কথাসাহিত্যিক মণিকা চক্রবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্যজগতের এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। তার গ্রন্থসংখ্যা তেরোটি—এর মধ্যে সাতটি উপন্যাস, তিনটি গল্পগ্রন্থ, একটি কবিতার বই, একটি গদ্যগ্রন্থ এবং একটি অনূদিত উপন্যাস রয়েছে। অনূদিত উপন্যাস ‘মিতিয়ার প্রেম’ রুশ সাহিত্যিক ইভান বুনিনের একটি বিখ্যাত রচনার বাংলা রূপান্তর। গল্প, উপন্যাস ও কবিতা—এই তিন ধারাতেই তার সাবলীল বিচরণ তাকে এক বহুমাত্রিক লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তিনি বিদেশি সাহিত্য পাঠ করতে ভালোবাসেন। সেই আগ্রহ থেকেই তিনি পাঁচটি জাপানি গল্প এবং একটি জাপানি উপন্যাস অনুবাদ করেছেন, যা বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তার লেখা বারোটি গল্পের ইংরেজি অনুবাদ ‘Beyond the Body and Other Stories’ নামে প্রকাশিত হয়েছে, যা তার সাহিত্যকর্মকে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছেও পৌঁছে দিয়েছে।
তার কবিতার বই ‘অপার্থিব গান’ বহুল আলোচিত এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল—যেখানে তিনি এক ভিন্ন স্বরের কবিতা নির্মাণ করেছেন।
তার লেখার কেন্দ্রে রয়েছে এক গভীর শুভবোধ ও মানবিক সম্পর্কের নিবিড় অনুসন্ধান। সভ্যতার নানা সংকট ও অন্ধকারের মধ্যেও তিনি তার রচনায় শুভবোধের আলো জাগিয়ে রাখেন। দাম্পত্য জীবনের জটিল বুনট, আধুনিক যান্ত্রিক জীবনের স্নায়ুচাপ এবং তার মধ্যেও মানুষের আনন্দমুখী অভিজ্ঞতা—এইসব সূক্ষ্ম জীবনচিত্র তার উপন্যাসে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সংসারের টানাপড়েন ও সম্পর্কের নানা জিজ্ঞাসা যেমন তার লেখার বিষয়, তেমনি অবচেতনের জটিল ও বহুমাত্রিক রূপও তার গল্পে উন্মোচিত হয়। তার ছোটগল্পে দেখা যায় এক ভিন্নধর্মী আত্মউদ্ঘাটন এবং অন্তর্গত দ্বন্দ্বের তীব্র উপস্থিতি। নারী ও পুরুষ—উভয় চরিত্রই তার লেখায় সমান দক্ষতায় ও গভীরতায় উপস্থাপিত হয়েছে, যেখানে জীবনের বিস্তৃত অভিজ্ঞতা ও সূক্ষ্ম উপলব্ধি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
এই সাক্ষাৎকারে তার সাহিত্য ভাবনা, লেখালেখির অভিজ্ঞতা এবং সৃজনপ্রক্রিয়ার অন্তরালকে জানার চেষ্টা করা হয়েছে। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ড. সাথী নন্দী।
প্রথমেই জানতে চাই, কী রকম পরিবেশ-পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আপনার বড়ো হয়ে ওঠা?
আমার জন্ম কুমিল্লা জেলায়। ১৯৭১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি। মায়ের মুখে শুনেছি, মা আমাকে আঁতুড় ঘরে বুকের কাছে নিয়ে ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া বিখ্যাত ভাষণটি শুনেছিলেন। অর্থাৎ একটি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যখন দেশটি যাচ্ছিল তখনই আমার জন্ম। আমার একমাস বয়সেই আমি শরণার্থী হয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে আগরতলায় যাই। কুমিল্লা থেকে আগরতলার বর্ডার ছিল খুব কাছেই। দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত সময়টা আগরতলার আত্মীয় পরিজনের সান্নিধ্যে ও সহায়তায় কাটে। মায়ের মুখ থেকেই শুনেছিলাম, সেখান থেকে ফিরে আসার পর যুদ্ধোত্তর দেশের পরিস্থিতি অর্থনৈতিক দিক থেকে খারাপ ছিল। স্বাধীনতার পর সেখানকার পরিবেশ অনেকটাই পালটে যায়। তবু সবকিছু ছাপিয়েও সাহিত্য ও সংগীতের একটি চমৎকার পরিবেশ আমাদের ছিল। আমার কাকা, আমার জ্যাঠতুতো বোন রেডিয়োতে গান করত। বাবাও গান করত দরাজ গলায়। মাকে সবসময়ই নীহাররঞ্জন গুপ্ত, সমরেশ বসু, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, এবং আরও প্রথিতযশা লেখকদের অনেক বই পড়তে দেখতাম। তখন একমাত্র বিনোদন ছিল কলকাতা রেডিয়োতে প্রচারিত নাটক ও গানগুলো। এভাবে স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি অন্য একটি ভিন্ন জগৎ ছিল আমার। বড়ো হতে হতে ওই বইগুলিও আমি নাড়াচাড়া করতে পছন্দ করতাম। ছোটোবেলায় আমি খুব একা একা থাকতে ভালোবাসতাম। দৌড়াদৌড়ি, খেলা আমার খুব বেশি পছন্দ হত না। অবসরে সহজ পাঠ, ঠাকুরমার ঝুলি, আরব্য রজনীর গল্প এইসব পড়তাম। তাছাড়া আরেকটি বিষয় আমাকে খুব টানত, আর তা হলো রামায়ণ ও মহাভারত। প্রায় প্রতিদিনই দুপুরের পর আমার দিদা সুর করে রামায়ণ ও মহাভারত পড়ত। আমি মন দিয়ে তাই শুনতাম। অন্য শিশুরা যখন খেলার জন্য নানা কিছু আয়োজন করছে, আমি তখন মহাভারত ও রামায়ণের ভীম, যুধিষ্ঠির, দ্রৌপদী, রাম, সীতা এসবের ঘোরের মধ্যে ভেসে থাকতাম। সবচেয়ে ভালো লাগত নিজের মনের কল্পনায় মোড়ানো চরিত্রগুলোর আলাদা রূপ। রামায়ণ ও মহাভারতের চমৎকার ছবিগুলোও আমাকে অবারিত কল্পনায় নিয়ে যেত। দিদার গলায় ছিল সেই পয়ার ছন্দের সুর, মহাভারত পাঠে তা অসাধারণ হয়ে উঠত। বাংলা সাহিত্যের অজস্র শব্দের ভাণ্ডারের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল তখনই। আমি ওখান থেকে যেন জীবনের অনেক দিকই নিয়েছিলাম। আর বয়সের আগেই আমার মানসিক পরিপক্কতাও অন্যদের চেয়ে বেশি ছিল হয়ত সেইজন্যই।
বাংলাদেশের প্রথম সারির একজন কবি কুমার চক্রবর্তী। আপনি তার স্ত্রী। শুনেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনাদের পরিচয়, সেখান থেকে সম্পর্ক তৈরি। কুমার চক্রবর্তীর সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রেই কি আপনার লেখালেখির জগতে আত্মপ্রকাশ, নাকি অন্য কোনও রহস্য আছে?
আমার লেখা আমার নিজের ভাবনা থেকেই জীবনে প্রথমবার উঠে এসেছিল। স্কুলে পড়ার সময় স্কুলের দেয়াল পত্রিকায় আমি কবিতা লিখেছিলাম। তাছাড়া কলেজে পড়ার সময় বিশিষ্ট কবি ও প্রাবন্ধিক শান্তনু কায়সার স্যার আমার ইংরেজি শিক্ষক ছিলেন। তিনি একটি কলেজ ম্যাগাজিন বের করেছিলেন। সেখানেই আমি ‘অসূর্যস্পশ্যা’ নামে একটি গদ্য লিখি। যতটুকু মনে পড়ে, সেখানে মহাভারতের নারী আর আধুনিক নারীর একটি তুলনামূলক আলোচনা ছিল। স্যার লেখাটির অনেক প্রশংসা করেছিলেন। কুমার চক্রবর্তীর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল, বিবাহিত জীবনের আগেই। তবে লেখার আত্মপ্রকাশের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ নেই। বরং বিবাহিত জীবনের প্রথম দিনগুলোতে আমার কেবলই পড়তে ভালো লাগত। শ্রেষ্ঠ রচনাগুলো, শ্রেষ্ঠ কবিতার বইগুলো তখন হাতের নাগালে। বিশ্বসাহিত্যের পাঠ ও কবিতার আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিটা জেনেছিলাম সে সময়। মালার্মে, র্যাঁবো, হাইনরেখ হাইনে, সুনীল, শক্তি, উৎপলকুমার, সমর সেন ওই সময়ে পড়ি। কুমার চক্রবর্তীর বইয়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহ আমাকে প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত করত। একটা জীবন বই পড়ে কাটিয়ে দেবার সাধই ছিল প্রবলভাবে। শান্ত ঘর, বইয়ের রাশি, সংগীতের সঙ্গে বসবাস এমনটাই চেয়েছিলাম। কিন্তু জীবন এসবের সঙ্গে আরও কিছু দেয়। তার ভার বড়ো বেশি। তাই সেই ভার কমানোর জন্য নিয়তিই আমাকে টেনে আনে লেখার পথে। লেখার জীবন আমার কাছে আমার প্রতিদিনের জীবনের পাশাপাশি এক সমান্তরাল জীবন। দুটো জীবনই সমানভাবে আদরণীয়।
আপনি তো বিজ্ঞানের ছাত্রী ছিলেন। সেখান থেকে সাহিত্যিকদের প্রতি আগ্রহ তৈরি, তাদেরকে নিয়ে ভাবা, তাদের বই পড়া, প্রচুর পরিমাণে বিদেশি লেখকদের বই পড়া, এবং সব মিলিয়ে আপনার নিজস্ব একটা মনোজগৎ তৈরি এসবের অনুপ্রেরণা কীভাবে পেতেন?
আমি নিয়মিতভাবে লিখছি ২০১০ সাল থেকে। তার আগে কলেজ ও ইউনিভার্সিটির বার্ষিক ম্যাগাজিনে আমি লিখেছি। কিন্তু সেই সব লেখায় আমি আমার আমিকে খুঁজে পাইনি। তা ছিল একধরনের কৃত্রিম লেখা যা আমার আবেগ বা অনুভূতির সঙ্গে ততটা সম্পর্কিত নয়। বিজ্ঞানের ছাত্রী হিসাবে জীববৈচিত্র্য ও উদ্ভিদের জীবন আমাকে বিস্মিত করত। রসায়নের নানা প্রক্রিয়াও ছিল খুবই মনোগ্রাহী। কিন্তু এসবের পাশাপাশি সাহিত্যের বই যে কেন আমার সকল অবসরকে এক নিমিষেই আনন্দময় করে তুলত, তা তখন বুঝতে পারতাম না। তখনও লিখবার তাড়না তৈরি হয়নি।
লিখতে শুরু করি তখন থেকেই, যখন একমাত্র লেখার পথটি ছাড়া আমার সামনে আর কোনো পথ নেই। লেখো অথবা মর। আসলে নিজেকে সুস্থ রাখা এত জরুরি হয়ে পড়েছিল যে, লেখা ছাড়া বেঁচে থাকাই ছিল অসম্ভব। দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো নিজে নিজেই চরিত্রের রূপ ধরে আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে। তারা আমাকে লেখার তাড়না দিয়েছে ক্রমাগত।
যতদূর জানি, মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্ট আপনার প্রিয় কবি এবং কবি কুমার চক্রবর্তী বদলেয়রীয় ধ্যান-ধারণায় প্রভাবিত। আপনাদের দুজনের এই যে আলাদা আলাদা পছন্দ, সেই পছন্দের কারণটা কী? আর লেখার ক্ষেত্রে আপনারা একে অপরের থেকে কতটা আলাদা?
আমার লেখার বিষয়বস্তু, ভাবনা, দর্শন সবকিছুই কুমার চক্রবর্তীর থেকে পৃথক। আমার চিন্তায় রয়েছে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দময়তা। সহজ ও গভীর ভাষাবোধ। আমার কাছে আনন্দ যেমন প্রকৃতির স্বাভাবিক দান, তেমনি দুঃখও। আমি বারবার চেষ্টা করেছি এর ভেতর দিয়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে। বলতে পারেন এসবের মধ্য দিয়ে নিজেকে বুঝতে পারা, পরিপার্শ্বকে বুঝতে পারা, মনস্তত্ত্বের ভেতর দিয়ে অন্য এক সত্যকে আবিষ্কার করার পথটিই আমি নিতে চেয়েছি, যা স্বাভাবিকভাবেই আমার কাছে ধরা দিয়েছে। অনেক পড়াশোনা করে এই পথটি আবিষ্কৃত হয়নি, তা এসেছে একেবারেই গভীর অনুভবের জায়গা থেকে। প্রকৃতি আমার খুব প্রিয়। যেন এক আলাদা চরিত্র। প্রকৃতির সাথে নিবিড় সখ্য আমি চমৎকারভাবে উপলব্ধি করি। এই বোধ আমি রবার্ট ফ্রস্টের কবিতায় বিশেষভাবে দেখি। আর ব্যক্তিগত জীবনে রবার্ট ফ্রস্ট ছিলেন এমন একজন যাকে তার নিয়তির করুণ পরিণতির সাথে বারবার মানিয়ে নিতে হয়েছে। তাই প্রকৃতি নিয়ে লেখা এইসব কবিতা যে শুধুমাত্র সৌন্দর্য ও শান্তির কথা বলে তা নয়, বরং হৃদয়ে যখন আর কোনো উষ্ণতা থাকে না, তখনও প্রকৃতিকে কেমন করে বুকে জড়িয়ে নিতে হয় তার কথাও বলে। এই জায়গাটিকে বারবার আবিষ্কার করি বলেই হয়ত রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা এত ভালো লাগে।
লেখার ক্ষেত্রেও আমার চিন্তা, কুমার চক্রবর্তীর চেয়ে আলাদা। আমরা যখন ভালোবেসেছিলাম, তখন দুজনে মিলে একটি সত্তার অভিমুখে যাত্রা করেছিলাম। কিন্তু কিছুদিন পরেই বুঝতে পেরেছি আমরা স্বতন্ত্র। আমার চিন্তা-ভাবনা-দর্শন, সবকিছুই আলাদা। আবার কোনো কোনো জায়গায় বেশ মিলও আছে। আমার কাছে এই মিল ও অমিল দুটোই চমৎকারভাবে উপভোগ্য। আমি যতটা গোছানো, সে ততটাই অগোছালো। তো আমি যে গোছানো প্রকৃতির মানুষ তা জানাই হতো না সে এতটা অগোছালো না হলে। আমার লেখায় পুরুষ চরিত্রগুলোর অনেক বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা আমি হয়ত তৈরি করতে পারতাম না অত কাছ থেকে এমন একটা জীবনযাপন না থাকলে।
আপনার জীবন দর্শনটা কীরকম?
আমি প্রকৃতিকে ঈশ্বর মনে করি। ধ্বংসলীলার পরেও শুভবোধের জন্য অপেক্ষা করি। ব্যক্তিগত জীবনে নিরলস পরিশ্রমী মানুষ আমি। হাজার প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবনীশক্তির উদ্ভাস আমি নিজের মধ্যে ঘটাতে চাই। পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলির প্রভাব আমাকে প্রচণ্ডভাবে বিচলিত করে। সেগুলিই অনেক ক্ষেত্রে আমার লেখার উৎস হয়ে দাঁড়ায়। মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে আমি সংগীত, কবিতা আর প্রকৃতির কাছে আশ্রয় নিয়ে থাকি। আর সত্যিই তা আমাকে বন্ধুর মতো পথ দেখায়।
আপনি যে সময়ে সাহিত্যজগতে প্রবেশ করেছেন তখন সাহিত্যে মেয়েদের সংখ্যাটা হাতেগোনা ছিল। আপনি নিজেকে কীভাবে মোটিভেটেড রেখেছেন? কারণ কোনো জায়গায় ঢোকা সহজ কিন্তু সেই জায়গাটা ধরে রাখা ততটাই কঠিন...
আমি কাজের ক্ষেত্রের পরিবেশ সহজ বা কঠিন, কখনও এসব বিষয় নিয়ে ভাবিনি। আজও ভাবি না। আমি লিখেছি আমার ব্যক্তিগত আনন্দ বা দুঃখের জায়গা থেকে, কিছুটা পঠন-পাঠন থেকে। আমার বই নির্দিষ্ট কিছু পাঠক খুব ভালোবেসে নিয়েছে। আমার লেখা ভিন্ন ধরনের কবিতাও পাঠকের কাছে মনোগ্রাহী হয়েছে। এমনকি আমার লেখা প্রবন্ধের বই ‘মেঘের আখরগুলি’ও খুবই পাঠক সমাদৃত হয়েছে। তাতে জীবনের নানা আবিষ্কার আর আমার দেখা ও অনুভবকৃত সত্যকেই আমি পাঠকের কাছে তুলে ধরতে চেয়েছি। লেখায় যদি সত্যিই ভালো কিছু থাকে, তবে তা অবশ্যই আদৃত হবে। সাহিত্যজগতে জায়গা নিয়ে আমার সেই অর্থে কোনো মাথাব্যথা নেই। তবে আমার সময়েও মেয়েরা অনেকেই লিখেছে। এখনও লিখে যাচ্ছে। নতুনরা তাদের সাহসী কলম নিয়ে এগিয়ে আসতে চায়। কিন্তু প্রতিটি জায়গায় এমন পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা যে ওখানে এক অদ্ভুত রাজনীতির শিকার হয়ে যেতে হয়। তাই শেষ পর্যন্ত অনেকেই টিকে থাকতে পারে না। লেখা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
আপনার লেখার মধ্যে শুভবোধ আছে। সম্পর্কের নিবিড়তা আছে। আপনি আপনার ভেতরে শুভবোধের চেতনাটাকে আজও কীভাবে বাঁচিয়ে রেখেছেন?
শুভবোধ আমার আত্মার অংশ। আমি বেঁচে আছি বলেই সে বেঁচে থাকে। অথবা উলটো দিকে সে বেঁচে আছে বলেই আমি বেঁচে আছি। যদিও জীবন আমার কাছে বারবারই উপস্থাপিত হয়েছে ভয়ঙ্করভাবে। তবুও কোথাও না কোথাও একটি শুভক্ষণের দেখা পেয়েছি নির্মম সময়ে। জীবন ও মৃত্যুর সহাবস্থানের ভিতরের চরম মুহূর্তে সেই সময়ের দেখা মেলে।
আপনার সাতটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে আপনার সবচেয়ে প্রিয় উপন্যাস কোনটি?
আলাদা করে প্রিয় কোনটিকে বলব! বুঝতে পারছি না। সবকটি উপন্যাসই আমার খুব প্রিয়। যে সব উপন্যাসে নারী চরিত্র প্রধান, সেগুলো যেমন আবেদনময়, তেমনি যে সব উপন্যাসে পুরুষ চরিত্র প্রধান সেগুলোও দ্বন্দ্বমুখর। ‘দিগন্ত ঢেউয়ের ওপারে’ আর ‘যখন ভেসে এসেছিল সমুদ্রঝিনুক’ পুরুষচরিত্র প্রধান। সেখানে একজন শিল্পীর জীবনের আলো-অন্ধকারের চিত্রকল্পগুলো যেমন বর্ণিত হয়েছে, তেমনি একজন অভিবাসী ছাত্র যখন প্যারিসে পড়তে যায় তার মনোজাগতিক জায়গায় যে অস্তিত্বের সংকট দেখা যায় সেসবও বর্ণিত হয়েছে। তাছাড়া আমার উপন্যাসগুলোতে আমি সবসময়ই চেয়েছি চরিত্রগুলোর মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলোকে তুলে ধরতে। ‘অ্যাম্ফিথিয়েটার’, বা ‘রোদের বৃত্ত’ উপন্যাসে নারী চরিত্র প্রধান। নারীর অন্তর্নিহিত বেদনাগুলো নানাভাবে আধুনিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। নারীর শরীর, যৌনতা ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি যেমন হয় বা সময়ের প্রভাবে তার যে রূপান্তর হতে পারে তারও প্রেক্ষাপট রয়েছে আমার উপন্যাসগুলোতে।
আপনার উপন্যাসগুলো বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে কতটা প্রাসঙ্গিক…
আমার সব উপন্যাসের প্রেক্ষাপটই আধুনিক সময়। আমি যা দেখি, পর্যবেক্ষণ করি, তার মনস্তাত্ত্বিক যে ভিত্তি আমার মনের উপর আছড়ে পড়ে তারই ইঙ্গিতে আমি লিখি। তবে বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায়, মানুষের অনুভবের ক্ষমতা আগেও যা ছিল এখনও তাই। প্রচণ্ড সংবেদনশীল মানুষ সবসময়েই একাকী। পুরো সমাজ ব্যবস্থায় সে বড্ড খাপছাড়া। অনেক মানুষের ভিড়ে আমি যেন তাকেই খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। দেখার চেষ্টা করি, সে কী করে এমন বিপরীত সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। আদৌ পারছে কি না? একসময় সেই মানুষটিই হয়ত আমার লেখার চরিত্র হয়ে ওঠে। তাছাড়া বর্তমান সময়ের মানুষদের যে অবচেতন, গল্পে বা উপন্যাসে তার একটি অভিঘাত সৃষ্টির প্রয়াসও থাকে আমার লেখায়।
আপনার উপন্যাসগুলো বিষয়ের ক্ষেত্রে কিংবা স্টাইলের ক্ষেত্রে একটা আর একটার থেকে কতটা স্বতন্ত্র?
আমার লেখা উপন্যাসগুলো প্রত্যেকটিই একটি অপরটির চেয়ে আলাদা। তবে স্টাইলের ক্ষেত্রে বা ভাষাগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তা খুব বেশি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নয়। তবে বিষয়ের ক্ষেত্রে তা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। উপমা-প্রতীক-চিত্রকল্প—অনুপঙ্খ বর্ণনাকে আমি পছন্দ করি। কতটা প্রয়োগ করতে পেরেছি তা মনস্ক পাঠকই বলতে পারবেন। আমি অনুভব ও ইন্দ্রিয় সংবেদনশীলতাকে অনেক প্রাধান্য দিয়েছি। সেই দিক থেকে প্রতিটি উপন্যাসেই অনুভবের যে অন্তর্গূঢ় রূপ তা একটি অপরটির চেয়ে আলাদা।
বিষয় নাকি প্রকরণ, কোনটাতে আপনি বেশি নিরীক্ষা করতে ভালোবাসেন?
আমার লেখা প্রতিটি উপন্যাসই বিষয়ের দিক থেকে আলাদা। কোনোটিতে রয়েছে শিল্পী জীবন, কোনটিতে রয়েছে জীবনের প্রবল সংগ্রাম, কোনো কোনো উপন্যাস নারীদের বিচিত্র অভিজ্ঞতা ও সময়ের মারপ্যাঁচে তাদের নুয়ে পড়া অবস্থান এবং সেখান থেকে উঠে দাঁড়াবার প্রত্যয়ের কথা বলা হয়েছে। একটি উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের কথা এসেছে। বিষয়ের দিক থেকে উপন্যাসগুলো যে একেবারেই ভিন্ন, একটি আরেকটির মতো নয়, সে ব্যাপারে আমাকে সতর্ক হতে হয়েছে। চিন্তা-ভাবনাও করতে হয়েছে। তবে প্রকরণের জায়গাটি আমি ছোটগল্পে চেষ্টা করেছি। উপন্যাসে করার মতো সময় ও সুযোগ পাইনি।
ছোটগল্পের ক্ষেত্রে আপনি বিষয় ও প্রকরণের মধ্যে কোনটাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন এবং কেন?
ছোটগল্পের ক্ষেত্রে আমি দুটোকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। ভালো লাগে ডায়ালগ নির্ভর গল্প, যথার্থ অণুগল্প, গল্পহীন গল্প, কবিতার রূপচিত্রের গল্প, যা নৈর্ব্যক্তিক। এমন কিছু কাজ করেছি, কিন্তু নানা ধরনের কাজ আরও করতে চাই।
গল্প আপনার কাছে কীভাবে ধরা দেয়, মানে এই যে এত এত গল্প আপনি লিখেছেন, সেই গল্পের পেছনের গল্পটা যদি শোনাতেন...
গল্প আমার কাছে পুরোপুরি জীবনের বহুমাত্রিকতা নিয়ে ধরা দেয়। যেমন প্রথম যে গল্পটি আমি লিখতে বাধ্য হয়েছিলাম তার নাম ‘বোতলের দৈত্য’। আমরা তখন একটি বহুতল ভবনে বসবাস করি। একদিন সন্ধ্যায় লিফটের ভেতর উঠে এক দম্পতিকে দেখলাম। কোনো এক জন্মদিনের পার্টিতে যাচ্ছিল, সঙ্গে একটি ৫/৬ বছরের একটি শিশু। লিফটে ওই পরিবারটি ছাড়াও আরও কয়েকজন আছে। অন্য একজন ব্যক্তির নেমে যাওয়ার সময়ে দুরন্ত শিশুটি হঠাৎ লিফটের দরজায় আঙুল দিয়ে বসে। তাই দেখে ওই লোকটি তার স্ত্রীকে এতগুলো মানুষের সামনেই চড় মারতে থাকে। আর সঙ্গে সঙ্গে বলতে থাকে মহিলা বাচ্চা সামলাতে পারে না। এই যে নারীর প্রতি মারাত্মক অপমান তা যেন মুহূর্তেই আমার ভিতরে সঞ্চারিত হয়ে যায়। এই বিষয়টি আমাকে এতটাই বিষণ্ন করে যে সেইরাতে আমি ঘুমাতে পারিনি। পরদিন দুপুর বেলার অবসরেই আমি গল্পটি নিয়ে বসি। আমার মনে হয়েছিল সমস্ত নারীরাই কোথাও না কোথাও জীবনের এই অন্ধকার মুহূর্তগুলোর ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। পুরো পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিটি ঘরে ঘরে এইসব নারীকে তৈরি করছে যাদেরকে শুধু মাংসের লোভেই বিয়ে করে গৃহপালিত করা হচ্ছে। মা হিসাবে বা স্ত্রী হিসাবে অথবা মানুষ হিসাবে কোনো মর্যাদাই তাকে দিতে পারছে না। এই ভারসাম্যহীনতাই প্রতিটি ঘরে দিনে দিনে তৈরি করে যাচ্ছে ক্ষোভ ও আগুন। আজ থেকে প্রায় ষোলো বছর আগে এই গল্পটি আমি লিখেছিলাম। এবং সত্যি সত্যিই ষোলো বছর পর এসে দেখছি ডিভোর্সের হার বেড়ে গেছে ভয়ানকভাবে, মেয়েরা বিবাহিত জীবনের দিকে যেতেই চাইছে না।
গল্প, উপন্যাস ও কবিতা— কোনটাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এবং কেন?
আমার কাছে সবগুলো মাধ্যমই স্বতঃস্ফূর্ত। কবিতা পড়তে বেশি ভালোবাসি। কবিতার পঙ্ক্তিগুলোও খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবে উঠে আসে গভীর অনুভব থেকে। উপন্যাসও নিজে নিজেই যেন একটি পরিণতিতে যেতে চায়। সেই ক্ষেত্রে বরং ছোটগল্প লেখার বিষয়ে আমাকে নির্মাণ ও তার সমাপ্তি নিয়ে অনেক ভাবতে হয়। আমার লেখা প্রবন্ধগুলোও খুব সাবলীল। তাকে অনেক তথ্য দিয়ে ভারাক্রান্ত করার ইচ্ছে হয় না।
আপনি কিছুদিন আগে কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন, আপনার দিন শুরু হয় রবীন্দ্রনাথ দিয়ে, এবং রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ইংরেজ কবি জন ডানের তুলনা টানলেন। যিনি পরিচিত ‘পোয়েট অব লাভ’ হিসাবে। আপনি এই দুজনের মধ্যে ঠিক কতটা মিল খুঁজে পেয়েছেন?
দিনের শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের গান দিয়ে, কথাটি সত্যি। প্রাণের মধ্যে একটি নতুন দিনকে ঘিরে গানের সুর জড়িয়ে থাকে। এভাবেই শুরুটা হয়। অথবা কখনও কখনও গানের সুরের চেয়ে গানের কথা আমাকে চমৎকারভাবে আলোড়িত করতে থাকে। রবীন্দ্রনাথের গান অনেক বেশি জীবনমুখী বলেই হয়ত বিষয়টা ঘটে।
ইংরেজ কবি জন ডানের যে কয়টি কবিতা আমি পড়েছি, তার অনেকগুলোতেই রবীন্দ্রনাথের কবিতা বা গদ্যের মিল খুঁজে পেয়েছি। ‘দ্যা ক্যানোনাইজেশান’ বা 'অ্যা ভ্যালেডিকশান ফরবিডিং মাউনিং'—বিশেষ করে যদি এই দুটি কবিতার কথা বলি। ‘শেষের কবিতায়’ ‘দ্যা ক্যানোনাইজেশান’ কবিতার প্রথম লাইনটি (ফর গডস সেক হোল্ড ইওর টাং অ্যান্ড লেট মি লাভ) ব্যবহৃত হয়েছেই এবং আমি মনে করি কবিতাটির বক্তব্যের মূল সারাংশও পুরো ‘শেষের কবিতা’য় প্রকাশ ঘটেছে ভিন্নভাবে। আবার ‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও’—বিদায় কবিতাটিতে যেন ‘অ্যা ভ্যালেডিকশান ফরবিডিং মাউনিং’-এর অনেকটা ছায়া পেয়ে যাই।
আপনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন, শেক্সপিয়ার ও রবীন্দ্রনাথ পড়া শেষ হলে আর কিছুই পড়ার বাকি থাকে না?
কথাটি হয়ত বলবার জন্য অনেকসময় বলি। পড়বার কি শেষ আছে? কিন্তু পাশাপাশি এটাও ঠিক যে রবীন্দ্রনাথ পড়লে যেমন এক অপার্থিব আনন্দবোধের ভিতর দিয়ে যাই, তেমনি শেক্সপিয়ারেও আমরা মানুষের চরিত্রের সন্দেহ, নিষ্ঠুরতা, মৃত্যু এই সবকিছুকে একসঙ্গেই পেয়ে যাই। দুজনের নানা দিক থেকে মিল ছিল। যেমন দুজনেরই অসংখ্য সৃষ্টি, তেমনি দুজনেরই কোনো জীবিত উত্তরাধিকার ছিল না। তবে রবীন্দ্রনাথ একটু বেশি দিন আয়ু পেয়েছিলেন।
আপনি অনুবাদ করেছেন বিদেশি বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য। অনুবাদের প্রয়োজনীয়তা কেন অনুভব করলেন?
আমি অনুবাদ করেছি মূলত ইংরেজি ভাষা থেকে। যদিও রাশিয়ার উপন্যাস, জাপানের ছোটগল্প, জাপানের উপন্যাস এসবই করেছি, তবে তা প্রথমবার অনূদিত হয়েছিল ইংরেজিতে। আমি সেখান থেকেই বাংলায় অনুবাদ করি। প্রথম নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত রুশ লেখক ইভান বুনিনের ‘মিতিয়াস লাভ’ ও প্রথম পুরস্কারপ্রাপ্ত জাপানি লেখক কাওয়াবাতা ইয়াসুনারির ‘দ্য হাউস অফ দ্য স্লিপিং বিউটিস’ এবং ইংরেজি ও জাপানি সাহিত্যের আরও কিছু গল্প আমি অনুবাদ করেছি। কিছু কবিতাও করছি নিয়মিত। তার কারণ বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষাটাও আমার খুবই প্রিয়। আমার মেয়ে লেখাপড়া করেছে ইংরেজি মাধ্যমে। সে সাহিত্য ভালোবাসে। তাই মেয়ের সঙ্গে চমৎকারভাবে একটা সাহিত্যিক আদান-প্রদান ও বন্ধুত্বের জায়গাটি নির্মাণের জন্যও এই অনুবাদ প্রক্রিয়ায় ঢুকতে পারাটা জরুরি ছিল। আমার একমাত্র কাব্যগ্রন্থ ‘অপার্থিব গান’ দ্বিভাষিক বই। কবিতাগুলোর ইংরেজি অনুবাদ করেছে আমার মেয়ে মিথিলা ওফেলিয়া। ওই কবিতাগুলো দুজনে মিলে অনুবাদ করার সময় অনুবাদের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে অনুভব করেছি। এর পর থেকেই অনুবাদের কাজে নিজেকে নিয়োগ করেছি। এই কাজটি দুজনে মিলে করি বলি যথেষ্ট উপভোগ্য হয়। অনেক সময় সে আমাকে সময় দিতে পারে না, আমাকে নিজে নিজেই অনেকটা পথ পার হতে হয়। তবু সঠিক অর্থটি খুঁজে বার করার প্রক্রিয়ায় তর্কে-বিতর্কে এক দারুণ সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটি সত্যিই চমৎকার।
বাংলা ভাষায় প্রচুর ভালো ভালো লেখা রয়েছে, সেগুলো অনূদিত হয়ে অন্য ভাষাভাষী মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাতে পেরেছে বলে মনে হয়?
এ ক্ষেত্রে সত্যিই আমাদের দুর্ভাগ্য। শুনেছি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিছু ছোটগল্প ও বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক’ অনূদিত হয়েছে। তবে অনেক বিখ্যাত লেখারই ইংরেজি অনুবাদ আমরা করতে পারিনি। আমাদের গল্পের ভিতরে আমাদের যে জীবনবোধ, যে মিথ, তা আমরা পৌঁছাতে পারিনি বহির্বিশ্বে। বরং অন্য সংস্কৃতির চাপে প্রভাবিত হয়ে নিজেদেরকেই হারাতে বসেছি। তবে অনেককাল আগের ইংরেজি কবিতায় আমাদের মিথগুলো বা আইডিয়াগুলোর প্রয়োগ নানা ক্ষেত্রে রূপকভাবে যখন দেখি, তখন সত্যিই অবাক হই।
বর্তমানে ‘নারীবাদ’ নিয়ে নানান সমালোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। এর কারণও আছে। আপনি নারীবাদ বলতে কী বোঝেন?
আমি নারীবাদ বলতে বুঝি নারী তার জীবনের, যৌনতার, এবং তার ব্যক্তিগত প্রতিটি বিষয়ের সিদ্ধান্ত নিজেই গ্রহণ করবে। এই ক্ষেত্রে তার সিদ্ধান্তই শেষ কথা। তবে সিদ্ধান্তগুলো যেন তার সন্তানের জীবনকে বিপন্ন করে নেওয়া না হয়। আমার মনে হয়, আমাদের যে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ছিল তাতে পুরুষের পাশাপাশি নারী শক্তিও ছিল সমানভাবে শক্তিধর। তখন তো নারীবাদ নিয়ে এত বিতর্ক হয়নি। নারীরা নিজেরা সিদ্ধান্তও নিতে পারতো। তবে ‘নারীবাদ’ নিয়ে যে বিতর্ক তাতে একটি অপরাজনীতি কাজ করে বলে আমি বিশ্বাস করি। নারী ঘরে এবং বাইরে সর্বত্রই পূর্ণ শক্তিতে বিরাজ করবে পূর্ণ মর্যাদা নিয়ে।
বর্তমানে মেয়েরা নিজেদের যেকোনো সমস্যা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে পছন্দ করে যা আগে ছিল না, এবং এই বিষয়টা পৌরাণিক চিন্তাভাবনার মানুষেরা মেনেও নিতে পারেন না, ফলে অনেক সমস্যা সৃষ্টি হয়। শুরু হয় নতুন ও পুরাণের দ্বন্দ্ব। এই বিষয়টা আপনার নজরে কীভাবে প্রতিভাত হয়েছে, হচ্ছে?
এক্ষেত্রে নারীরাই নারীদের প্রতিপক্ষ। এবং এই প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে যাবার ক্ষেত্রটি দীর্ঘকাল ধরে পুরুষরা তৈরি করেছে। আর নারী নিজে নিজেই সেখানে ধরা দিয়েছে, দিচ্ছে। তাই পুরাতন নারী ভাবছে নতুনেরা অনেক কিছু সহজে পেয়ে যাচ্ছে, তাই তাদের পাওয়ার পথে পুরুষতন্ত্রের সাহায্য নিয়ে বাধা হয়ে দাঁড়াব। আবার নতুন নারী ভাবছে, পুরাতনরা আর কী জানে! তাকে আমি ব্যবহার করব। সেও ওই ব্যবহারের সময় পুরুষতন্ত্রের রাজনীতির আশ্রয় নিচ্ছে। তো শেষপর্যন্ত নারীই নারীকে মর্যাদাহীন করছে। তাই আমরা আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় খুব কমসংখ্যক নারী লেখক, নারী রাজনীতিবিদ বা নারী বিজ্ঞানী পেয়ে থাকি। এর কারণ, মগজের শক্তিকে খুব ধীরে ধীরে শক্তিহীন করে দেওয়া হয়। বিষয়টা এমনভাবে হয় যে, নারীরা তা বুঝতে পারলেও গোলকধাঁধা থেকে বের হতে পারে না।
একসময় একান্নবর্তী পরিবার ছিল। ধীরে ধীরে পরিবারের সংজ্ঞা বদলেছে। বর্তমানে ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে সবাই এখন স্পেস খোঁজে, শুধু নিজেকে নিয়ে থাকতে ভালোবাসে। এটাকে কি আপনি স্বার্থপরতা বলবেন? বা এই বদলে যাওয়া মানসিকতার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে বলে আপনার মনে হয়?
স্পেস থাকাটা দরকার মনে করি। তবে এতটাও নয় যে, মানুষের অন্যকে সহ্য করার ক্ষমতা একেবারেই কমে যাবে। এই একাকীত্ববোধও কিন্তু ভালো নয়। তা একসময় মানসিক অসুস্থতা নিয়ে আসে। তাই আমি মনে করি, মানুষের সহ্য ক্ষমতা বাড়ানো দরকার। প্রকৃত অর্থে মানুষের সত্যিকারের সুখ নিহিত আছে, অন্যের সেবা ও শুশ্রূষার ভেতরে।
আমরা জানি মেয়েরা শ্বশুর বাড়িতে চরম অত্যাচারিত হয়েও বিয়ে টিকিয়ে রাখত, কারণ বিয়ে তাদের কাছে ছিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের বেশিরভাগ মেয়েরা উপার্জনশীল ও আত্মবিশ্বাসী, আবার বিয়েতেও অনেকের আপত্তি। আপনার দৃষ্টিতে বিয়ে নামক প্রথার ভবিষ্যৎ কী হতে চলেছে?
খুব দুর্ভাগ্যজনকভাবে মেয়েরা আর বিয়ের পথে পা বাড়াচ্ছে না। সামনের পৃথিবী কতটা আবেগহীন ও যান্ত্রিক হবে সেটা ভেবে আতঙ্কিত হই। বিয়ের পরে অন্তত সন্তান নেবার সময় প্রতিটি নারী এক অন্যরকম উপলব্ধির পথে পা বাড়ায়। স্নেহ, মমতা এই শব্দগুলো তখন মিশে থাকে তাদের আত্মায়। একজন পরিপূর্ণ মানুষের জীবনে নানা রকম অভিজ্ঞতা, নানা রকম চ্যালেঞ্জ থাকতে হয়। শুধুমাত্র পড়াশোনা আর চাকরির পরীক্ষায় পাশ করে জীবনের অন্য দিকগুলো না দেখাকেও মানতে পারি না।
আপনার চিন্তাভাবনা, জীবনশৈলী আমাকে উৎসাহিত করে। তাই আপনার কাছেই জানতে চাই, নিজেকে ভালো রাখার মূল আসলে কী?
ভালোবাসা। নিজেকে এবং অন্যকেও। আর একটি হচ্ছে প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা।
যৌনতা আপনার কাছে কী?
খুব গুরুত্বপূর্ণ। সুস্থ থাকার একটি ভালো উপায়। বিবাহিত জীবনকে মসৃণ রাখে।
ধর্ম ও রাজনীতির যে সংমিশ্রণ সর্বত্র বিরাজমান, এটা আপনাকে কীভাবে ভাবায়?
এই সংমিশ্রণ বিশ্বের কোথাও ভালো কিছু প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, বরং খারাপ উদাহরণ সৃষ্টি করেছে অনেক বেশি। তাই এটা আমাকে ভয় দেখায়।
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, আমাকে সময় দেওয়ার জন্য। এই আলাপ আমার কাছে বিশেষ প্রাপ্তি হয়ে থাকবে।
আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। আপনার প্রতি রইল শুভকামনা।