আমাদের সংবাদপত্রের ভূমিকা

মেয়েটিকে ওরা কাঁদতে দেখেনি কেউ। মেয়েটির আচরণ স্বাভাবিক। এখানে এসেছে তিনদিন হলো। মেয়েটিকে নিয়ে ছেলেমেয়ের সংখ্যা তেরো। সবকটিকে দিনের পর দিন কাঁদতে দেখেছে এবাদুল। কান্না দেখলে চোখ ফেটে রক্তবমি বের হতে চায় তার। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তাইতো মান্নান বক্সের এত পছন্দ তাকে। এটা হয়েছে বয়স যখন তেরো কিংবা চৌদ্দ, সেই দিঘল পূর্ণিমা রাত থেকে। এই ঘটনাটা হারায়ে যাওয়া এক বন্ধু ছাড়া আর কেউ জানে না। বেশ্যার অর্থহীন শুষ্ক হাসির মতো ব্যবহার মান্নান বক্সের সঙ্গে এবাদুলের।

মানব উন্নয়ন সংস্থার ম্যানেজার হিসাবে তার চাকরির বয়স পাঁচ মাস। সেভেন্টি সিসির রিকন্ডিশনড মটরবাইকে করে প্রতিদিন রাত এগারোটায় কর্পোরেশন অফিসে আসে বক্স। হিসাব চুকে গেলে ১২টার দিকে চলে যায় সে। তার রিভলভিং চেয়ারের পিছনের সেলফে পৌরাণিক পুঁথির ন্যায় বিশুদ্ধ কতগুলো গ্রন্থ থাম ইটের মতো মনে হয় এবাদুলের। এবাদুল নেড়েচেড়ে দেখেছে অনেকবার। তার নাড়াচাড়ার মধ্যে ছিল সন্দেহ। কারণ সে একবার তার আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিক্সের এক কমরেডকে দেখেছে মোটা একটা বই নিয়ে বিশেষ করে গুপ্ত সভায় উপস্থিত হতে। সেই বই একবার খুলে দেখার সুযোগ পেয়েছিল সে। ভিতরের পাতা খুলতেই দেখতে পায়, নকশা করে কাটা স্থানে অত্যাধুনিক এক রিভলভার। সে চমকায় না। বইটা যথাস্থানে রেখে দেয়। তাই চেয়ারের পিছনে রাখা সমস্ত গ্রন্থগুলোকে বারবার উলটেপালটে দেখেছে। ইংরেজি, বাংলায় লেখা এই বইগুলোর প্রতি তার কোনো আগ্রহ নেই। প্লাস্টিক প্লেটে বাংলায় লেখা বানান করে করে পড়েছে সে। এখন সে মুখস্থ বলতে পারে মানব উন্নয়ন সংস্থা। সততাই উৎকৃষ্ট ধর্ম। সবার উপরে মানুষ সত্য। আরো কী-কীসব। ভিতরে বিভিন্ন রকমের পোস্টার যা ইংরেজিতে লেখা। তার লেখাপড়ার যে দৌড় তাতে অর্থ করে বোঝার অত ক্ষমতা নেই।

ফিরোজা কালারের এই অফিসরুমে গত পাঁচ মাসে তার নিয়ন্ত্রিত শিশু-কিশোররা ছাড়া কাউকে আসতে দেখেনি। যদিও একবার এক সাদা সাহেব বেশকিছু ছবি-টবি তুলে নিয়েছিল ছেলে মেয়েদের। এ সুখের মালভূমিতে যারা একবার এসেছে তারা আর ফিরে যেতে পারেনি। এদের বয়সই বা কত? অষ্টম, নবম কিংবা কেউ দশম বর্ষে হয়তো পদার্পণ করেছে। এদের মধ্যে জন্মান্ধ আছে একজন। দুজন এবাদের হাতে...। অন্যরা সময়ের অসুস্থ আয়নায় ফ্রেমবন্দি হয়ে পূর্বের কর্মচারীদের হাতেই রাত্রির নর্দমায় অভিষিক্ত হয়েছে।

অফিস ঘরের সন্ত্রস্ত স্বর্গের নিচতলায় এবাদ থাকে। নিচতলার পাশ দিয়ে একটি সরু রাস্তা মজা ঝিলের কাছে মিশেছে। কাছেই সিটি কর্পোরেশনের ডাস্ট ফেলানো হয় নিয়মিত। তার পাশেই প্রলেপহীন ইটের দেয়াল, উপরে ও ভিতরে টিন ও চাটাইয়ের তৈরি অসূর্যস্পশ্যা চালাঘর। ছাউনিতে বৃষ্টি থামানোর জন্য পলিথিন আর পোকাধরা গোলপাতা ব্যবহারও লক্ষণীয়। স্থায়ী এক বুয়া পাশের ঘরে থাকে।

সন্তানহীন, প্রায় বুড়ি, পৃথিবীতে আপন বলতে তার কেউ নেই। দুই বেলা রান্না করে দেয় পোলাপানগুলারে। এরপর সমস্ত দায়িত্ব এবাদের।

ভোর হতে না হতেই অন্ধ তিনটাকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেয়া। লুলাগুলাকে (যাদেরকে এখানে আসার পর এমন করা হয়েছে) ফার্মগেট, নিউমার্কেট, সোনারগাঁও হোটেল মোড়, মগবাজার, মালিবাগ মোড়ে পৌঁছে দেয়া ও রাত ৯টার দিকে কলোনিতে ফিরিয়ে আনা। একটানা পাঁচমাস বণিক মৌমাছির মতো এই কাজ সে করে আসছে। বিনিময়ে মাসশেষে বেতন এবং সামান্য একটা পারসেন্টটিসও পায় সে। এই প্রথম সে চাকরি করছে জীবনে। মাঝেমধ্যে নতুন মালের আমদানি ঘটলে উটকো উত্তেজনায় কাটে তার। ভালবাসা-টাসার মতো কোনো পুতপুতা কাম তার মনে কখনো বাসা বাঁধেনি। তারপরও সেবার কি-যে ঘটলো তার।

সন্ধ্যারাতে মান্নান বক্স ফুটফুটে একটা ছেলে নিয়ে এলো অফিসে। এই কয় মাসে এমনতর চেহারা সে কখনো দেখে নাই বক্সের। আদেশের কণ্ঠে বললো, পা দুটা আর হাত দুটা ম্যানেজ করে রাখবে। এই ওষুধগুলা রাখো। আগে খাইয়ে নিবা। কাল সকালে ডাক্তার আসবে, তাকে ভিতরে ঢুকতে দিবা ক্যামন?

মোমবাতি ঝরা লালার মতন তার বিবেকহীন বিবেকের ভিতরে কি জানি ঝরতে থাকে। নির্দেশ পালন ছাড়া কিছুই করার নেই এবাদুলের। যত নতুন মালের আমদানি ঘটবে তত তার লাভ। জনপ্রতি একটা কমিশন সে পায়। সে না থাকলেও এ কাজ অন্য একজন না একজন করবেই। এর আগেও আরও জনা চারেক কর্মচারী ছিল। যাদের চলে যাবার সম্পর্কে এখানের পোষ্যরা কিছুই জানে না।

আততায়ীর মতো গুটিসুটি দেয়া সন্ত্রস্ত ঘুমন্ত শিশুটিকে প্রথমে হাতে ইনজেকশন পুশ করে। হাত মোচড়ানোর সময় ছেলেটি কোঁকিয়ে ওঠে প্রস্রাব করে দেয়। ঘুম ভেঙে যায় কি যায় না বলা মুশকিল। তবে হাত ফুলে কলাগাছের মোচার মতো হয়ে যায়। এবাদুল ভাবে এই শিশুটারও কি চোখ দুটা তোলা হবে। ভাবনায় ছেদ পড়ে-কতক্ষণ আনমনা ছিল মনে নেই, শিশুটার চিৎকারে সংবিৎ ফেরে তার, ভোরবেলায় একটা লোক এসে ভাঙা হাতে ব্যান্ডেজ করে। পা সুস্থ আছে কেন, এজন্যে মৃদু আপত্তি তোলে লোকটি। সে কোনো জবাব দেয় না। আঘাত পাওয়া লজ্জাবতী লতার মতন ন্যাতানো ছেলেটিকে দিনকয়েক পরে প্রশিক্ষণের জন্য রেখে আসে বাংলামোটর মোড়ে। সঙ্গে ঠ্যাংনুলা মৌন্টাকে রাখে। এই মৌন্টারে নাকি এক বছর বয়স পালে পথ থেকে নিয়ে এসে আশ্রয় দিয়েছে। আর ওই সময়েই পাতিলের ভিতর বসিয়ে রেখে রেখে পা দুটাকে অমন করে ফেলেছে। গোধূলির প্রস্থানের একটু পরপরই পৌঁছে যায় সে, বাংলামোটর মোড়ে। এর পূর্বেই অন্যদের সে রেখে এসেছে আজ।

মৌন্টা পাছা ঠেলে ঠেলে তার কাছে আসে। আক্ষেপের সঙ্গে বলে, ওস্তাদ, দুপার কালে জাউরার পোলায় মোরে থুইয়া চইল্লা গ্যাছে মুই কি হরমু কন। এবাদ ভ্যাবাচ্যাকা খায়। ভাবতে থাকে ভালোই করছে ছেলেটা। তার এবার চাকরি যাবে, যাক। আবার পুরানো কাজে যাবে সে। এসব ভাবনা ছেড়ে কঠিন হয়। দেহখানা ছুটায় অফিসের দিকে। বসের বাসার ঠিকানা জানে না। জানে না কোনো ফোন নাম্বার। এতদিনে একবারও এসব জানার আগ্রহ জন্মায়নি। মাতালের মতো সে একটা স্কুটার নিয়ে ছুটতে থাকে মৌচাক, মালিবাগ, কাকরাইল, জিপিও, গুলশান। না কোথাও পায় না তাকে। হতাশা ভর করে চোখে। কি জবাব দেবে ঐ বেঁটেখাটো গম্ভীর লোকটার কাছে। ভয় হয় না পৃথিবীতে কোনো মানুষরূপি জন্তুকে। তবে এই বক্স লোকটার বিকৃত মুখমণ্ডল, ছোট ছোট কুতকুতা চোখ, পেশাদার খুনির জ্যোতি ছড়ায়। যখন হাসে তখন মনে হয় যেন প্রেতের প্রতিচ্ছবি। অসুর বিকৃতিতে এবাদুল ও-বা কম কীসে? সেদিন বক্স সাহেব তার নিপুণ ফাইট দেখে বিপ্লবী নির্বাসন হতে লুফে নিয়ে এসে এখানে ম্যানেজার বানালো। এবাদ স্রেফ টাকার বিনিময়ে একটা আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টিতে কাজ করতো। পার্টিফার্টি, লেফট-টেফট অতশত বুঝে না। অথচ অপারেশন লাইনআপের প্রথম ব্যক্তি সে। অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিষ্পত্তির জন্যে, নাকি হঠাৎ ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের দমনের নামে তাকে অ্যাকশনে পাঠান তার কমরেড। তা তার জানা হয় না কিংবা জানার আগ্রহও নাই। অতর্কিত মুখোমুখি হামলায় সে অপর পক্ষের দু-দুটা লাশ ফেলে দিল অন দ্য স্পট।

কান্না আর রক্ত দেখলে নেশা জাগে তার। এবাদুলের রক্তের সম্পর্কের কেউ নেই। মায়া-দয়া ব্যাপারটা সে কোনোদিন বুঝেনি, কিংবা বুঝে উঠতে পারে না। স্তব্ধ পাথরের মতো চোখ তার। ভাস্করদের গড়া পাথর মূর্তিতে তাকালেও তো প্রাণ খুঁজে পায় দর্শকের চোখ। তারটা তার বিপরীতে। জীবনে কখনো কেঁদেছে কিনা তার মনে পড়ে না। এবাদুলের বারবার মনে হতে থাকে বক্স তার চেয়ে অধিক দূরদর্শী। ধূর্ত। রাত এগারোটার মধ্যে স্থির চোখ নিয়া, ভিতরে ভিতরে কিছুটা উদ্বিগ্ন মনে, অফিসে ফিরলে দেখে মান্নান বক্স তার পূর্বেই এসেছে অফিসে। কটায় আসলো লোকটা? মনে মনে প্রশ্ন করে? তাহলে সে কি জেনে গেছে ছেলেটার পালানোর খবর। দুর্ঘটনার কথা তাকে জানাতেই সে গম্ভীর করে অর্ডার করে, এমন যেন না হয় আর।

তবে এসব ছিন্নমূলদের কিছুদিন পাহারায় রেখে পোষ মানাতে হয়। মনের সকল স্বাধীন মানচিত্র ভুলাতে হয় বলে সে উঠে চলে গেলে, ঠিক রাত বারোটার দিকে একটা নেশাখোর ছোকরা হাতভাঙা ছেলেটাকে দিয়া যায়। তার ঘুম এমনিতেই কম। তার উপর ছেলেটা অবহেলা ভরে একটা চিঠি হাতে ধরিয়ে দেয়। তাতে লেখা, সকাল ছটায় ডাক্তার আসবে। তাকে সহযোগিতা করার জন্যে। চিঠিটা পড়ে তার পাথর চোখ আরো আবেগহীন হয়। তাহলে বক্স চক্ষু-কিডনি কোনো ব্যবসাই ছাড়েননি! তাইতো, শিশুগুলোর চোখ গ্যালো কোথায়? এতদিনে সে বুঝতে পারে।

দপদপে সাদা কফিন ড্রেসে সজ্জিত ডাক্তার অফিসের পাশের রুমে এসে ঢোকে। অনুরোধমাখা কণ্ঠে বলে, রোগীকে খাটের সঙ্গে বেঁধে ফেলো। যন্ত্রের মতো নির্দেশানুযায়ী কাজ করছে সে। এরপর যে দৃশ্যের অবতারণা তা এক জীবন্ত মৃত্যুর প্রতিচ্ছবি। চক্ষু দুটি টেস্ট-টিউব জাতীয় মেডিসিন-পূর্ণ-বিশুদ্ধ পাত্রে রেখে, ছেলেটির চক্ষুর গর্তের উপর ব্যান্ডেজ করে চলে যায় ডাক্তার। ছেলেটিও আশ্চর্য! আঃ উহ্ কিছুই করলো না। এবাদ খুন করেছে, একই গ্রুপের লোকের মৃত্যু দেখেছে, কিন্তু এভাবে জীবন্ত মেরে ফেলতে কাউকে দেখেনি সে। ডাক্তারকে বেশ নম্রভদ্র লোক বলে মনে হয়। চেহারা আর ব্যবহারের চমৎকারিত্বে ভক্তি অঞ্জলি হয়ে নেমে আসে তার পদযুগলে। যেন আরব থেকে আসা কোনো পীর। এবাদের পাথর চোখের জ্যোতি জ্বলে—আবার কী-ভেবে নিভে যায়।

চোখ উৎপাটনের দিন থেকে এবাদুলের মনে সূর্যগ্রহণ লাগে। ভাবতে পারে না সে অনেককিছুই। শিশুগুলোর প্যাটে যাদের কাটা দাগ আছে তাদের সে ভালো করে পরখ করে দেখে। শিশুগুলিকে জিজ্ঞেস করলে ওরা কিছুই বলতে পারে না।

হঠাৎ কাল রাতে এই মেয়েটাকে পাঠানোর পর তার মধ্যে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়। এমন হবার কথা তো অন্তত তার নয়। এর পরিণতিও এমনই হবে? তাতে তার কি? এসব প্রশ্ন এড়াতে পারে না। কী-সব বেজে চলে বুকের মধ্যে। কিন্তু নর্তকীর নাভির ফাটলের মতো মেয়েটির চোখ, দৃষ্টিভেদী চাহনি, এবাদের হৃদয়কে চুরমার করে দেয়। বারবার ভাবে, তার বুক এমন করে কেন। সমুদ্রের কাছে গেলে যেমন অস্থির আর উদাস লাগে, তেমন অস্থির লাগছে কেন? কখনো তো এমনটা ঘটেনি এতটুকু দীর্ঘজীবনে? তার হৃদয় বলে যা ছিল তা তো শ্মশানে পুড়ে গেছে। তারপরও কে যেন, কী-যেন তাকে জাপটে ধরে। বুক ভার হয়, মাথা ঝিমঝিম করে। ও মেয়েটির স্থানে যদি সে হতো। তার তো কেউ নেই। মেয়েটি যদি তার বোন হতো... দূর, যতসব উলটাপালটা চিন্তা বলে সে যত মাথা থেকে ঝেটে বিদায় করতে চায়, ততই সে কোথায় যেন আটকে যায়, বিদ্ধ হয়। বোন, মা এমনকোনো আত্মীয়-স্বজন তার কোনোকালে কোথাও ছিল কি-না সে তা জানে না। এর চেহারা বা রঙ কেমন তাও সে বলতে পারে না। তার বুকে পাহাড়ের মতো বাতাস ঘন হলে যেমন লাগে তেমন দম বন্ধ হয়ে আসে। ভ্রূ-র রেখায় মেঘ জমে। বারবার ভাবতে চেষ্টা করে সে তো শুধু চাকরি করে, তার কি দরকার এসকল ভাবনার। তারপরও সে দেখে মেয়েটির চোখের মধ্যে যে সমুদ্র তার মধ্যে সে হাবুডুবু খেয়ে ডুবে যাচ্ছে। মেয়েটি এত ছোট যে তার সম্পর্কে অন্যকিছু ভাবনা আসে না তার। কিন্তু তার চোখের দিকে তাকানোতে সে যেন বিদ্ধ হচ্ছে, বরফকুচির আঘাতে। অসহনীয়, তাকাতে চায় না তবুও বারবার চোখ যায় চোখে। মেয়েটি তাকে দেখার পর যেন চোখে একটিবারের জন্যেও পলক দেয়নি। এমনই মনে হয় তার। মেয়েটিকে বার দুই যে থাপ্পড় দিয়েছে তাতে তার হাতের তালু এখনো পুড়তে থাকে। মেয়েটিকে অনেক কথা জিজ্ঞেস করেছে কিন্তু মেয়েটি কাঁদেওনি, কোনো কথাও বলেনি। আশ্চর্য মেয়ে!

রাত পৌনে এগারোটার দিকে ডাক্তার শল্যবিদের কুশলতায় কড়া নাড়ে। এবাদকে নির্দেশ দেয় হাত পা বাঁধতে। এবাদ অনড় দেখে ডাক্তার নিজেই এগিয়ে যায়। মেয়েটি মন্ত্রমুগ্ধের মতো খাটে শুয়ে পড়ে। ডাক্তার হাত-পা বাঁধে—মেয়েটা এবাদের দিকে একই দৃষ্টিতে অপলক তাকায়ে থাকে। যেন ডাক্তারের উপস্থিতি কোনো ব্যাপারই নয়। ডাক্তার যন্ত্রপাতি বের করে। ইনজেকশন পুশ করতে চায় যখন বাম হাতে তখনই হঠাৎ এবাদ হাতের কাছের কাগজকাটা ছুটির নিয়ে হিংস্র ছোবলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডাক্তারের উপর।

আতঙ্কে নীল হয়ে যাওয়া ডাক্তারের চিৎকারের শব্দ শোনা যায় বদ্ধ ঘরে। ধস্তাধস্তি চলে অনেকক্ষণ। মান্নান বক্স ঠিক পৌনে এগারোটা-ই অফিস রুমের বাইরে অবস্থান করছিল। পর্যবেক্ষণ করছিল সবকিছু। উগ্র অশ্বের মতো লাফ দিয়ে নামে নিচতলায়। তার নিচে গোপন এক কক্ষ আছে, সেই কক্ষে গিয়ে ফোন করে পুলিশে। কারণ যে রুমে টেলিফোন সেখানটায় ডুয়েল লড়ছিল দু'জনে। পুলিশ রক্তাক্ত অবস্থায় এসে উদ্ধার করে ডাক্তারকে। পরেরদিন জাতীয় দৈনিকের শেষ পৃষ্ঠায় গুরুত্বের সঙ্গে ছবি ছাপা হয়...

কুখ্যাত খুনি-শিশুপাচারকারী দলের নেতা গ্রেফতার

গতকাল মহানগর পুলিশ এবাদুল নামের বহু খুনের এক আসামিকে গ্রেফতার করেছে।

পুলিশ কমিশনার জানিয়েছেন, সে এক সংঘবদ্ধ শিশু ও নারী পাচারকারী দলের নেতা। তাকে বহুদিন ধরে পুলিশ খুঁজছিল। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে সে স্বীকার করেছে অন্যান্যের নাম। তদন্তের স্বার্থে অন্যদের নাম গোপন রাখা হয়েছে। তার কাছ থেকে কয়েকজন শিশুসহ একটি রিভলভার, ছয় রাউন্ড গুলি ও একটি কাটা রাইফেল উদ্ধার করেছে পুলিশ। জানা গেছে, দলের অন্য সদস্যদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পুলিশকে সহায়তা করায় মহানগর পুলিশ কমিশনার মিস্টার বক্স এবং স্বনামধন্য ডাক্তার মিস্টার জ্যাকি সাহেবকে পৃথক পৃথকভাবে পুরস্কার ঘোষণা করেছেন।

(সরকার আশরাফ সম্পাদিত নিসর্গ লিটল ম্যাগাজিনে (দুই বাংলার ছোটগল্প) গল্পটি ১৯৯৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত হয়েছিল।)