‘অস্তিত্ববাদী-চিত্রকল্পবাদ’-এর আলোকে জীবনানন্দ দাশের ‘ক্যাম্পে’ কবিতার তুলনামূলক পুনঃপাঠ ।। ড. মোস্তফা সারওয়ার

এই প্রবন্ধে জীবনানন্দ দাশের ‘ক্যাম্পে’ কবিতাটি আমি একটি নতুন তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকে পাঠ করার চেষ্টা করেছি। আমার প্রধান উদ্দেশ্য, আমার প্রস্তাবিত ‘অস্তিত্ববাদী-চিত্রকল্পবাদ’-এর দৃষ্টিকোণ থেকে কবিতাটির অন্তর্গত শিল্পসত্যকে বিশ্লেষণ করা।

এই নন্দনতাত্ত্বিক ধারণা অনুসারে, অসাধারণ চিত্রকল্পের সঙ্গে মানুষের অস্তিত্বগত আকাঙ্ক্ষা এমনভাবে মিশে যায় যে, দৃশ্যমান বাস্তবতা এক গভীর অস্তিত্ব-অনুভূতির ভাষায় রূপান্তরিত হয়। আমার বিশ্বাস, জীবনানন্দ কেবল প্রকৃতির কবি নন; তিনি বিশ্বসাহিত্যের সেই বিরল আধুনিক কবিদের একজন, যিনি আকাঙ্ক্ষা ও ধ্বংসকে, অস্তিত্ব ও পরাবাস্তবতাকে, একই শিল্পভাষায় একীভূত করেছেন। এই আলোচনায় আমি রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু-চেতনার আধ্যাত্মিকতা এবং টি. এস. এলিয়ট ও রবার্ট ফ্রস্টের নগর-আধুনিকতার সঙ্গে জীবনানন্দের নির্মম আধুনিকতাবোধের তুলনামূলক পাঠ উপস্থাপন করেছি। এখানে কবি তার চিত্রকল্পের মাধ্যমে ‘অস্তিত্বের সংকট’-কে দৃশ্যমান করে তুলেছেন। আমার কাছে মনে হয়েছে, বনজ আদিমতার প্রেক্ষাপটে আধুনিক মানুষের অনিশ্চিত অস্তিত্বকে জীবনানন্দ এক গভীর, ভয়াবহ ও শৈল্পিক রূপ দিয়েছেন।

জীবনানন্দ দাশের এই কবিতাটি পড়তে বসলেই আমার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত, শীতল অথচ তীব্র অনুভূতি জমতে থাকে। মনে হয়, আমিই যেন বনের ধারে এক নির্জন ক্যাম্পে একা শুয়ে আছি। বাইরে চৈত্রের মাতাল দক্ষিণা বাতাস বইছে। চাঁদের আলো যেন এক অচেনা মাদক স্বাদে ভরে আছে। অথচ আমার চোখে ঘুম নেই। নিরবচ্ছিন্ন ভেসে আসে একটি ঘাইহরিণীর ডাক। কী আশ্চর্য সেই আহ্বান! মনে হয়, কোনো আদিম সম্মোহনের মন্ত্র। ভাবি—এই গভীর নির্জন রাতে সে কাকে ডাকছে? আমি যেন নিশ্চিত জানি, আজ কোথাও না কোথাও শিকারিরা ওত পেতে আছে। বাতাসের গন্ধেই যেন তাদের উপস্থিতি টের পাই। বিছানায় শুয়ে-শুয়ে ভাবতে থাকি—বসন্তের এই রাতে প্রকৃতির এই রহস্যময় খেলাটির শেষ কোথায়?

দীর্ঘদিন ধরে আমি জীবনানন্দের ‘ক্যাম্পে’ কবিতার সেই সম্মোহনের ভেতরেই আবদ্ধ ছিলাম—

এখানে বনের কাছে ক্যাম্প আমি ফেলিয়াছি;
সারারাত দখিনা বাতাসে
আকাশের চাঁদের আলোয়
এক ঘাইহরিণীর ডাক শুনি—
কাহারে সে ডাকে!

হরিণীরা ডাকছে। আর সেই ডাক শুনে বনের গভীর অন্তস্তল থেকে পুরুষহরিণেরা ছুটে আসছে। কী এক অনিবার্য আকর্ষণ! আজ যেন তাদের হৃদয়ে কোনো ভয় নেই। চিতাবাঘের আতঙ্কও নেই। এমনকি বাঘও যেন এই মায়াময় রাতে তার হিংস্রতা থামিয়ে দিয়েছে। এই ভাবনাই আমার শরীর শিহরিতো করে তোলে। জীবনের এই তৃষ্ণা—এই আকাঙ্ক্ষা, যা রক্তকে নাচিয়ে তোলে—শুধু পশু-পাখিদের নয়; এটি জীবন নামক অস্তিত্বেরই এক আদিম স্পন্দন। যেমন মানুষ তার প্রিয়জনের আকর্ষণে ছুটে যায়, তেমনি এই নির্বাক হরিণেরাও চাঁদের আলো-ভেজা পথ ধরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে—তাদের ‘হৃদয়ের বোন’-এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে। তারা জানেই না, এই ডাক আসলে এক সুপরিকল্পিত মৃত্যুফাঁদ।

হঠাৎ বন্দুকের গর্জন! আমার বুক কেঁপে ওঠে। একাকী শুয়ে থেকেও আমি যেন সমস্ত দৃশ্যটি স্পষ্ট দেখতে পাই। ওই যে, ঘাইহরিণী ডাকছে। আর তার ডাকে সাড়া দিয়ে একে একে প্রেমাসক্ত পুরুষহরিণেরা লুটিয়ে পড়ছে। কী নির্মম এই খেলা! সকালে হয়তো কোনো থালায় পরিবেশিত হবে হরিণের মাংস। তার সুগন্ধ নাকে এসে লাগবে। কিন্তু এই রক্তমাখা মাংস কি সত্যিই কোনো তৃপ্তি দেয়? আমি নিজেকেই প্রশ্ন করি— আমি কি এই হরিণগুলোর চেয়ে খুব আলাদা?

আমার জীবনেও কি কোনো বসন্তরাতে কেউ এভাবেই আমাকে ডাকেনি? আমি কি আমার সমস্ত ভালোবাসা নিয়ে কোনো মোহময় আহ্বানের কাছে আত্মসমর্পণ করিনি? জীবনানন্দ তার কাব্যভাষায় লিখেছেন—

আমার হৃদয়—এক পুরুষহরিণ—
পৃথিবীর সব হিংসা ভুলে গিয়ে
চিতার চোখের ভয়—চমকের কথা সব পিছে ফেলে রেখে
তোমাকে কি চায় নাই ধরা দিতে?
আমার বুকের প্রেম ঐ মৃত মৃগদের মতো
যখন ধুলায় রক্তে মিশে গেছে
এই হরিণীর মতো তুমি বেঁচেছিলে নাকি?
জীবনের বিস্ময়ের রাতে
কোনো এক বসন্তের রাতে?

আমরা সকলেই যেন এই একই নিয়তির যাত্রী। যারা আজ রুচিসহকারে হরিণের মাংস খাচ্ছে, তারাও হয়তো গভীর রাতে কোনো ক্যাম্পের বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছে—অপ্রাপ্তির যন্ত্রণায়, হারিয়ে যাওয়া কোনো ভালোবাসার দহন নিয়ে। মানুষের প্রেম, কামনা, আকাঙ্ক্ষা এবং মৃত্যু—সবকিছু যেন এই বনের ঘাইহরিণীর ডাকে নির্মিত এক রহস্যময় গোলকধাঁধায় বন্দী। এক অদ্ভুত ক্লান্তি আমাকে আচ্ছন্ন করে। এই দোনলা বন্দুকের গর্জন, এই প্রাণহরণ! আর সবশেষে—সেই একই নিঃসঙ্গতা।

আমার মনে হয়, ফড়িং থেকে মানুষ পর্যন্ত—আমরা সবাই যেন এই মহাবিশ্বের কোনো এক মহাশিকারির হাতে বাঁধা পুতুল। বসন্তের জ্যোৎস্নায়, ওই মৃত হরিণগুলোর মতোই, আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো প্রতারণার কাছে পরাজিত হয়ে পড়ে আছি। যখন আমি জীবনানন্দের চিত্রকল্পের গভীরে প্রবেশ করি, তখন অনুভব করি—তিনি যেন ভাষা দিয়েই জীবন্ত উপস্থিতির সৃষ্টি করেন। তার চিত্রকল্প কেবল অলংকার নয়; এগুলো অস্তিত্বের মানচিত্র, যার মধ্য দিয়ে কবিতার অন্তর্লীন প্রাণশক্তি স্পন্দিত হতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে তিনি যখন লিখছেন—

চারিপাশে বনের বিস্ময়,
চৈত্রের বাতাস,
জ্যোৎস্নার শরীরের স্বাদ যেন;

তখন আমার মনে হয়, এখানে ‘স্বাদ’ শব্দটি চাঁদের আলোকে স্পর্শযোগ্য, অনুভবযোগ্য, এমনকি আস্বাদনযোগ্য করে তুলেছে। এটাই জীবনানন্দের শিল্পসাফল্য। তিনি আলোকে কেবল দৃশ্যমান রাখেন না; তাকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতায় রূপ দেন। আলো যেন জিহ্বায় এসে লাগে, শরীরের ভেতরে প্রবেশ করে।

আবার, যখন তিনি শিকারিদের দোনলা বন্দুকের শব্দ এবং রক্তমাখা হরিণের মাংসের কথা বলেন, তখন জীবনের এই নিষ্ঠুর সত্য আমাকে আতঙ্কিত করে তুলে। তার চিত্রকল্পে যেমন ‘নোনা মেয়েমানুষ’, তেমনি ‘লালসা–আকাঙ্ক্ষা–সাধ–প্রেম–স্বপ্ন’—সবকিছু এমনভাবে প্রস্ফুটিত হয় যে তা পাঠকের স্নায়ুতন্ত্রকে অবশ করে দেয়। তিনি লিখছেন—

মৃগদের বুকে আজ কোনো স্পষ্ট ভয় নাই,
সন্দেহের আবছায়া নাই কিছু;
কেবল পিপাসা আছে,
রোমহর্ষ আছে।

মৃগীর মুখের রূপে হয়তো চিতারও বুকে জেগেছে বিস্ময়;
লালসা—আকাঙ্ক্ষা—সাধ—প্রেম—স্বপ্ন স্ফুট হ’য়ে উঠিতেছে সব দিকে
আজ এই বসন্তের রাতে;

আমার বিশ্বাস, এই রোমহর্ষ কেবল হরিণের নয়; এটি আধুনিক মানুষের সেই আদিম কামনার উত্তেজনা, যা শেষ পর্যন্ত তাকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আমি বিস্ময়ে অভিভূত হই দেখে যে, জীবনানন্দ কী অসামান্য শিল্পদক্ষতায় আকাঙ্ক্ষার এই মাতাল উত্তাপকে মৃত্যুর নির্মম শীতলতার সঙ্গে একীভূত করেছেন।

রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শনের প্রসঙ্গ যখন সামনে আসে, তখন তার সেই আধ্যাত্মিক উপলব্ধির কথাই প্রথম মনে পড়ে, যেখানে মৃত্যু এক পরম মিলনের প্রতিশ্রুতি। কিন্তু জীবনানন্দের কাছে জীবন অনেক বেশি তীব্র, অনেক বেশি দেহময়, রক্তমাংসের স্পন্দনে পরিপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথ যেখানে মৃত্যুকে ‘শ্যামের সমান’ বলে এক রহস্যময় আধ্যাত্মিক প্রশান্তির আবরণে ঢেকে দিয়েছেন, সেখানে জীবনানন্দ জীবনের নগ্ন কামনা, তার রক্তক্ষরণ এবং তার নির্মম বাস্তবতাকে কোনো আচ্ছাদনের আড়ালে লুকিয়ে রাখেননি।

রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি পবিত্রতার প্রতীক; কিন্তু আমার কাছে জীবনানন্দের প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেটি অনাবৃত, আদিম এবং সহজাত—যেখানে আকাঙ্ক্ষা ও ধ্বংসের এক গভীর মিলন সংঘটিত হয়। প্রকৃতির সৌন্দর্য সেখানে নিষ্কলুষ নয়; বরং তার অন্তর্গত রয়েছে কামনা, রক্ত, মৃত্যু এবং অনিবার্য ক্ষয়ের এক অন্ধকার সত্য। রবীন্দ্রনাথের বাঁশির সুর মানুষকে যেমন এক উচ্চতর আত্মিক জগতে আহ্বান জানায়, তেমনি জীবনানন্দের দোনলা বন্দুকের শব্দ এবং ঘাইহরিণীর আর্ত আহ্বান আমাদের ফিরিয়ে আনে পৃথিবীর খুব কাছাকাছি, দেহের অনিবার্য সত্যের মুখোমুখি।

জীবনানন্দের শিল্পসাহস আমাকে বিস্মিত করে। কারণ তিনি সৌন্দর্যের অন্তরালে গোপন হয়ে থাকা বিভীষিকাকেও শিল্পে রূপ দিতে পেরেছেন। তার কাছে সৌন্দর্য কখনোই নিষ্পাপ নয়; বরং সৌন্দর্যের ভেতরেই মৃত্যু তার নীরব পদচারণা রেখে যায়। রবীন্দ্রনাথের কাছে মৃত্যু মানে মিলন। জীবনানন্দের কাছে মৃত্যু মানে— এক স্তূপ ক্লান্তি, রক্তের গন্ধ, এবং নিঃশেষিত আকাঙ্ক্ষার দীর্ঘশ্বাস। আমি বিস্ময়ে ভাবি— এই আত্মসমর্পণ কি কেবল প্রেমের কাছে? নাকি এটি ধ্বংসের সেই অনিবার্য আহ্বান, যার হাতছানি এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা কারও নেই?

আমার কাছে মনে হয়, জীবনানন্দ দাশের ‘ক্যাম্পে’ কবিতার গভীরতা এমন এক শিল্পভূমি নির্মাণ করেছে, যেখানে টি. এস. এলিয়ট কিংবা রবার্ট ফ্রস্টের কাব্যিক আধুনিকতাও অনেক সময় ম্লান বলে মনে হয়। এলিয়ট তার দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড (১৯২২)-এ আধুনিক সভ্যতার শুষ্কতা, বিচ্ছিন্নতা এবং আধ্যাত্মিক অবক্ষয়ের অসাধারণ শিল্পরূপ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু জীবনানন্দের মতো জীবনের সেই আদিম, লবণাক্ত, রক্তমাখা স্বাদ তিনি আবিষ্কার করতে পারেননি।

এলিয়ট যখন লিখছেন— "I will show you fear in a handful of dust."

তখন তিনি ভয়ের একটি দার্শনিক রূপ নির্মাণ করছেন। কিন্তু জীবনানন্দ সেই ভয়কে রক্তমাংসের অভিজ্ঞতায় রূপ দেন—‘নোনা মেয়েমানুষ’-এর গন্ধে, শরীরের কামনায়, মৃত্যুর প্রতীক্ষায়।আমার বিশ্বাস, জীবনানন্দের আধুনিকতা এলিয়টের আধুনিকতার তুলনায় অনেক বেশি শারীরিক, জৈবিক এবং অস্তিত্বমুখী।

আবার, রবার্ট ফ্রস্টের বনে মানুষকে আহ্বান জানায় বিশ্রামের জন্য— "The woods are lovely, dark and deep."

সেই বন নিঃসন্দেহে রহস্যময়, সুন্দর এবং গভীর। কিন্তু সেখানে ফ্রস্ট মূলত একজন নীরব পর্যবেক্ষক। তিনি বনকে দেখেন; বনের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করেন না।

অন্যদিকে জীবনানন্দ বনের সেই নিঃসঙ্গতার মধ্যে প্রবেশ করেন। তিনি নিজের দেহ, নিজের প্রেম, নিজের হৃদয়কে হরিণের রক্ত, ধুলো এবং মৃত্যুর সঙ্গে একাকার করে দেন। এইখানেই দুই কবির মৌলিক পার্থক্য। থমাস হার্ডির নিয়তিবাদের কথা যখন ভাবি, তখন আমার মনে হয়, তার ভাগ্যবোধ অনেকখানি যান্ত্রিক এবং অনিবার্য নিয়মের মতো কাজ করে। কিন্তু জীবনানন্দের ‘ক্যাম্পে’ কবিতায় নিয়তি আসে অন্য এক রূপে। সেখানে নিয়তি কোনো অদৃশ্য যন্ত্র নয়। সেখানে নিয়তি আসে এক সম্মোহনী আহ্বান হয়ে— যে আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা যায় না। যে ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকা যায় না। আর সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে মৃত্যুর নিশ্চিত সম্ভাবনা। জীবনানন্দ লিখছেন—

তুমিও কাহার কাছে শিখেছিলে!
মৃত পশুদের মতো আমাদের মাংস ল’য়ে আমরাও প’ড়ে থাকি;
বিয়োগের—বিয়োগের—মরণের মুখে এসে পড়ে সব
ঐ মৃত মৃগদের মতো।
প্রেমের সাহস সাধ স্বপ্ন ল’য়ে বেঁচে থেকে ব্যথা পাই, ঘৃণা-মৃত্যু পাই;
পাই না কি?

এই পঙক্তিগুলো পড়ে আমার গভীর বিষণ্নতা আসে। তবু একই সঙ্গে আমি মুগ্ধ হই দেখে, কী অসাধারণ শিল্পক্ষমতায় জীবনানন্দ পাশ্চাত্যের আধুনিকতাকে বাংলার জ্যোৎস্নাভেজা প্রকৃতির শরীরে এমনভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন যে, সেটি আর কোনো বিদেশি প্রভাব বলে মনে হয় না। বরং তা হয়ে ওঠে আমাদের নিজেদের অপ্রকাশিত বেদনার ভাষা—আমাদের নিজস্ব অস্তিত্বের গান। জীবনানন্দ দাশের এই নিঃসঙ্গ জগতের বিপরীতে বুদ্ধদেব বসু এবং সুধীন্দ্রনাথ দত্তের আধুনিকতা ছিল মূলত পাশ্চাত্যনির্ভর এবং বুদ্ধিবৃত্তিক। আমার বিশ্বাস, বুদ্ধদেব বসুর আধুনিকতা যেন এক পরিশীলিত নাগরিক ড্রয়িংরুমের সুগন্ধি—পরিমিত, রুচিশীল এবং সংস্কারিত। অন্যদিকে জীবনানন্দের আধুনিকতা যেন বনের ভেজা মাটির কাঁচা গন্ধ, রক্তের উত্তাপ, এবং আদিম প্রকৃতির অনিয়ন্ত্রিত স্পন্দন।

বুদ্ধদেব বসু যৌবনকে উদ্‌যাপন করেছেন। কিন্তু জীবনানন্দ উন্মোচন করেছেন যৌবনের ‘মারণ-আকর্ষণ’—সেই অপ্রতিরোধ্য টান, যা শেষ পর্যন্ত মানুষকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।অন্যদিকে, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের নাস্তিক্যবোধ থেকে উৎসারিত শূন্যতার তুলনায় জীবনানন্দের এই দেহময় বিলাপ আমাকে অনেক বেশি আলোড়িত করে। সুধীন্দ্রনাথ তার বিশ্লেষণী মেধা দিয়ে পৃথিবীকে বিচ্ছিন্ন করে দেখেছেন; তিনি অস্তিত্বকে বিচার করেছেন মস্তিষ্কের শীতল নির্লিপ্ততায়। কিন্তু জীবনানন্দ পৃথিবীকে অনুভব করেছেন তার সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে—রক্তে, দেহে, স্নায়ুতে এবং হৃদয়ের গভীরতম স্পন্দনে। এইখানেই তার স্বাতন্ত্র্য। তিনি প্রমাণ করেছেন, কবিতা কেবল বুদ্ধির অনুশীলন নয়; বরং তা রক্তমাংসের এক অনিবার্য যন্ত্রণা।

সুধীন্দ্রনাথের বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি— "অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?" তত্ত্বগত দিক থেকে হয়তো আরও সুসংহত, আরও দার্শনিক। কিন্তু জীবনানন্দের ‘ঘাইহরিণীর ডাক’ আমাদের স্নায়ুকে সরাসরি আঘাত করে। আমরা সেটিকে কেবল বুঝি না— আমরা সেটিকে অনুভব করি। আমার প্রস্তাবিত ‘অস্তিত্ববাদী-চিত্রকল্পবাদ’ (Existential-Imagism)-এর সর্বোচ্চ শিল্পসাফল্য আমি জীবনানন্দের কবিতাতেই প্রত্যক্ষ করি। আমার কাছে এটি এমন এক শিল্পরীতি, যেখানে চিত্রকল্প কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের অলংকার নয়; বরং অস্তিত্বের গভীরতম, জ্বলন্ত এবং দহনময় আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করার প্রধান শিল্প-উপায়। চিত্রকল্প এখানে দৃশ্য নির্মাণ করে না মাত্র; তা অস্তিত্বকে অনুভব করায়।

যখন জীবনানন্দ লিখছেন— "জ্যোৎস্নার শরীরের স্বাদ যেন"। তখন তিনি আলোককে পদার্থবিজ্ঞানের ফোটন-তত্ত্ব থেকে নামিয়ে এনে মানুষের অনুভূতির জগতে স্থাপন করেন। এখানে আলো আর কেবল দেখার বিষয় নয়। আলো স্পর্শযোগ্য। আলো আস্বাদনযোগ্য। আলো যেন দেহেরই এক সম্প্রসারণ। আমার কাছে এটি কেবল দৃষ্টিনির্ভর চিত্রকল্প নয়; বরং এক ধরনের স্পর্শানুভূতিমূলক চিত্রকল্প (Tactile Imagery), যা অস্তিত্বের অনাবৃত সত্যকে স্পর্শ করে। এই কারণেই জীবনানন্দের চিত্রকল্প কেবল চোখে ধরা পড়ে না—তা আমাদের ত্বকে লাগে, স্নায়ুতে কাঁপন তুলে, রক্তে মিশে যায়।

কবিতার শেষাংশে জীবনানন্দ লিখছেন—

এই ব্যথা—এই প্রেম সব দিকে র'য়ে গেছে—
কোথাও ফড়িঙে—কীটে, মানুষের বুকের ভিতরে,
আমাদের সবের জীবনে।
বসন্তের জ্যোৎস্নায় ওই মৃত মৃগদের মতো
আমরা সবাই।

এই সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমি নিজেও গভীরভাবে বিষণ্ন হয়ে পড়ি। এইখানেই আমার কাছে জীবনানন্দ দাশ সর্বোচ্চ আধুনিক কবি হিসেবে একাকী দাঁড়িয়ে আছেন। আমি বিস্ময়ে দেখি—তিনি মানুষ ও পশুকে একই অস্তিত্বের সমীকরণে স্থাপন করেছেন। আকাঙ্ক্ষা, কামনা, প্রেম এবং ধ্বংস—এই চারটি শক্তির সামনে মানুষ ও পশুর মধ্যে আর কোনো মৌলিক পার্থক্য অবশিষ্ট থাকে না। আমরা সবাই একই নিয়তির অংশীদার। আমার মনে হয়, আমরা সবাই এই মহাবিশ্বের কোনো এক মহাশিকারির হাতে পরিচালিত পুতুলমাত্র। আমাদের সমস্ত প্রেম, সমস্ত লালসা, সমস্ত আকাঙ্ক্ষা, সমস্ত স্বপ্ন—শেষ পর্যন্ত ধুলোর মধ্যেই মিশে যায়।

জীবনানন্দের আগে বাংলা কবিতায় কেউ এই নির্মম অথচ অনিবার্য সত্যকে এত নিষ্ঠুর সৌন্দর্যের সঙ্গে প্রকাশ করতে পারেননি। জীবনানন্দের পরাবাস্তব অনুভূতি এবং অস্তিত্বের আদিম তৃষ্ণা তাকে তার সমসাময়িক সকল কবির ঊর্ধ্বে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। আমার বিশ্বাস, তিনি কেবল একজন কবি নন। তিনি আধুনিক মানুষের অনিশ্চিত অস্তিত্ব, দমিত আকাঙ্ক্ষা এবং চিরন্তন নিঃসঙ্গতার এক অনন্ত ভাষ্যকার। এই স্বাতন্ত্র্যই তাকে কেবল বাংলার নয়, বিশ্বসাহিত্যেরও এক সার্বভৌম আধুনিক কবির আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আমি জীবনানন্দের রূপান্তরক্ষমতায় বিস্মিত। যখন তিনি লেখেন—"আমরা সবাই", তখন মানুষের সামাজিক পরিচয়ের সমস্ত আবরণ যেন এক মুহূর্তে খসে পড়ে। সেখানে আর কোনো আভিজাত্য নেই। কোনো শ্রেণি নেই। কোনো অহংকার নেই। রয়ে যায় কেবল প্রাণীর নিঃসঙ্গতা। এই কারণেই তার বিষণ্ন অথচ গভীর জ্যোৎস্না আমাকে আজও মুগ্ধ করে। সেই জ্যোৎস্না আমাদের অস্তিত্বের কঙ্কালকে আলোকিত করে।

দীর্ঘ পাঠ-অভিজ্ঞতার শেষে আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই— বাংলা কবিতার আধুনিকতার ইতিহাসে জীবনানন্দ দাশ সেই একক আধুনিক কবি, যিনি রক্তের গন্ধের মধ্যেও মহাজাগতিক নিঃসঙ্গতাকে আবিষ্কার করেছিলেন। একেবারেই একা?

ড. মোস্তফা সারওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্সের প্রফেসর ইমেরিটাস। তিনি ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ায় ভিজিটিং প্রফেসর ও অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া তিনি ডেলগাডো কমিউনিটি কলেজের ডিন ও ভাইস-চ্যান্সেলর ছিলেন।