কুয়ো ও কবি

nonameগাছতলায় পাঁচ জন কবি দাঁড়িয়েছিলেন। প্রত্যেকেই হয়ত মাঝারি মানের কবিতা লেখেন, কিন্তু প্রত্যেকেই ভাবছিলেন নিজেকে ভবিষ্যতের কোনো মহৎ কবি। আমার মনে হয়, তারুণ্যের উন্মাদনা বলে তাদের ভাবনার এই দিকটা ক্ষমা করা যায়। অদ্ভুত ব্যাপার কি জানেন, তাদের প্রত্যেকেরই একটি করে মাথা রয়েছে, কিন্তু মাথার চুল আঁচড়ানোর ধরন পাঁচ জনেরটা পাঁচ রকমের। তার মানে কী, এরা প্রত্যেকেই কবিতা লিখলেও মাথার চুল আঁচড়ানোর মতো করে পাঁচ ধরনের কবিতা লিখবেন? যদি তাই-ই হয় এরা পাঁচ জন পাঁচ ধরনের ভঙ্গি কবিতাতে দান করার চেষ্টা করছেন, তবে এরা খারাপ লিখলেও আমি আশাবাদী।
আমার অবশ্য এক সময় কিশোর বয়সে ইচ্ছে ছিল, আইনস্টাইনের মতো চুল ও মাথাওয়ালা লোক হয়ে বৃষ্টিতে ভেজার। তখন খুব কল্পনা করতাম- বৃষ্টির মধ্যে শহরের কোনো নির্জন রাস্তায় আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ দাশ ও আমি হেঁটে বেড়াচ্ছি। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আমি যখনি এ দৃশ্য ভাবতাম তখনি বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়ে যেত। আজও শুরু হবে মনে হচ্ছে, গাছতলা থেকে পাঁচ কবি সরে যাচ্ছে আরও নিরাপদ আশ্রয়ে। আমার কাছে মনে হয়, এই ৫ জনই একে-অপরকে অনুকরণ করবে। কিন্তু ওই লোকটা কে? পাঠক আসুন আমরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি লোকটা কে?

***
লোকটার হাতে সাইনবোর্ড। তাতে লেখা, ‘আমি একটি গাছ লাগাব, ভুল ফলের গাছ। একটি কবিতা লিখব, ভুল ছন্দের কবিতা’। লোকটাকে একজন পথচারী জিগ্যেস করে-
: কটা বাজে দাদা?
-কিশোর সূর্যের মতো এগারোটা।
: ঠিক আছে তো মাথাটা?
-দুঃখিত ভুল বললাম। বাজে তেজি সূর্যওয়ালা ১টা।
: দাদা কি কবি?
(কিছুক্ষণ নিরুত্তর তারপর হঠাৎ উত্তর)
-‘কবিমাত্রই সন্ধ্যাতারার মতো উদাসীন’ প্রচলিত মেঘেদের ধারণা। অথচ, পাখিদের স্বরে স্বরে কবিই গান অনুভূতিময় আঁকাবাঁকা জীবনের কথা। তবুও কবিই উদাসীন, হা হা হা...। তাহলে চলি।
: কোথায় যান দাদা?
-ভুল ছন্দের ফুলভর্তি বিষাদে বুড়ো জীবনের অতি গভীরে, যেখানে কুয়াশা আছে। সমুদ্রের পানির মতো নোনাা পানীয় আছে। আছে একঘেয়ে আলো, সেখানে।
: তাহলে পুনরায় কোথায় পাব আপনাকে?
-সূর্যে ঘুমানো শিশুদের বাড়ির আঙিনায়।
: কিন্তু কখন?
-যখন সূর্য উদয়ে আকাশ রাঙা হবে কিংবা সূর্যাস্তে পাখিরা নদীর লাল ছুঁয়ে
বাড়ি ফিরবে ভুল পথ, ভুল হাসি, ভুল কান্না কিংবা ভুল ছন্দ চিনতে চিনতে।
: কিসের এই ভুল ছন্দ?
-আকশের, জীবনের, তারার, প্রকৃতির, মাটির, মানুষের...
: কিন্তু কেন?
-পৃথিবীর পেটের ভেতর নিজেকে এক টোকাতেই চিনে ফেলতে।
: চেনা আসলে কী?
-চেনা মানে সব কিছুকে ডিম ভাবা। যেমন- চাঁদ একটা ডিম, সূর্য একটা ডিম- সমগ্র মহাকাশ একটা ডিম।

(কিছুক্ষণ নীরবতা)

হঠাৎ ঝমঝম শব্দে বৃষ্টি নামে, লোকটা পালিয়ে যায় নিরাপদ আশ্রয়ে। কবি মুগ্ধ হয়ে হাঁটতে লাগলেন ‘গোসল করা হয়নি’ এ কথা ভাবতে ভাবতে। কি হবে বৃষ্টিতে ভিজলে, অসুখ করবে? ওটাতো জীবনেরই অংশ, ভাবতেই প্রচণ্ড হাসি পাচ্ছিল কবির। তার সেই হাসিতে কেঁপে ওঠে গোটা পৃথিবী আর পরম তৃপ্তির সাথে তাকে ভিজিয়ে দেয় বৃষ্টির পানি।

.
এই ঘটনার তিন দিন পর আমি আবার দেখতে পাই চায়ের দোকানের সামনে গাছ তলাতে সেদিনের সেই পাঁচ কবি আড্ডা দিচ্ছে। পাঁচ জন কবিকেই বেশ উত্তেজিত মনে হচ্ছিল, দুজন বেনসন সিগারেট টানছিল আর তিনজন চা খাচ্ছিল। এই পাঁচ জনের একজন এনজিওতে চাকরি করে, দু’জন সাংবাদিক, একজন অধ্যাপক আর একজন প্রকাশনার ব্যবসা করে- ছোটকাগজ সম্পাদনা করে। পাঁচ জন কবিই দাবি করছিল, কবিতার যদি কোনো বদল ঘটে তা এ সময়ই ঘটবে। কবিরা যখন এমন কথা বলছিল, তখন দূরে দুটি চড়াই পাখি সঙ্গম করছিল। দুটি কুকুর-কুকুরিও একই কলায় লিপ্ত ছিল। চড়ুই পাখির সঙ্গমদৃশ্য কারও চোখে না পড়লেও কুকুর-কুকুরির কাণ্ড কারওই চোখ এড়ায়নি। লোকজন কুকুর-কুকুরিকে ধাওয়া করে কিন্তু কুকুর-কুকুরি আলাদা করতে পারছিল না।
এমন সময় সেই কবিকে আমি দেখতে পাই, যে সেদিন বৃষ্টিতে ভিজছিল। দেখি সে কাছেই একটি কুয়োর মধ্যে তাকিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে হেঁটে আসছে। আমি দ্রুত তার সামনে গিয়ে দাঁড়াই, তিনি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি একটি হাসি দিলেন। তারপর আমাকে কাছেই একটি কুয়ো দেখিয়ে বললেন, ওইখানে পাঁচ জন লোক পড়ে গেছে একটু দেখে আসবেন? আমি কিছুটা অবাক হয়ে দ্রুত ছুটে যাই কুয়োর দিকে। গিয়ে দেখি পাঁচটা ব্যাঙ সাঁতার কাটছে। কিন্তু কোন মানুষ দেখতে পাই না। ব্যাঙগুলো নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। পাঁচটি ব্যাঙই দাবি করছে তারা সম্পূর্ণ আকাশ দেখে ফেলেছে। তাদের দাবি আকাশটা হচ্ছে এই কুয়োর সমান। আমি ব্যাঙগুলোকে দেখে ফিরে আসি কবির কাছে। কবি মুচকি হেসে বললেন, ঠিক আছে এবার চলি। আমি কিছু বলার আগেই সে সোজা হেঁটে চলে গেল।