হাজারীবাগের আকাশে সকাল থেকে গুমোট মেঘ জমে আছে। এগুলো শুধু জমেই থাকে, বৃষ্টিতে রূপ নেয় না। আর নিলেও আরেক ধরনের ঝক্কি। চিরচির করে দুএক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ে তো সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ উধাও। কারখানার ভ্যাপসা গরম ঘরটাকে বানিয়ে দেয় নরক। এর সঙ্গে রাস্তার জ্যামে আটকে পড়া টেম্পোর বিকট হর্ন, রিকশাওয়ালার গ্যাঞ্জাম আর শত সহস্র বছরের চামড়া পোড়া গন্ধ তো আছেই। এই রকম পরিবেশে আবদুর রহমানের অসহ্য লাগে এমন নয়। সে যে জুতার কারখানায় কাজ করে এখানে তার বাবাও করত। যদিও পাশের মেথরপট্টিতে বিয়ে করার জন্য তার বাবাকে ভদ্র সমাজ অনেকটা ব্রাত্যই করে রেখেছিল। খুব বেশি দিন নয়, আবদুর রহমান জন্মের পরই মামলা মিটে যায়। উচ্চ বংশজাত আবদুর রহমানের পিতা লোকের নিন্দামন্দ সহ্য করতে না পেরে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে সস্তা মদ ও রূপজীবিনী ধরার সঙ্গে সঙ্গেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক। ছোটবেলা থেকে এ-ঘর ও-ঘর করে এখন বাপের পুরোনো কর্মস্থলই আবদুর রহমানের আশ্রয়। একটা বহুতল বাড়ির এক অংশে কারখানা, আরেক অংশে মেসবাড়ি। ভবনের সবগুলো ঘরই ঘিঞ্জি, কারখানার জুতা সেলাইয়ের ঘরটা দৈর্ঘ্যে প্রস্থে একটু বড় হলেও হরেক রকম জিনিসপত্রে ঠাসা। সবচেয়ে ভালো ফ্ল্যাটটা মহাজনের একার, কারখানার সামনাসামনি পড়েছে ওটার রান্নাঘর। তিন রুমের সর্বদক্ষিণে থাকা মালিকের স্ত্রীর শাড়ির আঁচল আর কাঁচা চামড়ার স্তূপ একই হুকে ঝুলতে দেখা যায় সবসময়। বাড়িটার পাতলা ইটের দেয়ালের এপাশে চলে চামড়ার গায়ে ধারালো ছুরি বসানোর কচকচ শব্দ, অন্যপাশে ডাল-ভাত, আর বেগুন ভাজির ছ্যাত ছ্যাত। অবিকল মানুষের হাড় ভাঙার মতো কিছু একটাও মড়মড় করে এখানে সেখানে। পুরো বিল্ডিংয়ের শৌচাগারের অভিন্ন পাইপ বিল্ডিংটার মাঝামাঝি পড়েছে। এর নিচেই বর্জ্য সরার ড্রেন। চোখের সামনে দিয়েই কারখানার পানি, কাদা, রাসায়নিক তরল স্রোতের মতো বয়ে যায়, এসব দেখে আর আবদুর রহমান ভাবে, নিশ্চয়ই তার নিজের ধমনীতেও রক্ত নাই একফোঁটা, সেখানেও বইছে বিষাক্ত আবর্জনা আর মল। তার ফুসফুস এখন ট্যানারির ড্রামের মতো দূষিত লাগে, একঘেয়ে জীবনের সমস্ত দুর্গন্ধযুক্ত ঘটনা শ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে প্রবাহিত হয়। জন্ম থেকেই আবদুর রহমান অনাত্মীয়, নিঃসঙ্গ আর উগ্র, তপ্ত আঠার গন্ধে ঝিমঝিম করতে থাকা দুপুরে কোনো কারণ ছাড়াই আবদুর রহমানের ঘাড়ের রগ এমনি এমনি ফুলে ওঠে। মনে হয়, আস্ত একটা মানুষকে চার ভাঁজ করে যদি লবণে চুবিয়ে জীবাণুমুক্ত করে ধারালো র্যাপার দিয়ে নিখুঁত মাপে কেটে ফেলতে পারতো একটু হয়ত শান্তি হতো। সময় সময় পরিচিত কিংবা অপরিচিত যে কেউ-ই তার শত্রু হয়ে ওঠে। বিশেষ করে যে মানুষগুলো জান্তব ক্ষুধা নিয়ে রাস্তার নারী-পুরুষের বুক পাছার সাইজ মাপে তাদেরকে তার কী যেন করার আকুলতা তাকে কামড়ায়। চোখের সামনে মেয়ে না পেয়ে শিশু বাচ্চার পায়ুপথ যাদের আরাধ্য; তাদের আগাগোড়া বিষাক্ত বাসনাগুলো জুতার তলা হিসেবে ব্যবহার করার তীব্র এক ইচ্ছে আবদুর রহমান সযত্নেই তার হৃদয়ে লালন করে। মানুষের পৃথিবীর খাদ্য বস্ত্র বাসস্থানের বৈষম্যও যে গায়ে লাগে না তার তা নয়, চারপাশের চওড়া সুউচ্চ দালানগুলোও কেটে, ছিঁড়ে, সেলাই করে বাক্সে বন্দি করে রাখার অদ্ভুত জ্যামিতিক হিসাব তার মগজে জমা আছে সেই প্রাগৈতিহাসিককাল থেকেই।
কেবল জুতা সেলাইয়ের সময়টায় আবদুর রহমান সুস্থির থাকার চেষ্টা করে। কিছু জুতা উঠে গেলে, অকেজো চামড়াগুলো কেটে কেটে বানায় ফুল, পাখি কিংবা প্রজাপতি। কেউ দেখার আগেই সেসব আবার কুচি কুচি করে দিতেও মুহূর্তমাত্র দেরি হয় না তার। কিন্তু সময় সময় হাত ভারী হয়ে উঠলে নিজের ওপর বিরক্ত হয় আবদুর রহমান রেত আর রাঁদার সঙ্গেই বাঁধায় কলহ। বকে যায় সিসা হয়ে থাকা নিজের হাতকে। নিজেকে কেবলই শাসায়, সকালের এক কাপ চা, এক পিস পাউরুটিও যেন ন্যায্য শ্রমের বিনিময়ে হয় তার। তাকে যে এসব শিখিয়েছে সেই ফারুক স্যারও এক রহস্য। তিন মাসের জন্য হাজারীবাগের শেষ মাথার স্কুলটায় শিক্ষক হয়ে এসেছিলেন তিনি। যেমন হঠাৎ করে এসেছিলেন তেমন হঠাৎ করেই আবার চলে গেছেন। আবদুর রহমান জানে ফারুক স্যার এখন ব্যাংকের ক্যাশিয়ার, সারাদিন টাকা গোনেন। জুতা বানাতে এসে আবদুর রহমানের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল লোকটার। তাকে বলেছিল তোমার ভেতরে বিপ্লব আছে। তোমাকে দিয়ে হবে। হয়নি কিছুই অথচ আবদুর রহমান ভেতরে ভেতরে নিজেকে বিপ্লবী ভেবে বসে আছে। তার দ্রোহের প্রথম লক্ষ্যবস্তু নাছরিন। ওকে দেখামাত্রই আবদুর রহমান খ্যাক করে ওঠে।
ওর গা জ্বালানো হাসি অসহ্য রকম বিরক্তিকর। ওর ছায়া দেখলেও আবদুর রহমানের অস্বস্তি হয়। হাত পা ঘামে। চোখ পিটপিট করে, ক্রমান্বয়ে মুখ বুকের দিকে ঝুঁকে গেলে চোখের কাছে নেমে আসে যত্ন না করা চুল। নিজেকে 'চোতমারানির পুত' বলে একটা গালি দিয়ে কাজে মন দেওয়ার যতই চেষ্টা করে, হয় না। নাছরিন ঝুলে থাকে অদৃশ্যে। ওপাশে মহাজনের ঘরের রান্নাঘরের ছোট্ট জানালাটা খুলে নাছরিন সব সময় মাথা উঁচু করে এই দিকে দেখে। চোখাচোখি হলো তো ব্যাস, আবদুর রহমান দেয় গালি।
‘ওই খানকির ঝি, কাম-কাজ নাই? কাইলকা পয়দা হইয়া আইজকা ভাতার খুঁজো? সরো চোখের সামনে থিকা!' কথা নাই বার্তা নাই, শুধু শুধু এইসব গালি হজম করায় নাছরিন অভ্যস্ত। সে ভাতার খুঁজবে কী, তার কি ভাতারের অভাব? চাইলে তো মহাজনের হাঙ্গাইত্তা বউরেই আউট করে দখল করে নিতে পারে এখানকার রাজত্ব। নাছরিন তো এইসব করে না। বলতে গেলে আবদুর রহমানের পর্যায়ক্রমিক বিরক্ত উৎপাদন ছাড়া নাছরিনের যুদ্ধ জয়ের আর কোনো প্রয়াসও নাই। আবদুর রহমানের সঙ্গে আঠার মতো লেগে থাকে সে। ওর ‘শারগেদ’ বোবা কালা জালালের সঙ্গে বিরাট ভাব। ইশারায় কথা চালায় দুজন। সকাল হতেই বাহারি সাজে কোমর দুলিয়ে জালালকে নিয়ে কাঁচা বাজারে যায়। দুপুরে দীর্ঘসময় বারান্দায় জালালকে নিয়েই কাপড় মেলে, বিকেলেও মহাজনের বাচ্চা নিয়ে কারখানায় জালালের কোলে দেয়। যেন জালাল আর ওর নাছরিনের একটা মিনি প্যাকেজের সংসার। আবদুর মাঝে মাঝে ভাবে এসব দেখবে না। কিন্তু না দেখলেও বিপদ। নাছরিন রান্না করতে করতে টিস্যু দিয়ে পেঁচিয়ে ঢিল মারে কাঁচকলা, বরবটির লতা বা পটোল। জানালার ফাঁক দিয়ে ছুড়ে মারা এসব মহার্ঘ বস্তু যথাস্থানে না পৌঁছে সোজা ড্রেনে গিয়ে পড়ে অথবা পড়ে আবদুর রহমানের মাথায়। কারণ আবদুর রহমানের বসার স্থানটাই জানালার সবচেয়ে সন্নিকটে। আবদুর রহমান সেইসব ফল বা সবজি পা দিয়ে পিষতে পিষতে বলে, ‘হারামজাদিরে ঠিক একদিন কুত্তা দিয়া খাওয়ামু। লাঙ ধরা টোপ ফেলে মাগি। দূরে গিয়া মরতেও পারে না!’ বলেই সমস্ত ক্ষোভ উগরে দেয় জালালের প্রায় নগ্ন মাথায়। বেচারা অযথাই নাছরিনের দোষে প্রতিদিন এমন দুইচার ঘা খায়। নাছরিন আবার ওসব পুষিয়েও দেয়, ইশারায় ইশারায় অভিমান ভাঙায়, ফ্লাইং কিস দেয়। আবদুর রহমান বিস্ফোরণে ফেটে পড়া পর্যন্ত ওদের এসব নিঃশব্দ প্রেমালাপ তার চলতেই থাকে। শুধু এইটুকুতে থাকলেও হতো। নাছরিনের গা জ্বালানো প্রকল্প আরো ব্যাপক ও বিস্তৃত। কখনো কখনো মিথ্যে অজুহাত দেখিয়ে মহাজনের বউয়ের কাছ থেকে সারা দিনের ছুটি নিয়ে রহমানের পিছু নেয়, কোনো কোনোদিন টিএসটি এলাকায় রিকশা নিয়ে একাই ঘোরে আবদুর রহমান। দু-একদিন এমনও হয়েছে নাছরিন বোরকা পরে এসে জোর করে দখল করেছে রহমানের রিকশা, সেসময় রহমান তাকে লাথি মেরে ফেলে দিতে গিয়েও পারে না, কেবল গালি দেয় ‘মাগি তুই রিকশা থেকে নাম। ফকিন্নি, তোর লগে রিকশায় উঠলে আমার মান যাইবো না?’
নাছরিন কী কম যায়, আবদুর রহমানের এসব ঘৃণা-বাক্যের বিপরীতে তখনি পালটা উত্তর দেয়, ‘একবেলা রিকশায় চড়লে তোর কোন ইজ্জত খোয়া যাইবো রে রহমাইন্না? লুঙ্গির নিচে যেইটা থাকে সেইটা?’
রহমানের অভ্যাস আছে বিকেলের দিকে রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে যাওয়ার, অন্ধকার হয়ে আসা পর্যন্ত ওখানে একা একা বসে থাকতে ভালো লাগে ওর। বাদাম চিবোয়, চা খায়। কিন্তু আপাত নির্দোষ এ কাজটিও বেশি সময় টেনে নেওয়া যায় না নাছরিনের যন্ত্রণায়। সময় সময় সেখানে ভূতের মতো উদয় হয় সে, খ্যাক খ্যাক করে হেসে বলে, ‘কী রহমান কোন মাগিরে খুঁজতে আসছস? পাইছস কিছু?’
নাছরিনের এই সমস্ত বাঁকা কথায় আবদুর রহমানের পিত্তি জ্বলে যায়। আবদুর রহমান কি জানে না নাছরিন নিজে কী? মেসের সবাই বলে, নাছরিনের শরীর নাকি বেবুশ্যাগো মতো। আরো বলে ও নাকি বুক দেখানোর জন্য কাপড়চোপড়ও উদলা-মুদলা রাখে। এ জন্য ও যখন সামনে দিয়া যায়, আবদুর রহমানেরও মনে হয়, চোখের সামনে একদলা কাঁচা মাংস হাত-পা লাগিয়ে চলছে ফিরছে। ও চারপাশে থাকলে শত-সহস্র অদৃশ্য মাছির ভনভন করা শব্দও শুনতে পায় আবদুর রহমান।
নাছরিনের একটা বদ অভ্যাস আছে। সে এর তার কাছ থেকে পান খাওয়ার টাকা চেয়ে ছেঁচরামি করে। মেয়ে মানুষের আবদার কেউ ফেলতে চায় না। কিন্তু আবদুর রহমানের কাছে হাত পাতলেই আবদুর রহমান ওর চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করে দেয়। কিন্তু পরক্ষণে আবার ফিরেও আসতে হয়। যখনই ওকে মুচড়ে দিতে যায় আবদুর রহমান তখনই সে ওর বাড়িয়ে ধরা হাতের এখানে সেখানে, চ্যাপটা আঙুলে, কনুইয়ে দেখতে পায় অজস্র দাগ। গলার নিচে, ঘাড়ে, বুকেও থাকে কিছু। কীসের দাগ; আবদুর রহমান যেন বুঝেও বুঝতে চায় না। কখনো মনে হয় খুন্তির ছেঁকা কখনো মনে হয় ভারী কোনো ধাতব যন্ত্রের আঘাত। আবার কখনো মনে হয় প্রণয়ের, সোহাগের। আবদুর রহমানের কষ্ট হয়, নাছরিনের মতো ওর দাগগুলোও হজম করতে ওর গলা ধরে আসে। একদলা থুতু এমনি এমনি গিলে নেয়।
মাঝে মাঝে আবদুর রহমানের মনে হয়, যদি এমন কোনোদিন আসতো নাছরিন এসে তার কাছে অভিযোগ করত পুরো দুনিয়ার বিরুদ্ধে, সেদিন হয়ত আবদুর রহমান হয়ে উঠতে পারতো ফারুক স্যারের বলা সেই বিপ্লবী মানুষ, প্রতিটা লোকের মাথা ছেঁচে হিসেব চাইতে পারতো নাছরিনের শরীরের ওপর বসিয়ে দেওয়া অস্বাভাবিক ক্ষতের। যদি নাছরিন একটু কাঁদতো ব্যথায়, ওর অভিমানের অশ্রুতে আবদুর রহমান হয়ে উঠতে পারতো শুদ্ধ, তন্ন তন্ন করে খুঁজে আনতো একশ এক নীলপদ্ম। কিন্তু নাছরিনের সব কিছুই উলটো ধারায় বয়। নির্লজ্জ বেহায়ার মতো সবকিছু চাপা দিয়ে রাখে ছেনালী ঠোঁটে। সংগত কারণেই তাই ওকে দেখলে আবদুর রহমানের দাঁত কিড়মিড় করে, মুখে জমে ক্ষুরধার গালির স্রোত। ‘খাটাশ। আস্ত খাটাশ, পিশাচিনী, ছিনাল।’ আবদুর রহমান ভেবে পায় না নাছরিন কেন এমন। মেয়ে মানুষের গায়ে থাকে হাজার ফুলের সুবাস কিন্তু এই কুত্তার ঝিয়ের গায়ে সবসময় এমন পচা আবর্জনার দুর্গন্ধ থাকে কেন! যেদিন নাসরিনের কপাল ফুলে থাকে, বা চোখে উঠে থাকে বোলতার কামড়ের মতো পাহাড়, সেদিন কোনো কারণ ছাড়াই নাছরিনের ওপর মেজাজ খারাপ হয় আবদুর রহমানের। খাটাশ মেয়েটা এ সময়ও কেন কারখানায় আসে বুঝ আসে না ওর। ওর মিথ্যা ঝলমলে মুখ দেখলেই আবদুর রহমান খেকিয়ে ওঠে, ‘সর সর আমার সামনে থিকা, নাইলে কিন্তু রাঁদা দিয়া তোর জিবডা কাইটা ফালামু।’ নাছরিনও পালটা ত্যাজে ফুঁসে ওঠে, ‘দেখি কাট তো, তুই কেমন পারস’ উৎকট রাগে আবদুর রহমান আছারি-পিছারি করে কিন্তু নাছরিনের সেসব গায়েই লাগে না। উপরন্তু সে নাছোড়বান্দা হয়ে আরো সরে সরে আসে একদম আবদুর রহমানের গায়ের ওপর। ও যত কাছে আসে আবদুর রহমান ততই অসহ্য যন্ত্রণায় এমনভাবে কুঁকরে যায় যেন কোনো কুষ্ঠরোগী তাকে ছুঁতে আসছে। অবশ্য রহমান এই অস্বস্তিকর আচরণ শুধু নাছরিনের সঙ্গে করে এমন না। কারখানার অন্য কর্মচারীরা যখন ঘেমে-নেয়ে বা দুঃখে কাতর হয়ে তার পাশ দিয়ে যায়, আবদুর রহমানের নাকে কাঁচা চামড়ার চেয়েও তাদের শরীরের দুঃখ-গন্ধ বেশি লাগে। দুখীদের কেউ ভুলে তার টুল বা রাঁদা ধরলে সে এমনভাবে চিৎকার করে ওঠে যেন কেউ তার কলিজায় গরম লোহা ঢুকিয়ে দিয়েছে। সে খেঁকিয়ে ওঠে, ‘শুয়োরের বাচ্চা, তোগোর শইলে কি পিনিক ওঠে, গায়ের ওপর পরস? যা দূরে গিয়া মর।’
হাজারীবাগে টেনারি মোড়ের নোংরা কাদায় বড় হওয়ার পরও আবদুর রহমানের ভেতরে এই অতি আবেগ জন্ম দেওয়ার জন্য সে ফারুক স্যারকে অভিশাপ দেয়। অবশ্য দোষটা ফারুক স্যারের না। কেউ কেউ বলে ওর বাপেরও নাকি এমন দুঃখ নিয়ে বাতিকগ্রস্ত হওয়ার স্বভাব ছিল। ওর বাপও নাকি রোগ-শোক কাতর মানুষ দেখলেই বিড়বিড় করে নিজের সঙ্গে কথা বলতো আর গাল ভরা কফ থুক থুক করে ফেলে বলতো, ‘সবডি হারামির পুত, সবডির গতরে খালি দুখ আর দুখ। সবডিরে খুন কইরা জেলে যাইতে পারতাম'। এ কারণেই আবদুর রহমান যখন অযথাই সময় পেলে কাজের জায়গাটুকু চটচটে ন্যাকড়া আর ফিনাইল দিয়ে ঘষে ঘষে দুঃখ তোলে তখন কারো আর অস্বাভাবিক লাগে না। সবাই ভাবে পাগলের ঘরে তো পাগলই জন্মায়। সবাইকে ফিনাইল ঘষে তুলে ফেলতে পারলেও লেগে থাকে শুধু নাছরিন। কারণ সে তো জোর করেই উসকে রাখে তার অস্তিত্বের সলতে। এর বিপরীত কিছু ঘটতে পারে এটা আবদুর রহমান কখনো ভাবে না। কিন্তু হঠাৎ একদিন তাও ঘটে। সকাল যায় সুনসান, দুপুর গড়ায় তেমন, নাছরিনের কোনো সাড়া-শব্দ নাই। বিকেলটাও যায় এমন। আবদুর রহমানের কেমন জানি লাগে, নিজে নিজেই বিড়বিড় করে, ‘কুত্তার ঝি মরছে বোধহয়, আপদ গেছে।’ কিন্তু দ্বিতীয় দিন দুপুরে চামড়া কাটার সময় তার হাত আর চলে না। বারবার থেমে যায়। অবচেতনেই উৎকীর্ণ হয়ে ওঠে সেই ‘ঘিনঘিনে’ আওয়াজ শোনার অপেক্ষায়। এমন না এতক্ষণে নাছরিনের অনুপস্থিতি নিয়ে ওদের কর্মচারী মহলে অস্থিরতা শুরু হয়নি। হয়েছে। কিন্তু আবদুর রহমানের অবস্থা ভিন্ন। তার ভেতরে শঙ্কা, ‘বালডা মইরা যায় নাই তো আবার।’ এক দিন দুই দিন তিন দিন, পুরো সপ্তাহ দাঁতে দাঁত চেপে অবশেষে নিজের ব্যক্তিগত বিরক্তির সবটুকু নিয়েই দাঁড়ায় নাছরিনের ঘরের দরজায়। এক ধরনের ক্লান্ত জান্তবিকতা নিয়ে দরজায় টোকা দিয়ে নাছরিনকে ডাকে, ‘ওই ফকিন্নির ঝি, মরছো নাকি বাঁইচা আছো?’ কেউ কোনো জবাব দেয় না। আবদুর রহমান খেয়াল করে দেখে ঘরটায় তালা। যে গলিটা দিয়ে পচা নর্দমার জল উপচে উপচে পড়ে আবদুর রহমান সেদিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ। কাউকে কিছু বলার অভিযোগ করার সুযোগ না দিয়ে নাছরিন যে কোথায় হারালো আবদুর রহমানের বুঝে আসে না। যুদ্ধহীন আবদুর রহমান মনে হয় বেকারই হয়ে গেলো।
সময় যায়। নাছরিনের হঠাৎ অদৃশ্য হওয়া নিয়ে যতটা উত্তেজনা বিরাজ করার কথা ততটা হয় না। সবাই যেন কৌশলেই চেপে রাখছে সবকিছু। তাছাড়া এর মধ্যেই শুরু হয়েছে সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। এই দল ওই দলের প্রার্থীরা আসছে, হাউকাউ করছে, মিছিল মিটিং হচ্ছে। আর এসবের মাঝে চাপা পড়ে গেছে নাছরিন। কাটে আরো বেশ কিছু দিন। প্রায় সাত-আট মাস অতিবাহিত হলে আবার মহাজনের বাসার বারান্দায় দেখা যায় নাছরিনের মুখ। অসম্ভব বিমর্ষ। কী বৃত্তান্ত কেউই বোঝে না। নাছরিনের এই হঠাৎ অন্তর্ধান রহস্য নিয়ে কারখানায় শুরু হয় ব্যাপক কল্পনা-জল্পনা। যা তার হারিয়ে যাওয়ার পর অবশ্যম্ভাবী ছিল। হয়ত মহাজনেরই নিষেধ ছিল। ধারণা নয়, সত্যি হয়ে ওঠে ওর একটা বিয়ে হয়েছে। আবার এও শোনা যায় বিয়ের এক সপ্তাহর মধ্যে কী দোষে যেন তার তালাকও হয়েছে। এরপর কয়েক মাস গার্মেন্টসে কাজ করে আবার নাকি বহাল হয়েছে এখানে। সব কথা সত্যি নাকি মিথ্যে যাচাই করার উৎসাহ নাই আবদুর রহমানের। তার কেবল মনে হয় নাছরিন একবার বারান্দায় এসে চিৎকার করে উঠুক, রাস্তার ভ্যান থেকে সবজি কিনতে গিয়ে তুমুল বাহাস বাঁধাক। কাউকে মারুক কাটুক, পান খাওয়া ঠোঁটে গুনগুন করে সুর তুলুক চটুল কোনো গানের। নাছরিনকে খানকি, মাগি, নটী বলে গালি দেওয়ার জন্য ছটফট করে আবদুর রহমানের মন, ইতোমধ্যে ওর সঙ্গে তার বেশ কবার চোখাচোখি হয়েছে। দুজনই চোখ নামিয়ে নেয়। মনে হয় সুতো ছিঁড়ে গেছে কোথাও। ক্রমেই সবার চোখের সামনে নাছরিনের গর্ভাবস্থা প্রকট থেকে প্রকটতর হয়। এত বড় পেট, মনে হয় পুরো পৃথিবীর সমস্ত অনাগত সন্তান সেটে আছে ওর গর্ভে। কাজে কর্মে এখন আর সে অত চপল না। মুখও চলে না। শীতের সকালে একটা জবুথবু চাদর পরে এসে বেশ খানিকক্ষণ রোদ পোহায়। অল্প সময়ের জন্য। কিন্তু এই সময়টা যেন মহাকালের মতো চাপ ধরে থাকে আবদুর রহমানের বুকে। আবদুর রহমানের ভালো লাগে না, বিরাগ লাগে সব। কার কাছে যেন ক্ষোভ জানায় ‘জ্বলে যাক, পুড়ে যাক, জাহান্নামের মতো ছারখার হয়ে যাক সব।’ জন্মের পর এই প্রথম আবদুর রহমানের কোনো ইচ্ছের বাস্তব প্রতিফলন ঘটে।
হাজারীবাগে হঠাৎ এক জুতার কারখানায় ইলেকট্রিক শর্টসার্কিটে আগুন লাগে এবং সে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো হাজারীবাগ, ট্যানারি মোড়। কী বীভৎস ক্ষুধা সে আগুনের। ঘুমের পাতলা উষ্ণতায় আবদুর রহমান বুঝতে পারে না হাবিয়া দোজখের উত্তাপ কেমন হতে পারে। প্রতিরাতের মতো আজও সে একা একা জেগে বেশ দীর্ঘ সময় ধরে অনুভব করেছে তার চারপাশের সমস্ত ভারী নিশ্বাসের আওয়াজ। জালালের নাসিকা গর্জনকে উপেক্ষা করেই আধো ঘুমের এমন এক কল্প জগতে পৌঁছেছে, যেখানে সে কোনো কারখানার শ্রমিক নয়, রাজা। তার অবাধ্য সব রঙিন ইচ্ছের প্রজাপতি ওড়ে সেখানে; নদী ঢেউ ভেঙে গান শোনায় এক ঘরপোড়া বালককে। সে জগৎ এমন এক সব পাওয়ার জগৎ, যেখানে কেবল খুঁজে পাওয়া যায় না নাছরিনের অস্বাভাবিক উঁচু হয়ে যাওয়া পেট আর বদখত জীবন। এমন এক বিভ্রমের মাঝে তীব্র কটু প্লাস্টিক আর আঠা পোড়ার গন্ধে আবদুর রহমানের ঘুম ভাঙে। পাশ ফেরার চেষ্টা করে একটু, ভাবে তার সঙ্গে শুয়ে থাকা জালাল হয়ত বিড়ি ধরিয়েছে। মাঙ্গের পুত, বেজন্মা, ইবলিস শয়তানের মতো কিছু গালিও দেয় আধো ঘুমেই। কিন্তু কিছু মুহূর্তের মধ্যেই বাতাসের স্বাভাবিক আর্দ্রতা উধাও হয়ে এক অসহ্য শুষ্কতায় তার গলার নলি চেপে ধরতে এলে আবদুর রহমান পুরোপুরি চোখ মেলে তাকায়। চারপাশের পরিচিত অন্ধকারটা কেমন যেন হলদেটে আর রক্তাভ হয়ে উঠছে। সিলিংয়ের দিক থেকে আগুনের হলকা ইতোমধ্যে সাপের জিভের মতো লকলক করে নেমে এসেছে। সদ্য ঘুমভাঙা আবদুর রহমানের কাছে এই সামূহিক আকস্মিকতাকে অলৌকিক লাগে। তার মনে হয় কেয়ামতের কাল শুরু হয়েছে, ইস্রাফিল শিঙ্গায় ফুঁ দিয়ে বসে আছে শেষ বিচার দেখার আশায়। সে নিজের হাতটায় চিমটি কাটে; না এ বাস্তব। শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও আগুনের জান্তবিক তাপ তাকে প্রচণ্ড বিস্মিত করে। আরো বেশি বিস্মিত হওয়ার আগেই সে দেখতে পায় কারখানার প্রতিটি কোণে ফেলে রাখা সলিউশন আর ডেনড্রাইট আঠার ড্রামগুলো একেকটা বোমার মতো ফাটতে শুরু করেছে। বস্তির টিনের চালগুলো দূর থেকে কেঁপে কেঁপে উড়ে উড়ে এদিকে আসছে। এই বিল্ডিংয়ের দোতলার দুই ইউনিটের মাঝখানের সেই চটচটে দেয়ালগুলো আগুনের তাপে তাপিত হয়ে ওঠা গলিত রাবারের মতো চ্যাপ্টে যাচ্ছে। আশপাশের গলিতে হাজারো মানুষের চিৎকার, বালতি হাতে ছোটাছুটি, অসম্ভব কেওয়াস। এর মাঝে ড্রেনের নোংরা পানি থেকে বাষ্প উঠে এক কুয়াশাচ্ছন্ন গোলক তৈরি করেছে কারখানা ঘরে। সেই গোলকে আবদুর রহমান দিক খুঁজে পায় না। চোখের সামনে তার সাজানো ‘চামড়ার পৃথিবী’ পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। রাঁদা আর রেতগুলো আগুনের তাপে পাখির মতো ফুটছে। প্রবল প্রতাপের এই ধ্বংস উন্মত্ততার মাঝে দাঁড়িয়ে আবদুর রহমান প্রথমবারের মতো অনুভব করে বাস্তবিক দুঃখ। সে জেনে যায় আগুনের কোনো জাত নেই, কোনো শুচিতা নেই; সে তার উদরে সব কিছুকে যে সমতায় গ্রাস করে ঠিক নাছরিনের মতো, সেখানে দুঃখও যা সুখও তা-ই।
কিছুটা হুঁশ আসতেই আবদুর রহমান তার পাশে শুয়ে থাকা জালালকে খোঁজে। যে আধোয়া, শক্ত, শতছিদ্র কাঁথার দুর্গন্ধ আবদুর রহমানের ভেতরে বিবমিষা উদ্রেক করত সেই বস্ত্রখণ্ডই এই মুহূর্তে তার প্রবল আরাধ্য হয়ে ওঠে।
পুড়ে যাওয়া কাপড়ের তলদেশ থেকে জালালকে উদ্ধারের চেষ্টায় এদিক ওদিক হাতরায়। ইতোমধ্যে গুলিস্তান থেকে কেনা তার সস্তার জ্যাকেটের অর্ধেকাংশও পুড়ে শেষ। তবু আবদুর রহমান সাহস হারায় না, ক্যাশ বাক্স থেকে টাকা কোমরে গুঁজে চাবি নিয়ে ঝাঁপ খোলে। রাস্তায় মানুষের হুড়োহুড়ি ছুটোছুটিতে এমন এক পরিস্থিতি, একবিন্দু নড়ার উপায় নাই। তবু সে কারখানার আশে পাশে যাকে পাচ্ছে তাকেই জিজ্ঞেস করছে, ‘জালাল কই?’ কেউ শোনেও না বলেও না। প্রচণ্ড সে ছটফটে অবস্থার মাঝে হঠাৎ একটা চামড়ার স্তূপ বিকট শব্দে ফেটে ওঠে। তীব্র হলকায় আবদুর রহমান জ্ঞান হারায়। বেশ অনেক সময় পর তার যখন জ্ঞান ফেরে তখন রীতিমতো পোড়া চামড়ার আবরণে আচ্ছাদিত সে। পাশেই গলিত জালাল। আগুনের ধোঁয়ায় কালো হয়ে যাওয়া নিজের হাত দুটোর দিকে তাকায়। একটার অর্ধেক নেই। আরো বিস্মিত হওয়ার আগে দেখে অর্ধনগ্ন বিকৃত শরীরের ওপর ঝুঁকে আছে নাছরিন। তাকে টেনে রাস্তা পর্যন্ত এনেছে সে একাই। বেশ কিছুক্ষণ বিহ্বল আবেগে আবদুর রহমান নাছরিনের অস্থিরতা দেখে। এদিক সেদিক খুঁজে কী যেন একটা আনে ও। একটা ছোট সাইজের ময়লা ফেলার ক্যারাভ্যান। সেখানেই আবদুর রহমানকে টেনে তোলে। পরিশ্রমে হাঁপায়, একটু থামে, আবার টানে। আবদুর রহমান যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠে, মাতালের মতো গালি দেয়, নাছরিনকে আরো যন্ত্রণা দিতে চালায় বিকৃত দীর্ঘ সংলাপ, ‘আরে হারামির ঝি, আমারে এই গুয়ের গাড়িতে তুলতাছস ক্যান? এর চেয়ে আগুনই তো ভালো! পুইড়া ছাই হইয়া গেলে তো তোর হাত থেইকা বাঁচতাম!’
নাছরিনও ছাড়ে না। ক্যারাভ্যানটা টানতে টানতে চিৎকার করে ওঠে, চুপ থাক শয়তানের বাচ্চা! আগুনে তোর মরণ নাই, ভাবছস মইরা গেলেই নিস্তার? না, একদম না। চুপ থাকবি একদম। রাস্তায় আর কোনো পাক-পবিত্র গাড়ি আছে তোরে তুলুম?
আবদুর রহমানকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে নাছরিন তার সর্বস্ব দিয়ে টানতে থাকে সিটি করপোরেশনের ময়লা সংগ্রহের এই জং ধরা কন্টেইনার। যত দ্রুত সম্ভব আবদুর রহমানকে ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে পৌঁছাতে হবে তার। দূরত্ব বেশি না হলেও সমস্যা হচ্ছে তার ভারী শরীর। সামনের মাসেই ডেলিভারির ডেট। নাছরিন শক্তপোক্ত বলেই শরীরের যন্ত্রণাকে এড়িয়ে এখনো দাঁত চেপে রেখে আবদুর রহমানকে টেনে নিতে পারছে। নাছরিন পা চালাতে চায় দ্রুত। কিন্তু পথে থেমে থেমে আবদুর রহমানের পুড়ে যাওয়া শরীরে আঁচল দিয়ে একটু বাতাস দেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও বোধ করে। এ অবস্থায়ও যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে আবদুর রহমান বকে যায়, ‘তুই তো আমার জীবনটা কয়লা বানাইলি মাগি, কোন জাহান্নামে ফেইলা আসবি আমারে?’
নাছরিন ঝাঁঝের সঙ্গে তার কয়লাপোড়া হাতটাকে জোরসে চেপে ব্যথা দিয়েই বলে, ‘শোন হারামজাদা, তুই জাহান্নামের দেখছসটা কী। আমি তোরে দেখামু এইবার। এই শহরের কুত্তারা যখন আমারে ছিঁড়া খাইতো, তখন তুই আমারে বাঁচাইতে আসছস? আসস নাই। এখন আমি তোরে মরতে দিমু না। জ্যান্ত রাইখাই তোরে হাবিয়া দোজখের আগুনে পোড়ামু।’
নাছরিনের এই চ্যাটাং চ্যাটাং কথায় আবদুর রহমানের পিত্তি জ্বলে যায়, ঝটকা মেরে সরিয়ে নিতে চায় হাত, কিন্তু পারে না। নিস্তেজ চোখে তাকিয়ে থাকে তার মাতৃত্ব ফুটে ওঠা শরীরের দিকে।
ক্যারাভ্যানটা যখন মেডিক্যালের একদম কাছাকাছি, লোকজনের দৌড়াদৌড়ি হুটোপুটির মধ্যে আরো কিছু বডি ঢোকে বার্ন ইউনিটের দিকে। হসপিটালের ইমার্জেন্সির লোকেরা এদিকে কেউ আসেই না। নাছরিনের কী তর সয়। সে বিপদ বুঝে জুড়ে দেয় বিকট চিৎকার। খোদার আরশ কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো হাহাকারে একজন ওয়ার্ডবয় এসে আবদুর রহমানকে স্ট্রেচারে তোলে। দৌড়ে ছুটতে থাকে ইমার্জেন্সির দিকে। এই শেষবেলায় নাছরিনের চোখের জল বৃষ্টির মতো ঝরে, এই কান্নায় রাগ নাই, শোক নাই, কেবল প্রেম। নিস্তেজ হতে হতে আবদুর রহমান অদ্ভুত মুগ্ধতায় দেখে নাছরিনের কান্না। হঠাৎ সে অনুভব করে তার কোথাও আর যন্ত্রণা নেই। কেমন শীতল অনুভূতি। আজন্ম স্নেহ উপেক্ষিত আবদুর রহমানের চোখ ভিজে ওঠে নাছরিনের জন্য এক অপার্থিব মায়ায়। সে তার সমস্ত সামর্থ্য এক করে, অনেক কষ্টে নাছরিনের ছুটে যাওয়া শক্ত হাতটা ধরার চেষ্টা করে। কোনো কথা নেই, কোনো গালি নেই, এক তীব্র আকাঙ্ক্ষায় শুধু আঙুলে আঙুলের আলিঙ্গন চায় সে। অথচ অতটুকু চাওয়াও পূরণ হওয়ার আগেই পোড়া চামড়ার হাত গলে ফসকে যায় নাছরিন। পাহাড়সম তৃষ্ণা নিয়ে সূর্যের আলো ফোটার অপেক্ষায় অবশেষে আবদুর রহমান চোখ বন্ধ করে।