তানিম নূরের ‘উৎসব’ এবং ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ বাংলা চলচ্চিত্রে সাহিত্যনির্ভর চিত্রনাট্যের অনন্য সংযোজন। এই সাফল্যের নেপথ্যের কারিগরদের মধ্যে অন্যতম চিত্রনাট্যকার সামিউল ভূঁইয়া। উপন্যাসকে চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়ার অভিজ্ঞতা ও ভাবনা নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন হেমায়েত উল্লাহ ইমন।
হেমায়েত উল্লাহ ইমন: চিত্রনাট্য লেখার শুরুটা কীভাবে?
সামিউল ভূঁইয়া: লিখছি সেই ছোটোবেলা থেকেই। স্কুল জীবন থেকেই নিজের ব্যক্তিগত ব্লগেই লিখতাম। শুরুটা ছোটোগল্প দিয়ে। সেই সাথে লিখতাম ইতিহাস, সংস্কৃতি আর নৃতত্ত্ব নিয়ে আর্টিকেল। তবে আমার ক্ষেত্রে চিত্রনাট্য লেখার শুরুটা একদম কাকতালীয় ব্যাপার বলা যায়। সময়টা ২০২১, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়েছি মাত্র। যেহেতু অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেছি, স্বভাবতই পরিবার থেকে বলছিল সরকারি চাকরি অথবা ব্যাংকিং সেক্টরে ক্যারিয়ার গড়তে। চেষ্টা যে করিনি তা নয়। এক টেক কোম্পানিতে চাকরিও করেছি কিছু সময়। তবে মন সায় দিচ্ছিল না। চাকরি ছেড়ে দিয়ে শিক্ষিত বেকার হয়ে থাকলাম প্রায় ৫ মাস শুধু সুযোগের অপেক্ষায়। সত্যি কথা বলতে সে সময়টা বেশ হতাশায় কেটেছে। তবে আশা হারাইনি। লেখার নেশাটা সে সময় আরো জেঁকে বসে। একদিন হঠাৎ আমার বন্ধু মোন্তাসির কল করে জানাল একজন পরিচালক নতুন লেখক খুঁজছেন। একদম ফ্রেশ মাইন্ড। পরিচালকের নাম আবু শাহেদ ইমন। তার সাথে দেখা করলাম। তিনি তার আইডিয়াটা শেয়ার করলেন। আমি এক সপ্তাহ সময় নিয়ে পুরো গল্পটার একটা গঠন দাঁড় করালাম। তিনি আমার লেখায় বেশ মুগ্ধ হলেন। তারপর ৬ মাস টানা লিখে গেলাম। গল্প থেকে চিত্রনাট্য আর চিত্রনাট্য থেকেই সেই ওয়েব সিরিজ ‘মারকিউলিস’। বিশাল স্টারকাস্টে ভরপুর একটা সিরিজ। যদিও দর্শকের মনে জায়গা করে নিতে পারেনি। ব্যর্থতার কষ্ট আজও আমি বয়ে বেড়াই। তবে নিজের লেখা গল্প, চিত্রনাট্য আর সংলাপ পর্দায় দেখতে পেয়ে এক অদ্ভুত তৃপ্তি পাই। ভাবলাম, এইটাই তো আমার স্বপ্ন ছিল। তারপর থেকে লেখা থামাইনি এক মুহূর্তের জন্যও।
প্রশ্ন: অর্থনীতি বিভাগের ক্লাসরুম থেকে বড়পর্দা—সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই জগৎ। নিজেকে এই ট্রানজিশনের জন্য কীভাবে তৈরি করেছেন?
উত্তর: সাহিত্য-সিনেমার পোকা ছিলাম সেই বাচ্চাকাল থেকেই। টিভিতে বাংলা সিনেমা দেখা থেকে শুরু—নানাবাড়িতে প্রতি শুক্রবার দুপুরে দেখতাম। তারপর শৈশব আর কৈশোর জুড়ে ভিসিআর, সিডি, ডিভিডি এবং শেষে ইন্টারনেটে সিনেমা দেখা। এত এত সিনেমা দেখে শুরুতেই ভাবতাম সিনেমা আসলে লিখে কীভাবে। আমার বংশের কেউ বিনোদন জগতের সাথে যুক্ত ছিলেন না। তাই সে বিষয়ে কাছ থেকে দেখে শেখার প্রশ্নই আসে না। তবে আমার নানা লেখালেখি করতেন। তাকে দেখেই লেখার ইচ্ছাটা জেগে ওঠে। ছাত্র হিসেবে ভালোই ছিলাম। উচ্চশিক্ষা শেষ করাই ছিল মূল লক্ষ্য। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির মতো বিষয়ে পড়ালেখার সুযোগটা আমার জীবনের মোড় বদলে দেয়। আনু মুহাম্মদ স্যার এবং আসরার চৌধুরী স্যার ছিলেন আমার প্রিয় দুইজন শিক্ষক। আমাদের নবীনবরণের দিন ডিপার্টমেন্ট চেয়ারম্যান স্যার একটা কথা বলেছিলেন— “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ালেখায় কতটুকু ভালো সেটা বলতে পারছি না; তবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, প্রকৃতি এবং মানুষজন এমন যে এখান থেকে তুমি চাইলেই সংস্কৃতিমনা, সৎ এবং পরিশ্রমী মানুষ হয়েও বের হতে পারবে আবার চাইলে খারাপ মানুষ হয়েও বের হতে পারবে। তাই সিদ্ধান্ত তোমার, তুমি কী হতে চাও।” উনার এই কথাটা মনে গেঁথে যায়। মস্তিষ্ক পড়ে থাকতো অর্থনীতি বিষয়ের নানা মারপ্যাঁচে আর মনটা পড়ে থাকতো জাহাঙ্গীরনগরের প্রকৃতিতে। ক্লাস শেষেই চষে বেড়াতাম পুরো বিশ্ববিদ্যালয়। আর সময় পেলেই বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেরিয়ছি সারা বাংলাদেশ। ভ্রমণ আর বন্ধুরা আমাকে পৃথিবীটাকে নতুন করে চেনায়। সেটাই আমার মানসিকতা বদলে দেয়। নিজের মনের ইচ্ছাটাকে ছোট করে দেখিনি আর কোনোদিন। তাই পড়াশোনার পাট চুকিয়ে লেখক হবার স্বপ্ন পূরণে নেমে পড়ি একরকম জেদ করেই। ভয়ও ছিল; লেখাকে পেশা হিসেবে নেয়া আমাদের দেশে বেশ ঝুঁকির। সংশয় ছিল ক্যারিয়ারে মুখ থুবড়ে পড়ার। কিন্তু অভয় দিয়েছেন আমার বড় ভাই শাম্স। তার আস্থা ও সমর্থনের কারণেই চালিয়ে গিয়েছি লেখা।
প্রশ্ন: 'আ ক্রিসমাস ক্যারল' অবলম্বনে 'উৎসব' ও 'কিছুক্ষণ' অবলম্বনে 'বনলতা এক্সপ্রেস'—এই দুই টেক্সটের অভ্যন্তরীণ মনস্তত্ত্বকে দৃশ্যমান করার জন্য কী ধরনের সিনেম্যাটিক কৌশল ব্যবহার করেছেন?
উত্তর: ‘উৎসব’ আর ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ এই দুটো সিনেমার ন্যারেটিভ স্ট্রাকচার লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন যে দুইটি সিনেমায় আমরা একটা নতুন ন্যারেটিভ স্টাইল তৈরি করার চেষ্টা করেছি। কারণ সাহিত্য আর সিনেমার গল্প বলার ধরনে সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। সাহিত্য শব্দের মাধ্যমে চরিত্রের ভেতরের জগৎ খুলে দেয়, কিন্তু সিনেমায় সেটাকে দৃশ্য, শব্দ ও নীরবতা দিয়ে বোঝাতে হয়। এখানেই মূল চ্যালেঞ্জটা।
‘উৎসব’-এর ক্ষেত্রে আমরা মূলত চরিত্রের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনকে দেখানোর জন্য ভিজ্যুয়াল কনট্রাস্ট ব্যবহার করেছি। যেমন : আলো-আঁধারির ব্যবহার, ফ্রেমের ভেতরে একাকিত্ব তৈরি করা, এবং সময়ের পরিবর্তন বোঝাতে ট্রানজিশন। দর্শকদের কাছে গল্পটির পুরো চিত্র তুলে ধরতে অতীত প্রেক্ষাপটগুলোর ক্ষেত্রে ন্যারেশন বা ভয়েস ওভার ব্যবহার করেছি। চরিত্রের মানসিক অবস্থার সাথে পরিবেশকে মিলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি, যেন দর্শক সংলাপ ছাড়াই তার ভেতরের টানাপড়েন বুঝতে পারে।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এ সময় এবং স্মৃতিকে খুব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে ন্যারেটিভটা লিনিয়ার না রেখে খানিকটা ভাঙা কাঠামোয় রাখা হয়েছে, যাতে দর্শক নিজেই টুকরো টুকরো অংশ জোড়া দিয়ে গল্পটা অনুভব করে। ট্রেন যাত্রাটাকে আমরা শুধু বাহ্যিক ভ্রমণ হিসেবে রাখিনি, বরং এটা একধরনের মনস্তাত্ত্বিক যাত্রাও যেখানে চরিত্র নিজের ভেতরে ফিরে যায়।
দুটো কাজেই একটা জিনিস সচেতনভাবে করেছি—সংলাপ আর ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং এর ভারসাম্য রক্ষা। কারণ আমি বিশ্বাস করি, ভালো সিনেমা কখনো সব কিছু বলে না; কিছু জায়গা ফাঁকা রাখে, যাতে দর্শক নিজে ভাবতে পারে।
প্রশ্ন: হুমায়ূন আহমেদের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য তার সূক্ষ্ম উইট ও হিউমার। এসবের ভারসাম্য কীভাবে করেছেন?
উত্তর: হুমায়ূন আহমেদের উইট ও হিউমারটা আসলে খুবই সূক্ষ্ম। চরিত্র, পরিস্থিতি ও সংলাপের ভেতর দিয়ে স্বাভাবিকভাবে এসব চলে আসে। তাই স্ক্রিপ্টে এই টোনটা ধরে রাখতে প্রথমেই আমি চেষ্টা করেছি তার লেখার ‘সরলতা’ বজায় রাখতে। সংলাপকে কখনোই অতিরিক্ত চটকদার বা নাটকীয় করিনি; দৈনন্দিন জীবনের খুব সাধারণ কথোপকথনের ভেতরেই হিউমারটা খুঁজে নিয়েছি।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ‘পজ’ বা নীরবতার ব্যবহার। অনেক সময় সরাসরি মজার সংলাপের চেয়ে একটা অপ্রত্যাশিত বিরতি বা চরিত্রের রিঅ্যাকশনই হাস্যরস তৈরি করে; এই জায়গাটাকে আমি সচেতনভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি।
চরিত্র নির্মাণেও গুরুত্ব দিয়েছি। হুমায়ূন আহমেদের গল্পে প্রতিটা চরিত্রের নিজস্ব একটা ছন্দ থাকে, তাদের আচরণ, কথা বলার ধরন; সবকিছু মিলিয়েই হিউমার তৈরি হয়। তাই চরিত্রগুলোকে বাস্তব ও স্বতন্ত্র রাখার চেষ্টা করেছি, যেন তারা নিজেরাই পরিস্থিতি থেকে হাস্যরস বের করে আনতে পারে।
সবশেষে, আমি ইচ্ছাকৃতভাবে ‘ওভার এক্সপ্লেইন’ করা এড়িয়ে গেছি। কারণ এই ধরনের হিউমার তখনই ভালো কাজ করে, যখন দর্শক নিজে বুঝে নেয়।
প্রশ্ন: দুটি সিনেমাতেই কিছু চরিত্রে পরিবর্তন বা মডিফিকেশন দেখা যায়। এই সিদ্ধান্ত কি সেন্সর, নির্দিষ্ট দর্শকের কথা চিন্তা করে নাকি অন্য কোনো সৃজনশীল প্রয়োজন থেকে এসেছে?
উত্তর: চরিত্রে পরিবর্তন বা মডিফিকেশন করার সিদ্ধান্তটা কোনো একক কারণে আসেনি। একাধিক বাস্তব ও সৃজনশীল প্রয়োজনের সমন্বয় থেকে এসেছে বলা যায়। প্রথমত, সাহিত্য থেকে সিনেমায় রূপান্তরের সময় গল্প বলার ভাষা বদলে যায়—যেটা লিখে বোঝানো যায়, সেটাকে পর্দায় বিশ্বাসযোগ্য ও কার্যকর করতে অনেক সময় চরিত্রে সামান্য পরিবর্তন আনতেই হয়।
দ্বিতীয়ত, সিনেমা একটা ভিজ্যুয়াল ও সময়সীমাবদ্ধ মাধ্যম। তাই ন্যারেটিভকে সংক্ষিপ্ত, গতিশীল এবং দর্শকবান্ধব রাখতে কিছু চরিত্রকে সরল করা, কিছু বৈশিষ্ট্য কমানো বা বাড়ানো—এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
সেন্সর বা নির্দিষ্ট দর্শকের বিষয়টাও পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। আমাদের প্রেক্ষাপটে একটা নির্দিষ্ট দর্শকগোষ্ঠী মাথায় রেখে কাজ করতে হয়, যাতে গল্পের মূল ভাব অক্ষুণ্ন রেখে সেটাকে গ্রহণযোগ্য রাখা যায়।
তবে সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল সৃজনশীল প্রয়োজন। গল্পের আবেগ, থিম এবং চরিত্রের যাত্রাকে আরও স্পষ্ট ও প্রভাবশালী করার জন্যই এই পরিবর্তনগুলো করা হয়েছে।
অনেক দর্শক কিছুক্ষণ উপন্যাসের মওলানা চরিত্রটিকে বদলে আজিজ নামের একজন সাধারণ রক্ষণশীল ব্যক্তি হয়েছে। এর কারণ হলো, আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। শুধু ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা মানুষই রক্ষণশীল না। এর বিস্তৃতি আরও ব্যাপক। রক্ষণশীলতা আমি লক্ষ্য করেছি সমাজের প্রতিটি শ্রেণি পেশার মানুষের মাঝে। বড় পর্দায় তাই এই বিষয়টিকে ইউনিভার্সাল রূপ দেয়ার জন্য মওলানা চরিত্রটিকে বদলে ফেলা।
প্রশ্ন: মূল টেক্সটের প্রতি ‘বিশ্বস্ততা' এবং সৃজনশীল স্বাধীনতার মধ্যে আপনি কতটুকু ভারসাম্য বজায় রাখতে পেরেছেন বলে মনে করেন?
উত্তর: আমার কাছে ‘বিশ্বস্ততা’ মানে হুবহু ঘটনাক্রম বা সংলাপ ধরে রাখা না; বরং মূল টেক্সটের আবেগ, থিম আর চরিত্রের আত্মাকে অক্ষুণ্ন রাখা। সেই জায়গাটাকে আমি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি।
একই সঙ্গে এটা মাথায় ছিল যে সিনেমা একটা আলাদা মাধ্যম, যার নিজস্ব ভাষা আছে। তাই চিত্রনাট্যে কাজ করার সময় যেখানে প্রয়োজন হয়েছে, সেখানে সৃজনশীল স্বাধীনতা নিয়েছি। যেটা আসলে ন্যারেটিভের গতি ঠিক রাখা, দৃশ্যমানতা বাড়ানো এবং চরিত্রের আর্ককে আরও পরিষ্কার করার জন্য।
চেষ্টা ছিল যেন পরিবর্তনগুলো কখনোই মূল গল্পের উদ্দেশ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, বরং সেটাকে আরও শক্তিশালী করে। দর্শক যেন গল্পটা নতুনভাবে অনুভব করতে পারে, কিন্তু ভেতরের সত্তাটা একই থাকে।
আমি বলব, বিশ্বস্ততা আর সৃজনশীলতার মধ্যে একটা ব্যালান্স তৈরি করতে পেরেছি। যেখানে গল্পের আত্মা ঠিক রেখে, সিনেমার ভাষায় সেটাকে নতুনভাবে বলা গেছে।
প্রশ্ন: আপনাদের (আয়মান আসিব স্বাধীন) দুজনের মধ্যে ক্রিয়েটিভ বোঝাপড়াটা কীভাবে তৈরি হয়েছে?
উত্তর: আমাদের ক্রিয়েটিভ বোঝাপড়াটা খুব পরিকল্পিতভাবে তৈরি হয়নি; কাজ করতে করতেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। আমি আর স্বাধীন দুজনই চিন্তার দিক থেকে একই ঘরানার মানুষ। আমাদের চলচ্চিত্র দর্শনও খুব কাছাকাছি। শুরু থেকেই আমরা দুজনই গল্পের প্রতি সৎ থাকার চেষ্টা করেছি, আর ইগোটা বাইরে রাখার একটা অঘোষিত নিয়ম ছিল। আইডিয়া নিয়ে দ্বিমত হয়েছে খুব কম, যতটুকু হয়েছে সে জায়গাগুলোতেই আসলে কাজটা আরও ভালো হয়েছে কারণ আমরা দুজনই যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতাম, এবং যেটা গল্পের জন্য ভালো মনে হতো সেটাকেই শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করতাম।
আমাদের কাজের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ‘ওপেন কমিউনিকেশন’। আমরা একে অপরের লেখা খুব খোলামেলাভাবে ক্রিটিক করতাম, আবার প্রয়োজন হলে একে অপরের আইডিয়াকে আরও ডেভেলপ করতাম। এই পারস্পরিক আস্থা থেকেই বোঝাপড়াটা শক্ত হয়েছে।
প্রশ্ন: পরিচালক তানিম নূরের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা…
উত্তর: পরিচালক তানিম নূর ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও বেশ চমৎকার। একজন পরিচালক যখন লেখার ভেতরের সম্ভাবনাটা বুঝতে পারেন, তখন পুরো প্রসেসটাই অনেক সহজ হয়ে যায়। স্ক্রিপ্ট নিয়ে বসে লম্বা সময় আলোচনা, দৃশ্যের ভিজ্যুয়াল কল্পনা করা এবং আমাদেরকে স্বাধীনতা দেয়ার কাজটায় তানিম ভাই একশতে একশ পাবেন। তার এই সহযোগিতামূলক জায়গাটা খুব উপভোগ করেছি।
একটা মজার অভিজ্ঞতা বলি— ‘উৎসব’ লেখার সময় একটা ড্রাফটে আমার লেখা একটি সিন আমার ভালো লাগছিল না। আমি সেটা ডিলিট করে দেই। তবে স্বাধীন সেটা খুঁজে বের করে। সেই সিনটা স্বাধীনের খুবই ভালো লেগেছিল। আমাকে না জানিয়েই পরবর্তীতে সেই সিনটা ফাইনাল ড্রাফটে জুড়ে দেয় সে। সিনেমা মুক্তির পর সেই সিনটাই সবার খুব ভালো লেগেছে।
আর চ্যালেঞ্জিং দিকটা ছিল সময়সীমা। ডেডলাইনের মধ্যে থেকে কোয়ালিটি ধরে রাখা সহজ না। তবে সেই চাপটাই আমাদের আরও ফোকাসড হতে সাহায্য করেছে।
পারস্পরিক সম্মান, খোলামেলা আলোচনা আর গল্পকে প্রাধান্য দেওয়ার মানসিকতা—এই তিনটা জিনিসই আমাদের ক্রিয়েটিভ বোঝাপড়ার ভিত্তি।
প্রশ্ন: অ্যাডাপ্টেশন করতে গিয়ে এমন কোনো দৃশ্য বা অংশ কি বাদ দিতে হয়েছে, যা ব্যক্তিগতভাবে আপনার প্রিয় ছিল?
উত্তর: হ্যাঁ, বিশেষ করে এমন কিছু মুহূর্ত ছিল, যেগুলো সাহিত্যিকভাবে খুব শক্তিশালী—কিন্তু পর্দায় সেই একই ইমপ্যাক্ট তৈরি করছিল না, বা ন্যারেটিভের গতিকে ধীর করে দিচ্ছিল।
সিনেমার একটা বাস্তব সীমাবদ্ধতা আছে—সময়। সবকিছু রাখা সম্ভব না। তাই অনেক সময় প্রিয় অংশগুলোও বাদ দিতে হয়েছে শুধু গল্পটাকে আরও টাইট এবং ফোকাসড রাখার জন্য।
সিদ্ধান্তটা সহজ ছিল না, কারণ লেখক হিসেবে ওই দৃশ্যগুলোর সাথে একটা আবেগ তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেকে মনে করিয়েছি—এটা ব্যক্তিগত ভালো লাগার জায়গা না, এটা পুরো গল্পের স্বার্থের প্রশ্ন। যেটা গল্পকে এগিয়ে নেয় না, যতই প্রিয় হোক, সেটাকে ছেড়ে দিতেই হবে।
কঠিন ছিল, কিন্তু প্রয়োজনীয়—কারণ ভালো সিনেমা বানাতে কখনো কখনো নিজের প্রিয় জিনিসকেও ত্যাগ করতে হয়।
প্রশ্ন: বর্তমানে কোন চিত্রনাট্যে কাজ করছেন?
উত্তর: বর্তমানে আমি কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে শাকিব খানের ‘রকস্টার’ সিনেমার সংলাপ লিখছি। পাশাপাশি তানিম ভাইয়ের সঙ্গে আরও কয়েকটি প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। যেহেতু তার হাত ধরেই আমার বড় পর্দায় আসা, তাই তার ভিশনটাকে আরও দৃঢ়ভাবে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছি।
এছাড়াও নতুন কিছু প্রজেক্টের প্রস্তাব এসেছে। আমি আসলে নিজেকে নির্দিষ্ট কোনো জনরার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না—ভালো গল্প, দক্ষ পরিচালক এবং শক্ত টিম পেলেই কাজ করতে আগ্রহী।
সিনেমার পাশাপাশি আবার ওয়েব সিরিজ লেখার দিকেও মনোযোগ দিচ্ছি। তবে আমার কাছে সংখ্যার চেয়ে গুণগত মানটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ—কম কাজ করলেও ভালো কাজ করতে চাই।
প্রশ্ন: আপনার ‘ড্রিম প্রজেক্ট' কী—কোন গল্প বা লেখাকে আপনি ভবিষ্যতে বড়পর্দায় আনতে চান?
উত্তর: আমার আসলে শুরুটা ছিল ঔপন্যাসিক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু কাজ করতে করতেই বড় পর্দার জগতে ঢুকে পড়েছি। তবুও উপন্যাস লেখার ইচ্ছাটা এখনো আছে—এই বছরই সেই কাজে হাত দিতে চাই।
ব্যক্তিগতভাবে আগামী তিন বছর আমি সিনেমা লেখা এবং ফিল্মমেকিংয়ের প্রতিটি ধাপ খুব কাছ থেকে শিখতে চাই। এই সময়টাকে আমি নিজের জন্য প্রস্তুতির সময় হিসেবে দেখছি। এরপর যদি নিজেকে যথেষ্ট প্রস্তুত মনে হয়, তাহলে পরিচালনায় আসার ইচ্ছা আছে। না হলে লেখালেখিই চালিয়ে যাব।
এছাড়াও আমার নিজের লেখা একটি ড্রামা জনরার মৌলিক গল্প আছে, যেটাকে একসময় বড় পর্দায় রূপ দিতে চাই।
এখন শেখা আর লেখার সময়—ভবিষ্যতে সুযোগ ও প্রস্তুতি মিললে পরিচালনায় আসা, আর নিজের গল্পকে পর্দায় দেখা—এইটাই ড্রিম।