ভ্লাদিমির ভ্লাদিমিরোভিচ মায়াকোভস্কি

‘শিরদাঁড়া বাঁশী’র কবি

মায়াকোভস্কিপ্রবাদপ্রতিম রুশ কবি ভ্লাদিমির ভ্লাদিমিরোভিচ মায়াকোভস্কির জন্ম ১৮৯৩ সালের ১৯ জুলাই। আজ থেকে ৮৬ বছর আগে ১৯৩০ সালের ১৪ এপ্রিল তিনি বুকে রিভলবারের গুলি চালিয়ে পৃথিবী থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। কবিতা, নাটক রচনা এবং মঞ্চ ও সিনেমায় অভিনয়-সহ শিল্পের নানা ক্ষেত্রে তাঁর বিচরণ ছিল। তাঁকে নিয়ে আমাদের এই আয়োজন।

১৯১৭ সালের আগে অর্থাৎ প্রাক-রুশ বিপ্লবের বছরগুলোতে মায়াকোভস্কি দ্রুত পরিচিত হয়ে ‍উঠছিলেন রুশ ফিউচারিস্ট আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র হিসেবে। ১৯১৩ সালে রুশ সাহিত্যের সেসময়কার তরুণ তুর্কিদের লেখা ভবিষ্যৎ সাহিত্যের চেহারা কেমন হবে সে বিষয়ক মেনিফেস্টো জনরুচির মুখে চড় নামক অগ্নিঝরা সে কাগজে মায়াকোভস্কি ছিলেন অন্যতম স্বাক্ষরদাতা। আর সাথে সাথে প্রকাশ পাচ্ছিলো তাঁর ‘ট্রাউজার পরা মেঘ’ (১৯১৫) এবং ‘শিরদাঁড়া বাঁশী’ বা ব্যাকবোন ফ্লুটের মত (১৯১৬)অসামান্য সব কবিতা। গোটা সৃষ্টি জীবন জুড়ে মায়াকোভস্কি বিচিত্র নানা বিষয়ে প্রচুর কাজ করেছেন: তিনি কবিতা লিখেছেন, নাটক লিখেছেন এবং পরিচালনা করেছেন, সিনেমায় নেমেছেন এবং রুশ গৃহযুদ্ধের সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে নানা জ্বলজ্যান্ত পোস্টার ছেপেছেন। অদ্ভুত বিষয় হলো যদিও মায়াকোভস্কির রচনায় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আনুগত্য এবং কমরেড লেনিনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিয়মিতভাবে প্রকাশ পেত, তবু সোভিয়েত রাষ্ট্র-যন্ত্রের সাথে কবির ব্যক্তিক যোগাযোগের জায়গাটি বরাবর জটিল আর বিরোধিতামূলক রয়ে গিয়েছিল। প্রায়শ তিনি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সোভিয়েত রাষ্ট্রের ক্রমাগত বেড়ে চলা সেন্সরশীপ এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে শিল্প-সাহিত্যগত পরিসরে ‘সোশ্যালিস্ট বাস্তবতা’কে উৎসাহিত করার নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের হোমরা-চোমরা মনিবদের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যেতেন। এছাড়াও ‘কর অফিসারের সাথে কবিতা বিষয়ক আলাপ (১৯২৬)’-এর মত কবিতা বা ‘স্নানাগার (দ্য বাথহাউস-১৯২৯)-’এর মত নাটক সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ এবং সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেজারভাবে সহ্য করে গেছে।
১৯৩০ সালে মায়াকোভস্কি আত্মহত্যা করেন। এমনকি মৃত্যুর পরও সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের ভেতরে তাঁর বিষয়ে হার্দিক মনোভাব গড়ে ওঠেনি। স্ট্যালিন যুগে কবির অনেক বিরূপ সমালোচনা হলেও মৃত্যুর পর স্ট্যালিন নিজে কবিকে ‘আমাদের সোভিয়েত যুগের শ্রেষ্ঠতম এবং সবচেয়ে প্রতিভাসম্পন্ন কবি’ হিসেবে স্বীকার করেন।
জীবন ও কাজ
তদানীন্তন রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত জর্জিয়ার বাঘদাতি-তে এক স্থানীয় ফরেস্টার ভ্লাদিমির কনস্তান্তিনোভিচ মায়াকোভস্কির ঘরে কবির জন্ম। তাঁর মা আলেক্সান্দ্রা আলেক্সিয়েভনা ছিলেন গৃহবধূ। কবির ছিল দু’জন বোন- ওলগা এবং ল্যুদমিলা। বাবার দিক থেকে রুশ এবং জাপোরজীয় কসাক আর মা’র দিক থেকে ইউক্রনীয় এ পরিবারের কথা হতো রুশ ভাষায়। স্কুলে বন্ধুদের সাথে কবিকে বলতে হতো জর্জিয় ভাষা। ‘ককেশাসে জন্ম আমার। বাবা ছিলেন কসাক। মা ইউক্রনীয় আর মাতৃভাষা জর্জিয়। তিনটি সংস্কৃতির সংমিশ্রণে আমি বেড়ে উঠেছি,’ নিজের সম্পর্কে ১৯২৭ সালে প্রাগের এক সংবাদপত্রকে বলেন। জন্মভূমি জর্জিয়া আদম ও ঈভের মিলনক্ষেত্র সে পুরাণের স্বর্গোদ্যান বলে তিনি বিশ্বাস করতেন।
১৯০২ সাল নাগাদ ১৪ বছরের কিশোর মায়াকোভস্কি ছোট্ট শহর কুতায়িসিতে সংঘটিত নানা সমাজতন্ত্রী বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিতেন। মায়াকোভস্কির পড়শিরা তাঁর মা’কে ‘এতটুকু ছেলেকে এত স্বাধীনতা দেবা’র প্রশ্নে অনুযোগ করলেও তাঁর মা মনে করতেন শিশু-কিশোরের বিকাশে খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ না চাপানো ভাল। সেবছর হঠাৎ বিষক্রিয়ায় পিতার মৃত্যু হলে কিশোর কবি তার মা এবং দু’ বোনের সাথে মস্কোতে চলে আসেন। তার আগে স্থাবর সব সম্পত্তি তাদের বিক্রি করে দিতে হয়।
১৯০৬ সাল নাগাদ মায়াকোভস্কি মার্ক্সিস্ট সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ বোধ করতে থাকেন। ‘গল্প-উপন্যাস নয় বরং হেগেল, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান এবং নিশ্চিতভাবে মার্ক্সবাদ পড়তে আমার বেশি ভাল লাগতো। আমার জন্য মার্ক্সের ‘প্রারম্ভিক’-এর চেয়ে উচ্চতর কোন শিল্প থাকতে পারে না,’ ১৯২০ সালে লেখা আত্মজীবনীতে একথা বলেন তিনি। ১৯০৭ সালে যে জিমনাসিয়ামের ছাত্র ছিলেন, সেখানে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের গোপন পাঠচক্রের সদস্য হন এবং অংশ নেন রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টির নানা কাজে। বিধবা মা টিউশন ফি দিতে পারছিলেন না বলে ১৯০৮ সালে জিমনাসিয়াম থেকে মায়াকোভস্কিকে বহিষ্কার করা হয়। পরের দু’বছর স্ট্রগানোভের এক স্কুলে পড়াশুনা করেন।

তরুণ বলশেভিক এ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে মায়াকোভস্কি প্রচারপত্র বিলি করতেন, একটি পিস্তল রাখতেন কাছে এবং ১৯০৯ সাল থেকে জেলের নারী রাজনৈতিক বন্দীদের জেল থেকে লুকিয়ে মুক্ত করে অন্যত্র সরিয়ে দেবার কাজে জড়িয়ে পড়েন। ফলে বেশ ক’বার গ্রেপ্তার হন এবং শেষমেশ ১১ মাসের কারাদণ্ড জোটে। মস্কোর ব্যুতিরকা কারাগারে একাকী বন্দীত্ব অবস্থায় কাটানোর সময় তিনি প্রথম কবিতা লিখতে শুরু করেন। ‘বিপ্লব এবং কবিতা আমার মাথায় জড়িয়ে যায় এবং একাকার হয়ে যায়,’ পরে আত্মজীবনীতে লিখেছেন তিনি। যাহোক, বয়স কম ছিল বলে তার কারাভোগের মেয়াদ কমে যায় এবং ১৯১০ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি ছাড়া পান। জেলখানায় থাকা অবস্থায় যে নোটবুকে কবিতা লিখতেন, সেটি এক কারারক্ষী নিয়ে নেবার পর জীবনের প্রথম কবিতাগুলো তাঁর হারিয়ে যায়। তবু ১৯০৯-কে তাঁর সাহিত্য জীবনের সূচনা বৎসর বলে তিনি মনে করতেন।
জেলখানা থেকে ছাড়া পাবার পরও মনের ভেতরে গভীরভাবে সমাজতন্ত্রী রয়ে গেলেন মায়াকোভস্কি, তবে বুঝেছিলেন সাহিত্য তাঁকে যতটা টানে রাজনীতি ততা নয়। পার্টি ছেড়ে দিলেন (আর কখনো যোগদান করেননি) আর মন দিলেন পড়াশুনায়। ‘পার্টির কাজ ছেড়ে দিলাম। ধীর-স্থির বসে শেখার চেষ্টা শুরু করলাম। এখন আমার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ালো সমাজতন্ত্রী শিল্প প্রতিষ্ঠা।’
ফিউচারিস্ট কবিদের সঙ্গেফিউচারিস্ট আন্দোলন এবং মায়াকোভস্কি
রুশ সাহিত্যের বাঁক পরম্পরায় ফিউচারিস্ট আন্দোলন বাংলার ত্রিশের দশকের কবিতায় আধুনিকতার সূচনা বা তারও অনেক পরের হাংরি আন্দোলনের মত জরুরি পালাবদল। তার আগের প্রেক্ষিতটা একটু বলা দরকার। ১৯১১ সালে মায়াকোভস্কি মস্কো শিল্পকলা স্কুলে ভর্তি হলেন। ১৯১১ সালে ডেভিড বারলিয়ুক নামে এক সহপাঠীর সাথে পরিচয় হয়। প্রথম পরিচয়ে ঘুষোঘুষি হলেও পরে আজীবন স্থায়ী বন্ধুত্ব হয় যা জন্ম দেয় ভবিষ্যতের রুশ শিল্প-সাহিত্য জগতের অন্যতম আন্দোলন ফিউচারিস্ট মুভমেন্টের। ফিউচারিস্ট ম্যুভমেন্ট সাহিত্যকে একাডেমিক পণ্ডিতদের ভুবন থেকে বের করে আনতে চেয়েছে: এর সদস্যরা রাস্তায় কবিতা পড়েছে, শ্রোতাদের দিকে চা ছুঁড়ে মেরেছে এবং নিজেদের ভাবমূর্তিকে তারা তদানীন্তন শিল্প-সাহিত্যের প্রাতিষ্ঠানিকতার প্রতি হুমকি হিসেবে প্রতিপন্ন করতে চেয়েছে।
বারলিয়ুক প্রথম মায়াকোভস্কির কবিতা শুনে তাঁকে ‘প্রতিভাবান কবি’ আখ্যা দেন। পরে দু্’বন্ধুর বন্ধুত্ব ভেঙে গেলেও এবং চলার পথ ভিন্ন হলেও মায়াকোভস্কি গোটা জীবন জুড়ে বারলিয়ুককে ‘আমার অসাধারণ বন্ধু’ অভিধায় অভিহিত করে গেছেন। ‘বারলিয়ুক আমাকে কবি করে তুলেছিল। আমাকে সে ফরাসী ও প্রুশিয়ান সাহিত্য থেকে পড়ে শুনিয়েছে। আমাকে নিয়ে গেছে পুস্তকের জগতে। আমার সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিয়েছে। আমাকে অন্য কোথাও যেতে দেয়নি। প্রতিদিন আমাকে সে ৫০ কোপেক দিত যেন আমি লিখি এবং ক্ষুধায় না মরি!’
সাহিত্য জীবন
১৯১২ সালের ১৭ নভেম্বর মায়াকোভস্কি প্রথম প্রকাশ্যে কবিতা পড়েন। সে বছর ডিসেম্বরে তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতাগুলো যেমন ‘রাত্রি’ এবং ‘সকাল’ রুশ সাহিত্যের ফিউচারিস্ট আন্দোলনের মুখপত্র ‘জনরুচির মুখে চড়’-এ প্রকাশিত হয়। এ আন্দোলনের রাগী যুবকেরা ‘পুশকিন, দস্তয়েভস্কি, তলস্তয় প্রমুখকে আধুনিকতার বাষ্পীয় শকট থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে চেয়েছিলেন।’ ১৯১৩ সালে মায়াকোভস্কির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আমি’ প্রকাশিত হয়।
ডিসেম্বর ১৯১৩ নাগাদ মায়াকোভস্কি ফিউচারিস্ট আন্দোলনের কিছু সহযোদ্ধাকে নিয়ে সেভাস্তপল, কেরচ, ওদেসা এবং কিশিনেভ-সহ রাশিয়ার প্রায় ১৭টি শহরে ঘোরেন। কবিরা উদ্ভট পোশাকে যেতেন। মায়াকোভস্কি পরতেন নিজের হাতে তৈরি একটি হলুদ শেমিজ। ১৯১৪ সালের ১৩ এপ্রিল এ ভ্রমণ শেষ হলো বটে তবে ততদিনে কবি এবং কবির বন্ধু বারলিউক দু’জনে মস্কোর শিল্পকলা স্কুল থেকে বহিষ্কৃত।
১৯১৪ সালে লটারিতে ৬৫ রুবল জিতে মায়াকোভস্কি পেট্রোগ্রাডের কাছে কুয়োক্কালা নামে জায়গায় যান। সেখানে তিনি ‘ট্রাউজার পরিহিত মেঘ’ কবিতা শেষ করেন, কোর্নি চুকোভস্কির দাচা বা গ্রামের বাড়ি কয়েকবার বেড়াতে যান, নামী চিত্রশিল্পী রেপিনের মডেল হন এবং প্রথমবারের মত ম্যাক্সিম গোর্কির সাথে সামনা সামনি পরিচিত হন।
প্রথম মহাযুদ্ধের শুরুতে মায়াকোভস্কি স্বেচ্ছাসেবী হলেও ‘রাজনৈতিকভাবে তার উপর যথেষ্ট আস্থা রাখা যায় না’ এমন কারণে বাতিল হলেন। এসময় তিনি দেশপ্রেমিক ‘লুবক’-এ এবং নভ (কুমারী মৃত্তিকা)-এ বেশ কিছু যুদ্ধবিরোধী কবিতা যেমন ‘মা এবং একটি সন্ধ্যা যা জার্মানদের হাতে নিহত’ বা ‘যুদ্ধ ঘোষণা হয়েছে’ কি ‘আমি এবং নেপোলিয়ন’র মত কবিতাগুলো প্রকাশ করতে থাকেন। ম্যাক্সিম গোর্কি নিজে লেতোপিস নামে তাঁর জার্নালে মায়াকোভস্কিকে লিখতে বলেন।
সে বছরের জুনে মায়াকোভস্কি লিলিয়া ব্রিক নামে এক বিবাহিতা নারীর প্রেমে পড়েন। লিলিয়া মায়াকোভস্কির ‘ম্যিউজ’ হবার দায়িত্ব সাগ্রহে কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। লিলিয়ার স্বামী ওসিপ স্ত্রীর প্রেম নিয়ে মোটে চিন্তিত হননি; বরং তিনি কবির কিছু কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন এবং ফিউচারিস্ট আন্দোলনকে সাহায্য করতে উদ্যোক্তা হিসেবে কিছু চিঠি লেখেন। লিলিয়ার সাথে প্রেম, প্রথম মহাযুদ্ধ এবং সমাজতন্ত্র কবির অদ্যাবধি সেরা হিসেবে স্বীকৃত কাজগুলো যেমন ট্রাউজার পরা মেঘ (১৯১৫), শিরদাঁড়া বাঁশী (১৯১৫), যুদ্ধ এবং পৃথিবী (১৯১৬) এবং মানব (১৯১৮)-এ গভীর প্রভাব রাখে।
শুরুতে যুদ্ধ করতে চেয়েছেন বটে তবে ১৯১৫-এর শরতে যখন যুদ্ধ যাবার জন্য আবেদনপত্র তাঁর কাছে পূরণের জন্য আসলো, তখন তিনি পিছিয়ে গেছেন। গোর্কির সাহায্যে পের্ট্রোগ্রাড সামরিক গাড়ি চালনা স্কুলে ড্রাফটসম্যানের চাকরি নিলেন এবং সেখানে ১৯১৭-এর শুরু অবধি কাজ করলেন। ১৯১৬ সালে গোর্কির সহায়তায় পারুস (পাল) প্রকাশনা থেকে তাঁর কবিতা সংকলন হাম্বার মত সহজ প্রকাশিত হয়।
১৯১৭-১৯২৭

মায়াকোভস্কি বলশেভিক বিপ্লবকে মনেপ্রাণে আলিঙ্গন করেন এবং কিছুদিন স্মোলনিতে কাজ করেন যেখানে তিনি ভ্লাদিমির লেনিনকে অন্য বিপ্লবী সৈন্যদের সাথে কাঁধে কাঁধ মেলাতে দেখেন। সে অনুভূতির বিবরণ দেন আত্মজীবনীতে এভাবে: ‘গ্রহণ করা বা না করা, এমন কোন প্রশ্ন ছিল না…সেটা ছিল আমার বিপ্লব।’ ১৯১৭-এর নভেম্বরে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক আয়োজিত লেখক, চিত্রশিল্পী এবং নাট্য নির্দেশকদের এক সভায় নয়া শাসনব্যবস্থার প্রতি আনুগত্যের শপথ নেবার সভায় মায়াকোভস্কি অংশ নেন।

১৯১৮ সালে মায়াকোভস্কি নেপচুন স্টুডিও নির্মিত তিনটি নিঃশব্দ সিনেমায় অভিনয় করেন যাদের চিত্রনাট্য তাঁর লেখা। ১৯২২-এর মে মাসে মায়াকোভস্কি পভোলঝেয়ে দূর্ভিক্ষের পীড়িত মানুষের জন্য চাঁদা তোলার কাজ শেষ করে চলে যান বিদেশ বেড়াতে। ঘুরে দ্যাখেন রিগা, বার্লিন আর প্যারিস। প্যারিসে তিনি পিকাসোর স্টুডিওগুলো ঘুরে দেখেন। ১৯২২ থেকে ১৯২৮ নাগাদ মায়াকোভস্কি Left Art Front (LEF)-এর সদস্য ছিলেন যাদের শ্লোগান ছিল ‘ঘটনার সাহিত্য, কল্পনার নয় (literature of fact, not fiction)।’ অক্টোবর ১৯২৪-এ মায়াকোভস্কি ভ্লাদিমির উলিয়ানভ লেনিনের মৃত্যুর পর তিনি তাঁর মহাকাব্যিক ৩,০০০ পঙক্তির কবিতাটি অসংখ্য জনসমাগমে পড়ে শোনান। পরের ফেব্রুয়ারিতে এ কবিতাটি পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়। পাঁচ বছর পর মায়াকোভস্কি এ কবিতার তৃতীয় অংশটি যখন বলশয় থিয়েটারে পড়ে শোনান, ২০ মিনিট ধরে শ্রোতারা তাঁকে দাঁড়িয়ে করতালি দিয়ে অভিবাদন যোগান। ১৯২৫ সালে কবি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কিউবায় ভ্রমণ করেন। জানুয়ারি ১৯২৭-এ Left Art Front ((LEF)-এর প্রথম সংস্করণ ছাপা হয়। অথচ মায়াকোভস্কি নিজের হাতে গড়ে তোলা পত্রিকায় মায়া কাটিয়ে শিল্পীর জেদ আর অভিমানে ছেড়ে দেন খোদ Left Art Front ((LEF)।
১৯২৯-৩০
১৯২৯ সালে প্রকাশনা সংস্থা গসলিতিজিদাজ চার খণ্ডে ‘মায়াকোভস্কি রচনা সমগ্র’ প্রকাশ করেন। তবে, যবনিকার অন্তরালে কবির সাথে সোভিয়েত সাহিত্য প্রতিষ্ঠানসমূহের যোগাযোগে ক্রমে দূরত্ব নেমে আসছিল। যদিও কবির সাহিত্য জীবনের ২০ বছরপূর্তি উদযাপন করা হচ্ছিলো, পার্টির অনেক সদস্য, নেতা এবং বিশেষতঃ স্ট্যালিন সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। শিল্পে নিরীক্ষা পার্টি নেতৃত্বে একদম পছন্দ করছিলেন না। তাঁর রচিত ‘ছারপোকা’ এবং ‘স্নানাগার’ নামে প্রহসনমূলক নাটক দু’টো নিয়ে রুশ প্রলেতারিয়েত লেখক সমিতি প্রবল প্রতিক্রিয়া জানায়। ১৯৩০-এর ফেব্রুয়ারিতে মায়াকোভস্কিকে পপুতচিক নামে অভিহিত করা হয় যা অত্যন্ত ভয়ানক রাজনৈতিক অভিযোগ। সোভিয়েত সংবাদপত্রে ‘মায়াকোভশ্চিনা নিপাত যাক!’ প্রচারণা শুরু হয়। ৯এপ্রিল ১৯৩০-এ ‘আমার কণ্ঠস্বরের সপ্তমে (At the Top of My Voice)’ পাঠের সময়ে ছাত্ররা তাঁর কবিতা ‘খুব বেশি দূর্বোধ্যতা’র অভিযোগে চিৎকার করে থামিয়ে দেয়।

সুইসাইট নোটমৃত্যু

১২ এপ্রিল ১৯৩০-এ মায়াকোভস্কিকে শেষবারের মত জনসমাবেশে দেখা যায়। তার মাত্র দু’দিন পর মায়াকোভস্কির সেসময়কার বান্ধবী অভিনেত্রী ভেরোনিকা পোলোনস্কায়া কবির ফ্ল্যাট ছেড়ে বের হবার সময় পেছনের বন্ধ দরোজার ভেতর থেকে গুলির শব্দ শোনেন। ছুটে গিয়ে দেখেতে পান কবি মেঝেতে শুয়ে পড়ে আছেন; কবি নিজে নিজের হৃৎপিণ্ডে গুলি করেছেন। হস্তাক্ষরে লিখিত চিরকুটে লেখা: ‘তোমাদের প্রত্যেককে বলি। আমি মারা যাচ্ছি, তবে সেজন্য কাউকে দায়ি করতে চাচ্ছি না। দয়া করে এটা নিয়ে গুজব ছড়াবে না। যেহেতু মৃত এ মানুষটি এসব খুব অপছন্দ করতো। মা, বোনেরা, সহযোদ্ধারা, আমাকে ক্ষমা করো- জানি এটা কোন ভাল পন্থা নয় (এমনটা করতে আমি কাউকে বলি না)- তবে আর কোন উপায় ছিল না। লিলি- আমাকে ভালবেসো। কমরেড সরকার, আমার পরিবারের সদস্যরা হচ্ছেন লিলি ব্রিক, মা, আমার দু বোন এবং ভেরোনিকা ভিতোলদোভনা পোলোনস্কায়া। যদি তোমরা তাদের একটি ভাল জীবন দিতে পার, তবে খুব খুশি হব। ব্রিকস দম্পতির উদ্দেশ্যে যে কবিতাটি রচনা শুরু করেছিলাম সেটি তাদের দিও। তারা এ কবিতার মানে বুঝবে। “অসমাপ্ত কবিতা” হিসেবে মায়াকোভস্কির আত্মহত্যা চিরকুটে লেখা ছিল: ‘এবং তারা বলে- ঘটনাটি শেষ হয়ে গেছে। প্রেমের তরণী দুমড়ে মুচড়ে গেছে/ভয়াবহ রুটিনের ফাঁদে/পারষ্পরিক আঘাত, বেদনা আর যকৃতের চাপে।’
১৯৩০ সালের ১৭ এপ্রিল মায়াকোভস্কির শেষযাত্রায় দেড় লক্ষ মানুষ অংশ নেন। লেনিন এবং স্ট্যালিনের শবযাত্রার পর এটি রাশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম শেষযাত্রা।
মায়াকোভস্কির মৃত্যুর দিনে প্রাভদা একটি সংবাদ প্রকাশ করে যেখানে বলা হয়: ‘আত্মহত্যার এ ঘটনা পুরোপুরি ব্যক্তিগত কারণে এবং এর সাথে জনগণ বা কবির সাহিত্যকৃতির কোন সম্বন্ধ টানা যাবে না। মূলতঃ এক প্রকার অসুস্থতা যা থেকে কবি পুরোপুরি সুস্থ হননি, সে অসুস্থতার কারণে কবি আত্মহত্যা করেছেন।’ অভিনেত্রী ভেরোনিকা পোলনস্কায়ার সাথে মনোমালিন্যের পর মায়াকোভস্কি আত্মহত্যা করেন বলে কেউ কেউ মনে করেন। ভেরোনিকার সাথে কবির প্রেম চলছিল তবে তিনি তাঁর স্বামীকে ছেড়ে আসতে রাজি হচ্ছিলেন না। তবে, লিলিয়া ব্রিক তাঁর স্মৃতিকথায় বলেন, ‘আত্মহত্যার ধারণাটি তাঁর ভেতর ক্রনিক অসুখের মত কাজ করেছে এবং যে কোন ক্রনিক ব্যাধির মত প্রতিকূল পরিবেশে এ অসুখ শুধু বাড়ে।’
ভেরোনিকা পোলনস্কায়ার মতে, ১৩ এপ্রিল মায়াকোভস্কি তাঁর সাথে কথায় কথায় আত্মহত্যার কথা বলেন যখন তাঁরা দু’জনে ভালেন্তিন কাতায়েভের ঘরে ছিলেন। তবে ভেরোনিকা ভেবেছিলেন এটা মায়াকোভস্কির তাঁকে আবেগগতভাবে নরম করে তোলার চেষ্টা।
তবু কবির মৃত্যু নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলতে থাকে। দেখা গেল আত্মহত্যার চিরকূট লেখা হয়েছিল তাঁর আত্মহত্যার দু’দিন আগে। কবির মৃত্যুর পরপর লিলিয়া এবং ওসিপ ব্রিক দম্পতিকে দ্রুত বিদেশ পাঠিয়ে দেয়া হয়। কবির দেহ থেকে বের করা গুলি বা বুলেট কিন্তু তাঁর পিস্তলের ব্র্যাণ্ডের সাথে খাপ খায়নি। পড়শিদের মতে তারা দু’টো গুলির শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন। দশদিন পরে সরকারী তদন্ত রিপোর্টে বলা হয় কবি আত্মহত্যা করেছিলেন। অনেকে আবার এটা কঠোর সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের দ্বারা হত্যা বলেও মনে করেন। গ্লাসনস্ত-এর সময়ে ১৯৯১ সালে মায়াকোভস্কি যাদুঘরে আবার মায়াকোভস্কির ছবি, গুলিতে ছিন্ন হওয়া জামা, যে কার্পেটের উপর কবি লুটিয়ে পড়েছিলেন এবং আত্মহত্যার চিরকুটে কবির হস্তাক্ষর পরীক্ষা এসব কিছু পুনরায় খতিয়ে দেখা হয়। তবে শেষাবধি এটা নিশ্চিত হয় যে ঐ হস্তাক্ষর কবির, অন্য কারো নয়।
সোভিয়েত রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সাথে মায়াকোভস্কির শেষ দিকের শীতল দূরত্ব তাঁর মনোবেদনা বাড়িয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন।
ব্যক্তি জীবনের টানাপোড়েন
মস্কোর নিকটস্থ মালাখোভকায় এক গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপনের কেন্দ্র বা রুশি গ্রামের বাড়ি ‘দাচা’য় মায়াকোভস্কির সাথে প্রথম ওসিপ এবং লিলিয়া ব্রিক দম্পতির পরিচয় হয়। এর পরপর লিলিয়ার বোন এলসার সাথে কবির কিছুদিনের একটি প্রেম হয়। এলসা কবিকে এরপর একদিন নিয়ে যান পের্ট্রোগ্রাডে ব্রিক দম্পতির ফ্ল্যাটে। ব্রিক দম্পতি তখনো অবধি ছিল সফল কয়লা ব্যবসায়ী। সাহিত্যে বিশেষ অনুরাগ তখনো তাদের দেখা যায়নি। তবে, সেদিন সন্ধ্যায় কবি তাঁর অপ্রকাশিত কবিতা ‘ট্রাউজার পরা মেঘ’ আমন্ত্রণকারী গৃহকর্ত্রীকে পড়ে শোনান (তোমার জন্য, লিলিয়া)। ‘সেটা ছিল আমার জীবনের সুখীতম দিন’- কবি এমনটা পরে লিখেছিলেন তাঁর আত্মজীবনীতে। তবে, লিলিয়া ব্রিকের স্মৃতিকথা অনুসারে তাঁর স্বামীও কবিকে খুব পছন্দ করেছিলেন। ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি সর্ম্পকে লিলিয়ার ভাবনা: ‘ভলোদিয়া আমার প্রেমে পড়েনি; সে আমাকে আক্রমণ করতো। দু’বছর এবং ছ’মাস সময় ধরে আমার এক মূহূর্তের শান্তি ছিল না। আমি বুঝতাম যে ভলোদিয়া প্রতিভাবান তবে আমি তাঁকে পছন্দ করতাম না। এমন নিনাদিত চরিত্রের মানুষ আমার ভাল লাগত না…আমার ভাল লাগত না যে ভলোদিয়া এত লম্বা আর রাস্তার সব মানুষ তাকে তাকিয়ে দ্যাখে; আমার এটা ভেবে বিরক্ত লাগত যে সে নিজে নিজের গলার স্বরকে ভালবাসত, এমনকি মায়াকোভস্কি নামটা আমার সহ্য হতো না…সস্তা জনপ্রিয় একটি কলমি নাম আর কি!”
মায়াকোভস্কির টানা মুগ্ধতা আর রুক্ষ চেহারা লিলিয়াকে উত্যক্ত করতো। অথচ, কবি লিলিয়াকে সুখী করতে এক ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়া এবং হাঁটার সময় সে সময়ের অভিজাতদের মত একটি ছড়ি ব্যবহার করা শুরু করেন।
ওসিপ ব্রিক মায়াকোভস্কির লেখা ‘ট্রাউজার পরা মেঘ’ সেপ্টেম্বর ১৯১৫-তে প্রকাশের পরপর মায়াকোভস্কি পের্ট্রোগ্রাডের প্যালেস রয়্যাল হোটেলে আস্তানা গাড়লেন। কবি তাঁর ফিউচারিস্ট বন্ধুদের সাথে ব্রিক দম্পতির পরিচয় করিয়ে দিলে তাদের বাড়িটা দ্রুত কিছু সাহিত্য সাঁলোর রূপ নিতে থাকে। তখন থেকে মায়াকোভস্কি বলতে গেলে তাঁর প্রায় সব বড় কবিতা লিলিয়াকে উদ্দেশ্য করে লিখতেন (শুধুমাত্র লেনিনকে নিয়ে লেখা কবিতাটি ছাড়া)।একটা সময় মায়াকোভস্কি লিলিয়ার সাথে তাঁর পরিচয়ের আগের সময়ের কবিতাগুলোতেও ‘লিলিয়ার উদ্দেশ্যে’ কথাটি লিখতে থাকেন। ১৯১৮-এর গ্রীষ্মে লিলিয়া এবং ভ্লাদিমির ‘Encased in a Film’নামে একটি সিনেমায় একসাথে অভিনয় করেন।১৯১৯-এর মার্চে মায়াকোভস্কি এবং ব্রিকস দম্পতি মস্কোতে এসে তাগাংকার গণ্ড্রিকভ লেনে একটি ফ্ল্যাটে থিতু হন।
লিলিয়া ব্রিকের সঙ্গে কবি১৯২০ সালে মায়াকোভস্কির সাথে লিলিয়া লাভিনস্কায়ার একটি স্বল্পস্থায়ী প্রেম হয়। লাভিনস্কয়া গ্লেব-নিকিতা লাভিনস্কি নামে এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন (১৯২১-১৯৮৬) যিনি পরে এক সোভিয়েত ভাস্কর হন। ১৯২২ সালে লিলিয়া ব্রিক আলেক্সান্দার ক্রাসনশচয়োকভ নামে এক ব্যক্তির প্রেমে পড়েন। এর ফলে কবির সাথে লিলিয়ার তিন মাসের এক দূরত্ব তৈরি হয় যা খানিকটা তাঁর কবিতা এ্যাবাউট দ্যাট-এ প্রতিফলিত হয়েছে। লিলিয়া আর মায়াকোভস্কির প্রেম শেষ হয় এক বছরের মাথায়। তবু ঠিক সে অর্থে ছাড়াছাড়ি হয় না তাদের।
‘এখন আমি ব্যানার এবং প্রেম থেকে মুক্ত,’ কবি তাঁর এক কবিতায় স্বীকার করলেন। এতকিছুর পরও ১৯২৬-এ মায়াকোভস্কি যখন মস্কোর গেণ্ড্রিকভ লেনে একটি রাষ্ট্রায়ত্ব ফ্ল্যাটের বরাদ্দ পেলেন, ব্রিক দম্পতি এবং কবি সে ফ্ল্যাটে একসাথে উঠলেন এবং সেখানে ১৯৩০ সাল অবধি তাঁরা থাকলেন। মায়াকোভস্কি লিলিয়ার প্রতি তাঁর আনুগত্য প্রকাশ করে চলেন এবং তাঁকে পরিবারের সদস্য হিসেবে বিবেচনা করতেন। তবে মধ্য-১৯৩০ নাগাদ ব্রিক নিজে স্ট্যালিনকে লেখা তাঁর এক ব্যক্তিগত চিঠিতে মায়াকোভস্কি প্রসঙ্গে তাঁর সত্যিকারের অনুভূতি জানিয়ে দেন। তবে, লিলিয়াকে কবির নিকটজনেরা অনেকে পছন্দ করতেন না। যেমন কবির বোন ল্যুডমিলা লিলিয়াকে ভাবতেন অসংবেদনশীল, সংহারী চরিত্রের নারী যে সত্যি সত্যি কখনো না ভালবেসেছে মায়াকোভস্কিকে, না তাঁর কবিতাকে। ‘মায়াকোভস্কি লিলিয়াকে অমনটা ভালবেসেছিলেন যে নারীর এক হাতে থাকত চাবুক,’ আন্দ্রে ভজনেসেনস্কি পরে স্মৃতিচারণ করেন। সাহিত্য সমালোচক এবং ঐতিহাসিক ভিক্টর শকলোভস্কির মতে ব্রিক দম্পতি ছিল ‘লাশ খুঁজে বেড়ানো।’
১৯২৫-এর গ্রীষ্মে মায়াকোভস্কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে গেলে সেখানে জন্মসূত্রে রুশ অভিবাসী এলি জোন্সের সাথে পরিচয় হয়। এলি জোন্স ছিলেন দোভাষী যিনি রুশ, ফরাসী সহ চারটি ভাষা বলতে পারতেন। তিন মাসের এক অচ্ছেদ্য প্রেমে তাঁরা বন্দী হন। কবি দেশে ফিরে আসার পর এলি এক কন্যার জন্ম দেন যার নাম রাখা হয় প্যাট্রিসিয়া। মায়াকোভস্কি ১৯২৮-এ ফ্রান্সের নিসে মাত্র একবারের জন্য মেয়েকে দ্যাখেন। প্রেমটি দু’জনে মিলে গোপন রেখেছিলেন। কন্যা প্যাট্রিসিয়া পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক কলেজে শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত হন এবং Mayakovsky in Manhattan নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন যা তাঁর মা’র অপ্রকাশিত স্মৃতিকথার উপর ভিত্তি করে রচিত। সোভিয়েত রাষ্ট্র ভেঙে যাবার পর প্যাট্রিসিয়া রাশিয়া বেড়াতে যান এবং বিপুল সমাদর ও সম্মান লাভ করেন। তখন থেকে নিজের নামে ‘ভ্লাদিমিরোভনা মায়াকোভস্কায়া’ যুক্ত করেন তিনি যার মানে হলো ভ্লাদিমিরের কন্যা মায়াকোভস্কায়া।
১৯২৮ সালে প্যারিসে মায়াকোভস্কির সাথে আর এক রুশ অভিবাসী তরুণী তাতিয়ানার পরিচয় হয়। মাত্র ২২ বছর বয়সী তাতিয়ানা একটি ফ্যাশন হাউসের হয়ে মডেলের কাজ করছিলেন। দূর্দান্ত রূপসী তাতিয়ানার প্রেমে মায়াকোভস্কি উন্মত্ত হয়ে যান। কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন এলি জোন্স বা কন্যা সন্তান প্যাট্রিসিয়ার মা’র প্রভাব থেকে কবিকে মুক্ত করতে লিলিয়া তার বোন এলসার মাধ্যমে তাতিয়ানার সাথে কবিকে পরিচয় করান, তাতিয়ানার প্রেমে ভয়ংকরভাবে পড়েন কবি। প্রেমে পাগল কবি তাতিয়ানাকে রাশিয়াতে ফিরতে অনুরোধ জানালেও তাতিয়ানা অস্বীকার করেন। এরপর ১৯২৯ সালে মায়াকোভস্কি তাতিয়ানাকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে প্যারিস যাবার প্রয়াস চালান। অনুমান করা হয় সোভিয়েত আমলাতন্ত্রের সাথে উচ্চ মহলে ভাল যোগাযোগ রাখা লিলিয়া মায়াকোভস্কির প্যারিস যাবার চেষ্টা আটকে দেন। ফলে ভিসা পান না তিনি। উনিশশো বিশের দশকের শেষের দিকে কবির আরো দু’টো প্রেম হয়েছিল। একটি নাতালিয়া ব্রুখানেংকোর (১৯০৫-১৯৮৪) সাথে এবং অন্যটি ভেরোনিকা পোলোনস্কোয়া (১৯০৮-১৯৯৪)-র সাথে। জীবনে একাধিক নারীর হাতে প্রতারিত মায়াকোভস্কির জন্য স্বামীকে ছেড়ে আসতে না চাওয়া ভেরোনিকার প্রত্যাখ্যান ছিল কফিনে শেষ পেরেক। তবে অনেকে মনে করেন যে ভেরোনিকা নন, প্যারিসের ফ্যাশন মডেল তাতিয়ানার জন্য আত্মহত্যা করেছিলেন মায়াকোভস্কি। জানুয়ারি ১৯২৯-এ মায়াকোভস্কি একবার নাতালিয়া ব্রুখানেংকোকে বলেন যে ‘তাতিয়ানাকে আর একবার তাড়াতাড়ি না দেখতে পেলে মাথার খুলিতে পিস্তল ঠেকাবো।’ ১৯৩০-এর ১৪ এপ্রিল ঠিক সে কাজটি করে বসেন কবি।
তাতিয়ানাপ্রধান সাহিত্যকৃতি
খানিকটা অপরিণত হলেও মায়াকোভস্কির প্রথম যৌবনের কবিতাগুলো রুশ সাহিত্যের ফিউচারিস্ট আন্দোলন জাত প্রধান কতিপয় কবির অন্যতম হিসেবে তাঁকে পরিচিতি দেয়। ১৯১৩ সালে লেখা তাঁর কবিতাগুলো স্যুররিয়ালিস্টিক, অগ্রন্থিত যা জোরালো ছন্দ এবং অতিশয়োক্তকৃত দৃশ্যকল্পের উপর দাঁড়াতে চেয়েছে। শব্দগুলো সেখানে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যায়, রাস্তার ভাষাকে কবিতায় ঢুকিয়ে তা’ অনেকাংশে প্রথাগত সাহিত্য বাসরের কবিতার পক্ষে অনুপযুক্ত করা হয়। ‘রাস্তার গণতান্ত্রিক ভাষা’ সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন তিনি। ১৯১৪ সালে তাঁর প্রথম বড় কাজ ‘ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি’তে তিনি নাগরিক জীবন এবং পুঁজিবাদের কঠোর সমালোচনা করেন। ১৯১৫-এ লেখা ‘ট্রাউজার পরা মেঘ’-এ তিনি প্রেম, বিপ্লব, শিল্প এমন উত্তপ্ত সব বিষয়ে তার কবির ভাবনা ব্যক্ত করেন। এ কবিতায় ব্যবহৃত ভাষা অবশ্য ছিল রাস্তার ভাষা। ১৯১৬ সালে কবির লেখা ‘শিরদাঁড়া বাঁশী’ পুনরায় সমকালীন সাহিত্য সমালোচকদের ক্রুদ্ধ করে তোলে। কেউ কেউ এ কবিতাকে এক ‘ম্যালেরিয়া রোগীর শুন্য বকাবাজি’ বলেন এবং কেউ কেউ তাঁকে দ্রুত ‘হাসপাতালে পাঠানোর’ উপদেশ দেন। তবে, ‘শিরদাঁড়া বাঁশী’ ছিল বাস্তবিক কবিতায় আত্ম-উন্মোচনের এক নতুন আংগিক যেখানে একসাথে সামাজিক ক্রোধ এবং ব্যক্তিগত বিষাদ দেখা দেয়। ১৯১৭-২১ সাল নাগাদ বছরগুলো কবির জন্য ছিল অত্যন্ত ফলদায়ী সময় যিনি বলশেভিক বিপ্লবকে স্বাগত জানান প্রচুর কবিতা এবং নাট্যকর্মের মাধ্যমে। ১৯২১ সালে কবির কবিতা ১৫০ ০০০ ০০০ রুশ বিপ্লবের বৈশ্বিক স্ফুলিংগ বিস্তার নিয়ে লেখা হলেও লেনিন এ কবিতায় আদৌ মোহিত হননি। তিনি (লেনিন) বরং ১৯২২ সালে লেখা ঘুমন্ত সোভিয়েত আমলাতন্ত্রকে নিয়ে লেখা মায়াকোভস্কির কবিতাটি পছন্দ করেন।
মায়াকোভস্কির কবিতায় রাজনীতি ঘুরে-ফিরে আসে তবে কোন সামাজিক প্রচারণা তাঁর ব্যক্তি জীবনে প্রেমের চাহিদার ক্ষতিপূরণ করতে পারেনি। অক্টোবর ১৯২৪-এ ভ্লাদিমির লেনিনকে নিয়ে লেখা তাঁর কবিতা নিয়েও সোভিয়েত সাহিত্য সমালোচকরা কুণ্ঠিত ছিলেন। ভালেন্তিন কাতায়েভ এবং বরিস পাস্তেরনাকের মত বন্ধুরা তাঁকে ‘তুচ্ছ রাজনৈতিক প্রচারণায় প্রতিভা অপচয়ের’ জন্য ধমকাতেন। ১৯৩২-এ সমালোচক মারিনা সভেতায়েভা মায়াকোভস্কির মৃত্যু নিয়ে বলেন, ‘বারো বছর ধরে ব্যক্তি মায়াকোভস্কি কবি মায়াকোভস্কিকে ধ্বংস করছিলেন। বারো বছর পর তেরো বছরের মাথায় কবি মায়াকোভস্কি জেগে উঠলেন এবং মানুষ মায়াকোভস্কিকে হত্যা করলেন…তাঁর আত্মহত্যা বেঁচে থাকলো এর পরের বারোটি বছর।’
মায়াকোভস্কির মৃত্যুর পর সোভিয়েত রাষ্ট্রের প্রলেতারিয়েত লেখক সঙ্ঘ কবির সব প্রকাশনা বাতিল করে এবং সোভিয়েত প্রেসে তাঁর নামোল্লেখ বন্ধ করা হয়। ১৯৩৫ সালে লিলিয়া ব্রিক জোশেফ স্ট্যালিনকে একটি চিঠিতে এ বিষয়ে সাহায্য চান এবং স্ট্যালিন একটি বার্তা পাঠিয়ে বলেন: ‘কমরেড, দয়া করে ব্রিকের চিঠিটি দেখুন। আমাদের সোভিয়েত যুগের সেরা এবং সবচেয়ে প্রতিভাধর কবি হলেন মায়াকোভস্কি। ব্রিকের অভিযোগ আমার মতে যুক্তিযুক্ত…।’
এর ফলে রাতারাতি মায়াকোভস্কিকে আবার ধ্রুপদী সোভিয়েত কবি হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়। তিনি ছিলেন বিশ শতকের শুরুর দিকে রাশিয়ার avant-garde সাহিত্য আন্দোলনের একমাত্র কবি যাকে সোভিয়েত মূলধারার সাহিত্যে স্থান দেয়া হলো। জর্জিয়ায় তাঁর জন্মস্থানকে ‘মায়াকোভস্কি’ নামকরণে সম্মানিত করা হয়।১৯৩৭ সালে মস্কোতে মায়াকোভস্কি যাদুঘর এবং তাঁর নামে মস্কোর ‘ট্রিয়াম্ফ স্কোয়ার’-কে ‘মায়াকোভস্কি স্কোয়ার’ নামে ডাকা হতে থাকে। ১৯৩৮ সালে ‘মায়াকোভস্কি মেট্রো’ খোলা হয়। ১৯৪১ সালে ‘মায়াকোভস্কি এখানে শুরু করেন’ কবিতার জন্য এক কবি পান স্ট্যালিন পুরস্কার। তবে এসব প্রাপ্তির অন্য দিকের ফল ভাল ছিল না। সোভিয়েত পাঠকের কাছে মায়াকোভস্কির পরিচয় হয়ে দাঁড়ায় ‘বিপ্লবের কবি’ হিসেবে। তাঁর অধিকতর নিভৃত বা বিতর্কিত চরণগুলো পাঠকের কাছে অজানা থেকে যায়। তাঁর অনেক কবিতার কিছু চরণ গোটা প্রেক্ষিত থেকে আলাদা করে শ্লোগানের মত ব্যবহার করা হয় (যেমন মহাশক্তিশালী ‘লেনিন বেঁচেছিলেন, লেনিন বাঁচেন, লেনিন চিরদিন বাঁচবেন’ চরণটি)।এভাবে একটি প্রজন্মের প্রধান বিদ্রোহী কবিকে একটি নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিভূ করে গড়ে তোলা হয়। স্ট্যালিনের এ অনুগ্রহ, বরিস পাস্তেরনাকের মতে, মায়াকোভস্কির ‘দ্বিতীয় মৃত্যু’ নিশ্চিত করেছিল। ১৯৫০-এর শেষ এবং ১৯৬০-এর শেষে মায়াকোভস্কিকে সোভিয়েত দেশের নবীনতর প্রজন্মের কবি ও লেখকেরা শৈল্পিক স্বাধীনতা আর দুঃসাহসী নিরীক্ষার কবি হিসেবে নতুনভাবে উপলব্ধি করা শুরু করেন। নব প্রজন্মের কবিরা যারা কমিউনিস্ট ডগমায় বীতশ্রদ্ধ তারাও মায়াকোভস্কির ভাস্কর্যের সামনে কবিতা পড়া শুরু করেন । মায়াকোভস্কির দ্বারা বিপুলভাবে প্রভাবিত কবি ও লেখকদের ভেতর ছিলেন ভালেন্তিন কাতায়েভ, আন্দ্রে ভজসেনেস্কি এবং আরো অনেকে। বিদেশে নাজিম হিকমেত বা পাবলো নেরুদা তাঁর কাজ দ্বারা অনুপ্রাণিত বলে সরলভাবে স্বীকার করেছেন। রাষ্ট্র হিসেবে সোভিয়েত দেশের একদম শেষের বছরগুলোয় অবশ্য মায়াকোভস্কির লেখাকে অনেক সেকেলে এবং গুরুত্বহীন বলার চেষ্টা করা হয়। স্কুল পাঠ্যপুস্তকে তাঁর কবিতা বাতিলের দাবি তোলা হয়। তবে পক্ষ-বিপক্ষের নানা মতামতের পর মায়াকোভস্কিকে ‘রুশ কবিতার ক্রুদ্ধ ষাঁঢ়,’ ‘ছন্দের যাদুকর’ এবং ‘প্রচলিত রুচিবোধ ও প্রমিত মানের বিপরীতে ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যবাদী ও বিদ্রোহী’ হিসেবে আজ মনে করা হয়।