‘উইমেনস প্রাইজ ফর ফিকশন’ বিজয়ী ভার্জিনিয়া ইভানসের সাক্ষাৎকার

মার্কিন ঔপন্যাসিক ভার্জিনিয়া ইভানস তার উপন্যাস ‘দ্য করেসপন্ডেন্ট’-এর জন্য ২০২৬ সালের উইমেনস প্রাইজ ফর ফিকশন জিতেছেন। উপন্যাসটি লেখককে অপ্রত্যাশিত সাফল্য এনে দিয়েছে। কেন এমন হয়েছে, তা বোঝাও কঠিন নয়। উপন্যাসটিতে রূপ বদলানো কোনো চরিত্র নেই, নেই টাইমট্রাভেলার্সও। কোনো তরুণীর খুন বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও নেই। সাংস্কৃতিক-যুদ্ধের মতো সমকালীন বিতর্কও নেই। তাছাড়া গল্প বা চরিত্রগুলোর মধ্যে আরামদায়ক বা ‘কোজি’ কোনো আবহও নেই।

উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সিবিল মেরিল্যান্ডের একটি সাধারণ বাড়িতে একা বসবাস করা অবসরপ্রাপ্ত এক আইনজীবী। বইটির দৈর্ঘ্য খুব বেশি না হলেও এর কাহিনি প্রায় দশ বছরজুড়ে বিস্তৃত। এতে অন্তত এক ডজন ভিন্ন ভিন্ন কাহিনিসূত্র রয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অতীতের ইতিহাস, যা কিনা সিবিলের জন্ম পর্যন্ত পৌঁছে যায়। লেখক ও পাঠক উভয়ের জন্যই এত কিছু সামাল দেওয়া সহজ নয়।

এই সবকিছুই ঘটেছে পত্রোপন্যাসের সীমিত কাঠামোর মধ্যে, যা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয়। সংক্ষিপ্ত একটি ভূমিকাংশ ছাড়া পুরো উপন্যাসটিই চিঠির মাধ্যমে বলা হয়েছে। এখানে কোনো সংলাপ নেই, বর্ণনামূলক বিবরণ নেই, আখ্যানের ব্যাখ্যা নেই, নাটকীয় দৃশ্যও নেই।

উপন্যাসের শেষের দিকে একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সব চিঠিই হয় সিবিলকে লেখা, নয়তো সিবিলের লেখা। সব চিঠি কালানুক্রমিকভাবে সাজানো হয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, উপন্যাসটির কাঠামো অনেকটা চাকার কেন্দ্র ও কাঁটার মতো। এই বিন্যাস এমন এক যোগাযোগজালকে প্রাণবন্ত ও গতিশীল করে তুলেছে, যা অন্যথায় স্থবির হয়ে পড়তে পারত।

অনলাইন সাহিত্যপত্রিকা 'দ্য রাম্পাস'-এ প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন অ্যামি গাস্টিন।

চিঠির আকারে উপন্যাস লেখার ভাবনাটা আগে এসেছিল, নাকি এতগুলো উপকাহিনি ও ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা ছিল?

শুরুটা হয়েছিল চিঠি দিয়েই। এই ফর্মে লেখার কয়েকটি ভিন্ন উপায় ছিল। যেমন ‘৮৪’, ‘চ্যারিং ক্রস রোড’-এর মতো দুইজন মানুষের চিঠিপত্র নিয়ে লেখা যেতে পারে। আবার ‘দ্য কালার পার্পল’ বা জুলি শুমেকারের ‘ডিয়ার কমিটি মেম্বার্স’-এর মতো শুধু পাঠানো চিঠিগুলোও রাখা যেতে পারে।কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, প্রধান চরিত্র যে চিঠিগুলো লিখছে ও বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে যে চিঠিগুলো পাচ্ছে—দুটোই থাকলে তার জীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি তুলে ধরা সম্ভব হবে। সিবিলকে ভিন্ন ভিন্ন কোণ থেকে দেখানোর জন্য আলাদা আলাদা মানুষের প্রয়োজন ছিল, যেন তারা প্রত্যেকে আলাদা আয়না হয়ে ওঠে।

আমি খুব পরিকল্পনা করে কাজ করি না। তাই সরাসরি লেখায় নেমে পড়েছিলাম। গল্প এগোতে থাকলে নিজেকে জিজ্ঞেস করতাম, পাঠকের কী জানা দরকার, সিবিল সেটা কাকে বলতে পারে? কিংবা কে তাকে কী বলতে পারে? একজন বৃদ্ধাকে নিয়ে চিঠির বই খুব সহজেই একঘেয়ে হয়ে যেতে পারে। তাই প্রশ্ন ছিল, কাহিনিকে কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়। তবে বইটি কোনো নির্দিষ্ট প্লটের বদলে তার সমগ্র জীবন নিয়ে লেখা। তাই অতীতের কথাও বলতে হতো।

আমি চেয়েছিলাম অনেক মানুষকে গল্পে জড়িয়ে নিতে, যাতে তার জীবনের বিশালতাটা বোঝানো যায়। যদি সে শুধু তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুকেই চিঠি লিখত, তাহলে তাদের সম্পর্কের মধ্যেই গল্প সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু তার কর্মজীবন, বর্তমান জীবন, প্রেম, একজন পরামর্শদাতা ও মা হিসেবে তার পরিচয়—এসব তুলে ধরতে আরও অনেক চরিত্র দরকার ছিল। যেমন, সিবিল অবসরপ্রাপ্ত হওয়ায় তার পেশাজীবনের ধারণা দেওয়ার জন্য আমি উচ্চবিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে এনেছি, যে বিচারব্যবস্থা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করছে, ফলে তার সাক্ষাৎকার নিতে চায়। সব সময়ই একটা সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়েছে—যেন চিঠিগুলো সত্যিই মানুষের লেখা বাস্তব চিঠি বলে মনে হয়, বিশেষ করে বয়স্ক ও কিছুটা পুরোনো ধ্যানধারণার মানুষদের ক্ষেত্রে।

একসময় আমরা নিয়মিত চিঠি লিখতাম, পরে ফোনে কথা বলতে শুরু করলাম, এখন আবার ই-মেইল ও মেসেজের মাধ্যমে লেখালেখিতে ফিরে এসেছি। ই-মেইল ব্যবহারের সুযোগ কি বইটি লেখা সহজ করে দিয়েছে?

অবশ্যই। সিবিল সত্তরের কোঠায়, তার বয়স একশ হয়নি। তার একটি পেশাজীবন ছিল, তাই সে ই-মেইল ব্যবহার করবে, এটা স্বাভাবিক। তবে আমি মনে করিনি যে সে টেক্সট মেসেজ করবে। ই-মেইল তার জীবনে আরও বেশি সম্পর্ককে গ্রহণ করার সুযোগ করে দিয়েছে। যেমন, তার গার্ডেন ক্লাব তো প্রত্যেক সদস্যকে আলাদা করে ফোন করবে না; তারা একটি গ্রুপ ই-মেইল পাঠাবে।

অর্থাৎ, লেখার সময় প্রয়োজন অনুযায়ী আপনি সিবিলের সঙ্গে চিঠিপত্র আদান-প্রদান করা চরিত্রগুলো তৈরি করেছেন, যাতে পাঠকের সামনে তার জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা যায়?

ঠিক তাই। আমি চেয়েছিলাম গল্পটা যেন অনেকগুলো সুতোয় গাঁথা হলেও একটি শক্ত সুতোয় বাঁধা বলের মতো থাকে। পাঠকের আগ্রহ ধরে রাখতে এই সংহতি জরুরি ছিল।
তাই বারবার আগের ঘটনার দিকে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি ছিল, যেন পাঠক সব সময় মনে রাখতে পারেন কী ঘটছে এবং কী ঘটেছে। আমি জানতাম, শুরুতে যে সব কাহিনিসূত্র আনছি, সেগুলোর শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনো গুরুত্ব থাকতে হবে। গল্পের শুরুতে যা থাকবে, শেষেও তার অর্থ থাকতে হবে। গল্পকার হিসেবে আমরা এটা স্বভাবতই জানি।
আমি যখন ক্লেয়ার কিগানের কাছে লেখালেখি শিখছিলাম, তিনি এ বিষয়টিতে জোর দিতেন। তার কথা ছিল, গল্পের শুরুতে যা রাখবে, শেষ পর্যন্ত তার গুরুত্ব থাকতে হবে; নইলে তা রাখার প্রয়োজন নেই।

কিন্তু কিছু অসমাপ্ত দিক তো থাকবেই। ‘দ্য করেসপন্ডেন্ট’-এও কিছু কাহিনিসূত্র মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন, সিবিল যে সমস্যাগ্রস্ত তরুণকে সাহায্য করছে, সে কলেজে যায়, কিন্তু তার পরের জীবনের কথা আমরা আর জানি না। তাছাড়া সিবিলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর প্রতিবন্ধী ছেলে ও ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত স্বামী আছে, কিন্তু তাদের জীবনও বইয়ের পৃষ্ঠার বাইরে চলতে থাকে। তাই কোন কাহিনির সমাপ্তি টানতে হবে এবং কোনটা চলতে থাকবে, সেটাও ঠিক করতে হয়।

যদি এই উপন্যাসটিকে একটি টেলিভিশন মিনিসিরিজ হিসেবে ভাবেন, তাহলে প্রতিটি পর্ব সিবিলের একজন করে চিঠি-সঙ্গীকে কেন্দ্র করে হতে পারে। এই উপন্যাসে সিবিল হলো কেন্দ্র, অনেকটা সূর্যের মতো। অন্যরা গ্রহ। কিন্তু যদি হ্যারির জীবন নিয়ে লেখা হতো, তাহলে হ্যারিই হতো সূর্য, সিবিল হয়ে যেত একটি গ্রহ। আমি জানতাম, পাঠকেরা অন্য চরিত্রগুলোর জীবনের কেবল প্রান্তভাগই দেখতে পাবেন—সিবিলের জীবনের প্রেক্ষাপটে তাদের উপস্থিতি। এটাই আসলে মজার বিষয়। চাইলে অন্য প্রতিটি চরিত্রকে নিয়েও একই ধরনের গল্প লেখা যেত। কিন্তু আমি সিবিলকেই কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছি।

এটা আমাকে জুলিয়া ফিলিপসের ‘ডিসঅ্যাপিয়ারিং আর্থ’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। আমি একে ‘পালাবদলের উপন্যাস’ বলি, কারণ প্রতিটি অধ্যায়ে নতুন একজন চরিত্র গল্পের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

ডেভিড সালাইয়ের ‘টার্বুলেন্স’ বইটিও ঠিক এমন। বইটির প্রচ্ছদে লেখা আছে, ‘বারোজন যাত্রী পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ করছে। বারোজন আলাদা মানুষ, প্রত্যেকেই কোনো না কোনো অস্থিরতার মধ্যে আছে, আর প্রত্যেকের জীবন কোনো না কোনোভাবে পরের মানুষের সঙ্গে যুক্ত। তারা লন্ডন থেকে মাদ্রিদ, ডাকর থেকে সাও পাওলো, টরন্টো, দিল্লি, দোহা—এভাবে বারোটি বিমানযাত্রায় পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে।’ গল্পটিও এই বিমানযাত্রার সময় অনুযায়ী এগোয়। একটি গল্পে যে চরিত্রটি প্রান্তিক, পরের গল্পে সেই চরিত্রই কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বইটি অসাধারণ, আবার আকারেও ছোট, সহজে পড়া যায়।

আপনি কি অনেক চিঠি লিখেছিলেন, সব চিঠি কি বইয়ে আছে?

না, বেশিরভাগই আছে। সম্পাদনার সময় বাদ দেওয়ার বদলে আরও চিঠি যোগ করেছি।

নতুন লেখকদের ক্ষেত্রে সংলাপের মধ্যে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা ঢুকিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এখানে আমার মনে হয়েছিল, চিঠির মধ্যেও সেই ঝুঁকি ছিল। কিন্তু আপনি সেই ফাঁদে পড়েননি।

আমার চিন্তার অন্যতম প্রধান বিষয় হলো, সবকিছু বাস্তব মনে হচ্ছে কি না। পাঠের সময় হঠাৎ মনে হওয়া যে, ‘এটা তো কখনো ঘটতে পারে না’ বা ‘কেউ এভাবে কথা বলবে না’—এই অভিজ্ঞতাটা আমি একেবারেই পছন্দ করি না।

এটাও ক্লেয়ার কিগানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আপনি যখন একটি জগৎ তৈরি করেন, তখন পাঠক আপনাকে বিশ্বাস করে সেই জগতে প্রবেশ করে। কিন্তু যদি এক মুহূর্তের জন্যও পাঠক সেই জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে নিজের ঘরের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আমি এটা বিশ্বাস করছি না’, তাহলে পুরো প্রকল্পটাই ব্যর্থ হয়ে যায়।

আমার মনে হয়, কাহিনির সময়ক্রম যত সরল হবে, অধ্যায়ের শিরোনামের ওপর তত কম নির্ভর করতে হবে। সম্প্রতি আমি লিজ মুরের ‘দ্য গড অব দ্য উডস’ পড়েছি। সেখানে অধ্যায়ের শিরোনাম ও বিন্যাস বেশ জটিল। এতে বইটি যে একটি নির্মিত শিল্পবস্তু, সেটি স্পষ্ট হয়। আবার পাঠকের জন্যও এই শিরোনামগুলো খুবই সহায়ক, এমনকি অপরিহার্য। এগুলো লেখাকেও সহজ করেছে। কারণ, দৃশ্যের ভেতরে সময়ের পরিবর্তন বোঝানোর আলাদা প্রয়োজন হয়নি, অধ্যায়ের শিরোনামই সেই কাজ করেছে। আপনার উপন্যাসে তো তারিখ, সম্ভাষণ, সমাপ্তি ও ই-মেইলের সময়সূচির কারণে এই বিন্যাস আগেই তৈরি হয়ে গেছে। এ নিয়ে কি আপনি বিশেষভাবে ভেবেছিলেন?

না। পরে একজন আমাকে বলেছিলেন যে, আলাদা করে অধ্যায় ভাগ করতে হয়নি, কারণ চিঠিগুলোই আসলে অধ্যায়। তখনই প্রথম বিষয়টা আমার মাথায় আসে। পাঠক হিসেবে আমি পৃষ্ঠা বা অধ্যায়ের বিরতি খুব উপভোগ করি। আমার মনে হয়, প্রত্যেক পাঠকই সেই ক্ষণিকের বিরতির অপেক্ষায় থাকেন, যদিও বইটি এতটাই আকর্ষণীয় হতে পারে যে সঙ্গে সঙ্গেই পরের পৃষ্ঠায় চলে যান। দীর্ঘ অধ্যায়ের বই অনেক সময় ক্লান্তিকর মনে হয়। অবশ্যই আমাদের এমন বইও পড়া উচিত। কিন্তু এই বই, কিংবা যেকোনো পত্রোপন্যাস, পাঠককে আরও ঘন ঘন তৃপ্তির অনুভূতি দেয়। রূপক অর্থে বলতে গেলে, পড়ার সময় আপনি যেন শ্বাস ধরে রাখেন। অধ্যায়ের শেষে এসে সেই শ্বাস ছেড়ে নতুন করে শ্বাস নেন। আমার মনে হয়, এ কারণেই বইটি মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। দৈর্ঘ্যে সাধারণ উপন্যাসের মতো হলেও পড়তে সহজ মনে হয়।


এই উপন্যাসে অনেক কাহিনিসূত্র রয়েছে। পত্রোপন্যাসের রূপ কি এতকিছু একসঙ্গে রাখতে সুবিধা করেছে, নাকি কঠিন করেছে?

সবগুলো একসঙ্গে তালিকা করলে সত্যিই পাগলামি মনে হয়। এটাই তো আপনার প্রতিভার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক। এই রূপটি বরং কাজটা সহজ করেছে। প্রচলিত আখ্যানভঙ্গিতে আপনি যখন কোনো চরিত্র বা কাহিনিসূত্র আনেন, তখন পাঠকের মধ্যে একটি প্রত্যাশা তৈরি হয়। পুরো গল্পটাই আপনাকে বলতে হয়। কিন্তু পত্রোপন্যাসে চিঠিগুলোই গল্প নয়। মানুষের জীবন চিঠির বাইরেও চলতে থাকে। যেমন, হ্যারি যখন বাড়ি থেকে পালিয়ে তার কুকুরকে নিয়ে সিবিলের বাড়িতে আসে, ছয় মাস তার সঙ্গে থাকে এবং তাকে একটি সমস্যার সমাধানে সাহায্য করে, তখন সেই পুরো ঘটনাটা আমাকে আলাদা করে বলতে হয়নি। আমি শুধু দেখিয়েছি, সিবিল কীভাবে চিঠির মাধ্যমে অন্যদের কাছে ঘটনাগুলো বর্ণনা করেছে।
এক অর্থে, এই বইটি একটি জটিল কাহিনির কাঠামো মাত্র। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেটাই তৃপ্তিদায়ক। কারণ, সবকিছুই সিবিলকে ঘিরে আবর্তিত হয়। পাঠকের প্রধান আগ্রহও সিবিলকে নিয়ে। আপনি জানতে চান, সে এত খিটখিটে, অদ্ভুত এবং যন্ত্রণাগ্রস্ত কেন। এই কৌতূহলই আপনাকে গল্পের শেষ পর্যন্ত নিয়ে যায়। চিঠির মাধ্যম আমাকে স্বাধীনতাও দিয়েছে। যেমন, বইয়ের শুরুতে সিবিল ‘দ্য বাল্টিমোর সান’-কে একটি চিঠি লেখে। সেখানে সে সমালোচনা করে, কারণ তারা এমন এক খবর ছেপেছে যেখানে একজন অভিভাবক দুর্ঘটনাবশত নিজের সন্তানকে গাড়িচাপা দিয়েছেন। সেই কাহিনিসূত্র সেখানেই শেষ হয়ে যায়। এরপর আর কিছু ঘটে না। কিন্তু চিঠিটি পাঠকের কাছে সিবিলের চরিত্র নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাছাড়া তার প্রতিবেশীর হলোকাস্ট-অভিজ্ঞতার গল্পও আছে। আপনি সেই মানুষটির প্রতি আগ্রহী হন, কারণ তার অভিজ্ঞতাই ব্যাখ্যা করে কেন তার সঙ্গে সিবিলের এত গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

অন্য চরিত্রগুলোর গল্পের মাধ্যমে আপনি সিবিলকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন, কিন্তু তাকে সরাসরি ব্যাখ্যা করেননি। সম্ভবত এটিই বইটির সবচেয়ে বড় সাফল্য। এতে আমার এমিলি ডিকিনসনের একটি কবিতার কথা মনে পড়ে—
“সত্যকে বলো, তবে একটু বাঁকিয়ে বলো—
সাফল্যের পথ বৃত্তাকার।”

আমি কখনো সিবিলের গল্প সরাসরি বলতে চাইতাম না। সত্যি বলতে, আমি নিজেও সেই উপন্যাস পড়তে চাইতাম না। তার যন্ত্রণার এত গভীরে যেতে আমার ইচ্ছে হতো না। কিন্তু আমি সেই গল্প বলতে চেয়েছি। তাই ভাবতে হয়েছে, কীভাবে এমনভাবে বলা যায়, যাতে জীবনকে ইতিবাচকভাবে দেখানো যায়। তার বয়স আমাকে সেই সুযোগ দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি না যে সময় সব ক্ষত সারিয়ে তোলে। তবে সময় মানুষকে এক ধরনের দূরত্ব এনে দেয়। সেই দূরত্ব থেকেই আমি এই গল্পটি বলতে চেয়েছি।

আপনি কি শুরুতেই সিবিলের সবচেয়ে বড় বেদনাটিকে কেন্দ্র করে ভেবেছিলেন?

হ্যাঁ। আমি জানতাম, এমন একজন মানুষকে নিয়ে লিখতে চাই, যে দীর্ঘদিন ধরে শোক বয়ে বেড়াচ্ছে। প্রচলিত আখ্যানভঙ্গিতে লেখকেরা বড় ঘটনাগুলো দৃশ্যের মাধ্যমে দেখান, বলে দেন না। কিন্তু পত্রোপন্যাসে ব্যাপারটা উল্টো। সিবিলের জীবনের সবকিছু, এমনকি তার দীর্ঘ শোকও যেন মঞ্চের আড়ালে ঘটে। সবকিছুই বলতে হয়, এমনকি বড় ঘটনাগুলোও। তবে সরাসরি নয়, একটু ঘুরিয়ে। এক চরিত্র অন্যকে বলছে কিংবা ইঙ্গিতে উল্লেখ করছে, কারণ দুজনেই ঘটনাটি জানে। এটা অনেকটা উপন্যাসে যৌনতার বর্ণনার মতো। সরাসরি লেখা প্রায় অসম্ভব। তাই আমরা তার আগে ও পরের ঘটনাগুলো লিখি। এই চিঠিগুলোও তাই করে। যেমন, সিবিল যখন থিওকে তার সবচেয়ে বড় গোপন কথাটি বলে, আমরা সেই দৃশ্য দেখি না। পরে তাদের চিঠিপত্র পড়ে আমরা তা অনুমান করি, থিও কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল, সেটাও ইঙ্গিত থেকেই বুঝি।

এত আবেগপূর্ণ বিষয় এভাবে লেখার সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কি আপনি ভেবেছিলেন?

সমালোচনামূলক দৃষ্টিতে বইটি পড়ছেন, এমন মানুষের সঙ্গে কথা বলা খুবই আকর্ষণীয়। কারণ, লেখক হিসেবে আমি মূলত একটি ভালো গল্প বলতে চেয়েছি এবং কী করলে পাঠক পড়ে যেতে চাইবেন, সেটাই ভেবেছি। আমি যে কাঠামোর সাহায্যে গল্প বলছি বা মঞ্চের আড়ালে ঘটনাগুলো রেখে দিচ্ছি, সেটা পরে বুঝতে পেরেছি। এখন মনে হয়, এটা সত্যিই কঠিন একটি কাজ ছিল। আগে আমি প্রচলিত ধরনের উপন্যাস লিখেছি। তাই এটি ছিল একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা। কিন্তু আমি বেশি ভাবিনি। সরাসরি লেখায় নেমে পড়েছিলাম এবং পথ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। অবশ্যই, যাদের মতামতের ওপর আমার ভরসা আছে, তাদের কাছ থেকে কিছু সমালোচনামূলক পাঠ পেয়েছি। কিছু ঘটনার সময় বদলাতে হয়েছে, কিছু অংশ এদিক-ওদিক করতে হয়েছে। প্রথম চেষ্টাতেই সব নিখুঁত হয়ে যায়নি। তবে আমি সচেতনভাবে অতিরিক্ত ভাবতে চাই না। কারণ, বেশি ভাবলে ভয় পেয়ে যাই, তখন হয়তো লিখতেই পারব না।

বইয়ের শেষে পাঠকেরা এমন একটি চিঠি পড়েন, যেটা কিনা সিবিল লিখতে চেয়েছিল, কিন্তু কখনো পাঠায়নি। আবেগের দিক থেকে সেই চিঠিটি বইটিকে গভীর সমাপ্তি দেয়। এ নিয়ে একটু বলবেন?

আমার মনে হয়, প্রথম খসড়াতেও বইটির শেষ এমনই ছিল। আমি শেষ পাতায় নতুন এক উপলব্ধির জন্ম দেবে এমন কিছু দেখাতে চেয়েছিলাম। সেখানে দেখা যায়, সিবিল কত যত্ন নিয়ে চিঠি লিখত, শব্দ কেটে আবার লিখত, সংশোধন করত। তখন প্রশ্ন জাগে, সে কি সব চিঠিই এভাবে লিখত? এটি তার মানবিক দিকটিকে নতুনভাবে দেখায়। কারণ, প্রকাশিত চিঠিগুলোতে তাকে আত্মবিশ্বাসী, স্পষ্টভাষী ও নিজের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত মনে হয়। কিন্তু এই চিঠিটি দেখায়, সে ভয় পেত ও নিজের ভাবমূর্তি তৈরি করতে কঠোর পরিশ্রম করত। তার জীবন দীর্ঘ ছিল, অনেক কিছু ভালোও ঘটেছিল। কিন্তু আমি সেইভাবে গল্প শেষ করতে চাইনি। আমি চেয়েছিলাম, পাঠকের মনে শেষ পর্যন্ত তার বহন করে চলা শোকের স্বাদটুকু রয়ে যাক। আমার কাছে আনন্দ ও বেদনা—দুটোই একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। জীবন তো আসলে এমনই।


সিবিল উপন্যাস পড়ে ও বাস্তব জীবনের কিছু লেখকের সঙ্গেও চিঠি চালাচালি করে, যার মধ্যে জোয়ান ডিডিয়নও আছেন। ডিডিয়নের কণ্ঠে চিঠি লেখার সাহস আপনি পেলেন কীভাবে?

সম্ভবত সেরা প্রশ্নটা করলেন। বইটি বিক্রি হওয়ার পর আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘এটা কি ঠিক আছে?’ আইনগতভাবে এতে সমস্যা নেই, কারণ তিনি আর বেঁচে নেই। পাঠকদের কাছ থেকেও কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাইনি। তবে সাক্ষাৎকারে আমি বলেছি, ‘জোয়ান ডিডিয়নের কণ্ঠে লেখার চেয়ে বোকামি আর কী হতে পারে!’ আমি প্রথমে এটা করেছিলাম কারণ ভাবিনি যে বইটি কাউকে দেখাব। এজেন্টকে দেব বা প্রকাশ করব, এমন কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। তাই অনেক কিছুই নির্ভয়ে লিখেছিলাম, যেমন একজন সিরীয় শরণার্থীর কণ্ঠেও লিখেছি।

সম্ভবত পত্রোপন্যাসের রূপ এতে সাহায্য করেছে। সিরীয় শরণার্থী বাসাম মূল চরিত্র নয়। আপনি তার পুরো জীবনের অভিজ্ঞতার ভেতরে ঢোকেননি। শুধু কল্পনা করেছেন, সিবিলকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সে কী লিখতে পারে।

ঠিক তাই। আজকাল লেখকেরা নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার বাইরের কোনোকিছু লিখতে ভয় পান। আমার মনে হয়, বর্তমান সাহিত্যজগতে এটা একটা সমস্যা। আমি কি সারাজীবন শুধু তিরিশের কোঠার শ্বেতাঙ্গ নারীদের নিয়েই লিখব? সেটা তো ভীষণ একঘেয়ে হয়ে যাবে। অথচ সেটাই আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। আমি ভেবেছিলাম, এই বই কেউ পড়বে না। সেই ভাবনাই আমাকে সাহস দিয়েছিল এমন অনেক কিছু লেখার, যা অন্যথায় হয়তো লিখতাম না। আমার জন্য এটা একটা বড় শিক্ষা—মুক্তভাবে লিখতে হবে। মনে করা যাবে না যে কেউ সব সময় কাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে পড়ছে। তখনই সত্যিকার অর্থে লেখা সম্ভব।