তখন গভীর রাত। আমি খুব জোরে জোরে চিৎকার করছিলাম। কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছিল না।
এখন থেকে এক যুগ আগে ঘটনাটি ঘটেছিল। তারপর কত রাত আর কত দিন যে কেটে গেছে, সেই হিসাব কখনোই রাখা হয়নি। আজ আবার এমন ঘটনা ঘটে গেল। ভেবেছিলাম দুঃস্বপ্নের ভেতরে বিবেক শাঁখারি আর কোনোদিনও ফিরে আসবে না। যেখানে তাকে রেখে এসেছিলাম সেখান থেকে তার ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। কিন্তু আমি এখন খুবই অবাক হয়ে গেছি যে, আমার কাছে সে কীভাবে বারবার ঘুরে ফিরে এসে উঁকি দেয়। যখন তখন সে আমার নাম ধরে ডাক দেয়। তার মুখগম্ভীর করা রাগতস্বরের ডাক কেবল আমিই শুনতে পাই। চারপাশের আর কেউ তার ডাক কখনো শোনে না। এখন আমি সারাক্ষণই খুব আতঙ্কের মধ্যে থাকি যে, এই বুঝি সে আমার পাশে এসে মোটা গলায় ধীরে ধীরে ডাক দিচ্ছে—'মহানন্দ। এই মহানন্দ' আমি ভয়ে শিউরে উঠি।
বিবেক শাঁখারি আমার বন্ধু ছিল। শুধু বন্ধুই নয়, খুব ভালো বন্ধু ছিল। আমরা একসাথে শৈশব কৈশোর এবং আমাদের যুবক বয়সের রংবেরঙেয়ের দিনগুলো কাটিয়েছিলাম। আমাদের নেশা ছিল জুয়া খেলা। জুয়া খেলতে আমরা ভালোবাসতাম। তখন জুয়া খেলাকেই আমরা আমাদের জীবনের সেরা আনন্দ বলে মনে করতাম। আমরা শৈশবে মার্বেল খেলতে খেলতে জুয়া খেলা শুরু করেছিলাম। আমার মনে আছে, ওই ছোট্ট বয়সে তখন আমাদের হাতে কোনো টাকা পয়সা থাকত না। তখন মার্বেল খেলায় আমরা মার্বেলই জুয়া হিসেবে খেলে জিতে নিতাম। আঃ! সেই সব দিনগুলো আমাদের অনেক সুন্দর ছিল। তো ওই মাটিতে মার্বেল খেলা দিয়ে আমরা মূলত জুয়া খেলায় হাতে খড়ি দিই। এরপর আর জীবনে কখনো জুয়া খেলায় পিছিয়ে থাকতে হয়নি। আমরা এগিয়ে গেছি, সব সময়ই দুরন্তভাবে।
আমরা একত্রে কখনো পুকুর পাড়ে, কখনো পরিত্যক্ত ঘরের মাটিতে কিংবা কখনো জনসম্মুখের আড়ালের নিরাপদ কোনোখানে বসে আমরা জুয়া খেলতাম। শুধু আমরা দুজনেই নয়, আমাদের জুয়া খেলার একটি দল ছিল। দলের সবাই একেকদিন একেকখানে জুয়ার আসর বসিয়ে আনন্দে জুয়া খেলতাম। কখনো হারতাম আবার কখনো জিততাম। তবে আমাদের যৌথ খেলায় হেরে যাওয়ার গল্পই সবচেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু আমরা কোনো একদিন এভাবে হেরে যাব কখনো ভাবিনি। কিংবা আমিই তাকে চিরদিনের জন্য এভাবে হারিয়ে দেব সেটাও ভাবিনি। তবে যা কখনো ভাবিনি জীবনের দীর্ঘ পথে হাঁটতে হাঁটতে তাই অবলীলায় ঘটে গেছে। তবে আমি এত বছর আগের ঘটনাটি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। আমার আর কখনো তার কথা তেমনভাবে মনে পড়ত না। বেশ কিছুদিন ধরে আমি এখন আর আগের মতো রাতে ঘুমোতে পারি না। দিনেও একা একা চলতে পারি না। সব সময়ই মনের ভেতরে এক ধরনের আতঙ্ক নিয়ে থাকি। সব সময় কেমন জানি বুকের ভেতরে অস্থির লাগে। কোনো কাজেই মন বসাতে পারি না। সব সময় মনে করতে থাকি যে—এই বুঝি বিবেক আমাকে ডাক দিচ্ছে। এই বুঝি পেছন থেকে ডাক দিলো। বিবেক আমাকে যখন-তখন তার গা শিউরে ওঠা ভারী কণ্ঠে ডাক দেয়। আর বলতে থাকে—‘চল মহানন্দ। আমরা জুয়া খেলতে যাই। অনেকদিন হয়েছে, আমরা এক সাথে জুয়া খেলতে যাই না।’—আমি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই বিবেক শাঁখারিকে আর দেখতে পাই না। আঁতকে উঠি। শরীরের লোমগুলো দপ করে খাড়া হয়ে যায়। তখন শূন্যে ভাসতে থাকি। নিজের শরীর আমি কোথাও খুঁজে পাই না। হারিয়ে ফেলি। আমি গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিতে চাইলেও গলা দিয়ে আমার কোনো স্বর বের হয় না। আমি তখন নির্জন ফাঁকা জায়গা ছেড়ে আরো জোরে জোরে কোনো ভিড়ের মধ্যে কিংবা কোনো বাড়ি-ঘরের সামনের দিকে হাঁটতে থাকি। মানুষের ভিড়ের মধ্যে নিজেকে লুকাতে ভীষণ রকমের ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু যতই জোরে হাঁটতে থাকি, ততই আমার পথের দূরত্ব বেড়ে যায়। আমি সব শক্তি দিয়ে ঘরে ফিরতে চাই, কিন্তু টের পাই ঘর আমার থেকে অনেক দূরেই পড়ে আছে। আমি ঘরের কাছে এসে কিছুতেই পৌঁছাতে পারি না।
ছোটোবেলা আমার মা বলত—‘ঘুমের ঘোরে মানুষ দৌড়ে সামনের দিকে আসতে পারে না।’ তাহলে কী আমাকে সেই রোগে ধরেছে? আমি কী ঘুমের ঘোরে আছি নাকি বাস্তবে আছি, সেই বিষয়টি নিয়ে খেই হারিয়ে ফেলি। বুঝতে পারি না। আমার হাতে যখন টাকা পয়সা না থাকে তখন মূলত আমি খেই হারিয়ে ফেলি। টাকার জন্য পাগলের মতন হয়ে উঠি। আগেই বলেছি—আমি মূলত একজন জুয়াড়ি। জুয়া খেলা আমার শখ। সেই শখ থেকে জুয়া খেলা আমার এখন পেশা হয়ে উঠেছে। আমাদের এই গ্রামের মানুষের কাছে আমি এখন মহানন্দ জুয়াড়ি। ‘তালুকদার’ আমার পূর্বপুরুষের বংশ পদবি। কিন্তু গ্রামের মানুষেরা এখন আমাকে আর মহানন্দ তালুকদার বলে ডাকে না। বিষয়টি প্রথমে আমার বন্ধুরাই গ্রামে চালু করেছিল। আমার নামের পরে তালুকদার শব্দটি বাদ দিয়ে তারা বলতে শুরু করেছিল মহানন্দ জুয়াড়ি। একজন দুইজন করে করে গত এক দশক যাবৎ আমাকে সবাই মহানন্দ জুয়াড়ি বলেই ডাকে। আমার তালুকদার বংশ পদবি এখন আমার নামের পরে নেই। মানুষের মুখ থেকে সেটা এখন উধাও হয়ে গেছে। কিন্তু পনেরো বছর আগে আমি যখন বিয়ে করি তখনও লোকজনের কাছে তালুকদার বাড়ির পোলা হিসেবেই আমার পরিচয় ছিল। আমার মনে আছে—আমি যেদিন বিয়ে করার জন্য মেয়ে পক্ষের বাড়িতে যাই সেদিনও ভাবিনি যে, আমার মতন এমন বেকার ছেলের সাথে কোনো মেয়ের বাবা তার মেয়েকে বিয়ে দেবে। সে যাই হোক, আমার বাবা ও ভাইবোনদের দায়িত্বশীল আচরণের জন্য আমার শ্বশুর তার মেয়েকে আমার হাতে তুলে দিয়েছিল। তবে বিয়ের পরেও আমি আসলে জুয়া খেলা ছেড়ে দিতে পারিনি। অনেকবার আমার স্ত্রীকে কথা দিয়েছিলাম যে—আমি আর কোনোদিন জুয়ার আসরে যাব না। কিন্তু পারিনি। আমি নিজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখতে পারিনি। মনের অজান্তে জুয়ার আসরে বারবার ফিরে এসেছি। আমি অনেক বার খেয়াল করে দেখেছি, আমার স্ত্রীর সাথে ঝগড়া হলে আমি মাঝে মাঝে প্রতিজ্ঞা করেই বসি যে, আমি আর জুয়ার আসরে যাব না। কিন্তু দেখা গেল ওই কথা ভাবতে ভাবতেই আমি আমার খেলার সঙ্গীদের ডাকে কখন যে আসি। আমি নিজেও তা টের পাই না। সে যাই হোক। যেকথা বলছিলাম সেখানেই ফিরে আসি।
এইভাবে বিবেকের সাথে ঘটনাটি যে আমার ঘটে যাবে সেটি আমি এমন করে কখনো ভাবিনি। সেদিন আমার মাথায় কী পরিমাণ ভয়াবহ ক্রোধ জেগে উঠেছিল যে—আমি এখন অনুতপ্তের দহনে বুঝতে পারছি। ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ করেও তখন আমার অনুশোচনা জেগে ওঠেনি। কী জঘন্য অপরাধ তখন আমি করেছিলাম। বিবেকের উচিত ছিল আমাকে প্রকাশ্যে ছুরি বসিয়ে জবাই করে ফেলা। কিন্তু সে তা তখন করতে পারেনি। অপরাধী হয়েও তখন আমি ছিলাম অমানুষ। তা না হলে নিজের বন্ধুকে এইভাবে সরিয়ে দেওয়া কি যায়? যার সাথে কম করে হলেও রাত দিন মিলিয়ে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা একসাথে থাকতাম। তা প্রায় বিশ বছরের কম হবে না। বেশিও হতে পারে। যখন মাঝে মাঝে সপ্তাহ খানেকের জন্য আমরা দুজনেই হারিয়ে যেতাম তখন আমাদের দেখা হতো না। বিবেক ফেরি করে শাখা ও সিঁদুর বিক্রি করত। মাসে অন্তত এক সপ্তাহ সে কোনো দূরের এক গ্রামে গিয়ে শাখা সিঁদুর বিক্রি করে তারপর আবার নিজের গ্রামে ফিরে আসত। তবে, শাখা সিঁদুরের টাকায় তার সংসার ভালোভাবে চলতে পারত না। সবসময় অভাব অনটন লেগেই থাকত। সেই অভাবের মাত্রাটা আরো বেশি হয়ে যেত যদি নিজের পৈতৃক দুই বিঘা ধানের জমি তার না থাকত। ভাগ্যিস ধানের জমিটা থাকার জন্যই তার সংসারটা কোনোরকমে জোড়াতালি দিয়ে তার বউ টিকিয়ে রেখেছিল। বিবেক যা আয় রোজগার করে তা সে ওই জুয়ার আসরেই শেষ করে বাড়ি ফিরে আসে। এই নিয়ে বিবেকের বউ সবসময় অশান্তি করে চলে। যদিও তা সে কখনো আমলেই নেয় না। হাতে টাকা এলেই চলে আসে জুয়ার আসরে। জুয়ার আসরেই সে খুঁজে ফেরে জীবনের পরম আনন্দ। পরম বেদনা। কিন্তু এক যুগ আগের ঘটিয়ে ফেলা সেই ঘটনার পর থেকেই আমি ফেরারি হয়ে আছি। এতদিনে কত শহর আর কত বন্দর ঘুরে ফিরে এখানে এসে স্থির হয়েছি। সেকথা এখন আর আমি তুলতে চাই না। তুলতে গেলেই মনের ভিতরে নানার রঙের যন্ত্রণারা এসে জড়ো হয়। আমি তখন অনুশোচনায় ভুগতে শুরু করি। কিন্তু ঘটনাটি এত ভয়াবহ, এত নির্মম ও নিষ্ঠুর হয়ে যাবে যে, তা সেই সময়ে আমি উপলব্ধি করতে পারিনি। তখন মাথা গরম ছিল। বয়স অনেক কম ছিল। গরম মাথায় মানুষ অনেক কিছুই করে ফেলে। কিন্তু যখন হৃদয়ে অনুশোচনার সময়ে আসে। তখন হয়তো কিছুই করার থাকে না। আমার ক্ষেত্রেও ঠিক ওই রকমই ঘটেছিল।
পথে ঘাটে বাগানের লতা-পাতার ফাঁক গলে বয়ে যাওয়া হিমেল বাতাস গায়ে মাখতে মাখতে একদিন পেছনে ফিরে ভেবে দেখি, আমাদের বিয়ের বয়স দশ বছর পেরিয়ে গেছে। এখনো আমাদের দাম্পত্যের ঘর আলো করে কেউ বাবা বলে ডাক দেয়নি। স্ত্রীকে বারবার বলেছি—আমরা কবে বাবা-মা হবো। আর কতদিন আমাকে অপেক্ষা করাবে তুমি। কিন্তু আমার স্ত্রী আমার এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারত না। আমিও বুকের গভীরে ভীষণভাবে দুর্বল হতে থাকি। ভেঙে পড়তে থাকে আমার সকল স্বপ্নের গাঁথুনি। নিজেকেই বারবার প্রশ্ন করি— তাহলে আমারই কি সব দোষ? আমিই কী বাঁজা? কয়েকজন বন্ধু আমাকে বেশ কয়েকবার পরামর্শ দিয়েছিল। তারা বারবার আমাকে বলেছিল—‘মহানন্দ তুই শহরে গিয়ে ভালো একজন ডাক্তার দেখা। অনেক সময় ছেলেদেরও নাকি সমস্যা হয়ে থাকে। ছেলেরাও বাঁজা হয়।’ এই কথাগুলো শোনার পর থেকে আমার হৃদয়ে তুমুল ভয় কাজ করতে থাকে। আমি ভয় কিংবা সংকোচে অথবা লজ্জায় কখনো ডাক্তারের কাছে যেতে সাহস করতে পারিনি। অথবা বলা যায়, আমি ওই সাহস করার ইচ্ছাও দেখাইনি। কিন্তু আমার মনের মধ্যেই ছিল অব্যক্ত লালসা, ঘুমন্ত ছিল এক পশু। আমি আগে কোনোদিন টের পাইনি। একদিন ভেবে বসি, যেভাবেই হোক বিবেকের যুবতী হয়ে ওঠা মেয়ে পূর্ণিমাকে আদর করে দেখতে হবে। আমি কী আসলেই অপুরুষ নাকি পূর্ণপুরুষ। এরপর থেকেই আমি বিবেকের বাড়িতে আগের চেয়ে একটু বেশি সময় দিতে শুরু করি। বিবেকের বাড়িতে গেলেই পূর্ণিমাকে চোখে চোখে রাখতে শুরু করি। পূর্ণিমার বয়স এখন ১৩ বছর পেরিয়ে গেছে। আমার হাতের উপরেই বলতে পারি, সে জন্ম নিয়েছে। কিন্তু চোখের পলকে মেয়েটি কেমন করে জানি বড়ো হয়ে যাচ্ছে। তার বুক দুটো এখন কমলালেবুর মতন ফুলে উঠতে শুরু করেছে। দিনকে দিন তার শরীর জুড়ে হলুদ ফুলের সৌন্দর্য ছড়িয়ে পড়ছে। যেন ফুলে ও শরীরে তার মাখামাখি। কেউ কেউ চাইলে বলতে পারে যে, আকাশে জ্বলে থাকা পূর্ণিমার মতই তার শরীর জুড়ে সৌন্দর্য নেমে পড়ছে। হঠাৎ করে একদিন নিজের মধ্যে নিজেকে খেয়াল করে দেখলাম যে, আমি বিবেকের বাড়িতে এখন শুধু পূর্ণিমার আকর্ষণেই যাই। যখন মাথায় তেমন কোনো টেনশন কাজ করে না তখনই পূর্ণিমার ফুলে ওঠা ডাঁসা পেয়ারার মতন বুকের কথা মনে পড়ে যায়। আমার বুকের ভেতরে ঝিলিক মারে। মনে পড়ে যায়, পূর্ণিমার উজ্জ্বল প্রাণবন্ত লাল টুকটুকে মুখের হাসি। আমি তখন ওদের বাড়িতে ছুটে যাই। বিবেক আমার বন্ধু মানুষ। তাই যখন তখনই তার বাড়িতে চলে যাই। আমাকে দেখলেই পূর্ণিমা আমার কাছে ছুটে আসে। আমাকে সে কথা শেখার পর থেকেই কাকু কাকু বলে ডাকে। তার মুখের কথা এখন শুনলে আমার প্রাণ জুড়িয়ে যায়। সে ছোট্টবেলা থেকেই সে আমার বেশ ভক্ত। খুব আদর করতাম আমি। আমিও তার মুখের কথা শুনতেই যেন বড্ড ভালোবাসি। আমি যখনই ওদের বাড়িতে আসা-যাওয়া করি আমার কাছে ছুটে আসে। আমিও অনেক আদর করে এসেছি। কিন্তু এখন আর আমার মনের ভেতরে পূর্ণিমাকে নিয়ে কয়েক মাস আগের মতন ফিলিংস আসে না। তখন তো পূর্ণিমাকে ভাবতাম সে আমার বন্ধুর মেয়ে। কিন্তু এখন আমার মনের ভেতরে তাকে নিয়ে নতুন নকশা আঁকতে শুরু করেছি। এখন তাকে নিয়ে শরীরের রক্তে অন্যকিছু অনুভব করি। মনে হয় আমার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা কোনো এক পশু ক্ষুধায় কাতর হয়ে জেগে উঠেছে। আমার এখন আর বউকে ভালো লাগে না। বিয়ের পরে আমাদের দাম্পত্য জীবনের এতগুলো বছর কেটে গেল অথচ সে এখনো আমাকে একটি সন্তানের মুখ দেখাতে পারেনি। বয়স যত বেড়ে চলেছে আমার বুকের ভেতরে সন্তানের তীব্র আকাঙ্ক্ষা বাসা বুনতে শুরু করেছে। ওদিকে বউ আমাকে দোষ দেয়, আমার সমস্যাতেই নাকি এখনো বাবা হতে পারিনি। আমার কখনোই তার কথা বিশ্বাস হয় না। আমার শুধু মনে হয়—আমি সুস্থ আছি। ওই মাগির মধ্যেই যত সমস্যা। বাড়িতে গেলেই ওই মাগির সাথে আমার কলহ লেগেই থাকে। দুজনের মনের অশান্তিতেই অনেকদিন হয়ে গেছে আমরা দুজনে একসাথে ঘুমাই না। তবে আমরা যে এক সাথে ঘুমাই না এই কথা আমরা ছাড়া পৃথিবীর কেউ জানে না। জানবেই বা কী করে? আমাদের বাড়িতে আগের মতন এখন আর কেউ আসে না। আমাদের পুরাতন বাড়ি ছেড়ে বেশ কয়েক বছর হয়ে গেছে, আমি বাড়ির কাছেই একটি ধানি জমির মধ্যে পুকুর কেটে নতুন বাড়ি নির্মাণ করেছি। একটু বর্ষা আসলেই চারিদিকে জলে থইথই করে। যাতায়াতে একটু সমস্যা থাকায় আমার বাড়িতে লোকজন কমই আসে। ফলে আমার ও আমার বউয়ের মধ্যে যে দাম্পত্য হয় না সেকথা আর কেউ জানে না। যাই হোক, যে কথা বলতে চেয়েছিলাম—সেখানে ফিরে যাই। কিন্তু আমি কী বলতে চেয়েছিলাম সেকথা প্রায়ই ভুলে যাই। ওঃ! মনে পড়েছে। তখন ছিল অগ্রহায়ণ মাস। প্রকৃতি থেকে গরম বলতে গেলে প্রায় চলেই গেছে। দিনের বেলা একটু গরম লাগলেও বিকেলের পর থেকেই চারদিকে প্রকৃতি শীতের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। সন্ধ্যার আগে আগে দূরের কোনো ধানি জমির দিকে তাকালেই দেখতে পাওয়া যায় কুশায়ার দল যেন আছড়ে পড়তে চায় মাটির বুকে। যেখানে গ্রামের কৃষক ও কৃষাণিরা বোরো ধানের আবাদ করতে নিজেদের জমি প্রস্তুত করতে শুরু করে। কোনো কোনো জমির দিকে তাকালে চোখে পড়ে পুরো জমিটুকুর জঙ্গল পরিষ্কার করে ফেলা হয়েছে। আবার পাশেরই কোনো জমির দিকে তাকালে দেখা যায়, জমির বুকে শুয়ে থাকা জঙ্গলগুলো অর্ধেক পরিষ্কার করে ফেলে রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে, আর মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের পুরো গ্রামের জমিতেই বোরো ধানের সবুজ পাতায় ভরে উঠবে। তো আমি এমনই এক জমি প্রস্তুতির দিনে বিবেকের বাড়িতে গিয়ে দেখি, জমি থেকে সে এখনো বাড়িতে ফেরেনি। তার স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ির অদূরে একখণ্ড জমিতে বোরো ধান রোপণের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে। আমি ধীর পায়ে হেঁটে হেঁটে তার ঘরের দিকে এগিয়ে যাই। তখন সন্ধ্যা হয়নি। তবে সূর্যের আলোতে কোনো তেজ নেই। ঘরের সামনে গিয়ে দেখি, ঘরের বারান্দায় পূর্ণিমা একটি লাল টুকটুকে রঙের শাড়ি পরে বসে আছে। আমার মতনই তারাও পুরোনো বাড়ি থেকে দূরে নতুন করে বাড়ি করেছে। আশেপাশে কোনো বাড়ি-ঘর নেই। পূর্ণিমার মুখের দিকে তাকিয়ে টের পাই আমার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা এক পশু জেগে উঠেছে। আমি নিরুপায় হয়ে পড়ি। শরীরের শিরায় শিরায় বিদ্যুতের মতন লালসার লেলিহান শিখা জ্বলে উঠে। আমার চোখের ভেতরে ভাসতে থাকে, পূর্ণিমার উন্মুক্ত দেহখানা। আমি এসব ভাবতে ভাবতেই ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে ঘটতে থাকে। আমার হাতের টানে পূর্ণিমার লাল শাড়ি খুলে যায়। ছিঁড়ে যায় বড় পেয়ারার মতন ফুলে থাকা ডাঁসা ডাঁসা বুক দুটো ঢেকে রাখার লাল রঙের ব্লাউজখানাও। কোমরে বাঁধা লাল রঙের শায়াটি আমি খুলতে চেষ্টা করলেও তা সহজে খুলছিল না। শায়াটির বাঁধন খুবই শক্ত ছিল। আমি আর তা খুলে ফেলার চেষ্টা করিনি। আমার ভেতরে কামনা ক্রোধ এত দ্রুত দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে যে, আমার আর কোনো হুঁশ জ্ঞান ছিল না। চোখের সামনে পূর্ণির উন্মুক্ত দেহখানা ছাড়া আমার চোখে আর কোনো কিছুই ভেসে আসছিল না। সবকিছু মুহূর্তের মধ্যেই হয়ে যাচ্ছিল। এমন কচি একটি মেয়ের কাছে আমার মতন এক মর্দ পুরুষের মর্দামীই চলতে থাকল। পূর্ণিমা শুধু বলছিল, কাকা এসব কী করেন। আমাকে ছাড়েন ছাড়েন। এক সময়ে যখন আমার শরীর থেকে একদলা শক্তি বের হয়ে পূর্ণির দেহের ভিতের গেল, তখন আমার জ্ঞান ফিরতে শুরু করলো। আমি যেন ওর কোনো কথাই আর নিতে পারছি না। সবকিছু শেষে আমি দৌড়ে চলে আসতে থাকি। আমাকে পেছন থেকে কে যেন ডাকছিল। সম্ভবত বিবেকের কণ্ঠই হবে। আমি তখন তার ডাক শুনতে চাইনি। মনের ভেতরে ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে আমি পালাতে থাকি। কিন্তু কোথায় যাব পালিয়ে— সে পথও খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এরপর থেকে আমি সারাক্ষণ বিবেক শাঁখারির ভয়ে আতঙ্কে দিন কাটাতে থাকি। সব সময় অস্থির হয়ে থাকি। এই বুঝি তার মুখোমুখি পড়ে গেলাম। ঘটনা ঘটিয়ে আসার পরে আমি যেন আর হাঁটতে পারি না। আমার পা এগিয়ে নিতে আমার ভীষণ কষ্ট লাগে। মনে হয় যেন পা আর চলে না। তবুও আমি মনের বেখেয়ালে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি থেকে দূরের এক জঙ্গলের ভিটেতে চলে আসি। যেখানে বসে আছে আমাদের আরো বেশ কয়েকজন জুয়াড়ি। যাদের সাথে আমি ও বিবেক জুয়া খেলে বড়ো হয়েছি।
জঙ্গলের ভিটে হলেও এখানেও এখন বেশ কিছু গাছ-গাছলি বড়ো হয়ে উঠেছে। এখানে আছে আম, জাম, মেহগনি আর কিছু কাঁঠাল গাছ। ভিটেটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এই ভিটেখানির মালিক বেশ টাকা পয়সাওয়ালা লোক। ঢাকায় থাকেন। বছরে একবার কিংবা দুইবার গ্রামের এই বাড়িতে এসে থাকেন। লোকটার নাম সব সময়ই আমার মনে থাকে। এখন কেন জানি তার নামটি আমি মনেই করতে পারছি না। যাইহোক আমি একেবারেই জুয়ার আসরে চলে এসেছি। আমাকে দেখে দু’একজন বন্ধু বলে উঠলো—আরে কী খবর, এত দেরিতে এসেছিস। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, আমরা তো এখন চলে যাব। আজ আর বেশিক্ষণ খেলা চালানো যাবে না। আমি জুয়ার আসরে বন্ধুদের পাশেই গিয়ে বসে পড়ি। তবে বসতে বসতে ওদের কথাগুলো আমার কানে ভেসে আসলেও আমার মন ওই পূর্ণিমার বাড়িতেই পড়ে আছে। আমার চোখে কেবল পূর্ণিমার লাল টুকটুকে শাড়ি, শায়া আর ডাঁসা ডাঁসা পেয়ারার মতন বুকের ছবি ভেসে আসছে। ভাবছি— এসব কী হয়ে গেল। বিবেক তো আমাকে ছাড়বে না। এসব ভাবতে ভাবতেই তুমুল গর্জন করে আমি বিবেকের চিৎকার শুনতে পেলাম। পেছনে ফিরিয়ে তাকাতেই দেখি রুদ্র মূর্তির মতন সে একটি শাবল হাতে আমার মাথায় বাড়ি দিতে আসছে। আমি কোনো রকমে সটকে পড়ায় প্রথম বাড়িটি মাটিতেই পড়ে। এরই মধ্যে জুয়ার আসরের সবাই হুড়মুড় করে কিছু না বুঝেই বিবেককে তারা বাধা দিতে গেলে সে মুখ দিয়ে গলগল করে বলতে থাকে—তুই কী করে পারলি আমার মেয়ের এতবড়ো সর্বনাশ করতে? আমার মেয়ে তো এখন মরেই যাচ্ছে। তোকে কেন বাঁচিয়ে রাখবো? কথাগুলো বলতে বলতেই সে আবারও হাতের শাবল দিয়ে আমার মাথায় সজোরে একটা বাড়ি দেয়। আমি মাথা সরিয়ে নিতেই বাড়িটি আবারও মাটিতে পড়ে। আমি হতচকিত হয়ে যাই। মুহূর্তেই আমি ভোঁ-দৌড় দেই। গায়ে যত জোর আছে তার সবটুকুর প্রয়োগ করে আমি দৌড়াতে থাকি। আমার সাথে বিবেক দৌড়ে কোনোদিনই পারেনি। শৈশব থেকেই আমি ওর চেয়ে বেশি জোরে দৌড়াতে পারি। আমি দৌড়ে দৌড়ে অনেক দূরে চলে যাই। খেয়াল করছিলাম, বিবেকও আমার পেছনে পেছনে দৌড়ে আসছিল। আর চিৎকার করছিল। আমি জঙ্গল ও বাগানের ভেতর দিয়ে কোথায় যে চলে আসি বুঝতে পারিনি। অনেকক্ষণ পরে বুঝতে পারি, আমাকে বিবেক দৌড়ে ধরতে পারেনি। আমি অনেক দূরে কিছুটা নিরাপদে চলে আসি। তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে। সূর্য ডুবে চারদিকে প্রকৃতি তার অন্ধকারের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে। আমি জোরে জোরে শ্বাস নেওয়া কমিয়ে দিই। হঠাৎ মনে পড়ে যায় আমার বউয়ের মুখখানি। এমন একটি কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছি, আমার বউ তা কীভাবে মেনে নেবে। এই কথা শোনার পরে তো সে মরেই যাবে লজ্জায় ঘৃণায়। এতবড়ো অপমান নিয়ে বাকি জীবন বেঁচে থাকা আমার পক্ষে অনেক কঠিন হয়ে যাবে। আমি কিছুই ভেবে পাই না— এখন আমার কী করা উচিত। শেষমেষ আমি বুঝতে পারি, এমন অপমান নিয়ে আর বউয়ের সামনে আমি মুখ দেখাতে পারব না। কী করে আমি মুখ দেখাবো বিবেককের! কিংবা নন্দীনির সামনেই বা কী করে দাঁড়াবো! আমার মাথায় কোনো কিছুই কাজ করছে না। মনে হচ্ছে, মাথার ভেতরের সব ঘিলু জমাট হয়ে গেছে। তারা কোনো কাজ করছে না। আমি বন জঙ্গল আর গাছ গাছালির ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে আসি। দূর থেকে আমাদের পাশের গ্রামের ছোট্ট বাজারটিকে দেখতে পাচ্ছি। আস্তে আস্তে আমি বাজারের দিকে পা ফেলতে ফেলতে এসময় বাজারে চলে আসি। বাজারের নামকরা দোকানদার হরিদাস কুন্ডুর দোকানে গিয়ে এক বোতল ঘাস মারা ঔষধ কিনে বাড়ির পথে পা ফেলতে থাকি। কিন্তু বাড়িতে আমি কী করে যাবো। আমার বউ তো এতক্ষণে আমার এই কাণ্ড শুনে বাড়ির পুরো উঠোন জুড়ে সে কান্নার আসর বসিয়ে আছে। এসব ভাবতে ভাবতে গ্রামের অর্ধ পূর্ণিমার অন্ধকার পথে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে বোতল খুলে ঢকঢক করে ঘাস মারার তরল বিষ গিলে খেয়ে ফেলেছি টের পাইনি। এখন বুকে বড়ো যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। রাস্তার পাশেই পড়ে গেছি। অন্ধকার আকাশের জেগে থাকা আধখানা চাঁদ আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
তখনো আমার চোখে ভেসে উঠতে থাকে—আমার স্ত্রীর মুখখানা। আঃ! কী মায়াবী সে মুখ। তার কোনো শখ আল্লাদই এই জীবনে আমি পূরণ করতে পারিনি। সারা জীবন সেই দুঃখ আমার বউ বয়ে বেড়িয়েছে। তার দুঃখ মিটাতে না পারার সে আফসোস আমার থেকেই গেল।
দেখতে থাকি—পূর্ণিমার লাল টুকটুকে শাড়ি জড়ানো মুখ। আঃ! কী আকর্ষণীয় ছিল তার অঙ্গ। হলুদ ফুলের সৌন্দর্য বিছানো সে দেহখানা। কিংবা আকাশের ওই আধখানা পূর্ণিমার আলোয় বাগরুদ্ধ সৌন্দর্য মাখানো তার দেহবল্লরি। আমি এরপর আর কিছু দেখতে পাই না। ধীরে ধীরে ওই আকাশের আধখানা পূর্ণিমার চির অন্ধকারে ডুবে যেতে থাকি। এসময় টের পাই- লাল শাড়ি গায়ে জড়িয়ে পূর্ণিমাও পেছন থেকে আমার ডান হাতখানা ধরে যেন সুখের হাওয়ায় উড়তে থাকে। এদিকে তখনও চারপাশের মাটিতে নেমে আসা শোকের অন্ধকারে আকাশের বুকে আধখানা চাঁদের অবশিষ্টটুকু ঝুলে থাকে।