পাকস্থলী

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্যnonameদৃষ্টির সীমানা যতদূর তার সব মুখস্ত। সামনের রাস্তাটা। ঠাসাঠাসি দালানের ফাঁকে বাড়তে থাকা গাছটা। সামনের বিল্ডিংয়ের পানি নামা লোহার ফাটা পাইপটা। যেটাতে স্যারস্যার করে আওয়াজ হয়। ডানদিকে বিল্ডিংয়ের পাঁচতলার ভাঙা ভেন্টিলেটরের ফাঁকে পাখির বাসা। লোহার ফাটা পাইপওয়ালা যে বিল্ডিং, তার তিনটা পরের বিল্ডিংয়ের ব্যালকনিতে মানে আমার ব্যালকনির সোজাসুজি যে ব্যালকনি সেখানে যিনি আসতেন(সেই রূপবতীর রূপ বহুকাল ভুলব না বলে মনে হয়) তিনি এখন আসেন না। আসবেই বা কোন সাহসে! করোনার এই করুণ কালে। আমিও এখন ওনার ব্যালকনিতে আসা কামনা করি না। করোনার থেকে বেঁচে থাকুক তিনি। রোজ একই দৃশ্য দেখে সব মুখস্ত হয়ে গেছে। দিনের পর দিন ঘরে থেকে ঘুম জাগরণে স্বপ্ন-কল্পনা, চিন্তা-দুঃশ্চিন্তা বা চেতনায় শুধু মৃত্যুর থেকে বেঁচে থাকা।

আমার রুমমেট তার গ্রামে চলে গেছেন। একা পড়ে আছি শহরের লকডাউন বাড়িতে। কিছু দিনের বাজার করা আছে। রান্না করি খাই। রান্নার হাত এমন যে বোবাও বিশ্রী শব্দটা বলে ফেলতে পারত। এখন আমি বেশ খেতে পারি নিজের রান্না। বেঁচে থাকতে হবে বলে নিজেকে রোজ বোঝাতে থাকি। কিন্তু মায়ের কথা মনে হয়। মার কি ডায়াবেটিস কন্ট্রোলে আছে? ব্লাডপ্রেশার কি স্বাভাবিক? আমাকে কি রোজ সত্যি কথা বলে মা! মার খাবারের অভ্যাসে ডায়াবেটিস কন্ট্রোলে থাকে না। যে খাবার রান্না করে খাওয়া দরকার তেমন সৌখিনভাবে তার রান্না কিংবা খাওয়া কোনোটাই হয় না। ডায়াবেটিস কন্ট্রোল যতটুকু থাকে ওষুধ আর হাঁটাহাঁটি করে। আচ্ছা এখন কীভাবে হাঁটে! বাইরেই বেরুতে পারে না সেও লকডাউন অবস্থায় আছে। অসুস্থ হয়ে পড়ছে না তো! মা সত্যি কথা বলে না।

—হ্যালো মা! কীরাম আছ?
—আল্লাহ রাখছে ভালো। তুই কীরাম আছিস বাজান।
—আছি মা। তুমার…
—তোর খাতিদাতি ভারি কষ্ট হয় না!
—কীযে কও মা ডেলি রানতি রানতি শিখতিছি না! দেহনে আইসে একদিন খায়াবানি।
—হ বাজান। জলদি সব ভালো হয়ে যাক। কিন্তু তোর রানদা খাবনানে বাজান। এবার না করবি না তোরে বিয়ে দেব। তোর বউর রানদা খাব। (মার সামান্য হাসির আঁচ পাই)
—(আমি লজ্জায়) ধুর তুমি যা কও! আমার বউ কি রান্দুনি? আচ্ছা রাখি তরকারি পুইড়ে গেল।

তরকারি নাড়তে নাড়তে মনে হয়। আচ্ছা মা কেন বিবাহ বিষয়ে কথা বলল। মার শরীর তবে খারাপ বেশি! ফোন দিয়ে শুনি। কিন্তু পরক্ষণেই দ্বিধা হয়। মাকে ঘন ঘন ফোন দিলে মা দুঃশ্চিন্তা করবে।


২.

নাহ্ করোনার এই প্রাদুর্ভাবে ম্যাদম্যাদে হয়ে গেছে মানুষের চেহারা। সবার মুখে চিন্তার ছায়া। ও ভালো কথা মার সেই বহুকালের অভ্যাস দৈনিক বাজার করা। ছোট ভাইকে মা এখনও দুদিন, তিনদিন পর বাজারে পাঠায়। সেও যে বড় ঝুঁকি কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার জন্য। কীভাবে যে মাকে বোঝাই! বোঝাবই বা কীভাবে। অভাবে থাকায় অভ্যাস এই হয়েছে।

—ও মা কীয়েত্তিছ?
—শুয়ে পড়িছি বাজান।
—তুমি কীয়ারো?
—এই শোবো মা।

—তোমার শরীর কীরাম?

—আল্লায় রাখছে…। ও বাজান তোর মনডা ভালো ঠেকতিছে না তাই না! চিন্তা করা লাগবে না তোর। আমরা ভালো আছি। তুই দেহে-শুইনে থাহিস বাইরে-টাইরে যাইস না।
—আচ্ছা মা…।

(খানিক নীরবতা)
—ওমা ঠিক আছে তালি…
—আচ্ছা বাজান, ভালো থাইয়ো।

পুরো ঘর জুড়ে যেন এক নীরবতা নেমে এল। বাইরে কুকুরের ডাকের স্বর বাড়ছে ইদানিং। কুকুরের ডাক বাড়ছে… কেন? ক্ষুধা! আমারদেরও সামনে সেই দিন আসবে মনে হয়। চাকরিতে লেঅফ। সামনে ছাটাই হব। করোনাকাল হয়তো কেটে যাবে। আর সেদিন ক্ষুধায় করুণায় বেঁচে থাকব। তাই কি আজ বেঁচে থাকার ফিকির? সে বেঁচে থাকা কি বেচেঁ থাকা হবে! আমাদের শ্রেণির যুদ্ধ সামনে। প্রস্তুত হও, আমাদের মহান সম্মান, প্রস্তুত হও পাকস্থলী।