সুকুমার রায়ের ‘হযবরল’ কি নির্দিষ্ট কোনও দেশের কথা ভেবে লেখা?

গল্পের শুরুটা পড়তে গিয়ে প্রথমেই মনে হতে পারে—এ কী! আগা-মাথাহীন, অদ্ভুত এক জগৎ! নামের মতোই যেন সবকিছু হ-য-ব-র-ল। কিন্তু যত গল্পের গভীরে প্রবেশ করা যায়, ততই এই উদ্ভট জগতের সঙ্গে মিলে যেতে থাকে চেনা চারপাশের নানা দৃশ্য।

সুকুমার রায়ের ‘হযবরল’ শুরু হয়েছে এভাবেই— ‘বেজায় গরম। গাছতলায় দিব্যি ছায়ার মধ্যে চুপচাপ শুয়ে আছি, তবু ঘেমে অস্থির। ঘাসের উপর রুমালটা ছিল, ঘাম মুছবার জন্য যেই সেটা তুলতে গিয়েছি অমনি রুমালটা বলল, ‘ম্যাও!’ কি আপদ! রুমালটা ম্যাও করে কেন? চেয়ে দেখি রুমাল তো আর রুমাল নেই, দিব্যি মোটা-সোটা লাল টক্‌টকে একটা বেড়াল গোঁফ ফুলিয়ে প্যাট্‌-প্যাট্ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।’

শুরুর এই অদ্ভুতুড়ে দৃশ্য থেকেই পাঠক প্রবেশ করেন এক অসম্ভবের জগতে। সেখানে রুমাল বিড়াল হয়ে যায়, হিসাবের উত্তর সময়ের সঙ্গে বদলে যায়, আর বিচারসভায় ন্যায়বিচারের চেয়ে শব্দের মারপ্যাঁচ ও অদ্ভুত যুক্তির দাপট বেশি।

‘হযবরল’ বাংলা সাহিত্যের অসামান্য এক অর্থহীনতার গল্প। তবে এর অর্থহীনতা নিছক হাস্যরসের উপকরণ নয়। উদ্ভট কল্পনা, শব্দের খেলা আর অসংগতির আড়ালে সুকুমার রায় তুলে ধরেছেন সমাজের প্রচলিত যুক্তি, কর্তৃত্ব, বিচারব্যবস্থা ও ক্ষমতার নানা অসংগতি। গল্পটি যতই কল্পনার জগতে বিচরণ করুক, তার ব্যঙ্গের লক্ষ্য অনেকটাই বাস্তব।

যুক্তির নামে অযৌক্তিকতার প্রতিষ্ঠা

গল্পের চরিত্ররা এমন সব যুক্তি হাজির করে, যা শুনতে আপাতদৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য মনে হলেও একটু ভাবলেই তার অসারতা ধরা পড়ে। যেন সত্য প্রতিষ্ঠা নয়, যেকোনোভাবে নিজের কথাকে সঠিক প্রমাণ করাই তাদের উদ্দেশ্য।

এক জায়গায় সাত দুগুণে চোদ্দ হয় কি না, তা নিয়ে কাকের সঙ্গে কথকের তর্ক হয়। কাকের বক্তব্য, হিসাব করতে সময় লাগে বলে সাত দুগুণে চোদ্দ সব সময় থাকে না। তার ভাষায়, ‘তোমাদের দেশে সময়ের দাম নেই বুঝি।’

এ যুক্তি হাস্যকর, কিন্তু এর মধ্য দিয়ে একটি পরিচিত প্রবণতাও ধরা পড়ে—নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে যুক্তির নামে কীভাবে অযৌক্তিকতাকেও প্রতিষ্ঠা করা হয়। এখানে হিসাবের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে হিসাব বোঝানোর কৌশল।

কর্তৃত্ব ও বিচারব্যবস্থার প্রহসন

গল্পের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ব্যঙ্গগুলোর একটি দেখা যায় বিচারসভার পর্বে। সেখানে সত্য উদ্‌ঘাটন কিংবা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চেয়ে নিয়মের অদ্ভুত প্রয়োগ, শব্দের অপব্যাখ্যা এবং ক্ষমতার প্রদর্শনই মুখ্য হয়ে ওঠে।

মানহানির মামলায় কুমির আইনজীবী হিসেবে ‘মান’ শব্দের অর্থ বোঝাতে গিয়ে বলে, “মান মানে কচু।” এরপর মানকচু, ওলকচু, কান্দাকচু থেকে শুরু করে কচুর নানা প্রকার নিয়ে দীর্ঘ ব্যাখ্যা হাজির করে। অন্যদিকে শেয়ালও কচু নিয়ে নিজের বক্তব্য দিতে থাকে। অথচ যে অভিযোগের বিচার হওয়ার কথা, তা ক্রমেই হারিয়ে যায় শব্দের অর্থহীন বিতর্কে।

এই বিচারসভা যেন এমন এক ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি, যেখানে আইন ও নিয়মের উপস্থিতি থাকলেও ন্যায়বিচার অনুপস্থিত। বিচারপ্রক্রিয়া হয়ে ওঠে প্রহসন; আর সত্যের জায়গা দখল করে নেয় ক্ষমতাবানদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা।

ভাষা, ক্ষমতা ও বাস্তবতার উলটপালট

‘হযবরল’ শব্দটিই আজ বিশৃঙ্খলা, এলোমেলো অবস্থা কিংবা অসংগতির প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছে। গল্পে সুকুমার রায় ভাষার প্রচলিত অর্থকে ভেঙেছেন, যুক্তির স্বাভাবিক ধারাকে উল্টে দিয়েছেন। ফলে অর্থহীন কথাও সেখানে নিয়মের মতো প্রতিষ্ঠিত হয়, আর স্বাভাবিক প্রশ্ন হয়ে ওঠে অস্বাভাবিক।

গল্পটিকে শিশুর কল্পনাশক্তি ও স্বাধীন চিন্তার এক অনন্য প্রকাশ হিসেবেও দেখা যায়। তবে এর পাঠ কেবল শিশুমনের আনন্দে সীমাবদ্ধ নয়। বরং বড় হয়ে গল্পটি পড়লে এর ব্যঙ্গের নানা স্তর আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রচলিত নিয়মকে প্রশ্ন করা, কর্তৃত্বের সামনে যুক্তি খোঁজা এবং প্রতিষ্ঠিত সত্যের অসংগতি শনাক্ত করার এক ধরনের প্রেরণা পাওয়া যায় এখান থেকে।

কোনো নির্দিষ্ট দেশের গল্প নয়

তাহলে ‘হযবরল’ কি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা সমাজকে সামনে রেখে লেখা? গল্পের ঘটনাপ্রবাহ ও চরিত্রগুলোর ভিত্তিতে একে নির্দিষ্ট কোনো দেশের প্রতিচ্ছবি বলে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। বরং এর ব্যঙ্গের পরিসর আরও বিস্তৃত। যে সমাজেই যুক্তির বদলে অযৌক্তিকতা, ন্যায়ের বদলে নিয়মের অপপ্রয়োগ কিংবা জবাবদিহির বদলে ক্ষমতার দাপট প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানেই ‘হযবরল’-এর জগৎকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

সুকুমার রায় কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ছবি আঁকেননি; তিনি নির্মাণ করেছেন এক উলটপালট জগৎ, যার আয়নায় বাস্তব সমাজের অসংগতি ও ভণ্ডামি ধরা পড়ে। তাই ‘হযবরল’ শুধু শিশুদের কল্পনার গল্প নয়, বড়দের জন্যও এক ব্যঙ্গাত্মক পাঠ। হাসতে হাসতে যে গল্প পাঠককে প্রশ্ন করতে শেখায়—আমাদের চারপাশের সবকিছু কি সত্যিই ততটা যুক্তিসংগত, যতটা আমরা মনে করি?