মা সামান্য ভুলের জন্যও চড় মারতেন : আনি এরনো

নোবেলজয়ী ফরাসি লেখক আনি এরনোর ছোটোগল্প ‘স্টোরিজ’-এ উঠে এসেছে শৈশবের স্মৃতি, শিশুমনের সহজাত নিষ্ঠুরতা ও বড়ো হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পরিবার ও পরিবেশকে নতুনভাবে আবিষ্কারের অভিজ্ঞতা। গল্পটি নিয়ে লেখিকার সঙ্গে কথা বলেছেন ‘দ্য নিউ ইয়র্কার’-এর ফিকশন সম্পাদক ডেবোরা ট্রেইসম্যান।

‘স্টোরিজ’ গল্পে দশ বছর বয়সি বর্ণনাকারীকে পাঁচ বছরের একটি মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়। আপনার শৈশবে নরম্যান্ডিতে কি এটি সাধারণ ঘটনা ছিল? আপনিও কি এমন করতেন?

এটা খুবই সাধারণ ব্যাপার ছিল। বড়ো শিশুরা ছোটোদের স্কুলে নিয়ে যেত। মায়েদের সবসময় সময় হতো না। আমার মায়ের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। তিনি বারো-তেরো বছর বয়সি মোনিককে আমাকে নিয়ে যেতে বলতেন। পরে আমিও চার-পাঁচ বছরের দুটি ছোট মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে স্কুলে যেতাম। তখন আমার ঠিক কত বয়স ছিল মনে নেই, তবে দশ বছরের বেশি ছিল না।

একদিন গল্পের নায়িকা ছোট মেয়ে মারি-পলকে ভয়ংকর সব গল্প বলতে শুরু করে। সে কি মারি-পলের নিষ্ক্রিয়তায় বিরক্ত ছিল? নাকি কেবল একঘেয়েমি কাটানোর জন্য এটা করেছিল? নাকি অন্য কোনো কারণ ছিল?

গল্পটি অনেকটাই আত্মজৈবনিক। এর মধ্যে একঘেয়েমিও আছে, ওই নিষ্ক্রিয়, নির্বিকার ছোট মেয়েটির প্রতি বিরক্তিও আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, যাকে বলা যায় শিশুসুলভ নিষ্ঠুরতা—এমন এক ধরনের নিষ্ঠুরতা, যেখানে কোনো নৈতিক নিয়ন্ত্রণ কাজ করে না। যে কাউকে নিজের চেয়ে বেশি দুর্বল, সহজে প্রভাবিত হয় এমন মনে করে, তাকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পাওয়া যায়। আমি ঠিক মনে করতে পারি না, আমি সেই ছোট মেয়েটিকে কী কী গল্প বলেছিলাম।

গল্পের নায়িকা মারি-পলকে আরেকটি ছোট মেয়ের কথা বলে, যাকে একটি বন্ধ ক্যাফের ভেতরে আটকে রাখা হয়েছে। সে অনাহারে মারা যাচ্ছে। এই চিত্রটি কোথা থেকে এসেছে? এটা কি তার কল্পনায় সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা, নাকি সে নিজেকে সেই অবস্থায় কল্পনা করেছিল?

গল্পটি লেখার সময় আমি স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছিলাম, স্কুল থেকে ফেরার পথে আমরা যে রাস্তা দিয়ে যেতাম। পথে একটি ছোট, সাধারণ ক্যাফে ছিল। কয়েক বছর পরে সেখানে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের দিয়ে যৌন ব্যবসা চালানোর অভিযোগে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। মালিক আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন, কয়েক মাস কারাভোগ করছিলেন। আমি কখনো সেই ক্যাফে কিংবা ঘটনাগুলো ভুলতে পারিনি। সম্ভবত সেই কারণেই লেখার সময় আমি একটি মেয়েকে সেই ঘরে বন্দি করে রাখার গল্প কল্পনা করেছি। বাস্তবের মেয়েরা সেখানে পুরুষদের সঙ্গে দেখা করত, আমার কল্পনায় যৌনতার জায়গা নিয়েছে ক্ষুধা ও অনাহার।

সে কেন মারি-পলকে এসব গল্প বলতে থাকে? এটা কি নিষ্ঠুরতা, নাকি কৌতূহল?

এটা নিষ্ঠুরতার একটা চক্র। সেই নিষ্ঠুরতা থেকে পাওয়া আনন্দও একটা চক্র। মারি-পল কাঁদে, তাতে সে আরও বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। ফলে নায়িকার তাকে আরও বেশি কাঁদাতে ইচ্ছে করে।

মারি-পলের প্রতিক্রিয়া, মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কান্নাকাটি করা—এটা কি সত্যিকারের ভয়, নাকি অভিনয় বা কোনো রীতি?

সে সত্যিই মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। আমার মনে হয়, সেটা নিছক ভয় থেকেই।

গল্পের শেষে যখন মারি-পলকে স্কুল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়, তখন নায়িকা ভেঙে পড়ে। সে আসলে কী হারায়?

তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে থাকা ছোট বোনসুলভ সঙ্গীকে হারায়। এরপর থেকে তাকে নিজের কল্পনাকে সঙ্গী করে একাই স্কুল থেকে ফিরতে হয় ।

গল্পের শেষ বাক্যটি হলো: “দশ বছর বয়সের এই ঘটনাটি আমি বললাম, কারণ আমি বুঝতে চেয়েছিলাম কেন আমি লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটিও আরেকটি গল্প মাত্র।” ছোট মেয়েদের স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময়ই কি আপনি প্রথম গল্প বানাতে শুরু করেছিলেন? লেখার সময় কি আপনি পাঠকদের মধ্যেও মারি-পলের মতো তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে চান?

আমার মনে হয়েছিল, লেখার উৎস হয়তো শৈশবের কিছু ঘটনার মধ্যে লুকিয়ে আছে। এই ঘটনাটি আমাকে দীর্ঘদিন ধরে লজ্জা ও অপরাধবোধে ভুগিয়েছে, হয়তো তার একটি চাবিকাঠি হতে পারে। কিন্তু শেষ বাক্যটি দেখায়, সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

আসলে আমি পুরো শৈশবজুড়েই গল্প বানাতাম। সেসব গল্পের নায়িকা ছিলাম আমি নিজেই, সেগুলো বইয়ে পড়া গল্প থেকে অনুপ্রাণিত হতো। তবে সেগুলো ভয়ংকর ছিল না। আমি নিজেকে দূরদেশে, অভিজাত সমাজে, অতীতের ঘোড়ার গাড়ির যুগে, এমনকি আদিম মানুষের সময়েও কল্পনা করতাম। কখনো ভাবতাম আমি স্কারলেট ও’হারা, কখনো জেন আইয়ার; কখনো মরুভূমিতে, কখনো কলকাতার রাস্তায়, আবার কখনো আলাস্কার একটি কুঁড়েঘরে বাস করছি।

যখন সত্যি সত্যি লেখা শুরু করি, তখন গল্প উদ্ভাবনের জন্য বা নিজেকে কল্পকাহিনির মধ্যে স্থাপন করার জন্য লিখিনি, যদিও সেটাই সবসময় করতে চেয়েছিলাম। আমি বাস্তবতাকে প্রশ্ন করতে চেয়েছি। পাঠকদের আবেগপ্রবণ বা আতঙ্কিত করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না; আমি লুকানো সত্যকে উন্মোচন করতে চেয়েছি। এই গল্পে আমি আমার নিজের ভেতরের এক ধরনের নিষ্ঠুরতার মুখোমুখি হয়েছি।

‘স্টোরিজ’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৮৪ সালে। তখন কেন আপনি জীবনের এই বিশেষ সময়টিকে ফিরে দেখছিলেন?

সেটা ছিল আমার জীবনের গভীর অস্থির একটা সময়। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর আমি আমার দুই ছেলেকে নিয়ে একা থাকতাম। আমার জীবনে তখন আরেকজন পুরুষও ছিলেন (এ বিষয়ে আমার ‘হোটেল কাসানোভা’ গল্পটি দেখুন)। আমার মা আলঝেইমারে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।

আমি তখন মায়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক নিয়ে গভীরভাবে ভাবছিলাম। এখন আমি সত্যিই মনে করি, মারি-পলের প্রতি আমার নিষ্ঠুরতা ছিল এক অর্থে মায়ের সহিংসতার বিরুদ্ধে আমার প্রতিশোধ। মা সামান্য ভুলের জন্যও আমাকে চড় মারতেন। তিনি আমার কাছে এমন এক নিখুঁত ও প্রজ্ঞা প্রত্যাশা করতেন, যা আমি কখনো অর্জন করতে পারিনি।