ধারাবাহিক উপন্যাস।। পর্ব—২

অপ্রিয় হওয়ার সাহসিকতা ।। ইচিরো কিশিমি এবং ফুমিটাকি কোগা

প্রথম রাত

ট্রমাকে ভুলে যাও

যুবক দার্শনিকের পড়ার ঘরে প্রবেশ করল এবং কাঁধ সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে একটি চেয়ারে বসল। কেন সে দার্শনিকের তত্ত্বকে বাতিল করে দিতে এত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ? কারণ খুবই পরিষ্কার। তাঁর মধ্যে আত্মবিশ্বাসের প্রবল ঘাটতি রয়েছে। ছেলেবেলা থেকেই এর সঙ্গে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে তীব্র হীনম্মন্যতাবোধ, ব্যক্তিগত ও শিক্ষাগত অর্জনের খামতি এবং হতশ্রী চেহারা। এজন্যই হয়ত তাঁর প্রতি মানুষের মনোযোগ লক্ষ্য করলে সে-বিষয়ে তাঁর অতিরিক্ত তৎপরতা দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। প্রধানত, অন্য কারও সুখের সত্যিকার প্রশংসা করার অসামর্থ্য তাঁকে সারাক্ষণ কুঁড়ে খায়। এজন্য দার্শনিকের দাবি তাঁর নিকট উদ্ভট কল্পনার চেয়ে বেশি কিছু নয়।

অজ্ঞাত ‘তৃতীয় স্তম্ভ’

যুবক: কিছুক্ষণ আগে আপনি ‘অন্য দর্শন’শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন; অথচ আমার জ্ঞানমতে আপনি গ্রিক দর্শনের একজন বিশেষজ্ঞ।

দার্শনিক: তুমি ঠিকই জান। কৈশোর থেকেই গ্রিক দর্শন আমার ধ্যান-জ্ঞান। মহাজ্ঞানী সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টোটল আমার সবসময়ের নায়ক। বর্তমানে প্লেটোর একটি কাজ অনুবাদের চেষ্টা করছি এবং জীবনের অবশিষ্টাংশ ধ্রুপদী গ্রিক চিন্তা অধ্যয়ন করে পার করতে চাই।

যুবক: তাহলে এই ‘অন্য দর্শন’বলতে আপনি কী বোঝাতে চান?

দার্শনিক: এটি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের মনোবিজ্ঞান। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে অস্ট্রিয়ান মনোবিজ্ঞানী আলফ্রেড অ্যাডলার মনোবিজ্ঞানের এই ধারার পত্তন করেন। এদেশে সাধারণভাবে তা ‘অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞান’হিসেবে পরিচিত।

যুবক: হাহ্! গ্রিক দর্শনের একজন বিশেষজ্ঞ মনোবিজ্ঞানে আগ্রহী হবেন- আমি তা কল্পনাও করতে পারছি না।

দার্শনিক: মনোবিজ্ঞানের অন্য ধারাগুলো সম্পর্কে আমার ভালো ধারণা নেই। তবে, আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞানের মূলভাব গ্রিক দর্শনের সমান্তরাল এবং গবেষণার জন্য একটি চমৎকার ক্ষেত্র।

যুবক: ফ্রয়েড এবং জুং-এর মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে আমার সামান্য ধারণা আছে; অধ্যয়নের জন্য একটি আকর্ষণীয় বিষয়।

দার্শনিক: ফ্রয়েড এবং জুং দুজনেই খ্যাতিমান এবং এদেশেও সুপরিচিত। ফ্রয়েডের নেতৃত্বাধীন ‘ভিয়েনা সাইকোএনালাইটিক সোসাইটি’র মূল দলের একজন সদস্য ছিলেন অ্যাডলার। তাঁর মতবাদসমূহ ছিল ফ্রয়েডের মতবাদের বিপরীতধর্মী। এক পর্যায়ে তিনি ফ্রয়েডের দল থেকে আলাদা হয়ে গিয়ে নিজস্ব তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ‘স্বতন্ত্র মনোবিজ্ঞান’(individual psychology) নামক মনোবিজ্ঞানের একটি নিজস্ব ধারা প্রবর্তন করেন।

যুবক: স্বতন্ত্র মনোবিজ্ঞান? আরও একটি অদ্ভুত শব্দ। যা হোক, অ্যাডলার তাহলে ফ্রয়েডের শিষ্য ছিলেন?

দার্শনিক: না, তা নয়। এই ভুল ধারণা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। মনে রেখ, অ্যাডলার ও ফ্রয়েড কাছাকাছি বয়সের ছিলেন এবং গবেষক হিসেবে তাঁদের মধ্যকার সম্পর্ক সমান ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। এদিক থেকে অ্যাডলার ছিলেন জুং থেকে সম্পূর্ণ আলাদা; কারণ জুং-এর নিকট ফ্রয়েড ছিলেন পিতৃস্থানীয়। যদিও মনোবিজ্ঞানের বিষয়ে কথা বলতে গেলেই ফ্রয়েড ও জুং-এর নাম চলে আসে; তবুও অ্যাডলারের নামটি তাঁদের দুজনের সঙ্গে সারা দুনিয়া জুড়ে মনোবিজ্ঞানের তৃতীয় স্তম্ভ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

যুবক: তাই নাকি? এ বিষয়ে আমার আরও পড়ালেখা করা উচিত ছিল।

দার্শনিক: অ্যাডলারের নাম না জানা খুবই স্বাভাবিক। তিনি নিজেই একদা বলেছেন, ‘এমন এক সময় আসবে যখন মানুষ আমার নাম স্মরণ করবে না, এমনকি তাঁরা হয়ত ভুলে যাবে যে, আমার মতাদর্শ বলে কিছু ছিল’। তিনি এও বলেছেন যে, তাঁর মতবাদ কারও মনে রাখা-না রাখায় কিছু যায়-আসে না। কারণ তাঁর মতবাদ ভুলে যাওয়ার অন্য রকম অর্থ রয়েছে। অর্থাৎ তাঁর ধারণাগুলো পাণ্ডিত্যের একটি মাত্র বিশেষায়িত ক্ষেত্রের সীমা ছাড়িয়ে অন্যত্র বিস্তৃত হয়েছে; হয়ে উঠেছে সর্বজনীন। সর্বোপরি তা সকলের মাঝে ভাগাভাগি করে নেওয়া একটি অনুভূতিতে পরিণত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আন্তর্জাতিক পাঠক নন্দিত পুস্তক ‘How to Win Friends and Influence People’ এবং ‘How to Stop Worrying and Start Living’-এর লেখক ডেল কার্নেগি অ্যাডলারকে ‘মানব ও তাঁর সুপ্ত সামর্থ্য’কে উদ্‌ঘাটনের গবেষণায় নিবেদিত মহান মনোবিজ্ঞানী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর সকল রচনায় অ্যাডলারের মতবাদের প্রভাব সুস্পষ্ট। এমনকি স্টিফেন কোভি’র ‘The 7 Habits of Highly Effective People’ বইয়ের বিষয়বস্তুর বড়ো অংশের সঙ্গে অ্যাডলারের মতবাদের নিবিড় সাদৃশ্য রয়েছে। অন্যভাবে বলতে গেলে, অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞানকে পাণ্ডিত্যের একটি সংকীর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা না করে বরং একটি উপলব্ধি এবং সত্য ও মানবিক বোধগম্যতার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ধরে নেওয়া হয় যে, অ্যাডলারের ধারণাগুলি তাঁর সময়ের থেকে শতবর্ষ এগিয়ে ছিল, এবং আজও আমরা সেগুলো পরিপূর্ণরূপে বুঝতে সক্ষম হইনি। সত্যিকার অর্থেই এগুলো যুগান্তকারী মতবাদ।

যুবক: তাহলে আপনার তত্ত্বগুলো গ্রিক দর্শন থেকে উৎসারিত নয় বরং অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞানের ভাবধারা থেকে এসেছে?

দার্শনিক: হ্যাঁ, ঠিক বলেছ।

যুবক: ঠিক আছে; আপনার বেসিক অবস্থান সম্পর্কে আর কোনো প্রশ্ন করতে চাই না। এবার তাহলে বলুন আপনি কি একজন দার্শনিক নাকি মনোবিজ্ঞানী?

দার্শনিক: সোজাসুজি বলতে গেলে আমি একজন দার্শনিক, দর্শনই আমার ধ্যান-জ্ঞান, দর্শনেই বাঁচি। তবে, অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞান এমন এক ধরনের মতবাদ যার সঙ্গে গ্রিক দর্শনের একান্ত মিল রয়েছে; সে হিসেবে এটি দর্শনও।

যুবক: ঠিক আছে; তাহলে শুরু করা যাক...।

মানুষ কেন পরিবর্তন হতে পারে?

যুবক: শুরুতেই আলোচ্য বিষয়গুলো ঠিক করে নেই। আপনি বলেন মানুষ পরিবর্তন হতে পারে। এই তত্ত্বকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে বলেন সকলেই সুখী হতে পারে বা সুখ খুঁজে নিতে পারে।

দার্শনিক: হ্যাঁ, সকলেই…কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই।

যুবক: সুখী হওয়ার বিষয়টি পরে আলোচনা করা যাবে; শুরুতেই পরিবর্তনের ওপর আলোকপাত করা যাক। পরিবর্তিত হতে পারা সকলেরই প্রত্যাশা। আমি নিশ্চিতভাবে জানি আমার পরিবর্তন সম্ভব এবং রাস্তায় যে-কাউকে থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলে সেও বিষয়টিতে সম্মত হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সকলেই কেন মনে করবে যে তাঁদের পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন? এর একটিই মাত্র উত্তর… কারণ তাঁরা পরিবর্তিত হতে পারে না। পরিবর্তন হওয়া যদি সহজ হতো তাহলে তাঁরা পরিবর্তন হওয়ার প্রচেষ্টায় অযথা সময় নষ্ট করত না। তাঁদের এই আকাঙ্ক্ষা যতই তীব্র হোক না কেন, তাঁরা পরিবর্তন হতে পারে না। এজন্যই নতুন ধর্ম, সন্দেহজনক আত্ম-উন্নয়নমূলক সেমিনার এবং কীভাবে পরিবর্তন হওয়া যায় সে-সম্পর্কিত প্রচারের মাধ্যমে সর্বদা এত লোককে আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টা চালানো হয়। আমার ধারণা কি ভুল?

দার্শনিক: আচ্ছা...! তাহলে প্রশ্ন আসে - ‘মানুষ পরিবর্তন হতে পারে না’- এ ব্যাপারে তোমার এই নাছোড়বান্দা অবস্থানের কারণ কী?

যুবক: বলছি শুনুন। আমার এক বন্ধু গত কয়েক বছর যাবৎ নিজেকে একটি কক্ষে আবদ্ধ করে রেখেছে- বলতে পারেন স্বেচ্ছায় নির্জনবাস গ্রহণ করেছে। বাইরে যাওয়া এবং সম্ভব হলে একটি চাকরি করাও তাঁর প্রত্যাশা। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সে তাঁর বিদ্যমান অবস্থার পরিবর্তন চায়। তাঁর একজন শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু হিসেবে কথাগুলো আপনাকে বলছি। আরও নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, সে খুবই আন্তরিক একজন মানুষ এবং সমাজের অনেক উপকারে আসতে পারে। তবে, কক্ষের বাইরে আসতেই তাঁর যত ভয়। এমনকি সে তাঁর কক্ষের বাইরে এক কদমও যদি বের হয়, তাহলে তাঁর হৃৎকম্পন বেড়ে যায় এবং হাত-পা কাঁপতে থাকে। আমার মনে হয় এটি এক ধরনের মানসিক ব্যাধি বা ভীতি। সে পরিবর্তন হতে চায় কিন্তু পারছে না।

দার্শনিক: তাঁর এই কক্ষের বাইরে যেতে না পারার পিছনে কী কারণ থাকতে পারে বলে মনে কর?

যুবক: আমি নিশ্চিত নই। তবে, হতে পারে বাবা-মার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অথবা স্কুল কিংবা কর্মস্থলে উত্ত্যক্তের শিকার হওয়া এবং তা থেকে সৃষ্ট এক ধরনের ট্রমা তাঁকে সারাক্ষণ তাড়া করে বেড়ায়। তবে, অন্য কিছুও হতে পারে। হয়ত ছোটোবেলা থেকেই অতিরিক্ত আদর-যত্নে তাঁকে এমন ননীর পুতুল হিসেবে তৈরি করা হয়েছে যে, সে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে ভয় পায়। আসলে প্রকৃত ঘটনা আমার জানা নেই। তা ছাড়া, একজনের অতীত কিংবা পারিবারিক বিষয় নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করাও সমীচীন নয়।

দার্শনিক: তোমার ভাষ্যমতে তাঁর এই ট্রমা বা অনুরূপ ভীতির কারণ অতীতের এমন কোনো অনপনেয় স্মৃতি যার ফলে সে এখন আর বাইরে যেতে চায় না।

যুবক: অবশ্যই। প্রতিটি ঘটনার পিছনেই কোনো না কোনো কারণ থাকে। এখানে লুকোছাপার কিছু নেই।

দার্শনিক: সম্ভবত ছোটোবেলার বাড়ির পরিবেশের মধ্যেই তাঁর এমন অন্তর্মুখীতার কারণ নিহিত রয়েছে। বাবা-মা’র আদর-যত্ন ও ভালোবাসার সুখানুভূতি ব্যতীত বিচ্ছিন্নভাবে বেড়ে ওঠার ফলে এখন সে অন্যদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় এবং এমনকি বাইরে যেতেও ভয় পায়। এটা সম্ভব, তাই নয় কি?

যুবক: হ্যাঁ, সম্পূর্ণরূপে সম্ভব। সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি তাঁর জন্য খুবই ভয়াবহ বলে আমি মনে করি।

দার্শনিক: তোমার বক্তব্য অনুযায়ী প্রত্যেক ফলাফলের পিছনেই কোনো না কোনো কারণ থাকে। অন্যভাবে বলা যায়, আমার বর্তমান অবস্থা (ফলাফল) অতীতের কর্ম (কারণ) দ্বারা নির্ধারিত। আমি কি সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছি?

যুবক: হ্যাঁ, ঠিক তাই।

দার্শনিক: তোমার মতামত অনুযায়ী যদি পৃথিবীর সকলের ‘এখানে এবং এখন’ [১] (here and now) অর্থাৎ বর্তমান অবস্থান অতীতের কর্মফল বা ঘটনাপ্রবাহ দ্বারা নির্ধারিত হয়, তাহলে বিষয়টি কেমন অদ্ভুত হবে না? বাবা-মা কর্তৃক নির্যাতিত প্রত্যেককেই তোমার বন্ধুর মতো একই পরিণতি অর্থাৎ নির্জনবাস গ্রহণ করতে হবে। আর তা যদি না হয়, তাহলে তোমার সম্পূর্ণ ধারণাটিই অর্থাৎ অতীতের কর্মফল দ্বারা বর্তমান নির্ধারিত হওয়া এবং কারণ দ্বারা ফলাফল নিয়ন্ত্রিত হওয়ার বিষয়টি ঘটে পানি পায় না।

যুবক: আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?

দার্শনিক: আমরা যদি শুধু অতীতের ঘটনাপ্রবাহের ওপর মনোযোগ দিই এবং কেবল কারণ ও ফলাফলের সীমায় থেকে বিষয়গুলো ব্যাখ্যার চেষ্টা করি, তাহলে 'নির্ধারণবাদ' (determinism)[২]-এর ফাঁদে পড়ব। কারণ এই তত্ত্ব অনুযায়ী আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ইতোমধ্যেই অতীতের ঘটনাপ্রবাহ দ্বারা নির্ধারিত হয়ে আছে এবং তা অপরিবর্তনীয়। আমি কি ভুল বলেছি?

যুবক: অর্থাৎ আপনি বলছেন আমাদের বর্তমানে অতীতের কোনো ভূমিকা নেই?

দার্শনিক: হ্যাঁ, এটাই অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞানের মূল বক্তব্য।

যুবক: আচ্ছা! আমাদের দ্বন্দ্বের জায়গাটি কিছুটা পরিষ্কার হলো মনে হয়। আপনার ব্যাখ্যা অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত যা দাঁড়ায় তা হলো, আমার বন্ধুর বাইরে বের না হতে পারার পিছনে কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। কারণ, জীবনে অতীতের ঘটনাবলির কোনো গুরুত্ব নেই। আমি দুঃখিত, কিন্তু তা একেবারেই অসম্ভব। তাঁর নির্জনবাসের পিছনে অবশ্যই কোনো কারণ থাকতে হবে। তা না হলে কোনো ব্যাখ্যাও থাকবে না।

দার্শনিক: আসলেই এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞানে আমরা অতীতের কার্যকারণ নিয়ে নয় বরং বর্তমানের লক্ষ্য নিয়ে ভাবি।

যুবক: বর্তমানের লক্ষ্য?

দার্শনিক: তোমার বন্ধু নিরাপত্তার অভাব বোধ করে, তাই বাইরে বের হতে পারে না। একটু অন্যভাবে চিন্তা করি। সে আসলে বাইরে যেতে চায় না, তাই স্বেচ্ছায় একটি উদ্‌বেগজনক অবস্থা তৈরি করে নিয়েছে।

যুবক: হাহ্‌! কী বলছেন আপনি?

দার্শনিক: এভাবে চিন্তা কর। তোমার বন্ধু আগেভাগেই বাইরে না যাওয়ার লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছে এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে এক ধরনের উদ্বেগ ও ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করে নিয়েছে। অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞানে এটাকে বলে ‘টেলিওলজি’।

যুবক: আপনি নিশ্চয়ই মজা করছেন! আমার বন্ধু একটি কল্পিত উদ্বেগ ও ভীতির অবস্থা সৃষ্টি করে নিয়েছে? এরপরে আপনি কি আরও বলবেন যে, সে অসুস্থ হওয়ার ভান করছে?

দার্শনিক: হ্যাঁ। সে অসুস্থ হওয়ার ভান করছে। তোমার বন্ধু যে উদ্বেগ ও ভীতি অনুভব করছে তা বাস্তব। মাঝে মধ্যে সে মাইগ্রেন এবং প্রচণ্ড পেটে ব্যথায় ভুগতে পারে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, এগুলো তাঁর বাইরে বের না হওয়ার যে-লক্ষ্য তা অর্জনের উদ্দেশ্যে উদ্ভাবিত অজুহাত মাত্র।

যুবক: এটা মোটেও সত্য নয়। না, তা কোনোভাবেই হতে পারে না। এটা খুবই হতাশাজনক।

দার্শনিক: না। এটাই হলো ‘ঈটিওলজি’ (aetiology-অর্থাৎ কার্যকারণবাদ) এবং ‘টেলিওলজি’ (teleology-অর্থাৎ কোনো কর্মের কারণ নয় বরং উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানা)-এর মধ্যে তফাৎ। তুমি যা বলছ তার সবকিছুই ঈটিওলজি ভিত্তিক এবং যতক্ষণ আমরা ঈটিওলজি-তে থাকব ততক্ষণ এক পাও সামনে এগোতে পারব না।

ট্রমা বলে কিছু নেই

যুবক: আপনি যদি বিষয়গুলো এমন দৃঢ়ভাবে বলেন সেক্ষেত্রে আমি এর প্রতিটির পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা চাই। শুরুতেই বলুন ‘ঈটিওলজি’ ও ‘টেলিওলজি’র মধ্যে পার্থক্য কী?

দার্শনিক: ধরো প্রচণ্ড সর্দি ও জ্বর নিয়ে তুমি ডাক্তারের নিকট গেলে। অসুস্থতার কারণ সম্পর্কে জানাতে গিয়ে ডাক্তার বললেন, গতকাল বাইরে যাওয়ার সময় তুমি যথাযথ পোশাক পরিধান করনি এবং সেজন্য ঠান্ডা লেগেছে। তুমি কি তাতে সন্তুষ্ট হবে?

যুবক: অবশ্যই না। যথাযথ পোশাক পরিধান না করা, বৃষ্টি হওয়া কিংবা অন্য কোনো কারণ, সে-যাই হোক না কেন, তা আমার নিকট কোনো ব্যাপার নয়। এগুলো কেবল কারণ। সত্য হলো আমি উচ্চ মাত্রার জ্বরে ভুগছি এবং তা-ই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যদি ডাক্তার হন তবে, আশা করব তিনি আমার চিকিৎসার জন্য ঔষধ, ইনজেকশন বা প্রয়োজন মতো অন্য যে-কোনো বিশেষজ্ঞ উপায় বাতলে দিবেন।

দার্শনিক: তবুও ঈটিওলজি মতাদর্শে বিশ্বাসী অধিকাংশ পরামর্শদাতা ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞগণ যুক্তি দেখাবেন যে অতীতের অমুক-তমুক ঘটনা থেকে তোমার এই বর্তমান অসুস্থতা। তা ছাড়া, এই অসুস্থতার পিছনে তোমার কোনো ভূমিকা নেই বলেও তাঁরা সান্ত্বনার বাণী শোনাবেন। অর্থাৎ তথাকথিত ট্রমার পক্ষে অবস্থান মূলত ঈটিওলজি মতাদর্শে বিশ্বাসীদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য।

যুবক: এক মিনিট! আপনি কি ট্রমার অস্তিত্ব সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করছেন?

দার্শনিক: হ্যাঁ…অবশ্যই। দৃঢ়তার সঙ্গে।

যুবক: কী! আপনি, অথবা আমার বলা উচিত অ্যাডলার, মনোবিজ্ঞানের একজন দিকপাল নন কি?

দার্শনিক: অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞানে ট্রমাকে সুস্পষ্টভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। আর এই অস্বীকার করার বিষয়টি ছিল একেবারেই নতুন ও বৈপ্লবিক ধারণা। ট্রমা সম্পর্কে মহান ফ্রয়েডের মন্তব্য খুবই গুরুত্ববহ। তাঁর মতে কারও বর্তমান সময়ে অসুখী হওয়ার পিছনে তাঁর অতীতের মানসিক ক্ষতই (ট্রমা) দায়ী। মানুষের জীবন একটি বিশাল আখ্যান, রোমাঞ্চকর গল্প। সেখানে কখনও কখনও সহজে বোধগম্য কার্যকারণ এবং নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে থাকে। সে-অনুভূতি অত্যন্ত প্রখর হয় এবং মনের গভীরে দাগ কেটে যায়। কিন্তু অ্যাডলার এই ট্রমা মতবাদের বিপক্ষে গিয়ে বলেন যে, ‘কোনো অতীত অভিজ্ঞতাই এককভাবে আমাদের সাফল্য বা ব্যর্থতার কারণ হতে পারে না। আমরা আমাদের অতীতের বদ-কর্মফল তথা ট্রমার কারণে ভুগি না বরং সেখান থেকে আমাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করি। অর্থাৎ ‘বর্তমান আমি’ কোনোমতেই আমার অতীতের কর্মফল নই বরং জীবনে আমি প্রতিনিয়ত যে অর্থ (meaning) যোগ করি তা স্ব-নির্ধারণী, তা-ই আমাতে বিকশিত হয় এবং তা-ই প্রকৃত আমি’।

যুবক: তাহলে বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে, আমাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় যা-কিছু সেগুলোর সমাহারই প্রকৃত আমরা?

দার্শনিক: একদম ঠিক। অ্যাডলারের বক্তব্যের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবনের চেষ্টা কর - তাঁর মতে ‘আজকের আমি (self) আমার অতীত কর্ম দ্বারা নির্ধারিত নই বরং সেটাকে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করি তার উপর নির্ভর করে’। তিনি বলছেন না যে, অতীতের ভয়ংকর দুর্ঘটনা, ছোটোবেলার নির্মম অভিজ্ঞতা অথবা এমন অন্য কোনো দুঃসহ স্মৃতি মানুষের ব্যক্তিত্বের গঠনে কোনো ভূমিকা রাখে না। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেই প্রভাব দ্বারা কোনো কিছুই নির্ধারিত হয় না। তবে, সেই অতীত অভিজ্ঞতাগুলোকে আমরা কীভাবে কাজে লাগাই বা গ্রহণ করি তার দ্বারাই জীবনের গতিপথ নির্ধারিত হয়। মনে রাখবে, তোমার জীবন অন্য কারও দান নয়, বরং তা তোমার পছন্দ-অপছন্দ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, নির্ধারিত এবং তুমি কীভাবে বাঁচবে সে সিদ্ধান্ত কেবল তুমিই গ্রহণ করতে পার।

যুবক: ঠিক আছে…তাহলে আপনি বলতে চাচ্ছেন, আমার বন্ধু নির্জনবাস গ্রহণ করেছে কারণ সে সেভাবেই বাঁচতে চায়। এটা অবিশ্বাস্য! বিশ্বাস করুন… এটা সে কখনই চায় না। যদি তাঁর নির্জনবাসের কোনো কারণ থাকে তাহলো পরিস্থিতি। পরিস্থিতির চাপে অনন্যোপায় হয়ে সে তাঁর বর্তমান জীবনযাত্রা বেছে নিয়েছে।

দার্শনিক: না। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই তোমার বন্ধু আসলেই মনে করে যে, পিতামাতার নির্দয় আচরণ বা পারিবারিক পরিবেশ-পরিস্থিতির জন্য এই সমাজে সে খাপ খাওয়াতে পারছে না, তারপরও নির্জনবাস বেছে নেওয়া তাঁরই লক্ষ্য।

যুবক: এটি কী ধরনের লক্ষ্য?

দার্শনিক: একেবারে প্রথমেই যেটা আসে তা হলো ‘বাইরে না যাওয়া’। সে এই উদ্বেগ ও ভীতির আবহ সৃষ্টি করে কেবল ঘরের ভিতরে থাকার অজুহাত হিসেবে।

যুবক: কিন্তু সে বাইরে যেতে চায় না কেন? সেখানেই তো আসল সমস্যা।

দার্শনিক: আচ্ছা! বিষয়টি বাবা-মায়ের দৃষ্টিতে দেখলে কেমন হয়! তোমার সন্তান যদি বাইরে বের হতে না চায় তাহলে তোমার কেমন লাগবে?

যুবক: নিশ্চয়ই আমি উদ্‌বিগ্ন হবো। তাঁকে সামাজিকতা শিখাতে চাইব; চাইব সে সুস্থ থাকুক, এবং তাঁকে ভুলভাবে লালন-পালন করছি কি-না তাও ভেবে দেখব। নিঃসন্দেহে বলতে পারি আমি খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ব এবং তাঁকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সম্ভাব্য সবকিছুই করব।

দার্শনিক: আসলে এখানেই সমস্যা।

যুবক: কোথায়?

দার্শনিক: এটি খুবই স্বাভাবিক, আমি যদি বাইরে না গিয়ে সারাক্ষণ ঘরের মধ্যেই আবদ্ধ থাকি, আমার বাবা-মা চিন্তিত হয়ে পড়বেন। বাবা-মায়ের সকল মনোযোগ তখন আমার দিকে থাকবে। আমাকে অবুঝ শিশুর মতো অতিশয় যত্ন-আত্তি করতে তাঁরা সারাক্ষণ ব্যতিব্যস্ত থাকবেন। অপরদিকে, আমি যদি এক পাও ঘরের বাইরে বের করি তাহলে অবয়বহীন আমজনতার অংশ হয়ে পড়ব এবং আমার দিকে কারও বিন্দুমাত্র খেয়াল থাকবে না। অপরিচিত মানুষের ঢলে হারিয়ে যাব এবং আমার পরিণতি হবে গড়-পড়তা বা তার চেয়েও নিচু স্তরের একজনে। আমি কারও মনোযোগের কেন্দ্রে থাকব না; কেউ আমার প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখবে না।... তাই এ ধরনের গৃহবন্দি মানুষের উপস্থিতি অস্বাভাবিক নয়।

যুবক: আপনার ব্যাখ্যা অনুযায়ী সেক্ষেত্রে আমার বন্ধু তাঁর লক্ষ্য অর্জনে সমর্থ হয়েছে এবং সে তাঁর বর্তমান অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট?

দার্শনিক: এখানে আমি আসলে কিছুটা বিভ্রান্ত। আমার মনে হয় সে সন্তুষ্ট এবং একই সঙ্গে অসুখীও বটে। তবে, সে তাঁর লক্ষ্য অর্জনে সকল প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিষয়টি কেবল তোমার বন্ধুর ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রম কিছু নয়। আমরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো লক্ষ্য নিয়েই বেঁচে থাকি। এটিই টেলিওলজি।

যুবক: অসম্ভব! এটা হতেই পারে না। আমি এই ধারণাকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বাতিল করছি। দেখুন, আমার বন্ধু...

দার্শনিক: শোন, আমরা যদি কেবল তোমার বন্ধুকে নিয়েই আলোচনা করতে থাকি তাহলে কোনো উপসংহারে পৌঁছাতে পারব না। এটি অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে বিচারকার্য সম্পাদনের মতো হতাশাজনক হবে। অন্য একটি উদাহরণ নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে...।

যুবক: আচ্ছা, এটি কেমন হয়? আমার নিজের ঘটনা, মাত্র গতকালই এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি।

দার্শনিক: তাই? শুনছি, বলে যাও....আমার সকল মনোযোগ তোমার প্রতি।

টীকা:

[১] ‘এখানে এবং এখন’ (here and now) বলতে অতীতের অভিজ্ঞতার প্রভাব বা ভবিষ্যতের ফলাফলের ভয় থেকে মুক্ত হয়ে বর্তমান মুহূর্তে বেঁচে থাকার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, অতীতের ক্ষত (ট্রমা) এবং বাইরের কোনো আকাঙ্ক্ষা নয় বরং আমাদের বর্তমান সময়ের পছন্দ-অপছন্দ এবং কর্মগুলোই আমাদের জীবনকে সাজিয়ে তোলে। এই ধারণাটি আবার ‘টেলিওলজি’ ধারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত। টেলিওলজি তত্ত্ব অনুযায়ী অতীতের কর্মফলের পরিবর্তে ভবিষ্যতের প্রত্যাশা আমাদের বর্তমান আচরণকে পরিচালিত করে।

[২] ‘নির্ধারণবাদ’ (determinism) তত্ত্ব অনুযায়ী বর্তমানে যা কিছুই সংঘটিত হয় তার সবকিছুই অতীতের ধারাবাহিক কার্যকারণ ও ফলাফল দ্বারা নির্ধারিত; যা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির আদি শর্ত অর্থাৎ ‘বিশ্বজগতের সকল কিছুই পূর্ব নির্ধারিত’-এর অনুরূপ ভাব বহন করে।

আরো পড়ুন:
ধারাবাহিক উপন্যাস।। পর্ব—১