ঈদ সংখ্যা ২০২৬

লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের সঙ্গে আলাপচারিতা

লাসলো ক্রাসনাহোরকাই (জন্ম: ৫ জানুয়ারি ১৯৫৪) হাঙ্গেরীয় ঔপন্যাসিক ও চিত্রনাট্যকার। তিনি ২০২৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এর আগে ২০১৫ সালে তিনি ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছিলেন। তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন, অ্যাডাম থার্লওয়েল। প্যারিস রিভিউর The Art of Fiction বিভাগে যেটি প্রকাশিত হয়। সংখ্যা : ২২৫তম, প্রকাশকাল: গ্রীষ্ম, ২০১৮।


প্রশ্নকর্তা: আপনার লেখক হয়ে ওঠার পর্বটা দিয়েই শুরু করা যাক।

ক্রাসনাহোরকাই: আমি ভেবেছিলাম বাস্তব জীবন, সত্যি জীবনটা অন্য কোথাও থাকে। ফ্রানৎস কাফকার The Castle-এর সঙ্গে Malcolm Lowry এর Under the Volcano বইটাও কিছুদিন আমার কাছে বাইবেলের মতো ছিল। এটা ষাটের শেষ, সত্তরের শুরুর দিককার কথা। আমি লেখকের জীবন বেছে নিতে চাইনি। আমি স্রেফ একটিমাত্র বই লিখতে চেয়েছিলাম এবং তারপর আমি অন্য কিছু করতে চেয়েছিলাম, বিশেষ করে সংগীত বিষয়ে। আমি একেবারে গরিব মানুষজনের সঙ্গে বাস করতে চেয়েছিলাম— আমি ভেবেছিলাম সেটাই সত্যিকারের জীবন। আমি খুবই দরিদ্র গ্রামগুলোতে বসবাস করেছি। আমি সবসময়ই খুব বাজে কিছু চাকরি করেছি। প্রায়শই স্থানবদল করেছি আমি, প্রতি তিন চার মাসে, বাধ্যতামূলক সৈনিকজীবন থেকে পালিয়ে বাঁচার জন্য।

তারপর, আমি যেইমাত্র ছোটোখাটো কিছু লেখা প্রকাশ করা শুরু করেছি, পুলিশের কাছ থেকে ডাক আসে আমার। আমি মনে হয় একটু বেশিই দুর্বিনীত ছিলাম, প্রতিটি প্রশ্নের শেষেই আমি বলে উঠি, ”বিশ্বাস করুন আমি রাজনীতি করি না।” "কিন্তু আমরা আপনার সম্পর্কে কিছু কথা জেনেছি।” "না, আমি সাম্প্রতিক রাজনীতি নিয়ে কিছু লিখি না।” "আমরা আপনাকে বিশ্বাস করি না।” খানিকক্ষণ পর আমি কিছুটা রেগে যাই এবং বলে উঠি, "আপনারা কি সত্যি বিশ্বাস করেন, আমি আপনাদের মতো মানুষদের নিয়ে কিছু লিখতে পারি?” এতে বলাই বাহুল্য তারা ভীষণ রেগে যায়, এবং তাদের একজন, বা গোপন পুলিশের কেউ, আমার পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করতে চায়। সোভিয়েত আমলের কমিউনিস্ট ব্যবস্থায় আমাদের দুটো করে পাসপোর্ট থাকত, নীল ও লাল, আমার কেবল লালটাই ছিল। লালটা তেমন আকর্ষণীয় ছিল না, কেননা এটা দিয়ে আপনি কেবল সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতেই যেতে পারতেন, আর নীলটা ছিল সত্যিকারের স্বাধীনতার প্রতীক। আমি তাই বলি, "সত্যি আপনারা লাল পাসপোর্টটাই চান?” তারা সত্যি সত্যি সেটা নিয়ে চলে যায়, এবং ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত আমার কোনো পাসপোর্টই ছিল না।

সেটাই ছিল আমার লেখক জীবনের প্রথম গল্প— এবং খুব সহজেই সেটা শেষ গল্পও হতে পারত। সম্প্রতি, গোপন পুলিশের কিছু কাগজপত্র পড়ার সুযোগ হয় আমার, যেখানে সম্ভাব্য তথ্যপ্রদানকারী ও গুপ্তচরদের সম্পর্কে লেখা ছিল। তারা আমার ভাইয়ের মধ্যে কিছু সম্ভাবনা দেখেছিল, কিন্তু লাসলো ক্রাসনাহোরকাই সম্পর্কে লিখেছিল, এটা একেবারে অসম্ভব, কেননা সে নিজেই সাংঘাতিকভাবে কমিউনিস্টবিরোধী। এটা আমার কাছে এখন কৌতুককর মনে হয়, কিন্তু তখন সেটাকে তেমন কৌতুকপ্রদ মনে হয়নি। তবে আমি কখনোই আমার রাজনৈতিক বিশ্বাসের কোনো বহিঃপ্রকাশ ঘটাইনি। আমি ছোটোখাটো গ্রামে ও গঞ্জে বসবাস করছিলাম এবং আমার প্রথম উপন্যাসটা লিখছিলাম তখন।

প্রশ্নকর্তা: আপনি সেটা প্রকাশ করেছিলেন কীভাবে?

ক্রাসনাহোরকাই: সেটা ১৯৮৫ সালের কথা। কেউই, আমি নিজেও, বুঝতে পারছিলাম না Satantango লেখাটা কীভাবে প্রকাশ করা যায়, কেননা সেটা কমিউনিস্ট ব্যবস্থার জন্য একটা সমস্যাসংকুল উপন্যাস ছিল। সেইসময় একটি সমকালীন সাহিত্যের প্রকাশক নিজেই ছিলেন প্রাক্তন গোপন পুলিশের প্রধান, এবং তিনি হয়তো প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, তিনি তখনও ক্ষমতাবান, এতটাই যে, এরকম একটি উপন্যাস প্রকাশেরও সাহস রাখেন। আমার মনে হয় সেটাই একমাত্র কারণ বইটা প্রকাশের পেছনে।

প্রশ্নকর্তা: আপনি তখন কী ধরনের কাজ করছিলেন?

ক্রাসনাহোরকাই: আমি কিছুদিন একজন খনিশ্রমিকের কাজ করি। সেটা একটা হাস্যকর ব্যাপার ছিল, কেননা আমার হয়ে কাজ করত সত্যিকার শ্রমিকেরা। এরপর আমি বুদাপেস্ট থেকে অনেক দূরের গ্রামগুলোতে কয়েকটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে কাজ করি। প্রতিটা গ্রামেই এরকম একটা সংস্কৃতিকেন্দ্র ছিল যেখানে লোকজন ধ্রুপদী সাহিত্যের বইগুলো পড়তে পারত। এটাই ছিল তাদের প্রাত্যহিক জীবনের একমাত্র অবলম্বন। শুক্রবার ও শনিবারগুলোতে কেন্দ্রের পরিচালক সংগীতসন্ধ্যা ও সেরকম কিছু একটা আয়োজন করতেন, যেটা তরুণদের জন্য খুবই উপকারী ছিল। আমি ছয়টা ছোট ছোট গ্রামের শিল্পপরিচালক ছিলাম, তাই আমাকে এগুলোর মধ্যে পালা করে কাজ করতে হতো। এটা দারুণ একটা কাজ ছিল। আমি এ কাজটা খুব পছন্দ করতাম, কেননা এর জন্যই আমি আমার বুর্জোয়া পরিবার থেকে দূরে থাকতে পেরেছিলাম।

আর কী ধরনের কাজ? আমি তিনশত গরুর রাত্রিকালীন পাহারাদার ছিলাম। সেটা আমার খুব প্রিয় ছিল— বিরান প্রান্তরে এক গোশালা। আশেপাশে আর কোনো গ্রাম, গঞ্জ কিংবা শহর ছিল না। সম্ভবত কয়েক মাসের মতো আমি সেটার পাহারাদার ছিলাম। এক পকেটে Under the Volcano আর অন্য পকেটে দস্তয়েফ্স্কিকে নিয়ে এক গরিবি জীবন।

এবং অবধারিতভাবেই এই ভবঘুরে বছরটিতেই আমি মদ্যপান শুরু করি। হাঙ্গেরিয়ান সাহিত্যে এমন একটা ঐতিহ্য ছিল যে তার সব মহান প্রতিভাই মদ্যপ ছিলেন। আমিও পাগলের মতো মদ খেতাম। তারপর এমন একটা মুহূর্ত আসে যখন আমি একদল হাঙ্গেরিয়ান লেখকের সঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম এবং দুঃখের বিষয় তাঁরা সকলেই একমত ছিলেন যে, এটা অবধারিত যে হাঙ্গেরিয়ান প্রতিভাদেরকে মদ্যপ হতেই হবে। আমি সেটা মানতে অস্বীকার করি এবং রীতিমতো বাজি ধরি—বারো বোতল শ্যাম্পেনের ওপর— যে, আমি আর কখনোই মদ পান করব না।

প্রশ্নকর্তা: এবং আপনি সত্যিই আর মদ খাননি?

ক্রাসনাহোরকাই: না। সেইসময় সমসাময়িক গদ্যলেখকদের মধ্যে Péter Hajnóczy নামে একজন মদ্যপ সাহিত্যিক ছিলেন। তিনি একজন জীবন্ত কিংবদন্তি ছিলেন এবং Malcolm Lowry-এর মতোই প্রচণ্ড মাতাল ছিলেন। তাঁর মৃত্যু ছিল হাঙ্গেরিয়ান সাহিত্যের এক বিশাল ঘটনা। খুবই তরুণ ছিলেন তিনি, সম্ভবত চল্লিশ বছর বয়স। এবং আমি সেই জীবনটাই যাপন করছিলাম। আমি কোনোকিছু নিয়েই ভাবিত ছিলাম না, সবসময় একশহর থেকে আরেক শহরে ছুটে বেড়ানো, রেলস্টেশনে অপেক্ষারত, রাত্রিযাপন পানশালায়, মানুষ দেখি, তাদের সঙ্গে অল্পবিস্তর গল্প করি। এভাবে ধীরে ধীরে আমি আমার মাথার মধ্যেই বইটি লিখতে শুরু করি।

এভাবে লিখতে শুরু করাটাই ভালো ছিল, কেননা আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল সাহিত্য একটি আধ্যাত্মিক ক্ষেত্র, যেখানে অন্যত্র, কিন্তু একই সময়ে লিখে যাচ্ছিলেন Hajnóczy, János Pilinszky, Sándor Weöres এবং অন্য আরও অনেক অসাধারণ কবিসাহিত্যিক। গদ্যের আকর্ষণ একটু কমই ছিল। আমরা অনেক বেশি কবিতাকেই ভালোবাসতাম, কেননা সেটা গোপন রহস্যময়তায় ভরা। গদ্যের অবস্থান বাস্তবতার খুব বেশি কাছাকাছি। গদ্যের ক্ষেত্রে যাঁরা যত বেশি বাস্তবের কাছাকাছি থাকতেন তাঁদেরকেই তত বেশি প্রতিভাবান মনে করা হত। সেকারণেই, ঐতিহ্যগতভাবে হাঙ্গেরির গদ্যলেখকেরা, যেমন ধরুন Zsigmond Móricz, খুব ছোট ছোট বাক্যে লিখতেন। তবে Krúdy, হাঙ্গেরির গদ্যসাহিত্যে আমার একমাত্র প্রিয় লেখক, সেরকম লিখতেন না। তিনি চমৎকার একজন লেখক ছিলেন। একেবারেই অনুবাদ-অসম্ভব একজন লেখক। হাঙ্গেরির জন্য তিনি ছিলেন একজন দন জিওভান্নি— ছয়ফুট লম্বা, বিশাল ও বিস্ময়কর একজন মানুষ। তিনি এমনই আকর্ষণীয় ছিলেন যে তাঁকে কেউ এড়াতে পারত না।

প্রশ্নকর্তা: তাঁর বাক্যগুলো কেমন ছিল?

ক্রাসনাহোরকাই: তিনি অন্য গদ্যশিল্পীদের চাইতে ভিন্নভাবে তাঁর বাক্য নির্মাণ করতেন। তাঁকে সবসময় একজন দুঃখী মাতালের মতো মনে হত, যাঁর জীবন নিয়ে কোনো মোহ ছিল না, যিনি খুবই শক্তিশালী, যদিও তাঁর সেই শক্তিমত্তার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। তবে Krúdy আমার সাহিত্যিক আদর্শ ছিলেন না। তবে তিনি এমন একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যিনি আমাকে শক্তি দিয়েছিলেন যখন আমি লিখতে শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। János Pilinszky আমার আরেক কিংবদন্তি-পুরুষ ছিলেন। সাহিত্যিক বিবেচনায় Pilinszky তাঁর ভাষা ও গল্প বলার ধরনের জন্য আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। আমি তাঁকে অনুকরণ করতে চাইতাম। 'প্রিয় অ্যাডাম' আমাদের কেয়ামতের জন্য অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই,  আমরা তার মধ্যেই আছি, প্রিয় অ্যাডাম কোথাও যাবেন না দয়া করে— কোত্থাও না...

খুবই উচ্চস্বর, কিন্তু শব্দের মধ্যেকার এইসব যদিগুলোর কারণে ধীরস্থির এবং প্রতিটি শব্দের শেষ অক্ষরগুলো খুবই জোরালোভাবে ব্যবহৃত। অনেকটা সমাধিগহ্বরে উপবিষ্ট পুরোহিতের মতো, আপাত-নিরাশ, অথচ গভীরভাবে আশাবাদী। কিন্তু তিনি Gyula Krúdyi-এর চেয়ে আলাদা ছিলেন। Pilinszky ছিলেন ভেড়ার মতো। মানুষ নন— ভেড়া।

প্রশ্নকর্তা: বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদ কেমন পাওয়া যেত তখন?

ক্রাসনাহোরকাই: তখন একটা সময় ছিল, বিশেষ করে সাতের দশকে, যখন পশ্চিমা সাহিত্যের প্রচুর অনুবাদ পাওয়া যেত। উইলিয়াম ফকনার, ফ্রানৎস কাফকা, রিলকে, আর্থার মিলার, জোসেফ হেলার, মার্সেল প্রুস্ত, স্যামুয়েল বেকেট— প্রায় প্রত্যেক সপ্তাহেই একটা করে মাস্টারপিস পেতাম আমরা। কমিউনিস্ট শাসনে নিজেদেও কাজ প্রকাশ করতে না পেরে সব বড় লেখক ও কবিই অনুবাদক বনে গিয়েছিলেন। সেজন্যই আমরা শেকসপিয়ার, দান্তে, হোমার এবং ফকনার থেকে শুরু করে আমেরিকান সব বড় লেখকের অনুবাদই পেয়েছিলাম। Pynchon-এর Gravity’s Rainbow-এর প্রথম অনুবাদটিতো অসাধারণ ছিল।

প্রশ্নকর্তা: আর দস্তয়েফ্স্কি?

ক্রাসনাহোরকাই: হ্যাঁ। দস্তয়েফ্স্কির বিশাল প্রভাব ছিল আমার ওপর— সেটা তাঁর নায়কদের জন্য, গল্প কিংবা শৈলীর কারণে নয়। তাঁর White Nights গল্পের কথকের কথা মনে আছে আপনার? অনেকটা The Idiot এর মিশকিনের মতো, বলা যেতে পারে মিশকিনের পূর্বসূরি। আমি এই কথক এবং পরে মিশকিনের অন্ধ অনুরাগী ছিলাম— বিশেষ করে তাদের প্রতিরোধহীনতার। এই প্রতিরোধহীনতাটুকু যেন ছিল দেবোচিৎ। আমার লেখা প্রতিটি উপন্যাসে আপনারা এমন একটি চরিত্র পাবেন— যেমন Satantango-এর Estike কিংবা Melan cholyi Valuska , যারা পৃথিবী দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত। তাদের এই আঘাত পাওয়ার কথা নয়, এবং আমি তাদেরকে ভালোবাসি কারণ তারা এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে যেখানে সবকিছুই চমৎকার, এমনকি মানবঅস্তিত্বও, এবং আমি তারা যে বিশ্বাসী এই সত্যটিকেও সম্মান করি। যদিও পৃথিবী সম্পর্কে, মহাজগৎ সম্পর্কে তারা যেভাবে ভাবে, এবং নিষ্পাপতায় তাদের যে বিশ্বাস, সেটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

আমার বিশ্বাস, আমরা বরং জন্তুর পৃথিবীতে বাস করি। আমরাও জন্তু, তবে জিতে যাওয়া জন্তু। তারপরও আমরা একটা ভীষণভাবে anthropomorphic পৃথিবীতেই বাস করি, যেখানে আমরা বিশ্বাস করি, মানবজাতির পাশাপাশি জন্তু, বৃক্ষ ও পাথরের জন্যও জায়গা রয়েছে। কিন্তু এটা সত্য নয়। 

প্রশ্নকর্তা: আপনার জীবনদর্শন তাহলে পুরোপুরিই বস্তুবাদী?

ক্রাসনাহোরকাই: না, তা নয়, মিশকিনও সমান বাস্তব। দুঃখিত।

প্রশ্নকর্তা: ঠিক আছে, এ বিষয়ে আরেকটু বলুন।

লাসলো ক্রাসনাহোরকাইক্রাসনাহোরকাই: ফ্রানৎস কাফকা একজন ব্যক্তি। তাঁর জীবন, তাঁর গল্প সব নিয়েই তিনি ফ্রানৎস কাফকা। কিন্তু K. সেখানে রয়েছেন, মহাজগতের এক স্বর্গীয় স্থানে, এবং সম্ভবত আমার উপন্যাসের কিছু চরিত্রও সেখানে বাস করে। উদাহরণস্বরূপ, Irimiás ও Satantango-এর Mr. Eszter এবং Melancholy-এর Valuska অথবা আমার নতুন উপন্যাসের Baron। তারা খুবই সত্য, তারা বেঁচেবর্তে থাকে। তারা এই শাশ্বত পরিসরেরই অংশবিশেষ।

আপনি হয়তো তর্ক করবেন, মিশকিন তো কাল্পনিক চরিত্র। নিশ্চয়ই। কিন্তু এটা আসল সত্য নয়। মিশকিন হয়তো কারও মাধ্যমে, এক্ষেত্রে দস্তয়েফ্স্কির মাধ্যমে বাস্তব পৃথিবীতে প্রবেশ করেছে, কিন্তু এখন, আমাদের জন্য সে একটি সত্যিকার মানুষ। তথাকথিত ধ্রুপদী উপন্যাসসমূহের প্রতিটি চরিত্রই সাধারণ মানুষের ভেতর থেকেই তৈরি হয়েছে। এটি একটি গোপন প্রক্রিয়া, কিন্তু আমি শতভাগ নিশ্চিত যে তা সত্য। যেমন, আমি Satantango লেখার কয়েকবছর পর, একটি পানশালায় কেউ একজন আমার পিঠে টোকা দেয়। সে ছিল Satantango-এর Halics। সত্যি! আমি রসিকতা করছি না। সেজন্যই আমি কী লিখছি সে বিষয়ে খুব সতর্ক থাকি এখন। উদাহরণস্বরূপ বলতে পারি, আমার War and War উপন্যাসের আদিরূপটা প্রকাশিত রূপের চেয়ে খুবই আলাদা। আদিতে প্রথম একশত পৃষ্ঠার উপজীব্য ছিল Korin এর আত্মধ্বংসের বর্ণনা, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল যে, আমি হয়তো পরে এইরূপেই তার সাক্ষাৎ পাব এবং তাকে কোনো সাহায্য করতে পারব না। আমি এমন সম্ভাবনায় ভীত হয়ে উঠেছিলাম সে হয়তো কোনোদিনই তার এই ছোট শহরটা ছেড়ে যাবে না। সেজন্যই আমি তাকে সেখান থেকে বার করে এনেছিলাম, জীবনের শেষপ্রান্তে একবারের জন্য হলেও তার পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে গমনের ইচ্ছার বাস্তবায়ন দেখাতে। আমি এমন সিদ্ধান্ত নিইনি যে সেটা নিউইয়র্ক হবে, তবে এর মাধ্যমেই আমি তাকে আমার গল্পের বাস্তবতা থেকে বার করে এনেছিলাম, যেখানে সে একটা ছোট্ট প্রাদেশিক শহরেই আটকে ছিল সারাটি জীবন।

প্রশ্নকর্তা: আপনি যে বললেন মানুষ একটা anthropomorphic পৃথিবীতে বাস করে, আমি সেটা নিয়ে ভাবছি। কেননা আমার মাঝেমাঝে মনে হয় উপন্যাসসমূহই কী নিশ্চিন্তরকম মানবকেন্দ্রিক তথা anthropocentric। এখানে octopi-রা কোথায়? কোথায় algaeiv? আপনার উপন্যাসের এই একটা বিষয় আমার খুব পছন্দের যে, তারা সেরকম, অর্থাৎ প্রাদেশিকরকম মানবিক হয়ে উঠতে চায় না। তবে সেটাকে অনেকটা oxymoron বলেই মনে হয়। কেননা তারা এছাড়া আর কীইবা হতে পারে?

ক্রাসনাহোরকাই: এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। উপন্যাসের কাঠামোটা হয়তো একটু বেশিই মানবকেন্দ্রিক। যেকারণে ন্যারেটর তথা আখ্যানকর্তার সমস্যাটাই প্রথম সমস্যা, এবং সেটা শেষপর্যন্ত সেরকমই থেকে যায়। আপনি একটি উপন্যাস থেকে তার আখ্যানকর্তাকে কীভাবে বাদ দিতে পারেন? আমার সর্বসাম্প্রতিক উপন্যাসটির প্রতিটি পৃষ্ঠায় লোকেরা অপর লোকদের সঙ্গে কথাই বলে কেবল— আর সেটা একটা উপায় আখ্যানকারীকে বাদ দেওয়ার, কিন্তু এটা তো একটা কৌশলমাত্র। কেননা আমি আপনার সঙ্গে সহমত যে, উপন্যাসের কাঠামো এবং গোটা পৃথিবীটই মানবকেন্দ্রিক। কিন্তু আমাকে যদি কাঠামোবিহীন একটি পৃথিবী ও কাঠামোসমেত মানবজাতিকে বেছে নিতে হয়, আমি মানুষের পক্ষেই থাকব। 

বিশ্বজগৎটা আসলে কেমন সে-সম্পর্কে আমাদের ধারণা নেই। জ্ঞানী লোকেরা আমাদেরকে সবসময়ই বলেছেন, এটাই প্রমাণ যে তোমার খুব বেশি ভেবে কোনো লাভ নেই, কেননা চিন্তা আমাদেরকে কোথাও নিয়ে যায় না। আপনি কেবল ভুল বোঝাবুঝির এই বিশাল কাঠামো, সংস্কৃতি বলি আমরা যাকে, তার আয়তন বাড়িয়ে চলেন। সংস্কৃতির ইতিহাসই হচ্ছে বড় বড় চিন্তাবিদদের ভুল বোঝাবুঝির ইতিহাস। আমাদের তাই বারবারই শূন্যবিন্দুতে ফিরে যেতে হয় এবং ভিন্নভাবে শুরু করতে হয়। এবং হয়তোবা সেভাবে আপনার একটা সুযোগ হয়, বুঝে উঠতে না পারলেও, অন্তত নতুন ভুল বোঝাবুঝির হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার। এটাই যেহেতু এই প্রশ্নের অপর পিঠ, তাহলে আমরা কি এতই সাহসী যে মানবসংস্কৃতিকে খারিজ করে দেব? মানুষের সৃষ্টির সৌন্দর্যের প্রশংসা করা বন্ধ করে দেব? না বলাটা আসলেই খুব কঠিন।