শূন্যতার ভেতর সংস্কৃতি

সংস্কৃতি কি নিজেকে ভেঙে ফেলার জন্যই জন্মায়, নাকি ভাঙার গল্পটাই পরে আমরা বানাই; এই প্রশ্নটা কাগজে যতটা সোজা, বাস্তবে ততটাই কাদামাটি, হাঁটু ডুবিয়ে হাঁটতে হয়, কারণ এখানে শুধু গান, সিনেমা, বই নেই, আছে বাজার, আছে টাকার গন্ধ, আছে সেইসব অদৃশ্য হাত যারা ঠিক করে দেয় কোনটা জনপ্রিয় হবে, কোনটা অদৃশ্য হয়ে যাবে; ডব্লিউ. ডেভিড মার্ক্স তার বই Blank Space-এ এসে যেন এই সবকিছুর উপর একরকম হিসাবের খাতা খুলে বসেন, বলছেন, বিংশ শতাব্দী ছিল উদ্ভাবনের, নতুন ভাবনার, নতুন স্টাইলের, বিদ্রোহের; আর একবিংশ শতাব্দী যেন দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত স্থিরতায়, যেন সব আছে কিন্তু কিছুই নড়ছে না, একটা অস্বস্তিকর নীরবতা, যেখানে সবকিছু একইরকম দেখায়, একইরকম শোনায়, আর মানুষ নিজের অজান্তেই বলে ফেলে; কিছু একটা ঠিক নেই।

কিন্তু এই “ঠিক নেই”-এর দোষ মার্ক্স সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়া বা অ্যালগরিদমের ঘাড়ে চাপান না, বরং একধরনের বিস্তৃত, একটু ঝাপসা শব্দ ব্যবহার করেন; নিওলিবারালিজম; যেটা ঠিক কখন শুরু, কোথায় শেষ, সেটা স্পষ্ট নয়, কিন্তু তার দাবি, এই ব্যবস্থাই আমাদের রুচি, পছন্দ, আচরণ; সবকিছুর পেছনে বসে থাকা অদৃশ্য হিসাবরক্ষক; যেখানে লাভই শেষ কথা, আর সেই লাভের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তৈরি হয় এক ধরনের সাংস্কৃতিক দর্শন, যেখানে “পপটিমিজম” এসে বলে জনপ্রিয় মানেই ভালো, আর লজ্জাহীন প্রদর্শন, ব্যবসায়িক বুদ্ধি; এসবকে বলা হয় গণতান্ত্রিক শক্তি, যেন শিল্পের ভেতরের কারিগরি, গভীরতা, বা প্রতিভা আর একমাত্র মানদণ্ড নয়; কারদাশিয়ানদের রিয়েলিটি শো থেকে লেডি গাগার পারফরম্যান্স, এমনকি আমেরিকার ৬ জানুয়ারির রাজনৈতিক হাঙ্গামা; সবকিছু একই ধারার মধ্যে পড়ে যায়, যেখানে সংস্কৃতি আর রাজনীতি একে অপরের ভাষা ধার করে।

এখানেই মার্ক্সের আরেকটা বড় দাবি; একবিংশ শতাব্দীতে সংস্কৃতি রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে গেছে, ডান আর বাম; দুই দিকেই; বামপন্থিরা নাকি শিল্পের নতুনত্ব, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছেড়ে দিয়ে ভোক্তাবাদ আর বিদ্রূপের আড়ালে ঢুকে পড়েছে, সেই হিপস্টার সংস্কৃতি, যেখানে সবকিছুতেই একধরনের “আইরনি” আছে, কিন্তু অবস্থান নেই; আর সেই ফাঁক দিয়েই ডানপন্থা, বিশেষ করে ফার-রাইট, এসে সংস্কৃতির “বিদ্রোহী” ভূমিকাটা কেড়ে নেয়; চ্যান, ম্যাগা, নিক ফুয়েন্তেস; যারা কোনো শিল্পগত নতুনত্বে আগ্রহী নয়, কিন্তু বিদ্রোহের ভাষাটা ব্যবহার করে; ২০১৬-এর নির্বাচনকে তাই তিনি সংস্কৃতির লড়াই হিসেবে দেখেন, যেখানে ব্যবসায় সফল কিন্তু সাংস্কৃতিক মর্যাদা না পাওয়া মানুষদের ক্ষোভ জমে ওঠে, আর সেই ক্ষোভ একসময় পুরো রিপাবলিকান পার্টিকেই গ্রাস করে ফেলে।

মার্ক্স যখন নব্বইয়ের দশককে শেষ “প্রকৃত” শিল্পের সময় হিসেবে দাঁড় করান; পার্ল জ্যাম, পাঙ্ক এথোস, “সেল আউট” হওয়ার বিরুদ্ধে একধরনের নৈতিক অবস্থান; তখনই একটা অস্বস্তি এসে বসে, কারণ সেই সময়েই তো নিওলিবারালিজমও শক্ত হয়ে বসছিল, পোস্টমডার্নিজমও তখন বহু আগেই সংস্কৃতির কেন্দ্রে ঢুকে পড়েছে, যেখানে উচ্চ-নিম্নের পার্থক্য ভেঙে যাচ্ছে, বহুত্ববাদ, আপেক্ষিকতা; এসবই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে; তাহলে একবিংশ শতাব্দীকে আলাদা করে “দোষী” বানানোর জায়গাটা কোথায়?

এখানে এসে ফ্রেডরিক জেমসনের ছায়া পড়ে, যাকে মার্ক্স ব্যবহার করেন, কিন্তু পুরোপুরি ধরেন না; জেমসন বলেছিলেন, পোস্টমডার্ন সংস্কৃতি মূলত একধরনের “প্যাস্টিশ”; অতীতের সব স্টাইলকে টুকরো টুকরো করে নিয়ে এসে নতুন কিছু বানানোর ভান, কিন্তু ভেতরে কোনো দিকনির্দেশ নেই, যেন মৃত ভাষা, যেটার মধ্যে আমরা বাস করছি; মার্ক্স এই জায়গায় “ফিউশন”-এর কথা বলেন; ট্র্যাপ আর কান্ট্রি মিউজিক একসাথে, স্ট্রিটওয়্যার আর আর্ট; সবকিছু মিশে যাচ্ছে, আর এই মিশ্রণ তৈরি করছে একধরনের “অমনিভোরাস” সংস্কৃতি, যেখানে সবকিছু খাওয়া যায়, সবকিছু গ্রহণযোগ্য, ফলে আলাদা করে কোনো সাবকালচার দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, সবাই মিলে একটা “pluralistic monoculture”-এর ভেতরে ঢুকে পড়ে।

কিন্তু এই বিশ্লেষণে সমস্যা দেখা দেয় যখন তিনি নিজেই উদাহরণ দেন; ড্র্যাগ সংস্কৃতি, যার ভাষা, ভঙ্গি মূলধারায় ঢুকে পড়েছে; “ইয়াস কুইন”, “মাদার”; এসব শব্দ এখন সোশ্যাল মিডিয়ার সাধারণ শব্দ, কিন্তু প্রশ্ন ওঠে; এটা কি সমর্থন, নাকি মূলধারার দ্বারা প্রান্তিক সংস্কৃতির ভাষা দখল? RuPaul’s Drag Race-এর মতো শো কি সেই সাবকালচারকে শক্তিশালী করছে, নাকি বাজারের পণ্য বানিয়ে ফেলছে? আবার লেডি গাগাকে তিনি সমালোচনা করেন, কারণ তিনি নাকি ড্র্যাগ এস্থেটিক ব্যবহার করেছেন কিন্তু “র‍্যাডিক্যাল” কিছু করেননি; এখানেই একটা চাপা প্রত্যাশা দেখা যায়, যেন পপ শিল্পীকে অবশ্যই রাজনৈতিক বা বিপ্লবী হতে হবে।

এই দ্বন্দ্ব আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায় মার্ক্স একইসঙ্গে বলছেন; সংস্কৃতি খুব বেশি রাজনৈতিক হয়ে গেছে, আবার যথেষ্ট রাজনৈতিকও হয়নি, কারণ “প্রকৃত” বিপ্লব ঘটেনি; অথচ ম্যাগা-এর উত্থান নিজেই তো একধরনের সাংস্কৃতিক দখল, কিন্তু সেটা তার পছন্দের নয়, তাই সেটাকে তিনি উদ্ভাবন হিসেবে মানতে চান না; এই জায়গায় এসে তর্কটা একটু নিজের সাথেই লড়াই করে।

শিকাগো ড্রিলের মতো উদাহরণ তিনি দেন, কিন্তু তার গভীরে যান না; যেখানে বাস্তব সহিংসতা, গান, সোশ্যাল মিডিয়া; সব একসাথে জড়িয়ে আছে, যেখানে শিল্প আর বাস্তবের সীমানা ভেঙে যায়, আর প্রশ্ন ওঠে; সব উদ্ভাবন কি ভালো? সব সাবকালচার কি উদযাপনযোগ্য?

মার্ক ফিশারের কথাও এখানে এসে জুড়ে যায়; Capitalist Realism; যেখানে বলা হয়, এখন আর বিকল্প কল্পনা করার জায়গা নেই, পুঁজিবাদ এতটাই সবকিছু গ্রাস করেছে যে নতুন কিছু ভাবার আগেই সেটাকে শোষণ করে নেয়; কুর্ট কোবেইনের উদাহরণ; MTV-কে গালি দিলেও সেই গালিটাই MTV-র পণ্য হয়ে যায়; এই লুপ থেকে বের হওয়া কঠিন; মার্ক্স যেখানে নব্বইয়ের দশককে একধরনের শেষ প্রতিরোধ হিসেবে দেখেন, ফিশার সেখানে দেখেন এক অদ্ভুত ফাঁদ, যেখানে প্রতিরোধই পণ্যে পরিণত হয়।

তবু মার্ক্স পুরোপুরি নিরাশ নন; তিনি বলেন, শিল্পকে আবার জনসম্পদ হিসেবে ভাবতে হবে, শুধু অর্থনৈতিক সাফল্যের বাইরে গিয়ে সামাজিক মূল্য তৈরি করতে হবে, শিল্পীদের ঝুঁকি নিতে হবে, সমালোচকদের সেই ঝুঁকিকে চিনতে হবে, ছোট ছোট আন্ডারগ্রাউন্ড জায়গাগুলোকে সময় দিতে হবে বড় হওয়ার, বাজারের বাইরে একটু শ্বাস নেওয়ার; এমনকি তিনি বলেন, ক্লাসিক এত পড়তে হবে, এত দেখতে হবে যে বিরক্তি আসে; কারণ সেই বিরক্তি থেকেই নতুন কিছু বের হয়; আর ডেটা, অ্যানালিটিক্স; এসবের ওপর কম নির্ভর করে নিজের ভেতরের অনুভূতিকে বিশ্বাস করতে হবে।

কিন্তু বইয়ের শেষে এসে একটা অন্যরকম দৃশ্য ভেসে ওঠে; একজন সমালোচক, যিনি নব্বইয়ের দশকে বড় হয়েছেন, কোবেইনের সময়ে, যখন “অথেন্টিসিটি” একটা মূল্য ছিল, আর এখন তিনি তাকিয়ে আছেন নতুন সময়ের দিকে, যেখানে সবকিছুই একটু বেশি মিশ্র, একটু বেশি খোলা, একটু বেশি বাজারের ভেতরে; কৈশোরে যে শিল্প আবিষ্কার করা হয়, সেটাই তো সবচেয়ে নতুন লাগে, কারণ তখন নিজের ভেতরটাই নতুন থাকে; তারপরের সবকিছুই যেন একটু পুনরাবৃত্তি, একটু কম তীব্র।

সংস্কৃতি কি সত্যিই স্থবির হয়ে পড়েছে, নাকি আমরা স্রেফ নিজেদের সময়ের গণ্ডিতে দাঁড়িয়ে নতুন এক সময়কে বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছি—এই চিরাচরিত প্রশ্নটিই আবার সামনে চলে আসে।

“আমাদের সময়ের শিল্পীরাই প্রকৃত শিল্পী ছিলেন”—এমন আপ্তবাক্য প্রতিটি প্রজন্মের হাত ধরেই ফিরে আসে; মানুষ বদলে যায়, কিন্তু এই অনুভূতির কোনো হেরফের হয় না।

ঠিক সেই পুরনো রেশ ধরে এই বিংশ শতাব্দীতেও আমাদের মনে হয় যে কিছু একটা আমূল বদলে গেছে, কিন্তু নির্দিষ্ট করে তা চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না; কেবল অনুভব করা যায় যে গহীনে কোথাও একটা প্রবল পরিবর্তন ঘটে চলেছে।


টোকিওতে বসবাসরত সাংস্কৃতিক বিশ্লেষক ডব্লিউ. ডেভিড মার্ক্স মূলত জাপানি এবং আমেরিকান সংস্কৃতির মেলবন্ধন নিয়ে কাজ করেন। তাঁর সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থটির নাম “Blank Space: A Cultural History of the 21st Century”। এর আগে তিনি “Status and Culture” এবং “Ametora: How Japan Saved American Style”-এর মতো প্রশংসিত বই উপহার দিয়েছেন। তাঁর নিয়মিত কলাম ও প্রবন্ধগুলো The Atlantic, The New Yorker এবং The New Republic-এর মতো বিশ্বখ্যাত সাময়িকীগুলোতে স্থান করে নিয়েছে।