ডিসট্যান্স

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্যnonameঅনেকক্ষণ ফোন বাজে। কেউ রেসপন্স করছে না। মেয়ে গ্রোসারি করছে মনে হয়। চুপচাপ বুক মার্কার দেয়া উপন্যাস মেলে ধরলেন দীপা। বারিধারার এই ফ্ল্যাটে কিছুদিন হলো মুভ করেছেন। স্বামী হাঁটুর বয়সি কলিগের সঙ্গে লুকিয়ে চুরিয়ে মেনটেইন করছিলেন। প্রমাণসহ একদিন দীপা সরাসরি তাকে মিউচুয়ালের কথা বলেন। ডিভোর্স হয়ে যায়। এখন শুনেছেন তার এক্স স্বামী ভদ্রলোককে বিয়ে করেনি সেই নামকরা মহিলা।

দীপার ছেলেমেয়ে কানাডায় আছে কয়েক বছর। চমৎকার সেটেল করেছে। মাকে নিয়ে অনেক ভাবনা তাদের।ফ্ল্যাট দুই রুমের কিন্তু খুব সুন্দর প্লানিং। চারদিকে নীলমণিলতা এবং অপরাজিতার ঝাড়। হাঁটার জন্য আলাদা ডিভাইডার। ঈদের ছুটিতে কানাডায় যাবার কথা। কিন্তু গত দুইমাস আকস্মিকভাবে থেমে গেছে গোটা পৃথিবীর হালচাল। ‘লকডাউন’ নামে অদ্ভুত এক শব্দের আবির্ভাব এবং সারা পৃথিবীর মানুষ খাঁচাবন্দি।

‘করোনা’ শব্দটাকে মোটেই পাত্তা দেননি দীপা। ডিএইচএল-এ গেছেন মেয়ের জন্য বই পাঠাতে। ঢুকতেই তাকে হ্যান্ডস্যানিটাইজার দিয়ে হাত ক্লিন করানো হয়। এই প্রথম একটু খটকা লাগল। তাহলে কি এই সব ঘটনা সিরিয়াস?

বাসায় ফিরে দ্রুত মেয়ের সঙ্গে ফোনে বসে ঈদের প্লান করলেন। টিকিটের বুকিং দিয়ে রাখলেন। ক্রুজে যাবেন তিন দিনের প্যাকেজ, নায়াগ্রা ফলস,আরও কী কী তারা প্লান করেছে দীপা সবটা জানেনও না।

কিন্তু সেরকম কিছুই ঘটল না। ভাবছিলেন সাময়িক কিছু। কিন্তু সাতদিনের মধ্যেই বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে গেছে। সারা বিশ্ব স্থবির। সকল ফ্লাইট বন্ধ। রোড বাইপাস সব বন্ধ। শুধু মানুষের খিদে বন্ধ হয়নি, হয় না। দিনরাত প্রচুর মানুষ কোভিড১৯-এ আক্রান্ত হচ্ছে এবং প্রচুর মানুষ মারা যাচ্ছে। মেয়ে ফ্রন্টলাইন নার্স। কত শখ করে সে এই পেশায় এসেছিল। এবার ভয় পেতে শুরু করলেন দীপা।

মায়ের অনেকগুলো মিসকল। আজ কেন যেন কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।। করোনা এসে সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিয়েছে। ডিস্ট্যান্স মেইনটেন করা এখন জরুরি। মৃত্তিকা এসবের বাইরে। অথচ একটা ডুপ্লেক্স বাড়ি, চারপাশে রং ফুটে থাকা ঘোরে সে আচ্ছন্ন ছিল।

কিছুদিন হলো তাকে টের পাচ্ছে মৃত্তিকা। জারিফের সঙ্গে কয়েক মাসের রিলেশন। জারিফ ফ্যামিলিকে জানিয়েছে। মৃত্তিকাও। তুমুল সময় কাটিয়েছে তারা। বিয়ের সিদ্ধান্ত সময়ের ব্যাপার। অনলাইনে ডুপ্লেক্স পছন্দ হলো বেশ সস্তা। মৃত্তিকা ফিল করল জারিফের আশঙ্কাই ঠিক। সে কনসিভ করেছে।

কিন্তু করোনার কারণে তাদের সব এলোমেলো। দেখা হচ্ছে না, কাজেই কথা বলা খুব জরুরি। কিন্তু মৃত্তিকা ফিল করছে কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে। জারিফ মনে হচ্ছে কিছুটা ডিস্টার্ব। ইশারা না বোঝার মতো বোকা মেয়ে সে নয়। অথচ সেদিন জারিফ হল বুকিং নিয়ে ব্যস্ত ছিল। ডেট ফাইনাল হলেই মা দেশ থেকে আসবে।

‘জারিফ, টক টু মি ওপেনলি’,ফোনে মৃত্তিকা।

‘অ্যাকচুয়ালি, আমার ফ্যামিলি এখানে বর্ন অ্যান্ড ব্রডআপ ফ্যামিলির মেয়ে প্রেফার করছে।’

‘আমি বুঝলাম না, তোমার মতো অমানুষ আমি কীভাবে চুজ করলাম।’

‘মৃত্তিকা প্লিজ লিসন, তুমি খুব ভালো মেয়ে। বাট নট মাই টাইপ।’

‘হোয়াট অ্যাবাউট আওয়ার চাইল্ড?’

‘এটা তো কোনো বড় ইস্যু না। আর্লি প্রেগন্যান্সি।…, এছাড়া তুমি নার্স…।’

মৃত্তিকা ডিসকানেক্ট করে দেয়। সে নার্স এটাই আসল কারণ।

ক্লিনিক থেকে ফিরেই প্রথমে ঘর মব করল। তারপর শাওয়ার সেরে নিল। স্যামন মেরিনেট করে রেখেছিল বেইক করতে দিল। সেদ্ধ সবজি বাটারে লাইট স্যাঁতে করে নিল। ফোন হাতে নিল। মায়ের সঙ্গে লাইভে খেতে খেতে কথা বলবে। আজ বুক থেকে ভার নেমে গেছে। ৪ মাস চলছে তার মাকে আজ জানাবে। বারিধারায় মায়ের ফ্ল্যাটে রিং হচ্ছে…