বীজব্রহ্ম ও অন্যান্য কবিতা

বীজব্রহ্ম

দিয়েছ বাগান, সবজি সন্ন্যাস, নির্জন আয়ুধ
আদিকোরকের ভিতরে সাঁতরে দেখি— ঢেউ
অনন্ত পথে পড়ে আছে—ঘাসে শুকাতে দেওয়া মায়ের শাড়িতে
সূর্যের অল্প বয়সের ছবি, দুলছে—যুবতী ঘড়ি
বুক থেকে উড়িয়ে দিয়েছে হ্রেষাধ্বনি;
সপ্তর্ষির নিচ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, পৃথিবীর বয়স যেখানে
চাঁদের পুকুরে রুপালি পেখম হয়ে আছে

শলাপরামর্শহীন বৃষ্টির কিরিচে ফালি ফালি জ্যোৎস্নার আশ্বিন
শুয়ে আছে আয়নার মহিমা রেখায়— জাগ্রত অঙ্কুর,
প্রথম সবুজ, মেঘ ও ময়ূরের দেশে;
পেলাম প্রার্থিত চোখ, অবিরাম দেখা—দৃশ্যের আকার সাকার

নদীচরে মহিষেরা পৃথুলা মেঘ, গৃহবিগ্রহ নিয়ে
জ্যোৎস্নার পিয়েলি মাছে অলংকৃত মদির দেশে যাব;
অনুগত সংসারেই সন্ন্যাস, বোনা আছে—বীজব্রহ্ম
অনাদি, খুঁটে খাই—পাখিদের নরম কুহু


শান্ত সেতার

মা ও আমার বয়স ঘড়িতে সমান, যেন পুঁচকে নুড়িপাথর
গড়িয়ে গড়িয়ে সত্য বলা ঝরনার ভিতরে রঙিন মাছ হয়েছি
আনরূপ পাখিরা যেদিন সূর্যের জরায়ু রচিত গান হয়েছিল—জন্মতিথি ঐ

মায়ের জঙ্গলরঙা চোখের সিন্দুক থেকে গোপনে বীজ দিয়েছিল
মেঘ মাখানো সাইকেল চালিয়ে শারদীয় আলপথ ধরে
এগোলেই, আমাদের সবজি খেত— সেইখানে ছড়িয়ে দিয়ে
নৈঋতের মেঘকে বলেছি, কৃষিপ্রার্থনা রাখো

বিন্দুবীজ থেকে সন্তানের আঙুলের মতো সবুজ জেগে ওঠে
যা কিছু আশ্চর্য করেছে এতদিন, সমস্ত বিহ্বলতাকে
ভুলে যেতে সাক্ষী ঝিঙেলতা, সাক্ষী বরবটি ফুল
কুমড়ো ফুলের কৌটায় নিয়েরের হীরককুচি

মায়ের সংসারে ভ্রমরের কালো গান
মৃৎহাঁড়িতে স্ত্রীমৌমাছির প্রেমে
সকালের ভৈরবী মিশিয়ে, দুপুর রোদে ভিয়েন
রাত্রির পালকে আহারাদি পর আমরা শান্ত সেতার

এক নির্জন আঙুল আমাদের বাজিয়ে সবজি ক্ষেতের দিকে নিয়ে যায়


বাইসনের শিং

আভোলা চাঁদের রেণু পড়ে সাইকেলের হাতল বাইসনের শিং
অশীতিপর সাঁকো পেরিয়ে যাচ্ছি বহুদূর,
আমার কোনো গীর্বাণ নেই;
মায়ের আঁচলের মতো প্রণময়ী পথের কপালে
সূর্যমুখীর খেত আঁকব বলে হাতের মুঠোতে এই কল্লাচ পাথর

কন্যারঙের চালতাগাছ পিছু ডাকে
বাবার কবরের অগাধ ছায়া চুঁইলতার মতো জড়িয়ে ধরেছে সাইকেল;
সন্ধ্যার কানাগলির পেটে বসে থাকা ভিখারির চোখের মেঘে
আকাশের ওজন চৌদিশে অন্ধকার—তবুও পথ প্রবাহিত
মাকড়াপাথর মাড়িয়ে মাড়িয়ে
অনন্ত চিকন একটা ঝরনা থেকে
যূথভঙ্গ হরিণীর মুদ্রায় একটু জল খেতে হবে;
সম্মুখে প্রভূত মরুপথ, ফণিমনসার ঝোপে অস্তনির্জন সূর্য
ভুলে যাচ্ছে গীতস্মৃতি— তার স্বেদাক্ত মুকুর মুছে
নির্জন স্বরলিপির বুরুজ জাগানোর এই যাত্রা;

প্রচণ্ড সৈনিক কখনো নই, জয়-পরাজয়ের হীরণ্ময় মুকুট
স্বেদজলমোছা কাগজের মতো ছুঁড়ে ফেলে
আলোর বিলগ্ন রেখার দিকে ধাবমান আমি বাইসনের শিং

অহিলেখ্য রূপোর দোয়াত, প্রয়োজনে ভীষণ তরবারি


ছুড়ান

মায়ের ছায়ায় আঁকা স্কুল ছুটির দিন
বোবা ক্লাসরুমের দুপুরে জংধরা ঘড়ির জঙ্গলে
ফড়িংরঙা লাটিম হারিয়ে ফেলেছিলাম, অনন্ত খুঁজে খুঁজে
বন্ধ স্কুলের মাঠে হলুদ মর্মরস্তূপের ভিতর আমিই সেই লাটিম
নিজের সাথে একা ঘুরতে ঘুরতে
যুদ্ধকাহিল উড়োজাহাজের উঁচোট খাওয়া পেখম কুড়িয়ে পেয়েছি;
পেখমে রথ বানিয়ে
পুণ্ড্র, বেথলেহাম, বাগদাদ কিংবা উজ্জয়নী ছেড়ে
পৌঁছে গেছি বরফগুহার দরজায়
মূলাধার থেকে টেনে নিয়ে ছুড়ে দিলাম পবিত্র সিসেম—
খুলে যাও খুলে যাও শব্দসিন্দুক, আছে নৈঃশব্দ্য-ছুড়ান

শব্দকে ঘুমাতে দেব না,
তার নিরালা শিয়রে বসে নৈঃশব্দ্যের তসবি গুনে গুনে
ঈশ্বরের স্বকৃত মন্ত্রগুপ্তি জেনে নেব,
তেত্রিশ লক্ষবার নিজের নিভাষ শরীরে ফুঁ

একটার পর একটা স্বপ্ন না দেখা সিন্দুক খুলে খুলে
রংচঙা পালক উড়িয়ে গাইব শীতের কাসিদা


সত্যান্বেষী

স্ত্রী আর কন্যারা ঘুমালে তার পৃথিবী
অথবা পৃথিবীর ব্যক্তিগত সকল ঘুম স্ত্রী কন্যা হলে
অরবে মশারির শামিয়ানা থেকে মেটেসাপের নিরীহ শরীরে নামে;
ঘুমচোর একটা হাতভাঙা চশমা
তার চোখদুটোকে শৈশবের হেরে যাওয়া
মার্বেলের হামাগুড়ি শেখায়, সমস্ত ঘরে, ঘুমন্ত আসবাবের ড্রয়ারে
যেন একটা ডাইনিযোনি গর্তের ভিতরে প্রবলপাতিত
হাতড়ে যাচ্ছে, কেবল স্মৃতির নিরুদবিগ্ন নিস্বন ছাড়া অলীক সব
কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে রাতেদের কর্নিয়ায়
সে এখন নিপাট অন্ধকার—

সত্যান্বেষী গভীর— নিজের মুখস্থ শরীরের চেহারা হারিয়ে
জানালাবিহীন দেয়ালে খোঁড়া বিড়াল, কীটনিচয়
স্মৃতিভ্রংশ প্রাকমানুষের ছায়া
গুহা থেকে বেড়িয়ে আসছে

জন্মস্মৃতির আগে মৃত্যুর ছায়াছবি মনে পড়ে
মৃত্যুর ভিতরে টাটকা মৃত্যুর মোহন আলাপ
নিজের ভিতরে আরও নিজস্ব ভ্রূণে
পৃথিবীর ঘুমের নির্জনে, স্ত্রী-কন্যার সৈকতে দাঁড়ায়

হিমশান্ত হাওয়ায় দুলতে থাকা সেকেন্ডের কাটার মতো
তার ছায়া প্রলম্বিত, মিশে যাচ্ছে ঢেউয়ে