কথাসাহিত্যিক হামীম কামরুল হকের নতুন বই ‘ছোটগল্প লেখকের প্রস্তুতি: পর্বে পর্বান্তরে’ প্রকাশ উপলক্ষে এই সাক্ষাৎকার। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৬ সালে ‘ছোটগল্প লেখকের প্রস্তুতি ও অন্যান্য বিবেচনা’ নামে। দীর্ঘ এক দশক পর এটি নতুনভাবে সম্পাদনা, সম্প্রসারণ ও পরিমার্জনের মাধ্যমে ২৫০ পৃষ্ঠার নতুন সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ। বইটির বিষয়বস্তু, ছোটগল্পচর্চা, নতুন লেখকদের প্রস্তুতি এবং বাংলা ছোটগল্পের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।
এই বইয়ে ছোটগল্প লেখার কোন কোন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন? পাঠক কী কী শিখতে পারবেন?
চারটি পর্বে বইটি সাজানো। প্রথম পর্বে ছোটগল্পের ধাঁচ-ধরনের সঙ্গে এর ইতিহাস তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি, সঙ্গে ছোটগল্পচর্চার গুরুত্ব ও চর্চা বিষয়ে কিছু প্রস্তাবনা আছে। পাঠক কী কী শিখতে পারবেন? সেটি পাঠক না পড়লে আমার নিজের দিক থেকে বলা মুশকিল। প্রশ্নের সাপেক্ষে বলতে হয়, পাঠক এ বইয়ের দ্বিতীয় পর্বে আন্তন চেখভ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কমলকুমার মজুমদার ও ডোনাল্ড বার্থলেমের ছোটগল্পের স্পিরিটের সঙ্গে হয়তো পরিচিত হতে পারবেন; একইসঙ্গে তাদের গল্প লেখার পদ্ধতি, তাদের ভাষা প্রয়োগ, চরিত্র নির্মাণ, ঘটনাকেন্দ্রিক ও ঘটনামুক্ত গল্প লেখার দিকগুলি সম্পর্কে অবহিত হতে পারবেন। তৃতীয় পর্বে, বাংলাদেশের ছোটগল্পচর্চার পরম্পরা ছুঁয়ে দেখা হয়েছে। চতুর্থ পর্বটা আত্মজৈবনিক ধাঁচের হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, এই বইয়ের লেখাগুলি থেকে পাঠকের যদি ছোটগল্পের প্রতি ভালোবাসা নতুন করে তৈরি হয়, তাহলে জানা ও শেখাটা আপনা-আপনি শুরু হতে পারে। আর বইটির নামে ‘প্রস্তুতি’ কথাটা আছে, পাঠককে ও হবু লেখককে প্রস্তুত করা ও তার ভেতরে প্রেরণা তৈরিই ছিল এর কাজ। শেখাটা তো যার যার তার তার হাতে-কলমেই শিখতে হবে।
‘ছোটগল্প লেখকের প্রস্তুতি: পর্বে পর্বান্তরে’ বইটি মূলত কাদের জন্য? নতুন লেখকদের কথা ভেবে লেখা, নাকি অভিজ্ঞ গল্পকাররাও এই বই থেকে নতুন কিছু
পাবেন?
বইটি যারা গল্প পড়তে চান, লিখতে চান মূলত তাদের জন্যই। যারা ছোটগল্প পড়ে পড়ে ছোটগল্পের বিদগ্ধ পাঠক, আর যারা লিখে লিখে ঝানু ছোটগল্প লেখক হয়েছেন, তারা কিছু নতুন বিষয় পেতেও পারেন। কেননা, এখনও অনেকের অপঠিত কমলকুমারের অগ্রন্থিত ছোটগল্প নিয়ে একটা দীর্ঘ লেখা আছে, ফলে সেসব গল্পের কথা ও কারুকৃতির বার্তা মিলবে; তেমনই দীর্ঘ লেখা আছে ডোনাল্ড বার্থলেমের ছোটগল্প নিয়ে। কমলকুমার যদিও দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাভাষার গণ্ডিতে পড়ে আছেন, কিন্তু বার্থলেমে-‘উত্তরাধুনিক’ ছোটগল্পের একজন লাইটহাউজ-তুল্য লেখক। তাকে নিয়ে বা তার গল্প নিয়ে বাংলা ভাষায় আলাপ আলোচনা প্রায় নেই বললেই চলে। সেদিক থেকে এই লেখাটা কারো কারো নতুন ভাবনার খোরাক হতে পারে। তরুণ লেখকদের জন্য এই বইয়ে শেষ বা চতুর্থ পর্বে, আমার একান্ত নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু লেখা আছে। ছোটগল্পভাবনা, ছোটগল্প বা সাহিত্যের পথে সফরের পরিপ্রেক্ষিতে কীভাবে লেখাটা হতে পারে, কেমন হতে পারে শুরুর সময়ের অনুশীলন—এমন অনেক কিছু সেখানে এসেছে। এর আগের পর্বগুলিতে, বিশেষ করে প্রথম পর্বে, সেটা ছিল প্রস্তাবনা, সেগুলি নিজের জীবনে কীভাবে দেখা দিয়েছে, সেসব কেউ কেউ মিলিয়ে নিতে পারেন।
অভিজ্ঞ গল্পকারেরা কিছু উদ্দীপনা পেতেও পারেন। বইয়ের তৃতীয় পর্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী চার দশকের গল্প নিয়ে একটি দীর্ঘ আলোচনা আছে। এতে আপাতত এই সময়ের লেখকদের নামগুলি শনাক্ত করা হয়েছে। সত্তর, আশি, নব্বই, শূন্য, প্রথম ও দ্বিতীয় দশক অবধি অনেক অনেক লেখকের নাম নিয়েছি। যে-দু-চারজন বাদ পড়েছেন, সেগুলি ইচ্ছাকৃত নয়, পরে সুযোগ হলে তাদেরও যোগ করা হবে। তবে প্রতিনিধিত্বশীল কয়েকজনের সম্পর্কে অল্প কথায় আলাপ তোলা হয়েছে। ছোটগল্পের জগতে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের নানান বিচিত্র প্রয়াস সম্পর্কে বহু কিছু ছড়ানো আছে পুরো বইজুড়ে। যেসব বিষয় কিছুটা আড়ালে পড়েছিল, সেগুলিও সামনে আনার চেষ্টা করেছি। পড়ে কেউ কেউ চমৎকৃত হতে পারেন। তবে আমি যেকোনো বই প্রকাশিত হলে, খুবই অস্বস্তিতে থাকি, কারণ মনে হয়, কত ত্রুটিই না জানি রয়ে গেল।
এই বইয়ের কোন অধ্যায়টিকে আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন? কেন সেই অধ্যায়টি পাঠকদের আগে পড়া উচিত বলে মনে করেন?
আগেই বলেছি, বইটি চারটি পর্বে লেখা। চারটি পর্বের প্রতিটিতে, তৃতীয়টি ছাড়া, সব পর্বেই তিনের অধিক প্রবন্ধ আছে। একেকজনের কাছে একেকটি পর্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দিতে পারে। যেমন তরুণদের জন্য প্রথম পর্বের প্রবন্ধগুলি দরকারি মনে হতে পারে। মনে হতে পারে, শেষ পর্বের প্রবন্ধগুলিও। কিন্তু মাঝের দুটো পর্ব, যেখানে ছোটগল্পের চারজন বিশিষ্ট লেখককে নিয়ে আলোচনা, আর পরে বাংলাদেশের ছোটগল্প নিয়ে দুটো প্রবন্ধ, তৃতীয় পর্বে, সেগুলি গবেষকদের কাজে লাগতেও পারে। এর ভেতরে প্রথম পর্বের লেখাগুলির আলাদা গুরুত্ব আছে হয়তো। এজন্য সবার আগে এই পর্বটা পড়া যেতে পারে। কারণ এতে ছোটগল্পের স্বরূপ ও ইতিহাসটি, বিশ্বছোটগল্পের ও বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাস ও বিবর্তনের বিষয়গুলি সংক্ষেপে বিস্তারিতভাবে দেওয়া হয়েছে। তবে আত্মজৈবনিক পর্ব, মানে চতুর্থ পর্বটাও আগে পড়া যেতে পারে। কারণ সেখানে সরাসরি জীবন থেকে নেওয়া কথাবার্তা আছে।
যারা প্রথমবারের মতো ছোটগল্প লিখতে চান, তাদের জন্য আপনার তিনটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ কী হবে?
পরামর্শ তো অনেকেই দিয়েছেন। তাতে দেখা যায়, সবাই প্রথমত পড়ার কথাই বলেছেন। একটু আধটু নয়, বিপুল-ব্যাপক ও নিরন্তর বা অবিরাম পরিমাণ পড়ার কথা বলেছেন। পড়ো পড়ো পড়ো—লেখার জন্য এছাড়া উপায় নেই। আমি বলব, পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কল্পনা করো, কল্পনা করো এবং কল্পনা করো—এটা কতটা সক্রিয় হয়—যাচাই করা যেতে পারে। মানে অভিজ্ঞতা তো সবই, কিন্তু কল্পনাশক্তি কার কতটা কাজ করে, মানে সৃষ্টিশীল কল্পনাশক্তি—সেটা দেখা দরকার। আর নিত্য পর্যবেক্ষণ করা। সোজা কথায়— পড়ো, কল্পনা করো, লিখতে বসো। তার বাইরে বলা যায়, ১. উপন্যাস লিখবেন না কি ছোটগল্পের সাধনাতেই জীবনপার করতে চান—এই সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। যেটা অত্যন্ত কঠিন। ২. যদি কেবলই ছোটগল্পকার হতে চান, তাহলে সেটি জগতের কত ধরনে, কীভাবে কাদের হাতে বিবর্তিত হয়েছে, হচ্ছে, সেটা অবিরাম খেয়াল করা ও চর্চা করা ৩. নিয়মিত লিখতে বসা। শেষটা সবচেয়ে জরুরি। যদিও নিয়মিত লিখতে বসা বাঙালি লেখকদের বেলায় প্রায় বিরল।
এই বই লেখার সময় আপনার নিজের লেখকজীবনের কোন অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে প্রভাব ফেলেছে?
বইটা ২০১৬ সালে আসলে প্রথমে প্রকাশিত হয়েছিল: ছোটগল্প লেখকের প্রস্তুতি ও অন্যান্য বিবেচনা—এই নাম। তখন ছিল মাত্র ৬০ পৃষ্ঠার ছোট্ট একটি বই। কমিশন দিয়ে দাম ছিল মাত্র ৬০ টাকা। অল্প সময়ের ভেতরে সেই মুদ্রণটি শেষ হয়ে যায়। কোনো কপিই অবশিষ্ট ছিল না। এমনকি আমার কাছেও ছিল না। বর্তমানে এই বই ২৫০ পৃষ্ঠার। ফলে প্রায় চারগুণ হয়ে একেবারেই নতুন বই। কথাপ্রকাশের কর্ণধার জসিম ভাই বইটির সব কপি ফুরিয়ে যাওয়ার পর থেকে বার বারই আমাকে নতুন করে এটি প্রকাশ করার কথা বলে আসছিলেন। আমার কাছে কোনো কপি না থাকায় তিনি নিজে একটি কপি আমাকে দেন। এটা আসলে জসিম ভাইয়ের তাগাদার ফল। এমনকি বইয়ের নতুন নামটিও জসিম ভাই প্রস্তাব করেছিলেন। কারণ বইটিতে এত কিছু যোগ হয়েছে, যে আগের নামে বর্তমান বইটির স্বরূপটি বোঝা যেত না। নতুন সংস্করণটি করতে আমাকে নতুনভাবে অনেক শ্রম দিতে হয়েছে, নির্ঘণ্ট যোগ করা হয়েছে। এবয়সে এসে বুঝি, নির্ঘণ্ট ছাড়া নন-ফিকশান বই আসলে পূর্ণতা পায় না। একটি বই আগের চেয়ে চারগুণ আয়তনে তৈরি করতে কী কী ঘটনা ঘটে, তার ভেতর দিয়ে আমাকে যেতে হয়েছে—সেগুলি নিজের জন্য সত্যিই আলাদা অভিজ্ঞতা। এছাড়াও অভিজ্ঞতার ভেতরে মনে হয়েছে, পরিণত লেখক কি আদৌ হতে পারলাম? জগতের এত এত লেখকের ভূমিকার পাশে আমাদের মতো লেখকের দান-অবদান কী হতে পারে?—এই সব প্রশ্ন নতুন করে তাড়িত করেছে। এছাড়া লেখার ক্ষেত্রে যতটা সহজ শব্দ ব্যবহার করা, তৎসম তদ্ভব শব্দ সরিয়ে আটপৌরে শব্দ ব্যবহার করার প্রবণতার দিকে নতুন করে নজর পড়েছে। এটাও নতুন।
বাংলা ছোটগল্পের বর্তমান সময়কে আপনি কীভাবে দেখছেন?
জীবন যতক্ষণ, সম্ভাবনা ততক্ষণ। কেবল ব্যক্তিমানুষের একার বেঁচে থাকার জীবন নয় শুধু, মানব-প্রজাতি যতদিন আছে, ততদিনই সম্ভাবনার দিন। একটা কথা আছে: ঐশ্বর্য বা সমৃদ্ধি সবসময়ই সামনে। অতীতের শিক্ষা নিয়েই তা করা সম্ভব। এখন তো কী যেন বলে, করোনা গেল, এর সূত্রে নিউ নরমাল পেরিয়েও বিচিত্র ও অভাবনীয় নানান দশার ভেতর দিয়ে আমরা যাচ্ছি। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গল্পবীজ ছড়িয়ে পড়ছে। তরুণরা যদি সেসব কুড়িয়ে নিতে পারেন, তাহলে বাংলা ছোটগল্পের আরেকটি নতুন যুগ শুরু হবে। বিশেষ করে গদ্য নির্মাণ ও শব্দ প্রয়োগে বিশেষ গুরুত্ব দিলে বাংলা ছোটগল্পের সময় সবসময় সম্ভাবনাময়। তবে ফ্যাশনে মেতে গেলে, ফ্যাশানটাকেই স্টাইল মনে করলে বিপদ আছে।
যারা বইটি এখনও পড়েননি, তাদের উদ্দেশে এক মিনিটে বইটির বিশেষত্ব কীভাবে তুলে ধরবেন?
যারা বইটি পড়েননি, তাদের কাছে তো পুরো বইটিই নতুন। তবে, যারা আগের মুদ্রণ পড়েছিলেন তাদের জন্যও নতুন।...বিশেষত্ব? সেসব আমি নিজে কীভাবে বলি? তবুও চেষ্টা করছি বলার: প্রবন্ধ, নিবন্ধ এবং গবেষণামূলক লেখায় মিলেমিশে তৈরি হয়েছে এ বই। এরই সঙ্গে আত্মজৈবনিক কিছু লেখাও আছে। এই প্রথম, লেখা নিয়ে আমার ব্যক্তিগত-যাত্রা বা সফরের কথা অনেকটা খোলামেলা তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। পাঠক তাতে কিছু পেলে ধন্য হবো।
আমরা সাধারণত দেখি, ছোটগল্প নিয়ে যত বই, সবই নানান ছোটগল্পকারদের নিয়ে আলোচনা। কিন্তু ছোটগল্প স্বয়ং কী, কেন, কীভাবে লেখা হলো, হাল আমলের চালগুলি বুঝে নিতে ছোটগল্প নিয়ে কীভাবে কাজ করতে হয়—এসব অপেক্ষাকৃত কম আসে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সাহিত্যে ছোটগল্প’ এর ভেতরে সবচেয়ে কাজের বই। এছাড়া সৈয়দ শামসুল হকের ‘মার্জিনে মন্তব্য’ বইটিও অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আমার চেষ্টা ছিল, গল্পলেখার কলাকৌশলগুলি আরো সরাসরি হাজির করার। এর জন্য কোন কোন উৎসে যেতে হবে, তার সঙ্গে সেতুসংযোগ তৈরির। বিশেষকরে বিশ্বছোটগল্পের ধারায় যুক্ত করে নিজেদের ছোটগল্পগুলি দেখা ও দেখানোর। জানি না তা কতটা সম্পন্ন হলো। তবে এদিক থেকেই বইটি ছোটগল্প নিয়ে হালনাগাদ কোনো বই যদি হয়ে থাকে, তাহলেই তার বিশিষ্টতা দেখা দিতে পারে—সেটি আমি আসলে দাগিয়ে দিতে পারি না। তবে উদ্দেশ্য পরিষ্কার: সারা বাংলাদেশ ছোটগল্পকার দিয়ে পরিপূর্ণ হোক। এই প্রত্যাশা নিয়েই বইটি লেখা। আমাদের বিপুল পরিমাণ ছোটগল্পকার দরকার।








