শূন্যতাই পূর্ণতা 

শরতের সন্ধ্যায় পুরোনো বইয়ের দোকানের দোতলায় বসে আছি। আলো-আঁধারি পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছে ছোটোখাটো একটা জলসাঘর। ঘরের এক কোণে একটা টেবিলের ওপর হালকা লাল রঙের বাতি জ্বলছে। খুব কাছে গেলাম বাতিটার। দেখলাম পাশেই সাঁটানো আছে একটা ঐতিহাসিক ছবি। চারজন পুরোনো বন্ধুর তৈলচিত্রে চারজন গ্রিক দার্শনিক—সক্রেটিস, আগাথন, আরিস্তোফানেস আর আলসিবিয়াদেস। তাঁরা একটা মাঝারি সাইজের গোল টেবিলের চারপাশ ঘিরে বসে আছেন। দেখেই যেন আমি চিনতে পারলাম—ও, এত সেই প্লেটোর ‘সিম্পোজিয়াম’-এর বিখ্যাত বৈঠক। সেদিনকার আলাপের বিষয়বস্তু ছিল খুবই ইন্টারেস্টিং—‘প্রেম’। আজ বইয়ের দোকানটাতে এসে সেই মহাদর্শন যেন নতুন রূপ ধারণ করেছে। আজ তাদের আলোচনা প্রেমের সাধারণ সংজ্ঞা ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি তা হয়ে উঠেছে মহাজাগতিক, আবার মুহূর্তে স্পর্শ করেছে বাস্তবের মাটি।

আমি জলসাঘরের মতো বাতিজ্বলা ঘরটার মধ্যে এগুতেই দেখি টেবিলের চারটি চেয়ারে তিনজন বন্ধু বসে আছে। আর কোনো স্থান না পেয়ে, ইতস্তত আমি তাদেরই চোখের ইশারায় পাশের খালি চেয়ারটাতে বসে পড়ি। প্রথম প্রথম নিজেকে ‘কাবাবের হাড্ডি’ বলে মনে হলেও, কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের গভীর আলাপে মনোনিবেশ করতে পারলাম।

একজন বলছে, মানুষের জীবনে এমন প্রেম দেখেছি, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আরেকজন বলছে, প্রেমিক-প্রেমিকারা পরস্পরকে কখনো পায়, আবার কখনো কেউ কাউকে পায় না। অন্য আরেকজন বলছে, কেউ কেউ ভুলে যায়, কেউ হয়তোবা সারাজীবন বয়ে বেড়ায়। এই তিন সত্যের মাঝখানে থাকা আমি আপাতত কোনো জবাব দেই না। বরং তাদের ঘনিয়ে ওঠা আলাপটা মনোযোগের সাথে গিলতে থাকি।

এর মধ্যেই পানীয়ের অর্ডার হয়। তারা তিন বন্ধু পানে মত্ত হয়। আর আমি নির্বিকার, ধোঁয়া ওঠা কফিতে বারবার চুমুক দেই। কোন ফাঁকে যে আমরা নিজেদের মধ্যে ফানা হয়ে গেছি, টেরই পাইনি। রাত যে গভীর হয়েছে, সেটাও কেউ স্মরণ করিয়ে দেয়নি। অথচ এর মধ্যেই একেকজন ওই ছবির চরিত্র হয়ে উঠেছি। শুরু তারাই করেছিল, পরে দেখলাম, আমাকে ঘিরেই তাদের অতিরিক্ত উৎসাহ। তারা কথা বলছে আর আমার চোখের দিকে তাকিয়ে একটা মৃদু সায় প্রত্যাশা করছে। আর আমিও একরকম চোখের ইশারাতেই যেন ভাবনার মধ্যে প্রবেশ করছি। পরে আবার বুঝতে পেরেছি যে, শুধু চোখের ইশারায় সবকিছু বোঝানো সম্ভব নয়।

আরিফ কফিতে একটি চুমুক দিয়ে সাব্বিরের দিকে তাকাল। তারপর বলা শুরু করল, “সাব্বির, তুমি তো সবসময় বলো—প্রেম মানেই জয় করা, লাভ করা, তাকে উদ্‌যাপিত হতে দেওয়া। কিন্তু এমন এক অনুভূতির কথা ভাবো তো, যেখানে মানুষ যাকে চায়, তাকে কোনোদিন স্পর্শ করতে পারে না, রক্তে-মাংসের মানুষ হিসেবে তাকে চেনেও না, তবুও সারাজীবন সেই অধরা ছায়ার সঙ্গে কাটিয়ে যায় তার পরম যাপন।”

সাব্বির ভ্রূ কুঁচকে হাসল, “যে প্রেম মানুষকে কাছে আনে না, যে প্রেমে শরীরের সম্পর্ক নেই। যাতে সরাসরি অনুভূতির লেনদেন নেই, তা তো নিছক বিভ্রম, আরিফ। পাওয়ার মধ্যেই তো তৃপ্তি।”

পাশ থেকে তানভীর বলে উঠল, “না সাব্বির, মানুষের ভেতরে যে অপূর্ণতা, তা তো অনাদিকালের। আমরা সবাই আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া অর্ধেক অংশকে খুঁজে বেড়াই। কখনো কখনো সেই অর্ধেককে আমরা বাস্তবে পাই না। আবার কখনো হয়তোবা পাই, তবে তা শুধুই কল্পনায়।”

ঠিক এই সময় সুজন এক তরুণ লেখকের গল্প বলা শুরু করল। যে গল্পের আসলে কোনো নাম নেই—কিংবা হয়তো সব অপূর্ণ গল্পেরই নাম এক হতে হয়। ধরা যাক গল্পটির নাম ‘শূন্যতার গান’।

সুজন পাশের সোফায় হেলান দিয়ে সম্মানিত উপস্থিতিদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। তারপর বলল, “শূন্যতা বলতে তোমরা যা বোঝো, তা কিন্তু কেবল কোনো কিছুর অনুপস্থিতি নয়; শূন্যতা হলো সেই ব্যাকুল আবেদন, যা পূর্ণতার পথ সন্ধান করে।”

দর্শকদের নীরবতাকে সাক্ষী রেখে সে মূল গল্পে প্রবেশ করল— “শূন্য মানে তো কিছু না থাকা, তাই না? কিন্তু এই না-থাকার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে হারিয়ে যাওয়া অনুভবের প্রতিধ্বনি। ঠিক যেমন মেহরাব প্রথম যখন তিন্নিকে দেখেছিল, তখন সে ছিল খুবই চঞ্চল, স্বপ্নালু এক তরুণ—যাকে বলে পুরোদস্তুর জীবনপিয়াসী।”

তিন্নি শহরের এক কোণে গড়ে ওঠা পুরোনো লাইব্রেরির জানালার ধারে বসে বই পড়ত। মেহরাব প্রতিদিন তাকে দূর থেকে অবলোকন করত। যেন বাস্তব নয়, এক ছায়াবৃত মেয়ে তিন্নি। তাদের মধ্যে কথা হয়েছে খুব সামান্যই—হয়তো কেবল কোনো বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টানোর শব্দে, কিংবা দু চারটি বাক্য বিনিময়ে। রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে তিন্নি কেমন ছিল—তার রাগ, অনুরাগ, জটিলতা, দিনরাত্রির আলো-ছায়া—তার কিছুই মেহরাব জানতে পারেনি।

কিন্তু মেহরাব তাকে মনের গহিনে গড়ে তুলছিল আকাশকুসুম কল্পনায়। সেই তিন্নি ছিল এক নিষ্কলঙ্ক কবিতার মতো, শুভ্র এক আদর্শের ছবি। সে তাকে নিজের কল্পনার রঙে নিত্যই নতুন করে সাজাত। মেহরাব কখনো তাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়নি। আবার ব্যাকুলতা এলেও কী অদ্ভুত কারণে হাতটাও কখনো বাড়ায়নি। সে ছিল মেহরাবের সমস্ত লেখা ও সৃজনী কবিতা। তার চিন্তা ও প্রতিটি নিশ্বাসের নিঃশব্দ সহচর।

সময় গড়িয়ে যায়। তিন্নি একদিন অন্য কোনো শহরে চলে যায়, চিরতরে হারিয়ে যায় মেহরাবের জীবন থেকে। মেহরাব তাকে আর কখনো পায়নি। প্রথম জীবনের না-পাওয়ার সেই ব্যর্থতা তার ভেতর এক তীব্র যন্ত্রণা তৈরি করে। মনে পড়লেই হৃদয়ে সাংঘাতিকভাবে মোচড় দিয়ে ওঠে। প্রতিদিনের যাপনে তিন্নির অনুপস্থিতি মেহরাবকে ধূপের মতো পোড়ায়। রাত জেগে সে ভাবে, মানুষ এমন অপূর্ণ কেন? কেন সে এমনই অধরা, কেন কাউকে একান্ত নিজের করে পাওয়া যায় না? কেনই বা অতি যত্ন করে রাখা, পরম আকাঙ্ক্ষিত জিনিসটি হারিয়ে যায়?

সুজনের গল্প মাঝপথে থামিয়ে আরিফ প্রশ্ন করল, “সুজন, মেহরাব কি সত্যি তিন্নিকে ভালোবেসেছিল? নাকি সে ভালোবেসেছিল মনের ভেতরে থাকা নিখুঁত সৌন্দর্যকে, যা সে তিন্নির ওপর আরোপ করেছিল?”

তানভীর পেয়ালায় চুমুক দিয়ে মৃদু হেসে বলল, “সব মানুষই আসলে নিজের কল্পিত আদর্শ রূপকেই ভালোবাসে, আরিফ। তবে মেহরাবের এই না-পাওয়াটা কিন্তু তার জীবনকে থামিয়ে দেয়নি, বরং সে এই অপূর্ণতা নিয়েই ভালোভাবে বেঁচে রইল।”

সুজন আবার বলতে শুরু করল :

মেহরাব কিন্তু সেই নিঃসঙ্গতা নিয়ে বড়ো হতে থাকে। যৌবনের সেই তীব্র যন্ত্রণাময় দিনগুলো একসময় থিতু হয়। জীবনের চাকা ঘোরে, মেহরাব থিতু হয়, অন্য এক জীবন বেছে নেয়। সেই জীবন দায়িত্ব ও কর্তব্যে পূর্ণ হয়ে ওঠে।

তবে জীবনের এই সুদীর্ঘ পথচলায় মেহরাবের মন যে কেবল তিন্নিতেই আটকে ছিল, তা নয়। পথে চলতে চলতে আরও অনেকের সঙ্গেই তার পরিচয় হয়েছে। মানুষের হৃদয় তো বড়ো অদ্ভুত ও বিশাল—জীবনের ভিন্ন ভিন্ন মোড়ে এসে একাধিক মানুষকে ভালো লেগেছে মেহরাবের। কারও চোখের মমতা তাকে টেনেছে, কারও বুদ্ধিমত্তা তাকে মুগ্ধ করেছে, আবার কারও নিঃশব্দ উপস্থিতি তাকে শান্তি দিয়েছে। মানুষের মন বিচিত্র, তা একই মুহূর্তে অনুভূতির নানা বর্ণচ্ছটায় রাঙিয়ে যেতে চায়।

কিন্তু এই একাধিক মানুষকে ভালো লাগার মাঝেই মেহরাবের মন অন্যরকম এক গভীর খেলায় মেতে থাকত। অলক্ষ্যেই নিজের হৃদয় প্রতিনিয়ত বিচার আর বিশ্লেষণ চালাতে শুরু করত। যাকে আজ খুব সুন্দর মনে হয়, কাল তার কোনো ছোট জটিলতা বা খামখেয়ালিপনা দেখে পিছু হটে, মনটা একটুখানি থমকে যায়। সে সবসময় কাউকে মেলাতে চায় নিজের ভেতরে গড়ে ওঠা সেই নিখুঁত মাপকাঠির সাথে। সে বিচার করে—কে তার আত্মার কাছাকাছি, আর কে শুধুই ক্ষণিকের মোহ? কার ভেতরের আলো তাকে আলোকিত করে, আর কে-ই বা তার মনে বাইরের আলো ছড়িয়ে দেয়?

এই বিচার ও বিশ্লেষণের প্রক্রিয়া কখনোই থামেনি। একের পর এক মানুষ এসেছে, ভালো লেগেছে, আবার হৃদয় নিজের অজান্তেই মানদণ্ডে ফেলেছে। এই ধ্রুব হিসাব-নিকাশের মধ্য দিয়েই মেহরাবের এতদিনের জীবন গড়িয়েছে।

সময়ের নিয়মে মেহরাবের চোখে ভেসে ওঠে অভিজ্ঞতার রেখা। পরিণত বয়সে এসে মেহরাব যখন পেছন ফিরে তাকায়, তখন দেখে যে সেই পুরোনো ব্যাকুলতা বা যন্ত্রণার প্রায় অবসান ঘটেছে। তার বুকভাঙা কান্নার জায়গাটা দখলে নিয়েছে নিরুত্তাপ শান্ত ধ্যানী মেজাজের একটা মন।

মাঝে মাঝে মধ্যরাতে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে মেহরাব নিজেকে প্রশ্ন করে—“আমি যদি সেদিন তিন্নিকে পেতাম? যদি তাকে নিজের রক্তে-মাংসের জীবনে টেনে আনতাম, তবে কি আমি সুখী হতাম?”

প্রথমে উত্তর আসে, “হয়তো হতাম।” কিন্তু পরক্ষণেই এক গভীর অনুধাবন তাকে স্পর্শ করে। রক্তে-মাংসের জীবনের মধ্যে থাকে স্থূলতা, মান-অভিমান, সংসারের খুঁটিনাটি খিটমিট আর অনিবার্য ক্ষয়। যে-হৃদয়ে সারাজীবন ধরে অগণিত বিচার-বিশ্লেষণ চলেছে, সেই হৃদয় কি বাস্তবের কোনো রক্তে-মাংসের মানুষের প্রাত্যহিক ভুলত্রুটি সহ্য করতে পারত?

মেহরাব তো তিন্নিকে ভালোবেসেছিল অতীন্দ্রিয় সত্তা রূপে। সে ভালোবেসেছিল নিজেরই সৃষ্টি করা প্রতিমূর্তিকে, এক স্বর্গীয় অপ্সরাকে। তিন্নিকে বাস্তবে পেলে হয়তোবা সেই রূপকথার পৃথিবীটা চুরমার হয়ে যেত। রূপের মোহ কাটলে যে-বিচারক হৃদয় জেগে ওঠে, তা হয়তো তিন্নিকেও মেপে দেখতে শুরু করত। প্রাত্যহিকতার ঘর্ষণে স্বপ্নের সেই তিন্নি মলিন হয়ে যেত।

তাহলে কি না-পাওয়াটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড়ো সার্থকতা ছিল না? মেহরাব বুঝতে পারে, যাকে সে পায়নি, যাকে নিয়ে কোনোদিন বিচার-বিশ্লেষণের সূক্ষ্ম কাটাকুটি করতে হয়নি—সে অমর হয়ে আছে তার কল্পনায়। না পাওয়ার মধ্য দিয়েই তা পার্থিব সব মালিন্য ও তর্কের ঊর্ধ্বে উঠে এক অন্য উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে।

সাব্বির চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “কিন্তু এতে করে তো মানুষটা সারাজীবন একটা শূন্যতাকেই বয়ে বেড়ালো! বহু মানুষকে ভালো লেগেও আবার তাদের বিচার করে দূরে ঠেলে দেওয়া, আর এক না-পাওয়াকে আঁকড়ে ধরে থাকা—এই শূন্যতার মধ্যে সার্থকতা কোথায়, আরিফ?”

আরিফ শান্ত চোখে সবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “সাব্বির, এই বিচার-বিশ্লেষণ আর শূন্যতাই তো মানুষকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। মানুষ যখন কাউকেই আর বিচারে মাপে না, যখন সে পুরোপুরি তৃপ্ত হয়ে যায়—তখন তার অন্বেষণ থেমে যায়। কিন্তু মানুষের হৃদয় যতক্ষণ বিচার করে, তা আসলে পূর্ণতারই সন্ধান করে। এই যে একাধিক মানুষকে ভালো লাগা, তাদের মেপে দেখা, এবং শেষ পর্যন্ত কাউকেই সম্পূর্ণরূপে না পাওয়া—এই অপূর্ণতাই মানুষকে জীবনের নতুন নতুন তাৎপর্য খোঁজার প্রেরণা দেয়।”

আরিফ একটু থেমে সুজনকে বলল, “তোমার গল্পের মেহরাব পরিণত বয়সে এসে কী খুঁজে পেল?”

সুজন তার বেশ বড়ো উত্তর দিলো—

মেহরাব বুঝতে পারল যে, জীবনের আসল সৌন্দর্য মোটেও নিজের করে ‘পাওয়া’র মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই যে অগণিত ভালো লাগা, হৃদয়ের নিরন্তর বিচার-বিশ্লেষণ, এবং সবশেষে না-পাওয়ার যে বেদনা—সেটাই তাকে সংবেদনশীল করেছে, তাকে জীবনের অন্য গভীর মানে খুঁজতে শিখিয়েছে। সে উপলব্ধি করল, শূন্যতা কেবল খালি জায়গা নয়; শূন্যতা হলো মহাসমুদ্র, যার ভেতরে সৃষ্টির সমস্ত বীজ লুকানো থাকে।

মানুষ জন্মায় একাকী, আর সেই একাকিত্ব বা শূন্যতা থেকেই সে জীবনের অর্থ খুঁজতে শুরু করে। একাধিক মানুষকে ভালো লাগার মধ্য দিয়ে সে নিজের চেতনার বিভিন্ন দিককে আবিষ্কার করে, আর বিচার-বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে সে নিজের সীমানা চিনতে শেখে। এই পথচলাটাই হলো প্রকৃত বেঁচে থাকা। শূন্যতা আসে, মেঘের মতো ধেয়ে এসে হৃদয়কে আচ্ছন্ন করে, আবার তা মিলিয়ে যায়। কিন্তু সেই শূন্যতার ভেতর দাঁড়িয়ে পুনরায় বেঁচে থাকার মানে খোঁজার যে অসীম তাগিদ—সেখানেই মানুষ তার পূর্ণতা লাভ করে।

মনে হলো সুজনের গল্পটা আর মেহরাবে আটকে নেই, সেখান থেকে অন্যকিছুতে প্রবেশ করেছে।

সুজনের গল্প শেষ হলে ঘরে কিছুক্ষণের জন্য নিবিড় নীরবতা নেমে এলো।

জলসাঘর রূপী বইয়ের দোকানের বাতিটা আরও কিছুটা নিভে এসেছে। চারজনের মধ্যে সেই মুহূর্তে আর কোনো তর্ক নেই। সাব্বিরকে একটু উত্তেজিত মনে হয়েছিল। কিন্তু নিজের ভেতরের কোনো এক গোপন হারানো অতীত ও হৃদয়ের পুরোনো হিসাব-নিকাশ ছুঁয়ে সে-ও স্তব্ধ হয়ে গেছে।

আরিফ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরের আকাশে তখন অনন্ত নক্ষত্ররাজি জ্বলছে।

সে বলল, “মানুষ ভেবে নেয় যে, সে কোনো রক্তে-মাংসের মানুষকে পেয়ে সুখে শান্তিতে থাকবে। কিন্তু আসল কথা হলো, মানুষের প্রকৃত ব্যাকুলতা তো সেই অধরা চিরন্তন সৌন্দর্যের জন্য। যা কোনো সসীম শরীরে বা কোনো বিচার-বিশ্লেষণের অধীন নয়। মেহরাব যাকে তিন্নি বলে জেনেছিল, তা আসলে ছিল সেই পরমসৌন্দর্যের ক্ষণস্থায়ী আলোক রেখা।”

সে তাদের দিকে ফিরে আবার বলল, “পরিশেষে, জীবনের সমস্ত হিসাব-নিকাশ, হৃদয়ের সমস্ত মেলা-মেশা ও বিচার, সমস্ত প্রেম আর না-পাওয়ার গল্পের শেষে একটা জিনিসই টিকে থাকে—তা হলো আধ্যাত্মিক শূন্যতা। এই শূন্যতা কোনো হতাশা নয়, কোনো দেউলিয়াপনাও নয়। এটি মানুষের সেই চিরন্তন অনুভব, যা তাকে মনে করিয়ে দেয়—সে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অংশ, কিন্তু সে অপূর্ণ। মানুষ সারাজীবন প্রেম শেখে, একাধিক রূপকে ছুঁয়ে অরূপের দিকে যাত্রা করে, বিচার করে থামে, আবার পথ হাঁটে। সে কাউকে খোঁজে, কাউকে পায় না, কিন্তু এই না-পাওয়ার শূন্যতাকে বুকে ধারণ করে পথ চলতে চলতেই সে নিজের আত্মাকে চিনতে পারে।”

আরিফের কথাগুলো যেন উড়ন্ত পাখি, বাতাসের সঙ্গে মিশে গেল। বইয়ের দোকানে আড্ডারত চারজনই বুঝল, এই মরমি শূন্যতাই মানুষের সবচেয়ে বড় সত্য। জীবনের সব প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি, আর বিচারের হিসাব মুছে যাওয়ার পরও এই শান্ত, গম্ভীর, চিরন্তন শূন্যতাটুকু রয়ে যায়। মানুষের অস্তিত্ব তখন সবচেয়ে গভীর হয় আর খাঁটি অনুভবের অতলে ডুবে যায়।

এই বুঝতে বুঝতে জীবনের একটা পরমার্থিক আলো তারা দেখতে পায়।

রঙিন বাতিজ্বলা ঘরটির আলোকশিখা নিভে আসে, আর বাইরের পৃথিবী মেতে ওঠে দীপ্ত আলোর উৎসবে। তাদের নেশার খোঁয়ারিও কেটে যায়। তারা বাইরে তাকিয়ে দেখে সকালের আলো ফুটছে। জানালার পর্দা ভেদ করে তা ঘরের ভেতরে ঢুকছে।

এর মধ্যেই বইয়ের দোকানি আসে। তাদেরকে একটু বাইরে যেতে অনুরোধ করে। দোকানটা পরিষ্কার করে সেদিনের জন্য আবার প্রস্তুত করতে হবে।

তারা এতক্ষণ বোঝেইনি—কখন রাত কাবার করে ফেলেছে! কখন যে তারা একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল তাও টের পায়নি।

তবে তারা একে অপরের দিকে তাকায়, বুঝতে ভুল হয় না—কে কোন চরিত্রে ভর করেছিল সারারাত। আরিফ রূপান্তরিত হয়েছিল সক্রেটিসে, সুজন হয়েছিল আগাথন, তানভীর হয়েছিল আরিস্তোফানেস, আর সাব্বিরের মধ্যে ভর করেছিলেন আলসিবিয়াদেস।

তারা পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে। গতরাতের পাগলামির জন্য একটা হাসির রোল পড়ে যায়।

তারপর আবার যেন একটা শূন্যতা ভিড় করে তাদের মধ্যে। তারা একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সবার মধ্যে তখন বাড়ি ফেরার তাগাদা।