বাইরে এসেই আমরা বৃষ্টির ভেতরে পড়লাম। আমার ছাতা লাগেজে। ক্যাতারজিনা কালই বলেছিলেন যে চেক রিপাবলিকে থাকাকালীন কোনো বৃষ্টি নেই। কিন্তু পাহাড়ে কখন বৃষ্টি হবে তা হলফ করে বলা চলে না। ছিঁচকাঁদুনে বাচ্চাদের মতো অবস্থা। আমি গলার মাফলার মাথায় বাঁধলাম, আর সাথে সাথে এন্থোনির ছাতার নিচে ঢুকে গেলাম। ক্যাতারজিনার জ্যাকেট অনেকটাই বৃষ্টি প্রটেকটেড তাছাড়া একটা হুডও আছে। তিনি গটগট করে হেঁটে গেলেন গাড়ির দিকে। রাস্তার কোনায় এসে আমাকে বললেন, “তুমি ওদের সাথে যাও। আমি আসছি।” পড়লাম মহা বিপদে, কারণ অ্যান্থনিও ক্যাতারজিনার সাথে হাঁটা শুরু করলেন। অতএব আমাকে শেষ পর্যন্ত প্রফেসর সারগেই-র ছাতার নিচে ভিড়তে হলো। কিন্তু আমরা ক্যাসেলের যে দিকটায় ঢুকলাম সেখানে কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন হচ্ছে বলে বোঝা গেল না। দানুসিয়া ভেরাকে ফোন করে আমাদের বললেন যে এখানে নয়, আমার সাথে আসুন। আমরা আবার বৃষ্টির ভেতরে বের হলাম। এবং শেষ পর্যন্ত দেখা গেল ক্যাসেলে ঢুকেই প্রথমে আমি দৌড়ে যে গেটটিতে পৌঁছে গিয়েছিলাম এবং আমাকে ভুল পথে যাবার জন্যে উপহাস করা হয়েছিল, সেটাই ছিল আসল পথ। অতএব শেষ পর্যন্ত বিশাল ক্যাসেলের ভেতরে যাওয়া গেল, কিন্তু এটা ছিল একটি গোলকধাঁধার মতো বিল্ডিং। যদিও আমরা নির্দিষ্ট গেটে পৌঁছাতে সক্ষম হলাম তথাপি গেট বন্ধ দেখে একে অপরের দিকে চোখ চাওয়াচাওয়ি করছি, ঠিক এমন সময় ক্যাতারজিনার চেহারা মুবারক দেখা গেল। তিনি আশ্বস্ত করলেন যে ভেতরে লোক আছে, জোরে জোরে গুঁতা দিলে কেউ একজন দোতলা থেকে এসে খুলে দেবেন। তাই হলো। আমরা দোতলায় পৌঁছে দেখি সব কিছু সাজানো হয়ে গেছে। মাইক্রোফোন, চেয়ার, সোফা, আর পিছনের টেবিলে বই সবই পরিপাটি। ভেরা দেখিয়ে দিলেন কে কোথায় বসবেন। তার আগে পাশের রুমে শীতের কাপড় রেখে আসতে বললেন।
কিছুক্ষণের মধ্যে দুই শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে দুই স্কুল থেকে ছাত্রছাত্রী এসে দর্শকের আসন দখল করলে লাঞ্চের আগে আবারও ভেরা কোপেচকার পরিচালনায় সকালের মতোই কবিতাপাঠ ও প্রশ্নোত্তর পর্ব হয়ে গেল। পরের অনুষ্ঠান বিকাল পাঁচটায়। আমরা একটার দিকে লাঞ্চের উদ্দেশ্যে ক্যাসেল ছেড়ে পশ্চিমের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। কাজিমেয়ারেজ বুরনাতের নির্দেশনায় কিছুক্ষণের ভেতর পাহাড়ের ঢালুতে একটা বার ও রেস্টুরেন্টে পৌঁছে গেলাম। সামনের দিকে সব সিটই পূর্ণ, অতএব পিছনের রুমে গিয়ে আমরা, অর্থাৎ বিদেশি কবিরা দুটি টেবিলে ভাগ হয়ে বসলাম। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর ওয়েটার এলে আমি ও ক্যাতারজিনা উভয়েই কুসকুস দিয়ে মুরগির মাংস আর পানীয় হিসেবে নন-অ্যালকোহলিক বিয়ার নিলাম। ক্যাতারজিনা অবশ্য স্যুপও অর্ডার করলেন এবং আমাকে বললেন, আয়োজকরা নন, দুপুরের খাবারের জন্যে পে করবেন বুরনাত, তিনি একটি গ্রান্ট পেয়েছেন আমাদের খাওয়ানোর জন্যে। তবে খাবারের অর্ডার দিতে গিয়ে জানা গেল ভেজিটেরিয়ানদের জন্যে কোনো মেন্যু নেই। ফলত, অ্যান্থনি ও তার স্ত্রী উঠে গেলেন, অন্য কোনো রেস্টুরেন্ট খুঁজে পেতে। বুরনাত তাঁদের জন্যে প্রয়োজনীয় ক্যাশ দিয়ে দিলেন।
খেতে খেতে নানা রকম গল্প হলো। আমি বুরনাতকে জিজ্ঞেস করলাম তার কতগুলো কবিতা ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। তিনি চিন্তা করে বললেন, “আশিটির মতো।”
আমি বললাম, “ওগুলোকে একত্রিত করে একটা ফাইল বানিয়ে আমাকে পাঠান। আমি নিউইয়র্ক থেকে একটি বই বের করার ব্যবস্থা করবো।” একই রকম অনুরোধ আমি এর আগের সপ্তাহে ডারিউস টোমাস লেবিয়ডাকেও করেছি। পোল্যান্ডে আমার বই প্রকাশ ও আমাকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্যে এই দুইজন মানুষের অবদান অনস্বীকার্য, তাই আমি নিউইয়র্ক থেকে কোনো স্মল প্রেসের মাধ্যমেও এদের বই বের করে দিতে পারলে ধন্য হবো।
তিনি বললেন, “সবগুলো কবিতাই আমি দিয়ে দেব। তুমি দেখে নিও কোনটি বইয়ে যাবে কোনটি যাবে না।”
আমি বললাম, “অনুবাদের এডিটিং হতে পারে। যেমন, শব্দগুচ্ছ-র গত সংখ্যার জন্যে যে কবিতাগুলো দিয়েছিলেন সেখান থেকে তিনটি ছাপতে পেরেছি, তাও অনেক এডিটিং-এর পরে। প্রফেসর জোন ডিগবি আমাকে সাহায্য করেছেন। অনুবাদগুলো ভালো ছিল না।”
খাওয়া শেষেও আমাদের আরো খানিকটা আড্ডা চললো। আদতে তখন দুটো বাজে। পাঁচটায় পরবর্তী অনুষ্ঠান। একটু বাসায় গিয়ে জিরিয়ে নিতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু ক্যাতারজিনা বললেন, “ভেরা আমাদের হাতে বাসার চাবি দিতে রাজি হবেন না।”
অগত্যা রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আবারো ক্যাসেলের দিকে হাঁটা শুরু করলাম, আমি ক্যাতারজিনা ও কাজিমেয়ারেজ। অন্যরা যার যার মতো চলে গলেন। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ পানি খাওয়া হয়নি। ওয়াটার পিল ও হাই প্রেসারের ওষুধ নিয়মিত খেলে পানি খাওয়াটা বিশেষ জরুরি। অথচ বার-এ কেনার মতো পানি পাওয়া গেল না। কাজিমেয়ারেজ বললেন, “ওই তো রাস্তার ওধারে একটা দোকান!”
আমরা তাঁর নির্দেশিত দোকানে ঢুকে পানি কিনলাম। এবং খুচরা পয়সা হাতে নিয়ে বেশ অবাক হলাম যে আমি তো ১০০ করোনা দিয়েছি, আমাকে কেন শুধু খুচরা পয়সা দেয়া হলো! দোকানি বললেন, “এই তো পঞ্চাশ টাকার কয়েন।” মার ঢেলা, পঞ্চাশ টাকারও কয়েন আছে! সম্ভবত এই দেশই পৃথিবীতে একমাত্র যারা পঞ্চাশ টাকার কয়েন রাখে। আর এক টাকা, দুই টাকা, পাঁচ টাকা, দশ টাকার কয়েন তো আছেই। উপর্যুপরি কয়েনগুলো বেজায় ভারি আর মোটা।
দোকান থেকে বেরিয়ে আমরা পাহাড়ের ঢালু দিয়ে উপরে না উঠে দোকানের সামনের রাস্তা দিয়ে পুবের দিকে এগিয়ে গেলাম। গল্পে গল্পে অনেকটা পথ পেরিয়ে গেলেও ক্যাসেলে ঢোকার কোনো রাস্তা পাওয়া গেল না। ক্যাতারজিনা বললেন, “সম্ভবত ওটাই যে ব্রিজটা দেখছি ওটাই ক্যাসেলে ঢোকার পথ।” কিন্তু না, কাছাকাছি গিয়ে দেখা গেল পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নোংরা খালের উপর যে ব্রিজ তা পরিত্যক্ত। অগত্যা আবার ফিরে আসতে হলো যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানেই। কারণ ওটাই ছিল ক্যাসেলে যাবার সহজ রাস্তা। কাজিমেয়ারেজ বললেন, “সবই হাসানআলের দোষ। পানি কিনতে না চাইলে আমরা ওদিক দিয়ে হাঁটতাম না।”
ক্যাতারজিনা বললেন, “হাসানআল হাঁটতে পছন্দ করেন। তাছাড়া কিছুক্ষণ আগেই বলেছিলেন যে আজ তেমন হাঁটা হলো না। সেক্ষেত্রে ভালোই হয়েছে।”
ক্যাসেলে ফিরেও আমাদের হাতে আড়াই ঘণ্টার মতো সময়। আমি মূূল হল রুমের থেকে তিনরুম পরে একটি দরজা ঠেলতেই খুলে গেল। কিন্তু ভেতরে কাউকে দেখলাম না। অতএব সেখানে একটি চেয়ার টেনে একা একা আরামে বসলাম। আর পাশেই ফোন চার্জ দেবার ব্যবস্থা করলাম। এই সময়ে বেশ গরম লাগছিল। এক পর্যায়ে শার্টের নিচে পরা টি-শার্ট খুলে ফেললাম। আবার স্যুট-টাই পরে নিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। এই রুমে বিশাল একটি আয়নাই আমাকে টাই পরতে সাহায্য করলো।
তবে এভাবে রেস্ট নিলেও শারীরিক অসুস্থতার কথা চিন্তা করছিলাম। আজকাল একনাগাড়ে অনেকক্ষণ বাইরে কাটাতে পারি না। একটু রেস্টের প্রয়োজন পড়ে। তাছাড়া ভেরার বাড়িতে বাথরুমের দুরাবস্থায় সকালে গোসলটা পর্যন্ত করা হয়নি। সারা শরীর ভীষণ গরম হয়ে আছে। ব্যাগ থেকে টায়লানল বের করে খেয়ে নিলাম নিজেকে সামলানোর জন্যে। এবং জুতা মোজা খুলে সামনে আরেকটা চেয়ার টেনে এনে পা তুলে দিয়ে বসলাম। তিন চার মিনিটের একটি ঘুমও হয়ে গেল। ইতোমধ্যে দেখি আমার দরজা ঢেলে কাজিমেয়ারেজ ঢুকছেন। আমি তাঁকে হাত ইশারায় ভেতরে আসতে আহ্বান করলে তিনি আবার দরজা বন্ধ করে আমাকে কিছু না বলেই চলে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি ক্যাতারজিনাকে সাথে নিয়ে আবারো ঘরে ঢুকলেন। ক্যাতারজিনা বললেন, “তোমার কাছে পঞ্চাশ টাকার একটি কয়েন আছে না?”
আমি বলি, “আছে তো, কিন্তু সেটা ওভারকোটের পকেটে। বাইরে হ্যাঙারে ঝোলানো আছে তুমি যা লাগে নিয়ে নাও।”
আমার কথা শুনে দুইজনই একসাথে বেরিয়ে গেলেন। যাবার সময় কাজিমেয়ারেজ পোলিশ ভাষায় কী যেন একটা বলে হেসে কুটিকুটি।
ক্যাতারজিনা অনুবাদ করে দিলেন, “তুমি মোজা খুলে বসেছো বলেই আমরা টের পেয়েছি যে তুমি এই রুমে আছো”
কাজিমেয়ারেজের রসিকতা বড়ো অদ্ভুত! উপস্থিত ক্ষেত্রে এমন জোকস বানিয়ে ফেলেন যে তার তুলনা হয় না!
কিছুক্ষণের ভেতর আমি বেরিয়ে আসি। হলরুমে ঢুকে দেখি লোকে লোকারণ্য। পিছনে বইয়ের টেবিলে বসে চুটিয়ে বিক্রি করছেন ভেরা ও দাড়িওয়ালা এক ভদ্রলোক। পরে জানতে পারি তিনিই পিটার, গত রাতে আমাদের দোতলার ঘরে যার থাকার কথা ছিল। দেরিতে এসেছেন। আমি পিছনের দিকে একটি চেয়ারে আমার ব্যাগ রাখি। মনে হলো সামনে কোনো সিট আজ আর পাওয়া যাবে না। কিছুক্ষণের ভেতরেই ম্যারাথন কবিতাপাঠ শুরু হবে। পোলিশ, চেক ও অন্যান্য দেশের কবি মিলে প্রায় ৪০/৫০ জন কবিতা পড়বেন।
এরই মধ্যে আমাদের বন্ধু মানেকা বানাস, যিনি অত্যন্ত ভালো ফটোগ্রাফার, আমার বইয়েও তাঁর তোলা একাধিক ছবি ব্যবহার করেছি, এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, “হ্যালো, হাসানআল, মাই ফ্রেন্ড হাউ আর ইউ!”
আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে আমি বলি, “আই এম ওকে! হাউ আর ইউ! হোয়েন ডিড ইউ কাম?” মনিকা জানালেন যে ক্যাম্পনো থেকে তারা বেশ কয়েকবন্ধু কিছুক্ষণ আগে একসাথে এসে পৌঁছেছেন। আমি উৎসব এন্থোলজিতে তাঁদের নাম দেখে ভেবেছি যে তারা আসবেন। তিনি আমার স্ত্রী আসবেন কি না জিজ্ঞেস করলে আমি বললাম যে তিনি পোলানিৎসা কবিতা উৎসবে আমার সাথে যোগ দেবেন। আমি মানেকাকে অনুসরণ করে পাশের রুমে গিয়ে দেখি ইভা, রেনেটা, রোমা, ইউসেফ সবাই কাজিমেয়ারেজ ও ক্যাতারজিনার সাথে গল্প করছেন। এরা সবাই-ই ভ্রসলোভ রাইটার্স ইউনিয়নের সদস্য। প্রতিবছর এঁদের সাথে কত কত আড্ডা হয়। বন্ধুত্বের বন্ধনে গত বছর এরা সবাই মিলে আমাকে ক্যাম্পনো নিয়ে গিয়েছিলেন। বিশেষত ইউসেফ ছিলেন সেই আয়োজনের মূল কর্তা। ওখানে গিয়ে বুঝতে পারি কত বড়ো ধনি লোক ইউসেফ। বিশাল মার্কেটপ্লেসের প্রায় এক চতুর্থাংশই তাঁর।
যাহোক, সবার সাথে আলিঙ্গন, করমর্দন, সৌহার্দ্য বিনিময় শেষ আমিও তাদের আড্ডায় শামিল হয়ে গেলাম। দানুসিয়া এসে বললেন, “তুমি কি চা নিয়েছো?”
আমি বলি, “কোথায় চা?”
তিনি রুমের পিছন দিকে সারি সারি কেতলি দেখিয়ে বললেন, “তিন প্রকার চা আছে। আমি কাগজে লিখে দিয়েছি যে একটি ফলের, একটি ব্ল্যাক ও একটি গ্রিন!”
তিনি আমাকে সাহায্য করলেন চা কাপে ঢালতে। আমি বললাম, “আপাতত ব্ল্যাক দিয়েই শুরু করি!” ভেরার বাসায় সকালে নাস্তা ও কালকের খাবার তিনিই তদারকি করছিলেন। ফলে আমার চা প্রীতির কথা তিনি জানেন।
টেবিলে টেবিলে দেখলাম অনেক প্রকার স্যান্ডউইচ সাজানো। দুপুরে আমরা খেতে গেলে ভেরা নাকি এইগুলো এখানে সাজিয়ে রেখেছেন অন্যান্য গেস্টেদের জন্যে। সেখানে কিছু বিস্কুটও ছিল। আমি চায়ের সাথে বি¯ু‹ট নিলাম। ক্যাতারজিনা জানালেন, “আদতে এই উৎসব ভেরা কোপেচকার ব্রেন চাইল্ড। যে অনুদান তিনি পান তা দিয়ে হল ভাড়া আর এন্থোলাজি প্রকাশের বেশি কিছু করা সম্ভব নয়। বাকি খরচ তিনি নিজের পকেট থেকে করেন।”
আমি বললাম, “ভেরাকে সহযোগিতা করার জন্যে আমি এন্থোলজির বেশ কয়েকটা কপি কিনে নেব।”
নানারকম গল্প ও হাসি তামাসায় সময় কেটে যাচ্ছিলো। এরই মাঝে অচেনা দুই একজন এসে আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে যাচ্ছেন। কেউ বলছেন পোলানিৎজা কবিতা উৎসবে দেখা হয়েছে, কেউ বলছেন ভ্রসলোভ শহরের কালচারাল সেন্টারে আমার কবিতা শুনতে এসেছিলেন। এরই মধ্যে দেখতে পেলাম এক কোণে বসে আছেন হেলিনা স্যালামোন। সাথে একটি তরুণী। হেলিনা ভ্রসলোভ ইউনিয়নের পুরোনো সদস্য। সম্ভবত সবচেয়ে’ পুরোনো। বয়সের ভারে বেঁকে গেছেন। তাছাড়া তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তবুও প্রতিবছর কবিতা উৎসবে আসেন। ভেরার দশ কবিকে নিয়ে বিশেষ অ্যান্থোলজিতে তাঁর কবিতাও আছে। আমি এগিয়ে গিয়ে তার কুশল জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, “তুমি কবে এসেছো? পোলানিৎসা উৎসবে থাকবে তো?”
আমি বললাম, “আমি সপ্তাহখানেক আগে চিহানোভ কবিতা উৎসব উপলক্ষ্যে এসেছি, একেবারে আপনাদের কবিতা উৎসব সেরে ফিরে যাব।” তিনি খুশি হলেন। দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের এই একটা ব্যাপার আমি লক্ষ্য করেছি, তাঁরা গলার স্বর দিয়ে মানুষ চিনতে পারেন। পোজন্যান রাইটারস ইউনিয়নের বর্তমান প্রেসিডেন্ট কবি ও কণ্ঠশিল্পী ক্রিস্টফার গ্যালাসও ঠিক আমার গলার স্বর শুনে আমাকে চিনে ফেলেন। এ এক অদ্ভুত ক্ষমতা। ক্যাতারজিনা বলেন যে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা স্পর্শ, স্বর, এক সেন্ট দিয়ে মানুষ চিনে ফেলেন এমনকি তাঁরা কারো মুখে হাত বুলিয়ে অবয়বের ছবি পর্যন্ত কল্পনা করে নিতে পারেন।
ঠিক পাঁচটায় পোলিশ শিল্পী বারবারা পাচুরার গান দিয়ে ম্যারাথন কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান শুরু হলো। যথারীতি অনুষ্ঠান উপস্থাপন করলেন কবি ভেরা কোপেচকা। এবার অবশ্য নামের শেষ অংশের আদ্যাক্ষর দিয়ে যেভাবে উৎসব ম্যাগাজিন সাজানো হয়েছে সেভাবেই কবিতাপাঠের আমন্ত্রণ জানানো হলো। এবং আমার ডাক পড়লো শুরুতেই। যেহেতু উৎসব ম্যাগাজিনে আমার ‘হাত ধরে রেখেছে সময়’ ছাপানো হয়েছে, আমাক সেই কবিতাটিই পড়তে হলো। কবিতাটি বড়ো বিধায় আমি প্রথম দুটি স্তবক পড়ে কাতারজিনাকে মাইক দিলাম। আমি অডিয়েন্সকে জানিয়েও দিলাম যে সময়ের স্বল্পতার কারণে আমি এই দীর্ঘ কবিতাটি সম্পূর্ণ পড়ব না। তবে, ক্যাতারজিনা নিজের অনুবাদে পোলিশ ভাষায় অসাধারণ উচ্চারণে কবিতাটি পড়লেন। আগত কবিদের অধিকাংশই পোলিশ, তবে চেক যারা ছিলেন তারাও পোলিশ বোঝেন বলেই জানা গেল। যেমন বাংলা ও উড়িয়া ভাষা; ওড়িশার অধিকাংশ মানুষই বাংলা বোঝেন।
একে একে ৪০/৫০ জন কবি কবিতা পড়লেন। মাঝে ভেরার নাতনি গান শোনালেন। সব মিলে অনুষ্ঠান শেষ হতে প্রায় নয়টা বেজে গেল। এই মুহূর্তে আমাদের ডাক পড়লো পাশের একটি ভেন্যুতে কবিতার উপরে ওয়ার্কশপের। এমনিতে সকালে গোসল করে বের হইনি। আর সারাদিন এই অনুষ্ঠান স্থলে থেকে শরীরের অবস্থাও ভালো নয়। উপর্যুপরি আমার ঘাড়ের দুই দিকের রগ ব্যথা করতে লাগলো। আমি ক্যাতারজিনাকে বললাম, “আমার পক্ষে ওয়ার্কশপে যাওয়া সম্ভব নয়। আমাকে এখনই বাসায় পাঠিয়ে রেস্ট নেয়ার ব্যবস্থা না করতে পারলে কিছুক্ষণের ভেতরেই হাসপাতালে নিতে হবে।” আমার ঘাড়ের দুই দিকের রগ ব্যথা করার কথা খুলে বললাম। তিনি অবস্থার গুরুত্ব বুঝে ভেরাকে বললেন, “হাসানআল আর আমাকে এখনই বাসায় যেতে হবে। তাঁর শরীরের অবস্থা ভালো নয়।”
ভেরা রাজি হয়ে বাসার চাবি দিলেন এবং আমাদের সাথে দানুসিয়াকে পাঠালেন বাড়ির অ্যালার্ম সিস্টেমের কোড দিয়ে। ওদিকে পড়িমরি করে ক্যাতারজিনা উদ্ভান্তের মতো গাড়ি চালিয়ে আমাকে বাড়িতে নিয়ে আসলেন। আমি দোতলায় গিয়ে জামা কাপড় স্যুটটাই খুলে ঘরের কাপড় করে নিলাম। ক্যাতারজিনা বললেন যে তিনি দানুসিয়াকে নামিয়ে দিয়ে যত তাড়াতাড়ি পারেন ফিরে আসবেন। আমি যেন পুরোপুরি রেস্টে থাকি।
দানুসিয়া আর ক্যাতারজিনা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলে, পাহাড়ের উপরে বিশাল এই বাড়িতে আমি একা। কিন্তু একা বা অনেক সেকথা মনে আসার আগে যেটা ভাবলাম তাহলো সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে নিতে শাওয়ারের নিচে দাঁড়ানো। নিজের পাউস থেকে সাবান বের করে নিচের বাথরুমে চলে এলাম। এবং অবাক হলাম এই দেখে যে কলে গরম পানি আছে। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে দেখলাম বড়ো একটি গিজার বসানো। অতএব শাওয়ার ছেড়ে তার নিচে দাঁড়িয়ে গেলাম। দ্রুত সবকিছু হবে কারণ, ক্যাতারজিনা ফিরে এলে আমাকেই দরজা খুলে দিতে হবে।
গোসল সেরে কাপড় পরতে না পরতেই ক্যাতারজিনা ফিরে এলেন। হাতে খাবারের প্যাকেট। তিনি বললেন, “ওদের বলেছি দুইজনের খাবার দিতে।” এই ভদ্রমহিলার কর্তব্যপরায়ণতার প্রশংসা না করে উপায় নেই। তিনি খাবার টেবিলের দুইপাশে দুটি প্লেট রেখে চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, “এখনই খেয়ে নাও। খাবার গরম আছে।”
রুটি আর রেড মিট। আমি বলি, “আমি তো রেড মিট খাই না।”
তিনি বললেন, “এই মুহূর্তে এ ছাড়া আর উপায় নেই। গরম গরম খেয়ে নাও। ভালো লাগবে।”
অগত্যা তাঁর কথাই শুনতে হলো। আমি বললাম, “ঠিক আছে দু’টুকরো রুটির সাথে আমাকে সামান্য মাংস দাও।”
খেতে খেতে বললেন, “তোমার ডান চোখের নিচে রক্ত দেখা যাচ্ছে।”
আমি বলি, “কী বলছো তুমি!”
তিনি বললেন, “আয়নার সামনে গেলেই বুঝতে পারবে। অনেকের নাক দিয়ে রক্ত আসে। তোমার যে পরিস্থিতি ছিল তাতে হার্ট অ্যাটাক হতে পারতো। এই সামান্য রক্ত আসাতে সেটা থেকে বেঁচে গেছো।” ক্যাতারজিনা নিজে ভেষজ ডাক্তার, তাঁর জানাশোনা অনেক বেশি। তবে আমার দুই চোখ যে আগুনের মতো জ্বলছে তাতো আমি বুঝতে পারি।
খাওয়া সেরেই ক্যাতারজিনা শাওয়ারে ঢুকলেন। আমাকে বলে গেলেন। চুপচাপ বসে থাকো আমি শাওয়ার থেকে বেরিয়েই চা করে দেবো। খুব অল্প সময়ের ভেতরে তিনি গোসল সেরে পরিপাটি হয়ে চা নিয়ে এলেন। একতলার এই ডাইনিং রুমের একদিকে কয়েকটি সোফা, এবং তারই পাশে বিশাল খাট। আমরা সোফায় বসে গল্প করতে করতে চা খেতে থাকলাম। মূলত আমাদের গল্পে আজকের কবিতা উৎসবে নানা দিক উঠে এলো। বিদেশি কবিদের জন্যে দুপুরে বিশ্রামের কতটা দরকার তার উপরেই আমরা জোর দিলাম। আমি আদতে মাথা তুলে রাখতে পারছিলাম না। ঘুমানোটা বিশেষ জরুরি ছিল। ঘড়িতে এখন রাত দশটা ছুঁই ছুঁই। বিদায় নিয়ে আমি দোতলায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
কিছুক্ষণের ভেতর বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে গেলে। আমার রুমমেটদের উপস্থিতি টের পেলাম। আমি যেহেতু লিভিংরুমে এবং অন্যদের আমার রুম দিয়েই আসা যাওয়া করতে হয়, ফলে তাঁদের পায়ের আওয়াজ পাওয়া আমার জন্যে অমূলক নয়। আমার মনে হলো ফোনের লাইট জ্বালিয়ে বাথরুমের দিকে গেলেন সারগেই। আমি অস্ফূটে জিজ্ঞেস করলাম, “কখন এলেন?” তিনি উত্তর না দিয়ে বললেন, “জিনদবরে।”
আবার কিছুক্ষণের মধ্যে দ্রুত নিজের রুমে চলে গেলেন। আমি ফোনটা টেনে নিয়ে দেখি মাত্র এগারোটা বাজে। তার মানে ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়েছি। লাইট জ্বালিয়ে নিচে এসে দেখি নারীরা ঘুমানোর ব্যবস্থা করছেন। ক্যতারজিনার হাতে আরেক কাপ চা। দানুসিয়া কিচেনে গোঁজগাজ করছেন। আর ভেরা নিজের রুমে, মনে হচ্ছে ফোনে কারো সাথে কথা বলছেন। ক্যাতারজিনা বললেন, “উঠে এলে কেনো? এখন কেমন লাগছে?”
আমি বললাম, “চোখ জ্বালা করছে। আমার তো রুমমেট আছে। না উঠে উপায় কী!” আমি ডাইনিং টেবিলে বসলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আরেক কাপ চা করে দেবো।”
আমি বললাম, “না, এখন আর চা খাবো না। জানতে এসেছি সকালে নাস্তার জন্যে কয়টায় নেমে আসবো।”
দানুসিয়া ভেরা থেকে জেনে নিয়ে বললেন, “কাল নাস্তার সময় সাড়ে আটটা।”
আমি আর কথা না বাড়িয়ে দু’জনকেই গুড নাইট বলে বেরিয়ে এলাম।
ফিরে এসে বিছানায় গেলেও ঘুম আর আসতে চাইলো না। রাতে বেশ কয়েকবার বাথরুমে গেলাম। সামান্য ছাড়া ছাড়া ঘুম যা হলো তাকে খুব একটা আশাব্যঞ্জক বলা চলে না। সকাল পাঁচটার পরে আর বিছানায় থাকতে পারলাম না। বেসিনে হাতমুখ ধুয়ে শেভ করে সাড়ে পাঁচটার দিয়ে নিচের বাথরুমে ঢুকে গোসল করে এলাম। গতকালের ধকল আর সারারাত ভালো ঘুম না হওয়ার সমস্যাগুলো পানিতে ধুয়ে ফেলতে চাইলাম।
গোসলের পরে এতটাই ঠান্ডা লাগতে থাকলো যে আমি সবগুলো গরম কাপড় গায়ে জড়িয়ে নিলাম। পায়ের উপর লেপ টেনে দিয়ে বিছানায় বসে টি- টেবিলের উপর ল্যাপটপ রেখে লিখতে বসে গেলাম। সাড়ে ছয়টা বাজলে ক্যাতারজিনাকে মেসেজ পাঠিয়ে বললাম, “তুমি জাগলে আমাকে বলো, আমি চা নিতে আসবো।”
মনে হলো তিনি ইতোমধ্যেই জেগেছেন। সাথে সাথে উত্তর দিলেন, “চলে আসো।”
আমি কোনো শব্দ না করে ঘরে ঢুকে দেখি ডাইনিং রুমের একপাশে পাতা খাটে দুই নারী কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছেন। ক্যাতারজিনা মুখে আঙুল দিয়ে ইশারায় বললেন শব্দ না করতে। তিনি ইতোমধ্যে নিজের জন্যে কফি বানিয়ে নিয়েছেন। আমাকে লিপটন চা করে দিলেন। বললেন, “লেবু দেব?” আমি না করলাম না। তিনি পাশে রাখা অর্ধকাটা একটি লেবু থেকে চিলতে করে দু’টুকরো কেটে আমার চায়ে চিপড়িয়ে রস দিতে গেলে বললাম, “ভেতরে ছেড়ে দাও।”
আমাকে চা দিয়ে তিনি ইশারায় বললেন, “আমার ঘরে চলে আসো।” আমি তাঁর ঘরে গিয়ে সোফায় বসলাম। তিনি বসলেন খাটে। বললেন, “এই বিব্রত অবস্থায় এই বাসায় আর একমুহূর্তও নয়। আমি সব কিছু প্যাক করে ফেলেছি। তুমিও প্যাক করে নাও। আমরা একবারে বেরিয়ে যাবো। অনুষ্ঠান শেষে বাসার পথে গাড়ি চালাবো।”
আমি বললাম, “আইডিয়াটা মন্দ নয়। কিন্তু অনুষ্ঠান ফেলে চলে যাবো?”
তিনি বললেন, “না, না আমরা তো অনুষ্ঠান শেষেই যাবো। আজ বিকেলের অনুষ্ঠান হবে বর্ডারের ওপারের একটি লাইব্রেরিতে। সেখান থেকে ফিরে এসে রাতের খাবার খেয়ে সবাই সকালে যে যার চলে যাবে। কিন্তু ভেবে দেখো আমরা যেহেতু ইতোমধ্যে পোল্যান্ডেই যাচ্ছি, সেখান থেকে ফিরে আসার কারণ দেখছি না।” ক্যাতারজিনা একটু ভেবে বললেন, “আর এখানে তো একটি ভ্যালিড রিজন রয়েছেই, তোমার শরীরটা ভালো না।...এই বাসায় আমি আর এক মুহূর্তও থাকতে চাই না।”
আমি রাজি হয়ে তড়িঘড়ি নিজের রুমে ফিরে এলাম ব্যাগ গুঁছিয়ে নেবার জন্যে।
আজ নাস্তার টেবিলে চারটার জায়গায় সাতটা চেয়ার দেখে বুঝতে পারলাম যে এই বাড়িতে কালরাতে আরো লোক এসেছে। কিছুক্ষণের ভেতরেই টিয়েডোজিয়াকে দেখা গেল। তিনি এসে সৌহার্দ্য বিনিময় করলেন। তিনি কবি ও আমার ফেসবুক বন্ধু। পোলিশ রাইটার্স ইউনিয়নের এক শাখার প্রেসিডেন্ট। তিনি গাড়ি নিয়ে এসেছেন। তার মানে কাল রাতে আমরা চলে এলে ভেরাকে সাহায্য করেছেন টিয়েডোজিয়া। এর পরে এলেন ভেরার নাতনী, কাল যিনি গান গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেছিলেন। আমি বললাম, “অভিনন্দন, তোমার গান আমাদের সবার ভালো লেগেছে। কবিতাও। চর্চাটা চালিয়ে যাবে কিন্তু!” কত আর বয়স হবে এই মেয়েটির, হয়ত ১৬/১৭। হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে খেতে বসে গেল।
এর মধ্যে আসলেন পিটার। বুঝলাম, কাল রাতে আমার আরেকজন রুমমেট ছিলেন। পিটারও নিজের গাড়ি নিয়ে এসেছেন। এবং আজই সকালের অনুষ্ঠানের পর চলে যাবেন বলে জানালেন। নাস্তার টেবিলে সারগেই যখন এলেন তখন আমার খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু তার দিকে তাকিয়ে আমার ভেতর থেকে বমি ঢেলে এলো। দুই চোখ ভরা কেতর! আজকের দিনে, তাও একজন কবি, এসেছেন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবে, তাছাড়া তাঁর মুখ থেকেই শুনেছি যে তিনি চল্লিশ বছরের উপরে অধ্যাপনা করেছেন। এইভাবে তিনি খাবার টেবিলে এলেন আমি ভাবতে পারছি না। আমি তাঁর দিকে না তাকানোর চেষ্টা করলাম। এবং কিছুক্ষণ বাদে আস্তে করে উঠে চলে গেলাম। অন্যরা সারগেইর এই অবস্থা অবলোকন করেছিলেন কিনা জানি না। তবে আমরা যখন বাইরে, লাগেজ গাড়িতে উঠাচ্ছিলাম, সারগেই সেখানে গিয়ে দাঁড়ালে আমি ক্যাতারজিনাকে একপাশে ডেকে নিয়ে বললাম যে তুমি একটু অনুগ্রহ করে ভদ্রলোককে বলো চোখ পরিষ্কার করে আসতে। ক্যাতারজিনা বললেন, “আমিও লক্ষ্য করেছি, ডিসগাসটিং!”
কিছুক্ষণের মধ্যে ক্যাতারজিনা সারগেইকে এ কথা বললে কী আশ্চর্য, দুই হাতের আঙুল দিয়ে পিশাচের মতো তিনি দুই চোখ পরিষ্কার করে নিলেন। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এই লোকের কাছাকাছি আর আসা যাবে না, এমনকি বিদায় বেলাও তাঁর সাথে করমর্দন করবো না। অবশ্য আমি আমার সিদ্ধান্তে অবিচলই ছিলাম শেষ পর্যন্ত। পরে এক সময় ক্যাতারজিনা বললেন যে ইউক্রেনের লোকগুলো এমনই খাতরনাক।
গতকাল শুধু আমাদের গাড়ি পার্কিংয়ে থাকলেও, আজ বাসার সামনে এই ঢালুতে তিনটি গাড়ি পার্ক করা। এর মধ্যে টিয়েডোজিয়ার গাড়িটি সবচেয়ে’ বড়ো, এসইউভি টাইপের। কিন্তু তিনি এমনভাবে পার্ক করেছেন যে তার গাড়ি রাস্তায় না নামলে অন্য কেউ গাড়ি বের করতে পারবেন না। ক্যাতারজিনা ও পিটার অপেক্ষা করতে থাকলেন, আমরা সবাই অপেক্ষা করতে থাকলাম। ভেরা তখনও বেরিয়ে আসেননি। একপর্যায়ে টিয়েডোজিয়া এলেন এবং তাঁর গাড়িটি ব্যাক করে রাস্তায় ওঠানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু পাহাড়ের ঢালু বেয়ে অনেকটা পথ ব্যাক করতে হবে। যারা গাড়ি ব্যাকআপ করতে পারেন না, তাদের জন্যে কাজটি যে কত কঠিন সেটা টিয়েডোজিয়ার অবস্থা দেখেই বুঝতে পারলাম। একপর্যায়ে আমি বললাম, “তুমি নামো, আমি তোমার গাড়ি ব্যাকআপ করে দিচ্ছি।”
কিন্তু আমিও কিছু করতে পারলাম না, কারণ স্টিকশিপ্ট গাড়ির গিয়ার চেঞ্জ করার কায়দা আমি জানি না। তখন বুদ্ধি করে বললাম, “এক কাজ করো, তুমি ড্রাইভিং সিটে বসো, আমি প্যাসেঞ্জার সিটে বসে স্টিয়ারিং হুইল ঠিক রেখে গাড়ি ব্যাকআপ করে দিচ্ছি, তুমি শুধু গিয়ার চেঞ্জ করবে।” অতএব তাই হলো, এই বিশাল ঢালু পথটা পাড়ি দিয়ে গাড়ি আমি রাস্তায় বের করে দিলাম।
গাড়ি থেকে নেমে এসে টিয়েডোজিয়ে আনন্দে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি বললাম, “আস্তে আস্তে ব্যাকআপ করাটা শিখে নিও। খুবই দরকারি।”
আজকের অনুষ্ঠান স্থল খুব বেশি দূরে নয়। ভেরার বাড়ি থেকে বেরিয়ে ক্রিনিৎসা ভিলেজের রাস্তা ধরে দক্ষিণ দিকে কিছুটা এগিয়ে হাতের ডান পাশে একটি দোতলা মনোরম বাড়ি। নাম: অভেদ ক্রিনিৎসা। স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তাদের দফতর। তবে দোতলায় থাকার ব্যবস্থা ও একতলায় ডাইনিং আছে। এই বাড়ির দোতলায় কনফারেন্স রুমে আমরা পৌঁছানোর আগে থেকেই গোলটেবিল সেমিনার চলছিল কবিতার প্রেজেন্টেশন নিয়ে। একটি কবিতাকে কিভাবে দর্শক-শ্রোতার সামনে মনোগ্রাহী করে তোলা যায়। সবাই-ই কথা বলছিলেন পোলিশ বা চেক ভাষায়। আমার বোঝার কোনো সাধ্য ছিল না। ক্যাতারজিনাও কিছুই অনুবাদ করে দিলেন না, বললেন, “তোমার জন্যে এটা দরকারি নয়।” এই কনফারেন্স রুমের সাথে লাগোয়া একটি কিচেনও দেখা গেল। মানেকা সেখান থেকে আমাকে চমৎকার করে এক পেয়ালা চা এনে দিলেন। কিছুক্ষণ বাদে আমি অনেকটা অমনোযোগী হয়ে গেলে কিচেনে ঢুকে দেখি ওখানে মানেকা, ক্যাতারজিনা, ও ইভা তিনজনে ফেনো গান ছেড়ে নাচতে শুরু করেছেন। আমি সুযোগ পেয়ে সেই নাচের একটা ভিডিয়ো করে নিলাম। বললাম, “কিচেন ড্যান্স হিসেবে ইউটিউবে ছেড়ে দেব।”
কিছুক্ষণের মধ্যে সেমিনারে বিরতি দেওয়া হলো। বিরতির পর ক্যাতারজিনা আমাকে জানিয়ে গেলেন যে এবার নতুন বই নিয়ে অনুষ্ঠান। এ বছর যাদের নতুন বই বেরিয়েছে তারা নিজের নিজের বইয়ের পরিচিতি তুলে ধরবেন। আলোচনার শুরুতে বেশ কয়েকজন স্থানীয় লেখক তাদের বই উপস্থাপন করলেন। কিছু কিছু ক্যাতারজিনা আমাকে অনুবাদ করে শোনালেন। এরপরে আমার ডাক পড়লে আমি ক্যাতারজিনাকে নিয়ে পোডিয়ামে হাজির হলাম। সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বললাম, “এবছর আদতে আমার চারখানা বই প্রকাশ পেয়েছে, ভারত, বাংলাদেশ, মেক্সিকো ও পোল্যান্ড থেকে। তবে পোল্যান্ড থেকে যে ইংরেজি পোলিশ বাইলিংঙ্গুয়াল বইটি বেরিয়েছে আজ আমি সেটা নিয়েই আলাপ করবো। অনুবাদ করেছেন আপনাদের পরিচিত ক্যাতারজিনা জর্জিও। ইতঃপূর্বে ইংরেজিতে প্রকাশিত আমার চারটি বই থেকে কবিতাগুলো বাছাই করেছি আমি। এখানে একটা কথা না বললেন নয় যে আমি এক ধরনের সনেট লিখি যা অন্যান্য সনেট থেকে স্বতন্ত্র, সেই সব সনেটের কয়েকটি এই বইয়ে স্থান পেয়েছে।”
ক্যাতারজিনা আমার সবগুলো কথাই পোলিশভাষায় অনুবাদ করে দিলেন। এবং আমার সনেটের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করলেন।”
আমি আরো বললাম, “এই বইয়ে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার মুভমেন্ট নিয়ে একটি দীর্ঘ কবিতা আছে। যা লেখার পরে আমি আমার নিউইয়র্কের প্রকাশকের বিরাগভাজন হই, যিনি এখন আর আমার বই প্রকাশ করেন না, যদিও অন্য প্রকাশক থেকে এখন আমার বই প্রকাশ পায়।”
আমরা দু’জন মিলে বইয়ের প্রথম কবিতাটি পড়ে শোনালাম। কবিতাটির শেষ লাইন, “আই ওয়েট ফর এ বেটার লাইফ।’
আসনে ফিরে আসার সময় পাশ থেকে টিয়েডোজিয়া বললেন, “আমিও তোমার মতোই একটি বেটার লাইফের অপেক্ষা করছি।”
সকালের অনুষ্ঠান আর দুপুরের খাওয়া একই জায়গায় হলো। খাওয়ার আগে সবাই মিলে এই মিলনায়তনের সামনে ছবি তুললেন।
লাঞ্চে দেওয়া হলো স্যুপ আর মুরগির মাংস। সাথে আলু ভর্তা। চেক আলু ভর্তা আর বাংলাদেশের আলু ভর্তার মধ্যে পার্থক্য এই যে এরা কাঁচা মরিচ দেয় না, আমরা দেই। তাছাড়া, সবাই মিলে লাইন ধরে খাবার সংগ্রহ করার দৃশ্যটি ছিল বেশ দেখার মতো। তবে আমাকে ও কাজিমেয়ারেজ বুরনাতকে লাইন ধরতে হলো না। ইভা আমাদের দুইজনকে খাবার এনে দিলেন। ওদিকে টেবিলে সবাই শুরু করলেও ক্যাতারজিনার সামনে খাবার আসেনি। তাছাড়া তিনি টেবিলের শেষে যেমনি করে বসেছেন তাঁকে কেউ একজন এনে না দিলে তিনি উঠে গিয়ে খাবার আনতে পারবে না। সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে ক্যাতারজিনা বললেন, “এঁরা সবাই আমার ভালো বন্ধু, ভিড় কমলেই কেউ একজন আমার খাবার এনে দেবে।” এই ছোট্ট টোটকাটিতে কাজ হলো। দু’মিনিট পরেই রোমানা ওপাশ থেকে উঠে গিয়ে ক্যাতারজিনার খাবার এনে দিলেন।
লাঞ্চের পরে ক্যাতারজিনা জিজ্ঞেস করলেন, “আমি হাঁটতে বেরুবো, তুমি কি যাবে?”
আমি বললাম, “অবশ্যই।” আমাদের সাথে বুরনাতও ভিড়ে গেলেন। বিরাশি বছরের এই বৃদ্ধ, ক্যানসারের সাথে নিয়মিত লড়াই করেও কবিতা উৎসব, কবিতা প্রকাশ, কবিতার জন্যে প্রাণ উৎসর্গ করে চলেছেন। আর রসিকতা তো সব সময় লেগে আছে। তিনি আর রসিকতা সমার্থক শব্দ বললে ভুল হবে না। আমরা দক্ষিণের রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে, রসিকতা করতে করতে কনকনে শীতে নানা স্থাপনা দেখতে লাগলাম। স্থাপনা আর তেমন কিছু নয়, বলা যায় চেক রিপাবলিকের গ্রাম্য সৌন্দর্য। ভেড়ার খোঁয়াড়, গরুর গোয়াল, মুরগি পোলট্রি কত কি! অন্যদিকে খোলা মাঠ; দেখা গেল সেখানেও বেশ কয়েকজন হাঁটতে বেরিয়েছেন। শেষ অনুষ্ঠান নভারুদা লাইব্রেরিতে, সেটি বর্ডার পার হয়ে পোল্যান্ডের ভেতর। এখান থেকে বাস ছাড়বে তিনটায়। আমরা বাসের সাথে সাথে গাড়ি হাঁকাবো।
হাঁটা শেষে ফিরে আসতে আসতে বাস ছাড়ার সময় হয়ে গেল। পার্কিংলটে ঢুকতেই দেখলাম ভেরা ও তাঁর নাতনী অন্যদিক থেকে এসে একই পথে মিলনায়তনে ঢুকছেন। আমি ভেরাকে এই ফাঁকে বিদায় জানালাম। বললাম, “আমার কবিতা অনুবাদ করে আলাদা এন্থোলজিতে যুক্ত করা এবং আমাকে দাওয়াত করে তোমার দেশ দেখতে সুযোগ করে দেবার জন্যে ধন্যবাদ।”
তিনি বললেন, “নোভারুদা লাইব্রেরিতে তো তোমার সাথে দেখা হচ্ছেই।”
আমি বললাম, “তখন তুমি অনেক ব্যস্ত থাকবে, তাই আগেভাগে বিদায়টা সেরে নিলাম।”
তিনি মিলনায়তনে ঢুকে গেলে আমরা গাড়িতে উঠলাম। ক্যাতারজিনা বললেন, “আমাদের আর সময় নষ্ট না করাই ভালো। এখানকার একটা সুপারমার্কেট থেকে মায়ের জন্যে কিছু বিয়ার কিনো নেব। চেক বিয়ার বেশ ভালো।”
আমাদের ভাঙিয়ে নেয়া করোনার তেমন কিছুই খরচ হয়নি। শুধু সকালে ভেরার থেকে পাঁচখানা এন্থোলজি কেনা বাবদ ২৫০ করোনার জায়গায় আমি দুই হাজার করোনার একটা নোট দিয়েছি। তিনি তো টাকাটা কিছুতেই নেবেন না। আমি বললাম, “দেখুন আপনি নিজে থেকে এত খরচ করছেন, আর আমার এই সামান্য অনুদান! আপনাকে রাখতেই হবে।” এই বলে হাতে গুঁজে দিয়েছি। তখন তিনি আর না করতে পারেননি।
বেশ কিছুটা এগিয়ে একটি লরির পিছে পড়লাম। আমি ক্যাতারজিনাকে বললাম যে এই লরি সম্ভবত মার্কেটপ্লেসের দিকেই যাচ্ছে অতএব এটার পিছেই থাকা ভালো হবে। পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাবারও সুযোগ ছিল না। ফলে তিনিও সুবোধ মেয়ের মতো লরিকে অনুসরণ করে গেলেন। এবং একটি সুপারমার্কেট পেয়েও গেলাম। দশ-বারোটা বিয়ারের বোতল, চার-পাঁচটা টেঞ্জারিন, দুই প্যাকেট কাঠ-বাদাম, আর এক প্যাকেট কফি কিনে দেখা গেল আমাদের কাছে তখনও দশ-পনেরো করোনা রয়ে গেছে। সেটাকে আমরা স্যুভেনির হিসেবে রেখে দেবার চিন্তা করে গাড়িতে উঠলাম। কিন্তু আমাদের ওয়াইফাই কাজ করছে না। তথাপি জানি হাইওয়ে তিনশ-তিন থেকে তিনশ-দুইয়ে উঠতে হবে এবং বর্ডার কোনো মতে পার হতে পারলে ওয়াইফাই পেয়ে যাবো। তাই হলো। আমরা আধাঘণ্টার মধ্যে নবারুদা লাইব্রেরিতে পৌঁছে গেলাম।
বুঝতে পারলাম এই লাইব্রেরিতে যদিও আমাদের আনা হয়েছে, তথাপি এদের এই অনুষ্ঠানটি একটি আলাদা কবিতা উৎসব, ইতঃপূর্বে কবিতার কম্পিটিশন করা হয়েছে, সেখানে প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় হয়েছেন যারা তাদের পুরস্কৃত করার পাশাপাশি কবিতা পড়তে ডাকা হলো। এমনকি অডিয়েন্স থেকে যদি কেউ কবিতা পড়তে চায় অনুষ্ঠানের শেষে সে সুযোগও দেওয়া হলো। প্রথমেই একজন উদীয়মান কবির প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। এটি আদতে তাদের ৩২তম কবিতা উৎসব।
ওই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে কেউ কেউ বিরক্ত হয়ে খাবার রুমে গিয়ে সময় কাটিয়েছেন। আমিও একপর্যায়ে উঠে চা খেতে গেলে লাইব্রেরির ডিরেক্টরকে পেয়ে যাই। এবং কথায় কথায় বলি যে শেক্সপিয়ার বলেছিলেন, “ব্রিভিটি ইস দা সোল অব উইট।”
তিনি আমার কথা যে মনে রেখেছিলেন তা বোঝা গেল অনুষ্ঠান সমাপ্তির বক্তৃতায়, যা তিনি একটি মাত্র বাক্যে শেষ করেছিলেন। বিদায় বেলায় সে জন্যে তাঁকে ধন্যবাদ জানালাম। এবং দু’দিন পরে দেখলাম ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠিয়েছেন।
নবারুদার এই অনুষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক রূপ দেবার জন্যে চেক কবিতা উৎসবকে দাওয়াত দেয়া হয়েছে। চেক কবিদেরও ম্যারাথন কবিতা পাঠ শুরু হলো আমার কবিতা দিয়েই। আমি অবশ্য দুই একটি কথা না বলে পারলাম না। বারবার পোল্যান্ডে আসা এবং শব্দগুচ্ছ পত্রিকায় পোলিশ কবিদের প্রাধান্য ইত্যাদি নিয়ে কথা বলে আমি “খাবো” কবিতাটি পড়লাম। যথারীতি অন্যান্য জায়গার মতো উপস্থিত দর্শক-শ্রোতা আমার সাথে গলা মিলালেন। এখানেও ক্যাতারজিনা, কাজিমেয়ারেজ বুরনাত, দানুসিয়া সিসলাকোভা, সারগেই সেলকোভি, টিয়েডোজিয়া সুভডেরেস্কা, মানেকা বানাস প্রমুখ কবিতা পড়লেন। গান করলেন বারবারা পাচুরা। অনুষ্ঠান শেষে সবাইকে দ্রুত বিদায় বলে বাড়ির পথ ধরলাম। বাড়ি মানে ক্যাতারজিনার বাড়ি। তাও ওখান থেকে প্রায় পৌনে তিনশ কিলোমিটার। ফিরতে বেশ রাত হবে জেনেও আমরা গল্প করতে করতে গাড়ি ছোটালাম। প্রথমে এত বড়ো বাগান পড়লো যে মনে হলো, পৃথিবীর কোনো এক অজানা মেরুতে এসে পড়েছি। ক্যাতারজিনাও তাই বললেন; কিন্তু তিনি আশ্বস্ত করলেন যে ফোন অ্যাপ ফলো করেই তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন। এক সময় মনে হলো ওই জঙ্গলের পাহাড় থেকে নিচে নামছি। প্রায় ঘণ্টাখানেক এইভাবে গাড়ি চালানোর পর লোকালয় পাওয়া গেল। ক্যাতারজিনা বললেন, “আবার আর অ্যাপের প্রয়োজন নেই। এখান থেকে বাসা পর্যন্ত রাস্তা আমার চেনা।”
আমরা এক সময় হাইওয়ে ছেড়ে গ্রামের ঘুটঘুটে অন্ধকার রাস্তা ধরলাম। হঠাৎ জীবনানন্দের কবিতা মনে পড়ে গেল। “থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।” গলা ছেড়ে গভীর রাতে গাড়ির ভেতরে বসে পুরো কবিতাটি বাংলায় আবৃত্তি করে ফেললাম। ক্যাতারজিনাকে পরে কিছুটা ভাবানুবাদ করে শোনালে তিনি বললেন, “অসাধারণ।” বাসায় পৌঁছে দেখি ক্যাতারজিনার মা আমাদের জন্যে কেক বানিয়ে রেখেছেন। আমরা পথে খেয়ে নিয়েছি সে কথা শোনার পরেও চা বানিয়ে খাবার টেবিলে সেই কেক পরম যত্ন করে আমাকে খাওয়ালেন। আমি বলি যে আমার সুগারের প্রবলেম আছে, কিন্তু কে শোনে কার কথা। বললাম, “আমার মাও এমন করেন। নিজ হাতে পিঠা বানিয়ে কীভাবে ছেলেকে খাওয়ানো যায় সেই অপেক্ষায় বসে থাকেন।
আদতে পৃথিবীর সব মা একই রকম। সন্তানের জন্যে তাঁর ভালোবাসা তুলনাহীন!