শিল্প শুধু সৌন্দর্যের প্রকাশ নয়, বরং এটি সামাজিক বাস্তবতা, শিল্পীর সমসাময়িক চিন্তা ও মূল্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাসও বহন করে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের সময়ে শিল্প প্রতিবাদের ভাষা হয়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে সময়ের দলিল হিসেবে থেকে যায়।
কলাকেন্দ্রে গত ৩১ অক্টোবর “ফিরে দেখা” শিরোনামে শুরু হয়েছে চৌদ্দ জন শিল্পীর শিল্পকর্মের যৌথ প্রদর্শনী। সেখানে স্থান পেয়েছে শিল্পীদের ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে আঁকা শিল্পকর্ম। যারা দীর্ঘ শিল্পযাত্রার মধ্য দিয়ে এখনও সমান প্রত্যয়ে তাদের শিল্পচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। সময়টি বাংলাদেশের শিল্পের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল, যা শিল্পীদের সেই সময়ের কাজের গভীরতা এবং তাদের সামাজিক দায়িত্ববোধকে এই প্রদর্শনীর মধ্যদিয়ে পুনরায় দর্শকের সামনে নিয়ে আসে।
“ফিরে দেখা” প্রদর্শনীটি দুই দশক জুড়ে বাংলাদেশের শিল্পচর্চার একটি খণ্ডচিত্র তুলে ধরে সেই সময়ের ভাবনা, মনোভাব ও যাপন পুনরায় অবলোকনের প্রয়াসে। প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে চিত্রকলা, ভাস্কর্য, প্রিন্টমেকিং ও মিশ্রমাধ্যম, যা সেইসময়ের শিল্প অভিব্যক্তিকে ধারণ করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের দিকে ফিরে তাকালে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামকে কেন্দ্র করে শিল্পের নানা শাখায় এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়। যা যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে আরও ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। এই সময়কালে দেশের রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিবেশে নানা ধরনের টানাপড়েন ও উত্তেজনা ছিল, যা শিল্পে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। যুদ্ধকালীন পরবর্তী সময় থেকেই স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সমসাময়িক শিল্পীদের ভাবিত করে। পরবর্তীতে সময়ে সামরিক শাসন, গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন, এবং ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান, এসবই বাংলাদেশের শিল্পীদের কাজের মধ্যে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। গতানুগতিক ধারার পাশাপাশি মিনিমালিস্টিক, বিমূর্ত এবং এক্সপ্রেশনিস্ট ধারায় কাজ শুরু করেন কয়েকজন শিল্পী। যার প্রতিফলন আমরা এই প্রদর্শনীতেও দেখতে পাই।
এই সময়ের শিল্পকর্মে শিল্পীরা তাদের শিল্পের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা ব্যক্ত করেন। সেসময়ে বাংলাদেশে সামরিক শাসনের অধীনে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়ন্ত্রিত ছিল, যা শিল্পীদের মুক্ত চিন্তার প্রকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শিল্পীরা সেই শাসনের বিরোধিতা করেন তাদের শিল্পের মাধ্যমে। শিল্পে সমাজের নানা অসংগতি, দুর্নীতি এবং মানুষের সংগ্রাম প্রাধান্য পায় প্রতিবাদী ভাষায়। শিল্পীরা নানা সামাজিক সমস্যা, নির্যাতন, এবং বৈষম্যের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করেন তাদের শিল্পকর্ম দ্বারা।
এই প্রদর্শনীতে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তনগুলোর নানা ধরনের প্রতিফলন শিল্পকর্মে দেখা যায়। শিল্পীরা শুধু শিল্পের মাধ্যমে নিজের মতামত প্রকাশই করেননি, বরং দেশের বাস্তবতা, শোষণ, এবং গণতন্ত্রের মূল্যবোধের বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করেছেন। শিল্পের মাধ্যমে জনগণের কাছে পৌঁছাতে চেষ্টা করেছেন। শিল্পীরা তাদের শিল্পের মাধ্যমে দেশের মানুষের সংগ্রাম, অস্থিরতা, এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনকে তুলে ধরেছিলেন।
এই প্রদর্শনীটি কোনো নির্দিষ্ট গবেষণা বা পরিকল্পিত কিউরেটিয়াল ধারণার ভিত্তিতে নয়, বরং প্রদর্শনীটি সমন্বিত হয়েছে চৌদ্দ জন শিল্পীর সৃষ্টকর্ম নিয়ে যারা যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে চারুশিক্ষা গ্রহণ করে শিল্পযাত্রায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সংশ্লিষ্ট ছিলেন ‘ঢাকা পেইন্টার্স’, ‘সময় গ্রুপ’ বা অনুরূপ গোষ্ঠীর সঙ্গে, আবার অনেকে যাত্রা করেছিলেন স্বতন্ত্র পথে। তাদের এই সম্মিলিত উপস্থিতি তৎকালীন শিল্পজগতের একটি বহুমাত্রিক বর্ণময় চিত্র উপস্থাপন করে।
প্রদর্শনীটি শেষ হবে ১৫ নভেম্বর, প্রতিদিন খোলা থাকে বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত
শিল্প মানুষকে বহুমাত্রিকভাবে প্রভাবিত করে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, এমনকি আত্মিক যোগাযোগের মাধ্যম হতে পারে শিল্প। শিল্প এখন আর শুধু নান্দনিক বলয়ে আবদ্ধ নেই। বরং বহু যুগ আগে থেকেই শিল্প একটি বলিষ্ঠ হাতিয়ার। শিল্প মানুষের চিন্তা, অনুভূতি, আচরণ ও সমাজবোধকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।