ক্ষতচিহ্নিত হাড়মাংস অথবা নিছকই আত্মজনের কথা

২০তম পর্ব

ভেজা গামছা ও মানুষের চামড়ার মাংস

“কালো বেঁটে শহীদ বেদীর পাশে দাঁড়িয়ে
বৃদ্ধা বললেন...
আমার ছেলে ছিল ফর্সা লম্বা
হাসলে চোখের নীচ দিয়ে উড়ে যেত তিতির পাখী
আর গুলিটা
লেগেছিল ঠিক ওখানেই”
(স্মরণ সভা / প্রবীর রায়)

আমাদের গলি, কলোনির ৫ নম্বর গলির মাথায় ছিল আমার বন্ধু পার্থদের বাড়ি। সে সময় টিভি আসেনি, বাসায় বাসায় রেডিওও ছিল না। পার্থদের বাড়িতে একটা ট্রেঞ্জিস্টার রেডিও ছিল। ওর দাদা, শেখর চক্রবর্তী ভালো ছবি আঁকতেন আর সেই রেডিওর খবর শুনে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর জানাতেন। ওদের ঘরের দেওয়ালে কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে ভাষণরত ইন্দিরা গান্ধীর এবং মুজিবের একটা বড় একটা ছবি টানানো ছিল। ওদের বাসার সামনে, আমাদের পাঁচ নম্বর গলির মাথায় একদিন পুলিশের টহলদারি জিপ গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হল। গাড়ি রেখে পুলিশদল কলোনির ভেতর টহল দিচ্ছিল, হঠাৎ গাড়িটাতে দাউ দাউ আগুন। আমি ও পার্থ তখন ওদের বাসার পেছনের দিকে দাড়িয়াবান্ধা খেলার কোর্ট কাটছিলাম। আগুন দেখে দৌড়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পরেই সেই আগুনের কুণ্ডলীর ভেতর প্রবল শব্দে খুব জোরে একটা বিস্ফোরণ ঘটল । যে যার মতো তখন পালাচ্ছে। টহলদার পুলিশরা তখন বন্দুক উঁচিয়ে জায়গাটা ঘিরে ফেলেছে। আবার পুলিশ, সি আর পি এফ, আবার তল্লাশি। সি আর পি এফ ক্রমশ আমাদের কলোনির মানুষের কাছে আতঙ্কের এক নাম হয়ে ওঠে। বাচ্চাদের ভয় দেখানো হতো, ‘খেয়ে নাও না হলে সি আর পি আসবে’, ‘পড়তে বসো না হলে সি আর পি আসবে’ এমন সব কথায়।

সাতাত্তুরে বামফ্রন্ট রাজ্যে ক্ষমতায় এলে নকশালদের বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষ থেকে করা মসা সহ বিভিন্ন ধারায় করা মামলাগুলো তুলে নেয়। জেল থেকে নরেশ, হীরার মতো অনেক নকশাল যুবক ছাড়া পান। কিন্তু এঁদের অনেকেই তখন শারীরিক ভাবে অসুস্থ বা পঙ্গু। নকশালদের কেউ কাজ দিচ্ছিল না, অনেকেই চাকরি থেকে ছাঁটাই হয়ে গেছেন ততদিনে। বাচ্চু পাণ্ডে ফুড কর্পোরেশানে সদ্য চাকরি পেয়েছিলেন। বিপ্লবের ডাকে পথে নেমে জেলে যাওয়ার পর আর সেই চাকরি ফিরে পাননি। জেলের ভেতরের অত্যাচারে নরেশ অনেকটাই স্মৃতি হারানো জবুথবু হয়ে গেছে ততদিনে। জেলফেরত নরেশ বালক ব্রহ্মচারীর কীর্তনের দলে নাম লেখায়। হীরা চক্রবর্তী জেল থেকে ফিরে এসে পারিবারিক ‘জজমানি’ বা পুরুতের কাজ নেয়।

১৯৭৪ থেকে ১৯৭৭, জরুরি অবস্থার অন্ধকারে দেশ। চারদিকে পুলিশ আর কেন্দ্রীয় অসামরিক বাহিনীর দাপট চলছে। কিন্তু এরমধ্যে কলোনির বাড়িগুলোয় এক নতুন উৎপাত শুরু হল। চুরি, ছিনতাই। হঠাৎ জনসংখ্যার বৃদ্ধি ও রোজগারের উপয়া কমে আসায় দিন আনা দিন খাওয়া সহায়সম্বলহীন মানুষজনের মধ্য থেকে কেউ কেউ বাধ্য হয়েছিল ভিক্ষার পথে নামতে। যারা ভিক্ষার পথে যেতে পারতো না সেই যুবকদের কেউ কেউ ক্ষুধার তাড়নায় হয়ত চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের পথে যেতে বাধ্য হয়েছিল। অথবা চুরি ছিনতাই হয়ত কেউ কেউ পেশা করে নিল। যাইহোক, সেই সময় হঠাৎ চুরি ছিনতাই বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছিল। এর ফলে কলোনির সীমানা চিহ্ন মুক্ত বাড়িগুলোর মাঝে তারকাঁটার বেড়া উঠল। সতর্ক মানুষ একে অন্যকে সন্দেহ করতে শুরু করল।

আমাদের কলোনির বাসার পেছনের বাসাটাই পাঁচু কাকুদের বা পিযুষ মাস্টারের বাসা। সেই সোনার কাঠি পাঠাগারের পিযুষ ঘোষ। তাদের ছোট ভাই বিমল কাকুর অংশ ছিল বা ঘরগুলো ছিল তাঁদের বাসার দক্ষিণ দিকে, আমার জ্যাঠামশাইয়ের ঘরের পশ্চিমে লাগোয়া। সেদিক দিয়েই আমাদের তাঁদের বাসায় যাতায়াতের রাস্তা। একদিন দুই বাড়ির মাঝে কাঁটাতারের বেড়া টানা হল। তিন/চার মিটার পর পর কাঠের খুঁটি পোতা হল, চার পাঁচজন শ্রমিক, আমাদের চেনাজানা। তারা গোল করে পেঁচিয়ে রাখা কাঁটাতার খুঁটিগুলোতে টানটান করে লাগাল। আমি ও পাঁচু মাস্টারের ছেলে পিকু, দুই বন্ধু সারা দুপুর বসে বসে দুই বাড়ির মধ্যে কাঁটাতার উঠতে দেখলাম। দুই বাড়ির সীমানার মাঝে তিনটি কাঁঠাল গাছ ও একটা বড় জাম গাছ ছিল।বেড়া ওঠায় সেগুলোর মধ্যে দুটি গাছ কাঁটা গেল। গাছ ভর্তি কাঁঠাল তার আগে নামানো হল। কয়েকটি কাঁঠাল পাকা বা বাত্তি, অন্যগুলো তখনো এঁচোড়। পাকা কাঁঠালের একটি সেখানেই খোলা হল, পিকুদের ঘর থেকে মুড়ি এল। আমরা ও সেই শ্রমিক কাকুরা তাই মজা করে খেলাম। মুড়ি ও হলদে ও রসালো কাঁঠালের কোয়া, অমৃত সমান। পাঁচু স্যারের বাসায় দুটো পাকা কাঁঠাল দেওয়া হল, সঙ্গে গোটা কয়েক এঁচোড়। অন্যগুলো আমাদের চার ঘর ও প্রতিবেশীদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হল।

কাঁটাতার লাগানোর দিন কয়েক পরে এক সকালে ওই বাড়িতে ব্যাপক হইচই। বিমল কাকুদের ঘর ছিল টিনের চাল, মাটির ভিত। রাতের বেলা সেই ঘরে চোর সিঁধ কেটেছে। জামাকাপড় ও রান্নার বাসনপত্র সেই গর্ত দিয়ে চোরে বের করে নিয়েছে। কিন্তু বাসনের ঠুং ঠাং আওয়াজে পুতুল পিসি জেগে যাওয়ায় চোররা সেই বাসনপত্র বাইরে ছেড়েই পালিয়েছে। আমরা তুমুল আগ্রহে চোরের সিঁধ কাটা দেখতে গেলাম । ঘরের পেছনের দিকে নিখুঁত মাপে মাটির ভিত কাটা হয়েছে। জ্যেঠা বললেন, পাকা হাতের কাজ। দেড় ফুট চওড়া হবে, সুড়ঙ্গের মতো সেই গর্ত ঘরের ভেতর পর্যন্ত চলে গেছে। বাইরে পরে থাকা মাটির স্তূপে বেশ কয়েকটি পায়ের ছাপ, খালি পা। আজ সেই নিখুঁত সিঁধ কাটার কথা প্রসঙ্গে মনে এল যে প্রাচীন ভারতে‘চৌর্যবিদ্যা’-কে চতুঃষষ্টকলার অন্যতম বলে বিবেচনা করা হতো। এর সমর্থন পাওয়া যায় বাৎসায়নে। বাৎসায়ন তার ‘কামসুত্রম’এ লিখেছেন— ‘...হস্তলাঘম, ... ইতি চতুঃষষ্টিরঙ্গবিদ্যাঃ কামসূত্রস্যাবয়বিন্যঃ’। ( সাধারণ / প্রথম অধিকরণ / তৃতীয় অধ্যায় ) । এই চুরি যেহেতু একরকমের শিল্পকলা, সেইজন্য চোরেরা গৃহস্থের বাসায় এমন ভাবে সিঁধ কাটবে, যা একপ্রকারের দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যরূপে বিবেচ্য হবে এবং নগরবাসীরা সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রশংসা না করে পারবে না। পাঁচু কাকুর বাসার এই ‘সিঁধ কর্ম’-কে প্রশংসা না করে পারা যায় না। তখন এই ‘দর্শনীয়’ স্থাপত্যচিহ্নের চারপাশে আমরা। মনে পড়ল মনোজ বসুর ‘নিশিকুটূম্ব’এর কথা। ‘সিঁধ কাটার’ বিষয়ে তিনি লিখছেন –‘ভাল সিঁধ হল রীতিমতো শিল্পকর্ম। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখতে হয়। বস্তুটা আজকের নয়। হাজার দুয়েক বছর আগেও সাতরকম উৎকৃষ্ট সিঁধের খবর পাওয়া যাচ্ছে। পদ্মব্যাকোষ অর্থাৎ পদ্মফুলের মতো সিঁধকাটা। ভাস্কর অর্থাৎ সূর্যের মতো গোলাকার। বালচন্দ্র অর্থাৎ কাস্তের আকারের চাঁদের মতো। বাপি অর্থাৎ পুকুরের মতো চৌকো ...”। আমাদের সামনের সিঁধটি বাপি অর্থাৎ চৌকো।

বাসনকোসন রক্ষা পাওয়ায় খুশি পুতুল পিসি দর্শনার্থী বড়দের জন্য চা করে নিয়ে এলেন। বিমল কাকু কাজের জন্য বাইরে থাকেন, তিনি খবর পেয়ে রওনা দিয়েছেন, এসে হিসাব করে দেখবেন কতটা কী চোরে নিয়ে গেছে তাঁর। এর মধ্যেই খবর এলো পেছনের ডাঙ্গা পাড়ায় আরো একটা বাড়িতে সিঁধেল হানা দিয়েছিল, তাদের অনেক কিছুই নিয়ে গেছে চোরে।

পুলিশে খবর দেওয়া হবে কি হবে না সেই নিয়ে পাঁচুকাকুদের দুই ভাইয়ে বিতর্ক জমে উঠল। অবশেষে পাড়ার আরো কয়েকজনের মধ্যস্থতায় ঠিক হল যে পুলিশে জানানোর দরকার নাই, পুলিশ মানেই হাজার ঝামেলা। তার থেকে পাড়ায় নৈশ পাহারা চালু হোক। এরপর ৫, ৬ ও ৭ নম্বর গলির বাসিন্দারা মিলে একটা ‘নৈশ পাহারা’ কমিটি বানালেন। পালা করে ৫ জন করে দুই দলে পাহারা দেবে।তবে এই ‘নৈশ পাহারা কমিটি’ কখনই ‘নকশাল খেদানো শান্তি কমিটি’ গোছের ছিল না।

মহালয়ার দু-দিন আগের রাত। তখন মধ্যরাত হবে, হঠাৎ চিৎকার, ‘ধর, ধর, ধর’, ‘চোর চোর চোর’। ঘুম ভাঙলেও মা কিছুতেই আমাদের ঘর থেকে বেরুতে দিলেন না। দৌড়াদৌড়ির আওয়াজ আর চিৎকার চেঁচামেচি একসময় থেমে গেল। বাইরে তখন প্রবল বৃষ্টি। সেই ভোরে ঘুম ভাঙার পরে শুনলাম যে আবার চোর এসেছিল পাঁচু কাকুর বাসায়।বিমল কাকুর বাসায় না থাকা ও পেছনে ‘বুড়োর জঙ্গল’ চোরেদের মনে হয় ‘অনুপ্রাণিত’ করেছিল একই বাসায় চুরি করতে। কিন্তু এবার কিছু নিতে পারেনি, প্রাণ হাতে পালাতে পেরেছে এই যা। পালানোর সময় নতুন তারকাঁটার বেড়ায় আটকে গিয়ে প্রায় ধরা পরার জোগাড়, তবে শেষ পর্যন্ত ‘অপেশাদার পাহাদারদের’ হাত থেকে পালিয়েছে। পালানোর স্মারক হিসেবে চোরের পরনের গামছাটা তারকাঁটায় লেগে আছে। চা-মুড়ি খেয়েই ছুটলাম সেই ‘চোরের গামছা’ দেখতে। সারারাত বৃষ্টির জলে ভিজেছে তারকাটায় ঝুলতে থাকা লাল রঙের গামছার টুকরোটি। কিন্তু আমি সেই ভেজা ও ছেড়া গামছার দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম কিছুক্ষণের জন্য। একটা নির্বোধ গামছার গায়ে এমন যন্ত্রণার বীভৎসতা লেগে থাকে তা আমার কল্পনার বাইরে ছিল। গামছার আড়ালে তারকাঁটায় লেগে আছে কিছুটা মাংসলাগা মানুষের চামড়া। চুরি করতে আসা মানুষটা বোধহয় জানত না দুই বাড়ির মাঝে কাঁটাতার দেওয়া হয়েছে। পাহারাদারদের চিৎকার শুনে পালাতে গিয়ে তারকাঁটায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। বৃষ্টি ও পাহারাদারদের তাড়া খেয়ে এরপর তারকাঁটা ডিঙোতে গিয়ে হয়ত খুবলে গেছে গায়ের মাংস, চামড়া। সেই ভেজা গামছা ও মানুষের চামড়ার মাংস আমাকে অনেক রাত ঘুমোতে দেয়নি। সে বোধহয় ছিল আমার প্রথম কান্না পাওয়া, সমাজ সভ্যতা আমাদের যাবতীয় বোধের কাছে যে অপরাধী তার যন্ত্রণাটা আমাকে ভেতর থেকে বিবশ করে দিচ্ছিল। চোরেদের নিয়ে একটা অদ্ভুত রহস্য আমাদের সভ্যতা লালন করছে যুগ যুগ ধরে, সেই রহস্য আমাকে সে রাতগুলোতে ঘুমোতে দেয়নি। কিছুটা বড় হয়ে, আশির দশকের শুরুতে জলপাইগুড়ি সিনে সোসাইটির আয়োজনে লুইজি বার্তোলিনির কাহিনি অবলম্বনে তৈরি ভিত্তেরিও দি সিকার ‘বাইসাইকেল থিভস’ (লাদ্রি দি বাইসিস্লিত্তো) দেখেছিলাম। ৯৩ মিনিটের সেলুলয়েডের সাদাকালো কবিতাটি যতবার দেখেছি ততবার কেঁদেছি। কোথাও দুই দশকের দূরত্ব অতিক্রম করে আমার দুই কান্না এক হয়ে যাচ্ছিল। অসহায় বাবার কান্নার সংক্রমণ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারি নি। লুইস বার্তোলিনির গল্পেটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী মন্দ্রাক্রান্তা ইতালির দরিদ্র নাগরিক আন্তোনিও রিচির (লামবার্তো মাজ্ঞিওরানি) জীবিকা সন্ধান ও সেই নিয়ে ঘটা ঘটনা সমূহের কাহিনি। সে একটি চাকরি পায়, পোস্টার সাঁটানো। শর্ত ছিল তার একটি সাইকেল থাকতে হবে। স্ত্রী মারিয়া বিছানার চাদরের বিনিময়ে মহাজনের কাছ থেকে সাইকেল এনে দেয়। কিন্তু সেই সাইকেল চুরি হয়ে যায়। সে তখন ছেলে ব্রুনোকে নিয়ে সাইকেল খুঁজতে বের হয়। এরপর নানা ঘটনা ঘটে এবং রিচি ক্রমশ বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশীদের কাছে হাস্যকর হয়ে উঠতে থাকে। এরপর সে একটি সাইকেল চুরি করতে গিয়ে ধরা পরে যায়। সিনেমার চূড়ান্ত ক্লাইমেক্সে পুত্র ব্রুনো দেখছে সাইকেল চোর সন্দেহে মানুষেরা তার বাবা আন্তেনিওকে মারছে, এই দৃশ্য আমাকে সেই কাঁটাতারের কাছে নিয়ে যায়, যেখানে ভেজা গামছার আড়ালে চামড়ার রক্তে ভেজা মাংস ঝুলছে।

চলবে