সেলিম আল দীন তাঁর ‘বনপাংশুল’ নাটকের প্রারম্ভে ‘বন প্রবেশ-১’ পর্বে লিখেছেন— “আজ সূর্যাস্তে পরন কথার প্রত্নবর্ণ বিলেপন দেখেছি মান্দাই অরণ্যের কুয়াশা ধরানো আকাশে আশ্বিনের মধ্যভাগে। তারই অস্তগামী আলোর বিপরীতে যে ক্ষয়িষ্ণু নৃগোষ্ঠীর ছায়া সভ্য মানুষের আত্মম্ভরী ইতিহাসে তার কথা মাত্র লেখা হয় নাই।” বঙ্গীয় ভূগোলে এই জনপদের জাতিগত ইতিহাস-সংস্কৃতি বহুকাল ধরেই প্রবল অবহেলায়-অনাদরে পড়ে ছিল। হাজার বছর ধরে বহিঃশত্রুর শাসন ও শোষণের ভয়ংকর ইতিহাসের দরুন বাঙালিদের জাতিগত সৌকর্য-স্বকীয়তা ইতিহাসের পাতায় প্রবলভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। সর্বশেষ প্রায় দু’শ বছর ধরে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন জাতিগত স্বকীয়তার ভিত্তি নড়বড়ে করে দিয়েছে একেবারে। দুর্বলের উপর সবলের যে চিরাচরিত অত্যাচার-বঞ্চনা তারই চিত্র স্পষ্ট হয়েছে সেলিম আল দীনের উপর্যুক্ত লেখায়। তবে এখানে নিপীড়িতের খাতায় বাঙালির নাম নেই, আছে ক্ষয়িষ্ণু এক নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর কথা। লেখক হিসেবে সেলিম আল দীনের দেখার ভঙ্গি ও লেখার ভঙ্গি এই দুই বিষয় যারপরনাই বিচার বিশ্লেষণ জরুরি। এই জাতির অন্ত্যজ ভাবাবেগের সলিল প্রবাহের ধারাকে তিনি স্বর্ণকলমে লিখেছেন। তাঁর নাটকের চরিত্রগুলো ক্রমশ ভূমিজ মানুষের যাপনের সাথে মানানসই রুচি, আবেগ ও সংলাপ নিয়ে হাজির হয়েছে গুণী পাঠক ও বোদ্ধা দর্শকের সামনে। কারণ তিনি কোনো কল্পিত আখ্যান লেখেননি, লিখেছেন ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির বহমান ধারায় প্রাণিত হয়ে। আর তাই হাতহদাইয়ের ‘আনার ভাণ্ডারি’, কিত্তনখোলার ‘বনশ্রীবালা’ থেকে বনপাংশুলের ‘রাজেন্দ্র মান্দাই’ সকলেই যেন জীবন্ত চরিত্র হিসেবে ধরা দিয়েছে তাঁর লেখার মানসভূমিতে। এসব আলেখ্য রচনায় তিনি কখনোবা সশরীরে আবার কখনও লোক মারফত তথ্য সংগ্রহ করেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানকালে সেলিম আল দীনের এমনই একজন ছাত্র এবং পরে সহকর্মী ছিলেন অধ্যাপক লুৎফর রহমান। ছাত্রাবস্থা থেকে সহকর্মী পর্যন্ত দীর্ঘকাল তিনি সেলিম আল দীনের সাহচর্য পেয়েছেন। সেলিম আল দীনের মহাপ্রয়াণের পর তাঁর এই ভাবপুত্র তিনটি গ্রন্থ রচনা করেছেন তাঁকে নিয়ে। ‘কালের ভাস্কর সেলিম আল দীন’, ‘বাংলা নাটক ও সেলিম আল দীনের নাটক’ এবং ‘সেলিম আল দীন: সত্তার জলছবি’—তিনটি গ্রন্থ ছাড়াও আর কিছু অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি জমা করে রেখেছেন তিনি নিজের কাছে। এই লুৎফর রহমান-ই সেলিম আল দীনকে নিয়ে গিয়েছিলেন ‘মর্মরিত অরণ্যের রক্তসিন্দুরের সিঁথি পথ বেয়ে নাককিনী দেবীর নাগের পিঠে পিঠে এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া সখিপুর পেরিয়ে গারো বাজার পর্যন্ত’ ‘রাজেন্দ্র মান্দাই’য়ের কুঁড়ে ঘর অবধি। যেই রাজেন্দ্র মান্দাই আজকাল বনপাংশুলের পাতায় ও মঞ্চের আলোধুমেল খেলায় প্রায়শ হয়ে উঠছে প্রাণবন্ত। লুৎফর রহমানের ভাষ্যে সেলিম আল দীন তাঁকে ভাবে-বিভাবে, স্নেহে-শাসনে পায়ে চলতি পথে নবরূপে গড়ে তুলেছেন। লেখক সেলিম আল দীন ও ব্যক্তি সেলিম আল দীনকে খুব কাছ থেকে দেখা লুৎফর রহমানের উল্লেখ্য তিনটি গ্রন্থ তাই সেলিম আল দীনকে পাঠ ও বোঝার জন্য কার্যকরী। এই আলোচনায় তিনটি গ্রন্থের সঙ্গে পাঠককে পরিচয় করিয়ে দেবার ক্ষুদ্রতম প্রয়াস থাকবে।
সেলিম আল দীনের মৃত্যুর অব্যবহিত পর ২০০৯ সালের একুশে বইমেলায় রোদেলা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় লুৎফর রহমানের ‘কালের ভাস্কর সেলিম আল দীন’ গ্রন্থটি। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন সেলিম আল দীনের পছন্দের প্রচ্ছদকার আনওয়ার ফারুক। সর্বমোট ১১ টি নিবন্ধ সংযুক্ত এই গ্রন্থটির মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৫৩। সেলিম আল দীনের শিল্পীজীবন ও ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা ছাড়াও গ্রন্থটিতে নানান কর্মপরিসরের বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে। প্রথম নিবন্ধটি হচ্ছে— সেলিম আল দীন: শিল্পী জীবন ও ব্যক্তি জীবন। দ্বিতীয় নিবন্ধের নাম- ব্রতচারী শিল্পী: সেলিম আল দীন। এই নিবন্ধে সেলিম আল দীনের বিস্তৃত রচনা পরিসর নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। মঞ্চনাটক থেকে টেলিভিশন নাটক, প্রবন্ধকারের পাশাপাশি নির্দেশক হিসেবেও সেলিম আল দীন স্বকীয় ভূমিকা রেখেছেন। সেসব প্রসঙ্গ উঠে এসেছে লুৎফর রহমানের আলোচনায়। লেখক হিসেবে সেলিম আল দীনের প্রথম দিকের উল্লেখযোগ্য নাটক হচ্ছে ‘শকুন্তলা’। মহাভারতের শকুন্তলা বা কালীদাসের; শকুন্তলা’ অপেক্ষা ভিন্ন একটি পাঠ উপস্থাপন করেছেন সেলিম আল দীন নাটকটিতে। এই গ্রন্থে লুৎফর রহমানের তৃতীয় নিবন্ধের শিরোনাম হচ্ছে— আবির্ভাবের অভিজ্ঞান: শকুন্তলা। চতুর্থ নিবন্ধে তিনি লিখেছেন ‘চাকা নাটক ও চিত্রনাট্য: একটি তুলনামূলক বিচার’ শিরোনামে। যেখানে চাকা নাটকের মঞ্চের পাণ্ডুলিপির সাথে তিনি মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যের পাণ্ডুলিপির তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। পঞ্চম নিবন্ধে লেখক ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব: যৈবতী কন্যার মন’ শিরোনামে দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের আলোকে যৈবতী কন্যার মন নাটকটি বিশ্লেষণ করেছেন। ষষ্ঠ নিবন্ধে হরগজ নাটক ও বাংলাদেশের থিয়েটার চর্চা নিয়ে আলোচনা করেছেন ‘বাংলাদেশের সাম্প্রতিক থিয়েটার চর্চা: প্রসঙ্গ হরগজ’ শিরোনামে। এই গ্রন্থের সপ্তম নিবন্ধের নাম হচ্ছে— বনপাংশুল: মহাজীবনের পাঁচালি। ১৯৯৬-৯৭ সালে নব্যপাঁচালি আঙ্গিকে রচিত এই নাটকের গড়ন-গঠন ও চরিত্রসমূহের উৎপত্তি নিয়ে সবিস্তারে আলোচনা করেছেন লেখক লুৎফর রহমান। সেলিম আল দীনের এই নাটকটি রচনার প্রেক্ষাপটের সাথে লেখকের ছিল সরাসরি সংযোগ। নব্যপাঁচালি রীতিতে রচিত সেলিম আল দীনের অন্য একটি নাটক ‘প্রাচ্য’ নিয়ে পরবর্তী অষ্টম নিবন্ধটি লিখেছেন লুৎফর রহমান। এখানেও লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও প্রখর বিশ্লেষণ ভঙ্গিমা ফুটে উঠেছে ‘প্রাচ্য নাটকপাঠ, প্রযোজনা: নন্দনতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ’ শিরোনামে। নবম নিবন্ধের শিরোনাম— গ্রাম থিয়েটার, সেলিম আল দীন: জাতীয় নাট্য আঙ্গিক প্রসঙ্গ। দশম নিবন্ধটি হচ্ছে মৃত্যু শয্যায় সেলিম আল দীনের শেষ দিনগুলো সম্পর্কে লুৎফর রহমানের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ। এর শিরোনাম— দিনপঞ্জির সেই দিনে। এগারোতম ও শেষ নিবন্ধটি হচ্ছে গ্রন্থ নামাঙ্কিত অর্থাৎ ‘কালের ভাস্কর সেলিম আল দীন’। সেলিম আল দীনের বিভিন্ন নাটকের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ও নাট্যঘটনার চমকপ্রদ বিশ্লেষণ করেছেন লেখক এই নিবন্ধে।
লুৎফর রহমান রচিত ‘বাংলা নাটক ও সেলিম আল দীনের নাটক’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে একুশে বইমেলা ২০১২তে নান্দনিক প্রকাশনী থেকে। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন লেখক নিজেই। ১২টি ছোট ছোট নিবন্ধ সন্নিবেশিত হয়েছে ২৯৩ পৃষ্ঠার বইটিতে। ‘কহনকথা’ নামে প্রথম নিবন্ধে তিনি লেখা শুরু করেছেন সেলিম আল দীনের মহাপ্রয়াণের স্মৃতি সহকারে। ক্রমশ তাঁর নাটকের ক্রমবিবর্তন, বেড়ে ওঠা ও লেখার ভঙ্গিমা নিয়ে আলোচনা করেছেন। একটি অংশে তিনি লিখেছেন— “সাম্রাজ্যবাদী শোষণ অধ্যুষিত বাংলার অনগ্রসর সমাজের মানুষ হলেও সেলিম আল দীন সমসাময়িক অন্যান্য শিল্পী-সাহিত্যিক-কবি-গীতিকার-নাট্যকারদের মতোই অত্যন্ত সচেতনতার সঙ্গে বিশ্বপরিস্থিতি পরিবর্তনের প্রতিটি বাঁকের প্রতি তীক্ষ্ণদৃষ্টি নিবদ্ধ রাখেন। সেই সঙ্গে তিনি দেশীয় আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির সংগ্রামমুখর পরিবেশ এবং বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটের প্রত্যক্ষদর্শী। পূর্বপুরুষ এককালে তালুক থেকে খাজনা আদায় করতেন। অর্থাৎ গ্রামীণ জোতদার পূর্বপুরুষের মেজাজ রক্তপ্রবাহে আমৃত্যু বয়ে বেড়িয়েছেন তিনি। শিল্পীজীবনের প্রারম্ভে নগরজীবনের জটিল দ্বান্দ্বিকতা তাঁর নাটকের উপজীব্য রূপে প্রত্যক্ষ করি। আঙ্গিকেও পাশ্চাত্য নাটকের বিশেষত বেকেটীয় জগতে পৌঁছবার প্রয়াস লক্ষণীয়। শিল্পীসত্তার উদ্বোধনকালে দেশীয় আঙ্গিকের প্রতি আত্যন্তিক ঝোঁক প্রায় মন্ত্রসিদ্ধির স্তরে পৌঁছে দেয় তাঁকে। সেলিম আল দীন সম্পর্কে এসব সকলের জানাকথা। ঘটনাদৃষ্টে বলা যায়, তিনি কতকটা মধুসূদন দত্তের মতোই পাশ্চাত্য শিল্পরীতির নানা বাঁক সাঁতরে পার হয়ে বঙ্গজননীর চরণামৃত পান করেন। রীতির বিরুদ্ধে রীতিহীনতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। এবং তাঁর এ যুদ্ধের সূচনা বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরে। এ ছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাঙালি জাতির নিজস্ব শিল্পরীতি প্রতিষ্ঠার আবশ্যকতার বোধপ্রসূত সাংস্কৃতিক মুক্তির সংগ্রামের অংশ। অন্য অনেকের সঙ্গে সেলিম আল দীন এই যুদ্ধের অন্যতম সাগ্নিক।”
এই গ্রন্থের দ্বিতীয় নিবন্ধের নাম— বাংলা নাটক ও সেলিম আল দীন। বাংলা নাটকের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য অন্বেষণের নিমিত্তে দেশের বিভিন্ন প্রান্তর থেকে রসদ সংগ্রহ করেছেন সেলিম আল দীন। নানান ধরনের ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্য অবলোকনের মাধ্যমে তিনি সচেষ্ট ছিলেন বাঙালির নিজস্ব নাট্য আঙ্গিক নির্মাণে। সেসব প্রসঙ্গই এই নিবন্ধে তুলে ধরেছেন লেখক লুৎফর রহমান। ‘ভাঙ্গা হাঁটের মেলার পরে’ নামক তৃতীয় নিবন্ধে তিনি সেলিম আল দীনের প্রয়াণ পরবর্তী বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ঢাকা থিয়েটার আয়োজিত ৬০তম জন্মজয়ন্তী উদ্যাপন সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেছেন। চতুর্থ নিবন্ধের নাম— এক জনমে কত বদল প্রসঙ্গে। এই নিবন্ধে আলোচনার ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। পঞ্চম নিবন্ধে তিনি লিখেছেন— গ্রাম থিয়েটার: জাতীয় নাট্য আঙ্গিক প্রসঙ্গে। বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার কীভাবে জাতীয় নাট্য আঙ্গিক নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে সেটি আলোচনা করা হয়েছে এখানে। ষষ্ঠ নিবন্ধের নাম— গ্রাম থিয়েটারের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন: একটি অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি। এই গ্রন্থের সপ্তম নিবন্ধটি হচ্ছে— কহুয়ারে কহুলো। এটি ‘সেলিম আল দীন স্মারক বক্তৃতা’র লেখ্যরূপ। অষ্টম নিবন্ধে লেখক ‘অভিন্ন তীর্থের তীর্থংকর’ শিরোনামে আধুনিক ভারতীয় থিয়েটার ব্যক্তিত্ব হাবীব তানবীর ও সেলিম আল দীনের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। ঐতিহ্যের নবনির্মাণ সেলিম আল দীনের 'কিত্তনখোলা' নাটকটি নিয়ে নবম নিবন্ধে লেখক ‘সেলিম আল দীন, কিত্তনখোলা: ঐতিহ্য ও সৃজন’ শিরোনামে লিখেছেন। দশম নিবন্ধের শিরোনাম হচ্ছে— ‘শকুন্তলা’ নাটকে প্রবচনতুল্য সংলাপ: দার্শনিক অভিপ্রায় ও নান্দনিক মূল্য। এটি মূলত সেলিম আল দীনের ‘শকুন্তলা’ নাটক প্রসঙ্গে আলোচনা। এগারোতম নিবন্ধের নাম— সেলিম আল দীনের নাটক: আর্থ-সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে ভূমিকাপত্র। এবং সর্বশেষ বারোতম নিবন্ধের শিরোনাম— সেলিম আল দীনের নাটকের চিত্রভাষ্য: একটি বিবেচনা। এগারো ও বারোতম নিবন্ধে লেখক মূলত সেলিম আল দীনের নাটকের প্রাসঙ্গিকতা ও সৌকর্যতা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
সেলিম আল দীনকে নিয়ে লুৎফর রহমান রচিত সর্বশেষ ‘সেলিম আল দীন: সত্তার জলছবি’ গ্রন্থটি ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে কোলকাতার রক্তকরবী প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে। সাতটি অধ্যায়ে বিভক্ত এই গ্রন্থের মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৯৯। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন ফাহরিয়াজ ইমরান। গ্রন্থটির প্রথম অধ্যায়ের শিরোনাম— সেলিম আল দীনের নাটক: শিকড় রসের উদ্ভাসন। এই অধ্যায়ে লেখক ঔপনিবেশিকতার অবলেশ ভেদ করে দেশজ সংস্কৃতির শেকড় অনুসন্ধানী নাট্যকার হিসেবে সেলিম আল দীনের পরিচয় তুলে ধরেছেন। দ্বিতীয় অধ্যায়ে লেখক সেলিম আল দীনের নাটক ও কর্মের বিস্তার ও তাঁকে নিয়ে গবেষণার সংকট সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। এই অধ্যায়ের শিরোনাম— সেলিম আল দীন গবেষণার খতিয়ান: চিহ্নিত অচিহ্নিত সংকট। দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব ও সেলিম আল দীন নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে ‘সেলিম আল দীন: দ্বৈতাদ্বৈতবাদ: একটি অন্বেষণ’ শিরোনামে তৃতীয় অধ্যায়ে। এই গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়ের শিরোনাম হচ্ছে— সেলিম আল দীন: ‘এই যে আমি’; অন্তর্গত ভাবালোক। এটি মূলত সেলিম আল দীনের ১১ তম মহাপ্রয়াণ উপলক্ষ্যে আয়োজিত একটি সেমিনারের স্মারক বক্তৃতার লেখ্যরূপ। মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে প্রকাশিত হয় সেলিম আল দীনের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘ভাঙা প্রেম অশেষ বিশেষ’। যেখানে সেলিম আল দীন শিল্পী সত্তার প্রবল প্রকাশে বস্তুগত জীবনের প্রেমকে ভাবালোকের আঙ্গিকে সাবলীলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। পঞ্চম অধ্যায়ে ‘সেলিম আল দীন: ভাঙা প্রেম অশেষত্ব বিশেষত্ব: একটি পর্যবেক্ষণ’ শিরোনামে উল্লিখিত গ্রন্থটির তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা করেছেন লেখক। ষষ্ঠ অধ্যায়টি সেলিম আল দীন রচিত একমাত্র দিনলিপি প্রসঙ্গে। শিরোনাম— দিনলিপি: ‘দিন গেল দিন গেল’ আত্মালোক, ভাবলোক। সপ্তম ও শেষ অধ্যায়ে লেখক সেলিম আল দীনের সমসাময়িকতা, পূর্ববর্তী লেখকদের সঙ্গে সামঞ্জস্যতা ও ভাবীকালে তাঁর রচনার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিস্তৃত আলোকপাত করেছেন। এই অধ্যায়ের শিরোনাম— সেলিম আল দীন: স্রষ্টা, একাল ও ভাবীকালে, কতিপয় পর্যবেক্ষণ। এটি সেলিম আল দীনের প্রাসঙ্গিকতা সম্পর্কিত আলাপটিকে আরও জোরালো করেছে।
এই তিনটি গ্রন্থের বাইরেও বিভিন্ন সভা-সেমিনারের বক্তৃতা এবং সেলিম আল দীন সম্পর্কিত আরও কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধের পাণ্ডুলিপি লেখকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। যা ভাবীকালে সেলিম আল দীন নিয়ে গবেষণা ও বাংলা নাট্যের তৎপরবর্তী উৎকর্ষ সাধনে লেখক-পাঠক-গবেষকের কাছে মূল্যমান বিচারে বিপুল সমাদৃত হবে বলেই আশা ব্যক্ত করা যায়।
শেষাংশে আবারও মনে পড়ে বনপাংশুলের স্মৃতি, সেলিম আল দীন লিখেছিলেন— “অরণ্যের বৃক্ষবাকলে ঝরাপাতার বিশুষ্ক পত্রশিরাদিতে কিছু হয়ত লেখা ছিল কালের অদৃশ্যমান অগ্নিতে পুড়ে গেছে। কিছু লেখা উড়ে গেছে গাজন দিনের বৈশাখি বাতাসে। কৃষিজীবী মান্দাইরা কিছু পঙক্তি রচনা করেছিল বনস্থালীর অবসরে শস্যক্ষেত্রে লাঙ্গলের ফলায়।” এই ভূমিজ সন্তানেরা হাজার বছর ধরে নিজেদের স্মৃতির আকর কেটেছে কত বিচিত্র পন্থায়। সেলিম আল দীন গভীর অনুধ্যানে সেসব রত্ম কর্ষিত জমির গহিন থেকে আবিষ্কারের প্রয়াস নিয়েছিলেন। “তিনি উপলব্ধি করেন এ আপাত নিস্তরঙ্গ জনপদের ভেতরে আছে এক সুগভীর সংগীতের সুরসুধা”। আর তাই বাংলা নাটকের সহস্রবর্ষের ইতিহাসে সেলিম আল দীনের নামটি নিশ্চিতই স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট জন্মগ্রহণ করা এই মহান লেখক ২০০৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি পরলোকে গমন করেন। মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে তিনি তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘ভাঙা প্রেম অশেষ বিশেষ’ এ প্রচণ্ড অহমের সাথে বলেছিলেন— “আমার শেষ নেই, আমি নিশ্চিতই কাল থেকে কালে বাহিত হবো লেখক হিসেবে।” লেখকের এই আত্মঅহমিকা সম্বলিত উক্তিটি কতটা সত্য তার উত্তর মহাকালই দেবে। তবে মৃত্যুর প্রায় ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও সেলিম আল দীন এখনও যে প্রাসঙ্গিক তা বলাই বাহুল্য।