অরণ্যপুত্র

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্যnoname

বাংলা আর ভাগলপুরের গ্রামগুলি সীমানা ঘেঁষাঘেঁষি, ভাগলপুরের অনেক মানুষ কাজের সন্ধানে এসেছে কলকাতায়। মুর্শিদাবাদ এখন অচল, তার রূপ নষ্ট হয়ে গেছে পলাশীর যুদ্ধের পর। ইংরেজ রাজ প্রতিষ্ঠা হয়েছে, তার হুকুমতে অরণ্যে নতুন আইন-কানুন জারি। বিদ্রোহী সাঁওতালদের নেতা বাবা তিলকা মাঝি। এই কাহিনি রটল, বাজলো, উড়ে গেল অন্যান্য বিদ্রোহীদের কানে এবং বিদ্রোহী দমনপীড়ন রাজমহলে।
শেষ দৃশ্যের ভাগলপুর—১
ভাগলপুরে একটি স্থান তৈরি করা হলো তিলকাকে সেই স্থানে জনসম্মুখে চাবুক মারা হবে। পৈশাচিক হাসি হেসে তিলকার শরীরে চাবুক পেটানো ইংরেজের দম্ভ যেন কমে না বরং তার অহঙ্কারে গর্বে বুকের সিনা ফুলে উঠছিল প্রতিশোধ আর বিদ্রোহী দমনের খুশিতে। কে তিলকাকে অমনভাবে পেটাচ্ছিল, আনন্দ উপভোগ করছিল ইতিহাস ঘেটে তার নাম পাওয়া গেল না।
এইবার কী ক্ষান্ত! মদের নেশা পাওয়ার মতো আরেক কুচক্রী ইংরেজ এসে বলল, এইভাবে শালা মরবে না, তাকে ঘোড়ার সঙ্গে বাঁধা হোক।

শেষ দৃশ্যের ভাগলপুর—২
ঘোড়া যখন ছোটানো হল, তখনো তিলকা তার চোখে দেখছে ভাগলপুর শহরের নির্বিকার মানুষের মূর্তি। তবুও তার মনে নেই একবিন্দু অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাওয়া। বরং সে চায় তার রক্ত এই দেশের মাটিতে মিশে যাক, অরণ্যে মিশে যাক মৃত্যুপরবর্তী সকল বৃক্ষের চারা তার রক্তে উর্বর হয়ে জন্ম নেবে। এইখানে তিলকা গর্ব অনুভব করে, তার রক্তাক্ত মুখে যে বিষম যন্ত্রণা তা ছুটন্ত ঘোড়ার চাইতেও বেগবান আর গতিময়।

শেষ দৃশ্যের ভাগলপুর—৩
আহা! ভগবান কি মরে গো। স্বজাতির বিলাপ আকাশকে ঝাঁকিয়ে তুলল। এ শালা কৈ মাছের প্রাণ, এক ইংরেজ এই কথা চেঁচিয়ে বলে উঠল। অবশেষ তিলকার ফাঁসির মঞ্চ তৈরি হলো এবং শোষণের কালো দড়িতে তিলকার প্রাণ গেল সেই বর্ষার শেষে।

শেষ দৃশ্যের ভাগলপুর—৪
গ্রীষ্মের শুরু থেকেই অরণ্যে এক পুনর্জন্মের তোড়জোড় যজ্ঞের সিদ্ধান্ত পাকা হচ্ছিল। বৃদ্ধ সাঁওতাল মুড়ল বাবা তিলকা মাঝির জন্য এই যজ্ঞ অনুষ্ঠানের ক্রিয়া কার্য করছেন, বর্ষার শেষে এই অনুষ্ঠান হবে। আপনাদের জানিয়ে রাখা ভালো, তারা যজ্ঞের মন্ত্র বদলে ফেলেছিল বাবা তিলকা মাঝির স্মরণে এবং অরণ্যে তাদের অধিকার পুনরায় প্রতিষ্ঠার লক্ষে। কী সেই মন্ত্র!

‘স্ত্রী পুত্রের জন্য, জমি-জায়গা বাস্তুভিটা আর অরণ্যের জন্য। হায়! হায়! এ মারামারি, এ কাটাকাটি কী গো—মহিষ লাঙল ধন-সম্পত্তির জন্য, পূর্বের মতো আবার ফিরে পাবার জন্য আমরা বারবার বিদ্রোহ করব।’
শেষে হঠাৎ রে রে ধ্বনি উঠল জ্যায় বাবা তিলকা মাঝিকা জ্যায়!
তারপর শোঁ শোঁ শব্দ তুলে বৃষ্টি নামল। আশ্চর্য সবাই বৃষ্টিতে ভিজছে আর ভেজা ঝাপসা দৃষ্টিতে যজ্ঞের নিভে যাওয়া আগুন দেখছে। এই তাদের বিদ্রোহী বছরের শেষ বৃষ্টি-দেখা দিনগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল।