'নির্বাচিত দেবদূত' : নাগরিক জীবনের নিঃসঙ্গতা ও পুরুষতন্ত্রের মনস্তত্ত্ব 

সমকালীন বাংলা কথাসাহিত্যে তরুণ লেখকদের পদচারণা বরাবরই নতুন এক বয়ানশৈলী ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার দ্বার উন্মোচন করে। সাজিদ উল হক আবির রচিত এবং 'অনুবাদ প্রকাশনী ' থেকে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ 'নির্বাচিত দেবদূত' সেই ধারারই এক অনন্য ও মননশীল সংযোজন। ২০২৪ সালের মর্যাদাপূর্ণ 'কালি ও কলম তরুণ কবি ও লেখক পুরস্কার' বিজয়ের মাধ্যমে বইটি ইতোমধ্যেই সাহিত্যে মহলে নিজের শক্ত অবস্থান জানান দিয়েছে। জাহিদ সোহাগের আঁকা চমৎকার ও প্রতীকী প্রচ্ছদে মোড়ানো এই গ্রন্থটি মূলত সাতটি গল্পের এক সুনিপুণ সমাহার। প্রথম দর্শনেই এর প্রচ্ছদ ও নাম পাঠকের মনে এক ধরনের আধ্যাত্মিক ও জাগতিক টানাপড়েনের আভাস দেয়। সাজিদ উল হক আবিরের গল্প বলার ভঙ্গি ও ভাষার কারিগরি অত্যন্ত সচেতন এবং পরিমিত, যা এই সময়ের কথাসাহিত্যে সচরাচর খুব একটা দেখা যায় না। এখানে তিনি কোনো সস্তা আবেগ বা অতি-নাটকীয়তার আশ্রয় নেননি, বরং মানুষের ভেতরের একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতা এবং অব্যক্ত যন্ত্রণাকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম আলপনায় ফুটিয়ে তুলেছেন। 

গল্প সংকলনের মূল সুরটি আবর্তিত হয়েছে মূলত পুরুষতান্ত্রিক মনস্তত্ত্ব, মহানাগরিক জীবনের অবদমন এবং মানুষের অস্তিত্বের সংকটের চারপাশ জুড়ে। বই হাতে নিয়ে ফ্ল্যাপ পড়লেই আমরা জানতে পারি, এখানে গল্পগুলোর পটভূমি মূলত শহরকেন্দ্রিক এবং এর প্রধান চরিত্রের অভিজ্ঞতার জগৎ সম্পূর্ণ ভিন্ন, তাদের বেদনার রং আলাদা, এবং উদ্‌যাপনের উপলক্ষ্যও বিচিত্র। তবুও এক অদৃশ্য সুতোয় তাদের জীবন একই তানে বাঁধা পড়ে আছে। লেখক অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে মহানগরের চোরাগলিতে আলো ফেলে মানুষের চিরন্তন নিঃসঙ্গতাকে চিনিয়েছেন। প্রতিটি গল্পই যেন এক একটি স্বাধীন সত্তা, অথচ সবগুলো গল্প পড়ার পর মনে হয় এটি আমাদের যাপিত জীবনেরই এক অখণ্ড উপাখ্যান, যা আমাদের নিজস্ব না-হওয়া কাহিনীগুলোকে উদ্‌যাপন করতে শেখায়। 

'থিরবিজুরি' চলচ্চিত্রায়নের আড়ালে একাকিত্বের রূপক

সাজিদ উল হক আবির-এর ‘থিরবিজুরি’ গল্পটি প্রথম পাঠে একটি নাটকের শুটিং সেটের দৃশ্য মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে একবিংশ শতাব্দীর মহানাগরিক একাকিত্ব এবং মধ্যবিত্তের মনস্তাত্ত্বিক অবদমন। গল্পের শুরুতেই পনেরো তলা উঁচু দালানের ছাদে রেলিং ঘেঁষে বিপজ্জনকভাবে দাঁড়িয়ে থাকা অরিন নামের মেয়েটির যে বর্ণনা লেখক দিয়েছেন, তা পাঠককে এক ঝটকায় জীবনের ভঙ্গুরতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। অরিনের মুখ দিয়ে লেখক বর্তমান প্রজন্মের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অসারতা এবং মধ্যরাতের নিঃসঙ্গতাকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যেখানে মেসেঞ্জারের টুংটাং শব্দ শেষ হওয়ার পর, ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের হোম পেজ বারবার রিফ্রেশ করেও যখন কোনো নতুনত্ব মেলে না, তখন মানুষের মন কংক্রিটের রাস্তাকে ছুঁয়ে দেখার এক আত্মঘাতী আকুলতায় ভুগে থাকে। সাদা পাঞ্জাবি আর নীল ডেনিম পরা নবীন কিশোরের মতো সরল অরিন এবং তার ওড়নার বাসন্তী রঙের গুঁড়োর মতো ছড়িয়ে থাকা রূপকটি গল্পের নান্দনিকতাকে বাড়িয়ে দেয়।

গল্পের মূল মোড়টি আসে যখন জানা যায়, এতক্ষণের এই আবেগঘন ও মনস্তাত্ত্বিক কথোপকথনটি আসলে একটি নাটকের স্ক্রিপ্টের অংশ এবং অরিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এমিল মূলত সেই সেটের থার্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর। এমিল ক্যারেক্টারে এতটাই মিশে গিয়েছিল যে তার চোখ দিয়ে টুপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে, যা সেটের সবার কাছে কৌতুক ও অবজ্ঞার খোরাক জোগায়। এই ঘটনার পর ডিরেক্টরের সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্টের কাছ থেকে খাওয়া একটি কৌতুকপূর্ণ লাথি এমিলের মধ্যবিত্ত ইগোতে গভীর আঘাত করে। ছাদের এক কিনারায় বসে সিগারেট পোড়া ধোঁয়ার মাধ্যমে এমিল যখন তার জীবনের ব্যর্থতা পড়াশোনায় ভালো না করা, ভালো চাকরির অভাব, বাবার সাথে ঝগড়া করে ঘর ছাড়া এবং মায়ের কান্না ইত্যাদি বেদনার হিসাব কষে, তখন পাঠক এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হন। পশ্চিমাকাশে বৃষ্টির সম্ভাবনাহীন মেঘে তিনবার যে ‘থিরবিজুরি’ বা স্থির বিদ্যুতের চমক দেখা যায়, তা মূলত এমিলের জীবনেরই প্রতীক যার ভেতরটা প্রতিনিয়ত আলোড়িত হচ্ছে কিন্তু বাইরে তার কোনো প্রকাশ বা বৃষ্টি নেই। এই তীব্র বঞ্চনা ও অবদমন থেকে মুক্তি পেতে এমিলের “একটা সিনেমা বানাতে হবে বাল!” এই উক্তিটি যান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক চরম ক্ষোভ ও সৃজনশীলতার আর্তনাদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

'ঘূর্ণিঝড়ের রাত শেষে' প্রাপ্তির প্রাচুর্যে অস্তিত্বের সংকট

‘ঘূর্ণিঝড়ের রাত শেষে’ গল্পটিতে লেখক মানবমনের এমন এক জটিল মনস্তত্ত্বের ব্যবচ্ছেদ করেছেন। গল্পের মূল চরিত্র ইরফান, যে মহানগরের ২০ তলা উঁচু বিশ্বাস টাওয়ারের ১৩ তলার এক বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসে ‘টম’ নামের এক চরিত্রের সাথে সংলাপে লিপ্ত হয়। বাইরে যখন ঘূর্ণিঝড় ‘মায়ায়’ প্রকৃতি তোলপাড়, তখন ঘরের ভেতরে ইরফানের মনে বইছে অন্য এক ঝড়। ইরফান একসময় তীব্রভাবে কামনা করত এমন এক নিঝুম, একাকী রাত যেখানে কোনো নারীসঙ্গ থাকবে না, কেউ তার জন্য অপেক্ষা করবে না, চাবি দিয়ে দরজা খুলে সে সম্পূর্ণ নিজের মতো নিঃসঙ্গতা বিলাস করবে। কিন্তু যখন তার স্ত্রী রিনি সপ্তাহখানেকের জন্য বাড়ি থাকে না এবং তার সেই দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত নিঃসঙ্গতা অর্জিত হয়, তখনই সে আবিষ্কার করে এই একাকিত্ব কতটা ভয়াবহ এবং দমবন্ধকর। লেখক এখানে মানুষের এক চরম সত্যকে তুলে ধরেছেন যে, মানুষ যা চায় তা ঠিকঠাক পেয়ে যাওয়াটাই বেশিরভাগ সময় তার জীবনকে বিষিয়ে তোলে।

গল্পের দার্শনিক গভীরতা আরও বাড়ে যখন ইরফান স্বীকার করে যে, তার বর্তমান চাকরি, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, সুশ্রী স্ত্রী রিনি এবং ফুটফুটে সন্তান সবই ছিল তার প্রথম যৌবনের স্বপ্ন। কিন্তু এই সব পেয়ে যাওয়ার পর তার মনে প্রশ্ন জাগে, জীবনের সমস্ত বৈচিত্র্য কি এখানেই শেষ? সামনের দিনগুলো কি কেবল এই সমান্তরাল একঘেয়ে জীবনের ঘানি টানা? টমের মুখ দিয়ে লেখক বলিয়েছেন যে, জীবনের এই পরিবর্তনহীনতা বা ‘নো নিউজ ইজ গুড নিউজ’ এক অর্থে ভালো, কারণ ঘূর্ণিঝড়ে যাদের ঘরের চাল উড়ে যায়, তারা এমন নতুন ভোর কখনো কামনা করে না। ইরফানের স্মৃতিতাড়িত বয়ানে শৈশবের মৃত্যুর যে বর্ণনা উঠে এসেছে যেদিন সে প্রথম ঘর থেকে বের হয়ে রুখসানার সাথে ব্যাডমিন্টন খেলেছিল, সেটাই ছিল তার বাবা-মায়ের কাছে তার নিষ্পাপ শৈশবের মৃত্যুদিবস তা অত্যন্ত মায়াময় ও বেদনাদায়ক। গল্পের সমাপ্তিটি এক চরম আধুনিক ট্র্যাজেডি ও ব্যঙ্গাত্মক রূপ নেয়। পরদিন সকালে রিনি যখন জলাবদ্ধতা ও লিফ্‌ট বন্ধের ঝক্কি পোহাতে পোহাতে ফ্ল্যাটে ফেরে, সে দেখে ইরফান বাচ্চার টেডিবিয়ারকে জড়িয়ে ধরে মেঝেতে ঘুমিয়ে আছে এবং তার মোবাইলের চ্যাটজিপিটি স্ক্রিনে হাবিজাবি টাইপ করা। রিনি এই দৃশ্য দেখে কোনো সহানুভূতি না দেখিয়ে, আধুনিক যান্ত্রিক নাগরিকের মতো স্বামীর সেই ‘ছিটগ্রস্ত’ অবস্থার ছবি তুলে কাজিনদের মেসেঞ্জার গ্রুপে পাঠিয়ে দেয়, যেখানে ১৫টি ‘হাহা’ রিঅ্যাক্ট পড়ে। এই পরিণতিটি দেখায় যে, আধুনিক পরিবারে মানুষের ভেতরের চরম মানসিক সংকট কীভাবে কেবল এক টুকরো উপহাসের উপাদানে পরিণত হয়।

'লাল টেলিফোন' অতিলৌকিক আবহে পিতৃশোকের অন্বেষণ

‘লাল টেলিফোন’ গল্পটি একাধারে মনস্তাত্ত্বিক, রহস্যময় এবং তীব্র আবেগি, যা পাঠককে এক পরাবাস্তব জগতের আবহে নিয়ে যায়। সমেটে সবুজ শ্যাওলায় মোড়া, কপাটহীন জানালার এক মান্ধাতার আমলের চার তলা হোটেলের কামরায় বসে মিরা নামের এক তরুণী তার বাবার রহস্যময় আত্মহত্যার সত্যতা উদ্‌ঘাটন করতে চাইছে। তার বাবা তিন মাস আগে এই হোটেলের কামরা থেকে বের হয়ে অদূরে এক শিরীষ গাছের ডালে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন। এক বুড়ি মহিলার দেওয়া তান্ত্রিক বা অতিলৌকিক ফর্দ অনুযায়ী মিরা বাবার ব্যবহৃত শার্টের টুকরো, একটি অর্ধসমাপ্ত ডায়েরি, পুরোনো নোকিয়া ১১০০ ফোন, পোড়া রসুন এবং তার বান্ধবী সুপ্তির মৃত কালো বিড়াল ‘র‍্যাম্বো’-র মাটির নিচ থেকে তুলে আনা চামড়া দিয়ে এক গোপন সংযোগ স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করে। সাদা ও লাল চকের গণ্ডির ভেতরে নিজের শরীরের রক্ত মোমবাতির আগুনে উৎসর্গ করার পর ঘরের পরিবেশ সম্পূর্ণ বদলে যায়।

লেখক এই গল্পে জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতার “বিপন্ন বিস্ময় আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে” এই পঙ্‌ক্তিটিকে সুনিপুণভাবে ব্যবহার করে চরিত্রের ভেতরের এক চরম মানসিক ক্লান্তিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। মোমবাতি নিভে যাওয়ার পর মৃত বিড়ালের ছায়ার ঘরময় আদিম উন্মাদনায় চক্রাকারে ছুটে চলা এবং পোড়া রসুনের গন্ধের মাঝে মিরার বাবার চিরচেনা ঘ্রাণের আবির্ভাব পরাবাস্তবতার এক চূড়ান্ত আবহ তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ার একপর্যায়ে, বৃত্তের মাঝে রাখা ব্যাটারি ও সিমহীন মৃত নোকিয়া ফোনটি হঠাৎ তীব্র লাল আলোয় জ্বলে ওঠে এবং বাবার নম্বর থেকে রিংটোন বেজে চলে। মৃত্যুর আগে বাবা মিরাকে ফোন করে বলেছিলেন, তার খুব শীত লাগছে এবং কিছু কথা বলতে চেয়েছিলেন। এই লাল টেলিফোনটি ধরলেই মিরা হয়তো সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যেত, কিন্তু এক অদ্ভুত মানসিক ক্লান্তি ও সান্ত্বনার চরম মুহূর্তে সে ফোনটি না ধরার সিদ্ধান্ত নেয়। সে বোঝে যে উত্তর পেয়ে গেলে হয়তো এই রহস্য ও বাবার সাথে স্মৃতির সংযোগটি চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। তাই সে মেঝেতে গুটিসুটি পাকিয়ে শুয়ে পড়ে, ঠিক যেভাবে শৈশবে শীতের রাতে বাবার পিঠের সাথে পিঠ লাগিয়ে সে নির্ভরতার ওম খুঁজত। অনন্তকাল ধরে বাজতে থাকা লাল টেলিফোনের শব্দ আর মিরার এই শৈশবে ফিরে যাওয়ার আকুতি গল্পটিকে এক অপার্থিব ও চিরন্তন বেদনায় রূপ দেয়।

'ছাদের রেলিংয়ে আশফাকুর রহমানের টেবিল ল্যাম্প' একাকিত্ব ও অস্তিত্বের নিভৃত বিসর্জন

‘ছাদের রেলিংয়ে আশফাকুর রহমানের টেবিল ল্যাম্প’ গল্পটি মধ্যবিত্ত জীবনের এমন এক যান্ত্রিক ও নির্মম বাস্তবতার কাহিনি, যা পাঠককে ভেতরে-বাইরে স্তব্ধ করে দেয়। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র আশফাকুর রহমান একজন ছোট সরকারি চাকুরে, যার জীবনটা আবর্তিত হয় সেরেফ আয়-ব্যয়ের নিখুঁত হিসেবের ‘টালিখাতা’ এবং সংখ্যার গোলকধাঁধায়। বৈশাখি গুমোট গরমে লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে বসে যখন তার মাথার ঘাম খাতার ওপর টপ টপ করে পড়ে, তখন তা কেবল শারীরিক কষ্টের বহিঃপ্রকাশ থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে তার তিলে তিলে ক্ষয় হওয়া অস্তিত্বের প্রতীক। পরিবারে তার এই নিয়মমাফিক হিসাব রাখার অভ্যাসকে সবাই বিদ্রুপের চোখে দেখে। স্ত্রী ফাহমিদার নিরুত্তাপ কণ্ঠের অবিরাম খোঁটা, অন্যের প্রাচুর্যের সাথে তুলনা এবং কন্যা লুতফার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি-র হিসাব মেলাতে মেলাতে আশফাক নিজের অজান্তেই যেন এক জীবন্ত যন্ত্রে পরিণত হয়েছে, যার অপছন্দের বিরুদ্ধে একমাত্র অস্ত্র কেবল ‘চুপ করে থাকা’।

গল্পে তিন মাস ধরে চার্জহীন অবস্থায় অলৌকিকভাবে আলো ছড়াতে থাকা টেবিল ল্যাম্পটি মূলত আশফাকুর রহমানের নিজেরই এক বিশ্বস্ত রূপক। ল্যাম্পটি যেমন আছাড় খাওয়ার পরেও, কোনো রিচার্জ ছাড়াই পরিবারকে আলো দিয়ে যায়, আশফাকও তেমনি লোকাল বাসে ঝুলে, রিকশাওয়ালার করুণ বিলাপ আর জ্বলন্ত চাহনি সয়ে, নিজের সমস্ত সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে পরিবারকে টেনে নিয়ে চলেছেন যার কোনো স্বীকৃতি বা সহানুভূতি কারো কাছে নেই। একপর্যায়ে ল্যাম্পটির প্রতি আশফাকের যে অদ্ভুত মায়া ও সমবেদনা জাগে, তা আসলে নিজের অবদমিত আত্মত্যাগেরই এক নীরব প্রতিধ্বনি। কালবৈশাখি ঝড়ের রাতে ছাদের নিচু রেলিংয়ে পা ঝুলিয়ে বসা আশফাকের তেত্রিশ দিনের ‘নিশিবিলাস’ দেখায় যে, জীবনের সব স্বাদ-আহ্লাদ শুকিয়ে গেলে মানুষ কতটা বোধহীন হয়ে পড়ে। শেষপর্যন্ত, সে তার একমাত্র নিঃসঙ্গ সঙ্গী টেবিল ল্যাম্পটিকে রেলিঙের নিচে ফেলে চূর্ণবিচূর্ণ করে যেন নিজের যান্ত্রিক নিয়তিকেই মুক্ত করে। তবে গল্পের চূড়ান্ত মোড়টি আসে যখন আশফাক নিজে শূন্যে ঝাঁপ না দিয়ে, পেছনের ছাদে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে শুয়ে পড়ে এবং বৃষ্টির ছাঁটকে ‘তাল তাল মাটি’র মতো অনুভব করে ল্যাম্পের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে। এই রূপক মৃত্যু ও নগ্নতা আসলে সমাজের চাপিয়ে দেওয়া মধ্যবিত্তের ‘মানসম্মান’ এবং টানাপড়েনের খোলস থেকে মুক্ত হয়ে এক আদিম, নিভৃত আত্মহনন বা মুক্তিরই পরাবাস্তব প্রকাশ।

'শব্দের হিম, আলোর ওম' স্মৃতির বাতায়নে শেষ অপেক্ষার উপাখ্যান

‘শব্দের হিম, আলোর ওম’ বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতা, একাকিত্ব এবং হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের ওম খোঁজার এক মায়াবী ও বেদনাবিধুর মনস্তাত্ত্বিক গল্প। প্রায় আশি ছুঁই ছুঁই বৃদ্ধ করম খাঁর কাছে শীতকাল, বিশেষ করে শীতের রাতগুলো এক পরম শত্রু, যা তাকে দোজখের তীব্র শীতের আবহের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বয়সের ভারে শরীর ল্যাগবেগিয়ে গেলেও তার চোখের জ্যোতি আর কানের শ্রুতি মারাত্মক রকমের সজাগ। এই সজাগ কানই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়, কারণ যে শব্দ সে এড়াতে চায় কুয়াশা বিস্তারের মিহিন সুতোর মতো শব্দ, ঝিঁঝি পোকার তারস্বর থেকে স্তিমিত হয়ে যাওয়া, কিংবা পাশের ঘরে ছেলে-বউয়ের সন্তর্পণে কাপড় সরাবার আওয়াজ সবই তার কানের পর্দায় হাতুড়ির মতো আঘাত করে। অথচ, খাটে পাশ ফিরলে তৈরি হওয়া তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় ও পরিচিত শব্দগুলো আজ দুই বছর ধরে নিখোঁজ, কারণ দুই বছর আগে তার বুড়ি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে।

স্মৃতি ও একাকিত্বের এই তীব্র দহন থেকে বাঁচতেই রাত চারটায় কুয়াশার চাদর ভেদ করে করম খাঁ বিলের পাড়ের দিকে রওনা হয়। কিন্তু অতীতে ফিরে যাওয়ার আকুলতায় সে আবার ঘরে ফিরে আসে এবং তার মৃত স্ত্রীর ব্যবহৃত সেই নির্জন ছোট কামরায় দেশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে কুপিটি প্রজ্বলিত করে। জাজিমহীন খাটিয়া, ভাঁজ করা জায়নামাজ, পানের পিকদান আর তসবিহ সবকিছুই যেন এক জীবন্ত শূন্যতা নিয়ে স্ত্রীর উপস্থিতির জানান দেয়। আলনা থেকে স্ত্রীর ব্যবহৃত চাদরের ওম আর পরিচিত সুবাস গায়ে জড়িয়ে করম খাঁ যখন বিলের পাড়ে গিয়ে দাঁড়ায়, তখন দূর থেকে মিটমিট করে জ্বলতে থাকা কুপির আলোটি তার কাছে অতীত ও বর্তমানের এক মায়াবী সংযোগরেখা হয়ে ওঠে। একসময় হাট বা সালিশ থেকে ফেরার পথে এই কুপির আলোই ছিল তার কাছে আশ্রয়, উষ্ণতা ও ভালোবাসার পরম চিহ্ন, যা তাকে জানাত যে কেউ একজন তার জন্য অপেক্ষা করে আছে। আজ দুই বছর ধরে সেই আলো জ্বলে না, কিন্তু কুপিটি জ্বেলে এবং স্ত্রীর চাদরের ঘ্রাণে বুঁদ হয়ে বৃদ্ধ করম খাঁ নিজেকে সান্ত্বনা দেয় "হয়তো বদলায়নি কিছু... সবকিছু আগের মতোই আছে। ঠিকঠাক।" গল্পটি শব্দের শীতলতা আর স্মৃতির উষ্ণতার (আলোর ওম) এক অদ্ভুত যুগলবন্দি, যা মানুষের চিরন্তন অপেক্ষার আকুতিকে ফুটিয়ে তোলে।

'পর্দার ওপাশে' যান্ত্রিকতার নিগড়ে অবদমিত এক মধ্যবয়সি কবিসত্তা

'পর্দার ওপাশে' মূলত মধ্যবয়সের সংকট বা মিডিল লাইফ ক্রাইসিস, প্রাত্যহিক জীবনের একঘেয়েমি এবং মানুষের অবদমিত রোমান্টিক সত্তার পুনর্জাগরণের ও সংবেদনশীলতার গল্প। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র আফসার আলী ‘দৈনিক রাঙা প্রভাত’ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক, যিনি অত্যন্ত ইন্ট্রোভার্ট এবং ঘড়ির কাঁটা ধরে চলা এক চরম নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত। সংসার ও অফিসের কঠোর রুটিনে তার ভেতরের নিজস্ব মানুষটি যখন প্রায় মৃত, ঠিক তখনই প্রায় ৩০ বছর পর শেষরাতে দেখা প্রথম প্রেমিকার একটি স্বপ্ন তার অবচেতন মনকে নাড়া দেয় এবং দীর্ঘদিনের চেনা রুটিনকে আচমকা লাইনচ্যুত করে দেয়। এই একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আফসার আলী তার চেনা খোলস থেকে বেরিয়ে বেইলি রোডের ফুটপাতে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক অ্যাডভেঞ্চারে জড়িয়ে পড়েন। তিনি অফিসে বসে সহকর্মীদের সাথে অনভ্যস্ত হালকা আড্ডায় মাতেন, বসের নির্ধারিত সময়ের আগেই অফিস থেকে বের হন এবং শান্তিনগরে স্ত্রীর ফোন পেয়ে মিথ্যা বলে বেইলি রোডে ফুল কিনতে যান যা ছিল মূলত তার ফুরিয়ে যাওয়া, বুড়িয়ে যাওয়া ভঙ্গুর পুরুষতান্ত্রিক অহংকারকে তাগড়া করার এক মরিয়া চেষ্টা।

গল্পের মূল ট্র্যাজেডি ও মোড় আসে যখন নাগরিক কোলাহলের মাঝে আফসার আলী দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী চরিত্রের মুখোমুখি হন। বেইলি রোডের রাস্তায় এক হিজড়া চরিত্রের আকস্মিক আলিঙ্গন ও কৌতুকপূর্ণ চুম্বনে আফসার আলীর ব্লাশ করা কিংবা কান গরম হওয়া তাকে মনে করিয়ে দেয় যে যান্ত্রিকতার প্রেষণে সে এখনো পুরোপুরি ফুরিয়ে যায়নি। এরপর সিদ্ধেশ্বরী কলেজের পাশে লাল সুতি শাড়ি আর কালো স্লিভলেস ব্লাউজ পরা এক আধুনিক ও স্পষ্টভাষী তরুণীর সাথে তার দীর্ঘ কথোপকথন গল্পটিকে গভীর জীবনদর্শনের দিকে নিয়ে যায়। তরুণীটি আফসারের ভেতরের মানসিক শূন্যতা ও সংকটকে এক দেখাতেই নিখুঁতভাবে পড়ে ফেলে এবং ধারালো ছুরির মতো সত্যগুলো তার সামনে সাজিয়ে দেয়। শীত-বসন্তের মাঝের অসময়ের বৃষ্টি, ‘জোনাকি’ সিনেমা হল বন্ধ হয়ে সেখানে কাবাবের দোকান হওয়ার বিষণ্নতা আর একশ থেকে তেত্রিশটিতে নেমে আসা কাটছাঁট করা গোলাপের তোড়া—এই সবকিছুই গল্পে মানুষের অপূর্ণতা, একাকিত্ব ও খণ্ডিত জীবনের পরম রূপক হিসেবে ধরা দিয়েছে।

গল্পের চূড়ান্ত দর্শন লুকিয়ে আছে এর শেষভাগে, তরুণীর রেখে যাওয়া একটি অমোঘ প্রশ্নের উত্তরে, যেখানে সে জানতে চায় মেয়েরা প্রেম কবিদের সাথে করলেও বিয়ে কেন কেরানিদের করে। আফসার আলী শান্তিনগর মোড়ের জ্যামে আটকে ওয়ানটাইম কাপে চা খেতে খেতে উপলব্ধি করেন যে, মেয়েরা জীবনের নিরাপত্তার জন্য হয়তো ‘কেরানি’দেরই বেছে নেয়, কিন্তু পৃথিবীর সব কেরানি বা ব্যবসায়ীই জীবনের কোনো না কোনো প্রান্তে আসলে ‘কবি’ ছিল এবং মনের ভুলে হলেও কারও জন্য দুটো লাইন লিখেছিল। কিন্তু মর্ত্যের সংসারে এসে সেই কবিসত্তাকে জাগিয়ে তোলার মতো কোনো ‘পর্দার ওপাশের’ মানুষ আর থাকে না। দিনশেষে আফসার আলী স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার করে আবার তার চেনা রুটিন ও বাস্তবতার খাঁচায় ফিরে যান ঠিকই, তবে রুলটানা জীবনের এই বিচ্ছিরি কিন্তু কাঙ্ক্ষিত কাটাকুটি তাকে এই পরম সান্ত্বনা দিয়ে যায় যে, প্রেষণের ছিপি খুলে দিলে এখনো তার অন্তরের অবদমিত কোণ থেকে কস্তুরীর সুবাস ছড়ায়।

'নির্বাচিত দেবদূত' নিষ্ঠুর বাস্তবতার আবর্তে একখণ্ড এতিম শৈশব

বইয়ের নামভূমিকায় থাকা ‘নির্বাচিত দেবদূত’ পিতৃহীন, পরিবারচ্যুত এক বালকের অসহায়ত্ব এবং তার নিজস্ব ঈশ্বর-ভাবনার এক নির্মম ও হৃদয়বিদারক গল্প। মাত্র আট বছর বয়সে বাবা হারানোর পর, মায়ের পুনর্বিবাহ এবং মামার সংসারে ‘উটকো ঝামেলা’ হিসেবে গণ্য হওয়া মাশুককে পাঠিয়ে দেওয়া হয় মাদ্রাসার লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে। সমাজের এই ছুড়ে ফেলা নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে ঢাকা দিতে তার মামা একে ‘আল্লাহর বেছে নেওয়া রাস্তা’ বলে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। এই সান্ত্বনাই মাশুকের কচি মনে এক গভীর প্রভাব ফেলে; সে পুথিগত ধর্মের জটিলতা না বুঝে আল্লাহকে নিজের মতো এক অদৃশ্য, পরম ‘বন্ধু’ বানিয়ে নেয়, যার সাথে সে ক্ষুধা, জ্বর, ঘুম কিংবা সহপাঠীদের নির্মম চড়-থাপ্পড়ের সমস্ত দুঃখ ভাগ করে নেয়। মামার দেওয়া একমাত্র ঝকঝকে রুপালি স্টিলের ট্রাঙ্কটিই ছিল এই তীব্র অভাবের মাঝে মাশুকের আত্মপরিচয়, বিশেষত্ব এবং যক্ষের ধনের মতো আগলে রাখা একমাত্র মূল্যবান বস্তু।
গল্পের মূল ট্র্যাজেডি আসে জুমার দিনে, যখন অবস্থাসম্পন্ন ঘরের কিছু উগ্র শিশু মাশুকের প্রিয় ট্রাঙ্কটিকে লাথি মেরে দুমড়েমুচড়ে দেয়। আজীবন ভয় ও অবহেলা সয়ে যাওয়া মাশুকের ভেতর প্রথমবারের মতো জন্ম নেয় এক আদিম, অনিয়ন্ত্রিত ক্রোধ। তার দেওয়া একমাত্র ধাক্কায় স্থানীয় প্রভাবশালী কাউন্সিলরের ছেলে দোতলার জানালা গলে নিচে পড়ে পা ভেঙে ফেললে পুরো মাদ্রাসার যান্ত্রিক ও চাটুকার ব্যবস্থা মাশুকের ওপর চড়াও হয়। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে তাকে খাটের পায়ার সাথে বেঁধে নির্মমভাবে বেত্রাঘাত করা হয়। কাউন্সিলরের তীব্র আস্ফালন ও গালমন্দের মুখেও মাশুকের অবিচল উচ্চারণ “আমি আল্লার বন্ধু। আল্লার মেহমান... আমারে আল্লা বাইছা আনছে তার কালাম পড়ার লাইগা” তার ভেতরের এক পরম আধ্যাত্মিক শক্তির জানান দেয়। কিন্তু বাস্তবতার নিষ্ঠুরতা এখানেই থামে না; ট্রাংক থেকে ছিটকে পড়া মাশুকের মায়ের একমাত্র ছবিটি যা ছিল তার নিশ্চিন্ত অতীত ও বর্তমান দুঃস্বপ্নের একমাত্র সেতু তাকেও ‘বেগানা আওরতের ছবি’ বলে কুচি কুচি করে ছিঁড়ে জানালা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। মাশুকের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু এবং প্রিন্সিপালের ক্ষমতার কাছে আত্মসমর্পণ করে বেত উঁচিয়ে ধরার দৃশ্যটি দেখায় যে, সমাজে এতিম ও দরিদ্রদের ঈশ্বরের 'নির্বাচিত দেবদূত' বলা হলেও, বাস্তবতার জাঁতাকলে তারা কতটা নিঃসহায় ও অরক্ষিত। শেষমুহূর্তে মাশুকের মুখে ‘হাসবিআল্লাহু...’ (আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট) দোয়াটি এক উন্মত্ত প্রেমিকের মতো খোদাকে ডাকার আকুলতায় গল্পটিকে এক চরম ট্র্যাজিক রূপ দেয়।

সাজিদ উল হক আবির-এর সবচেয়ে বড়ো শক্তি তার গদ্যের ভাষা। তার ভাষা অত্যন্ত পরিমিত, মেদহীন এবং একই সাথে তীব্র কাব্যিক সুষমায় মণ্ডিত। তিনি যখন বর্ণনা করেন "জীবন কেটে যাচ্ছিল ঢিমেতালের তেরেকেটেতাকে, কোনো তেহাই ছাড়া" কিংবা "কুয়াশা বিস্তারের মিহিন সুতোর মতো শব্দ" তখন পাঠক কেবল গল্প পড়েন না, বরং গদ্যের ভেতরে এক ধরনের সুর ও আবহ অনুভব করেন। শব্দের এই পরিমিত এবং যথাযথ ব্যবহার সমকালীন তরুণ লেখকদের মধ্যে বেশ বিরল। তিনি জটিল মনস্তাত্ত্বিক অনুভূতিগুলোকে খুব সাধারণ এবং আটপৌরে শব্দের সাহায্যে এমনভাবে প্রকাশ করেন, যা পাঠকের অবচেতন মনকে তীব্রভাবে স্পর্শ করে।

আবিরের গল্পগুলোর চরিত্ররা কেউ একরৈখিক বা ফ্ল্যাট নয়। তারা সবাই বহুমাত্রিক এবং জটিল মনস্তত্ত্বের অধিকারী। ‘পর্দার ওপাশে’ গল্পের আফসার আলী একাধারে একজন দায়িত্বশীল সংসারী মানুষ, কঠোর বস, আবার অন্যদিকে ভেতরে ভেতরে একজন অতৃপ্ত, অবদমিত কাম ও রোমান্টিকতায় ভুগে চলা মধ্যবয়সি পুরুষ। এই যে মানুষের ভেতরের ‘স্প্লিট পার্সোনালিটি’, একে লেখক অত্যন্ত সাহসিকতা ও দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন। একইভাবে, ‘নির্বাচিত দেবদূত’ গল্পের মাশুকের ভেতরের সেই অবদমিত রাগ এবং তার ঈশ্বরের সাথে সখ্যতার মনস্তত্ত্ব অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে আঁকা হয়েছে। তরুণ বয়সেই মানুষের মনের এত গভীর ও জটিল অন্ধকার গলিপথগুলোকে চিনে নেয়। 

এই সংকলনের গল্পগুলো একই সাথে সমকালীন এবং চিরন্তন। ঢাকা শহরের জ্যাম, সিনেপ্লেক্স কালচারের উত্থান, ল্যাপটপ-মোবাইলের ব্যবহার, লিভিং টুগেদার বা পরকীয়ার মতো আধুনিক নাগরিক অনুষঙ্গ যেমন এতে আছে, তেমনি আছে একাকিত্ব, শৈশবের ট্র্যাজেডি, বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতা এবং মৃত্যুর মতো চিরন্তন মানবিক সংকট। লেখক সাময়িক কোনো সস্তা ট্রেন্ডের পেছনে না ছুটে মানুষের মৌলিক আবেগকে ধরেছেন। ফলে গল্পগুলো কেবল এই সময়ের পাঠককেই নয়, বরং যেকোনো সময়ের পাঠককেই নাড়া দিতে সক্ষম। 

সাজিদ উল হক আবির-এর ‘নির্বাচিত দেবদূত’ কেবল সাতটি গল্পের সংকলন নয়, এটি আসলে মানুষের অবদমিত আত্মার সাতটি ভিন্ন ভিন্ন দীর্ঘশ্বাস। লেখক এখানে দেখিয়েছেন যে, দৃশ্যমান পৃথিবীর পর্দার ওপাশে আরও এক বিশাল অদৃশ্য জগৎ রয়েছে, যেখানে মানুষের আসল যুদ্ধটা চলে। 
তার গল্পের সমাপ্তিগুলো পাঠককে কোনো তৈরি উত্তর দেয় না, বরং এক ধরনের তীব্র শূন্যতা আর গভীর ভাবনার সাগরে ডুবিয়ে দেয়। আশফাকুর রহমানের ছাদের ওপর নগ্ন হয়ে শুয়ে থাকা, করম খাঁর কুপি জ্বেলে স্ত্রীর চাদর গায়ে দিয়ে বিলের পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা, কিংবা আফসার আলীর শান্তিনগর মোড়ে দাঁড়িয়ে ভাবা যে "পৃথিবীর সব কেরানিই জীবনে কখনো না কখনো কবি ছিল" এই দৃশ্যগুলো পাঠক সহজে ভুলতে পারবেন না।