‘ঐতিহ্যায়ন’ বাঙালির আত্মপরিচয় উন্মোচনের বৈদগ্ধ্যমণ্ডিত সংকলন

আবদুল্লাহ আল-আমিন
১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৪৬ আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:৪৬

উনিশ শতকীয় বঙ্গীয় রেনেসাঁস তথা নবজাগৃতি কি সত্যিকার অর্থেই রেনেসাঁস নাকি কলকাতাকেন্দ্রিক উঁচুতলার বর্ণহিন্দু ও ব্রাহ্মদের নবজাগরণ! এই নবজাগরণ কি বাঙালি মুসলমান সমাজ এবং নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের প্রভাবিত করতে পেরেছিল? উত্তর: পারেনি। সত্যি বলতে কী, উনিশ শতকীয় বঙ্গীয় রেনেসাঁস তথা নবজাগৃতির পুরোধা ব্যক্তিরা প্রায় সবাই ছিলেন কুলীন ব্রাহ্মণ সন্তান! মনন-মগজে পশ্চিমা। নবজাগৃতির পুরোধা ব্যক্তিত্ব রামমোহন রায় (১৭৭৪-১৮৩৩) ও তার প্রধান সহকর্মী দ্বারকানাথ ঠাকুরও (১৭৯৪-১৮৪৬) ছিলেন আপাদমস্তক পশ্চিমা। পাশ্চাত্য সাহিত্য, শিল্পকলা, সংগীত, জীবনাদর্শ এমনকি ইউরোপের মিথ্যা-অহমিকার মধ্যেও এরা খুঁজে পেয়েছিলেন মহৎ ও শ্রেষ্ঠতর জীবনের নিশানা। মাইকেল মধুসূদন দত্ত-ও সাহিত্যসাধনার ছলে আপাদমস্তক সাহেব হওয়ার সাধনা করে গেছেন, ইংরেজি কবি হওয়ার সীমাহীন সাধ তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। উনিশ শতকের বাঙালি বুর্জোয়া শ্রেণি এবং তাদের অনুগামী বুদ্ধিজীবীরা অর্থাৎ ‘ইন্টেলিজেন্সিয়া’ শ্রেণি যে কত ইংরেজ-ন্যাওটা ছিলেন, সেটা যারা তাদের হাবভাব ও জীবনযাত্রা দেখেছেন বা তাদের নিয়ে গবেষণা করেছেন, তারা ভালো করেই জানেন। এরা বিদেশি শিক্ষকের সান্নিধ্যে বিদ্যালাভ করে হিউম্যানিস্ট ইন্টেলেকচুয়াল হয়েছিলেন বটে, কিন্তু নিজ দেশকে আপন মনে করতে পারেননি। উনিশ শতক থেকে এখানে যারা শিক্ষা-দীক্ষা অর্জন করে কুলীন হয়ে ওঠেন, তাদের একটা বড়ো অংশ মনে করতেন, আমাদের নিজেদের কোনো শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য নেই। ইংরেজরা শিল্প-সাহিত্যের যে ধারা নিয়ে এসেছেন সেটাই উন্নত, আধুনিক ও গ্রহণযোগ্য। সেটাকেই বেঞ্চমার্ক বিবেচনা করে তারা অগ্রসর হতে চেয়েছিলেন। তাই, তাদের কুলীন বয়ানে দেশীয় ঐতিহ্য ঠাঁই পায়নি। কিন্তু বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের আরেকটি অংশ নিজ দেশের সাহিত্য ও ঐতিহ্য অন্বেষণে ব্যাপৃত হয়েছিলেন। এক্ষেত্রে রাজেন্দ্রলাল মিত্র, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রবীন্দ্রনাথ ও দীনেশচন্দ্র সেনের নাম উল্লেখ করা যায়। রবীন্দ্রনাথের লালন-হাছনের গান ও লোকছড়া সংগ্রহের পরম্পরায় দীনেশচন্দ্র সেন মৈমনসিংহ গীতিকা সংগ্রহ ও সংকলনে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ও তার সহগামীদের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, “আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ভাণ্ডার শূন্য নয়, বরং তা প্রত্যাশার অতিরিক্ত সমৃদ্ধ, সেটিই তারা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেন। এর মাধ্যমে তাদের উপনিবেশবিরোধী মনোভাবের পরিচয় ঘটে। এভাবেই তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন বিউপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ার সফল উদ্যোক্তার ভূমিকা।” (সৈয়দ আজিজুল হক, শতবর্ষে ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’, প্রথম আলো, ১৯ মে ২০২৩) এর পর থেকে দেশীয় তথা পূর্ববঙ্গীয় সাহিত্যের রত্নভাণ্ডার বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হতে থাকে, শুরু হয় উপনিবেশবাদী প্রচারণার বিপক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ। লেখক ও সাহিত্যিক হিসেবে আবু সাঈদ তুলুর অবস্থান উপনিবেশবাদী চিন্তার বিপক্ষে। তার নাটক, কবিতা, প্রবন্ধ পাঠ করলে বোঝা যায়, তিনি আক্ষরিক অর্থেই দীনেশচন্দ্র সেন ও নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের চিন্তাধারার একনিষ্ঠ অনুগামী। ইংরেজ শাসন এদেশের মানুষের মধ্যে যে হীনম্মন্যতার জন্ম দিয়েছে, তা দূর করতে লেখকজীবনের শুরু থেকেই তিনি দারুণভাবে সরব ও সক্রিয় রয়েছেন। আবু সাঈদ তুলু একাধারে একজন প্রতিশ্রুতিশীল গবেষক, কবি, কথাসাহিত্যিক, নিষ্ঠাবান প্রাবন্ধিক এবং বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক। সাহিত্যচর্চার সূত্রে তুলুর সাথে আমার এক দশকের সম্পর্ক। তার মাধ্যমে আমি শিল্পকলার নানা মাধ্যমের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, বিশেষত নাটক-থিয়েটারের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দিকের সঙ্গে। লেখক হিসেবে তিনি মনে করেন, সাহিত্য কাজের বাইরে থাকা কোনো স্বপ্নগাথা নয়। ব্যক্তি ও জাতির আত্মনির্মিতির ক্ষেত্রে সাহিত্যের রয়েছে অপরিসীম ভূমিকা। তুলুকৃত সাংস্কৃতিক সম্পদের তালিকায় মৌখিক ও লিখিত শিল্পের ঐতিহ্য সমান গুরুত্ব পেয়েছে। দীনেশচন্দ্র সেনের মতো তিনিও পূর্ববঙ্গের ব্রাত্য জনগোষ্ঠীর সাহিত্য-সংস্কৃতি ও মননচর্চার মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন বাঙালি সংস্কৃতির প্রকৃত ইতিহাস। ১৯৭৯ সালে জামালপুর জেলার এক সংস্কৃতিমনস্ক, উদার ও আলোকপ্রাপ্ত পারিবারিক পরিমণ্ডলে জন্ম নেওয়া সাঈদ তুলু শৈশব থেকেই শিল্প-সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগী। বেশ কয়েকটি মঞ্চনাটকেও তিনি অভিনয় করেছেন।

সাহিত্যের নানা দিক নিয়ে তিনি দু হাত ভরে লিখে চলেছেন, কিন্তু তার চর্চার মূল ক্ষেত্র বাঙালির বিশেষত পূর্ব বাংলার নিম্নবর্গীয় জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্কৃতি। দেশের শীর্ষস্থানীয় সাহিত্য পত্রিকা, গবেষণা পত্রিকা, লিটলম্যাগে প্রকাশিত হয়েছে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি বিশেষত থিয়েটার নিয়ে বেশ কয়েকটি সিরিয়াস প্রবন্ধ। আবু সাঈদ তুলু মূলত একজন ইতিহাসমনস্ক ও ঐতিহ্য সন্ধানী লেখক। বাঙালির ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্কৃতির হাতিয়ার দিয়ে তিনি মোকাবিলা করতে চান ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির আগ্রাসন এবং রুখতে চান পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক আধিপত্য। তার রচিত উপন্যাস ‘বিপ্রলব্ধ’ (২০০৮), কাব্যগ্রন্থ ‘অনন্ত পথের যাত্রী’ ও ‘জলের আয়না’ (২০১৫) এবং অনন্য গবেষণা গ্রন্থ ‘সেলিম আল দীনের সাহিত্য ভাবনা’, ‘নাট্য ঐতিহ্য ও বাংলাদেশের নাটক’, ‘অনুভূতির খসড়া’, ‘বাংলাদেশের সমকালীন থিয়েটার’ ও ‘বাংলাদেশের নাটকে বিউপনিবেশায়ন’ বিদগ্ধ পাঠকমহলে বেশ সমাদৃত হয়েছে। তিনি আন্তরিকভাবেই বাংলার সংস্কৃতির বৈশ্বিক নবজাগরণ কামনা করেন। সম্প্রতি প্রকাশিত তার গবেষণা ও চিন্তার আকরগ্রন্থ ‘ঐতিহ্যায়ন’ সুধী পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে।

‘ঐতিহ্যায়ন’ বইটি মূলত ১৪টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত। প্রতিটি অধ্যায়ে লেখক বিভিন্ন রেফারেন্স ব্যবহার করে ক্ষুরধার যুক্তি দিয়ে বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য, নাট্যতত্ত্ব, শিল্পভাষা ও মানসিক সংকটকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। বইয়ের প্রথম প্রবন্ধ ‘বাংলা সাহিত্যরীতি: অদ্বৈত মার্গ নন্দনে’ তিনি যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন, আধুনিক বাংলা সাহিত্যচর্চা কীভাবে ইউরোপীয় রীতির অন্ধ অনুকরণ করতে গিয়ে নিজস্বতা হারায়। ইংরেজরা আসার আগে থেকেই প্রাগৈতিহাসিক গৌড়-বঙ্গ-পুণ্ড্র অঞ্চলের সাহিত্য ছিল স্বকীয় ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। ইউরোপকেন্দ্রিক ইতিহাসচর্চার ফলে চর্যাপদ, শূন্যপুরাণ, সেক শুভোদয়া বা ইউসুফ-জোলেখার মতো মৌলিক সাহিত্য ব্রাত্য-অপাঙ্‌ক্তেয় হয়ে বাংলা সাহিত্যের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রাবন্ধিক প্রমাণ করেছেন যে, আবহমান বাংলার সাহিত্যে গদ্য-পদ্যের বিভাজনহীন এক অদ্বৈত মার্গীয় সৌন্দর্যচেতনা বিদ্যমান ছিল। কিন্তু উইলিয়াম কেরি ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতরা সেটা স্বীকার করেননি।

বাঙালি যে প্রাচীনকাল থেকেই বিপুল ঐশ্বর্যমণ্ডিত সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী তা নানাভাবেই আবিষ্কৃত হচ্ছে। সম্প্রতি আবিষ্কৃত উয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন প্রমাণ করে এখানে নগর-সভ্যতার বিকাশ ঘটে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে। ‘প্রাচীন বাংলার সংস্কৃতি’ অধ্যায়ে লেখক প্রাচীন বঙ্গদেশের উর্বর নদীমাতৃক ভৌগোলিক পরিবেশ এবং তার অনন্য সংস্কৃতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আর্য বা পশ্চিম ভারতীয় শাসকেরা বঙ্গজনকে ‘অসুর’ বা ‘ভাষাহীন পাখি’ বলে তাচ্ছিল্য করলেও প্রাচীন বঙ্গ সভ্যতা ছিল জ্ঞানে, বিজ্ঞানে, শিল্পে, মসলিন বুননে ও বাণিজ্যে সমৃদ্ধ। প্রাচীন বাঙলার মানুষ ছিল নতুন চিন্তার অভিসারী ও দ্রোহী, কোথাও তারা শৃঙ্খল মেনে নেয়নি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও বাঙালি পরাভব মানেনি, দুর্মর স্বপ্ন আর অসীম সাহসিকতা দিয়ে আধুনিক সমরবিদ্যায় পারদর্শী পাকহানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করেছে। লেখক প্রাচীন বাঙালির খাদ্যাভ্যাস, উৎসব ও নৃত্য-গীতনির্ভর নাট্যপ্রবণতার স্বরূপ উন্মোচনের মাধ্যমে ঐতিহাসিক রূপ উন্মোচন করেছেন।

কবি, কবিতা ও কবিতার পাঠক নিয়ে লেখা ‘কবিতার পাঠক, পাঠকের কবিতা’ প্রবন্ধে লেখক বলেছেন, কবিতা মূলত একজন সৃষ্টিশীল কবির বৈদগ্ধ্যমণ্ডিত উপলব্ধির প্রাণময় প্রকাশ। মানুষের শোক-তাপ, আনন্দ-বেদনা, হাহাকার তথা একান্ত ও সামষ্টিক অনুভূতির শৈল্পিক প্রকাশ ঘটে কবিতার মাধ্যমেই। কবিতা হয়তো কবিকে যশ-খ্যাতি, প্রতিপত্তি দেয় না, কিন্তু পাঠককে নিয়ে যায় এক আনন্দময় ও রসময় কল্পরাজ্যে। এজন্য কবি মানেই রসতীর্থের পথিক। ‘কবিতার পাঠক, পাঠকের কবিতা’ প্রবন্ধে কাব্যতত্ত্বের এক মননশীল পাঠ উন্মোচিত হয়েছে। কবিতা কীভাবে পাঠকের আত্মাকে স্পর্শ করে, তাকে আনন্দ-সাগরে অবগাহন করায় এবং পাঠকের অনুভূতির মাধ্যমে একটি কবিতা পূর্ণতা পায়, তা নিয়ে লেখক আলোচনা করেছেন। কবিতাকে কেবল কলাকৈবল্যবাদী বা রাজনৈতিক স্লোগান না বানিয়ে মানবমনের গভীর অনুভূতি ও জীবন জিজ্ঞাসার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। বিশ্বসাহিত্যের র‌্যাঁবো, বোদলেয়ার, মার্লামে থেকে শুরু করে জীবনানন্দ ও বুদ্ধদেব বসুর কাব্যদর্শনের রূপ তুলে ধরে লেখক প্রমাণ করেছেন যে কবিতা কেবল শব্দের খেলা নয়, এটি জীবন জিজ্ঞাসার চিত্রাত্মক রূপ। এ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের পাশাপাশি সুবোধ সরকার, মলয় রায়চৌধুরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর প্রসঙ্গও এসেছে।

ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতকে বাংলা ছিল সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার তীর্থভূমি। ১৪৭৪ খ্রিষ্টাব্দে বাঙালি কবি জৈনন্দিন রচনা করেন জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ ‘রসুলবিজয়’। কাব্যটি এত জনপ্রিয় ছিল যে পরবর্তীকালে শেখ চাঁদ, সৈয়দ সুলতান, শাহ বারিদ প্রমুখও রসুলবিজয় নামে স্বতন্ত্র কাব্য রচনা করেন। হিন্দু কবিরাও ওই একই ধারার কাব্য রচনায় উদ্বুদ্ধ হন। মালাধর বসুর শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, ফয়জুল্লাহ’র গোরক্ষ বিজয়, বিপ্রদাসের মনসাবিজয় আসলে জৈনন্দিন প্রবর্তিত বিজয় ধারার কাব্য। ‘রসুলবিজয় কাব্য: অন্তরালে লুকিয়ে থাকা এক ইতিহাস’ প্রবন্ধের মূল বিষয় সুলতানি আমলের কবি জৈনুদ্দিন রচিত ‘রসুলবিজয়’ কাব্যটির অবমূল্যায়ন ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। ১৪৭৪ খ্রিষ্টাব্দে গৌড় সুলতান শামসুদ্দিন ইউসুফ শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় রচিত রসুলবিজয় কাব্যটি বাংলা সাহিত্য ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন। অথচ ঔপনিবেশিক আমলের সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন উন্নাসিক পণ্ডিতরা কাব্যটিকে ‘দোভাষী’ বা ‘বটতলার পুঁথি’ বলে তাচ্ছিল্য করে বাংলা সাহিত্যের মূল ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। শুধু ‘রসুলবিজয়’ নয়, ইংরেজ আমলে অন্যান্য মুসলমান কবিদের পুঁথিও নিদারুণ অবজ্ঞার শিকার হয়। ফলে মুসলমান কবিদের রচিত কোনো কাব্যগ্রন্থ ছাপাখানায় পাওয়া যায় না। আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদের মতো সংগ্রাহকরা যদি এসব পুঁথি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ না করতেন, এগুলি হয়তো বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেত। লেখক আবু সাঈদ তুলু মনে করেন মুসলমান কবিদের রচিত পুঁথি সাহিত্যের পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। তিনি দেখিয়েছেন, ‘রসলবিজয়’ কাব্যের একটি নিজস্ব ছন্দ আছে, হিন্দু মুসলমান সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও কাব্যটির ভূমিকা রয়েছে। অথচ এই মহান কবিকে বাংলা সাহিত্যের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন করে আরাকানি রোম্যান্টিক ধারায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

বাঙালি নিজস্ব সংস্কৃতি, নৃত্যগীত ও ভাঁড়ামি পছন্দ করে, বলেছেন গেরাসিম লেবেদেফ। সুলতানি-মোগল আমলে পাঁচালির মতো জনপ্রিয় নাট্যরীতি তৈরি হয়। মধ্যযুগে কীর্তনের আঙ্গিকে আসরভিত্তিক নাটক পরিবেশিত হতো। চারদিকে দর্শক বসত, মাঝখানে কীর্তনীয়া গীত সুরে নাটক পরিবেশন করতেন। কিন্তু ইংরেজ শাসনামলে পাশ্চাত্য রীতির থিয়েটারভিত্তিক নাটকের প্রবল-প্রতাপে ধীরে ধীরে বাংলার নিজস্ব রীতির নাট্যশৈলী বিলীন হতে থাকে। ইউরোপীয় থিয়েটার ধারা বাংলার লোকায়ত নাট্যধারাকে গ্রাস নেয়। পাশ্চাত্য নাট্যরীতির প্রভাবে বাংলার নিজস্ব নাট্যরীতি প্রায়-লুপ্ত হয়ে যায়। ‘বাংলা নাট্য: তত্ত্ব ও রীতি’ অধ্যায়ে লেখক তুলু আবহমান বাংলার নিজস্ব নাট্যরীতির দার্শনিক ও প্রয়োগ শিল্পভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি বলছেন, প্রাচ্যের নাট্যরীতির ধারাবাহিকতায় বাংলায় যে গীত-নৃত্য-অভিনয়-সংগীতের সমন্বিত আখ্যান গড়ে উঠেছিল, তা পাশ্চাত্য প্রসেনিয়াম থিয়েটার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। মঙ্গলকাব্য, পাঁচালি, যাত্রা ও পালায় যে দ্বৈতাদ্বৈতবাদী নাট্যধারা গড়ে উঠেছিল, তা-ই বাঙালির নিজস্ব নাট্যতত্ত্ব।

লেখক ইতিহাসের আয়নায় চোখ রেখে বলেছে, বাংলার মধ্যযুগ ছিল নাট্য-গীতসুধারসে মুগ্ধ ও মুখর। নানা আঙ্গিকের নাট্যচর্চা ছিল মধ্যযুগজুড়ে। নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন তার বাঙলা নাট্যকোষ গ্রন্থের তথ্য ধার নিয়ে বলা যায়, নৃত্য-গীত ও অভিনয়সহকারে সে যুগে নানা রীতি ও আঙ্গিকের নাটক পরিবেশিত হতো। তার ভাষায়, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-ও এক নাট্যাভিনয়, তিনি এর পরিবেশনরীতিকে ‘গায়েন কেন্দ্রিক নাট্যাভিনয়’ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ড. সুকুমার সেন ‘চৈতন্য ভাগবত’ ও তার শিষ্যদের নাচগানকেও পরিপূর্ণ নাটকের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তুলুর ‘বাংলার নাট্য ঐতিহ্য’ প্রবন্ধে বাঙালির হাজার বছরের নাট্য ঐতিহ্যের এক প্রামাণ্য ইতিহাস ফুটে উঠেছে। চর্যাপদের নৃত্য-গীত রূপ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের হাজারো পালার গঠনরীতি আলোচনা করা হয়েছে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর ট্র্যাজেডির পর কলকাতায় ইউরোপীয় ধাঁচের প্রসেনিয়াম থিয়েটারের আগমনের ফলে কীভাবে আমাদের দেশীয় নাট্য ঐতিহ্য মুখ থুবড়ে পড়ে এবং স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তা কীভাবে ফিরছে—তার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। নাট্য সমালোচক তুলু রবীন্দ্রনাথকে বাংলা নাটকের আধুনিক প্রতিভূ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নাট্য আঙ্গিকের প্রশ্নে লেখক তুলু-ও রবীন্দ্রনাথের মতো পাশ্চাত্য বিরোধী। তিনিও রবীন্দ্রনাথের মতো যাত্রার তথা দেশীয় আঙ্গিকে বাংলা নাটককে দাঁড় করাতে চান। রবীন্দ্রনাথ দৃশ্য ও মঞ্চসজ্জার নামে বাড়াবাড়িকে পছন্দ করতেন না যা তার ‘রঙ্গমঞ্চ’ প্রবন্ধে তুলে ধরেছেন। “যাহারা বিশ্বাস করিবার জন্য, আনন্দ করিবার জন্য আসিয়াছে, তাহাদিগকে এত ঠকাইবার আয়োজন কেন।” রবীন্দ্রনাথের মতো নাট্যসমালোচক তুলুও এটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন।

‘উত্তর-আধুনিক নাট্যতত্ত্বের পূর্বাপর’ প্রবন্ধে নাট্যতত্ত্বের বৈশ্বিক ও ঐতিহাসিক বিবর্তন নিয়ে এই অধ্যায়ে এক উচ্চমার্গীয় আলোচনা করা হয়েছে। ভরত মুনির ‘নাট্যশাস্ত্র’ (পঞ্চম বেদ), রূপক বিভাজন, রসতত্ত্ব থেকে শুরু করে অ্যারিস্টটলের ‘পোয়েটিক্স’, ব্রেশট ও গ্রোটোফস্কির তত্ত্ব বিশ্লেষিত হয়েছে। প্রাবন্ধিক দেখিয়েছেন যে উত্তর-আধুনিক নাট্যবিশ্বের আলোচনায় ভরত মুনির নাট্যশাস্ত্র বা বাঙালির ঐতিহ্যিক নাট্যভাবনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

‘ঐতিহ্যবাহী নাট্যরীতি: পালা’ প্রবন্ধে লেখক বলেছেন, ‘পালা’ বাংলার নিজস্ব ও সর্বাধিক জনপ্রিয় লোকনাট্য আঙ্গিক। এ অধ্যায়ে ময়মনসিংহ গীতিকা, মনসামঙ্গল ও কিস্সানির্ভর পালাসমূহের গঠনপ্রকৃতি তুলে ধরা হয়েছে। মুক্তমঞ্চে গায়েন, দোহার ও কুশীলবদের আসরভিত্তিক অভিনয় কৌশলকে লেখক আধুনিক নাট্য রচনার প্রধান আকর হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

‘বাংলাদেশের নাট্যচর্চা: প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ’ প্রবন্ধে ৪৭-এর দেশভাগ, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের নাট্যআন্দোলনের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। শহরকেন্দ্রিক পাশ্চাত্যরীতির প্রসেনিয়াম নাটকের সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে লেখক জোর দিয়েছেন গ্রামীণ লোকনাট্য ও শহরকেন্দ্রিক থিয়েটারের সমন্বয়ের ওপর। বাংলা নাটকের প্রবাদপুরুষ নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের সাহিত্য দর্শন ও নাট্যরীতি নিয়েও এ গ্রন্থে আলোচনা করা হয়েছে। সেলিম আল দীন কীভাবে ইউরোপীয় ‘দ্বন্দ্বাকুল’ নাট্যকাঠামো ভেঙে ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ বাংলা নাট্যরীতির প্রবর্তন করেছিলেন, তা লেখক সশ্রদ্ধভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।

‘সাহিত্যে প্রযুক্তির প্রভাব: সংকট ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বর্তমান ডিজিটাল যুগ ও সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সাহিত্যচর্চার ওপর কী প্রভাব পড়ছে, তা নিয়ে লেখক সময়োপযোগী আলোকপাত করেছেন। প্রযুক্তি একদিকে যেমন প্রসার বাড়িয়েছে, অন্যদিকে সাহিত্যের গভীরতা ও মৌলিক চিন্তাকে সংকুচিত করছে। তবে প্রযুক্তির মাধ্যমে বিরল পুঁথি-দলিল সংরক্ষণের সম্ভাবনাকেও লেখক চিহ্নিত করেছেন।

‘বাঙালির ভয়: মনস্তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক প্রবন্ধে বাঙালির রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক ভয়ের মনস্তাত্ত্বিক রূপরেখা আঁকা হয়েছে। হাজার বছরের ঔপনিবেশিক শাসন বাঙালির মনে যে হীনম্মন্যতার জন্ম দিয়েছে, তা চিহ্নিত করে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে এই ভয় কাটিয়ে উঠা সম্ভব। তিনি বলেছেন,উপনিবেশবাদীদের জ্ঞানতাত্ত্বিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য-সংস্কৃতির জাগরণ প্রয়োজন। কিন্তু হীনম্মন্যতা আর এক অজানা ভয় আমাদের আড়ষ্ট করে রেখেছে। ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির জাগরণ ঘটিয়ে ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বাঙালি সমাজকে বেরিয়ে আসতে হবে। তবেই বাঙালি নবজন্ম লাভ করবে।

সর্বশেষ অধ্যায়ে প্রাবন্ধিক আবু সাঈদ তুলু বাঙালির সংস্কৃতির এক মহৎ বৈশ্বিক নবজাগরণের স্বপ্ন বুনেছেন। তিনি মনে করেন, অন্ধভাবে পাশ্চাত্যকে অনুকরণ না করে চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য ও নিজস্ব লোকনাট্যের শক্তিতে বিশ্বসভায় আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা করতেই হবে।

বাঙালির লোকায়ত জীবন ও সংস্কৃতি যে কত বিপুল ও বিচিত্র এবং গভীর দার্শনিকতায় সমৃদ্ধ তার খানিকটা আভাস পাওয়া যায় ‘ঐতিহ্যায়ন’ পড়লে। বইটি নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিক বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী প্রয়াস। তবে কয়েকটি অধ্যায়ে (যেমন: ১ম, ৫ম, ও ৬ষ্ঠ অধ্যায়) ঔপনিবেশিকতার সমালোচনা ও পাঁচালি রীতির আলোচনা বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। প্রাবন্ধিক ঔপনিবেশিকতার আগ্রাসনকে যেভাবে আক্রমণ করেছেন তা যুক্তিযুক্ত হলেও, আধুনিক প্রসেনিয়াম থিয়েটারের কারিগরি ও আলোক-উৎকর্ষকে যেটুকু বর্জনীয় মনে করেছেন, তা আধুনিক নাট্যচর্চায় পুরোপুরি বাদ দেওয়া কিছুটা কঠিন। তারপরও প্রাবন্ধিক আবু সাঈদ তুলুর গদ্যশৈলী অত্যন্ত প্রাঞ্জল, সাবলীল, ওজস্বী ও সৃজনশীল। তার শব্দচয়ন ও গঠনভঙ্গি যেকোনো বিদগ্ধ পাঠককে মুগ্ধ করবে।

সার্বিক বিবেচনায় আবু সাঈদ তুলুর ‘ঐতিহ্যায়ন’ নিঃসন্দেহে পাণ্ডিত্যপূর্ণ বিশ্লেষণধর্মী আলোচনায় সমৃদ্ধ একটি অনবদ্য সংকলন। বাঙালির নিজস্ব আত্মপরিচয় খোঁজার ও সাংস্কৃতিক বিউপনিবেশায়নের এক বৈদগ্ধমণ্ডিত ইশতাহার। বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতি, তার প্রভাব-প্রতাপ, বিকাশ, পরিণতি, দুর্বলতা বোঝার ক্ষেত্রে বইটি পাঠককে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, থিয়েটার ও ইতিহাস অনুরাগী যেকোনো বিদগ্ধ পাঠকের কাছে বইটি সুখপাঠ্য হবে।

প্রথম প্রকাশ: অগ্রহায়ণ ১৪৩২/ ডিসেম্বর ২০২৫
প্রকাশক: মিঠু কবির, অয়ন প্রকাশন, বাংলা বাজার, ঢাকা-১১০০
মূল্য: ৫০০ টাকা

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
ডেমরায় আগুনে পুড়লো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস
ডেমরায় আগুনে পুড়লো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস
পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে এখনও বেরোচ্ছে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও টাংস্টেন
পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে এখনও বেরোচ্ছে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও টাংস্টেন
আরেক হত্যা মামলায় মাইটিভির চেয়ারম্যান সাথী গ্রেফতার
আরেক হত্যা মামলায় মাইটিভির চেয়ারম্যান সাথী গ্রেফতার
বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান আব্দুল হান্নান কাতারে গ্রেফতার 
বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান আব্দুল হান্নান কাতারে গ্রেফতার 
সর্বাধিক পঠিত
এখন থেকে লাগেজ লাইভ দেখতে পারবেন শাহজালালের যাত্রীরা
এখন থেকে লাগেজ লাইভ দেখতে পারবেন শাহজালালের যাত্রীরা
সৌদিতে দুই বাংলাদেশিকে শাস্তি: যা বললেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
সৌদিতে দুই বাংলাদেশিকে শাস্তি: যা বললেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
‘আমির হামজার মাহফিলে রাজনৈতিক ও উসকানিমূলক বক্তব্য যেন দেওয়া না হয়’
‘আমির হামজার মাহফিলে রাজনৈতিক ও উসকানিমূলক বক্তব্য যেন দেওয়া না হয়’
‘আমরা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছি’, ইমেইল পাঠানোর পর স্ত্রীর সঙ্গে মিললো টেকির মরদেহ
‘আমরা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছি’, ইমেইল পাঠানোর পর স্ত্রীর সঙ্গে মিললো টেকির মরদেহ
শাহজালাল বিমানবন্দরের এমন রূপ কেউ কখনও দেখেননি আগে 
শাহজালাল বিমানবন্দরের এমন রূপ কেউ কখনও দেখেননি আগে