খ্রিস্তিয়ঁ বোবাঁ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫১ সালে ফ্রান্সের ল খ্রুজো এলাকায়। পঁচিশ বছর বয়সে তিনি তার প্রথম বই 'Lettre pourpre' লেখা শুরু করেন। বোবাঁকে কখনোই খ্যাতির পেছনে ছুটতে দেখা যায়নি। নিজেকে পর্দার আড়ালে রাখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি নানা ধরনের কাজ করেছেন। কখনো অতুঁ শহরের গ্রন্থাগারিক হিসেবে কাজ করেছেন, কখনো ল খ্রুজোর ইকোমিউজিয়ামে দর্শনার্থীদের গাইড হয়েছেন। আবার 'Milieux' পত্রিকায় লেখালেখি করেছেন, মনোরোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে নার্সিংয়ের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, এমনকি দর্শনের শিক্ষক হিসেবেও কাজ করেছেন। ১৯৯১ সালে প্রকাশিত 'Une petite robe de fête' বইটির মাধ্যমে লেখকজীবনে বড়ো সাফল্য পান। বইটি প্রায় ২ লক্ষ ৭০ হাজার কপি বিক্রি হয়। পরের বছর, তখনও যথারীতি প্রচারবিমুখ বোবাঁ ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক মহলে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেন 'Le Très-Bas' বইটি প্রকাশের মাধ্যমে। আসিসির সন্ত ফ্রঁসিসকে নিয়ে লেখা এই বইটি ৪ লক্ষেরও বেশি কপি বিক্রি হয়। ১৯৯৩ সালে বইটির জন্য তিনি 'Prix des Deux Magots' এবং 'Grand Prix catholique de littérature' পুরস্কার লাভ করেন। জনপ্রিয়তা বোবাঁকে কখনোই বদলাতে পারেনি। 'Louise Amour' বইয়ে তিনি তার জীবন সম্পর্কে লিখেছেন: “আমার জীবন কেটেছিল পৃথিবীর কোলাহল থেকে দূরে, বইয়ের ভেতর। আর আমি না জেনেই আমার পড়াশোনার সঙ্গে ঠিক সেই কাজটিই করেছিলাম, যা পাখিরা সহজাত প্রবৃত্তিতে গাছের ন্যাড়া ডালপালার সঙ্গে করে। তারা ডালগুলোকে ঠোকরায়, কুটে কুটে ভেঙে নেয়, যতক্ষণ না একটি ছোট্ট ডাল আলাদা হয়ে আসে; তারপর সেই ডালটিকে অন্য ডালের সঙ্গে জুড়ে জুড়ে তারা নিজেদের বাসা তৈরি করে।” নিজের জন্মস্থান ল খ্রুজো সম্পর্কে বোবাঁ লিখেছেন, “আমি ইস্পাতের দোলনায় জন্মেছি।” ল খ্রুজোতে একদিকে ছিল বিশাল শিল্পকারখানার ভারী হাতুড়ির অবিরাম আঘাত, অন্যদিকে শ্নাইডার কারখানার সাইরেনের ডাক। অথচ তার লেখায় সেই শিল্পনগরীর কোনো কাহিনি নেই—নেই শিল্পায়নের উপন্যাস, সামাজিক বাস্তবতার সরাসরি চিত্র, কিংবা শ্রেণিসংগ্রামের কথা। তার লেখার ধরন ছিল অনেকটা বিন্দু-বিন্দু করে আঁকা ছবির মতো—অতি সূক্ষ্ম, নীরব ও সংবেদনশীল; যার দৃষ্টি বারবার ফিরে যায় প্রকৃতি আর আকাশের দিকে। বোবাঁ তার লেখায় এমন এক আবহ তৈরি করেন, যা প্রায় ধর্মীয় অনুভূতির কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তার কবিতার মতো হালকা, স্বচ্ছ ও মেঘের মতো ভেসে থাকা গদ্য পাঠককে থেমে যেতে, নীরব হতে এবং নিজের ভেতরে ডুব দিয়ে ভাবতে আহ্বান জানায়। খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি ছড়িয়ে আছে তার রচনায়। 'Le Très-Bas' এবং 'Ressusciter' বই দুটো এই ধারার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২০১০ সালে 'Psychologies' পত্রিকায় নিজের বিশ্বাস সম্পর্কে তিনি বলেছেন: “আমার বিশ্বাস আসলে মননের, ধ্যানের এক ধরনের অভিজ্ঞতা। পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে বেঁচে আছি—এই বিস্ময় থেকে আমি কখনো বেরিয়ে আসতে পারি না। আমি যেন সদ্যোজাত শিশুর মতো বিস্মিত হয়ে থাকি; জীবনের ‘যা কখনো দেখা হয়নি’, সেই অজানার প্রতি আমার এক সীমাহীন আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। এর সঙ্গে সেই ঈশ্বরের কোনো সম্পর্ক নেই, যাকে চার্চের স্বয়ংক্রিয় বিধি-নিষেধের মধ্যে বন্দি করে রাখা হয়েছে।” বোবাঁ লিখেছেন প্রবন্ধ আর কবিতার মাঝামাঝি এক নিজস্ব ভঙ্গিতে। ফলে তার কোনো কোনো বই হয়ে উঠেছে ডায়েরির মতো—যেমন 'Autoportrait au radiateur'; আবার কোনো বই গড়ে উঠেছে একের পর এক চিঠির মতো করে—যেমন 'Un bruit de balançoire'। উল্লেখযোগ্য কবিতার বইগুলোর মধ্যে রয়েছে: 'L’Enchantement simple' (১৯৮৯), 'Le Colporteur' (১৯৯০), 'La Vie passante' (১৯৯০), 'La Présence pure et autres textes' (২০০৮)। ২০১৬ সালে তার সমগ্র সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি 'Le prix de l'Académie Française' পুরস্কার লাভ করেন। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২০২২ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
||
তোমাদের কাছে সত্য লুকিয়ে থাকে সংখ্যা, যুক্তি আর প্রমাণের মধ্যে। তোমাদের সত্য বাইরের জগতে—তোমাদের সামনে, যেমন পথিকের সামনে বিস্তৃত প্রাকৃতিক দৃশ্য, যেমন ভোরের সামনে দিগন্ত
আর আমাদের কাছে সত্য তেমন কিছু নয়।
দূর আকাশে সে জ্বলে না। সে গান গায় একেবারে কাছাকাছি। সে পথের শেষে নয়, পথটিই সে। সে আমাদের সামনে নয়, আমাদের মাঝখানেই বাস করে।
আমরা সত্যের মধ্যে বাস করি, যেমন গভীর জলের মধ্যে খেলে বেড়ায় শিশুরা। তারা ডুব দেয়, হারিয়ে যায়, আবার ভেসে ওঠে—হাতে এক মুঠো ঘাস, ঠোঁটে একেকটি ধাঁধা:
কে আমাদের সবচেয়ে ভালো চেনে, মায়ের চেয়েও?
—মৃত্যু।
বাতাস কোথা থেকে আসে?
—এক প্রাচীন বই থেকে, যা কেউ বন্ধ করতে ভুলে গেছে।
সত্যিকারের কথাকে কীভাবে চেনা যায়?
—তার নীরবতা দিয়ে।
তুষার কী?
—একটু শীত, অনেকখানি শৈশব।
কে ভোর পর্যন্ত নাচে?
—নক্ষত্র।
কে হাঁটে, অথচ নিজের পদচিহ্ন মুছে দেয়?
—মমতা।
আমাদের সঙ্গে ফেরেশতাদের পার্থক্য কোথায়?
—তাদের সহজাত স্বাভাবিকতায়।
যে কুকুর নিজের প্রভুকেই কামড়ায়, তার নাম কী?
—খ্যাতি।
মৃত্যুর পরও কে হাসে?
—পাতার ফাঁকে বৃষ্টির শব্দ।
আমাদের হাত থেকে কে আহার করে?
—আশা।
আমাদের অনুপস্থিতিতেই কে আমাদের ঘরে আসে?
—ভালোবাসা।
কে কখনো অসুস্থ না হয়েও জ্বরে ভোগে?
—সময়।
কে নোংরা কাপড় দিয়ে আলো মুছে ফেলে?
—উন্মাদনা।
কে নিমন্ত্রণ ছাড়াই আসে, আর তাড়িয়ে না দিলেও চলে যায়?
—জীবন।
এইভাবেই আমরা সত্যের ভেতর বয়ে চলি—যেমন একটি শিশু তার খেলার ভেতর দিয়ে: হারতে হারতে জেতে, জিততে জিততে হারে। আর সে সবসময়ই প্রস্তুত থাকে বলতে, সবসময়ই প্রস্তুত থাকে খেলতে।
কারণ, যদি তোমাদের কাছে সত্য হয় এক বৃদ্ধ, তবে আমাদের কাছে সত্য হলো এক শিশু।
||
একটি চিঠির খসড়া, যা কখনো পাঠানো হবে না: «আপনি আমাকে যা বলছেন, তা শুনছি; আর তার চেয়েও যা বেশি শুনছি, তা হলো—আপনি কীভাবে কথাগুলো বলছেন। আপনি এমন কিছু চাইছেন, যা নেই আপনার; আর যেহেতু সেটি আপনার নেই, তাই আপনি তার কথা বলছেন এমনভাবে, যেন সেটি আপনার প্রাপ্য। আপনাকে দেখে ওইদিন রাস্তায় শোনা সেই কথাটি মনে পড়ে যায়: “সে ভালোবাসা পেতে চায়—কী বোকামি!” এই বোকামিটি রয়ে গেছে সেই বিশ্বাসে যে, আমাদের ইচ্ছাই আমরা যা চাই, তার ওপর আমাদের এক ধরনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে—যেন তার গায়ে আগে থেকেই সামান্য আঁচড় বসিয়ে রেখেছে। কিন্তু সত্যি বলতে, আমাদের মধ্যে এমন কী আছে, যা ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য? যতই খুঁজি, কিছুই তো দেখতে পাই না। বোকামিটি চাওয়ার মধ্যে নয়; বোকামিটি হলো নিজের চাওয়াটিকে অভিযোগে, আর ক্রমে তা দাবিতে পরিণত করা। আমি জানি, আপনি আসলে সেসবের কথা বলছেন না। কিন্তু আপনি যে সুরে কথা বলছেন, সেই সুরেই যেন সেসব কথা উচ্চারিত হচ্ছে। আর সত্য প্রথমে শব্দের মধ্যে নয়, থাকে আমাদের নিঃশ্বাসে। আমি আপনার যুক্তিগুলো শুনি, অথচ শুনতে পাই কেবল আপনার ক্ষোভ। কিন্তু তিক্ততার মধ্যে আমি কখনো এক বিন্দু সত্যও খুঁজে পাইনি। হতাশ এক আত্মমর্যাদার করুণ দশা ছাড়া সেখানে কখনো আমি আর কিছুই শুনিনি। আমি সত্যের ঔজ্জ্বল্য কেবল আনন্দের মধ্যেই উপলব্ধি করি, এবং তার সঙ্গে সর্বদা থাকা সেই আত্মসচেতনতায়, কিছুই না হওয়ার সেই দীপ্তিময় সচেতনতায়—আর তখন আমরা কী করে কোনো কিছুর দাবি করতে পারি আর কেনই বা এমন এক চাওয়াকে আঁকড়ে ধরে থাকব, যে চাওয়া ঠিক জানেই না সে কী চায়, শুধু জানে যে সে তা চায়? ভালোবাসা আসে করুণাতেই, আমরা যা, তার কোনো হিসাব না রেখেই। তাছাড়া এমনটি যদি না হতো, তবে ভালোবাসার দেখা কখনোই পেতাম না আমরা। নিশ্চিন্ত থাকুন: আমি যদি এসব নিয়ে লিখি, তবে এসবের যোগ্যতা থেকে বহুদূরে আমি। অন্তত, ছায়াময় পথে দিগন্তের দিকে আজ যে পাহাড়গুলোতে পৌঁছানো যাবে না, সেদিকে তাকিয়ে থাকার মতো করে আমি এসব নিয়ে ভাবা কখনো থামাই না। প্রতিদিন সকালে আমাদের দরজায় কড়া নাড়া এক দূতের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার মতোই আমরা দাঁড়িয়ে আছি জীবনের সামনে। আমরা তাকে ভেতরে আসতে বলি, বসতে দিই, তারপর তাকে বলতে শুরু করি আমাদের আশাগুলোর কথা, জানাতে থাকি আমাদের অভিযোগের কথা। এরপর তাকে আমাদের সঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাব দিই আর আবার শুরু হয় অভিযোগের সেই দীর্ঘ জপমালা, আশাগুলোর অনর্গল বকবক, এবার সন্ধ্যা নেমে আসে, আমরা তাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিই, বিদায় জানাই—অথচ এতক্ষণ ধরে সে আমাদের চোখের সামনে যে চিঠিটা দুলিয়ে চলেছে, তা পড়ার কথা এক মুহূর্তের জন্যও আমাদের মাথায় আসেনি।»
—একাকিত্ব কি আপনার কাছে খুব ভারী হয়ে ওঠে না?
—একাকিত্ব তো ভারহীনই: ফুটে-ওঠা আলোর মধ্যে যেমন পাখি উড়ে বেড়ায়, তেমনি সেখানে উড়ে বেড়ায় হৃদয়ও।
||
মনে হয়, আমার মুখ আলোকিত হয়ে উঠছে—আমি ঝুঁকে আছি যে বইটির ওপর, সেটিই যেন একটি জ্বলন্ত মোমবাতি।
গাছেরা আলোর ভেতর ঘুরে বেড়ায় অন্ধের মতো, তাদের বাহু ছড়িয়ে থাকে এলোমেলোভাবে।
গাছ, চড়ুই কিংবা কোনো চীনা মানুষ—যখনই কেউ সত্যিকার অর্থে কথা বলে, মুছে যায় মৃত্যুর অস্তিত্ব।
ভ্রাতৃত্বসুলভ কণ্ঠস্বর একসূত্রে নিয়ে আসে সব জগৎকে আর শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয় নক্ষত্রদের ঘুমে।
প্রয়াত লেখকদের নামই যেন একেকটি ঘণ্টাধ্বনি। তাদের নাম উচ্চারণ করলেই আমি শুনতে পাই সেই অনুরণন।
জানালা দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ে সবুজ রঙের বাতাস। আমাকে জাগিয়ে তোলে এক কালো ময়নার গান। আমি বুঝতেই পারিনি, কখন যে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। তোমার মৃত্যুর পর জন্ম নেওয়া মানুষদের কাছে তুমি লুই চতুর্দশের মতোই সুদূর অতীত। আর অষ্টম শতাব্দীর চীনা কবিদের কাছে তুমি বসন্তের পাখির মতোই তরুণ।
আন্না আখমাতোভার কণ্ঠস্বর। ১৯১২ সালের এক প্রেমবেদনা। প্রিয়জনের ছেড়ে যাওয়া সেই ভূমিকম্প, যার আভাস আগে থেকেই অনুভব করে অন্তরাত্মা। একটি কবিতা হলো একজন নারী বা পুরুষের অনুভব করতে পারা সংবেদনশীলতার সর্বোচ্চ সীমা। যেন একটুখানি বেশি হলেই ভাষার ফুসফুস ফেটে যাবে, যেমন ফেটে যায় সেই ডুবুরিদের ফুসফুস, যারা সমুদ্রের অতল থেকে খুব দ্রুত ওপরে উঠে আসে।
||
চোখ আর কণ্ঠস্বরে লেগে থাকা ছোটো ছোটো ছায়ারা, তোমরা বরফশীতল, ছোটো ছোটো ছায়ারা। নরকের সেই দরজা, যা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছি আমরা।
অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় উপস্থিত হয়ে তুমি দাঁড়িয়ে আছ তোমারই কফিনের পাশে, হালকা ওক কাঠের ওপর রাখা একটি হাত।
পুরোনো বইয়ের দোকানে একটি বই কখনো কখনো এমন এক মৃত মানুষ, যে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে মিনতি করে—তুমি ছেড়ে যেও না আমাকে।