আনা ফ্রাঙ্ক ছিলেন একগুঁয়ে, প্রাণবন্ত এক কিশোরী। মায়ের সঙ্গে তার প্রায়ই মতবিরোধ হতো। নিজের বদলে যেতে থাকা শরীর নিয়েও উদ্বিগ্ন ছিলেন।
১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে নাৎসিদের হাতে নিহত ৬০ লাখ ইহুদির একজন আনা ফ্রাঙ্ক। আনা সেই ডাচ ইহুদিদেরও একজন, যাদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ও মৃত্যুশিবিরে প্রাণ হারিয়েছিল। হলোকাস্টে নিহত হওয়া ১৫ লাখ ইহুদি শিশুরও একজন।
আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি কেন আজও এত আলোচনা ও বিতর্কের বিষয়?
১৯২৯ সালে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট আম মাইন শহরে আনা ফ্রাঙ্কের জন্ম হয়। ১৯৩৪ সালে সে পরিবারের সঙ্গে নেদারল্যান্ডসে চলে যান। এর কিছুদিন আগে হিটলার জার্মানিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন। নাৎসিদের ক্রমবর্ধমান নির্যাতনের কারণে প্রায় ২৫ হাজার ইহুদি জার্মানি ছেড়ে নেদারল্যান্ডসে আশ্রয় নিয়েছিল। ফ্রাঙ্ক পরিবার ছিল তাদেরই একটি। কিন্তু নেদারল্যান্ডসেও ফ্রাঙ্ক পরিবার ও অন্য ইহুদিরা নিরাপদ ছিল না।
১৯৪০ সালের মে মাসে জার্মানি নেদারল্যান্ডস আক্রমণ করে। পাঁচ দিনের মধ্যেই ডাচ সরকার দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। দেশটি নাৎসিদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। নাৎসিরা দ্রুত দেশের প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়। তারা জার্মানিতে যে ধরনের বিধিনিষেধ ইহুদিদের ওপর আরোপ করেছিল, সেগুলো নেদারল্যান্ডসেও চালু করে।
নতুন আইন অনুযায়ী ইহুদিরা গণপরিবহণ ব্যবহার করতে পারত না। তারা অনেক পেশায় কাজ করার অধিকার হারায়। অ-ইহুদিদের সঙ্গে একই স্কুলেও পড়তে পারত না। তাদের সাইকেল, রেডিও ও অন্যান্য অনেক জিনিস বাজেয়াপ্ত করা হয়। পরে সেগুলো অ-ইহুদিদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
আক্রমণের পর তার পিতা নিজের পরিবার নিয়ে ক্রমেই বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি 'ইহুদিরা ব্যবসার মালিক হতে পারবে না-এমন একটি আইন এড়ানোর উপায় বের করেন। তিনি নিজের প্রতিষ্ঠান 'ওপেকটা'-এর দায়িত্ব কয়েকজন সহানুভূতিশীল সহকর্মীর হাতে তুলে দেন। প্রতিষ্ঠানটি ঘরে রান্নার কাজে ব্যবহৃত পেকটিন বিক্রি করত। তিনি পরিবারসহ যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য ভিসা নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এদিকে নাৎসিরা ইহুদিদের গ্রেপ্তার করাও শুরু করে। নিজের অ-ইহুদি বন্ধু ও সহকর্মীদের সহায়তায় তার পিতা পরিবারের জন্য একটি গোপন আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। মূলত ওপেকটার অফিসের পেছনের অংশে থাকা কয়েকটি আবাসন কক্ষ।
১৯৪২ সালের জুলাই মাসে আনা, তার বাবা-মা ও বোন সেখানে চলে যায়। ছোট ও সংকীর্ণ সেই দুইতলা বাসাটিকেই আনা পরে দ্য সিক্রেট অ্যানেক্স নামে উল্লেখ করেছিলেন। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন পরিবারের বন্ধু অগুস্তে ও হারমান ভ্যান পেলস। তাদের ছেলে পিটারও সেখানে ছিল। এছাড়া ফ্রিটজ ফেফার নামে একজন দন্তচিকিৎসকও সেখানে আশ্রয় নেন। গোপন আশ্রয়স্থল থেকে এই সাতজন বাসিন্দা টানা দুই বছরেরও বেশি সময় বাইরে বের হননি। একটি ব্যস্ত শহরের কেন্দ্রস্থলে লুকিয়ে থাকলেও দিনের বেলায় তাদের প্রায় সম্পূর্ণ নীরব থাকতে হতো। রাতে আবার বিমান হামলার আতঙ্ক সহ্য করতে হতো। অন্ধকার নামলে গোপনে রাখা একটি রেডিয়োর চারপাশে জড়ো হয়ে সবাই যুদ্ধের খবর শুনতেন। তাদের জীবন পুরোপুরি নির্ভর করত অল্প কয়েকজন সাহায্যকারীর ওপর। এই মানুষগুলো নিজেদের বড় ঝুঁকির মধ্যে ফেলে তাদের জন্য কালোবাজার থেকে খাবার কিনে আনতেন। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জোগাড় করতেন। কঠিন সময়ে তাদের মানসিক ও বাস্তব সহায়তা দিতেন।
আনা ফ্রাঙ্কের 'দ্য ডায়েরি অব আ ইয়াং গার্ল'
সেই গোপন জীবনের অনেক তথ্যই আজ জানা যায় আনার ডায়েরির কারণে। সেখানে কাটানো দিনগুলোর কথা খুব যত্নের সঙ্গে লিখে রেখেছিলেন। আত্মগোপনে যাওয়ার এক মাস আগে, তার ১২তম জন্মদিনে তিনি এই ডায়েরিটি উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন।
ডায়েরিটি ডাচ ভাষায় লিখতেন। এক কাল্পনিক বন্ধু কিটি-কে উদ্দেশ করে লিখেছিলেন। দিন যত গড়াতে থাকে, যুদ্ধের চাপ ও লুকিয়ে থাকার কষ্ট তত বাড়তে থাকে। একসময় সেই চাপ প্রায় অসহনীয় হয়ে ওঠে। তখন ডায়েরিই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে বড় সঙ্গী। ১৯৪৩ সালের অক্টোবরে লিখেছিলেন, সে যেন এমন একটি গানের পাখি, যার ডানা কেটে দেওয়া হয়েছে। সে গভীর অন্ধকারে নিজের খাঁচার শিকের সঙ্গে বারবার ধাক্কা খাচ্ছে।
১৯৪৪ সালের মার্চ মাসে আনা একটি রেডিয়ো সম্প্রচার শোনেন। সেখানে নির্বাসিত এক ডাচ কর্মকর্তা মানুষকে যুদ্ধ ও নাৎসি দখল-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক দলিলপত্র সংরক্ষণ করার আহ্বান জানান। এই আহ্বানে অনুপ্রাণিত হয়ে সে ডায়েরি প্রকাশের জন্য সম্পাদনা করা শুরু করেন। ডায়েরিতে লিখেন, "যুদ্ধ শেষ হওয়ার দশ বছর পর মানুষ খুব আগ্রহ নিয়ে পড়বে, আমরা লুকিয়ে থাকা ইহুদিরা কীভাবে জীবন কাটাতাম, কী খেতাম ও কী নিয়ে কথা বলতাম।" বইয়ের নাম দেন 'হেট আখটারহাউস। যার অর্থ "পেছনের বাড়ি"। ডায়েরিতে গোপন আশ্রয়স্থলের থাকা ব্যক্তিদের ও তাদের সাহায্যকারীদের জন্য ছদ্মনামও ব্যবহার করেছিলেন।
আনা ফ্রাঙ্কের জটিল উত্তরাধিকার
আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি হলোকাস্টের মতো অকল্পনীয় এক ট্র্যাজেডির জীবন্ত সাক্ষী। অনেক স্কুলে এই বই বাধ্যতামূলক পাঠ্য হিসেবে পড়ানো হয়। তাই অনেকেই এই বইয়ের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো হলোকাস্টের নির্মম ইতিহাস জানতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে এটিই একমাত্র পরিচয়। কিন্তু বইটির বিপুল জনপ্রিয়তা ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব হলোকাস্টের অনেক কঠিন বাস্তবতাকেও আড়াল করে ফেলেছে।
ডায়েরিটি ফ্রাঙ্ক পরিবারের গ্রেপ্তারের আগেই শেষ হয়ে যায়। ফলে আনা গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার জীবনে কী ঘটেছিল, সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বেশির ভাগই পাঠকদের অজানা থেকে যায়।
যুদ্ধের সময় আত্মগোপনে থাকা প্রায় ২৮ হাজার ডাচ-ইহুদির তুলনায় ফ্রাঙ্ক পরিবার কিছু ক্ষেত্রে বেশি সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল। তাদের কাছে তুলনামূলক বেশি জায়গা ছিল। জীবন ছিল কিছুটা স্থিতিশীল। এছাড়া তারা বাইরের লোকদের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সহায়তাও পেয়েছিল। আনার লেখার অনেক উদ্ধৃতিও প্রায়ই ভুলভাবে ব্যবহার করা হয়। কখনও কখনও সেগুলো মূল প্রেক্ষাপট থেকে সরে যায়। ডায়েরির সবচেয়ে বিখ্যাত ও সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত হওয়া অংশে আনা লিখেছিলেন যে তিনি বিশ্বাস করেন, "মানুষের অন্তর আসলে ভালো।" কিন্তু তার ডায়েরির বড় একটি অংশে মানবজাতি সম্পর্কে অনেক বেশি অন্ধকার ও হতাশাব্যঞ্জক দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যায়। তিনি যুদ্ধের আতঙ্ক, নির্যাতনের ভয় ও অনিশ্চয়তার গভীর উদ্বেগের কথাও বারবার লিখেছেন।
তার সবচেয়ে বিখ্যাত মন্তব্যটির ঠিক পরেই তিনি লিখেছিলেন, "বিভ্রান্তি, দুর্দশা ও মৃত্যুর ওপর দাঁড়িয়ে আমি কোনো আশা গড়ে তুলতে পারি না।" আরেক জায়গায় লিখেছিলেন- "আমি দেখছি পৃথিবী ধীরে ধীরে এক বিরানভূমিতে পরিণত হচ্ছে। আমি সেই বজ্রধ্বনি শুনতে পাচ্ছি, যা ক্রমেই কাছে আসছে ও একদিন আমাদেরও ধ্বংস করবে।"
এই কারণেই আনা ফ্রাঙ্কের উত্তরাধিকার শুধু আশা বা মানবতার গল্প না-একই সঙ্গে ভয়, অনিশ্চয়তা, যুদ্ধ, নিপীড়ন ও মানবিক সহনশীলতারও এক শক্তিশালী দলিল।
আনার উত্তরাধিকার রক্ষা
আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি বিশ্বের মানুষকে ইউরোপের ইহুদিদের ওপর নাৎসিদের সংঘটিত গণহত্যার ভয়াবহতা সম্পর্কে জানতে সাহায্য করেছে। কিন্তু এর ফলে একটি বড় প্রতীকী দায়িত্বও এসে পড়ে নিহত আনা ফ্রাঙ্কের ওপর। লেখক ফ্রান্সিন প্রোজ লিখেছেন, "খুব কম লেখকই এমন তীব্র আবেগ, এমন প্রবল অধিকারবোধ ও এত বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। কে তার নামে কথা বলার অধিকার রাখে, তার বই কী প্রতিনিধিত্ব করে বা করে না-এসব নিয়ে এত তর্ক খুব কম লেখককে ঘিরেই হয়েছে।"
এই বিতর্কগুলো ডায়েরিটির সত্যতা ও বৈধতা নিয়েও দেখা দিয়েছে। বহু বিস্তারিত ফরেনসিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে আনা ফ্রাঙ্ক নিজেই ডায়েরিটি লিখেছিলেন। তবুও জাল বা ভুয়া বলে মিথ্যা দাবি এখনো ছড়ানো হয়। এসব দাবি হলোকাস্ট অস্বীকারকারীদের প্রচারণাকে উৎসাহিত করে। আনার উত্তরাধিকারের মালিকানা নিয়েও বিরোধ হয়েছে।
এদিকে আমস্টারডামে অবস্থিত 'আনা ফ্রাঙ্ক হাউস' জাদুঘর, অন্যদিকে অটো ফ্রাঙ্ক প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশন 'আনা ফ্রাঙ্ক ফন্ডস' (ডায়েরির স্বত্বাধিকার রয়েছে)—এই দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও আইনি লড়াই হয়েছে।
আনা ফ্রাঙ্কদেরকে কে ধরিয়ে দিয়েছিল?
ফ্রাঙ্ক পরিবার ও তাদের সঙ্গীদের পরিণতি আরেকটি প্রশ্নকে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রেখেছে—কে তাদের সম্পর্কে ডাচ কর্তৃপক্ষকে খবর দিয়েছিল? বছরের পর বছর ধরে একাধিক ব্যক্তির নাম সন্দেহভাজন হিসেবে উঠে এসেছে। ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানে সন্দেহ করা হয় আর্নল্ড ভ্যান ডেন বার্থ-কে। এক অজ্ঞাত সূত্র দাবি করেছিল, তিনিই লুকিয়ে থাকার জায়গার তথ্য কর্তৃপক্ষকে দিয়েছিলেন।
তবে অনেক গবেষক এই সিদ্ধান্তে একমত নন। 'আনা ফ্রাঙ্ক হাউস'-এর পরিচালকসহ আরও অনেকে মনে করেন, আর্নল্ড ভ্যান ডেন বার্ঘই বিশ্বাসঘাতক ছিলেন, এমন প্রমাণ যথেষ্ট নয়।
এক অসমাপ্ত গল্পের শক্তি
শেষ পর্যন্ত আনা ফ্রাঙ্কের গল্পের শক্তি লুকিয়ে আছে এর সবচেয়ে বেদনাদায়ক বৈশিষ্ট্যে—ডায়েরিটি অসমাপ্ত। আনার সংক্ষিপ্ত ডায়েরি, তার করুণভাবে থেমে যাওয়া জীবন ও ৮০ বছরেরও বেশি সময় পরও তাকে কে ধরিয়ে দিয়েছিল' সে বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত ঐকমত্য না থাকা-সবকিছুই সেই গণহত্যার ব্যাপকতা ও নিষ্ঠুরতার কথা মনে করিয়ে দেয়, যার প্রতীক হয়ে উঠেছেন তিনি।
মৃত্যুর ঝুঁকির মুখে, গোপনে বসে লেখা সেই কথাগুলো এখনো মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যায়। ডায়েরির শেষ লেখায় আনা লিখেছিলেন, "আমার ভালো দিকটা কেউ জানে না।" তার মৃত্যুর বহু দশক পরে আমরা আজ সেই ভালো দিকটিই জানতে পেরেছি। তার লেখার মাধ্যমে আমরা চিনেছি এক সংবেদনশীল, বুদ্ধিমান, স্বপ্নবান এবং গভীরভাবে মানবিক কিশোরীকে।









