ভালো জীবন, ভালো প্রণয় ও গুড-সেক্সের জন্য কবিতা ও গানের প্রয়োজন আছে || সরকার আমিন

সিডির প্রচ্ছদকবি সরকার আমিন সম্প্রতি গান করতে শুরু করেছেন। তিনি তাঁর গানকে বলেন ‘গানলামি’। গানের কথা, সুর ও কণ্ঠ তাঁর নিজের। অগামীকাল ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হচ্ছে গানলামির প্রথম অ্যালবাম ‘চিকিৎসা’। ফেইসবুকে ‘গানলামি’ পেইজে ও ইউটিউবে ‘গানলামি’ চ্যানেলে তাঁর গান শোনা যাচ্ছে। এই সিডিপ্রকাশকে সামনে রেখে তাঁর সাথে আমাদের কথোপথন। আজ সরকার আমিন ৫০ বছরে পা দিলেন। ৫০-এ গান গাইতে পেরে তিনি খুবই আনন্দিত; তাঁর ভাষায়, ‘আমার এই অতৃপ্তিটা দূর হয়ে গেল।’ এটা নিজেকে দেয়া নিজের সেরা উপহার। শুভ জন্মদিন কবি।

জাহিদ সোহাগ : আমিন ভাই, আমার প্রথম জিজ্ঞাসা- হঠাৎ করে গান গাইতে ইচ্ছা হলো কেনো?
সরকার আমিন : আমি মাঝে মাঝেই ‘হঠাৎ-এর কবলে’ পড়ে যাই, জাহিদ। প্রায় দুই দশক আগে আমরা যখন মঙ্গলসন্ধ্যার একগুচ্ছ বই বের করি, তখন একটা কথা বলেছিলাম, ‘কবিতা দীর্ঘশ্বাসের মতো আরামদায়ক’। গানও আসলে দীর্ঘশ্বাসের মতোই আরামদায়ক একটা শিল্প। জানতে চেয়োছো কেনো  আমি  গাইতে শুরু করলাম? তোমার এই জরুরি প্রশ্নটার উত্তরে বলবো, যে কারণে শ্বাস নিই; দীর্ঘশ্বাস নিই, সেই একই কারণে গান করি। দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে একটা মানুষের দিন যাপনের মিঠা-মধুর-তেতো স্বাদ ও নির্যাস, তার স্বপ্ন, স্বপ্ন-ভঙ্গতা, আশা-আশঙ্কা, স্মৃতি, কল্পনা, তার ছন্দ সবকিছুই গ্রেফতারকৃত অবস্থায় থাকে । সাধারণ মানুষ যখন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, তখন তার দীর্ঘশ্বাসটি বাতাসে হারিয়ে যায়। কবি বা একজন স্পর্শকাতর মানুষ যখন দীর্ঘশ্বাস ফেলেন; তখন সেই দীর্ঘশ্বাসটি শব্দে, ছন্দে বা ধ্বনিতে প্রতিফলিত হয়; তখন সেটা হয়ে উঠে কবিতা বা গান। জাহিদ; আমিও এই বাস্তবতার ব্যতিক্রম নই।
জাহিদ : কবিতার ক্ষেত্রে যেমন পঠন-পাঠন বা ব্যাকরণের কিছু দিক জানার থাকে, তেমনি গানের ক্ষেত্রেও সুর, লয় বা তালের একটা জ্ঞান থাকা লাগে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি শৈশবে নিয়মমাফিক গান শিখেছেন কি না?
আমিন : গান আসলেই কিছুটা প্রস্তুতি দাবি করে। গানের জন্য গলা তৈরি করতে হয়, গানের জন্য সরগম শিখতে হয়। তবে সহজ একটা ব্যাপারও কিন্ত আছে। এখন আমি যদি প্রশ্ন করি, যখন একটি কাক গান করে, সে কি কোথাও সরগম শিখেছে? বা একটি কোকিল যখন তার নিজের মতো করে গেয়ে উঠে? সে তো ছায়ানটে ভর্তি হয়নি।
জাহিদ : কাক আর কোকিলের গান গাওয়াটা তো জৈবিক আচরণ, আর্ট নয়।
আমিন : হ্যাঁ; মানুষের মধ্যে একটা জৈবিক আচরণ আছে। আমি মনে করি, মানুষ প্রথম গান করে যখন সে তার মায়ের পেট থেকে ভূমিষ্ট হয়ে চিৎকার করে। এই কান্নাটা হচ্ছে মানুষের প্রথম গান করা। এই কান্নাটাকে যদি স্ক্যান করো, এর মধ্যে তুমি রাগ-রাগিনী খুঁজে পাবে। কান্নার মধ্যে স্বরের যে ওঠা-নামা তা কিন্তু ছন্দময়। শিশুর কান্নার মধ্যে নানান ছন্দ কাজ করে। আমি জানি কেউ একদিন শিশুর কান্না নিয়ে গবেষণা করবে বা পিএইচ-ডি করবে। এবং তার মধ্যে সঙ্গীতের উপকরণ খুঁজে পাবে যাবে। কান্নাসঙ্গীত...হা হাহ হা।
জাহিদ : সদ্যজাত শিশুরা কান্না করে, কিন্তু কান্নার সময় চোখ দিয়ে অশ্রু বের হয় না। অশ্রুহীন কান্না।
আমিন : হ্যাঁ, সেটা আছে। আমি বলতে চাচ্ছি- মানুষের স্বভাবের মধ্যেই গান আছে, স্বভাবের মধ্যেই কবিতা আছে। তাই আমার কাছে মনে হয়, প্রতিটি মানুষই কবি, প্রতিটি মানুষই গায়ক। জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, কেউ কেউ কবি। আর আমি বলতে চাই, সবাই কবি। সবারই ব্যক্ত হবার আলাদা রিদম আছে, আলাদা বৈশিষ্ট আছে। মানুষ প্রত্যেকেই তার মতো করেই ব্যক্ত হয়। ভালো জীবন, ভালো প্রণয় ও গুড-সেক্সের জন্য কবিতা ও গানের প্রয়োজন আছে।
আমার বিশ্বাস কবিতা না পড়লে প্রেয়সীকে প্রপারলি ভালোবাসা যায় না, ভালো যৌনতার জন্যও কবিতা পড়তে হয়। নারীর কানে কানে যদি না বলা যায়, তোমাকে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ভালোবাসি; সঙ্গম ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। (হাসি) তো আমার ধারণা, কৃষক থেকে বুদ্ধিজীবী; সঙ্গমের মুহূর্তে সবাই কবি। কবিতা ছাড়া আমাদের কারোর শুভ জন্ম হতে পারে না।
জাহিদ : গান গেয়ে আপনি হঠাৎ করেই আমাদের চমকে দিলেন! এর আগেপিছের কথা শুনতে চাই।
অফিসই তাঁর স্টুডিওআমিন : আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমি যখন কিশোর, তখন গান শেখার জন্য এক ওস্তাদের কাছে গিয়েছিলাম। সেই ওস্তাদ ছিলেন রিকশার মিস্ত্রী। আমি তাকে মামা বলে ডাকতাম । মিস্ত্রী মামাকে বললাম, আমি গান শিখতে চাই। আপনি আমাকে গান শিখান। উনি ওনার হারমোনিয়ামটা পাশেই রাখতেন এবং ঐ হারমোনিয়াম দিয়েই আমি প্রথম সরগম শিখেছিলাম। কিন্তু সেই মামার কাছে আমি বেশি দিন শিখতে পারি নাই। সামান্য সরগমটাই শিখেছিলাম। তারপর আর শেখা হয়নি। কিন্তু ধরো, গত ত্রিশ বছর ধরেই  তো আমি একনিষ্ঠ স্রোতা। প্রতিদিন গড়ে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা গান শুনি। রাতে ঘুমোতে যাই গান শুনে, ঘুম থেকে উঠে শুনি। আমার শোনার মধ্যে ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক, সিনেমার গান, পল্লীগীতি, পপসঙ্গীত, কান্ট্রি সং- সব আছে। আমি গানের ক্ষেত্রে সর্বভূক। বলতে পারো, গানের মধ্যেই আমি বসবাস করি। গাওয়ার আকাঙ্ক্ষাটা ছিলো, কিন্তু হয়ে উঠছিলো না। গিটার কয়েকবার কিনেছি, গিটার শিখতে স্কুলে গিয়েছি। কিন্তু আমি ঠিক কুলাতে পারি নাই। কারণ এই বয়সে এসে, একেবারে শুরু থেকে শেখাটা অনেক কঠিন। তো আমি হতাশ হইনি। হতাশ হতে আসলে আমার লজ্জা লাগে। আবার গান করবো না-করবো এ নিয়ে একটা দ্বিধাও ছিলো। কিন্তু এক সন্ধ্যায় বসে ছিলাম বাসায়। মুন্নী অফিসে ছিলো, বাচ্চারা তাদের বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছিলো পাশেই। এক নিঃসঙ্গ সন্ধ্যা। আমি বসেছিলাম বেডরুমে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল। তো এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গেল, আমার মনে হলো যে, আমি গাইতে চাই, নিজের গান। আমার মোবাইল ফোনের রেকর্ডারটা অন করে গাইতে শুরু করে দিলাম ‘তোমার চোখ থেকে যদি জল গড়িয়ে পড়ে।’ একটানা গানটা গেয়ে ফেললাম। রেকর্ড হয়ে গেল। এটার কোনো স্ক্রিপ্ট ছিলো না এবং পরের লাইনটাও আমি জানতাম না। পুরো গানটা হয়ে গেলে ধ্যানস্থ অবস্থায়। এটাই আমার প্রথম গান। গানটা রেকর্ড হয়ে রইলো মোবাইলে। দু’দিন পরেই আমার সঙ্গে পরিচয় হলো তরুণ এক মিউজিশিয়ান এস. আর. সজীবের সঙ্গে। সজীব দুর্দান্ত মিউজিক করে। কম্পোজার সে। একেবারে অলৌকিকভাবে সে হাজির হলো আমার সামনে। আমার এক তরুণ বন্ধু রেজা ওকে নিয়ে আসলো। তখন তাকে বললাম, সজীব; কয়েকদিন আগে আমি একটা গান রেকর্ড করেছি, তুমি কি এর মধ্যে মিউজিক এ্যাড করে দিতে পারবা? সজীব বললো, ‘দেন, আমিন ভাই, আমি চেষ্টা করে দেখি।’ তারপর সে গানটায় যখন মিউজিক যুক্ত করে আনলো, আমি অবাক হয়ে গেলাম। একটা অসাধারণ কম্পোজিশন মনে হলো। আমি গানটা ফেইসবুকে পোস্ট দিলাম এবং দেখলাম চমৎকার সাড়া। সবাই আমাকে সমর্থন করছেন এবং গানটার প্রশংসা করছেন। গানটার কথা আমি গুণদাকে বলেছিলাম। তো গুণদা একটা স্ট্যাটাসই লিখলেন ফেইসবুকে। বললেন, গাও আমিন। তুমি পাশ করছো। এরপর গাইতে লাগলাম।
জাহিদ : আচ্ছা, আমিন ভাই, গান এবং কবিতা- এই দুই জায়গাতে আলাদা কোনো প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় কি না?
আমিন : গান এবং কবিতা আমার কাছে মনে হয় আসলে দুই ধরনের এক্সপ্রেশন। কিন্তু সূত্র একটাই। আমি কাঁপতে কাঁপতে কবিতা লিখি; কাঁপতে কাঁপতে কবিতা লেখার মানে হচ্ছে, কবিতা আমার কাছে আসে। তুমি হয়তো জানো, আমার একটি কবিতা লেখার জন্য দুই-তিন মিনিটের বেশি সময় লাগে না। ঝড়ের মতো আসে এবং আমিও তা নামিয়ে দিই অনায়াসে। গানও ঠিক এভাবেই আসছে। আসলে আমার এ অনুভূতির জায়গাটা তোমাকে বোঝাতে পারবো না! অনেকটা এলহামের মতো যেন। গান বা কবিতা করার সময় শারীরিক ও মানসিক কম্পন অনুভব করি। গানের মতো যখন কোন ঝড় আসে তখন আমি আমার এ অনুভূতিটাকে সঙ্গে সঙ্গে আমার রেকর্ডারে এরেস্ট করে ফেলি।
জাহিদ : আপনার গানের প্রশংসা বন্ধুরা তো করেছেনই- সঙ্গীতজ্ঞদের মতামত কি? তাদের কথা শুনেছেন?
আমিন : আসলে যারা সঙ্গীত বিশেষজ্ঞ তাদের কারো কাছে যাওয়া হয়নি বা কারো সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়নি। আমি বিশেষজ্ঞদের কথা ভেবে গাই না। আমি তরুণদের জন্য গাই। তারা আমাকে উদারভাবে প্রশংসা করেন। আর কি লাগে?
জাহিদ : আপনি কবিতা লিখলেন, গান করলেন। এখন কি আমরা অপেক্ষা করবো যে, আপনি ছবি আঁকবেন?
আমিন : (হাসি) আমি ছবি আঁকার চেষ্টা মাঝে মধ্যে করি। সত্যিকার অর্থে; তোমাকে বলি, কোনোটাই কোনোটা থেকে আলাদা না, বিচ্ছিন্ন না। যে কবিতা লিখবে, সে গাইতে পারবে না? আবার যে গাইবে সে আঁকতে পারবে না? তোমাকে কে বলেছে ফর্মের দাস হয়ে থাকতে হবে? মানুষ হচ্ছে অসীম সম্ভাবনাময়। তার যা খুশি; ভালো লাগে করবে সে, যদি অন্যের অসুবিধা না হয়। নির্মলেন্দু গুণ ছবি আঁকতে শুরু করলেন এবং তাঁর ছবির মধ্যে যে নীল রঙের ব্যবহার তা আমাদের চোখে লেগে থাকে। তিনি আর্ট কলেজ থেকে শিখে আসেননি। এজন্যই বলি, পৃথিবীর প্রথম আর্ট ইন্সটিউশনের প্রধান যিনি ছিলেন তাঁর কিন্তু কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিলো না।
জাহিদ : কবীর সুমন, অঞ্জন দত্ত, নচিকেতা, শিলাজিৎ- এরা নিজেদের গান গেয়েছেন এবং তাদের গানে সমকালীন নানা বিষয় পাওয়া যায়। তাদের জনপ্রিয়তা হেমন্তযুগ পেরিয়ে অনন্য মাত্রা পেয়েছে। আমাদের দেশে এই কাজটা খুবই কম। এখানে সুরকার একজন, গীতিকার একজন আর গাইছেন আরেকজন। তো তিনজনের আবেগকে এক জায়গায় এনে কীভাবে কাজ করা যায়?
ফেসবুক তাঁর প্রকাশের ক্ষেত্রআমিন : তুমি অত্যন্ত সুন্দর একটা প্রসঙ্গ তুলেছো। কারণ, একজন গান লিখবেন এক আবেগ থেকে। আরেকজন তাতে সুর দিবেন আরেক আবেগ থেকে। আবার আরেকজন গাইবেন আরেক আবেগ থেকে। তিনটি আবেগকে এক জায়গায় মেলানো কঠিন, তবে অসম্ভব না। কিন্তু যদি একটি আবেগ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাণীসহ, সুরসহ কণ্ঠস্বরে ধ্বনিত হয় সেটা সম্ভবত নতুন একটা মাত্রা তৈরি করতে পারে। আমরা সুমনকে দেখেছি, তিনি নিজে লিখেন, সুর করেন এবং গানও। তার গান তো অন্য আবেগের মাত্রা তৈরি করে। রবীন্দ্রনাথ যদি গান গাইতেন উপযুক্তভাবে এবং উপযুক্ত পরিমাণে; আমরা কিন্ত অন্য মাত্রার গায়ক পেতাম। রবীন্দ্রনাথের গাওয়া যদি দশটি গান থাকতো তাহলে কিন্তু আমরা পাগলের মতো হয়ে সেই দশটি গান শুনতাম। নজরুল জনপ্রিয় ছিলেন; নিজের গান তিনি নিজে গাইতে পারতেন। মুশকিল হচ্ছে কি জানো, আমার গান নির্দিষ্ট কয়েকটি সুরের মধ্যে নাই, তাই আমার গান বিভিন্ন সুরের মধ্যে ওঠা-নামা করে, ঢেউয়ের মতো খেলা করে। এই ঢেউগুলো আমারই মনে থাকে না। আমার গান দ্বিতীয়বার আমি নিজেই জুৎমতো গাইতে  পারি না। (হাসি) তবে আমি শীঘ্রই সবকিছু শিখে নেবার পণ করেছি। তাল-টাল শিখে ফেলব। বিটে গান করব।
জাহিদ : আপনি প্রতিদিন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা গান শুনেন। ক্ল্যাসিকাল মিউজিকের প্রতি আপনার একটা দুর্বলতা আছে তা আমরা জানি। একজন শিল্পীর একটা এ্যালবাম প্রকাশের মানে হচ্ছে, তার পরিণতির একটা জায়গার জানান দেওয়া। এই জায়গায় এসে শিল্পী বা স্রোতা হিসেবে আপনি আপনার গানটাকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
আমিন : আমি মনে করি, আমাদের জীবনটাই একটা খসড়া। যে জীবন-যাপন করি তা একটা রাফ জীবন-যাপন। প্রতিনিয়ত যাপন করে করে আগাই।  সব হচ্ছে এডহক। অস্থায়ী। অমসৃণ সরকার আমিকে আমি পছন্দ করি। কারণ, মসৃণতা জিনিসটা আসলেই একটা ধোঁয়াশা। প্রতিটি শিল্পই আসলে খসড়া। একজনের কাছে যেটা পরিণত মনে হচ্ছে, অন্যজনের কাছে তা খসড়া ছাড়া কিছুই নয়। কারণ, আমরা যে জীবনটা যাপন করি একটু পরেই কী হবে তা আমরা জানি না। ভবিষ্যতের বাস্তবতা তুমিও যেমন জানো না তেমনি আমিও জানি না। কচু কাটতে কাটতে ডাকাত; একটা প্রবাদ আছে। আমি ভাবি গাইতে গাইতে গায়ক। পরিণতি-টতি নিয়ে ভাবি না বন্ধু।
জাহিদ : আমার কেনো যেনো মনে হয়, পরবর্তীতে আপনার যে এলবামটা আসবে তা হবে ধ্রুপদী সঙ্গীতের।
আমিন : হয়তো। আমি তিনজন ওস্তাদের কাছে গান শিখছি আট মাস ধরে। এবং আমি এটা অব্যাহত রাখবো। প্রথমেই আমি যে কথাটা বলেছিলাম, আমি স্বতঃস্ফূর্ত। এখন এ কথাটার বিরোধিতা করবো। কারণ যে সাইকেলটা আমি চালাবো, তা শিখেই চালাতে চাই। যেমন, এখন আমি তালের ব্যাপারে সচেতন হচ্ছি। আমার শিক্ষকরা আমাকে তাল শিখাচ্ছেন এবং আমি খুব মজাই পাচ্ছি। বীট সম্পর্কে ধারণা নিচ্ছি। প্রথম সিডিটা বের হওয়ার পর এখন আমি প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছি। সঙ্গীতের কলা-কৌশলগুলো শেখার চেষ্টা করছি।
জাহিদ : আপনি সকালে রেওয়াজ করেন?
আমিন : না, সকালে করি না। আমি গাইতে চেষ্টা  করি সন্ধ্যায়। সন্ধ্যাটা বড় ভালো লাগে ।
জাহিদ : সঙ্গীত নিয়ে মেতে থাকার ফলে আপনার পড়াশোনা বা লেখালেখির ক্ষেত্রে কোনো ক্ষতি হচ্ছে কিনা?
আমিন : লেখালেখি, পড়াশোনা এগুলো তো নিঃশ্বাসের অংশ। আমার মনে হয়, আমি আলাদা করে পড়াশোনা করি না- বাংলা একাডেমিতে চাকুরি করার ফলে সব সময় আমি বই নিয়েই আছি, পড়াশোনার মধ্যেই আছি।
জাহিদ : এখন আপনার ৩০ সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠান নিয়ে কিছু জানতে চাই?
মাটি ও মরমের মানুষের টানেআমিন : ৩০ তারিখ আমরা অ্যালবামটা প্রকাশ করছি। একটা রেস্টুরেন্টে অনুষ্ঠান হবে। তবে সেটা খুবই অল্প পরিসরে। সেখানে শুধু আমার সেই বন্ধুরা থাকবেন; গানলামিতে যাদের অবদান আছে। কয়েকজন শ্রদ্ধেয় মানুষ থাকবেন। অতিবিখ্যাত ব্যক্তিদের সেখানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তবে কয়েকজন বিখ্যাত আছেন; যারা আমার বা আমাদের আপনজন। যাদের ভালোবাসা পেয়েছি, যারা আমার ভালোবাসা পেয়েছেন, যাদের দ্বারা আমি উপকৃত হয়েছি, সেইসব অতি ঘনিষ্ঠদের নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে ছোট্ট পরিসরে ডিনারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জাহিদ : আপনি আপনার ৫০তম জন্মদিনে নিজেই নিজেকে এই উপহার দিলেন?
আমিন : আমি খুবই আনন্দিত যে, আমার পঞ্চাশ বছর বয়সে গান করতে পেরেছি। আর এটাই ছিলো আমার একমাত্র অতৃপ্তি। এবং আমার এই অতৃপ্তিটা দূর হয়ে গেল।
জাহিদ : এটা আপনার জন্য সাফল্যের বিষয়।
আমিন : না, সাফল্য আমি ভাবছি না। আমার কাছে সাফল্য জিনিসটা অন্য রকমের। আমার মনে হয়, আমি কিছু করছি এটাই আমার  সাফল্য। ৫০ বছর ধরে বেঁচে আছি এটাই আমার বড় সাফল্য।
জাহিদ : অনুপ্রেরণা বলতে কি বোঝেন?
আমিন : ‘ক্রিয়েটিভ অনুপ্রেরণা’ হচ্ছে একটা ঘোর। এই ঘোরকে অনুভব করা যায় কিন্ত ব্যাখ্যা করা যায় না। আর ‘বাস্তবিক প্রেরণা’ হচ্ছে আমার বন্ধুরা। আমি সৌভাগ্যবান একগুচ্ছ উৎকৃষ্ট সৃষ্টিশীল বন্ধু আছে আমার। তারা আমার সুখে সুখি হন। দুখে পাশে থাকেন। তাদের রান্নাঘর তক আমার দৌড়। তেমনি আমার বাড়ি তাদের বাড়ি। জীবনে এটা একটা বড় পাওয়া। এখন পেয়েছি কয়েক হাজার ফেইসবুক বন্ধু। তাদের কারোর বয়স ৮০। কারো বয়স ১৭। নর আছেন, নারী আছেন। তারা প্রতিনিয়ত আমাকে উৎসাহিত করেন। আমি খুব কৃতজ্ঞ ফেইসবুকের বন্ধুদের প্রতি। তার সবাই আমার আত্মার-প্রতিবেশি; আমার স্পিরিচুয়াল বন্ধু। আমার ৫০ বছর বয়সে পা দেবার কালে সবাইকে ভালবাসা জানাই। আমি সবার ভালবাসা পেতে আগ্রহীও। কারণ ভালবাসা ছাড়া আমি অন্ধ-বধির ও পঙ্গু।

শ্রুতিলিখন অসীম চক্রবর্তী