দ্বিপাক্ষিক

করোনায় আমরা ভীত নই। বরং মোকাবেলা করছি গৃহে অন্তরীণ থেকে। এতে হয়ত কিছুটা বাড়তেও পারে মানসিক চাপ। তাই আসুন, খুলে দেই মনঘরের জানালা। নিজেকে চালিত করি সৃজনশীলতায়। আপনি নিয়মিত লিখছেন, বা এটাই হতে পারে আপনার প্রথম গল্প। লিখুন ফেসবুকে। চটজলদি ৫০০ শব্দের গল্প, বাংলা ট্রিবিউনের জন্য। একইসঙ্গে নমিনেট করুন আপনার পছন্দের আরও ১০ জন লেখককে। সেরা ১০ জন লেখক পাচ্ছেন কাগজ প্রকাশনের বই। আর অবশ্যই হ্যাশট্যাগ দিন #বাংলাট্রিবিউনসাহিত্যnonameভাইয়ার ঘটনাটার পর আমার প্রতিজ্ঞা ছিল আমি জীবনে কখনো প্রেম করব না। প্রেমে পড়ে যে মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটে এবং মানুষ অযৌক্তিক কাজকর্ম করে থাকে সেটা বোঝার জন্য আমাকে বেশি দূর যেতে হয়নি। আমার বড় ভাই তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। কিন্তু সেই ধনুকভাঙা পণ করার পরও প্রথম যেদিন আমি মালাকে দেখি তখন আমার মনে হয়েছিল এইসব প্রতিজ্ঞা-টতিজ্ঞা স্রেফ বালকসুলভ অভিব্যক্তি। প্রাপ্তবয়স্কতা এসবের থেকে বেশি কিছু। প্রতিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করা হলো প্রাপ্তবয়স্কতা। আমি আমার ভাইয়ের ভাই হয়ে প্রেম না করে কীভাবে ঐতিহ্য ভঙ্গ করি? আমি মালাকে একদিন পাকড়াও করলাম। আমার ভাইয়ের প্রেমের কাহিনি এলাকার লোক জানে ফলে মালাও জানে। ভাইয়ের প্রেমের কাহিনি আমার প্রেমে কাজে লেগে গেল। মালা আমাকে ‘না’করার সাহস পায়নি। এখনও দেখা করে ফিরবার সময় গলা জড়িয়ে ধরে। মালা সত্যিকার অর্থেই আমার গলায় মালা হয়ে থাকে কিছুক্ষণ। এই সময়টা আমার মনে হয় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নেহাৎ একটা মাংসাশী মানুষ, নইলে বরুণার বুকে মাংসের গন্ধ পেত। মালা যখন দুহাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরে তখন আমি একটা নেশা নেশা কাঁঠালচাঁপার গন্ধ পাই। সেই গন্ধ বুকে ভরে আমি নেশা করি। জয়ের নেশা। মালার কাছ থেকে আমি পৃথিবী জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে ফিরে আসি।

খালপাড়ে মোড়টাতে আসতেই দেখি তিথী আপা। আমাকে ডাক দেন। তিথী আপা আরও সুন্দর হয়েছেন। আমাকে বলেন, ‘তুই কিছুক্ষণ পরে আমাদের বাসায় আসিস। তোর সঙ্গে কথা আছে।’

এই সুন্দর মানুষটাকে আমি সবসময় এড়াতে চেয়েছি। আমি বললাম, ‘এখন বলেন।’

‘এখন বলা যাবে না। রাস্তায় বলার বিষয় নয়। বাসায় আসিস।’

আমার আর কিছু বলার থাকে না। যদিও চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে আপনার কথামতো আমি যাব না আপনাদের বাড়িতে। আপনার কথাই শেষ কথা হতে পারে না সবসময়।

আমি তার কিছুই বলতে পারি না। সম্বিত ফিরে পেতে দেখি তিথী আপা অনেক দূর চলে গেছেন।

এই সেই তিথী আপা যার জন্য আমার এসএসসিতে বোর্ড স্ট্যান্ড করা ভাইয়া কলেজই পার করলেন না। তিথী আপাকে চিঠি লিখেছিলেন ভাইয়া। তিথী আপা নালিশ করেছিলেন প্রিন্সিপালকে। ভাইয়া তার শাস্তি ঠান্ডা মাথায় ভোগ করে, আরও ঠান্ডা চোখে তিথী আপার দিকে তাকিয়ে সবার সামনে বলেছিল, যাও তোমার কলেজেই আসব না। তোমার জন্য এতটুকু আমি করতেই পারি।

ভাইয়া আর কোনোদিন কলেজে যাননি। কেউ তাকে পড়াশুনায় ফেরাতে পারেনি। কিন্তু তাতে তার রাশদপ কমেনি। ভাইয়া এখন উপজেলা চেয়ারম্যান। এখানে তার কথাই আইন।

কী বলতে পারে তিথী আপা। আমি তিথী আপাদের বাসায় যাই।

দরজা খোলে তিথী আপাই।

‘বস, কী খাবি?’

‘কিছু খাব না। কী বলবেন বলেন।’

‘ক্যান, কোনোদিন কি তুই আমাদের বাড়ি থেকে খালি পেটে গেছিস?’

‘সেটা বারো-পনেরো বছর আগের কথা। এই সময়ে অনেক কিছু পরিবর্তিত হয়।’

‘কী পরিবর্তিত হয়ে গেছে জিসান? তুই আর আমার সেই ছোট্ট ভাইটি নেই?’

‘কী বলবেন বলেন?’

‘আচ্ছা বাদ দে। আমি তোকে একটা কথা বলার জন্য ডেকেছি। তোর ভাই আর আমার ব্যাপারটি কি জানিস?’

সে খবর সারা শহর জানে তাই আমি কোনো কথা বললাম না।

আমাকে চুপ দেখে তিথী আপা আবার বলল, ‘যা জানিস তা ভুল জানিস। তোর ভাইয়া আর আমি প্রেম করতাম। কিন্তু একটা ব্যাপারে তখন আমাদের রাগারাগি চলছিল। তোর ভাইয়া আমাকে মানানোর জন্য চিঠি লেখে। আমি তাকে শিক্ষা দেয়ার জন্য চিঠিটা প্রিন্সিপালের কাছে দেই। তার বদলে তোর ভাইয়া আমাকে সারাজীবনের শিক্ষা দেয়। লেখাপড়া বাদ দেয়। পলিটিক্স করা শুরু করে। এ শহরের সবার কাছে আমি বিরাট ক্রিমিনাল কিন্তু তোর ভাইকে আমি ভালোবাসতাম। তোর ভাই যা কিছু করেছে তা আমাকে শিক্ষা দেয়ার জন্য। আমি তার পায়ে ধরেছি পড়াশুনা করার জন্য। মাফ চেয়েছি। বুঝতে পারছিস?’

‘এসব আপনি আমাকে বলছেন কেন?’

‘বলছি তার কারণ তুই যেন বুঝতে পারিস আমি তোর ভাইয়ার কাছে অপরাধী। আর সেটা আমি এখন স্বীকার করছি তা না, সেই তখনই স্বীকার করেছি। সে যদি আমার কথা মানত তাহলে আমাকে অন্যের ঘর করা লাগত না। আমিই হতাম তোর ভাবী।’

‘আমি বুঝে কী হবে?’

‘তুই বুঝলে তুই মালাকে ছেড়ে দিবি। আমার বোনের ওপর প্রতিশোধ নিয়ে তুই আমার ওপর প্রতিশোধ নিতে পারিস না। তুই তো মালাকে ভালোবাসিস না। মালার সঙ্গে সম্পর্কের নাটক করে তুই আমাদের ওপরে প্রতিশোধ নিবি এবং নিচ্ছিস। কিন্তু তুই কি বুঝতে পারছিস এটা তোর ভাই আর আমার দুইজনের ব্যাপার। এর মধ্যে প্রিন্সিপালকে এনেছিলাম বলে আমার এই শাস্তি। আমাকে সারাজীবন আরেকজনের ভাত রান্না করা লাগছে। তাহলে তোর কি এই সম্পর্কের মধ্যে ঢোকা ঠিক? বল!’