ঘর

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্য

nonameফারিহা মেয়েটাকে বিপুলের খারাপ লাগার কোনো কারণ নেই, ছিমছাম শ্যাম বর্ণের মেয়ে। টানা টানা চোখ, নরম গোলাপি চিকন ঠোঁট। তিন মাস হয় তাদের বিয়ে হয়েছে। অফিসের ব্যস্ততা কিংবা ব্যক্তিগত উৎসাহের অভাবে খুব একটা ভাব হয়ে ওঠেনি এখনো তাদের। আর এরমধ্যেই চলে এলো এই মহামারির কাল। কে জানতো এভাবে হুট করে ফারিহার সঙ্গে তাকে একা হতে হবে। মেয়েটার সবকিছুই কেমন যেন, শান্ত সৌম্য, অনেকটা পূজা দেয়া প্রতিমার মতো। ঘরের কাজ-কর্ম যতটা সম্ভব গুছিয়ে করে, রাতজাগা কফি খাওয়ার মতো স্বাভাবিক অভ্যাসগুলোতে সে নির্লিপ্ত। করোনার ছুটিতে স্কুলে ক্লাস নিতেও যেতে হয় না। এই কটা দিনেই ঘরটাকে কেমন স্বর্গীয় ইমেজ বানিয়ে রেখেছে সে। দেয়ালে দেয়ালে লতানো সবুজ পাতা, বারান্দায় টিয়াটার মুখে স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জণবর্ণ, অ, আ, উ। বইয়ের তাকে সাজানো সব কবিতা। স্বপ্ন স্বপ্ন সব। সময় সময় ফারিহার এইসব ভালত্বে বিপুল হা হয়ে তাকিয়ে থাকে, মেয়েটা কি মানুষ! তারপর কাউকে বলা যায় না, কাউকে বোঝানো যায় না এমন একটা দমবন্ধ অনুভূতি ভাতের সঙ্গে রুটির সঙ্গে গিলে চুপসে যায় সে। ফারিহা বোঝে না বিপুলের সমস্যাটা কোথায়। বিপুল কখনো আগ বাড়িয়ে কিছুই বলে না, চায়ও না কিছু। নিজেকে কেমন অসহায় ব্যর্থ লাগে তার। শহরে-নগরে হুট করে লকডাউন হয়ে যাওয়ায় ফারিহার ভেতরে ক্ষীণ আশা ছিল গৃহবন্দি এই সময়টাকে মনবন্দি করার। যদিও এই বিয়েটা তার প্রেমের নয়, কোনো একটা কারণে ফারিহার মা বিপুলের প্রতি অন্ধ।

মায়ের পছন্দেই বিয়ে। তাছাড়া বিপুলের আগের বউ নিশির মতো জুড়েও বসেনি সে, ফারিহা ছাড় দেয়া মানুষ, না হয় কোন ঠেকায় বিপুলের মত এমন সাত আট বছরের বড় ডিভোর্সড কাউকে বিয়ে করে সে। সে কি দেখতে খারাপ না অযোগ্য? দোষ হোক বা গুণ হোক তার একটাই সমস্যা সে কথা কম বলা মানুষ।

বিপুল যে ফারিহার এইসব আত্মত্যাগ, অযাচিত স্নেহ বা করুণা বোঝে না, তা নয়। তবুও কেমন যেন লাগে, ঘরে ফিরতে ইচ্ছে হয় না আগের মত। দীর্ঘদিনের অভ্যাস বশে এখনো রিমোট নিয়ে আতঙ্কে থাকে এই বুঝি কেউ একজন ছুটে আসবে হা রে রে করে। কেউ আসে না। জোর করে কেউ কেড়ে নেয় না হাতের বই বা সিগারেট। চ্যানেল পাল্টায় না কেউ, গান বাজে না এলোমেলো জোরে, পার্টিতে গেলে উৎকট সাজপোশাকে সঙ্গে যায় না কেউ। রাস্তায় বিশ্রী চিৎকারে গলাবাড়িয়ে ঝগড়া টেনে আনার মানুষটা নেই তার। কিচ্ছু নেই কোথাও। হুল্লোড় করবে না কেউ, বন্ধু জড়ো করে হাসবে না কেউ। এলোমেলো বেতাল নাচবে না কেউ। অথচ ফারিহার বয়স নিশির চেয়ে দু’বছরের কম। তাহলে নিশি কেন এত অবুঝ ছিল! পান থেকে চুন খসলেই এখন আর বিপুলের কানের পর্দা ফাটে না। এটা হয় না, ওটা হয় না। ঝগড়া হয় না, প্রেম হয় না। সন্দেহের আগুনে পুড়িয়ে ছাই হয় না সুখ। কেউ নেই ছেলেমানুষী করার। ফারিহার পাশে নিশিকে মানায় না একদম। ও ছিল অনেকটাই ব্যাটা ছেলে টাইপ। ফারিহা চমৎকার। হয়তো নিশির পাশাপাশি দেখে বলেই বেশি বেশি লাগে তার।

নিশি মেয়েটা চলে গিয়ে তাকে স্বস্তি দিয়েছে খুব, প্রতিবেলা খেতে বসলেই বিপুল আলগোছে তাকায় ডানহাতের কব্জিতে, সেখানে নিশির বড় বড় নখের খামচির দাগ, বড্ডবুনো। মাঝে মাঝে বিপুল নিজে নিজেই হাসে এই কোয়ারেন্টাইন দিনে ফারিহা না হয়ে ওর পাশে নিশি থাকলে কয়টা বাসন ভাঙতো আর কয়টা বই উড়ে যেত জানালার রেলিং ধরে ঐ সুদূরে, সে কেবল নিশির সৃষ্টিকর্তাই জানে। বিপুল নিজেকে বোঝায়, যাক ফারিহাই ভালো, খুব বেশি ভালো, ওর মাছের ঝোল পানসে লাগে লাগুক, রুটিগুলো বেশি গোল লাগে লাগুক। কফি তেঁতো কি মিষ্টি হয় হোক। ফারিহা ভালো, খুব ভালো, অনেক ভালো।

অতঃপর এই ভালো ভালো অনুভূতি নিয়ে বিপুল ড্রয়িংরুমের সোফায় ঠ্যাঙ ছড়িয়ে ঘুমায় আর ফারিহা শোবার ঘরে দূর জানালায় তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে তার জীবনটা এমন হলো কেন!