ভোরের আলো মাছাপুচ্ছ্রের বরফঢাকা গায়ে পড়তেই শৃঙ্গগুলো সোনালি আভায় ঝলমল করে উঠল। অভিযাত্রীরা একে একে তাঁবুর ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। বাইরে তখন প্রচণ্ড ঠান্ডা—শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। সোজাকথা দাঁড়িয়ে থাকাই ঝুঁকির। সেই কষ্টের মধ্যেও সবাই দ্রুত প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নিলো; আজ তাদের লক্ষ্য বরফের দেয়াল বেয়ে উপরে ওঠা।
দলের সবাই যখন ভোরের ঠান্ডায় দাঁতে দাঁত চেপে প্রয়োজনীয় কাজ সারছিল, ঠিক তখনই তারা খেয়াল করল তিলক লিম্বু উপস্থিত নেই। বিষয়টা মুহূর্তেই সবাইকে চিন্তায় ফেলে দিলো। চারপাশে খোঁজাখুঁজি শুরু হলো, কিন্তু কোথাও তার দেখা মিলল না।
অথচ গতকাল বিকেলেও তিলক লিম্বু লাকপার সঙ্গে একই তাঁবুতে ছিল। লাকপা তখন থেকেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, রাতের খাবারও স্পর্শ করেনি। মাঝরাতে একবার ঘুম ভাঙলেও সে ভেবেছিল তিলক হয়তো অন্য কোনো তাঁবুতে গিয়ে শুয়ে পড়েছে। তাই আর খোঁজ নেয়নি তার।
চারপাশে খুঁজেও তিলকের কোনো চিহ্ন পাওয়া গেল না। বরফের ওপর কোনো পায়ের ছাপও নেই, তাই অনুসরণ করার মতো কোনো সূত্রও খুঁজে পায়নি কেউ।
অভিযাত্রীদের মনে আতঙ্ক ও বিস্ময় ছড়িয়ে পড়ল। তাঁবু ছেড়ে তিলক লিম্বু হঠাৎ কোথায় চলে গেল? কেউ কিছু বুঝতে পারছে না ব্যাপারটা।
শেরপারা প্রথমে ভেবেছিল, তিলক হয়তো আশেপাশে ঘুরে দেখছে বা রেকি করছে। আগের অভিযানগুলোতেও সে প্রায়ই এভাবে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করত। তাই শুরুতে কেউ খুব চিন্তিত হয়নি। সবাই ধরে নিয়েছিল, কিছুক্ষণ পরেই সে ফিরে আসবে।
সময় গড়িয়ে গেলেও তিলকের দেখা পাওয়া গেল না। তখন দলের ভেতর উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ল। কেউ কেউ মনে করতে লাগল, হয়তো সে পালিয়ে গেছে। আবার সেটা জোর দিয়েও বলতে পারছে না কেউ, কারণ পালাতে হলে খাবার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নেওয়ার কথা। অথচ তাঁবুতে তার ব্যবহৃত সবকিছুই পড়ে আছে। ফলে অভিযাত্রীরা দ্বিধায় পড়ে গেল। তিলক যদি পালিয়ে না থাকে, তবে সে গেল কোথায়? বরফের উপর কোনো পায়ের ছাপও নেই। মনে হচ্ছে সে হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে গেছে।
তিলক লিম্বুকে খুঁজে হয়রান হয়ে লাকপা শেরপা একপর্যায়ে বলেই ফেলল, ‘তিলক দাই ভয়ে পালিয়েছেন। আমি নিশ্চিত তিনি নিচের দিকে নেমেছেন।’
পাসাং শেরপা অনুযোগের সুরে বলল, ‘আমাদেরকে ফেলে রেখে চলে যাওয়া ঠিক হয়নি তার। যদি কোনো সিদ্ধান্তে অমত থাকত, তিনি তা বলতে পারতেন। শেরপারা সবাই মিলে নেমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে অভিযাত্রীরা আটকে রাখতে পারতেন না।’
পেম্বা শেরপা রেগে বলল, ‘না জেনে না শুনে তিলক দাই সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করো না কেউ। মনে হচ্ছে তিনি কোনো বিপদে পড়েছেন।’
সবাই যখন কথা কাটাকাটি করছে তখন শৈলজিত রায় একটা বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন, ‘তিলক পালিয়েছে আমি শিওর। গতকাল থেকেই তিলকের আচরণে আমার সন্দেহ হচ্ছিল। কথার ফাঁকে সে বলেছিল, “এটাই আমার শেষ অভিযান, পারলে এখনই চলে যেতাম। আর কখনোই কোন পর্বতে উঠব না।” তার কথার সঙ্গে আজকের পরিস্থিতি মিলিয়ে মনে হচ্ছে, সে সত্যিই পালিয়েছে।’
শৈলজিতের কথা শুনে সবাই চুপ হয়ে গেল। মুহূর্তেই দলের ভেতর ভয় আর হতাশা ছড়িয়ে পড়ল। ইখতিয়ার হামিম দাঁড়িয়ে ছিলেন, তার মুখেও হতাশার ছাপ ফুটে উঠল। তিনি বললেন, ‘তিলক যদি সত্যিই পালিয়েও থাকে, তবু আমাদের পদযাত্রা থামবে না। আমরা এখন সামিটের একেবারে কাছাকাছি এসে পৌঁছেছি। আর মাত্র নয়শত ফুট উপরে উঠলেই শিখর জয় সম্পন্ন হবে। এতদূর এসে যদি ফিরে যাই, তবে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম আর ত্যাগ সবই বৃথা হয়ে যাবে। আমাদের সঙ্গে চারজন অভিজ্ঞ শেরপা রয়েছে, তাদের নিয়েই আমরা এগিয়ে যাব।’
ইখতিয়ারের সিদ্ধান্তে শেরপারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। সোনাম শেরপা কর্কশ কণ্ঠে বলল, ‘সামিট পরে হবে। আগে তিলক দাইকে খুঁজে বের করতে হবে। তিনি পালাতে পারেন না। সাহসী মানুষ। আমার মন বলছে, তিনি আশপাশে কোথাও আছেন, হয়ত বিপদে পড়েছেন।’
সোনামের কথায় রিনজো খড়কা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। তিনি বললেন, ‘তুমি ঠিকই বলেছো। বিপদে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে আশেপাশে তো কোনো বড় ফাটল নেই, যাতে ধরে নেওয়া যায় সে পড়ে গেছে।’
ইখতিয়ার এবার বুঝতে পারলেন, নেপালি অভিযাত্রীরাও তার সিদ্ধান্তে রেগে গেছে। তিনি অনুশোচনার সুরে বললেন, ‘ভুল হয়েছে; আজ উপরে ওঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হয়নি। আগে তিলক লিম্বুকে খুঁজে বের করব, তারপর সামিট সম্পন্ন করব।’
ইখতিয়ারের নতুন সিদ্ধান্তে শেরপারা খুশি হলেন। সবাই একমত পোষণ করল যে, একসঙ্গে চেষ্টা করলে তিলককে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। পবন থাপা বললেন, ‘একটা প্রস্তাব দিতে চাই।’
ইখতিয়ার বললেন, ‘প্রস্তাবটা শুনতে চাই, জানাও।’
পবন থাপা বললেন, ‘আমরা চারজন অভিযাত্রী, আর শেরপাও চারজন আছে। তাই আটজনকে চার ভাগে ভাগ করবে। প্রতিটি দলে একজন শেরপা আর একজন অভিযাত্রী থাকবে। চারটা দল চারদিকে ছড়িয়ে গিয়ে খুঁজবে। এতে তিলককে খুঁজতে সহজ হবে।’
সবাই তার প্রস্তাবে সম্মতি জানাল। তারা দ্রুত ঠিক করে নিলো কে কোন দিকে যাবে। সব ঠিকঠাক হতেই একেক দল আলাদা পথে বেরিয়ে পড়ল।
প্রথম দলে আছে, ইখতিয়ার হামিম ও সোনাম শেরপা, তারা যাচ্ছে উত্তর দিকে। দ্বিতীয় দলে আছে, শৈলজিত রায় ও লাকপা শেরপা, তারা যাচ্ছে দক্ষিণ দিকে। তৃতীয় দল নিয়ে পবন থাপা ও পাসাং শেরপা যাচ্ছে পূর্ব দিকে। আর চতুর্থ দল নিয়ে পশ্চিম দিকে যাচ্ছে রিনজো খড়কা ও পেম্বা শেরপা।
দল ভাগ হতেই সবাই নিজের দল নিয়ে দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। শুরুতেই নিয়ম করে দেওয়া হয়েছিল, যত দূরেই যাওয়া হোক না কেন, সূর্যাস্তের আগে অবশ্যই তাঁবুতে ফিরে আসতে হবে। সঙ্গে রাখতে হবে মিনি অক্সিজেন মাস্ক আর শুকনো খাবার, যাতে পথে কোনো বিপদে পড়লেও সামলে নেওয়া যায়।
সারাদিন ধরে চারটি দল তিলক লিম্বুর খোঁজে পর্বতের আশেপাশে ঘুরে বেড়াল। পাথরের ফাঁক, ছোট ছোট গিরিখাতসহ সব জায়গায় খুঁজেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই সবাই নিয়ম মেনে তাঁবুর দিকে ফিরতে শুরু করল।
তিন দল ঠিক সময়েই ফিরে এলেও শৈলজিত-লাকপার দল তখনো ফেরেনি। তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। কারো ধারণা, হয়তো তারা অনেক দূরে চলে গেছে। আবার কেউ মনে করছে, হয়তো পথ হারিয়ে ফেলেছে। এদিকে তাঁবুর চারপাশে তখন হালকা অন্ধকার নেমে এসেছে, ঠান্ডা হাওয়াও বইতে শুরু করছে।
সূর্যের আলো নিভে যেতেই অন্ধকার ঘনিয়ে এলো। দলের ভেতর উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে গেল। সবার দৃষ্টি দূরের দিকে, যদি শৈলজিত দলের দেখা মিলে।
তাঁবুর সামনে দাঁড়িয়ে সবাই শৈলজিতের দলের জন্য অপেক্ষা করছে। সময় যত গড়াচ্ছে, পর্বতের গায়ে অন্ধকার তত ঘনিয়ে আসছে। আজ চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়বে আরও ঘণ্টাতিনেক পর, তার আগে মাছাপুচ্ছ্রে নিমজ্জিত থাকবে গভীর অন্ধকারে। ফলে শৈলজিতের দল সহজে ফিরে আসতে পারবে না। আলো ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসায় ইখতিয়ার হামিমের মনে দুশ্চিন্তা বাড়তে লাগল। নিয়ম অনুযায়ী শৈলজিতদের অনেক আগেই ফিরে আসার কথা ছিল, অথচ তারা এখনো ফেরেনি।
নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার ঘণ্টাখানেক পরেও তাদের দেখা নেই। এদিকে বরফঢাকা চূড়াগুলো অন্ধকারে ঢেকে গেছে অনেক আগেই। আবছা অন্ধকারে বরফের ফাটল চিনে এগোনো খুব কঠিন হয়ে পড়বে এখন। কারও সঙ্গে টর্চ লাইটও নেই। শুরুতেই সবাই ভেবেছিল সূর্যাস্তের আগেই তাঁবুতে ফিরে আসবে, তাই আলাদা আলো নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি কেউ।
অপেক্ষার সময় যত বাড়ছে, উদ্বেগও তত বাড়ছে। মাঝে মাঝে বরফের ওপর পায়ের শব্দের মতো শোনা যাচ্ছে, তখন সবাই চমকে উঠে। পরে অনুভব করে সেটা কারো পায়ের শব্দ নয়, বাতাস বয়ে যাওয়ার শব্দ। সবাই তাকিয়ে আছে সামনে, যদি হঠাৎ শৈলজিতদের দেখা পাওয়া যায়।
তাঁবুর ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে, চাপা পরিবেশ বিরাজ করছে। সময়ও গড়িয়ে যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল, তবুও তাদের কোনো খোঁজ নেই। তাঁবুর ভেতর উদ্বেগ আরও বাড়তে লাগল। একটু পর পর কেউ না কেউ তাঁবুর বাইরে এসে দূরে তাকিয়ে দেখছে শৈলজিতের দল আসছে কি না।
দ্রুত ছয়জন একত্র হলো। সবাই আলোচনায় বসল। যুক্তি তর্কের শেষে তারা নিশ্চিত হলো, শৈলজিতের দল বিপদেই পড়েছে। কারণ শৈলজিত খুব দায়িত্বশীল মানুষ। তিনি কখনো কোন নিয়ম ভেঙে দেরি করতেন না। আবার তিনি অতটা সাহসীও নন যে, অকারণে ঝুঁকি নিয়ে কঠিন পথ পেরিয়ে বহুদূর চলে যাবেন। সবাই নিশ্চিত, বিপদ ঘটেছে বলেই তারা ফিরতে পারছে না।
ইখতিয়ার হামিম এখন বিপাকে পড়েছেন। তিনি দলনেতা, তাই তার সিদ্ধান্তের ওপরই সবার ভরসা। অথচ সকাল থেকে দেখা যাচ্ছে, তার নেতৃত্ব কেউ ঠিকমতো মানছে না। মুখের ওপর কিছু বলছে না যদিও, তবে সবাই ভেতরে ভেতরে অসন্তুষ্ট তা বুঝা যাচ্ছে। অভিযাত্রীরা লাজ-লজ্জার কারণে চুপ করে আছেন, শেরপারাও সরাসরি কিছু বলছে না অবশ্য।
এদিকে সারাদিনের ক্লান্তিতে সবার চোখে ঘুম এসে যাচ্ছে। যদি এখন খেয়ে বিশ্রাম নিতে পারত, তাহলে শরীরের ক্লান্তিটা দূর হতো তাদের। কিন্তু সেই সুযোগ নেই। কারণ একজনকে খুঁজতে গিয়ে এবার আরও দুজন বিপদে পড়েছে। ফলে দলের ভেতর উদ্বেগ আরও বেড়ে গেছে। এই অবস্থায় কেউ খেতে চাইছে না, কেউ বিশ্রামও নিতে পারছে না। সবার মনে একই চিন্তা, কি হতে যাচ্ছে সামনের দিনগুলোতে।
ইখতিয়ার বুঝতে পারছেন, দলের মনোবল ভেঙে যাচ্ছে। তিনি জানেন, এখন যদি সঠিক সিদ্ধান্ত না নেন, তবে পুরো অভিযাত্রাই ভেস্তে যাবে। আবার যদি তিনি নির্দেশ দেন বা অনুরোধ করেন, ‘টর্চ নিয়ে আশপাশে খুঁজতে বের হও’। তাহলে কেউ-ই সেটা মানবে না। দলের মধ্যে তার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। সবাই মনে করছে তিনি বারবার ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
তার নিজেরও ভয় হচ্ছে, যদি আবার ভুল কোনো সিদ্ধান্ত দেন, তাহলে শেরপারা রেগে গিয়ে চড়াও হতে পারে। শেরপারা অভিজ্ঞ, তারা পর্বতের নিয়ম জানে। তাই তাদের বিরোধিতা করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।
সবকিছু ভেবে ইখতিয়ার একেবারেই চুপসে গেলেন। এখন কোনো কৌশলই কাজে লাগবে না, তা সে অনুধাবনও করতে পেরেছেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, তার পক্ষে একা সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভবই হচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে তিনি সবার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, ‘আমরা খুব কঠিন সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। এই অবস্থায় তোমাদের সাহায্য দরকার। এখন কি করা উচিত, তোমাদের সিদ্ধান্তটা জানাও।’
ইখতিয়ারের কথা শেষ হওয়ার আগেই পেম্বা শেরপা উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘তিলক দাইয়ের সতর্কবার্তা তুমি মানোনি। তার কথা শুনে যদি আমরা নিচে ফিরতাম, আজ এই বিপদে পড়তে হতো না। মনে রেখো, সব দায়ভার তোমাকেই নিতে হবে।’
পেম্বার কঠিন কথায় মনে মনে সবাই খুশি হলো এবং নীরবে সম্মতিও জানালো। ইখতিয়ার হামিম চুপ হয়ে গেলেন। তার মুখ থেকে কোনো কথা বের হলো না। নেপালি দুই অভিযাত্রীও তাকে সমর্থন করল না। ফলে তিনি একেবারেই একা হয়ে পড়লেন।
ইখতিয়ার ভালো করেই জানেন, শেরপারা যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে পেলে, তাহলেও তারা সহজেই পার পেয়ে যাবে। কারণ নিচে গিয়ে তারা যা বলবে, প্রশাসন সেটাকেই সত্য বলে ধরে নেবে। এত উঁচুতে উঠে আসা বা এখানে তদন্ত করা পুলিশ বা অন্য কোন সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়।
পর্বতের উপরে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেও প্রকৃত ঘটনা কেউ যাচাই করে বের করতে পারবে না। শেরপারা অভিজ্ঞ, তারা জানে কীভাবে মিথ্যাকথা সাজিয়ে বলতে হয়। তাই তাদের কথাই শেষ পর্যন্ত সত্য হিসেবে ধরা নেওয়া হবে।
ইখতিয়ার বুঝতে পারলেন, এই অবস্থায় তিনি একেবারেই অসহায়। যদি কোনো বিপদ ঘটে, তার দায়ভার হয়তো তাকেই নিতে হবে।
রাত বাড়ছে। তিনঘন্টা পর মাছাপুচ্ছ্রের গায়ে চাঁদের আলো নেমে এসেছে। চারপাশ এখন ফকফকা। নিস্তব্ধতার মাঝে শুধু বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ শোনা যাচ্ছে। তাঁবুর ভেতরে অভিযাত্রী দল চুপচাপ বসে আছে। কারো চোখে ঘুম নেই। উদ্বেগ আর অজানা ভয় তাদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
ইখতিয়ার হামিম ভেঙে পড়েছেন। তিলক লিম্বুর পর এবার শৈলজিত রায় আর লাকপা শেরপা ফিরে আসেনি, বিষয়টা ক্রমেই রহস্যময় হয়ে উঠছে। একে একে তিনজন মানুষ নিখোঁজ হয়ে গেছে, অথচ ঘটনার কোনো আলামত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বরফে আস্তরে পায়ের ছাপ নেই, অথবা আশপাশে কোনো শব্দ নেই, যেন তারা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।
ইখতিয়ার হামিম বুঝতে পারছেন, তার প্রতিটি সিদ্ধান্তই ভুল ছিল। ভেতরে ভেতরে তিনি আফসোস করতে লাগলেন, সেদিন যদি তিলক লিম্বুর সতর্কবার্তা আমলে নিতেন, হয়তো আজ এই বিপদে পড়তে হতো না। দায়িত্বের ভার এখন তার কাঁধে পাথরের মতো চেপে বসেছে, বিষয়টা একদম ভালো লাগছে না ইখতিয়ারের।
হঠাৎ তাঁবুর বাইরে থেকে একটা শব্দ ভেসে এলো। অনেকটাই পায়ের আওয়াজের মতো। সবাই চমকে উঠল এবং তাৎক্ষণিক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল তাঁবুতে।
সাহস করে সোনাম শেরপা দ্রুত বাইরে বেরিয়ে গেল। বাইরে গিয়ে কিছুই দেখতে পেল না সে, চারপাশ তুষারে ঢাকা। তুষারের স্তর এতই ঘন যে, সামনের কয়েক ফুট দূরত্বের কিছুও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। ফলে সে হতাশ হয়ে তাঁবুতে ফিরে এলো।
তাঁবুতে ঢুকেই সোনাম শেরপা বলল, ‘কিছুই দেখতে পেলাম না। তবে এটা কোনো জীব-জানোয়ারের পায়ের শব্দ নয়। শব্দটা খুব ভারী মনে হলো আমার কাছে।’
রিনজো খড়কা বললেন, ‘আমার কাছে মনে হলো শব্দটা পর্বতের বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে।’
তার কথা শুনে দলের সবাই থর থর করে কাঁপতে লাগল। এবার সবার ধারণা, অজানা কোনো রহস্য তাদেরকে ঘিরে ধরেছে।
পবন থাপা বললেন, ‘তিলক হয়তো এমন কোনো শব্দ শুনে সামনে এগিয়ে গেছে, আর সে তখনই বিপদে পড়েছে। শৈলজিতের দলও একইভাবে বিপদে পড়তে পারে। এটা অনুমান করে বললাম; সত্য নাও হতে পারে।’
ইখতিয়ার বললেন, ‘আজ রাতে আর কেউ তাঁবু ছেড়ে বাইরে যাবে না। যা করার সকালে করব।’
তার কথায় সবাই সম্মতি জানিয়েছে। অবশ্য সম্মতি জানানো ছাড়া অন্য কোনো উপায়ও নেই। রাতে বের হওয়া মানে বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনা। তাই কেউ আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ শোয়ে পড়ল।
রাত গভীর হলো। পবন থাপা কৌতূহল নিয়ে তাঁবুর বাইরে মুখ বের করল। হঠাৎ দূর থেকে এক আলোকরশ্মি ভেসে আসতে দেখল সে। সঙ্গে সঙ্গে খবরটা তাঁবুর ভেতরে জানাল পবন।
দলের সবাই তড়িঘড়ি করে বাইরে এসে দাঁড়াল। তারা দেখল আলোটা স্থির নয়, টর্চ লাইটের মতো একবার জ্বলছে আবার নিভছে। তবে কিছুক্ষণ পর আলোটা আর দেখা যায়নি, হঠাৎ মিলিয়ে গেল।
সোনাম শেরপা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল, ‘আমার বিশ্বাস শৈল দাই আসছেন, চলো আমরা এগিয়ে যাই।’
সবাই নীরব। তার কথায় কেউ কোনো মন্তব্য করল না। কারণ এ আলো শৈলজিতের আলো নয়, তিনি টর্চ জাতীয় কিছু নিয়ে বের হননি। এই আলো রহস্যময় কিছুর ইঙ্গিত।
আলোকরশ্মি দেখে তারা অনেক কিছু বুঝে গেল, আর ধীরে ধীরে সবাই তাঁবুর ভেতরে ফিরে এলো। তারা পরিষ্কার বুঝতে পারল, মাছাপুচ্ছ্রের বুকের ভেতর লুকিয়ে আছে এক অজানা রহস্য, যে রহস্য তাদের চারপাশে ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে।
ইখতিয়ার হামিম বুঝতে পারলেন, সামিটের পথে আর এগোনো সম্ভব নয়। এখন একটাই কাজ বাকি, দ্রুত নিচের দিকে নামা। তবে তার আগে নিখোঁজ তিনজনকে খুঁজে বের করতে হবে। দলের প্রত্যেকেরই একই সংকল্প, বিষয়টা যতই কঠিন হোক না কেন, তারা সঙ্গীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে আগে।