অমর একুশে বইমেলা ২০২৬

মেলায় বিক্রির উদ্দেশ্যে মানহীন বই বের করে : আলম খোরশেদ 

উমামা জামান মিম: মেলায় আপনার নতুন কী বই প্রকাশিত হচ্ছে?

আলম খোরশেদ: এবারের মেলায় আমার দুটি অনুবাদের কাজ আসার কথা রয়েছে। যেহেতু এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নই তাই প্রকাশকের নাম বলতে চাচ্ছি না। একটি হলো ‘বিশ শতকের বিশ্ব কবিতা’ (অনুবাদ সংকলন) এবং অন্যটি জার্মান কথাসাহিত্যিক ডব্লিউ. জি. সেবাল্ড-এর দুটি বড়ো গল্পের অনুবাদ, যার শিরোনাম ‘দেশান্তরীদ্বয়’।

প্রশ্ন: বইটি নিয়ে পাঠকদের কিছু বলুন? বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কি এই বইয়ের বিষয়বস্তুকে প্রভাবিত করেছে?

উত্তর: ‘বিশ শতকের বিশ্ব কবিতা’ সংকলনটিতে আধুনিক কবিতার বৈচিত্র্য ফুটে উঠেছে, যেখানে রাজনীতি, সমাজনীতি, সংস্কৃতি ও মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন আছে। অন্যদিকে ‘দেশান্তরীদ্বয়’ বইটিতে জার্মানির প্রেক্ষাপটে ইমিগ্র্যান্ট বা দেশান্তরী মানুষদের জীবন উঠে এসেছে। এতে ইহুদিদের নির্বাসন, নিঃসঙ্গতা, স্মৃতিকাতরতা ও বিচ্ছিন্নতাবোধের চিত্রায়ণ রয়েছে। যদিও এটি বিদেশি প্রেক্ষাপটে রচিত, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত মানবিক অনুভূতিগুলো বৈশ্বিক ও সর্বজনীন। বর্তমান অস্থির সময়ে এই বিচ্ছিন্নতা ও অস্তিত্বের লড়াইয়ের গল্পগুলো পাঠকদের নতুন করে ভাবাবে।

প্রশ্ন: শুরু থেকেই মেলা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছিল, এমন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইভেন্টের প্রতি কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা আছে?

উত্তর: বর্তমান কর্তৃপক্ষের কাছে শিল্প-সাহিত্য বা প্রগতিশীল চিন্তার গুরুত্ব হয়তো আর আগের মতো নেই। একুশে বইমেলার যে প্রগতিশীল চেতনা ও বাঙালি সংস্কৃতির উদযাপন, সেটাকে হয়তো তারা নিরুৎসাহিতও করতে চায়। মেলা আয়োজনের যে তারিখ তারা নির্ধারণ করেছে, তা দেখে মনে হয় তারা চাপের মুখে পড়ে বা দায়সারাভাবে এটি করছে। আন্তরিকতা থাকলে রোজা কিংবা নির্বাচনের দোহাই না দিয়ে মেলাটি স্বাভাবিক নিয়মেই সম্পন্ন করা যেত বলে আমি মনে করি।

প্রশ্ন: সময় কমিয়ে আনা ও রমজানের কারণে মেলায় কেমন প্রভাব পড়বে?

উত্তর: প্রভাব তো অবশ্যই পড়বে। ২০ তারিখ মেলা শুরু হলে তার পরপরই রোজা শুরু হয়ে যাবে, সাথে থাকবে গরম। এতে মেলার চিরাচরিত আবেদন নষ্ট হতে পারে এবং প্রকাশকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তবে একেবারে না হওয়ার চেয়ে হওয়াটা ভালো। কারণ, এই সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনটুকু আমাদের স্থবিরতা কাটাতে সাহায্য করবে। নির্দিষ্ট একদল পাঠক ও লেখক প্রাণের টানে ঠিকই মেলায় আসবেন।

প্রশ্ন: গত বছর মেলা নিয়ে প্রকাশকদের হতাশা দেখেছি, অনেকের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ছিল—এ বছর এমন কিছু আশঙ্কা আছে?

উত্তর: রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা অস্থিতিশীলতার কারণে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার আশঙ্কা একদম উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বর্তমানের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হয়তো অনেক কিছুই চায় না, ফলে একটা ভয় থেকেই যায়। তবে ভয়ের কারণে গুটিয়ে থাকলে চলবে না; প্রতিকূলতার মধ্যেই আমাদের কাজ করে যেতে হবে।

প্রশ্ন: একটি সুন্দর বইমেলা আয়োজন করতে কী কী পদক্ষেপ নিলে ভালো হয়?

উত্তর: মেলা সংশ্লিষ্ট তিনটি পক্ষ—প্রকাশক, লেখক ও পাঠক; এই তিন পক্ষের মতামত ও আলোচনার ভিত্তিতে মেলার পরিকল্পনা করা উচিত। মেলার অনুষ্ঠানগুলো ঠিকঠাকভাবে পরিচালনা ও প্রচার করতে হবে। শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, মেলার আসল লক্ষ্য অর্জনে এই তিন পক্ষের সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।

প্রশ্ন: বইমেলায় পাঠক-লেখক সম্পর্ক বা যোগাযোগের বর্তমান বাস্তবতা কী?

উত্তর: বর্তমানে লেখক-পাঠক যোগাযোগের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। মেলায় ‘লেখককুঞ্জ’ থাকলেও সেখানে লেখকদের চেয়ে পুলিশের উপস্থিতি বেশি দেখা যায়। একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে লেখক ও পাঠকদের অন্তরঙ্গ পরিসরে আলাপচারিতা ও মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি করা উচিত। যোগ্য মানুষদের মাধ্যমে এমন সক্রিয় উদ্যোগ নিলে উভয় পক্ষই উপকৃত হবে।

প্রশ্ন: প্রচুর বই ছাপা হচ্ছে কিন্তু বইয়ের মান ও সম্পাদনা নিয়ে প্রকাশকরা কতটা সচেতন বলে মনে করেন?

উত্তর: অধিকাংশ প্রকাশকই মান নিয়ে সচেতন নন। এখন টাকা দিলেই বই প্রকাশ করা সহজ হয়ে গেছে, ফলে মানের কোনো বালাই থাকছে না। অনেক নতুন প্রকাশক শুধু মেলার এক মাসে বিক্রির উদ্দেশ্যে মানহীন বই বের করেন। তবে যারা সিরিয়াস এবং দীর্ঘদিনের সুনাম আছে, তাদের উচিত পেশাদার সম্পাদনার পেছনে বিনিয়োগ করা। বইয়ের মান নিয়ন্ত্রণে একটি শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ থাকা দরকার বলে মনে করি। লেখক, প্রকাশকদের পেশাগত মানোন্নয়নে কর্মশালা বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা জরুরি।