অমর একুশে বইমেলা ২০২৬

বইমেলার উদ্দেশ্য একুশের চেতনা ধারণ করা : সাইমন জাকারিয়া

বাংলা ট্রিবিউন: মেলায় আপনার নতুন কী বই প্রকাশিত হচ্ছে?

সাইমন জাকারিয়া : বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর আমার দুটি বই প্রকাশের বিষয় চূড়ান্ত হয়েছে। বই দুটি হলো: “বাংলাদেশের লোকসংগীত” এবং “গল্পকথা নাটক : মানিক থেকে মিলন”।

প্রশ্ন: বইগুলো নিয়ে পাঠকদের কিছু বলুন? বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কি এই বইয়ের বিষয়বস্তুকে প্রভাবিত করেছে?

উত্তর: আমার রচিত “বাংলাদেশের লোকসংগীত” বইটিতে মূলত বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সংগীত ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, মারফতি, বাউল, জারি, বিচার, কবি, গোষ্ঠ, দৈন্য প্রভৃতি গানের রীতি-প্রকৃতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিখ্যাত সাধক কবি যেমন ফকির লালন সাঁই, রাধারমণ দত্ত, বিজয় সরকার, জালাল খাঁ, উকিল মুন্সী, আবদুল গফুর হালী প্রমুখ সাধকের জীবন ও সংগীত সাধনার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা-বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশের মাজারকেন্দ্রিক সংগীত ঐতিহ্য, সাধুসঙ্গের গানের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নিবন্ধ মুদ্রিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত সংগীতের উত্তরাধিকারদের কয়েকজনের সাক্ষাৎকার, চিঠিপত্র সংকলিত হয়েছে। অন্যদিকে আমার রচিত ‘গল্পকথা নাটক : মানিক থেকে মিলন’ বইটিতে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একে অনালোচিত নাটক ‘ভিটে মাটি’ থেকে শুরু করে আবদুল গফুর হালী, সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল্লাহ আল-মামুন ও সেলিম আল দীনের নাটকের ভিন্নতর ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে হুমায়ুন আহমেদ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও ইমদাদুল হক মিলনের কথাসাহিত্যের অনালোচিত দিক নিয়ে আলোচনামূলক প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। আমার দুটি বই-ই যেহেতু বহু বছরের সাধনায় রচিত সেহেতু এতে সাম্প্রতিককালীন সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার তেমন কোনো প্রতিফলন নেই।    

প্রশ্ন: শুরু থেকেই মেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছিল, এমন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইভেন্টের প্রতি কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা আছে?

উত্তর: অমর একুশে বই মেলা ২০২৬-এর আয়োজন নিয়ে বাংলা একাডেমিকে প্রথম থেকেই আন্তরিকভাবে সচেষ্ট দেখেছি। সাম্প্রতিক কালের রাজনীতি পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে, বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন ও রোজা ফেব্রুয়ারি মাসে পড়ে যাবার কারণে বাংলা একাডেমি ডিসেম্বর মাস থেকে শুরু করে জানুয়ারি মাসের মধ্যে বইমেলা আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনায় নির্বাচনের পর বইমেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে বাংলা একাডেমির আন্তরিকতার প্রশংসা করতে হয়।

প্রশ্ন: সময় কমিয়ে আনা ও রমজানের কারণে মেলায় কেমন প্রভাব পড়বে?

উত্তর: অমর একুশে বইমেলার সাথে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের সম্পর্ক রয়েছে। সেদিক দেখলে বইমেলা তার পুরোনো ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে অনুষ্ঠিত হবে। রমজানের মধ্যে বইমেলার আয়োজন সফল হবে বলে মনে করি। এরমধ্যে দিয়ে নতুন একটি শিক্ষা আমাদের সামনে তৈরি হবে। ভিন্ন পরিস্থিতিতেও অমর একুশে বইমেলা ঐতিহ্যগত চলমান থাকার একটি দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে।

প্রশ্ন: গত বছর মেলা নিয়ে প্রকাশকদের হতাশা দেখেছি, অনেকের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল—এ বছর এমন কিছু আশঙ্কা আছে?

উত্তর: অমর একুশের প্রতি শ্রদ্ধাশীলদের সমর্থনে বইমেলা সফল হবে বলে বিশ্বাস করি। প্রকাশকদের হতাশা শুধু ব্যবসাকেন্দ্রিক হলে তা হতাশাজনক হবে। অমর একুশের বইমেলার মূল উদ্দেশ্য একুশের চেতনাকে ধারণ করা। সেদিকে নজর দিয়ে বইমেলাকে আরও অর্থবহ করে তুলতে প্রকাশকদের চেতনাগত উৎকর্ষ নিয়ে উপস্থিত হওয়া জরুরি।

প্রশ্ন: একটি সুন্দর বইমেলা আয়োজন করতে কী কী পদক্ষেপ নিলে ভালো হয়?

উত্তর: বইমেলাকে অর্থবহ করে তুলতে হলে শুধু বাহ্যিক সাজসজ্জার উৎকর্ষ সাধন করলেই হবে না, যুগের পর যুগ বইমেলায় প্রকাশিত বইয়ের অধিকাংশ লেখকরা তাদের প্রাপ্য রয়্যালটি থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। বইমেলা শেষের দিন লেখক রয়্যালটি দেবার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলে ভালো হয়। এটাকে প্রথম পদক্ষেপ মনে করি। এছাড়া, বইমেলায় প্রকাশিত বইয়ের গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য মেলার কার্যক্রম আরও আগে থেকে শুরু করলে ভালো, যাতে লেখকদের বই যথাযথ সম্পাদনার মাধ্যমে প্রকাশের সুযোগ পাই। এছাড়া, প্রতি বছর অনেক নতুন প্রকাশক বইমেলায় স্থান করে নেয়, তাদের জন্য লিটল ম্যাগাজিন কর্নারের মতো আলাদা একটি কর্নার করলে ভালো হতে পারে। এতে করে নতুন প্রকাশকদের চিহ্নিত করতে যেমন সহজে পারে তেমনি তাদের প্রকাশিত বই সম্পর্কে পাঠকের ধারণা পেতে সহজ হবে।

প্রশ্ন: মেলায় এবং সারা বছর যত বই প্রকাশিত হয় তার ডিজিটাল ডেটাবেইজ কি বাংলা একডেমি বা কোনো কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করতে পারে?

উত্তর: অবশ্য বইমেলায় প্রকাশিত সকল বইয়ের ডেটাবেজ স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করতে পারলে ভালো। আমি যতটুকু জানি বাংলা একাডেমি এবছর থেকে এ ধরনের একটি ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করেছে।

প্রশ্ন: বইমেলায় পাঠক-লেখক সম্পর্ক বা যোগাযোগের বর্তমান বাস্তবতা কী?

উত্তর: লেখক-পাঠকের প্রত্যক্ষ যোগাযোগের বাস্তবতা এখন অনেকটাই কমে গেছে। কারণ, ভার্চুয়াল মিডিয়ার কারণে লেখকদের সাথে পাঠকের যোগাযোগ ঘটা এখন আর কঠিন কিছু নয়। তারপরও বইমেলায় লেখার সান্নিধ্যে এসে পাঠক বই সংগ্রহ ও লেখকের অটোগ্রাফ সংগ্রহ করার ঐতিহ্য এখনও লুপ্ত হয়ে যায়নি। জনপ্রিয় লেখকদের পাশাপাশি নবীন, প্রবীণ লেখকদের সাথে অনেক পাঠক বইমেলায় এসে সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পান।

প্রশ্ন: প্রচুর বই ছাপা হচ্ছে কিন্তু বইয়ের মান ও সম্পাদনা নিয়ে প্রকাশকরা কতটা সচেতন বলে মনে করেন?

উত্তর: বইয়ের মান ও সম্পাদনা নিয়ে খুব কম প্রকাশকই সচেতন। তবে, সাম্প্রতিককালে কিছু কিছু প্রকাশক বইয়ের গুণগত মান বৃদ্ধিতে সম্পাদনা করে আসছেন। এই ঐতিহ্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেই বইমেলার আয়োজন আরও বেশি অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।

প্রশ্ন: কোন প্রকাশনী থেকে আসছে? মূল্য, প্রচ্ছদ ও স্টল নম্বর জানতে চাই।

উত্তর: আমার রচিত “বাংলাদেশের লোকসংগীত” বইটি প্রকাশ করছে ঐতিহ্য; অন্যদিকে “গল্পকথা নাটক : মানিক থেকে মিলন” বইটি প্রকাশ করছে অন্যধারা।