জীবনানন্দ দাশের ‘লোকেন বোসের জর্নাল’ কবিতাখানি তার শ্রেষ্ঠ কবিতার একটি। কবিতাটি পড়তে পড়তে হঠাৎই আমার মনে হলো—এর চরিত্রগুলো তো আমার খুব পরিচিত। আমি যেন তাদের চিনি। সুজাতা, অমিতা সেন, সুবল ও কবিতার কথক লোকেন বোস—তারা যেন আমার আশপাশেই কবিতায় এবং কবিতার বাইরে ছদ্মবেশ ধারণ করে আছে।
এই তর্জমা একদমই আমার ব্যক্তিগত ভাবনা, তবে আমার ভাবনার জগতে ডুবসাঁতার দেয়ার আগে কবিতাটা আরেকবার পড়তে পারেন।
এখন ভাবুন—সুজাতার জায়গায় শোভনা, অমিতা সেনের জায়গায় লাবণ্য দাশের ছায়া ও সুবলের চরিত্রটা কিছুটা কাল্পনিক অথবা জীবনানন্দের আরেক সত্তা। সুবল ছিল কৃষ্ণের সখা—সে কথায় পরে আসছি। লোকেন বোস নিজেই যদি হন সাক্ষাৎ জীবনানন্দ অথবা জীবনানন্দেরই আরও এক অন্তর্লীন ছায়া, তাহলে চরিত্রগুলোর এই নব দৃশ্যায়ন আপনার মস্তিষ্কে প্রতিস্থাপন করলেই কবিতার চিত্ররূপ আপনাকে আলোড়িত করবে। আমি আমার এই পাঠ-প্রস্তাবের পক্ষে কিছু যুক্তি দিতে চাই। কবিতার প্রথম চার লাইন—
“সুজাতাকে ভালোবাসতাম আমি—
এখনো কি ভালোবাসি?
সেটা অবসরে ভাববার কথা,
অবসর তবু নেই”
প্রথম চার লাইনে দেখা যায় লোকেন বোসের প্রেমিক হৃদয়ের দ্বান্দ্বিকতা। লোকেন বোস নামক ব্যক্তিটি সুজাতা নামের যে রমণীকে ভালোবাসতেন, এখন তার প্রতি আর প্রেম আছে কি না, তা নিয়ে তিনি নিজেই সন্দিহান। পরের তিন লাইনে লোকেন বাবু তার নিজের ভাবনা চার্বাক, ফ্রয়েড, প্লেটো, পাভলভদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছেন। তিনি আর ভাবতে চান না। কেননা ভাবলেই যে অতৃপ্ত প্রেমের স্মৃতি ভাবনায় চেপে বসে। সে জন্যই ‘হায় চিল’ কবিতায় জীবনানন্দ বলেছেন— “কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!”
কবিতায় উল্লেখ্য চারজন মনীষীর নাম বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কেন লোকেন বোস তার সুজাতাকে ভালোবাসার ব্যাপারটি তাদের চিন্তা করার বিষয় বানাচ্ছেন? চারজনের মধ্যে ফ্রয়েড ও পাভলভ আধুনিক মনস্তত্ত্ব ও আচরণ-বিশ্লেষণের সঙ্গে যুক্ত, চার্বাক ও প্লেটো পৃথিবীর দুই প্রাচীন চিন্তার দুই প্রবাদপ্রতিম নাম—ভারতীয় বস্তুবাদ এবং গ্রিক দর্শন। কবিতায় ফ্রয়েড ও প্লেটো পাশাপাশি অবস্থান করছেন—এটা কবির ইচ্ছাকৃত বলেই আমার ধারণা। কারণ জীবনানন্দ ফ্রয়েডের যৌন মনস্তত্ত্ব এবং প্লেটোর অতীন্দ্রিয় প্রেমের ধারণা, যা “প্লেটোনিক প্রেম” নামে পরিচিত, সে বিষয়ে অবগত ছিলেন বলেই মনে হয়।
লোকেন বোসের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বটা সেখানেই। তিনি বুঝে উঠতে পারছিলেন না, সুজাতার প্রতি তার যে প্রেম ছিল—বা হয়তো এখনও আছে—সেটা কি দৈহিক, না মানসিক? মানসিক, না দৈহিক? তবে চার্বাক ও পাভলভের ভূমিকা কী? ভূমিকা আছে। চার্বাক ভারতীয় বস্তুবাদের দ্রষ্টা। তিনি অতিপ্রাকৃতবাদ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, পরজাগতিক ব্যাপারগুলো অস্বীকার করে ব্যক্তির ইহজাগতিক সুখকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, লোকেন বোস সুজাতাকে মৃত্যুর পরে কোনো অন্য জগতে নয়, এই পৃথিবীতেই প্রণয়িনী রূপে পেতে চান। মৃত্যুর পরে অন্য কোনো পরজাগতিক অস্তিত্বে তিনি বিশ্বাস করেন না। এই বক্তব্যের ভেতর দিয়েই লোকেন বোস ধর্ম ও ঈশ্বরের ধারণাকে সূক্ষ্মভাবে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যান।
পাভলভ মানুষের ও প্রাণীর আচরণগত প্রতিক্রিয়া নিয়ে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের এক বড়ো নাম। আচরণ, অভ্যাস, উদ্দীপনা ও প্রতিক্রিয়া—এসবের সঙ্গে মানুষের প্রেমও কখনও কখনও অদ্ভুতভাবে যুক্ত হয়ে যায়। এখানে ডারউইনের বিবর্তন-ভাবনা কিংবা কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং-এর যৌথ অবচেতনের কথাও মনে পড়তে পারে। লোকেন বোস যেন সুজাতার আচরণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও খুঁজছেন। তাই কবিবর তার সুজাতা-সম্পর্কিত সকল ভাবনা এই মহাজ্ঞানী চিন্তাবিদদের মাথায় চাপিয়ে দিয়েছেন।
লেখার শুরুতেই আমি সুজাতার স্থানে শোভনাকে কল্পনা করার কথা বলেছিলাম। জীবনানন্দ দাশের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে পড়াশোনা করলে শোভনা-প্রসঙ্গটি নিয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। জীবনানন্দের জীবনী-আলোচনায় শোভনা এক গভীর, আলো-আঁধারি নাম। তিনি জীবনানন্দের জ্ঞাতি-সম্পর্কীয় কাকাতো বোন ছিলেন। জীবনানন্দ তার প্রেমে বুঁদ ছিলেন। শোভনার প্রতি সেই প্রেম কবির চেতনে কিংবা অবচেতনে এবং যাপনে অনেকদিন জীবিত ছিল, কেউ কেউ তো ধারণা করে থাকে আমৃত্যুই ছিল! পরের স্তবকে লোকেন বোস বলছেন—
“পুরোনো চিঠির ফাইল কিছু আছে:
সুজাতা লিখেছে আমার কাছে,
বারো তেরো কুড়ি বছর আগের সে-সব কথা;
ফাইল নাড়া কি যে মিহি কেরানীর কাজ;
নাড়বো না আমি
নেড়ে কার কি লাভ;”
রচনাকাল, বাংলা ১৩৫৭ সনের কার্তিক মাস, ইংরেজি হিসাবে ১৯৫০ সাল—অর্থাৎ জীবনানন্দের ঐতিহাসিক প্রয়াণের বছর চারেক আগে—তাহলে কবিতায় উল্লিখিত বারো, তেরো, কুড়ি বছর আগের চিঠিগুলো নিয়ে ভাবলে ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয়, যেটা ১৯৩০ থেকে ১৯৩৭-৩৮ সালের দিকে নির্দেশ করে। শোনা যায়, বিয়ের পরেও তার সাথে শোভনার যোগাযোগ ছিল, কিন্তু একটা সময়ে গিয়ে শোভনাই যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। সুতরাং, আমার কবিতা অনুসন্ধান বলছে, কবিতায় বর্ণিত সুজাতাই আসলে শোভনা, বা কবিতায় তার ছায়া।
১৯২৯ সালের জীবনানন্দকে মনে করা যাক। তিনি তখন শিক্ষিত বেকার। চাকরি খুঁজছেন হন্যে হয়ে। তিন মাসের চুক্তিতে বাগেরহাটের পি. সি. কলেজে চাকরি করে আবার বরিশালে ফিরেছেন। শোভনার বাবা চাকরি করতেন আসামের ডিব্রুগড়ে, বন বিভাগের বড়ো কর্মকর্তা। তিনি সময় পেলেই পরিবার নিয়ে বরিশালে আসতেন। জীবনানন্দও একবার ছুটিতে আসামে গিয়েছিলেন। এই সময়ের মধ্যেই জীবনানন্দ নিজের মনের মধ্যে শোভনাকে চিরস্থায়ী আসন দিয়েছিলেন প্রণয়িনী হিসেবে। যদিও পরিবার এবং সমাজ বাস্তবতায় সেই প্রণয় পূর্ণতা পায়নি।
যাই হোক, ওমন সংকটের সময়ে কাকা অতুলানন্দ চিঠি দিয়ে জীবনানন্দকে আসামে যেতে বললেন—যদি কাঠের ব্যবসা করে নিজের ভাগ্য ফেরাতে পারেন। জীবনানন্দ তার আর্থিক ভাগ্য ফেরানোর আশায় আসামে গেলেন, না কি শোভনার সাহচর্য পেতে গেলেন—এই প্রশ্নটা আমাকে খুব ভাবায়। ১৯২৭ সালে প্রকাশিত জীবনানন্দের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ যে তিনি ‘কল্যাণীয়াসু’-কে উৎসর্গ করেছিলেন—এ কথাও আমাদের এই পাঠে এসে জুড়ে যায়। যার জন্ম হয়েছে শব্দের সওদাগরি করার জন্য, সে কি করে কাঠের সওদাগরি করবে! আসামের পুরো সময়টা তার কেটে গেল এক ঘোরের মধ্যে। খুব কাছ থেকে তিনি এবার প্রেম বিনিময় করলেন শোভনার সঙ্গে—এমন ইঙ্গিত গৌতম মিত্র সম্পাদিত জীবনানন্দের জীবনকথা ও ডায়েরি-আলোচনায় পাওয়া যায়।
এরকম আসা-যাওয়ার মধ্যেই শোভনা ও মিলুর মধ্যে শুরু হয়েছিল চিঠি আদান-প্রদান—আমার পাঠে অন্তত কবিতার ‘পুরোনো চিঠির ফাইল’ সেই দিকেই ইঙ্গিত করে। জ্ঞাতি-সম্পর্কের এই প্রণয়ের ব্যাপারটা তৎকালীন তো বটেই, বর্তমান সামাজিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটেও অস্বস্তিকর। প্রথাগত হিন্দু বা ব্রাহ্ম সমাজে জ্ঞাতির মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ বলে বিবেচিত। জীবনানন্দ ব্রাহ্ম পরিবেশে মানুষ হলেও, এমন সম্পর্ক সমাজের চোখে নিষিদ্ধই ছিল। বিয়ে তো পরে। কিন্তু জীবনানন্দ তো অবশ্যই বিপ্লবী—এক অর্থে বাংলা কাব্যজগতে মাইকেলের পরে তিনিই বড়ো প্রথাভাঙা কবি। ব্যক্তিজীবনে প্রথাবিরোধী কোনো স্রোত না থাকলে কি কাব্যে এমন বিপ্লব সাধিত হয়?
যাই হোক, একটা সময় পরে শোভনা হয়তো বুঝেছিলেন—এই প্রথা আর সমাজবিরোধী প্রেম কোনো পরিবারই মেনে নেবে না। তাই তিনি নিজেকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। ১৯৩০ সালে জীবনানন্দের বিয়ে হয় লাবণ্য গুপ্তের সঙ্গে, যিনি পরে লাবণ্য দাশ। তাদের বিবাহিত জীবন যে সহজ, সুখী, নির্ভার ছিল না—তার ইঙ্গিত আমরা ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতায় যেমন পাই, তেমনি ‘মাল্যবান’সহ তার উপন্যাসগুলোতেও পাই। কিন্তু তিনি কখনোই কি ভুলতে পেরেছিলেন শোভনার স্মৃতি? আমার মনে হয়, পারেননি। সেই স্মৃতি বর্তমান ছিল তার মননে, মস্তিষ্কে। প্রত্যক্ষ চিহ্ন হিসেবে ছিল বারো, তেরো, কুড়ি বছরের পুরোনো চিঠিগুলো।
ততদিনে শোভনার জীবন অন্যদিকে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই লোকেন বোস জানতেন—ফাইল নেড়ে স্মৃতি রোমন্থন করে কোনো লাভ নেই। কিন্তু লাভ নেই বললেই কি স্মৃতি থেমে থাকে? সুজাতা লোকেন বোসকে ভালোবাসতেন কি না, তা নিয়েও তার সবসময় সন্দেহ ছিল। তিনি নিজে যেমন নিজের প্রেমের কথা অকপটে নিবেদন করেছেন, শোভনা হয়তো তেমন করেননি। তিনি হয়তো কিছুটা রক্ষণশীল ছিলেন, হয়তো মুখে বলেননি ভালোবাসার কথা। জীবনানন্দের মনে তাই হয়তো সবসময়ই সন্দেহ ছিল—শোভনা কি তাকে ভালোবাসতেন? কখনও মনে হত, হ্যাঁ; কখনও মনে হতো, না। শোভনার মনস্তাত্ত্বিক দ্বান্দিকতার জন্যই জীবনানন্দের নিজের মনে জন্ম নিয়েছিল দ্বন্দ্ব। আর যদি ভালোবেসেই থাকেন, তবে সেই ভালোবাসা কি এখনও বর্তমান আছে?
এইসব অবাধ্য প্রশ্ন বারবারই ক্ষতবিক্ষত করেছে তার হৃদয়কে। তাই কবিতার শেষ স্তবকের আগের স্তবকে তিনি বলেন—
“ভালোবাসতাম”—স্মৃতি—অঙ্গার—পাপে
তর্কিত কেন রয়েছে বর্তমান।
সে-ও কি আমায়—সুজাতা আমায় ভালোবেসে ফেলেছিলো?
আজও ভালোবাসে না কি?”
এই প্রশ্নের কোনো উত্তর কবিতায় নেই। বরং আছে ইলেকট্রনের বলয়, অন্তিম আকাশ, ভুবনেশ্বর, মিহিজাম, অজানা ঠিকানা—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত এক মানসিক ভূগোল। সুজাতা কোথায় আছেন, তা যেন কিছুটা জানা, অমিতার ঠিকানা অনিশ্চিত। অথচ মানুষের সবচেয়ে নিকটজনও কখনও কখনও সবচেয়ে দূরের মানুষ হয়ে ওঠে—কবিতাটি সেই দূরত্বেরই মানচিত্র। উপরের আলোচনা থেকে আমি অন্তত আমার পাঠের ভেতর এটুকু স্পষ্ট দেখি—সুজাতা শোভনার ছায়া এবং কবিতার কথক লোকেন বোসের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছেন জীবনানন্দ দাশ স্বয়ং, অথবা তারই কোনো ছায়া-সত্তা। এখন যে ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা করব, সেটাই এই কবিতার সবচেয়ে কুহেলিকাময় অংশ—অমিতা সেন আর সুবল। কে এই অমিতা সেন? আর কেই বা সুবল?
সে ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে আরেকটা ব্যাপার পরিষ্কার করা দরকার। ‘অল্টার ইগো’ নামে সাইকোলজিতে একটা টার্ম আছে। আধুনিক সাহিত্যে বিভিন্ন সাহিত্যিক এটাকে অবলীলায় ব্যবহার করেছেন। অল্টার ইগো হচ্ছে ব্যক্তিরই আরেকটি সত্তা। আয়নার সামনে দাঁড়ালে আপনি যাকে দেখতে পান, সে আপনি—কিন্তু উলটো দিকের আপনি। অল্টার ইগোও তেমনই—নিজের ভেতরের আরেক নিজস্ব সত্তা, নিজের মিরর ইমেজ। সাহিত্যের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন যে, লেখক নিজের অথবা তার কোনো চরিত্রের আচরণ, চিন্তা, ভাষা, কামনা, অপরাধবোধ—সবকিছু অন্য আরেকটি চরিত্রের ভেতর দিয়ে প্রকাশ করেন।
‘লোকেন বোসের জর্নাল’ তর্জমা করতে করতে আমি এই সিদ্ধান্তে আসি যে, লোকেন বোস জীবনানন্দ দাশের অল্টার ইগো। সুবল লোকেন বোসের অল্টার ইগো। সুজাতা শোভনার অল্টার ইগো। এ যেন বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের ঘূর্ণি। হ্যাঁ তাই তো! ত্রিভুজ প্রেমের উপাখ্যান! আয়নার মধ্যে আয়না। যেমন জীবনানন্দ “আকাশলীনা” কবিতার শেষ দুই লাইনে বলেছেন—
“বাতাসের ওপারে বাতাস—
আকাশের ওপারে আকাশ।”
তেমনি এখানে আয়নার ওপারে আয়না। কবিতায় বাস্তব চরিত্রের দুই ধরনের প্রতিরূপ।
তাহলে এই অমিতা সেন নারীটি কে? এই কবিতার সবচেয়ে প্রহেলিকাময় চরিত্র এই অমিতা সেন। অমিতা সেনকে শুধু শোভনার প্রতিধ্বনি বললেই ব্যাপার শেষ হয় না। লাবণ্য দাশ মানে কবির স্ত্রী তাহলে কোথায়? বরং অমিতা সেনকে আমার বারবারই লাবণ্য দাশের অল্টার ইগো মনে হয়। সে বক্তব্যের পেছনে আমার যথেষ্ট যুক্তিও আছে।
সে ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে সুবলকে নিয়ে একটু বলা উচিত। সুবল নামটি বাংলা লোকস্মৃতি ও বৈষ্ণব কাব্যপরম্পরায়ও অন্য এক অনুষঙ্গ বহন করে—রাধাকৃষ্ণের প্রেমের সংবাদবাহক, সখা, মধ্যবর্তী চরিত্র। সেই অর্থে সুবলকে লোকেনের বাইরের মানুষ যেমন ধরে পড়া যায়, তেমনি তার অন্তরের আরেক কণ্ঠ হিসেবেও দেখা যায়। লোকেন যেন নিজের প্রেমের বিচার নিজেই আরেক সত্তার হাতে ছেড়ে দেন।
“কেমন আছে রাধা বল,
ওরে ভাই সুবল”
অমিতা সেন আর সুবলকে জীবনানন্দ ঘন কুয়াশা দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন। পাঠক বারবার তাদের আসল পরিচয় নিয়ে সন্দিহান হতে বাধ্য।
আমি যদি বলি, শোভনা/অমিতা হল রাধা ও কৃষ্ণ/লোকেন বোস সেই রাধার প্রেমে মাতোয়ারা—তাহলে সুবল হয়ে ওঠে সেই মধ্যবর্তী সখা, যার কাছে প্রেমিক নিজের প্রেমিকার না-আসার দুঃখ বলে। আবার এই সুবলই যদি লোকেন বোসের নিজের অল্টার ইগো হয়, তাহলে ব্যাপারটা আরও জটিল। লোকেন নিজের প্রেমের ব্যাপারেও সুবলকে সন্দেহ করে, অথচ সুবল নিজেই তার ভেতরের আরেক সত্তা। তাই তো কবি বলেন—
“মনে হয় যেন অমিতা সেনের সাথে সুবলের ভাব, সুবলেরই শুধু?”
এখানেও লোকেন বোসের দ্বান্দিকতার প্রকাশ। পরের লাইনেই তিনি কাকে অমিতা সেন বলছেন, তা স্পষ্ট না করে পাঠকদের ভাববার জন্য সুচতুরভাবে এড়িয়ে গেছেন। অমিতা সেনকে তিনি ধোঁয়াশার ভেতরেই রেখে দিয়েছেন।
অমিতা সেনকে যদি লাবণ্য দাশের ছায়া ধরে পড়ি, তবে কবিতাটি আরেক স্তর পায়। তৃতীয় স্তবকের শেষ চার লাইন—
“তারপর তুমি নিজের ভিতরে ফিরে এসে তবু চুপে
মরীচিকা জয় করেছো বিনয়ী যে ভীষণ নামরূপে—
সেখানে বালির সৎ নীরবতা ধুধু
প্রেম নয় তবু প্রেমেরই মতন শুধু।”
জীবনানন্দ তখন লাবণ্য দাশকে বিয়ে করেছেন অনেকদিন। শোভনা তার জীবন থেকে দূর অতীতের মরীচিকা। এর দুই লাইন আগেই তিনি হৃদয়কে মরুভূমি বলেছেন। তারপর তিনি নিজের ভিতরে ফিরে এসেছেন নীরবে। কারণ তিনি জানেন, সেসব এখন অসম্ভব। তিনি লাবণ্য দাশের সঙ্গে দাম্পত্য জীবনে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। সেখানে কোনো মরীচিকা নেই, আছে শুধু নীরবতা। জীবনানন্দের সঙ্গে লাবণ্যের দাম্পত্য যে সুখের ছিল না, তা যারা জীবনানন্দ পড়েছে, তারা তার কবিতা ও উপন্যাসের ছায়া থেকে বারবার অনুভব করে বা জানে।
তিনি যে ‘নামরূপে’ মরীচিকা জয় করার কথা বলছেন, সেটি আসলে কী? ‘শোভন’ শব্দের অর্থ সুন্দর, ‘শোভনা’ তার স্ত্রীলিঙ্গরূপ। ‘লাবণ্য’ শব্দের অর্থও সৌন্দর্য, আভা, কোমল দীপ্তি। তিনি এক সুন্দর হারিয়ে অন্য সুন্দর জয় করেছেন ঠিকই, কিন্তু সেখানে কি প্রেম আছে? হয়তো নেই। তাই—
“প্রেম নয় তবু প্রেমেরই মতন শুধু।”
চতুর্থ স্তবকের শুরুতে লোকেন বোস বলছেন—
“অমিতা সেনকে সুবল কি ভালোবাসে?
অমিতা নিজে কি তাকে?”
তাদের দাম্পত্যে প্রেম ছিল কি না, তা নিয়ে কবিতার ভেতরেই এক ভয়ানক সন্দেহ কাজ করছে। জীবনানন্দ হয়তো লাবণ্যের সঙ্গে মানিয়ে নিতে চেয়েছিলেন, তার প্রেমে বিভোর হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লাবণ্য কি তার প্রেমে পড়েছিলেন? তাকে কি ভালোবেসেছিলেন? তবে এখানেও সতর্ক থাকা জরুরি। লাবণ্য দাশকে সরাসরি অমিতা সেন বলে ঘোষণা করা যায় না। কবিতা জীবনের প্রতিলিপি নয়। জীবনানন্দের কবিতায় বাস্তব চরিত্ররা প্রায়ই রূপক, প্রতীক ও ধোঁয়াশার ভেতর দিয়ে নতুন অস্তিত্ব পায়। তাই অমিতা সেনকে লাবণ্যের ‘ছায়া’ ধরে পড়া যেতে পারে, কিন্তু তাকে লাবণ্য দাশের সরাসরি প্রতিরূপ বলা উচিত নয়।
তাই তো লোকেন বোস সন্দিহান—অমিতা আর সুবল একে অপরকে ভালোবাসে কি না। সেটাও তিনি ভাবতে চান না, সেখানেও অবসর চান। পরের লাইনে তিনি বলেন—
“দূর ব্রহ্মাণ্ডকে তিলে টেনে এনে সমাহিত হওয়া চাই;”
জীবনানন্দ আর লাবণ্য একসঙ্গে ঘুমালেও তাদের মানসিক দূরত্ব পৃথিবী থেকে প্লুটোর দূরত্বের চেয়েও যেন অনেক দূর, আলোকবর্ষেরও বেশি। তবু দৈহিক চাহিদায় তাদের মিলিত হতেই হয়। তাদের অপ্রেমময় দাম্পত্যের ইঙ্গিত তিনি দিয়েছেন ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতায়ও—
“শোনো
তবু এ মৃতের গল্প; কোনো
নারীর প্রণয়ে ব্যর্থ হয় নাই;
বিবাহিত জীবনের সাধ
কোথাও রাখেনি কোনো খাদ,
সময়ের উদ্বর্তনে উঠে এসে বধূ
মধু— আর মননের মধু
দিয়েছে জানিতে;”
শেষ স্তবকের আগের স্তবকে আবার লোকেন বোস সুজাতার কথা বলেন। পুরোনো প্রেমের স্মৃতি তাকে তখনও আহত করে। ‘পাপ’ শব্দের ভেতর দিয়ে তিনি সেই সামাজিক ও ধর্মীয় বিধিনিষেধের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন বলে আমার মনে হয়। আবার জানতে চেয়েছেন—সুজাতা/শোভনা তাকে এখনও ভালোবাসে কি না। কিন্তু সে উত্তর তার জানা নেই। সুজাতার প্রেম হয়তো লোকেন বোসের জন্য আর অবশিষ্ট নেই। যেমন জীবনানন্দ তার ‘দুজন’ কবিতায় বলেছেন—
“প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়”
একদম শেষ স্তবকের প্রথম দুই লাইনে লোকেন বোস ইঙ্গিত করেছেন—সুজাতা কোথায় থাকে, তা তিনি জানেন। কিন্তু অমিতার ব্যাপারে তিনি সন্দিহান। পারিবারিক যোগাযোগের সূত্রে শোভনার অবস্থান সম্পর্কে তার ধারণা হয়তো ছিল। আর মানুষের মন তো পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুত যান, মুহূর্তেই আলোকবর্ষ পাড়ি দিতে পারে। কিন্তু এক ছাদের নিচে থেকেও জীবনানন্দ কি জানতেন, লাবণ্য আসলে কোথায় আছেন? মানুষের শরীরের ঠিকানা জানা যায়, মনের ঠিকানা কি এত সহজে জানা যায়?
পরের লাইনে তিনি বলেন, সে ঠিকানা না জেনে ভালোই হয়েছে। শেষ তিন লাইনে হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন—তার পূর্বতন প্রেমের স্মৃতিময় সময় তার কাছে স্থির, কিন্তু স্থিরতর নয়, সে স্থিরভাবে প্রবহমান। অর্থাৎ পৃথিবীর গতির মতো—দেখতে স্থির, অথচ নিজের অক্ষের ওপর ঘুরছে, আবার কেন্দ্রকে ঘিরেও ঘুরছে। যেমন, তিনি আরেক কবিতায় বলেছেন—
“তুমি তো জানো না কিছু, না জানিলে—
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে…”
পুরো কবিতা জুড়ে জীবনানন্দ শব্দের, রূপকের, স্মৃতির, প্রেমের এবং আত্মগোপনের ভয়ানক এক ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করেছেন—তার অন্যান্য কবিতার মতোই। পাঠককে হতবুদ্ধি করেছেন, রূপকের মায়াজালে পাঠককে উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরুতে ঘুরিয়ে মেরেছেন সাবলীল ভাষায়। পাঠক যখন কবিতা পাঠ করেন এবং বুঝতে চেষ্টা করেন কবিতার রসায়ন, তখন পাঠকের মননে যে স্বতন্ত্র অনুভূতি ও অনুসন্ধিৎসা তৈরি হয়, সেটাই কবিতার একেকটা স্বতন্ত্র ও স্বতঃস্ফূর্ত অর্থ।
‘লোকেন বোসের জর্নাল’ শেষ পর্যন্ত প্রেমের কবিতা, কিন্তু প্রচলিত প্রেমের কবিতা নয়। এখানে প্রেম মানে প্রশ্ন। এখানে স্মৃতি মানে অঙ্গার। এখানে দাম্পত্য মানে অদৃশ্য দূরত্ব। আর এখানে কবির কাজ কোনো একমাত্রিক উত্তর দেওয়া বদলে পাঠককে এমন এক ঘূর্ণিতে ফেলে দেওয়া, যেখানে সুজাতা, অমিতা, সুবল ও লোকেন—সবাই একে অন্যের আয়না হয়ে ওঠে।
এই কারণেই কবিতাটি জীবনানন্দের অন্তর্জগতের এক অসামান্য দলিল। আমরা চাইলে সুজাতার মধ্যে শোভনার স্মৃতি দেখতে পারি, অমিতার মধ্যে লাবণ্যের ছায়া, সুবলের মধ্যে লোকেনের বিভক্ত সত্তা এবং লোকেন বোসের মধ্যে মিলু দাশের অস্থির, দ্বিধাগ্রস্ত, প্রেমে আহত কবিমানস। কিন্তু এই পাঠই চূড়ান্ত নয়। জীবনানন্দের কবিতার সৌন্দর্য এখানেই—তিনি উত্তর দেন না, তিনি প্রশ্নকে দীর্ঘায়িত করেন।
শেষ পর্যন্ত মনে হয়, ‘লোকেন বোসের জর্নাল’ আসলে এক মানুষের নিজের সঙ্গে নিজের কথা বলা। পুরোনো চিঠির ফাইল নাড়তে চান না তিনি, তবু চিঠিগুলো রয়ে যায়। প্রেম নয়, তবু প্রেমের মতো কিছু রয়ে যায়। ঠিকানা জানা নেই, তবু মানসিক ভ্রমণ থামে না। সময় স্থির নয়, তবু তার এক স্থির দিক আছে। আর সেই দিকেই, হয়তো, জীবনানন্দের সমস্ত কবিতা—তার সুজাতা, অমিতা, বনলতা, শোভনা, লাবণ্য—সবাইকে নিয়ে নীরবে অগ্রসর হয়।