দোষ স্বীকার করে নেওয়ার অর্থ পরাজয় নয়
যুবক: ঠিক আছে। তাহলে, সামনাসামনি ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণের শিকার হলে আপনি কী করবেন? আপনি কি দন্ত বিকশিত করে হাসবেন এবং সহ্য করবেন?
দার্শনিক: না। সহ্য করার এই মানসিকতা প্রমাণ করে যে, তুমি এখনও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মধ্যেই আটকে আছ। তোমাকে যখন কোনো লড়াইয়ে আহ্বান জানানো হয় এবং তুমি বুঝতে পারো এটি আসলে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, তাহলে যত দ্রুত সম্ভব সেখান থেকে কেটে পড়। এই ক্রিয়ার বিপরীতে প্রতিক্রিয়া দেখাতে যেও না। এ ক্ষেত্রে এটিই একমাত্র কাজ যা আমরা করতে পারি।
যুবক: কিন্তু প্ররোচনায় আত্মসংবরণ করা কি এতই সহজ? প্রথমে বলুন, রাগ নিয়ন্ত্রণ করব কীভাবে?
দার্শনিক: তুমি রাগ নিয়ন্ত্রণ করছো, যার অর্থ হলো তুমি এটিকে মেনে নিয়েছ, তাই না? চলো, রাগের অনুভূতির পরিবর্তে বিষয়টি সমাধানের অন্য একটি উপায় শিখে নেই। সর্বোপরি রাগ হলো একটি হাতিয়ার, লক্ষ্য অর্জনের একটি উপায়।
যুবক: খুবই ঘোরালো-প্যাঁচালো লাগছে!
দার্শনিক: প্রথম বিষয় হলো—আমি চাই তুমি এই সত্যটি অনুধাবন কর যে, রাগ হলো এক ধরনের যোগাযোগের মাধ্যম। তবে, রাগকে ব্যবহার না করেও এই যোগাযোগ সম্ভব। রাগের কোনো ব্যবহার ছাড়াই আমাদের চিন্তা-ভাবনা ও ইচ্ছেগুলোকে প্রকাশ করা সম্ভব এবং তা অন্যদের দ্বারা গৃহীতও হতে পারে। তুমি যদি নিজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিষয়টি বুঝতে শেখ, তবে রাগের অনুভূতি তৈরি হওয়া একসময় আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে যাবে।
যুবক: কিন্তু কেউ যদি মিথ্যা অভিযোগ করে বা অপমানজনক মন্তব্য করে? তখনও কি রাগ করা উচিত নয়?
দার্শনিক: মনে হচ্ছে বিষয়টি এখনও বুঝতে পারোনি। এটি এমন নয় যে, তোমার রাগ হবে না; তবে, রাগের উপর নির্ভরশীল হওয়ার প্রয়োজন নেই। রাগী বা মেজাজি মানুষের অল্পতেই রেগে যাওয়ার প্রবণতা থাকে না—বরং তারা জানে না যে, রাগ ছাড়াও যোগাযোগের কার্যকর উপায় রয়েছে। এজন্য মানুষ প্রায়ই বলে, ‘আমি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললাম’ বা ‘সে প্রচণ্ড রেগে গেল’। শেষ পর্যন্ত আমরা রাগকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়ে যাই।
যুবক: রাগ ছাড়া কার্যকর যোগাযোগের অন্য উপায়?
দার্শনিক: আমাদের ভাষা রয়েছে। আমরা ভাষার মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারি। ভাষার ক্ষমতা এবং যুক্তির ভাষায় আস্থা রাখ।
যুবক: অবশ্যই, ভাষায় বিশ্বাস না রাখলে আমাদের এই সংলাপই সম্ভব হতো না।
দার্শনিক: ক্ষমতার দ্বন্দ্ব সম্পর্কে আরেকটি বিষয় রয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেকে যতই সঠিক মনে কর না কেন, তার ওপর ভিত্তি করে প্রতিপক্ষকে সমালোচনার চেষ্টা না করা। এটি হলো একটি ‘আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের ফাঁদ’—অনেক মানুষই যে-চক্রে ধরা খেয়ে থাকে।
যুবক: তা কেন?
দার্শনিক: আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে-মুহূর্তে একজন নিজের সঠিকতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে, ঠিক সে-সময় থেকে নিজের অজান্তেই সে ক্ষমতার লড়াইয়ে মধ্যে ঢুকে পড়ে।
যুবক: কেবল নিজেকে সঠিক মনে করার কারণে? একদমই না, এটা তো বিষয়টিকে পুরোপুরি অতিরঞ্জিত করা।
দার্শনিক: আমি ঠিক—এর মানে হলো অপর পক্ষ ভুল। ঠিক এখানেই আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ‘যুক্তির সঠিকতা’ থেকে ‘আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্কের অবস্থা’তে পরিবর্তিত হয়। অন্য কথায়, ‘আমি ঠিক’ এই বিশ্বাস থেকে ‘অপর ব্যক্তি ভুল’ ধারণাটি তৈরি হয়। শেষে এটি একটি প্রতিযোগিতায় পরিণত হয় যেখানে তুমি ভাবতে থাক, ‘আমাকে জিততেই হবে’। এটি তখন নিতান্তই একটি ক্ষমতার লড়াইয়ে পরিণত হয়।
যুবক: হুম্!
দার্শনিক: প্রথমত, কারও যুক্তির সঠিকতার সঙ্গে জয় বা পরাজয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। যদি নিজেকে সঠিক মনে হয়, তবে অন্যদের মতামত যাই হোক না কেন, তাৎক্ষণিকভাবেই বিষয়টি শেষ করে দেওয়া উচিত। তবে, অনেকেই ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন এবং অন্যদের আত্মসমর্পণ করাতে চেষ্টা করেন। আর ঠিক এজন্যই তারা ‘ভুল স্বীকার করা’কে ‘পরাজয় স্বীকার করা’ বলে মনে করেন।
যুবক: হ্যাঁ, নিশ্চয়ই এখানে এমন একটি দিক রয়েছে।
দার্শনিক: হেরে যাওয়ার ভয় থেকে মানুষ নিজের ভুল স্বীকার করতে পারে না, ফলে শেষ পর্যন্ত তাঁরা ভুল পথ বেছে নেয়। ভুল স্বীকার করা, ক্ষমা চাওয়া এবং ক্ষমতার লড়াই থেকে সরে আসা—এগুলোর কোনোটিই পরাজয় নয়। শ্রেষ্ঠত্বের সাধনা আসলে এমন কিছু নয় যা অন্যদের সঙ্গে কোনো প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অর্জন করা যায়।
যুবক: তাহলে ব্যাপারটি দাঁড়াচ্ছে যে, চিন্তাভাবনা যখন কেবল জয়-পরাজয়ের মধ্যেই ঘুরপাক খেতে থাকে, তখন সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য লোপ পায়, তাই কি?
দার্শনিক: হ্যাঁ। এটি তোমার বিচার-বিবেচনাবোধকে অস্পষ্ট করে তোলে। তখন তোমার চোখে শুধু আসন্ন জয় বা পরাজয় ভাসতে থাকে। ফলে তুমি ভুল পথ বেছে নাও। যখন প্রতিযোগিতা এবং জয়-পরাজয় থেকে আমাদের দৃষ্টি সরিয়ে নিতে সক্ষম হই, তখনই কেবল নিজেদের সংশোধন ও পরিবর্তন করতে শুরু করতে পারি।