সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ, হতাশা, নিঃসঙ্গতা, দুশ্চিন্তা, অবসাদ, মতানৈক্য ও পারিবারিক অশান্তি আত্মহননের কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে আত্মহত্যা করার নেপথ্যে অন্যান্য আরও অনেক কারণ রয়েছে, যেমন বিভিন্ন ধরনের নিরাময়-অযোগ্য অসুখ (যেমন ডিমেনশিয়া বা স্মৃতি-ভ্রম, ক্যানসার, এইডস, অ্যালঝাইমার্স, বার্ধক্যজনিত শারীরিক অসুখ ইত্যাদি)। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, এসব কারণে অনেক সময় ভুক্তভোগী মানুষ নিজেকে আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এছাড়া অনেক সৃজনশীল এবং আবেগপ্রবণ কবি ও লেখক ছিলেন, যারা অপমানের যন্ত্রণা ও আত্ম-অভিমান সহ্য করতে না পেরে আত্মঘাতী হয়েছেন। নোবেল বিজয়ী সুইডিশ কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার হ্যারি মার্টিনসন এমনই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
হ্যারি মার্টিনসন শুধু সুইডেনের স্বনামধন্য লেখক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেননি, তাকে বিশ শতকের প্রধান লেখকদের মধ্যে একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তিনি আন্তর্জাতিক সাহিত্যাঙ্গনে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি লাভ করেছেন তার বিখ্যাত আনিয়ারা (১৯৫৬) এপিক কাব্যগ্রন্থের জন্য। এই দীর্ঘ কাব্যগ্রন্থে তিনি এক ধরনের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি এবং মহাজাগতিক বিপর্যয়ের সামনে মানব অবস্থা তুলে ধরেছেন। তার সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে নোবেল কমিটি প্রশংসা করে মন্তব্য করেছিল, ‘তার লেখা শিশির ফোঁটা ধারণ করে, অথচ মহাবিশ্বকে প্রতিফলিত করে।’ তিনি এবং স্বদেশী কবি ও লেখক এইভিন্দ জনসন যৌথভাবে ১৯৭৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। জানা যায়, নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সময় তারা দু’জন সুইডিশ অ্যাকাডেমির সদস্য ছিলেন এবং একই সংস্থা নিজেদের দুই সদস্যকে পুরস্কার দিয়েছে। পুরস্কার ঘোষণার পর সুইডিশ অ্যাকাডেমির বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বজনপ্রীতির জন্য সুইডেনের সংবাদ মাধ্যমে তুমুল সমালোচনার ঝড় উঠেছিল, যার কারণে হ্যারি মার্টিনসন ভীষণ অপমানিত বোধ করেন এবং মাসিকভাবে ভেঙে পড়েন। সেই অপমান এবং মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে পুরস্কার লাভের চার বছর পরে তিনি আত্মহননের পথে পা বাড়িয়েছেন।
এই মুক্ত গদ্যের মূল উদ্দেশ্য হলো তার অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু নিয়ে আলোচনা করা, বিশেষ করে কবে, কোথায় এবং কীভাবে মৃত্যু হয়েছে, আত্মহননের কারণ এবং আত্মহননের চিরকুট (সুইসাইড নোট)। এছাড়া আরও আছে সুইডিশ একাডেমির কেলেঙ্কারি ও বিতর্ক, সাহিত্য সমালোচনা ও রাজনীতির শিকার এবং তার উত্তরাধিকার (লিগ্যাসি)। এ কথা সত্যি যে, বাংলাদেশি পাঠকের কাছে তিনি খুব বেশী পরিচিত নন। তাই তাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য শুরুতেই তার জীবনী ও সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা রয়েছে।
জীবনী ও সাহিত্যকর্ম
হ্যারি মার্টিনসনের (জন্ম নাম: হ্যারি এডমুন্ড মার্টিনসন) জন্ম ১৯০৪ সালের ৬ মে দক্ষিণ-পূর্ব সুইডেনের ব্লেকিংয়ে কাউন্টিতে। তিনি ছিলেন পিতা-মাতার সাত সন্তানের মধ্যে পঞ্চম। তার বাবা-মা গ্রামে একটি ছোট দোকান চালাতেন। তার শৈশব কেটেছে দারিদ্র্য আর কষ্টের মধ্যে। তিনি ছোটোবেলায় পিতা-মাতা দু’জনকে হারিয়েছেন। তার বাবা যক্ষ্মা রোগে ১৯১০ সালে মারা যান এবং বাবার মৃত্যুর এক বছর পরে তার মা নিজের সন্তানদের রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পোর্টল্যান্ডে চলে যান। ছেলেবেলায় তিনি একাধিক বাড়িতে দত্তক ছিলেন।
হ্যারি মার্টিনসনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল সীমিত। তিনি অল্প বয়সে স্কুল ছেড়ে বিভিন্ন টুকটাক কাজ করেছেন এবং ষোলো বছর বয়সে দত্তক পরিবার ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজে যোগ দেন। তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে ব্রাজিল এবং ভারত ভ্রমণ করেন। তবে কয়েক বছর পরে ফুসফুসের সমস্যার জন্য তিনি জাহাজের কাজে ইস্তফা দিয়ে নিজের দেশে থিতু হন। পরবর্তী সময়ে সুইডেনের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করেন এবং মাঝে মধ্যে ভবঘুরের মতো গ্রামীণ পথ-প্রান্তরে ঘুরে বেড়ান। একসময় ভবঘুরের মতো ঘোরাঘুরির জন্য তাকে ম্যালমো শহরে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন তার বয়স ছিল একুশ বছর।
স্টকহোমের ‘ব্র্যান্ড’ নামের পত্রিকার মাধ্যমে মোয়া সোয়ার্টেজের সঙ্গে ১৯২৭ সালে হ্যারি মার্টিনসনের পরিচয় হয়। মোয়া ছিলেন হ্যারির চেয়ে চৌদ্দ বছরের বড়। সেই সময় মোয়া সোয়ার্টজ একজন প্রগতিশীল নারী ও প্রলেতারিয়ান লেখিকা হিসেবে সাহিত্য মহলে পরিচিত ছিলেন। তখন হ্যারি মার্টিনসন জাহাজের চাকুরী ছেড়ে ফিরেছেন এবং তিনি ছিলেন বেকার ও গৃহহীন। তরুণ কবি হ্যারি মার্টিনসনের প্রতি মুগ্ধ হয়ে মোয়া সোয়ার্টজ তাকে নিজের কটেজে থাকার ব্যবস্থা করেন, যা স্টকহোম থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত ছিল। অবশেষে তারা ১৯২৯ সালে বিয়ে করেন এবং মোয়া সোয়ার্টজ বিয়ের পরে নাম পরিবর্তন করে রাখেন মোয়া মার্টিনসন। এক সময় হ্যারি মার্টিনসনের রাজনীতির প্রতি অনীহা নিয়ে দু’জনের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দেয় এবং ১৯৪০ সালে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। পরে ১৯৪২ সালে হ্যারি মার্টিনসন বিয়ে করেন ইনগ্রিড লিন্ডক্রান্টজকে।
১৯৬০-এর দশকে হ্যারি মার্টিনসনের স্বাস্থ্য খারাপ ছিল এবং তখন তিনি মানসিক অবসাদ ও বিষণ্নতায় ভুগেছেন। সমসাময়িক সাহিত্য জগতের লোকজন তাকে সাধারণত পুরোনো ধাঁচের লেখক হিসেবে দেখতেন। হ্যারি মার্টিনসন একজন বিশ্বনন্দিত লেখক হওয়া সত্ত্বেও খুব বেশী সংখ্যক সাহিত্যকর্ম লিখে যেতে পারেননি। জানা যায়, ১৯৭৩ সালের শুরুতে তিনি গুরুতর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেরে উঠার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে তিনি কখনই পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। জানা যায়, অবশ্য নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার জন্য কোনো বক্তৃতা দেননি। এ ছাড়া সুইডিশ একাডেমির বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে তীব্র সমালোচনা এবং তুমুল তর্ক-বিতর্কের ঝড় উঠার কারণে তার স্বাস্থ্য ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। তিনি ৭৩ বছর বয়সে ১৯৭৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সুইডেনের সোলনা শহরে আত্মহত্যা করেন এবং প্রায় দু’সপ্তাহ পরে (২৪ ফেব্রুয়ারি) তাকে সোলেনটুনা শহরে সমাহিত করা হয়।
হ্যারি মার্টিনসনের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব সত্ত্বেও সাহিত্যের প্রতি ছিল তার গভীর আগ্রহ এবং কিশোর বয়স থেকে কবিতা লেখা শুরু করেন। তার কয়েকটি কবিতা ১৯২৭ সালে বিভিন্ন ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। তিনি ১৯২৯ সালে প্রকাশিত ফাইভ ইয়ুথস (পাঁচ কবির কবিতা) সংকলনের মাধ্যমে কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, যা সুইডিশ সাহিত্যে আধুনিকতাবাদকে পরিচয় করিয়েছে। তার প্রথম একক কাব্যগ্রন্থ ঘোস্ট শিপ প্রকাশিত হয় একই বছরের সেপ্টেম্বরে এবং দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘নোম্যাড’ ১৯৩১ সালে। ‘নোম্যাড’ কাব্যগ্রন্থে তিনি বিভিন্ন বিষয় (যেমন প্রকৃতি, সমুদ্র ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এবং শৈশবের স্মৃতি) এবং সাহিত্যিক শৈলীর আশ্রয় নেন, যেখানে আধুনিক মুক্ত ছন্দ ও মহাকাব্যিক গদ্য কবিতার সঙ্গে প্রচলিত ছন্দ মেশানো হয়েছে। এই অভিনব কাব্য শৈলীর জন্য সমসাময়িক সমালোচকেরা ভূয়সী প্রশংসা করেন। পরবর্তী সময়ে হ্যারি মার্টিনসন দুটি গদ্য গ্রন্থ প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি তার নাবিক জীবনের বছরগুলো তুলে ধরেছেন: এইমলেস জার্নিজ (১৯৩২) এবং কেইপ ফেয়ারওয়েল (১৯৩৩)। এই গ্রন্থ দুটি তাকে তার প্রজন্মের প্রধান সুইডিশ লেখকদের তালিকায় একজন হিসেবে আরও দৃঢ় করেছে।
যদিও হ্যারি মার্টিনসনের ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত ন্যাচার কাব্যগ্রন্থ সফলতার মুখ দেখেনি, তবে ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ফ্লাওয়ারিং নেটল-এর মাধ্যমে তিনি বড় সাফল্য পেয়েছিলেন, যেখানে তিনি তার শৈশবের কথা বর্ণনা করেছেন। উপন্যাসটি সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছিল এবং পাঠকের কাছে ভীষণভাবে সমাদৃত হয়েছিল। জানা যায়, এক বছরের মধ্যে উপন্যাসের তিনটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে বিশ্বের ত্রিশটিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আত্মজীবনীমূলক পরবর্তী উপন্যাস ‘দ্য ওয়ে’ আউট প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালে এবং এই উপন্যাসও সমালোচকদের প্রশংসা ও বাণিজ্যিকভাবে সফলতা অর্জন করে।
হ্যারি মার্টিনসনের পরবর্তী কাব্যগ্রন্থপাসাদ (চীনা কবিতার প্রভাব নিয়ে রচিত) প্রকাশিত হয় ১৯৪৫ সালে এবং তার সবচেয়ে সফল কবিতার বই হিসেবে গণ্য করা হয়। তার ‘দ্য রোড টু ক্লকরিক’ (১৯৪৮) আরেকটি সফল উপন্যাস। তবে তার সবচেয়ে প্রশংসিত এবং বেশি বিক্রিত কবিতার বই ‘সিকাডা’ (১৯৫৩), যেখানে তিনি তার লেখার পরিচিত বিষয়বস্তু (যেমন প্রকৃতি, শিক্ষামূলক কবিতা এবং আধুনিক সমাজের সমালোচনা) ছাড়াও শেষ অংশে কিছুটা অভিনবত্ব প্রকাশ করেছেন।
হ্যারি মার্টিনসনের বিখ্যাত বই আনিয়ারা (যা এইভিন্দ জনসনের সঙ্গে যৌথভাবে রচিত) ১৯৫৬ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত হয়। এই মহাকাব্য গ্রন্থটি সুইডিশ সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। এই গ্রন্থে মানব অস্তিত্বের জটিলতা এবং মহাজাগতিক দুর্যোগের কারণে কী ঘটনা ঘটে, তারই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ভাষার নতুনত্ব এবং অস্তিত্বগত বিভিন্ন প্রশ্নের গভীর অন্বেষণের জন্য গ্রন্থটি পাঠক ও সমালোচকদের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়েছে। পরবর্তীতে গ্রন্থটি অপেরায় রূপান্তরিত করা হয় এবং ২০১৮ সালে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।
হ্যারি মার্টিনসন আনিয়ারা-এর দ্বিতীয় খণ্ড হিসেবে ডোরিডের্না রচনা করেছেন, যার মূল বিষয় ছিল পৃথিবীতে বেঁচে থাকা মানুষের গল্প গাঁথা। তার পরবর্তী গ্রন্থ ‘দ্যা গ্রাস ইন থুলে’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৮ সালে, যা মূলত প্রকৃতি বিষয়ক কবিতার সংকলন এবং সেই গ্রন্থটিও সমকালীন সমালোচক ও পাঠকদের কাছে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছিল। ‘দ্য ওয়াগন’ (১৯৬০) কাব্যগ্রন্থটি, যেখানে মূলত আধুনিক সমাজ ও তার প্রযুক্তির সমালোচনা করা হয়েছিল, কিন্তু সমকালীন সমালোচকদের কাছে ভালোভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাই সমালোচনার প্রতি সংবেদনশীল হয়ে হ্যারি মার্টিনসন ঘোষণা করেছিলেন যে, তিনি তার জীবদ্দশায় আর কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করবেন না। তবে তিনি ‘থ্রি নাইফস ফ্রম মেই’ (১৯৬৪) নাটক লেখেন, যা ৭ম শতাব্দীর চীনের আবহে রচিত এবং ১৯৬৪ সালে স্টকহোমের রয়্যাল ড্রামাটিক থিয়েটারে ইংমার বার্গম্যান প্রোডাকশন থেকে মঞ্চস্থ করা হয়। অবশেষে ১৯৭১ সালে তিনি ‘লাইট অ্যান্ড ডার্কনেস’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে পুনরায় কবি হিসেবে সাহিত্য জগতে ফিরে আসেন। পরে ১৯৭৩ সালে প্রকৃতিবিষয়ক কাব্যগ্রন্থ ‘টাফটস’ প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া তিনি একাধিক রেডিয়ো এবং মঞ্চ নাটক রচনা করেন।
সবশেষে বলা যায়, হ্যারি মার্টিনসনের কবিতা, যা ভাষাগত উদ্ভাবন এবং প্রায়শই রূপক ব্যবহার দিয়ে চিহ্নিত, প্রকৃতির প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এবং প্রেমকে গভীর মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। এ কথা সত্যি যে, সমৃদ্ধ ভাবচিত্র এবং সঠিক পর্যবেক্ষণের জন্য তার কবিতা আলাদা মর্যাদা পেয়েছে। ১৯৩০-এর দশকে তিনি কথাসাহিত্যে ও কবিতায় প্রকৃতি বর্ণনায় মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন এবং বিশেষত বিচক্ষণ দৃষ্টিতে দেখা ছোট ছোট প্রাকৃতিক কবিতার জন্য সুনাম অর্জন করেন। তখন থেকে তার সাহিত্যকর্মে প্রকৃতি এবং পৃথিবী ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠে। অন্যদিকে পরবর্তী সময়ের লেখায় হ্যারি মার্টিনসন নতুন বিষয়ের উপর মনোনিবেশ করেন। কেননা তখন মহাকাশ এবং মহাজাগতিক বিষয়ের প্রতি তার আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। তার শেষ দিকের সাহিত্যকর্মে আধুনিক জীবন এবং প্রযুক্তির প্রতি সমালোচনা আরও তীব্রভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
হ্যারি মার্টিনসন সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে অনেক পুরস্কার এবং সম্মাননা লাভ করেন। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি ‘অ্যানিয়ারা’ গ্রন্থের জন্য ১৯৭৪ সালে এইভিন্দ জনসনের সঙ্গে যৌথভাবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। এ ছাড়া তিনি ১৯৪৯ সালে নোমাড কাব্যগ্রন্থের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ‘বেলম্যান পুরস্কার’ লাভ করেন। তার ঝুড়িতে অন্যান্য আরও পুরস্কার রয়েছে, যেমন সুইডিশ সাহিত্য সমিতির ‘দ্য নাইন সোসাইটি প্রাইজ’ (১৯৩৮) এবং ‘ডোবলোগ প্রাইজ’ (১৯৫৪)। তিনি ১৯৪৯ সালে প্রথম ‘প্রোলেতারিয়ান লেখক’ হিসেবে সুইডিশ একাডেমির সদস্য নির্বাচিত হন।
সুইডিশ একাডেমির কেলেঙ্কারি ও বিতর্ক
সুইডিশ একাডেমি ১৯৭৪ সালের ৩ অক্টোবর ঘোষণা করে যে, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার যৌথভাবে হ্যারি মার্টিনসন এবং এইভিন্দ জনসনকে প্রদান করা হবে। বিজয়ীদের নাম ঘোষণার পরপরই বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং সুইডিশ একাডেমি নিজেদের দুই সদস্যকে পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে একাডেমির বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা শুরু হয়। তারা আরও অভিযোগ করে যে, নোবেল পুরস্কার একাডেমির সম্মান ও সততা এবং পুরস্কারের খ্যাতি ধ্বংস করেছে। এ প্রসঙ্গে একজন সমালোচনাকারী মন্তব্য করে লিখেছেন, ‘এমন সিদ্ধান্তে একাডেমি বিদ্রুপ এবং হাসির পাত্র হয়েছে…দুর্নীতির প্রতিক্রিয়া সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে এবং পুরস্কারের খ্যাতি মুছে দিয়েছে।’
যদিও পুরস্কারের সিদ্ধান্তে কিছু ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াও ছিল, কিন্তু স্পর্শকাতর হ্যারি মার্টিনসন নেতিবাচক মন্তব্য ও সমালোচনা নিজের হিসেবে গ্রহণ করেন। জানা যায়, সেই সময় সংবেদনশীল হ্যারি মার্টিনসনের কাছে কঠিন চাপ এবং সমালোচনা মোকাবিলা করা, এমনকি নিজের সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি উপভোগ করা, কঠিন মনে হয়ে পড়েছিল।
হ্যারি মার্টিনসন এবং এইভিন্দ জনসন ছাড়াও সেই বছরের সম্ভাব্য নোবেল পুরস্কারের পছন্দের তালিকায় ছিলেন ব্রিটিশ কথাসাহিত্যিক গ্রাহাম গ্রিন, কানাডিয়ান-মার্কিন লেখক সল বেলো এবং রুশ-মার্কিন লেখক ভ্লাদিমির নাবোকভ।
সাহিত্য সমালোচনা ও রাজনীতির শিকার
হ্যারি মার্টিনসনের সাহিত্যিক জীবন মোটেও নিষ্কণ্টক এবং মসৃণ ছিল না, বরং বিভিন্ন রচনার জন্য তাকে কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে, এমনকি সহ্য করতে হয়েছে অপমান ও গ্লানি। নিচে কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা হলো:
১. ‘নোমাড’ কাব্যগ্রন্থটি ১৯৩১ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, যার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন কমিউনিস্ট পত্রিকার সম্পাদক তুরে নেরমান। তিনি হ্যারি মার্টিনসনের নোমাড কাব্যগ্রন্থের সমালোচনামূলক পর্যালোচনা করে হ্যারি মার্টিনসনকে তার তথাকথিত ব্যক্তিবাদ এবং নিজের সামাজিক শ্রেণির প্রতি প্রতারণার জন্য উপহাস করেছিলেন। যদিও তার লেখক বন্ধুরা নেরমানের নগ্ন অপমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রবন্ধ/নিবন্ধ এবং সংবাদপত্রের সম্পাদকদের কাছে চিঠি লিখে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, কিন্তু তারপরও দু’পক্ষের মাঝে প্রকাশ্য বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। জানা যায়, হ্যারি মার্টিনসন তার সামাজিক বাস্তবতার বিভিন্ন স্লোগান সত্যিকারের কবিতা মনে করতেন এবং রাশিয়ান লিরিক কবি আলেকজান্ডার ব্লক (১৮৮০-১৯২১) এবং সের্গেই ইয়েসেনিন (১৮৯৫-১৯২৫)-এর শ্রেণি পার্থক্যের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে লেখা বিভিন্ন কবিতার সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং নিজেকে নিরপরাধ দাবি করেছেন।
২. ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে সাহিত্যের অধ্যাপক ভিক্টর স্বানবার্গ (১৮৯৬–১৯৮৫) হ্যারি মার্টিনসনের সাহিত্যকর্মের নতুন এক সমালোচক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তার একাধিক আক্রমণের জবাবে হ্যারি মার্টিনসন ভদ্রোচিত এবং শালীন ভাষায় একসময় একটি সাহিত্যিক জার্নালে সংক্ষিপ্ত এক বার্তায় পাল্টা আঘাত করেন।
৩. সম্ভবত হ্যারি মার্টিনসনের পুরো সাহিত্যিক জীবনে সবচেয়ে কঠোর এবং নিষ্ঠুর সমালোচক ছিলেন অভিজাত শ্রেণির ‘দাগেন্স নিউহেটের’-এর সম্পাদক ওলফ লাগারক্রান্টজ। তিনি ১৯৩০-এর দশক থেকে হ্যারি মার্টিনসনের সাহিত্যকর্ম অনুসরণ করেছেন। তিনি ১৯৫৬ সালে আনিয়ারা মহাকাব্যের সমালোচনা পুনরায় প্রকাশ করেন, যা তিনি ১৯৩৬ সালে হ্যারি মার্টিনসনের ‘রসকষহীন ভাষাগত গঠন শৈলীর প্রতি ঝোঁক’ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন।
৪. নতুন প্রজন্মের লেখকরা হ্যারি মার্টিনসনের প্রতি বিমুখ ছিল। কেননা তখন সুইডিশ লেখকদের মধ্যে রাজনৈতিক বার্তা নিয়ে সাহিত্য রচনা সাধারণ নিয়ম ছিল। উল্লেখ্য, ১৯৬৯ সালে তাকে উদ্দেশ্য করে সংবাদপত্রের এক প্রবন্ধে অবমাননাকর শিরোনাম প্রকাশিত হয়েছিল, ‘হ্যারি মার্টিনসনের কথা কি আপনাদের মনে আছে?’
কবে, কোথায় এবং কীভাবে মৃত্যু হয়েছে
হ্যারি মার্টিনসন ১৯৭৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ৬৩ বছর বয়সে স্টকহোমের ক্যারোলিনস্কা ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে আত্মহত্যা করেন। হাসপাতালের মনোরোগ ক্লিনিক থেকে এক জোড়া কাঁচি সংগ্রহ করে তিনি নিজের পেট কাটেন, যা জাপানি কায়দায় আত্মহত্যার পদ্ধতি ‘হারা-কিরি’-র মতো। জানা যায়, আত্মহত্যার আগে তিনি মানসিকভাবে হতাশ এবং সম্ভবত বিভ্রান্ত ছিলেন। তাই চিকিৎসার জন্য বন্ধুরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল।
আত্মহত্যার চিরকুট
হ্যারি মার্টিনসনের আত্মহত্যার চিরকুট বা সুইসাইডস নোট এবং সেই সময়ের চারপাশের পরিস্থিতি পাঠক ও সমালোচকদের কাছে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছিল। তবে আত্মহত্যার চিরকুটের, যা পরে তার বন্ধুরা কারোলিনস্কা হাসপাতালের মনোরোগ ক্লিনিকে খুঁজে পেয়েছিল, এক জায়গায় লেখা ছিল, ‘সমাজের জন্য বিষয়টি মোটেও উপযুক্ত নয় যে, একজন মানুষকে এমন মর্মান্তিক কাজ নিজেকেই করতে বাধ্য করা হবে। সম্ভবত আজকের দিনটি শেষ দিন, যা আমি নিজে কাজটি করতে পারব।’
আত্মহননের কারণ
হ্যারি মার্টিনসনের আত্মহত্যার নেপথ্যে একাধিক কারণ ছিল, যার মধ্যে অন্যতম কারণ ছিল নোবেল পুরস্কার লাভের পর সুইডিশ একাডেমির পক্ষপাতিত্ব ও সমালোচকদের তীব্র আক্রমণ, যা তার হতাশাকে বাড়িয়ে তুলেছিল। কেননা তিনি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না এবং সহকর্মীদের কাছ থেকে শত ভাগ সমর্থন পাচ্ছিলেন না, এমনকি পুরস্কার লাভের আনন্দ উপভোগ করতে পারছিলেন না। বলা হয়, নোবেল পুরস্কার তার মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতিতে অবদান রেখেছিল। এ ছাড়া চরম কষ্ট, আকাঙ্ক্ষা এবং রোষের সঙ্গে হ্যারি মার্টিনসনের সারাজীবনের লড়াই ছিল। তার জীবন দুঃখ ও তীব্র উদ্বেগে পরিপূর্ণ ছিল, যার মধ্যে ছিল বঞ্চনার স্থায়ী ভয়। এসব কারণে তার মধ্যে জন্ম নিয়েছিল মানসিক অবসাদ এবং শারীরিক অসুস্থতা।
উত্তরাধিকার
হ্যারি মার্টিনসনের সাহিত্যিক উত্তরাধিকার মূলত তার কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং নাটক। এ কথা সত্যি যে, সুইডিশ সাহিত্যে হ্যারি মার্টিনসনের প্রভাব অবিসংবাদিত এবং স্থায়ী। তার প্রাথমিক কাজের মাধ্যমে শ্রমজীবী শ্রেণির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতা এবং পরবর্তীতে অ্যানিয়ারা এপিক কবিতার মাধ্যমে বিস্তৃত দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলোর সঙ্গে তার সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয় সাহিত্যিক অবদানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। তিনি পরবর্তী প্রজন্মের সুইডিশ লেখক এবং কবিদের প্রভাবিত করেছেন।
হ্যারি মার্টিনসনের জীবনের চ্যালেঞ্জ এবং দুঃখ, যেমন তার শৈশবে ও কৈশোরে দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম, অনাথ হওয়ার কঠিন অভিজ্ঞতা এবং বিষণ্নতার সঙ্গে নিরন্তর লড়াই, পাঠক ও গবেষকদের কাছে আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে। গবেষকরা তার লেখার বিষয়বস্তু, শৈলী এবং সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করেন, যা সাহিত্য জগতে তার গুরুত্বকে আরও গভীরভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক।
হ্যারি মার্টিনসনের ১৯৭৩ সালে রচিত প্রকৃতি নিয়ে লেখা কবিতা সুইডিশ সঙ্গীতগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তার জন্মশতবার্ষিকী ২০০৪ সালে সুইডেনে উদ্যাপিত হয়েছিল। একইভাবে ২০২৪ সালে তার নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ৫০তম বার্ষিকী এবং তার জন্মের ১২০তম বার্ষিকী উদ্যাপন করা হয়েছে।
হ্যারি মার্টিনসনের স্মৃতির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক ‘সিকাডা পুরস্কার’ চালু করা হয়। এ ছাড়া ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘হ্যারি মার্টিনসন সোসাইটি’ এবং হ্যারি মার্টিনসনের চিন্তা-ভাবনা নিয়ে কাজ করা ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানকে ‘হ্যারি মার্টিনসন পুরস্কার’ প্রদান করা হয়। সুইডিশ একাডেমি সাহিত্যকর্মে হ্যারি মার্টিনসনের অবদান রাখার জন্য সুইডিশ ভাষায় সাহিত্য রচনার জন্য প্রতিবছর যেকোনো একজন লেখককে বৃত্তি প্রদান করে।
শেষকথা
নোবেল বিজয়ী হ্যারি মার্টিনসন একাধারে ছিলেন কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক এবং চিত্রনাট্যকার। তাকে ‘বিশ শতকের সুইডিশ কাব্যের মহান সংস্কারক' বলা হয়েছে এবং তিনি এমন একটি সাহিত্যিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন, যা ‘প্রলিতারিয়ান সাহিত্য’ নামে পরিচিত। সেই আন্দোলনের মূলে ছিল শ্রমজীবী মানুষের জীবন। তার সাহিত্যকর্মে প্রায়ই নিজের দারিদ্র্য ও সংগ্রামের অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি ১৯৭৪ সালে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন, যা তার আত্মহননের মূল কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। কেননা নোবেল পুরস্কার সময় তিনি ছিলেন সুইডিশ একাডেমির একজন সদস্য এবং সেই একাডেমি তাকে পুরস্কার দিয়েছে। বিজয়ীদের নাম ঘোষণার পরপরই সুইডিশ একাডেমির বিরুদ্ধে কেলেঙ্কারি ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে কঠিন চাপ এবং সমালোচনা মোকাবেলা করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। অবশেষে ১৯৭৮ সালে তিনি আত্মঘাতী হন।
সব শেষে বলা যায় যে, হ্যারি মার্টিনসনের আত্মহত্যা ছিল এমন এক বিয়োগান্ত পরিণতি, যা সৃজনশীল কাজ, খ্যাতির চাপ ও সমাজের প্রত্যাশার সঙ্গে তার জীবন সংগ্রামের কাহিনি জড়িত ছিল।