পাতা ঝরার ঝড়

images-2

এলাকায় সম্ভবতো কেউ মারা যায়নি। তবু মাগরেবের আগে মরা মাছের চোখের রঙা আকাশ দেখে শাহজালাল দ্রুত বাড়ি ফিরতে থাকে। একটু ঝিমুলেই শাহজালাল সেই গাছটা দেখতে পায়, অনেক বড় গাছ, দুনিয়ায় যতলোক বেঁচে আছে সবার নামে গাছের একটি পাতা আছে। গাছের একটি পাতা হলুদ হলে বুঝতে হবে পাতায় লিখা নামের মানুষটির আয়ু ফুরিয়ে এসেছে। পাতাটি ঝরে গেলে লোকটিও মরে যায়। দুনিয়ার বাঁচা লোকের সংখ্যা আর গাছের পাতা সমানে সমান। শাহজালাল কেবল গাছটিকে দেখতে পায় যদিও আসমত ফকির পাতাগুলার নাম পড়তে পারে। আসমত ফকিরের কাছ থেকে সাদা চন্দনের শিকড় পাওয়ার আনন্দ মিইয়ে যায় মরা মাছের চোখের রঙা আকাশ দেখে। এ রঙের আকাশ মানে খারাপ খবর। তাই বড় গাছটার শেকড়ের ফাঁকে বশীকরণের তাবিজ আর পশ্চিম দিক হেলানো বিচি কলার ছড়ির সবচেয়ে বড় কলা আর চাচির বোনের আচঁরানো চুললাগা চিরুনিটি লুকিয়ে রেখে দ্রুত বাড়ির দিকে হাঁটে। আগামিকাল ভোরে সুরমা গাঙ্গে ডুব দিয়া কলার ভেতর চুল আর তাবিজে ভরা সাদা চন্দনের তাজা শিকড়টি পশ্চিমমুখী হয়ে খেয়ে ফেলতে হবে। খাওয়ার পর অনেকেই দক্ষিণ দিক থেকে পরিচিত কণ্ঠ নিয়ে অনেক ডাক আসবে কিন্তু পেছনে তাকানো যাবে না, উত্তর দিকে পথে বাড়ি ফিরতে হবে। আসমত ফকির পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে পেছনে তাকালেই সবশেষ। চাচির বোনরে বশ করা সহজ কাজ না।
কিন্তু বাড়ি ফিরে উঠানে মানুষ মরার জটলা দেখে শাহজালাল চিৎকার দিতে গিয়েও থেমে যায়। তার তেরো বছরের বোনকে ঘিরে আছে সবাই। মরা মাছের রঙা আকাশ ঢাকা গাঢ় অন্ধকার বোনের ফ্যাকাশে শরীর ঢাকতে পারে না। মায়ের বিলাপে অঘটন না বুঝে সুর মেলাতে পারছে না। হারিকেনের চিমনি মুছতে গিয়ে ভাঙা কাচে কেটে ফেলা কবজির উপরের রগ দিয়ে ফিনকি দিয়ে ছোটা রক্ত থামানোও কঠিন। কাঁথা বানানোর জন্য রাখা মায়ের পুরনো শাড়ির আঁচলে বাঁধন রক্তের ধারা কমিয়েছে মাত্র। রঙ দেখার লোকের অভাব নাই। আবার অকারণ কান্দনীরও অভাব নাই। আগামিকালই বোনটি চাকরি নিতে ঢাকায় যেতো। শরীফ মামা তাকে ভাল গার্মেন্টেসে নিয়ে যাবে বলেছিল। কিন্তু এখন রক্ত থামানোর অষুধ কেউ আনতে পারছে না।
শাহজালাল জানে, রক্ত থামানোর মলম এই গ্রামে কেবল চাচার শ্বশুরবাড়িতেই থাকবে। চাচার সমুন্দী সৌদি থেকে এনেছে বলে কন্যার মাথা কোলে নিয়ে শাহজালালকে মা জানায়। চাচির বাড়ির লোকজনের কাছে অষুধ মাগতে এ-বাড়ির জামাই-আকাঙ্ক্ষী মন সংকোচ করে। তাছাড়া এই কাপড়ে চাচির বোনের সামনে পড়লে লজ্জিত তো হতেই হবে, সেই সাথে চাচাতো ভাইয়ের আকিকার রাতের কর্মের জন্য সামনে যাওয়াই কেমন। কিন্তু বোনের হাতের রক্তের পড়া কমে গেলে চাচির বাড়ির মানুষের কাছে শাহজালালের আগাম নত হওয়া থেকে বেঁচে যায়। কিন্তু চিমনির কাচের ধার কত হতে পারে যে দুইটা কাঁথা রক্তে ভিজলে পরে রক্ত বন্ধ হয়। আর খালের এ পাড়ে কারেন্টের খাম্বা বসাতে মেম্বারের দাবিকৃত টাকা বাকি থাকায় শাহজালালের বাড়ির লোকজন এখনও হারিকেন আর কুপির ভরসা করে। বোনটা যদি তার মরে, দায় নিতে হবে মেম্বারকেই।
ঘুমে শুয়ে থাকা রক্তনিঃসৃত ক্লান্ত ছোটবোনের পায়ের কাছে বসে ঢুলতে থাকে শাহজালাল। আধোঘুমের মধ্যে সে স্পষ্ট দেখতে পায় সেই গাছটার একটা পাতা নড়বড়ে হয়ে আছে। পাতাটিকে বড় আপন মনে হয়। মৃত্যুর দুয়ারে থাকা বোন নাসিমার নামের পাতা নয়তো সেটি? ঘুমের মধ্যে আৎকে উঠে শাহজালাল। আসমত ফকিরে শিখিয়ে দেয়া দুআ জপতে থাকে। সোয়া লাখ খতম করলে হলুদ হওয়া পাতাটি সবুজ হয়ে উঠবে। সকালের কড়া রোদ শাহজালালকে পাতার হলুদ সবুজ রঙ দেখতে বাধা দেয়। কিন্তু ঘুম ভেঙে নাসিমাকে এক হাতে কাপড়বাধা নিয়ে গরুর জন্য ভাতের ফেনের বালতি তুলতে দেখে নিশ্চিত হওয়া গেলো, তার কিছু হবে না।
আজকে চাচির বোনকে বশের শিকড়টি কলা দিয়ে খাওয়া হলোনা ঠিক, কাল হয়ে যাবে। চাচির বোনকে বিয়ে করতে চায় তার শরীফ মামাও, দুবাইয়ের ব্যাগভরা স্রো-পাউডার পাঠিয়ে সম্বন্ধ বিষয়ে আগাম জানান দিয়েছে। এ জায়গায় মামারেও ছাড় দেয়া যায় না। কিন্তু শাহজালাল জানে, দুর্গাপুরে মাছের আড়তের ব্যবসা পোক্ত করতে পারলে চাচির বোনকে বশ করা সহজ হবে। আরও জাল দরকার, আরও পুঁজি দরকার। ওরা আবার টাকা ছাড়া কিছু চিনে না। এই বাড়ির জামাই মানে লাখ টাকা খরচ। শাহজালাল কনুই জাল নিয়ে বিলের দিকে রওনা হয়।
বিল ভরা সাদাবক আর কানিবকের কাড়াকাড়ি। মানুষের জন্য একটা পুঁটিও রাখবে বলে মনে হয় না। মানুষইতো পাখিদের খাবার জালে তুলে আনে। তবে বকদের ভিড় মাছেদের ভিড় জানান দেয়। শাহজালাল শিখেছে তার নানার কাছ থেকে। চাচাতো ভাইয়ের আকিকার রাতে চাচির বোনের প্রসারিত বুকে মমতা ছড়িয়ে দেয়ার সাহস নিয়ে শাহজালাল কনুইজাল হাওড়ের জলে বিছিয়ে দেয়। ফিরতি হিশেবে কাদাজল থেকে যে ওম ও ঘ্রাণ পেয়েছিল তার স্বাদ নিয়ে শাহজালাল পুরো হাওড় সেচতে পারবে। কিন্তু জাল টানলে যখন শামুক, জলজ পাতা আর পাখিদের পরিত্যক্ত পালকের সাথে দু-তিনটে দুর্ভাগা পুঁটির মাথা ভেসে ওঠে শাহজালাল চাচির বোনের নাম মাথা থেকে বাদ দিয়ে জাল ফেলতে চায়। পাপ চিন্তা করায় বোধ হয় মাছেরা নাখোশ হয়েছে। এ জলাভূমির বুক যেমন মাছ মারার অধিকার তেমনি চাচির বোনের প্রতি অধিকার রয়েছে বুকে জাল ফেলা শাহজালালেরও। এতে পাপের কি আছে? এবার চিতল মাছের সাদা শরীরটা ভরা সকালের রোদে চকচক করলে শাহজালাল ভরসা পায়। এই মাছগুলোই তাকে ঘর বাঁধতে সাহায্য করবে। দূরে এই জলার মালিকের মাথার টুপি দেখা যাওয়া মাত্র শাহজালাল জাল কাঁধে তুলে বড় কচুরিপানার আড়ালে লুকিয়ে পড়ে, যেভাবে চাচির বোনকে গোসলঘাটে দেখার সময় লুকিয়ে পড়ে চাচির বাবাকে দেখে। এই দুই চুরিই রপ্ত করতে সাহস দরকার। কচুরিপানার মাঝে নাক ভাসিয়ে রেখে শাহজালাল মাছের ঝুড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকে। জলার মালিকের চোখ ঝুড়িতে না গেলেই হয়। এই বুড়া আবার চোখে একটু বেশিই দেখে। কবরে শুয়েই সে এই জলার আয়-ব্যয় হিশেব করবে। এর সাথে মিল আছে কেবল হেকমত আলীর, তার হবু শ্বশুরের। অচল বিছনায় পড়া, তবু ডাঙর কন্যার বিয়ের জন্যে সকাল বিকাল ঘটক ডাকে। আরে, কন্যা ডাঙর তো, শাহজালালই পাহারা দিচ্ছে। আড়তের ব্যবসা শুরু করলেই ঘরে তুলবে। বুড়া মিয়ার চিন্তার শেষ নাই। ঝুড়িতে মাঝবয়সী চিতল ও পুঁটিগুলো কড়া রোপে হাঁপাচ্ছে। কচুরিপানার নিচ থেকে বেরিয়ে এসে উদ্ধার করে মাছগুলোকে। কিন্তু এতো কম মাছ খাবেই কি আর বেচবেই কি? ঘরে মা-বোন নিজের জন্য আরও মাছ দরকার। বেচাতো দূরের কথা।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলে শাহজালালের ক্ষিদেও বেড়ে যায়। ঝুড়িও মাছে ভারি হয়। শোল, টাকি, টেংরা, চিতলের সাথে প্রচুর পুঁটি মারা পড়েছে। বাড়ি ফিরে দেখে, কাটাহাত নিয়েই শরীফ মামার সাথে ঢাকায় রওনা হয়েছে বোন। কালই একটা গার্মেন্টেসে ঢুকিয়ে দেবে। নাসিমা মাকে যেতে চায়নি, মা-ই তাকে পাঠিয়েছে। শাহজালালেরও একটা গোপন ইচ্ছা বোনটি রোজগারী হলে বিয়েও হবে আগে। কিন্তু মেয়েকে ভিনদেশ দিয়ে মা খালের ধারে ঘাটের উপরে বিদায়ের স্থানের দিকে তাকিয়ে ফুঁপাচ্ছে। কাটাহাত সহই মেয়েকে যেতে দিলো এজন্য নয়, মেয়ে শাক-শুটকি যাই খাক, ঘরেই খেয়েছে এতদিন। ঢাকার খাবার যে বাছবিছার করে খাওয়া পঞ্চদশী কন্যার জন্য কষ্টকর মা সেটা জানে। জোয়ান ডাঙর মেয়েটাকে জামাই বাড়ি দেয়ার বদলে গার্মেন্টেসে দিল। না দিয়ে উপায় কি? শাহজালাল তো বিলের টেংরা-পুঁটির সাথে কাড়াকাড়ি করে ঘর চালাতে পারবে। কিন্তু বোনের বিয়া দিতে পারবে না।
সারাদুপুর বিল সেচে আনা মাছগুলো মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। নাসিমা বাড়িতে থাকলে এতক্ষণে চুলায় ওঠে যেতো। কিন্তু শোকচাপা দেয়া মায়ের কাছে এই আধমরা মাছগুলো ক্ষুধা বাড়াবার বদলে অরুচি তৈরি করছে। চুলা থেকে বাসি ছাই এনে বটির সাথে ঘষে আঁশ ছড়ানোতে বিলম্ব তার পেছনে মায়ের মাছকাটতে অনীহা নয়, সংসারের বেহাল দশায় শাহজালালের অকর্মণ্যতাই দায়ী। জালাল কামপটু হলে তো মেয়েটার এ-বয়সে ঢাকা যাওয়া লাগতো না। কাজকাম নাই খালি আসমত ফকিরের পিছে ঘুরে। ওটা আরেক আকামলা।
নাসিমা চলে গেছে তাই বাড়ির বয়সী গরুটার যেমন ঠিকসময় খাওয়ানো হচ্ছে না, তেমনি ঘাট আর উঠান জুড়ে পুঁইগাছগুলোও কেমন রুগ্ণ হয়ে যাচ্ছে। শাহজালালের এদিকে খেয়াল নেই। সাদা চন্দনের তাবিজ খেয়ে চাচির বোনেরে কব্জা করার আগাম বাহাদুরি তার মধ্যে ভর করছে। এখন জালভরা খালি মাছ আর মাছ। এই কার্তিক-আগনেই মাছ বেচে চাচির বোনরে ঘরে তুলবে। মা যদি রাজি নাও হয়। বিলের ধারে শোলোকপুরের সড়কে ঘর তুলবে। আসমত ফকিরের কেরামতিতে হোক আর বিলের পানি কমে যাওয়ার কারণে হোক। শাহজালালের জালে মাছ উঠছে হরদম। বেচতে গেলেও দাম পাওয়া যাচ্ছে। মাকেও টাকা দেয়া যাচ্ছে। প্রথম মাসের বেতন পেয়ে মোবাইল কিনেছে নাসিমা। খবর পাঠিয়েছে নিজের নম্বর দিয়ে।
শাহজালালের মা যেমন এক সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের ইশারা দেখছে এই মোবাইল কেনার মাধ্যমে, তেমনি শাহজালালও মাছ ধরতে ধরতে পৌঁছে যাচ্ছে চাচির বোনের নিশ্বাসের খুব কাছে। কিন্তু সবচেছে বেশি যেদিন মাছ ধরল সেদিন খবর পেল গ্রামের বড় মসজিদে গত বছর যে আলেম তারাবিহ পড়াতে এসেছিল, সেই চাচির বোনকে নিকাহ করতে যাচ্ছে। শাহজালাল ওই আলেমকে দেখেছে লম্বা সাদা পাঞ্জাবি পড়া। কেমন দারুণ সুবাস সারা গতর জুড়ে। যেদিক দিয়ে হেঁটে যায় সেদিকেই সুবাস পাওয়া যায়। নতুন চাকরি পেয়েছে ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসায়। চাচির বাবার কপালে এর চেয়ে ভাল পাত্র জিন্দেগিতেও জুটবে না। আবার কেমন ভাগ্য। আলেম সাব নিজেই প্রস্তাব নিয়ে এসেছে। গত বছরই নাকি শবে বরাতের দাওয়াত খেতে এসে মনে ধরেছিল।
শাহজালাল মাছের ঝাকিটা নৌকায় ফেলে দৌড় দেয় চাচার শ্বশুর বাড়ি দিকে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর থেমে যায়। শাহজালাল দৌড় দেয় আসমত ফকিরের আস্তানার দিকে। ‘এই মুল্লারে এমন একটা বান দিতে অইব, জিন্দেগীতেও এই গাঁয়ের মাইয়্যার দিকে নজর দিবো না’। কোন বানটা দিলে ঠিক হবে শাহজালাল ভাবছে। এই মতে আসমত ফকিরের কাছে আরজি পেশ করবে। পেশাব বন্ধের বানটাই যুৎসই। ‘হালা বলে আলেম, বদনজর’
আসমত ফকির চিড়ার একটা বাটি নিয়ে বসে আছে। বৃত্তান্ত শুনে সাতটা খেজুরের ডাল আনতে বলে। এই সন্ধ্যায় ফকির সুরমা গাঙের তিনমাথায় দাঁড়িয়ে থাকবে। এই সময় ডালগুলো গাঙের জলে ধুয়ে আলেমে গ্রামের ঢোকার পথে বিছিয়ে দিলেই কাম খতম। খেজুরের গাছের চূড়াকে শাহজালাল চাচির বোনকে দখল করার চূড়ান্ত বিন্দু ধরে উঠে যায়। এক আদিম জেদ খেজুর গাছের ডালকেটে উজারতো সহজ, দ্রৌপদীর আঁচল টেনেও ক্লান্ত হবে না। আসমত ফকিরের সারা শরীর ভেজা। নদীর উপর দিয়ে হাঁটার সময় হয়তো কোনো গর্ভবতী শুশুককে আহত করেছিল। ভিজে জবুথবু হয়ে শেষ বিকেলের রোদে গরমের খোঁজ করছে। কিন্তু খেজুর গাছের ডালগুলাকে সে ঠিকই তিনমাথার নদীর জলে ধুয়ে ফুঁ দিয়ে শাহজালালের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। শাহজালালও ওই মৌলানা আসা যাওয়ার পথে খেজুর ডালের জল ছিটিয়ে গেছে। এইবার বুঝবে। পেশাব বন্ধ হইয়্যা মরবে। এই গ্রামের মাইয়্যার দিকে নজর দেয়ার হাউশ মিটে যাবে। শাহজালালের আজ দারুণ ঘুম হবে। মায়ের কাছ থেকে নতুন কাঁথা চেয়ে নিয়ে মুখ ঢেকে ঘুম দিল শাহজালাল।
ঘুমের মধ্যে আসমত ফকিরের লাইনে সেই গাছটার খোঁজ নেয়। যদি কোনো ভাবে মৌলভির নামের পাতাটা হলুদ পাওয়া যায়, তাহলেতো কথাই নাই। মৌলভির আসন্ন মৃত্যুর আকাক্সক্ষা মধ্যে নেই বিষাদ, আছে কার্তিকের আধাশীতের কাঁপুনির মধ্যে কাঁথার ভাজে কাকির বোনের গোপন সিন্দুকের চাবি পাওয়ার আনন্দ। স্পষ্ট সে দেখতে পাচ্ছে আসমত ফকিরের কেরামতিতে মৌলভির নাম লেখা পাতাটা হলুদ হয়ে উঠবে। পেশাব আটকে কনে দেখতে এসেই মৌলভির খায়েশ মিটে যাবে। হরদম ঝরা পাতার শব্দে ঢুকে যায় শাহজালাল। তার দাদার নামের পাতাটিকে খুঁজে পেলো না। মাটি শুষে নিয়েছে। বাবার নামের পাতাটিকে মাড়িয়ে যাচ্ছিল প্রায়। কিন্তু এই গাছ থেকেই সারাক্ষণই পাতা ঝরছে। পাতা ঝরছে মানে মানুষ মরছে। আচ্ছা, কত মানুষ একবারে মরে, দুনিয়াজুড়ে? শাহজালাল মৌলভিকে বান মারার আনন্দ ক্ষীণ হয়ে আসে এই বিশাল বৃক্ষের পাতা ঝরার ঝড় দেখে। কিছু কচি পাতা সবুজ থাকা অবস্থায় ঝরে পড়ছে। বিশাল গাছের উপরের আকাশটা মরা মাছের চোখের রঙের। শাহজালাল এই গাছের দেশ থেকে ফিরে আসতে চাইছে। তখনই একটা ডাল হুট করে ভেঙে পড়ল। একবারে অনেকগুলো পাতা হলুদ হওয়ার আগেই ডালসমেত ভেঙে পড়ল মাটিতে। কে জানি বিলাপ শুরু করছে। শাহজালালের ওমে কে ব্যাঘাত ঘটাল। মায়ের কান্নায় সাড়া দিতে গিয়ে শাহজালাল আর গাছের দেশে যেতে পারছে না।

ঢাকায় নাকি বড় একটা গার্মেন্টস ভাইঙ্গা পড়ছে। নাসিমা এই গার্মেন্টেসেই কাজ করতো। তার নতুন মোবাইলটাও বন্ধ। মাকে নিয়ে শাহজালাল ট্রেনের বগিতে ওঠার আগে মৌলভির বিয়ের খবরটা পায়। নাসিমা বেঁচে আছে কিনা জানতে গিয়ে আসমত ফকিরকে পাওয়া যায় নাই। কামের সময় হালাগো খুঁইজা পাওয়া যায় না। আল্লাগো, তুমিই ভরসা। নিজেই গাছটা আবার খোঁজ করার চেষ্টা করে শাহজালাল। ট্রেনের বগিতে ঝিমুনিতে ঘুম আসছে না, এক দাঁতের মাজনের ক্যানভাসার লোকজনের দাঁত পরিষ্কার করতাছে।
সম্ভবতো এলাকার কেউ মারা যায়নি। তবু মরা মাছের চোখের রঙা আকাশ দেখে শাহজালাল চোখ বুজে গাছের দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে।