হাসান নাঈমের ‘রায়টপুরের উপকথা’ গ্রামবাংলার জীবন, লোকসংস্কৃতি, ইতিহাস ও মানুষের বহুমাত্রিক অস্তিত্বকে ধারণ করা একটি আখ্যান। মানুষের পদচিহ্নে সভ্যতা তৈরি হয়, আবার সেই পদতলেই মরে যায় তৃণভূমি। এই দ্বন্দ্বই যেন ‘রায়টপুরের উপকথা’র অন্তর্গত দর্শন। আধুনিক নগরসভ্যতার বিপরীতে লেখক ফিরে তাকিয়েছেন সেই গ্রাম ও গঞ্জের দিকে, যার মধ্য দিয়ে বাংলার সামাজিক অস্তিত্বের দীর্ঘ ইতিহাস গড়ে উঠেছে।
উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ জমিদারি ব্যবস্থা ও তার সামাজিক অভিঘাত। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে ভূমি ও ক্ষমতার যে নতুন বিন্যাস তৈরি হয়েছিল, তার দীর্ঘ ছায়া গ্রামবাংলার মানুষের জীবনে কীভাবে পড়ে, আখ্যানটি তারই পাঠ।
ইতিহাসের ভেতর দিয়ে লেখক প্রবেশ করেছেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। ব্রিটিশ-উত্তর গ্রামীণ সমাজের নানা পেশার মানুষ, শিল্পী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, নিম্নবর্ণের মানুষ, বাইদ্যা-বাইদ্যানী, দরবেশ, পীর-ফকিরের মতো বহু বিচিত্র চরিত্র ও জীবনপ্রবাহ মিলে তৈরি হয়েছে উপন্যাসের সমাজচিত্র। এই বহুস্বরই উপন্যাসটির অন্যতম শক্তি। কোনো একক শ্রেণি বা দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে রায়টপুরকে দেখা হয়নি। নানা মানুষের কথকতা মিলেমিশে নির্মাণ করেছে একটি বৃহৎ জনজীবনের ছবি।
‘রায়টপুরের উপকথা’র ভাষাও এই বহুমাত্রিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোথাও ভাষা সরল ও জীবনঘনিষ্ঠ, কোথাও তা হয়ে ওঠে দার্শনিক ও কাব্যিক। শিল্পিত শিরোনাম ও উপশিরোনামের মধ্য দিয়ে লেখক জীবনের নানা ইঙ্গিতকে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
ইতিহাস, লোকঐতিহ্য, মিথ, বাস্তবতা ও মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সমন্বয়ে হাসান নাঈম এমন এক আখ্যান নির্মাণ করেছেন, যেখানে একটি গ্রামের গল্প ক্রমে হয়ে ওঠে একটি ভূখণ্ডের স্মৃতি।
প্রকাশক: অনন্যা
প্রচ্ছদ: মোস্তাফিজ কারিগর
মুদ্রিত মূল্য: ৫৫০ টাকা