শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের 'বেঙ্গল টুডে' ।। পর্ব—০১

অনুবাদ : আলমগীর মোহাম্মদ
২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:২৬ আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৪৭

আমি কেন পদত্যাগ করেছি

ভারতবর্ষে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ইতিহাসে প্রায় অনন্য এক পরিস্থিতিতে আজ আমরা এই পরিষদে মিলিত হয়েছি। আমরা শেষবার মিলিত হয়েছিলাম ১৯৪৩ সালের ২৯শে মার্চ। সেই ভাগ্য নির্ধারক সকালে আমাদের বিদায় ছিল অত্যন্ত নাটকীয়। গত তিন মাস এক সপ্তাহ সময়ের মধ্যে এমন সব ঘটনা ঘটেছে যা সংবিধানের ভিত্তিমূলকে কাঁপিয়ে দিয়েছে এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের প্রহসনকে উন্মোচিত করেছে। পরিষদের সদস্যদের স্মরণে আছে যে, বাজেট অধিবেশনের শেষ দিনে আমরা মিলিত হওয়া মাত্রই জনাব কিরণ শঙ্কর রায় এবং অন্যরা আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন—আমি মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছি কি না, দিয়ে থাকলে তা গৃহীত হয়েছে কি না। আমি উভয় প্রশ্নেরই ইতিবাচক উত্তর দিয়েছিলাম। তবে আমার উত্তরগুলো স্বাভাবিকভাবেই উত্থাপিত নির্দিষ্ট পয়েন্টগুলোর তথ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। যে পরিস্থিতির মধ্যে আমাকে অত্যন্ত চতুরতার সাথে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তার বিস্তারিত বিবরণ সেখানে ছিল না। এরপর পরিষদ মুলতবি করা হয়। বিরতির সময় আমি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বর্ণনা করেছি যে, কোন পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমি আগে থেকে খসড়া করা এবং টাইপ করা একটি দলিলে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছিলাম, যেটা কিনা আমার পদত্যাগপত্র হিসেবে চালানো হয়েছে।

আমি ভেবেছিলাম এই বিবৃতিগুলো জনসাধারণকে আমার মুখ্যমন্ত্রী পদের নাটকীয় অবসানের ধরণ সম্পর্কে একটি নির্ভুল ধারণা দিয়েছে এবং এই পরিষদে আমার আর নতুন করে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমি বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করছি যে, সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়া পার্লামেন্টে আমার পদত্যাগ সংক্রান্ত পরিস্থিতির বিষয়ে এমন সব বক্তব্য দিচ্ছেন (বা তাকে দিয়ে দেওয়ানো হচ্ছে), যা প্রকৃত ঘটনার বিকৃত রূপ এবং সেখানে এমন কিছু ইঙ্গিত রয়েছে যা আমি মেনে নিতে পারি না। পার্লামেন্টে তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে ভারত সচিব মন্তব্য করেছেন যে, আমি 'স্বেচ্ছায়' পদত্যাগ করেছি এবং আমার পদত্যাগ ও পরবর্তী ঘটনাবলি 'প্রাদেশিক প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানের পদ্ধতি অনুযায়ী' ঘটেছে। সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়ার ব্যবহৃত এই ভাষা ছিল রহস্যময়, যদি না বলি অর্থহীন। আমি তার কাছে একটি টেলিগ্রাম পাঠিয়ে ঘটনার এই ভুল ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানাই এবং অনুরোধ করি যেন তিনি কোনো বিবরণ জনসমক্ষে দেওয়ার আগে প্রকৃত তথ্য যাচাই করে নেন। আমি ভাইসরয়কেও একটি টেলিগ্রাম পাঠিয়ে অনুরোধ করি যেন তিনি ভারত সচিবের কাছে সঠিক তথ্য পাঠান। এর জবাবে আমাকে জানানো হয় যে, গভর্নর সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়ার সাথে যোগাযোগ রাখছেন এবং আমার ও গভর্নরের বিবরণের মধ্যে পার্থক্যের বিষয়ে তিনি সন্তুষ্ট যে গভর্নরের বিবরণই সঠিক।

আমি স্বীকার করছি যে, আমার প্রতিবাদের এই জবাবে আমি মোটেও অবাক হইনি। এটি ছিল ভারতের "প্রাদেশিক প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানের কার্যপদ্ধতির" সাথে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ। এটি নিজের অধস্তন সরকারি কর্মকর্তারা যা-ই করুক না কেন, সেদিকে দু-চোখ বন্ধ করে রাখার নীতি—যা জনপ্রিয়ভাবে 'অনুপস্থিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃক মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাকে অন্ধভাবে সমর্থন' করার নীতি হিসেবে পরিচিত। এটি এমন এক নীতি, যা ভারতের কর্মকর্তাদের যা খুশি তা-ই করতে উৎসাহিত করে, এই বিশ্বাসে যে তাদের অপরাধের মাত্রা যাই হোক না কেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের পূর্ণ সমর্থন দেবে। এই নীতির কারণেই স্যার জন হার্বার্ট প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানের দোহাই দিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের গুলিবর্ষণ এবং মেদিনীপুরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা রোমহর্ষক অভিযোগের তদন্ত করতে অস্বীকার করার সাহস পেয়েছিলেন।

এই নীতি একজন গভর্নরকে তার মন্ত্রীদের উপেক্ষা করার এবং একজন সচিবকে নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেয় যাতে তিনি পকেটে প্রচুর অননুমোদিত সরকারি অর্থ নিয়ে দুর্ভাগা মফস্বল এলাকায় এজেন্ট পাঠাতে পারেন, যেন তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো চাল কেনা-বেচা ও মজুত করে বিপুল মুনাফা লুটতে পারে, যখন এই দেশের সন্তানরা অন্নের অভাবে না খেয়ে মরছে। এটি এমন এক নীতি যা গভর্নরকে মন্ত্রীদের সাথে পরামর্শ করার আগেই প্রশাসনের উচ্চপদে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। এটি এমন এক নীতি যা সুযোগসন্ধানী মন্ত্রীদের গরিবের কুঁড়েঘরে তল্লাশির নামে সংগঠিত লুটতরাজ চালানোর অনুমতি দেয়, যদিও তারা ভালো করেই জানে যে গ্রামাঞ্চলে কোনো উদ্বৃত্ত চাল অবশিষ্ট নেই। এটি সেই নীতি যা একটি প্রতিক্রিয়াশীল সরকারকে সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ করতে এবং সরকারের সমালোচাকে দমন করতে সহায়তা করে। এটি এমন এক নীতি যা মন্ত্রীদের দায়মুক্তি দেয় যখন তারা জনমতকে উপেক্ষা করে এবং নিজেদের রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত সহযোগীদের বাণিজ্যে একচেটিয়া সুযোগ করে দেয়—যাতে তারা অঢেল সম্পদ পুঞ্জীভূত করতে পারে, যা পরে সরকারি বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহৃত হয়।

আমার পক্ষ থেকে তাই কর্তব্য এখন স্পষ্ট। আমাকে অবশ্যই এই পরিষদের কাছে বিস্তারিত সব ঘটনা বলতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারে এই বহু-ঘোষিত প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের অধীনে ভারত কীভাবে শাসিত হয়েছে। তবে আমি স্বীকার করছি যে, আজ এই পরিষদে আমার বিবৃতি দেওয়ার বিষয়টি গভীর ও উদ্‌বিগ্নের বিষয় ছিল। একদিকে, আমার পরিষদ ও দেশবাসীর কাছে কর্তব্য হলো পুরো ঘটনার আমার ভাষ্য পূর্ণাঙ্গ ও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা। এই কর্তব্য আরও বেশি জরুরি হয়ে পড়ে যখন দেখি গভর্নর ঘটনার নিজস্ব বয়ান প্রচার করছেন, যা আমি সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারছি না। অন্যদিকে, আমি উপলব্ধি করি যে গভর্নরের কাজের সমালোচনা না করে আমি আমার বক্তব্য দিতে পারছি না—যা মাঝে মাঝে প্রতিকূল এবং এমনকি তিক্ত ও অপ্রীতিকর হতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে, স্যার জন হার্বার্ট বা এই সাংবিধানিক নাটকের অন্য কুশীলবরা (যার বীভৎস বিবরণ আমি আজ উন্মোচন করতে যাচ্ছি) আমার কাছ থেকে কোনো দয়া পাওয়ার যোগ্য। ভারত যদি একটি স্বাধীন দেশ হতো এবং এই পরিষদ যদি সার্বভৌম পার্লামেন্ট হতো, তবে স্যার জন হার্বার্টকে অনেক আগেই কোনো নমনীয় জলবায়ুতে পাঠিয়ে দেওয়া হতো এবং ভারতের এই প্রধান প্রদেশের গভর্নর হওয়ার পরিবর্তে তাকে কম গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজে নিয়োগ দেওয়া হতো। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আজ স্যার জন হার্বার্ট সম্পর্কে আমি যা বলব তা কেবল প্রদেশের নির্বাহী প্রধান হিসেবে তার সরকারি কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে, তার চরিত্র বা আচরণের অন্য কোনো দিকের সাথে এর সম্পর্ক নেই। স্যার জন হার্বার্ট যেভাবে জালিয়াতির মাধ্যমে আমার পদত্যাগপত্র নামক ওই দলিলে স্বাক্ষর করিয়েছিলেন তার বর্ণনা দেওয়ার আগে, আমি মনে করতে চাই আমি স্যার জন হার্বার্টের সাথে দেখা হওয়ার আগে চারজন ধারাবাহিক গভর্নরের সাথে কাজ করেছি। এই প্রতিভাবান প্রশাসকদের মধ্যে প্রথম ছিলেন স্যার জন অ্যান্ডারসন। এরপর স্যার রবার্ট রিড এবং স্যার জন উডহেড—যারা দুজনেই আইসিএস-এর অত্যন্ত দক্ষ সদস্য ছিলেন এবং ইংল্যান্ড ও ভারতে তাদের উজ্জ্বল কর্মজীবনের পর বাংলার গভর্নরের উচ্চপদে আসীন হয়েছিলেন। প্রদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রশাসনের কঠিন কাজে এই গভর্নররা এবং অধস্তন কর্মকর্তারা আমাকে যেভাবে সহায়তা করতেন, সে সম্পর্কে আমার কেবল সুখস্মৃতিই রয়েছে। চতুর্থ যে গভর্নরের সাথে আমি কাজ করেছি তিনি ছিলেন প্রয়াত লর্ড ব্র্যাবোর্ন। এক গভর্নরের সাথে অন্যজনের তুলনা করা দৃষ্টিকটু হতে পারে, তবে আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি যে লর্ড ব্র্যাবোর্ন ছিলেন একজন ব্যতিক্রমী উচ্চমানের গভর্নর। জন্মগতভাবেই তিনি একজন ভদ্রলোক, সুনিপুণ রাষ্ট্রনায়ক এবং মার্জিত আচরণের সংস্কৃতিমান ইংরেজ ছিলেন। তিনি কঠোরতার সাথে সহমর্মিতার সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন এবং ভারতে আসা অন্যতম সফল প্রশাসক হিসেবে তাকে সর্বদা স্মরণ করা হবে। এই চার গভর্নরের সাথে কাজ করার সময় আমি কখনোই অনুভব করিনি যে ভারত শাসন আইনে 'গভর্নরের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা' (ডিসক্রেশন) বা 'ব্যক্তিগত বিচারবুদ্ধি' বা 'বিশেষ দায়িত্ব' বলে কিছু আছে। আমরা সবাই অনুভব করতাম যে মন্ত্রীপরিষদ এবং গভর্নর একটি দল হিসেবে কাজ করছেন যার একমাত্র লক্ষ্য হলো ন্যায়পরায়ণ, দক্ষ এবং জ্ঞানদীপ্ত প্রশাসন।

/জেড-এস/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মানবতাবিরোধী অপরাধে আওয়ামী লীগের ৭ নেতার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন এ সপ্তাহেই
মানবতাবিরোধী অপরাধে আওয়ামী লীগের ৭ নেতার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন এ সপ্তাহেই
এক দিনে ডেঙ্গুতে প্রাণ গেলো ৫ জনের, হাসপাতালে ভর্তি ২২১৮
এক দিনে ডেঙ্গুতে প্রাণ গেলো ৫ জনের, হাসপাতালে ভর্তি ২২১৮
আইনজীবীদের দ্বৈত পেশায় থাকার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট
আইনজীবীদের দ্বৈত পেশায় থাকার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট
প্যাকেটজাত খাবারে সতর্কবার্তা প্রচারে দুই মাসের ক্যাম্পেইন
প্যাকেটজাত খাবারে সতর্কবার্তা প্রচারে দুই মাসের ক্যাম্পেইন
সর্বাধিক পঠিত
একসঙ্গে ২৫ জেলে আটক, ৮০ কেজি ইলিশ গেলো এতিমখানায়
একসঙ্গে ২৫ জেলে আটক, ৮০ কেজি ইলিশ গেলো এতিমখানায়
ভোট দেওয়া নিয়ে অনুশোচনা ও বিএনপি সরকারের সমালোচনা করা নারী আটক
ভোট দেওয়া নিয়ে অনুশোচনা ও বিএনপি সরকারের সমালোচনা করা নারী আটক
‘আমার মৃত্যুর জন্য ইউএনও দায়ী থাকবে’ বলা এসিল্যান্ডকে প্রত্যাহার
‘আমার মৃত্যুর জন্য ইউএনও দায়ী থাকবে’ বলা এসিল্যান্ডকে প্রত্যাহার
মোটরযানের কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে জরুরি বিজ্ঞপ্তি
মোটরযানের কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে জরুরি বিজ্ঞপ্তি
মিয়ানমারের বিরল খনিজ রফতানিতে জোয়ার
মিয়ানমারের বিরল খনিজ রফতানিতে জোয়ার