অমৃতকথা—৮

শব্দার্থতত্ত্বের একটি তত্ত্ব হল, শব্দ ও অর্থের সম্পর্ক স্বাভাবিক। শব্দের অন্দরে, তার ব্যবচ্ছেদেই পাওয়া যাবে অর্থের শুলুকসন্ধান। অর্থের জন্য শব্দের বাইরে বেরনোর কোনও প্রয়োজন নেই। শব্দ ও অর্থের সম্পর্ক মোটেও আরোপিত বা প্রথাসিদ্ধ নয়।  

ভারতীয় উপমহাদেশের যে প্রাচীন দার্শনিক সাহিত্য সে সবের মধ্যে এই তত্ত্ব রয়েছে। এমন মতবাদের অন্যতম আদি পুরুষ হলেন আচার্য যাস্ক। যাস্ক পাণিনির চেয়েও প্রবীণ। পাণিনি হলেন বৈয়াকরণ কিন্তু যাস্ক হলেন নিরুক্তকার। শব্দ ও অর্থের সম্পর্ক স্বাভাবিক--শব্দার্থের এমন মতবাদকে নিরুক্ত বলা যেতে পারে। 

মনে করা হয়, ভারতের ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাস প্রায় ৩৫০০ (বা তারও বেশি) বছরের পুরনো যা বৈদিক যুগে খুঁজে পাওয়া যায়। বৈদিক গ্রন্থগুলি এমন ভাবে রচিত হয়েছিল যাতে এই রচনাসমূহে কোনও অনীতি বা দুর্নীতি বা পরিবর্তন না হয় তা নিশ্চিত করা। এর প্রয়োজনীয়তা ভেবে ভারতীয় পণ্ডিতরা ভাষা এবং বক্তৃতা নিয়ে আলোচনা, বিতর্ক এবং তত্ত্ব উপস্থাপন করেছিলেন। সেই প্রারম্ভিক পণ্ডিতদের মধ্যে কয়েকজন বিশিষ্ট হলেন আচার্য যাস্ক, পাণিনি, কাত্যায়ন, পতঞ্জলি, ভর্তৃহরি, শাকটায়ন, গর্গ্য প্রভৃতি পণ্ডিত। 

যাস্কের প্রধান কাজ শব্দের ব্যুৎপত্তিসংক্রান্ত, তাঁর শাস্ত্রকে বুৎপত্তিবিজ্ঞান বলা যেতে পারে। এরই অন্য নাম ‘নিরুক্ত’। যাস্ক ঠিক কোন সময়ের মানুষ তার সঠিক সাল তারিখ জানা যায় না বটে, তবে গবেষকরা তাঁকে প্লেটোর চেয়ে পুরনো বলে মানেন। যাস্ক প্লেটো অপেক্ষা অন্তত এক শতাব্দী আগের মানুষ। কেউ কেউ তাঁকে আরও আগের মানুষ বলে মেনে নিয়েছেন। ভারতীয়রা ব্যক্তি-মানুষের জীবনীতে খুব একটা বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁরা ভাবতেন যে একজন ব্যক্তির জীবনের বিবরণ খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। যা গুরুত্বপূর্ণ তা হল ধারণার পরম্পরা। ভারতীয় চিন্তাধারার একটি অধিনিয়ম বা 'মেটা-রুল' আছে। কী সেটা? বুদ্ধকে উল্লেখ না করা মানে হল বুদ্ধকে না জানা এবং বুদ্ধকে না জানা মানে হল বুদ্ধের আগে জন্মগ্রহণ করা।

এটি লক্ষ করা গুরুত্বপূর্ণ যে যাস্ক বা পাণিনি কেউই বুদ্ধের উল্লেখ করেননি, তবে পাণিনি যাস্ককে উদ্ধৃত করেছেন। এর উপর ভিত্তি করে, পণ্ডিতরা যাস্ককে খ্রিষ্টপূর্ব নবম শতাব্দীর মানুষ বলে মনে করেন, যদিও তিনি আরও আগের মানুষও হতে পারেন।

যাস্ক ব্যুৎপত্তিবিদ্যার প্রথম লেখক এবং তিনিই প্রথম পণ্ডিত যিনি এটিকে একটি স্বাধীন বিদ্যা হিসাবে বিবেচনা করেন। যাস্ক রচিত নিরুক্ত হল নিঘন্টুর একটি ভাষ্য। যাস্ক নিজেই তাঁর নিঘন্টুর জন্য অর্থের ভিত্তিতে শ্রেণিবদ্ধ অস্পষ্ট বা অস্বচ্ছ বৈদিক শব্দসমূহের একটি তালিকা সঙ্কলন করেছেন। সেই হিসেবে, অনেকেই নিঘন্টুকে অভিধান বা লেক্সিকোগ্রাফির প্রাচীনতম কাজ বলে মনে করেন। নিরুক্তকে ছয়টি বেদাঙ্গের অন্যতম বলে মনে করা হয়। বেদাঙ্গগুলি (আক্ষরিক অর্থে, 'বেদের অঙ্গ') হল আনুষঙ্গিক শৃঙ্খলা, বেদকে বোঝার জন্য এক ধরনের পূর্বশর্ত। ছয়টি বেদাঙ্গের মধ্যে রয়েছে শিক্ষা (ধ্বনিতত্ত্ব), কল্প (আচার), ব্যাকরণ (ব্যাকরণ), নিরুক্ত (ব্যুৎপত্তি), ছন্দ, এবং জ্যোতিষ (প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যা)।

বেদ নিত্য বা শাশ্বত শব্দ এবং মন্ত্র নিয়ে গঠিত-- যা থেকে বিশ্বাস করা হয় যে বেদ থেকে সমগ্র মহাবিশ্ব সৃষ্টি করা যেতে পারে। এই সৃষ্টির অর্থকে অন্য ভাবে গ্রহণ করতে হবে। বৈদিক পণ্ডিতরা বিশ্বাস করেন যে বস্তুনিষ্ঠ বাস্তবতার একটি মহাবিশ্ব বিদ্যমান কারণ মানুষ এটিকে ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারে। ভাষা ছাড়া প্রকাশের তেমন কোনও মাধ্যম নেই। এই পৃথিবীতে প্রতিটি উপাদান, প্রতিটি বস্তু, প্রতিটি ধারণা বিদ্যমান কারণ সেগুলি একটি ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করা যেতে পারে। এই বিশ্বদর্শনের মূলে ছিল বৈদিক মন্ত্রসমূহ, আচার অনুষ্ঠান। যেহেতু ভাষা বৈদিক বিশ্বদর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল, তাই এর বিশুদ্ধতা, সঠিক উচ্চারণ, স্বরধ্বনি ইত্যাদি কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়ার একটি পদ্ধতিও ছিল। ভারতীয় জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যে বেদের প্রাধান্য থাকা সত্ত্বেও বৈদিক মন্ত্রগুলির কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ছিল। বেদের বহু ঋষি—যেমন ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ঋষি কৌৎস বিশ্বাস করতেন যে বৈদিক মন্ত্রগুলি অর্থহীন। কৌৎসকে মোকাবেলা করার জন্য যাস্ক বলেছিলেন যে বৈদিক গ্রন্থগুলিকে বিচ্ছিন্নভাবে অধ্যয়ন করা যাবে না। বৈদিক গ্রন্থসমূহের সঠিক অর্থ পেতে হলে সেগুলিকে একটি মেথোডলজি বা পদ্ধতি মেনে অধ্যয়ন করতে হবে। ছয়টি বেদাঙ্গের পূর্বশর্ত ছাড়াও পাঠককে বেদের তিনটি মৌলিক ধারণাও বুঝতে হবে। প্রথম হল, কোন বিভাগে কোন ঋষি মন্ত্রগুলো বলছেন। দুই, কোন দেবতার উদ্দেশ্যে মন্ত্রগুলি উৎসর্গীকৃত। তিন, কোন ছন্দে মন্ত্র বলা হচ্ছে। লক্ষণীয়, ছয়টি বেদাঙ্গের মধ্যে তিনটি (শিক্ষা, ব্যাকরণ এবং নিরুক্ত) সরাসরি ভাষাবিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত।

অমৃতকথা—৭