[দীপেশ চক্রবর্তী (জন্ম: ১৫ ডিসেম্বর ১৯৪৮, কলকাতা) একজন প্রখ্যাত ভারতীয় বাঙালি ইতিহাসবিদ ও তাত্ত্বিক। তিনি মূলত উত্তর-উপনিবেশবাদী ইতিহাসচর্চা ও সাবঅল্টার্ন স্টাডিজের তাত্ত্বিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। বর্তমানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস এবং দক্ষিণ এশীয় ভাষা ও সভ্যতা বিভাগের লরেন্স এ. কিম্পটন ডিস্টিংগুইশড সার্ভিস প্রফেসর হিসেবে কর্মরত আছেন।
শামীম রেজা একইসঙ্গে কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ২০১১ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগদান করেন। পরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন 'তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট'। 'যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে' কাব্যগ্রন্থের জন্য ২০০৭ সালে তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রবর্তিত 'কৃত্তিবাস' পুরস্কার লাভ করেছেন।
৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫ ইতিহাসবিদ দীপেশ চক্রবর্তীর সাথে কবি শামীম রেজা, তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ-এর প্রভাষক ও শিক্ষার্থীদের এ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।]
শামীম রেজা : শ্রদ্ধা ও প্রণতি জানাচ্ছি বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু দীপেশ চক্রবর্তী দাদাকে। যার জন্ম ১৯৪৮ সালে কলকাতায়, বেড়ে ওঠা কলকাতা শহরেই, পূর্বপুরুষের বাড়ি তৎকালীন পূর্ব বাংলায়। বর্তমানে দীপেশ চক্রবর্তী শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস, দক্ষিণ এশীয় ভাষা ও সভ্যতা বিভাগে লরেন্স এ. কিম্পটন সম্মানিত সার্ভিস অধ্যাপক। আমাদের সাথে আছেন, তুলনামূলক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনিভার্সিটি অফ লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ এর বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা।
কবিতাই যেহেতু আমার আরাধ্য, কবিতার প্রসঙ্গ দিয়েই শুরু করছি, ঠাকুরিয়া এন্ড্রুস স্কুলে অভিনয় করতে গিয়ে যে পাঞ্জাবি বালিকাকে মনে ধরেছিল—সেখান থেকে কি কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন? আপনার মননে রবীন্দ্রনাথের যে বীজ, আপনার নিজস্ব চিন্তা-বিজ্ঞানে-ইতিহাসে-নন্দনতত্ত্বে সব বিষয়ের মধ্যে আপনার মধ্যে রবীন্দ্রনাথই আপনার মূল কেন্দ্র।
শিশুর রংমহল থেকে আমরা শুরু করি, এসব আপনি বহুবার বলার পরেও আমার মনে হচ্ছে যে আপনার বুক পকেটের মধ্যে বা আপনার হৃদয়ের মধ্যে গেঁথে আছে শৈশব। সমৃদ্ধ শৈশব সম্পর্কে, বাবা সম্পর্কে, মা সম্পর্কে আলোকপাত করে আমরা অন্য প্রসঙ্গে যাব।
দীপেশ চক্রবর্তী : প্রথমে সবাইকে শুভ সন্ধ্যা, নমস্কার, সালাম, প্রীতি ইত্যাদি জানিয়ে শুরু করছি। আমি তো বিদেশে থাকি, তাই আমার চোখে ইন্ডিয়ায় হোক, কলকাতায়ই হোক, বাংলাদেশি হোক বেশিরভাগই মিডিয়া দিয়ে আসে। ফলে, বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণ স্মরণ করে শুরু করি। ছোটোবেলা বলতে আমার যেগুলো মাথায় আছে, সেদিনই কাজী আবদুল ওদুদ কে নিয়ে একটা ছোট লেখা লিখতে গিয়ে, শিখার শতবর্ষ শুরু হয়েছে তো, মুসলিম সাহিত্য সমাজের সদস্য ছিলেন, তিনি সেটা লিখতে গিয়ে আমি একটা চিঠির মতো লিখে ফেলেছি।
আমার ছোটোবেলায় উনি কলকাতা থাকতেন। আমাদের রাস্তাতেই থাকতেন। তখনও বাঙালি মুসলমান ভদ্রলোক অনেকে ধুতি পাঞ্জাবি পরতেন। ধুতি পাঞ্জাবিটা পরা মোটামুটি ১৯৫০-এর দশকের গোড়া পর্যন্ত চলছিল। পরে পাঞ্জাবি পাজামা হয়ে গেল। উনি যেতেন আমাদের ওইখানে, পাকিস্তান থেকে, আমাদের মামা বাড়ি ঐখানে ছিল, বা পাকিস্তান হবার একটু আগে হয়ত। তখন সবাই বলতো, ঐ দেখ আবদুল ওয়াদুদ যাচ্ছেন, নামকরা লেখক। আমার বয়স তখন ৯-১০ বছর। তারপরে পাঠ্যপুস্তকে ছিলেন আবদুল ওয়াদুদ। কিন্তু এখন আমার ফিরে দেখে যেটা মনে হয় যে, ফজলুল হক যখন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বাংলার সেই সময়কার যে পাঠ্যপুস্তক ছিলো, আইএ পরীক্ষার যে পাঠ্যপুস্তক ছিল, আমি যদি সেখানেই যাই, অনেক অনেক আরো অনেক মুসলমান লেখক বাঙালি পাঠ্যপুস্তক জায়গা করে নিয়েছিলেন। যেমন, প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খান এর লেখা ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পরে এদের অনেককে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। জসীমউদ্দীন, নজরুল, আবদুল ওয়াদুদ এরা অবশ্যপাঠ্য ছিলেন। এখন আমি যখন ফিরে দেখি, তখন আমার মনে হয়, এটা হয়ত পাকিস্তানের উল্টাটা হয়েছিল যে, আমরা স্বাধীনতার পরে আরো বেশি করে হিন্দু হয়েছিলাম। মানে সেক্যুলার হিন্দু নিজের অজান্তে মুসলমানের নিন্দা করতো তা না।
ফজলুল হকের সময় রবীন্দ্রনাথের 'রাজকাহিনী' নিয়ে মুসলমানদের আপত্তি ছিল, এটা পাঠ্য ছিল না। ওটা আবার পাঠ্য করে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হলো। ওরা তখন ভাবতো দেশভাগ হবে না, অখণ্ড ভারতে মুসলমানরা সংখ্যালঘু হয়ে থাকবে।
সংখ্যাগরিষ্ঠের আত্মগরিমা তাদের হবে না, তাহলে কীভাবে থাকা যায়?
উনি তো কলকাতায় থাকতেন স্ত্রীকে নিয়ে, সন্তানরা ঢাকায় বড়ো হয়েছিল। আমার এখন খুবই দুঃখ হচ্ছে, উনি ১৯৭০ সালের মধ্যে মারা গেলেন। তখন আমার বয়স ২০-২১ হবে। আমি ভাবি কেন গিয়ে দেখা করিনি, কেন জিজ্ঞাসা করি নাই যে এভাবে কলকাতায় থাকতে তার কেমন লাগতো, যে কলকাতা তো আরো বেশি হিন্দু হয়েছে। আগের সেক্যুলার মনোভাব নাই। গত ৫০ বছর ধরে আমি দুইটা দেশে থাকি। যেখানে আমি সংখ্যালঘুর মধ্যেই থাকি আমেরিকায়। আমার সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার কোনো চান্স নেই।
অনেকদিন ধরে আমার এই যে সংখ্যালঘুর পজিশন থেকে কী করব, কীভাবে ভাবতে হয়, এটা আমার একটা ভাবনার দিক আমার। বিদেশ বসবাসের একটা সুবিধা হয়, যখন ধরো কেউ বাংলাদেশি বন্ধু হন, সংখ্যালঘুর পজিশন থেকে বন্ধু হন। কারণ এই সাদাদের দেশে তো আমরা কখনো সংখ্যাগরিষ্ঠ হব না। সেই কল্পনাও করি না। বড়োজোর এখানে উচ্চাভিলাষী লোকেরা ভাবে যে, আমার ছেলেপুলে কোনোদিন এমপি মন্ত্রী হবে বা প্রাইম মিনিস্টার হবে, কিন্তু আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হব এটা কখনো ভাবে না।
আবদুল ওয়াদুদ একটা জিনিস অনেক আগে থেকেই ভাবতেন যে সংখ্যালঘুর অবস্থান থেকে কথা বললে কী হয়, সেটা আমরা প্রথম জানতে পারি। এই সমস্যাটার উদয় হয়েছিল ইহুদিদের জীবনে। ইহুদিদের ইউরোপীয়ানরা পুরোটা গ্রহণ করতো না। ইসরাইল প্যালেস্টাইন গোলমালটা ভাবতে পারি এইভাবে যে, ইউরোপের সমস্যা যেটা ছিল সেটাকে মধ্যপ্রাচ্যে ঠেলে দিল।
ইউরোপের সমস্যা ছিল যে ওরা একদিকে এই যে, ইউরোপের সাম্রাজ্য ইহুদিদের পয়সা দিয়ে সাহায্য করছে। অনেক ইহুদি পরিবার ভাবতো ওরা ১৯ শতকে গ্রহণযোগ্য হয়ে গেছে। পরে যখন ইসরাইল নিয়ে আলোচনা হয়েছে ১৯৩০-১৯৪০ এর দশকে ইসরায়েল খালি ইহুদিদের রাষ্ট্র হবে কিনা? তখন কিন্তু হানা আরেন্টের মতো যে বিখ্যাত ইহুদি দার্শনিক, তিনিও তখন বলছে যে না আমাদের শিখতে হবে। যেমন, কাফকা বিপন্ন বোধ করতে করতে গ্রেগরি সামসায় রূপান্তরিত হতে দেখছেন নিজেকে। এই হলো সংখ্যালঘুর মন ও মনন।
যেটা হয় যে ভারতবর্ষেই বলেন, বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের যারা সংখ্যাগুরু তাদের অজান্তেই সংখ্যাগুরুবাদ মনের মধ্যে ঢুকে যায়। আমাদের এক সময়কার এ দেশের ইতিহাসটা কিন্তু চালিত হয়েছে সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘুর হিসাব করে করে। কেউই সংখ্যালঘু হতে চাইত না, কারণ কেউ সংখ্যাগুরু বিশ্বাস করত না। যেমন, এটা অখণ্ড বাংলার কথা যখন হয়েছিল তখন হিন্দু বাঙালি ভদ্রলোকেরা বিশ্বাস করতেন না যে সংখ্যাগুরু মুসলমান হিন্দুদের স্বার্থ দেখবে এবং একটা অখণ্ড ভারতের সংখ্যা গুরু হিন্দুরা মুসলমানদের স্বার্থ দেখবে, এটা নিয়ে তো ভাগ হয়ে গেল দেশটা।
আমার একটা ইন্টারেস্ট আছে যে সংখ্যালঘুর অবস্থান থেকে কী করে ভাবা যায়। আবদুল ওয়াদুদকে আমার খুব ইন্টারেস্টিং লাগে এই কারণে যে তিনি তো স্বেচ্ছায় সংখ্যাগুরুর গরিমা ছেড়ে দিয়েছেন। আমি কিছুদিন আগে ভাবছিলাম, এই যে ছায়ানট ধ্বংস হলো, উদিচি ভাঙচুর করলো। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ছাড়া তো ছায়ানট ভাবা যায় না, তাইতো বাঙালি মুসলমানের ইতিহাসের মধ্যে খুব ইন্টারেস্টিং সব জট আছে।
শামীম রেজা: শৈশবে বেড়ে ওঠা, প্রেম—প্রেসিডেন্সির গল্প স্পর্শ করে যদি শিখা গোষ্ঠী ও অন্যান্য প্রসঙ্গে প্রবেশ করতেন।
দীপেশ চক্রবর্তী: ভর্তি হলাম ঢাকুরিয়ার এন্ড্রুজ স্কুলে। বইপত্র ইংরেজিতে, নীচু ক্লাসে কয়েকজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ও ভারতীয়-খ্রিষ্টান শিক্ষিকাও ছিলেন।
এখানেই একদিন বাংলা ক্লাসে 'দাতব্য চিকিৎসালয়'-এর মানে বোঝাতে গিয়ে 'দাঁতের চিকিৎসালয়' বলাতে শিক্ষিকা স্নেহভরেই বেশ হেসেছিলেন। এন্ড্রুজ স্কুলে ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে পড়ত। বড়ো ক্লাসে উঠে দেখেছিলাম মেয়েদের সঙ্গে বেশি কথা বললে স্কুলের আয়ারা চোখে চোখে রাখে, ধমক দেয়, নালিশ করে ইত্যাদি। কিন্তু নীচু ক্লাসেই ছোটোদের একটি নাটিকায় অভিনয় করতে গিয়ে গোলগাল, ফরসাপানা, পুতুল-পুতুল দেখতে একটি পাঞ্জাবি বালিকাকে আমার বেশ ভালো লেগে যায়। ছোটো তখন আমি, কিন্তু ভালোলাগাটা যে দিব্যি লাগছে, তা বেশ বুঝতে পারছি। অনুভূতিটির নাম জানি না, কিন্তু এই বোধ ছিল যে এর প্রকাশ অনুচিত হবে। আজ তিনি এই কথাগুলো কোনোদিন শুনবে না জেনে নতজানু হয়ে তাঁকে বলি: বলজিৎ চিমনি, তুমিই আমার প্রথম ভালোলাগা রহস্যময়ী রাজকন্যা! এই রহস্যের সেই প্রথম অভিজ্ঞতা আজও আমার গোপন সঞ্চয়।
আমার বয়স যখন আট-নয় হবে, বাবা একদিন আপিস থেকে এসে বললেন, 'চল, তোদের নিয়ে সিএলটি-এর অনুষ্ঠান দেখতে যাব।' 'তোদের' বলতে মা, আমার বোন রিমি ও আমি। 'সিএলটি' কী জানি না, কিন্তু জাদুঘরের আঙিনায় স্মৃতি সত্তা সংলাপ। তাদের প্রযোজিত 'মুগলী' দেখে মন ভরে গেল। তারপর থেকে বাবা সিএলটি-র টিকিট আনলেই আমি মুগ্ধ নেত্রে টিকিটে আঁকা সিএলটি বা শিশুরংমহলের লোগোটির দিকে তাকিয়ে থাকতাম-ঢাল-তরোয়াল হাতে উষ্ণীষধারী একটি শিশু। এই বুঝি নাটক শুরু হলো বলে! আমার জীবনে শিশু রংমহলের অবদান অফুরন্ত। প্রতিষ্ঠাতা সমর চট্টোপাধ্যায়কে, আমাদের 'সমরদা'কে খুব কাছ থেকে দেখেছি। অমন ব্যক্তিত্বশালী গুণী ও দক্ষ সংগঠক মানুষ আমি আর জীবনে দুটি দেখিনি। সিএলটি-তেই পরিচয় হয় সংগীতশিল্পী শৈলেন মুখোপাধ্যায়, পিন্টু ভট্টাচার্য, অর্ঘ্য সেন প্রমুখর সঙ্গে। এঁদের মধ্যে একমাত্র অর্ঘ্যদাই বেঁচে আছেন।
ছোটোবেলার একটি স্মৃতি এখন মনে পড়ে। ১৯৬১ সাল। আমার বছর-বারো বয়স। তখন আমি সমর চট্টোপাধ্যায়-সৃষ্ট শিশুনাট্য প্রতিষ্ঠান শিশুরংমহল বা চিলড্রেন্স লিটল থিয়েটারের খুদে সদস্য। রবীন্দ্রশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে পুনশ্চ গ্রন্থের 'ছেলেটা' কবিতাটির একটি নাট্যরূপ দান করলেন সমরদা। নাটকটিতে আমাদের অভিনয় শেখাতেন আমাদের অতিপ্রিয় অভিনয়-শিক্ষক সুনীলদা বা সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়। হঠাৎ এক সন্ধ্যেবেলা নাটকের মহড়া দিতে গিয়ে দেখি সমরদার সঙ্গে ঘরে ঢুকছেন ফরসাপানা, কোঁকড়ানো চুল, সিল্কের পাঞ্জাবি ও চুড়িদার-পাজামা পরা এক সুন্দর-দর্শন ভদ্রলোক। খবরের কাগজের দৌলতে চিনতে ভুল হলো না: পণ্ডিত রবিশঙ্কর। সারাটি সন্ধে বসে আমাদের রিহার্সাল দেখলেন, আমাদের সঙ্গে হাসিতামাশা করলেন। তারপর চলে গেলেন। দু-একদিন বাদেই সমরদা জানালেন, আবহ ও অন্যান্য সংগীতসহ 'ছেলেটা' নাটকের সংলাপের রেকর্ডিং হবে। যদিও নাটকটিতে মূল চরিত্রে অভিনয় করত আমার তখনকার বন্ধু ময়ূখ ঘোষ-তার বাবা নির্মলকুমার ঘোষ বা 'এনকেজি' ছিলেন নামি চিত্র-সমালোচক-রেকর্ডে মূল চরিত্র 'ছেলেটা'র সংলাপ ছিল আমারই বলা। রেকর্ডিং স্টুডিয়োতে গিয়ে দেখি স্বয়ং রবিশঙ্কর হাজির তাঁর সঙ্গী বাদকদের নিয়ে। 'ছেলেটা'র মিউজিক তিনিই বানিয়েছেন। পরে জেনেছিলাম শিশু রংমহল-কে ভালোবেসে একটি পয়সাও নেননি। কিন্তু কী অসাধারণ সেই সংগীত। রবীন্দ্রনাথ কবিতায় একটি অংশে লিখেছেন, ছেলেটার লোভ হয় গ্রামের 'মরা নদীর বাঁকে' 'জলের ঝিলিমিলি দেখে':
তলায় পাতা ছড়িয়ে শ্যাওলাগুলো দুলতে থাকে,
মাছগুলো খেলা করে।
আরো তলায় আছে নাকি নাগকন্যা?
সোনার কাঁকই দিয়ে আঁচড়ায় লম্বা চুল
আঁকাবাঁকা ছায়া তার জলের ঢেউয়ে।
সেতারে নাগকন্যাদের নাচের সংগীত নিজের হাতে বাজিয়েছিলেন পণ্ডিতজি। সেই অসাধারণ সুর আজও আমার কানে বাজে। অবাক হয়ে দেখেছিলাম, তিনি কেবল একটি দিনের মহড়া দেখে নাটকটির জন্য সংগীত তৈরি করে ফেললেন। অবাক হব না, যদি স্টুডিয়োতে বসেই তৈরি করে থাকেন। স্টেজে যখন সেই সুরের সঙ্গে ছোট্ট নাগকন্যারা নাচত ও তাপস সেনের আলোকসম্পাতের ম্যাজিকে সত্যিই তাদের ঘিরে যেন তৈরি হতো এক 'জলের ঝিলিমিলি', তখন যে মনে মনে কোথায় চলে যেতাম তার কোনো ঠিকানা ছিল না। আজও রবিশঙ্করের সেই সৃষ্টিক্ষমতার কথা ভাবলে-যা নিজে প্রত্যক্ষ করেছিলাম-চমৎকৃত হই।
যৌনতার প্রশ্নটিও আমাদের কাছে সততার প্রশ্নই মনে হতো। এই প্রশ্নকেই প্রচণ্ডভাবে উসকে দিল সমরেশ বসুর শারদীয়া উপন্যাস বিবর। আমাদের ভিতরে এই বোধ সঞ্চিত হচ্ছিল যে, সামাজিক প্রথা ও অনুষ্ঠানগুলি সব ভণ্ডামির আকর। সেই বোধেই যেন ধার দিয়ে গেল বিবর। দেশ পত্রিকায় বেরিয়েছিল উপন্যাসটি। প্রকাশিত হতেই দীর্ঘ প্রতিবাদপত্র লিখলেন প্রেসিডেন্সি কলেজেরই ইতিহাসের অধ্যাপক শ্রদ্ধেয় দিলীপকুমার বিশ্বাস। প্রতিবাদ, প্রতি-প্রতিবাদের ঝড় উঠল। আমরা ছিলাম দিলীপবাবুর বিপক্ষে। উপন্যাসটির ভাষা: 'দিলাম বাবার টেবিলের তলায় ছরছরিয়ে মুতে' (স্মৃতি থেকে লিখলাম, ভুল হতে পারে), বা প্রেমিকের প্রেমিকাকে হত্যা করায়-আমরা খুঁজে পেলাম সামাজিক প্রথার ভণ্ডামির উপর এক চূড়ান্ত আঘাত। আমরা তখন এই উপলব্ধিতে নীত হয়েছি যে, একমাত্র খুল্লাম খুল্লা, স্বার্থভিত্তিক চুক্তি করে করা সম্পর্কগুলোই 'সৎ'। যে-সম্পর্ক তেমন নয়, তা যেন নানা আবেগের মোড়কে স্বার্থসিদ্ধির প্রশ্নটিকে গোপন করে রাখে। তখন ভাসা-ভাসাভাবে অস্তিত্ববাদের কথা শুনছি। কাম্যু-কাফকা-সার্ত্ররা জীবনে আসছেন। কিন্তু সমরেশ বসুর উপন্যাসটিই আমাদের জীবনে ওসব দর্শনের সারবস্তু।
শামীম রেজা: তারা যে লেখাগুলো লিখেছে, ঐগুলো এখন লিখলে আমাদের আর ধড়ের উপর মাথা থাকবে না।
দীপেশ চক্রবর্তী : এখন এগুলো বলা খুব শক্ত। কিন্তু একদিন তো মানুষ পুরো ইতিহাসটা দেখবে। বাংলাদেশ হলো, পাকিস্তান হলো, এখন আজকে কথা বললে কিন্তু আমাদের ৪৭ এর বাস্তবতা এবং একাত্তরের বাস্তবতা মেনে নিয়ে কথা বলতে হবে এবং বলি। আজকের পৃথিবীতে মেজরিটিয়ান হওয়া খুব কঠিন। সব দেশে, ইন্ডিয়াতেও মেজরিটিয়ান চলছে।
শামীম রেজা : মন যে দিল না সারা,
তাই তুমি গৃহহারা—
নির্বাসিত বাহিরে অন্তরে।
শেষ প্রশ্নের জায়গায় আপনি শুরুটা করেছেন আজকে দাদা।
দীপেশ চক্রবর্তী : ওইখানে রবীন্দ্রনাথ ভাবতে সাহায্য করে। সেদিনও আমি এক জায়গায় বলেছিলাম বিবেকানন্দ সম্বন্ধে, আমি যেহেতু ব্রাহ্মণ, পূর্ব বাংলার মূলত শাক্ত, বৈষ্ণব না, পরিবারে বড়ো হয়েছি—আমার জীবনে কিন্তু বিবেকানন্দ আর রামকৃষ্ণ অনেক আগেই এসেছে। রবীন্দ্রনাথ আসছেন পরে, উনি তো ব্রাহ্ম ছিলেন, বাবা প্রবর্তিত ব্রাহ্ম সমাজের গীতিকার।
আমাদের একটা হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের যে প্রাত্যহিকতা, তার মধ্যে যে আচার আশ্রয়—এটা ছুঁইয়ো না—এটা করো না—একজন গুরু রাখো—তার কাছে দীক্ষা নাও কিন্তু অনেক বেশি শাক্ত হিন্দু ভিত্তিটা সেই চর্যাপদের বৌদ্ধ তন্ত্রের মতো, কাজেই আমাদের যে হিন্দু বাড়িতে যখন দীক্ষা নেওয়া হয়, যে মন্ত্রগুলি কানে দেয়, যেগুলি আমার শেয়ার করার কথা না। যার কাছে চর্চা পদ আছে—সেটা একটা আছে একটা স্তর হিসেবে, তার উপর একটা হিন্দু স্ট্রাকচার আছে, সেই স্ট্রাকচারে বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ অনেকেই আমার এখনো অনেক গভীরে বসে থাকেন। ওটা ছোটোবেলায় এমন ভাবে বসানো যেটা ভোলার উপায় নাই । এটারই একটা কারেক্টিভ হিসেবে এবং বাঙালি হিন্দুর উনিশ শতকের শেষে কিন্তু পুরুষের মডেল হলেন দুজন। একজন বিবেকানন্দ আরেকজন রবীন্দ্রনাথ। বিবেকানন্দ খাতরো তেজদের কথা বলেন, আর রবীন্দ্রনাথ কমল ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ যখন কুড়ি ও কোমল বইটা লিখলেন, বিবেকানন্দ একটা কথা আছে, উনি বলছেন না কাকে নিয়ে বলছেন, কিন্তু আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথের নিয়ে বলছেন। "এই যে আজকাল একদল হয়েছেন, সর্বদা বুক চপরে হাসান-হোসেন করছেন, এরা আমাদের পুরুষত্ব নষ্ট করছে"। সেখানে বলতে পারি যে, রবীন্দ্রনাথ বড়ো হওয়াতে জিতে গেলেন। পুরুষ মানুষ বলতে কী বোঝায় সংজ্ঞায় বিবেকানন্দের চাইতে রবীন্দ্রনাথই জিতে গেলেন। বিবেকানন্দ অবশ্য অনেক অল্প বয়সে মারাও গেছেন বটে।
আজকে যদি আমি আবুল মনসুর আহমেদ, কাজী আবদুল ওদুদকে সমান্তরালভাবে দেখি, পাশাপাশি ফেলে দুজনের মধ্যে দুটো আলাদা মডেল আছে বাঙালি মুসলমান হওয়ার। আশা করি একদিন বাংলাদেশে এসব আলোচনাগুলি হবে। বাংলাদেশে আসাটা আমার খেপে খেপে হয়েছে, আহমেদ কামাল আমার প্রথম বন্ধু হলো। ৮০ দশকের গোড়ায়। এই যে দেশভাগের স্রোতটা বয়ে নিয়ে গেল কাজী আবদুল ওয়াদুদ অন্য পাড়ে, তার মনে হলো যে দেশভাগ দিয়ে আমি সংস্কৃতি ভাগ করতে পারব না।
শামীম রেজা : আপনি খুব সুন্দর একটা জায়গা থেকে নিজেকে সংখ্যালঘুর বিচিত্র সংকটের কথা উপস্থাপন করছেন। আমি যে সংখ্যালঘুর জায়গায় আছি, সেই জায়গা থেকে আমি দেখছি, আমাদেরকে আপনি দেখতে পাচ্ছেন কি? মুসলিম সংখ্যাগুরুর ভিতরে থেকেও বিপন্ন এই সত্তা! আজকে যে কথাগুলো বলতে চাই, কিন্তু বলতে পারব না, হয়ত আমাদের অ্যালিগরি দিয়ে রূপকে প্রতীকে গল্প উপন্যাসের কবিতা লিখব। কিন্তু এর থেকে মুক্তি কোথায়?
এটাও তো বুঝতে হবে, বাঙালি হিন্দুরও তো অনেক দোষ ছিল। স্বদেশী আন্দোলনের সময় আপনি মুসলমানদের বুঝেন নাই। যদিও অনেক মুসলমান ভদ্রলোক স্বদেশী আন্দোলনে ছিলেন, প্রচারও করতেন। যখন বুঝতে পারলেন, কিছু মুসলমানদের চাকুরি হোক এটাও তো বাঙালি হিন্দু মেনে নিতে পারে নাই। ফলে বাঙালি মুসলমান যত শিক্ষিত হয়েছে, তার তো মনে হয়েছে যে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে। এখন এই একনলেজমেন্টটা তো আমাদের মধ্যে এখনো পুরোটা আসে নাই।
আমরা এটাকে ইকোনমিক জায়গা থেকে দেখি—বেশিরভাগ হিন্দু জমিদার ছিল এবং বেশিরভাগ কৃষক ছিল মুসলমান। এটা একটা ইকোনমিক সংঘাত। এটার জন্য বাঙালি হিন্দুর একটা দায়িত্ব নিতে হবে, যে এটা সে করছে। প্রথমত সেটা হয় নাই।
দ্বিতীয়ত, যেটা হয়েছিল যে, ৩০-৪০ দশক বিশেষ করে পাকিস্তান রেজুলেশন পাস হওয়ার ১৯৪০ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত, তখন পরস্পরের মধ্যে একটা বীতশ্রদ্ধ ভাব, বিরক্ত ভাব, পরস্পরে শত্রুতার ভাব একটা তুঙ্গে উঠছিল। সেখানে পার্টিশন হয়ে খানিকটা অন্তত আমি বলতে পারি আমার জীবনে প্রথম ১৪-১৫ বছরের একটা শান্তির মতো ছিল। একটা জিনিস ছিল, লোকেরা প্রাইভেটলি মুসলমানের ক্রিটিসিজম করলেও স্কুলে এবং পাঠ্য বইতে সেটা ছিল না। দেশভাগের ফলে অনেকে দুঃখ কষ্ট পেয়েছিল এই উদ্বাস্তু হয়ে। কলকাতাকে তাদের নিজস্ব করতে করতে ১৯৬০-এর দশকে পৌঁছে গেল। ফলে পূর্ব বাংলার থেকে আসা মানুষ কলকাতার রাজত্ব করতো এই শিশু রং মহল তৈরি করেছিল এটা কিন্তু অনেক আগে আসা মানুষের তৈরি।
আমার মনে হয়, বাংলাদেশের ১৯৩০ থেকে ১৯৪০ এর মধ্যে হিন্দু-মুসলমানের বিবাদের যে আন্ডারস্ট্যান্ডিংটা ডমিন্যান্ট হয়েছিল, সেই বোধের ইতিহাস এখনো চলছে।
শামীম রেজা : যেভাবে সুন্দর করে বললেন যে, আমার দুঃখ হয়, কিন্তু ক্ষোভ নাই। কিন্তু এখানে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা, আপনাদের চেয়ে ছোট বয়সীরা, তারা এটাকে প্রতিহিংসার রাজনীতিতে নিয়ে যাচ্ছেন। হিন্দু মুসলিমের সম্প্রীতির সম্পর্কে ভেঙে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চূড়ান্ত রূপ দিতে চাইছেন।
দীপেশ চক্রবর্তী : যেহেতু আমি বাংলাদেশে থাকি না। নানান আলোচনায় আমি অর্ধেক বুঝি, অর্ধেক বুঝি না করে আমার একটা মন তৈরি হয়। আজকে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে মানুষ যে ভাবছে, আমি সেটার সমালোচনা করছি না, কারণ সে অভিজ্ঞতা আমার নাই। আমি বাইরে থেকে বলছি, বক্তব্যের সাথে আমি সহমত না। কিন্তু সে কোন অভিজ্ঞতা থেকে একটা বক্তব্য দিয়েছে সে প্রসেস আমি জানি না। কিন্তু ইতিহাসগত ভাবে আবদুল ওয়াদুদ তার সময়টাও এখন না, আমারও সময় না।
আমি যেটা ওখান থেকে বার করে নিয়ে এসে ভাবার চেষ্টা করি সেটা হচ্ছে যে, ইউরোপের ভেতর থেকে চিন্তাটা এসেছিল। আমি মেজরিটি হই বা মাইনোরিটি হই—সেটা মনে মনে ওই মাইনোরিটি অবস্থান থেকে তৈরি করা যায়। মাইনোরিটি—সে কালচারাল মাইনোরিটি হোক বা ডেমোগ্রাফি মাইনোরিটি—যে মাইনরিটি হোক সে কিন্তু যে মেজরিটি, তার সম্বন্ধে অনেক বেশি জানে। তুমি যেমন নিজেকে কালচারাল মাইনরিটির জায়গায় নিজেকে দেখছো
আমি একটা টেস্ট কেস বলি, আমি তো এই বাংলাদেশের নাটক দেখি, দেখতাম, এখনো দেখি। একটা কারণ ছিল যে আমি খুবই আঞ্চলিক ভাষাগুলি শেখার চেষ্টা করতাম। বরিশাল, নোয়াখালি এবং চাটগার ভাষার নাটক দেখতাম। তারপর আমি নোয়াখালি এবং চাটগার ভাষা আলাদা করার চেষ্টা করতাম।
এ্যাক্টরদের ভালোবেসে ফেললাম এই মোশাররফ করিম, তারপরে ফ্যান হয়ে গেলাম চঞ্চল চৌধুরির। এখন আমি কিন্তু চঞ্চল চৌধুরি কি, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় কি, এটিএম শামসুজ্জামানের বন্ধু ছিলেন প্রবীর মিত্র। এরা কি অসম্ভব প্রত্যয়ের সঙ্গে মুসলমান চরিত্র এখন অভিনয় করে বোঝা যায় না। এটাই হচ্ছে মাইনোরিটি পজিশন। যেখান থেকে হয়ত আমার ধর্মটা আলাদা তা কিন্তু আমি আপনাকে জানি অনেক গভীর করে ভিতর থেকে।
যেভাবে বলেছে যে, বাঙালি মুসলমান কিন্তু বাঙালি হিন্দুর সম্বন্ধে কিছু জানতো কারণ এই কালচারাল মাইনোরিটি পজিশন থেকে বাঙালি হিন্দু মুসলমানকে জানতো না।
ইসলাম সম্বন্ধে আমরা জানি এরকম বাঙালি বন্ধু খুব কম আছে। এই অব্লিগেশনটা হয় নাই। অখণ্ড ভাবে থাকতাম, ওটা অখণ্ড বাংলা হতো, তাহলে কিন্তু আমাদের শুরু হয়েছিল কলকাতায় এই ৩০ এর ৪০ এর দশকেই। আমি এখন খানিকটাই মাইনোরিটি থেকে ডেভেলপ করার চেষ্টা করি যে, কলকাতায় মধ্যে বাঙালি মুসলমানের জার্নালিজম অনেক বেড়ে গেছে, আবুল মনসুর কলকাতায় সাংবাদিকতা করতেন এবং তার বন্ধু শামসুদ্দিন কলকাতা সাংবাদিকতা করতেন। যদি দেশভাগ না হতো তাহলে আমাদের হিন্দু বাংলার বাঙালি ডিভাইস ডেভেলপ করছে, তার উপর একটা ইম্প্যাক্ট হতো।
বাংলা ভাষার বিবর্তনে তখনই এই যে মুসলিম জার্নালিজমে যেটা কন্ট্রিবিউশন লেখা সাহিত্যের সেটা হতো কিন্তু। কতগুলি পসিবিলিটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, যে কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দুই দশকের কলকাতাটা বাদ দিয়ে এরপর থেকে কন্টিনিউ করে, আমরা তো জীবনানন্দ পড়তাম, কিন্তু বরিশাল পড়তাম না। আমরা দর্শনটা নিতাম। কিন্তু কেউ বলতোও যে দেখে আয় ধানসিড়ির নদীটা কেমন দেখতে। দেখে আয় বরিশালের সংস্কৃতি কেমন।
শামীম রেজা : দারুণ দারুণ উদাহরণ দিয়েছেন। বরিশালের ধান- নদী-খালের সংস্কৃতি না বুঝলে জীবনানন্দের 'বাংলার ত্রস্ত নীলিমা' মানে রূপসী বাংলা কীভাবে বোঝা সম্ভব?
দীপেশ চক্রবর্তী : আমার এই বিদেশে থাকার জীবনে অনেক একাকিত্বে থাকি বা থাকতে হয়েছে। কিন্তু বাঙালি হিসেবে আমার একটা সুবিধাটা এটা লাগে যে আমরা যখন একজন আরেকজনের সাথে মিশি, আমি কখনোই কোনো রাষ্ট্রিক একটা প্রকল্পের অংশ হয়ে মিশতে পারি না। যদিও উঠে গেলে বলবে যে ভারতের দোসর বলে বা বলতে পারে, কিন্তু আমি তো কোনো রাষ্ট্রিক প্রকল্পে নাই।
শামীম রেজা : তত্ত্বের যে রাজনীতি সেদিক আমি যাব না। আমি একটু ধর্মের যে রাজনীতি তার মধ্যে একটু প্রবেশ করি। এই যে এক ঈশ্বরের বিশ্বাসের অন্য ঈশ্বরের প্যাগোডা, মন্দির, মসজিদ, ট্যাম্পেল, সিনাগগ, এগুলো ভেঙে দিচ্ছেন। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা এই পরস্পর পরস্পরের যে প্রতিদ্বন্দ্বী এর থেকে নিস্তারের উপায় কি আসলে?
দীপেশ চক্রবর্তী : অনেক মানুষ তো আছেন, যারা মনে করে এটা ঠিকই করছেন। এখন পৃথিবীতে কখনো তো এরকম হবে না যে সব মানুষের একমত হবে। আপনার এটা ভেবেই বাঁচতে হবে যে সব মানুষ একমত হবে না, অনেক সময় আপনি হয়ত মতের দিক থেকে সংখ্যালঘুর মধ্য পড়তে পারেন।
আমার তো অনেক সময় মনে হয় যে পৃথিবীতে আসল সংখ্যালঘু লোক হচ্ছে শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ। এক্ষেত্রে কবিরা হলো আসল সংখ্যালঘু, দার্শনিক আসল সংখ্যালঘু, এদের বাদ দিয়ে যে মানুষ সেই নানান ভাবনায় আন্দোলিত হয়, তার নানান মোটিভেশন আসে। আমি কীরকম একটা ধাপ, কীভাবে এটা ধার্মিক অবস্থানে পৌঁছাতে পারি যেখান থেকে আমি অন্য ধর্মের সম্বন্ধে আরো সহিষ্ণু হব, শুধু সহিষ্ণু হব না, উৎসুকও হতে পারি, কৌতূহলিও হতে পারি তা জানতে পারি, জেনে হয়ত সব জায়গায় আমার সাথে মিলবে না, কোনো কোনো জায়গায় মিলবে, এরকম হতে পারে। নিশ্চয়ই সমস্ত ধর্মের মধ্যেই এমন মানুষ আছেন যারা অনেক সহনশীল।
ধরেন, বাংলাদেশের এবারে অভ্যুত্থানের পরেও কত লোককে বলতে শুনছি যে ঘৃণা অনুভব করেন অন্যের জন্য, ঘৃণা অনুভব করলে আপনার ভেতরে সেই ক্রোধটা আসবে। আমিতো ব্যক্তিগতভাবে ঘৃণা ইমোশনটা পছন্দ করি না, তার মানে কী আমার ভেতরে ঘৃণা হবার ক্যাপাবিলিটি নাই? আছে। কিন্তু এটা তো একটা ব্যক্তিগত চয়েজ যে, আমি নিজে ঘৃণা কতটা অনুভব করব। ঘৃণা অনুভব না করেও অন্যের সম্বন্ধে আপত্তি করা যায়। মানে আপনি ধরে নেন যে সমাজে মানুষ অনেক ভুল করবেই এবং অন্যায়ও করবে, প্রতিবাদও করতে হবে। অনেক সময় বলে থাকে যে রোগটাকে ঘৃণা কর, রোগীকে ঘৃণা কর না।
জুলাই অভ্যুত্থানের আন্দোলনের দুটি জিনিস আমার দার্শনিকভাবে মনে হয় যে একটা ঘৃণা অনুভব করার পলিটিক্স হয়েছে, যেটা ঘৃণা অনুভব করাকে উৎসাহ দিত। ঘৃণা অনুভব করুন এবং কতগুলি পোস্টার আমি দেখছি ঘৃণা ছাড়া আঁকা যেত না, কিন্তু এটা ব্যক্তি একটা ব্যক্তির লেভেল, এটা চয়েজ আমি নিজেকে ঘৃণা অনুভব করতে দেব কিনা। আমি ছোটোবেলা হতে এখনো একটা জিনিস ফেস করি, কিন্তু নিজেকে বারবার জিজ্ঞেস করতে হয়, অনুভব করতে হয় যে আমি কি অন্যের প্রতি হিংসা অনুভব করতে চাই, আমি কি জেলাস হতে চাই। মানুষের তো ক্যাপাসিটি আছে, আমারও ক্যাপাসিটি আছে কাউকে হিংসা করার।
কোনো সময় যে লোভ হয় না, এটা মানে হিংসা করতে ইচ্ছা করে না, তাও তো না, কিন্তু তখন নিজেকে থামাই যে আমি হিংসা করব কি এটা এই অনুভূতি থেকেই চাই জীবনে। সেরকম ঘৃণা নিয়ে তো ভাবার আছে, ঘৃণা কী পলিটিক্যাল ইমোশন হওয়া উচিত? আর একটি কথা ইমানুয়েল কান্ট বলতেন সবসময় যে, তুমি যদি মানুষকে মানুষের মূল্য দাও, তাহলে কোনো মানুষ তোমার কার্যসিদ্ধির উপায় করতে পারে না। তার মানে মানুষ কি উপায় করে ফেল না? এটা বিপ্লবী আন্দোলনে অনেক সময় হয়। এটা হলে কি হয়, যেমন: ধরো, ‘ক’ যদি মৃত্যু বরণ করেন এবং ‘ক’ যদি আমার আমার মতের আদর্শের হয়, তখন সেই মৃত্যু জন্য আমি শোক পালন করি। কিন্তু ‘খ’-এর যদি মৃত্যু হয় এবং ‘খ’ যদি আমার বিরোধী হয়, তখন আমার মনে হয় এটা দরকার ছিল।
কিন্তু ‘ক’-এর বাবা-মা এবং 'খ’-এর বাবা-মা উভয়েরই একই ধরনের ক্ষতি হলো। এবং উভয়ই একই ধরনের দুঃখের ভেতর দিয়ে যাবে। রাজনীতিতে কান্ট-এর যে বক্তব্য যে অন্য মানুষ তোমার উপায় হতে পারে না। এটা পালিত হয় না। কারণ রাজনীতির মধ্য এটা যুদ্ধ মনে করে অনেক ট্যাকটিস আছে—এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে। এই সব পরিস্থিতিতেও আমি যে অবস্থায় থাকি, মাইনোরিটি অবস্থান, কারণ আমার কোনো রাষ্ট্রিক প্রতিষ্ঠান নাই। আমি মনে করি এটার মধ্যে অনেক একাকিত্ব আছে, অনেক দুঃখ আছে। কিন্তু একটা বন্ধুত্বের, ভালোবাসার প্রকল্প করা যায়। কিন্তু অনেকে আমাকে ভুল বুঝে, বলে, আমার কথাবার্তা নাকি ভারতের মানুষের মতোই। আমি যেহেতু ভারতের লোক, আমার কিছু কথাবার্তা ভারতের মতো হতেই পারে।
ফলে ধর্মের প্রশ্নটা একটা ব্যক্তির লেভেলে করা যায়। যখন সামগ্রিকভাবে হয় তখন একটা দেশ, তার নেতৃবৃন্দ, তার পলিসিতে, রাজনীতিতে এত জিনিস চলে আসে, যেগুলিকে একজন ঐতিহাসিক হিসেবে কাটাছেঁড়া করে বোঝা যায় যে কেন এত জিনিস হলো।
দীপেশ চক্রবর্তী : ইন্ডিয়ায় এখন কোনো পার্টি আর হারতে চায় না। যেকোনো ভাবে জিততে চায়। এটার সাথে কিন্তু আরেকটা খুব মোটা ব্যাপারে যোগাযোগ আছে, সেটা হলো রাজনীতিতে অনেক পয়সা। বাংলাদেশের কথা আমি জানি না, কিন্তু ইন্ডিয়াতে গত ৩০ বছরে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ক্রমাগত ক্ষমতা ঘনীভূত হয়েছে এবং কেন্দ্রভূত হয়েছে। ফলে একটি খুব বড়ো ব্যাবসাদার মুকেশ আম্বানির সাধ্য নাই যে কেন্দ্রীয় সরকারের উপেক্ষা করে কিছু করে।
ফলে আপনি যদি পলিটিক্স করে ঐ জায়গায় পৌঁছাতে পারেন, তাহলে শুধু ক্ষমতা নয়, ক্ষমতা ব্যবহার করে আপনি যত কিছু করতে পারেন, জাগতিক ভাবে এটা কেউ ছেড়ে দিতে চায় না আজকাল। ফলে এখন আমাদের দেশে কিন্তু এখন ইলেকশনগুলি অনেক বেশি ডু অর ডাই হয়ে গেছে।
গণতন্ত্রের একটা ধারণা যে ঠিক আছে, আপনার হারতেও হবে আর একটা অন্য দলে এসে পড়বে। এখন এই সিপিএম থেকে গেল ৩৪ বছর পশ্চিমবঙ্গে। অনেক অন্যায় করেই থাকতো। এই ছাপ্পা ভোট করেই থাকতো। এখন ছাড়তে পারত না, কেন, ছাড়তে পারছে না, কারণ এই ইন্টার পার্টির সমাজ সব এক হয়ে গিয়েছে। করাপশন, এগুলো খানিকটা আগেকার সরকার সম্বন্ধে বলা হয়। যে ছবিটা পাই, সেই ধরনের একটি ছবি হয়েছিল। এমনকি বিবাহ বিচ্ছেদও পার্টি ছাড়া হতো না।
তার ফলেই পার্টি ঘিরে আবার অনেকটা প্রভু শ্রেণী হয়েছিল, যেন পার্টির সূত্রে পয়সা খেত। তারাই আবার যখন মমতা জিতল, সিপিএম ছেড়ে অন্যদিক চলে গেল। এখন আজকে যদি বিজেপিও ক্ষমতায় আসে, পশ্চিমবঙ্গের একই কাণ্ড হবে। চট করে এটা আশা করতে পারি না যে, পশ্চিমবঙ্গ রাতারাতি একটা করাপশন শূন্য সমাজ হবে।
শামীম রেজা : আমাদের গরিব দেশগুলোতে আসলে কী উচিত, কিংবা কোন রকমের রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ বা আপনার চিন্তায় বা প্রকল্পের মধ্যে কী হলে ভালো হয়।
দীপেশ চক্রবর্তী: একটি লিবারেল রাষ্ট্র ভোটের মাধ্যমে বিকল্প ও প্রতিবাদী কণ্ঠকে জায়গা দেয়। কারণ এই রাষ্ট্রের বিশ্বাস—মানুষের মধ্যে মতভেদ না থাকলে কোনো কিছুরই উন্নয়ন হয় না, কোনো একটা জিনিসের উন্নতি করা যায় না।
আমি অপোজিশন চাই। যেমন একটা যুক্তি যখন দিই, যেন আমাকে সবাই শালা হারামজাদা না বলে, কেউ আমাকে একটা ভুল দেখাক। আমি যেন তা সংশোধন করতে পারি—গণতন্ত্রের ভেতরে একটা বেসিক কথা কিন্তু এটা যে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর যা করছে, তার জন্য জায়গা করে দেওয়া—এই জায়গাটা এখন পৃথিবীজুড়ে সংকুচিত হয়ে আসছে।
আমি আমেরিকার কথাই বলি, একটা কারণ হচ্ছে যে এই কেন্দ্রীয় সরকারটা অনেক বেশি ক্ষমতা ব্যবহার করে, এখানে যেটা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে যাওয়া, যেটা এখন ভারতবর্ষ অন্যভাবে নিচ্ছে। আমি বলব, তারেক রহমান দেশে ফিরে এসে যে বক্তৃতাটা রাখছে আমার অনেক ভালো লাগছে যে এত অস্থিরতার মাঝে। তিনি যে ১৭ বছর মোটামুটি একটা ডিফারেন্ট জায়গায় ছিলেন, তার কথা শুনলে সেটা মনে হয়। এটা হলে বাংলাদেশসহ পুরো ভারতবর্ষের জন্য ভালো হবে। একটা সরকার যখন অনেক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে, তখন সে সমাজেও একটা প্রভাব পড়ে। সমাজটাও তো রাতারাতি পরিবর্তন হয় না।
শামীম রেজা : তাহলে তো গণতন্ত্রের আগে সমাজটা পরিবর্তনের জন্য সংস্কৃতিটা দরকার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চর্চার।
দীপেশ চক্রবর্তী : হ্যাঁ, কিন্তু সেটা তো শুরুটা হওয়া উচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। আমি সবসময় বলি যে একটা গণতান্ত্রিক সমাজ তৈরি করা খুব শক্ত। যদি আমি ইউনিভার্সিটি গুলি, কলেজগুলির পলিটিসাইজ করে ফেলি, এখন যেটা বাংলাদেশে আলোচনাটা হয় যে—ছাত্ররা দলের লেজুড় সংগঠন হবে না, কিন্তু রাজনীতি আলোচনা করবে। কিন্তু কার্যত আপনারা যারা বাংলাদেশের মব করা বলেন, মব ভারতবর্ষেও হয়, বাংলাদেশেও হয়। এবং এটাতো তরুণদের দিয়ে হতে পারে, এটা তো বুড়ো মানুষ টানবে না। ফলে মুশকিল হয় কি, ওই যে আপনার ওই রকম একটা আলোচনার পরিষদ তৈরি করেন। যেমন এজন্য সর্বশ্রেষ্ঠ জায়গা হচ্ছে ক্লাসরুম—যেখানে আমরা বিরুদ্ধ মতো এনকারেজ করি, এদিক থেকে যদি ইউনিভার্সিটিগুলি যদি মান পড়তে থাকে তখন হয় কি সমাজের মধ্যে যে ইউনিভার্সিটি ফাংশনটা ছোট ছোট গ্রুপে হয়ে যায়। বোধিচিত্ত এরকম একটা, যেখানে মানুষ অল্প বয়সে জানতে চায়, দেখা করে, বই পড়ে, কারো সাথে কথা বলে কিন্তু এটা ইউনিভার্সিটি রিপ্লেস করতে পারে না।
ধরেন, আমি হেগেল দিয়ে একটা গ্রুপে বসে একটা বই পড়লাম আর আমি হেগেলের উপরে ছয়টা সেমিনার করলাম, ইউনিভার্সিটি কোর্স করলাম, এ দুটো তো এক হতে পারে না। আমার এটা খুব মনে হয় যে, একটা গণতান্ত্রিক সমাজে যেহেতু আমি মাস্টার, ইউনিভার্সিটি গুলির একটা চিন্তাভাবনার উন্মুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করা, যাতে নাকি চিন্তাভাবনার উন্মুক্ত ক্ষেত্রে এটা মানুষের মূল্যবোধের অংশ হয়ে যায়। সেটা না করলে এটা গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব তৈরি করা শক্ত হয়ে যায়।
শামীম রেজা : আপনি খুব সুন্দর জায়গায় পৌঁছেছেন, আসলে স্কুলিংটা কে কীভাবে গ্রহণ করে? এই বিষয়ে কতগুলো প্রশ্ন আছে এবং সেটা আপনাকেই প্রশ্ন— আমাদের এই চিত্তে বা বধিতে বা আমাদের চিন্তায় তো আসলে ইউরোসেন্ট্রিক যে জায়গাটা, বিশেষ করে আপনাকে আমি বহুবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছি যে আপনার ভাষাটা নিয়ে, যে কলকাতা আমি যাদের সাথে মিশেছি সে শঙ্খদা হোক, সুনীলদা হোক কিংবা দেবেশদা হোক—তারা একটা মান ভাষায় কথা বলে, কিন্তু আপনি একদম আমাদের ভাষায় আত্মস্থ না হয়েও একদম স্বাভাবিকভাবেই বলেন। সেখানে আক্রমণ না, আমাদের যে চিন্তা, তত্ত্বের যে রাজনীতি, বিশেষ করে আমাদেরকে চাপিয়ে দেয়া তত্ত্বগুলো, সেখান থেকে বেরোনোর রাস্তা গুলো কোথায়? আপনাদের সময় এসে আপনারাই কয়েকটা মানে বিশেষ করে ভারতীয়তত্ত্ব সাবঅল্টার্ন তত্ত্ব।
দীপেশ চক্রবর্তী : আমার এক তরুণ বন্ধু আছে, আমার খুবই প্রিয়, ব্যারিস্টার সাব্বির, ঢাকা সুপ্রিম কোর্টের। আমি বলি যে, সাব্বির, ইউরোপীয় চিন্তাধারা, ইকোয়ালিটি ইন দা এইজ অব ‘ল—এসব তুমি কোত্থেকে পাবে? এটা তো কোনো ধর্ম থেকে আসে না। ধর্ম বলতে হিন্দুদের একটা আইন, মুসলিমদের একটা আলাদা আইন, তুমি সেইভাবে চলো। কিন্তু এই চিন্তাটা না আসলে তো ভারতবর্ষে আম্বেদকর হতো না।
আমরা তো ঈশ্বরের চোখের তুমি আমি এক, তাহলে তুমি আমাকে খারাপ ব্যবহার কর কেন? আমরা তো সবাই ঈশ্বরের সন্তান। এই যে মানুষ বলতে পারল যে, দেখো আইনের চোখে সমান। এটা তো ইউরোপে থেকে আসছে। তখন সাব্বির বলল যে, হ্যাঁ সেটা তো ঠিকই, এটা তো ছেড়ে দেওয়া যায় না।
মেয়েদের স্বাধীনতা মুক্তি— পড়াশোনা করবে, বোরকা পরোটা বাধ্যবাধকতা হবে না। আমি ঢাকা এক মেয়ের কাছে শুনেছি, "কলেজে পড়ার সময় ঢাকার বাহিরে বোরকা পড়তে হতো, পুরোটা। ঢাকায় এসে এই যে এলোচুলে ক্লাসে যাই, এটার যে কত আনন্দ দীপেশ দা, আপনি বুঝতে পারবেন না।" এখন আমি যদি মনে করি যে, এটা আমাদের দরকার, এই মুক্তিটা দরকার, তখন ইউরোপের সাথে কথোপকথন হবেই।
একই সঙ্গে সর্বত্রই ইউরোপীয় ফলো করতে হবে এটা নয়, যতটুকু ভালো ততটুকু। এই যে ইউরোপের চিন্তা আসলো যে, আপনি আর আমি আইনের চোখের সমান বা আপনি আর আমি মানুষ হিসেবে সমান, আপনি বড়লোক হতে পারেন সেটা ধরেন ইসলাম থেকেও আসতে পারতো। সেই সাম্যের চিন্তার মধ্যেও আপনি তো বলতেই পারতেন, একটা বাচ্চাকে মুরুব্বিকে সালাম দেও, বা আমার বাসায় কোনো আত্মীয় আসলে আমি তাকে যৌবনে প্রণাম করতে চাইতাম না। তখন বাবা বলতেন, তারে প্রণাম করলি না কেন? আমি বলতাম, তুমি যে আমাকে বলতে ঐ লোকটা ঘুস খায়। তখন বাবা বলতো ওটা অন্য ব্যাপার, সামাজিকভাবে প্রণাম করতে হয় ইত্যাদি ইত্যাদি।
সেখানে তো বুঝতে পেরেছি আমরা ইউরোপের কাছে থেকে, আমরা নিই, নিয়ে আবার নিজের মতো করে নিজেদের জীবনে অ্যাডজাস্ট করি। মুরুব্বীদের সালাম করতে হবে এটা তো ইউরোপীয় না। তারা হয়ত স্যালুট করার কথা বলবে, ফলে আমরা আমাদের ইতিহাসের মধ্যে থেকে নিই। ফলে কখনোই সর্বাঙ্গীণ ভাবে নিই না।
কিন্তু যেটা বিমূর্ত আইডিয়া, যেমনভাবে একটা অঙ্ক শিখতে পারেন, সেভাবে শিখছেন। কিন্তু অনেক সময় আমাদের আইনের কোর্টে সেটা হয় না, অনেক সময় হয়ত পলিটিক্যাল ইনফ্লুয়েন্স করলাম, পয়সা দিয়ে ইনফ্লুয়েন্স করলাম, ফলে কার্যত যার পয়সা আছে আইনের চোখেও সমান না, এই আর কি। কিন্তু আদর্শটা তো এটা, এবং সেই আদর্শটা বুঝতে গেলে আপনাকে খানিকটা ইউরোপিয়ান চিন্তকদের পড়তেই হবে।
শামীম রেজা : খানিকটা না। যতটুকু ভালো তাই নেব। কিন্তু আপনারা প্রথম কিন্তু খুঁজলেন, এবং প্রথম কোন ভারতীয়, মানে আপনাদের গ্রুপটাই যে যারা পৃথিবীকে একটা নতুন তত্ত্ব দিলেন সেটা ইতিহাসের চিন্তার জায়গা থেকে। আমাদের হাসান আজিজুল হক ফিলোসফি পড়েছেন সারা জীবন। তার লেখা পেয়েছি। তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছি যে ভারতীয় বাঙালির কোনো দর্শন নাই এটা কি হতে পারে হাসান ভাই?
দীপেশ চক্রবর্তী : দর্শন বলতে যেটা গ্রামসি বলতেন যে, প্রত্যেক মানুষেরই দর্শন আছে। প্রত্যেক মানুষই জীবনটাকে ভাবে। সে সবচেয়ে সচেতনভাবে দর্শন করছে না, দর্শন বিদ্যাটা তার নাই। কিন্তু তার কাছে একটা মতামত চাইলে সে তো দার্শনিকতাই বলবে। নতুন পলিটিক্যাল ধারণা যেগুলো ইউরোপ থেকে আসছিলো, সেগুলো আমাদের পক্ষে খুব ইনস্পায়ারিং ছিল। আইনের চোখে সবাই সমান, এটা তো ইনস্পায়ারিং আইডিয়া ছিল। এটা তো সত্যি কথা, ততটা তো ইউরোপ নিজেই মানে নাই, তাহলে তো আর জাতি বিদ্বেষ হতো না। বর্ণ বিদ্বেষ হতো না। ইউরোপিয়ানরা তো নিজেরাই মানে নাই। এই তাদের বানানো আইন।
তার জন্য গান্ধী বলতেন যে ওদের কথা ওদেরকে মনে করিয়ে দিতে হবে। গান্ধী যখন আফ্রিকায় ছিলেন, তখন বাড়িবাড়ি বর্ণবিদ্বেষী কিছু ঘটলে তখন আইনের কাছে যেতেন। আইন বিশ্বাস করতো যে ইউরোপের আইডিয়াগুলি ভালো, লোকগুলি খারাপ। ওদের তো ওরা নিজেরাই মানে না। তাহলে তো সাম্রাজ্যবাদ হয় না, কিন্তু সেগুলো আমি এটা সাম্রাজ্যবাদ সত্ত্বেও শিখি, সাম্রাজ্যবাদটা ইগনোর করে শিখে না। যে আমার উপর অত্যাচার করে, তারও চিন্তায় এমন একটা কিছু থাকতে পারে। যেটা সে নিজেই বিকৃত করছে আমাকে অত্যাচার করার জন্য। তখন অনেকখানি বলতে পারি যে, তোমরা তো তোমাদের আইডিয়াগুলো পালন করো না।
প্রশ্নোত্তর পর্ব
লাবনী আশরাফি : আমার প্রশ্নটা হচ্ছে যে এই অঞ্চলে, মানে বৃহত্তর ভারতবর্ষ ধরি, আমাদের কালচারে, ধর্মে বা যাপনের আইডিয়া কি ছিল না? আমাদের ইউরোপ থেকেই কেন শিখতেই হলো? আমাদের এই জায়গাকে আমরা এক্সপ্লোর কেন করলাম না?
আমি আদিবাসী ভাষা সাহিত্য পড়াই, এই সূত্রে আমার একটাই কাজ এখন চলছে গারোদের নিয়ে। আমি দেখি যে ওখানে, মানে মানুষের মধ্যে কেবল ইকোয়ালিটির ভাবনা আছে তা না, তারা প্রকৃতিকেও সমান কখনো তাদের উপরে স্থান দিচ্ছেন।
আমি একেবারেই কৃষক ফ্যামিলি থেকে আসা। সেখানে দেখছি নবান্নে নানুকে দেখতাম যে সবাইকে একসাথে খাওয়ানো, সকালবেলা সে কাকের জন্য খাবার দিচ্ছে। এই যে মানুষ এবং প্রকৃতিকে এক করে যে ইকোয়ালিটি, যে ভাবনাটা সেটা তো আমরা এক্সপ্লোর করি না, কিন্তু আমরা তাত্ত্বিক জায়গা থেকে ইউরোপ থেকে নিচ্ছি, এই জায়গাটা আসলে ব্রিজিং করছি না কেন?
দীপেশ চক্রবর্তী : আপনি খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, এখানে আমি দুইটা বিষয়ে ভাগ করি। এক হচ্ছে আইনের চোখের সমতা। আরেকটা হলো, মানুষ হিসেবে আর আরেকটা মানুষকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ডিগনিটি দিয়ে ব্যবহার করা। সেটা ন্যাচারালি ইকোয়ালিটি নাও হতে পারে। যেমন: ধরেন, আপনি আপনার কোনো বড়োলোক আত্মীয়র বাসায় গেলেন, কিন্তু তারা আপনার সাথে এমন ব্যবহার করলেন যে তার মধ্যে বড়োলোকি ছিল না। আপনাকে ছোট ফিল করেন নাই, সেটা একটা অন্যধরনের প্র্যাকটিস।
আমি আইনের চোখের ব্যাপারটা এইজন্য বলছি যে, এটা আসলো কোত্থেকে? আগে তো ভারতবর্ষের নানা রকম মুদ্রা চল ছিল। যতই ইকোনমিতে ইন্টিগ্রেট করে এক করার চেষ্টা করছে, তখন আস্তে আস্তে এক মুদ্রা করতে হলো। ঠিক সেইভাবে, যত দেশটা বড়ো হয়ে যায়, তখন এই যে আইডিয়া—মানে ইকুয়াল পানিশমেন্ট ফর ইকুয়াল ক্রাইম, এই যে একটা স্ট্যাটিসটিকাল ম্যাথমেটিক্যাল আইডিয়া অফ সমতা—সেটা তখন ওই যে ইকুয়াল পানিশমেন্ট ফর ইকুয়াল ক্রাইম, এবং সেই ইকুয়ালিটিটা হবে ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে, এই যে একটা আদর্শ, আইনের আদর্শ, যা আইনের চোখে আমরা সবাই সমান—এটাই ইউরোপে ডেভেলপ করছিল ইউরোপের স্কেল বাড়ার কারণেই। এটা একটা আদর্শ, যেটা বললাম, ওরা ও পালন করত না, নিজের দেশের দ্বারা, কখনো বর্ণবিদ্বেষের দ্বারা চালিত হতো।
অন্য যে কথাটা আপনি বললেন যে মানুষ এবং মানুষের বাইরের সংসার আধুনিক ইউরোপীয় চিন্তায় অনেকদিন পর্যন্ত নেগলেক্ট করছে। আপনি যদি ইউরোপের কৃষি সমাজে যান তাহলে কিন্তু আইডিয়াগুলো পাবেন। মানে ইউরোপের কৃষি সভ্যতায় এগুলি পাবেন। কিন্তু যখন কৃষি সভ্যতাও এটা ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে চলে আসলো, এটাও একটা ব্যাবসা শিল্প। কসাইখানার একটা শিল্প। এখন ফার্মিং ইন্ডাস্ট্রি হলো। যখন স্কিলটা বেড়ে এটা হলো তখন কিন্তু ইউরোপীয় চিন্তায় মানুষ কেন্দ্রিকতা আসলো। যেটার পরিবেশগত কুফলগুলি আমরা এখন দেখতে পাই। সেই দিক থেকে আপনি যাদের সেই গারোদের মধ্যে কাজ করেন, মানে গারো, সাঁওতাল ইত্যাদি বানিয়েছে, আমরা যাদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলি বা ইনডিজেনাস লোক বলে, এদের কিন্তু পরীক্ষিত সত্য যে এদের লাইফস্টাইল অনেক সাসটেইনেবল।
কিন্তু আজ পৃথিবীতে ৮ বিলিয়ন মানুষ, এদের লাইফস্টাইল ইংরেজিতে বলে স্কেল আপ করা যায় কিনা, মানে ৮ বিলিয়ন মানুষকে খাওয়াতে গেলে আমরা এইভাবে খাওয়াতে পারি কিনা। এই চিন্তা করে দেখাতে পারি কিনা— এই প্রশ্নটা ওঠে। সেই প্রশ্নটা নিয়ে এখন নানান ডিবেট হয়। অনেকে বলে যে, আজকের পৃথিবীর যে সমস্ত অঞ্চলে জীব-বৈচিত্র্য খুব বেশি, সেগুলিতে কিন্তু এখন এই আদিবাসী জাতের মানুষেরা বাস করেন। ফলে এদের কাছ থেকে অনেক সময় আমাদের শিক্ষা নেবার আছে। কিন্তু সেই শিক্ষাটাকে আমি ৮ বিলিয়ন মানুষকে কীভাবে অ্যাপ্লাই করব সেটাও শেখার আছে।
সুমাইয়া উর্মি: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে একদম চোখের সামনে থেকে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান দেখেছি, আমার বন্ধুর একটা ছোট্ট কর্মকাণ্ড, খুবই ছোট যেটা কখনো মিডিয়ায় আসবে না, বইয়ে লেখা হবে না হয়ত— কিন্তু সেটা আসলে কীভাবে বাংলাদেশের ভিত নাড়াতে পারে। সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় যখন রাষ্ট্রের জন্ম বা পুনর্জন্মের জন্য কাজ করছে তখন আসলে ওই আপনি যে কথাটি বললেন যে বিশ্ববিদ্যালয়কে আসলে তার এই রূপ থেকে বের হয়ে আসতে হবে—এটা আসলে সাংঘর্ষিক হয়ে যাচ্ছে কিনা, বা আমরা আসলেই এরকম কোনো জিনিস ভাবতে পারি কিনা, মানে আমার কাছে মনে হচ্ছিল এটি বলার জন্য বলা, বাস্তবে আসলে এটি সম্ভব কিনা?
দীপেশ চক্রবর্তী : আপনাদের যে অভিজ্ঞতাগুলি তা সরাসরি অভিজ্ঞতা, সেগুলো তো আমার নেই। তাহলে আমি এই অভিজ্ঞতা বলতে পারি না, কিন্তু আমার কাছে একটা জিনিস মনে হয়, যখন গণ-অভ্যুত্থান হলো, তার মধ্যে যারা নেতা ছিলো, তাদের কয়েকজনকে আমি চিনতাম। চিনি আর কি ভালোবাসি! আমার একটা সংগ্রাম চলছে, সেই সংগ্রামটার ভিতরে আমিও তো সংগ্রামের কারণেই, হয়ত সংগ্রামের কারণে ভিন্ন স্বর শুনতে চাই না। কিন্তু গণতন্ত্রের কী এভাবে হয় যে, আমি এখন টেম্পোরারি, আমার কানটা ভিন্ন শরীরের প্রতি বন্ধ করে দিলাম? তারপরে সব কিছু ঠিক হয়ে গেলে বলবেন, দীপেশ দা বলেন, এখন শুনি।
এখন এইভাবে কিন্তু লেনিন ভাবতে না, আমি বলছি যে এর উদাহরণ নাই তা না। কিন্তু আমার নিজেকে অনেক বেশি গান্ধীবাদী লাগে। নিজেরাই আমার মনে হয় যে উপায় এবং লক্ষ্য—এ দুটোর মধ্যে একটা মিল থাকা উচিত। তাহলে সংগ্রামটা আমাকে গণতান্ত্রিক করে। আমি বলেছিলাম বিরোধী মতকে শুধু সহ্য করা নয়, বিরোধী মতের জন্য বসে থাকা, কারণ আমার মতে তো ভুল থাকতে পারে। গান্ধী অনেক সময় অহিংসতার এই যুক্তি দিয়ে জাস্টিফাই করতেন যে, আমি তো কোনদিনই ১০০ ভাগ নিশ্চিত হতে পারি না। যে আমার মত ঠিক আর তোমার মত সম্পূর্ণ ভুল। তাহলে আমি তোমারে অপসারণ করব কোন যুক্তিতে? আমি ফিরে যাই ক্লাসরুমে, যে ক্লাসরুমটা একটা প্রটেক্টেড স্পেস যেখানে এই প্র্যাকটিসটা করা যায়। একটা অ্যাকচুয়াল সংগ্রামের মধ্যে থেকে প্র্যাকটিস করা শক্ত। সে জন্য আমি বলেছি, এই প্র্যাকটিস থেকে যদি সংগ্রাম করতে হয়, তার একটা প্রস্তুতি পর্ব লাগে। সেই প্রস্তুতি পর্বটা শিক্ষাপ্রাঙ্গণ। শিক্ষাপ্রাঙ্গণ যাতে একটা পার্টিজন পলিটিক্স এর শিকার না হয়। যেটা করা খুব শক্ত, কারণ আমাদের দেশের চট করে অনেক ধরনের ইন্টারেস্টিং সামাজিক কারণে এগুলো পার্টিজন পলিটিক্সের উপায় হয়ে দাঁড়ায়। যে কারণে ছাত্রজীবনে মতপার্থক্য বিনিময়ের বদলে মারপিট হয়ে যায়। ফলে আমার কাছে মনে হয় যে, এই কলেজ, ইউনিভার্সিটি এগুলোর খুব রোল আছে। সমাজটার ভিতরে একটা গণতান্ত্রিক মনোভাব আনার জন্য—এটাই বলছিলাম।
হেমায়েত উল্লাহ ইমন : সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, নতুনভাবে মুসলিম সাহিত্য লেখার চেষ্টা চলছে, তারা বলে যে আমরা একটা মুসলিম কালচার চাই। দেখা যাচ্ছে, প্র্যাকটিসিং মুসলিম না। নামাজ পড়ছে না, আবার রোজা রাখছে না। কিন্তু সে একটা কালচারাল জায়গা থেকে ইসলামকে দেখতে চাচ্ছে। মুসলিম সাহিত্য বা হিন্দুয়ানি সাহিত্যের বাইনারি আসলে কতটুকু করা যায়?
দীপেশ চক্রবর্তী : এটা নিয়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সাহেবের একটা খুব ভালো উক্তি আছে, তিনি বলেছেন যে, মুসলিম সাহিত্য যে মুসলমান কি করতে হবে তা না। উনি বলছেন যে, যদি কোনো হিন্দু মুসলমানকে ভালো করে জেনে উপন্যাস লেখেন, সেটাই তো মুসলিম সাহিত্য। সেজন্যই চঞ্চল চৌধুরীকে উদাহরণ দিয়েছিলাম। সত্যিই জন্মগতভাবে, পারিবারিকভাবে ধর্মে সে হিন্দু। জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় কিন্তু মুসলমান চরিত্রে অনায়াসে ডুবে যেতেন। সেখানে এটাও বলতে পারি, যখন ইস্ট পাকিস্তানে শরৎচন্দ্রের বইয়ের ছবি হয়েছে, তাতে এটিএম শামসুজ্জামান অভিনয় করেছেন। তার কিন্তু অভিনয়ের মধ্যে তিনি যতটা হিন্দুদের জানতেন, আমি অতটা মুসলমানকে জানি না। একটা জেনুইন সমস্যা ছিল। সমস্যাটা কী ছিল, একবারে রবীন্দ্রনাথকে এক লেখক একটা বই পাঠিয়েছিলেন। তখন রবীন্দ্রনাথ বললেন যে, ভালো লিখেছ, কিন্তু এত আরবি ফারসি কথা কেন? তখন উনি বললেন যে, গুরুদেব আমরা তো এই ভাষায় কথা বলি। এই যে পূতি সাহিত্যে যে ভাষা, সেটা তো অনেকটা মুসলমান পরিবারের ভাষা। এগুলো সম্বন্ধে হিন্দুরা সত্যি অজ্ঞ। এই অজ্ঞতা নিয়ে তো করা যায় না। আমার কাছে মুসলিম সাহিত্য বলতে যে মুসলমানের সমাজের সঙ্গে, ধর্মের সঙ্গে, আচারের সঙ্গে পরিচিত হয়ে লিখবে। তার ধর্মটা কি আসে যায় না।
শরৎচন্দ্রকে একবার একদল মুসলমান বলেছিল, আপনি আমাদের নিয়ে লেখেন না কেন। শরৎচন্দ্র বললেন, তোমাদের চিনি না বলেই তো লিখি না, তোমরা তো ঘরের মেয়ে বের করো না, আমি তো ঘরের কথা লিখি। মানে তার মডার্ন উপন্যাস, সেটা তার সাথে ডোমেস্টিক সিটির বর্ণনার খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। প্রেমের কথা, আসবাবপত্রের কথা, মহিলা দুঃখের কথা এ অভিযোগটা মোটা দাগে সত্যি।
যে হিন্দুরা যে সাহিত্য করছে তাতে মুসলমানের অস্তিত্ব খুব কম ছিল। শেষের দিকে একদম পদ্মানদীর মাঝি অমরেন্দ্র ঘোষের লেখা ‘চর কাশেম’ একদম শেষের দিকে আসছিল। হয়ত দেশভাগ না হলে আরো আসতো। কিন্তু তাও তো ১০০ বছর থেকে ১৫০ বছর হয়ে গেছে। নবাবি মুসলমান ছাড়া তো বঙ্কিমের নবাবি তাতে মুসলমান নাই। পাঠান মুসলমান, আফগান মুসলমান। এক রহিম শেখ নামটা কেন কিন্তু রহিম শেখের সঙ্গে লিখছে, পরিচয় ছিল না। এটা একটা ঐতিহাসিক সত্যিকারে মানতে হবে যে। হিন্দুরা জানতো না, কোনো ছিলো না। তাদের দোষ বলে লাভ নাই। ফলে আমার বর্তমান সময় কর্তব্য সেটা নিয়ে কথা বলতে পারি। কিন্তু যদি দোষ দিতে হয়, দেওয়া যায়।
সাদিয়া আফরিন : আমার কাজ মূলত ভাষা নিয়ে, উপভাষা নিয়ে। আমাদের সমাজে আমরা এখনো উপভাষা গুলোকে অনেক বেশি অসম্পূর্ণ ভাষা কিংবা অপরিণত ভাষা কিংবা অপভাষায় হিসেবে দেখি, এটার কি কোনো ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ আছে কিনা বা ঐতিহাসিক কোনো উৎস আছে কিনা? এই একটা ভাবনার ব্যাপারে আসলো।
আরেকটি বিষয়, সাবলটার্ন স্টাডিজ-এর আলোকে কি উপভাষাকে আমরা প্রতিরোধের ভাষা হিসেবে পাঠ করতে পারি কিনা?
দীপেশ চক্রবর্তী : দ্বিতীয়টার উত্তর প্রথমে দেই। উপভাষার সবসময়ই একটা ডমিনেন্ট ভাষাকে প্রতিরোধ করে। ধরেন এরকম যদি হয় দরিদ্র গোষ্ঠী, বা শহরের গুন্ডা গোষ্ঠী—এখন তারা অনেক অশ্রাব্য কথা ব্যবহার করে তাদের ভাষার মধ্যে। ঐ কথার ফলে ভদ্রলোক জাতীয় লোক, মানে আমার মতো লোক চট করে তাদের মধ্য ঢুকতে পারে না। ফলে কিন্তু ওরা নিজেদের জীবনটা আমার থেকে প্রটেস্ট করে নিয়েছে। এটা হচ্ছে প্রতিরোধ। আপনি প্রতিরোধ না করলেও এই দুইটা ভাষা যেন পরস্পরের মধ্যে ঘষা খায়। আপনি জানেন যে, বঙ্কিম বিদ্যাসাগরকে পছন্দ করতেন না। বঙ্কিমের মনে হচ্ছে যে, বিদ্যাসাগরের রসিকতা গুলি খুব কুরুচিপূর্ণ। বাংলা ভাষায় বঙ্কিম রবীন্দ্রনাথ থেকে একটা পরিশীলিত ভাব আসছিল। আবার হয় কী এ পরিশীলন যদি না হয়, তাহলে আবার অনেকগুলি পরিবর্তন হয় না। ধরুন আপনাকে একি কথা আরো সূক্ষ্মতম ঠাট্টায় করতে হবে। এই সূক্ষ্মতম ঠাট্টা করতে গিয়ে কিন্তু সাহিত্যে মিথের ব্যবহারটা বেশি হবে। তখনই হাস্যরসের মধ্যে—আপনি আরেকটা জায়গার মধ্যে নির্মল হাস্যরস পাবেন।
আমার যেটা অনেক সময় মনে হয়, বাংলাদেশ কলকাতার চেয়ে অনেক বেশি ডেমোক্রেটিক। আঞ্চলিক ভাষাকে অনেক বেশি জায়গা করে দেয়। আমি যত চট করে টেলিভিশন নাটক দেখে বরিশালের ভাষা চিনতে পারি, কিন্তু কলকাতার টেলিভিশনের নাটক থেকে অত সহজে বাঁকুড়া বা মেদিনীপুর-এর ভাষা শিখব ঠিক করতে পারি না। কারণ কলকাতায় ওই সম্মানটা তারা পায় না। এটা ভালো দিক, এটা হলো অনেক বেশি ডেমোক্রেসি।
আমি তো পূর্ব বাংলার বাড়ির ছেলে, ফলে আমার উচ্চারণের চন্দ্রবিন্দু আসতো না, শব্দে 'ম' থাকলে আসতো না, 'ড়' এবং 'র' পার্থক্য করতাম না। কিন্তু আমাদের যেহেতু আবৃত্তি প্রতিযোগিতা ছিল, স্কুলে স্কুলে হতো এবং বড়ো বড়ো লোকেরা আবৃত্তি করতেন। শিশির ভাদুড়ী থেকে শম্ভু মিত্র আবৃত্তি করতেন। আমরা তখন খুব মন দিয়ে ওদের কাছ থেকে শুনতাম এটা কী করে করতে হয়। আমি তো বলতাম বিস্ময়, আমি বিস্মিত হলাম। আরো যারা বড়ো পড়ুয়া আছে তারা বলতো, এটায় তো 'স' এর সাথে 'ম' আছে— এটাকে তো বিস্ময় বলতে হবে। আমার কিন্তু এই দুটো চর্চাই দরকার হয়।
ইনক্লুসিভিটি দরকার এবং অন্যটাও দরকার। অন্যটা দিয়ে একটা মান তৈরি হয়। মান মনে হায়ারার্কি। ফলে আমার নিজের মনে হয় হায়ারার্কি ও ডেমোক্রেসির মধ্যে একটা সুষ্ঠু ভারসাম্যে পৌঁছানো প্রয়োজন। কলকাতা ইনক্লুসিভিটি কম ফলে হায়ারার্কিটা প্রেসিভ হয়ে যায়। যে কারণে আবুল মনসুর আহমদের যে অভিযোগ সেটা তো ঠিকই। ফলে আমার নিজের মনে হয় যে দুটোরই দরকার আছে। কারণ ইনক্লুসিভটা খুব দরকার, কারণ ইনক্লুসিভটা আমাদের ভাষাকে রিচ করে। নানান বৈচিত্র্য আনে তার ভেতরে। এটা না হলে আবার ভাষাটার রুট শুকিয়ে যায়। আবার একই সঙ্গে একটা অনুশীলন, পরিশীলন ও একটা চর্চা দরকার।
ইনক্লুসিভিটি দাবিটা খুব ভালো এবং জোরালো এটা বাংলাদেশের ডোমেস্টিক রেস্পেক্ট। ভাষিক ডেমোক্রেসি, রাষ্ট্রিক ডেমোক্রেসি এটা রেস্পেক্ট। কিন্তু মানের দাবিটা আরো জোরদার হওয়া উচিত। মানে কিন্তু একটা হায়ারার্কি আবার তৈরি করার চেষ্টা এবং যে হায়ারার্কি লোকে মেনে নেয়।
যেমন ধরুন, আমাদের মানতেই হবে যে, জীবনানন্দ দাশ একজন অতি অসাধারণ কবি। এটা যদি আমি না মানি তাহলে আমার কবিতার মান ঠিক হবে না। আমি যদি না মানি যে শক্তি চট্টোপাধ্যায় একজন জাত কবি, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল একজন অসাধারণ কবি—এগুলো যদি না মানি তাহলে হয় কি কবিতা চর্চাটা হয় না।
শামীম রেজা : আপনাকে যে গান্ধীবাদী লাগে এটা তো আপনার জীবন চর্চা—আপনার লেখালেখির শুরু থেকেই এটা বোঝাই যাচ্ছিল। কিন্তু গান্ধী কোথা থেকে আসলেন, তার উৎস মূল জায়গাটা যে নালন্দা, তক্ষশীলা, গারো কিংবা মান্দিদের নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে আপনি আমাদের ৮০০ কোটির লোকের মধ্যে একটা দর্শন ও সংস্কৃতি ছড়ানোর কথা বললেন। এখানে কী আমরা মানে সমন্বয়ের দিকে যেতে পারি কিনা যে, গান্ধী আসলে কি বুদ্ধের জায়গা থেকে কতটুকু নিয়েছিলেন?
দীপেশ চক্রবর্তী : আমি একটা কথা বলি, গান্ধীর থেকে প্রকারান্তরে বুদ্ধের কাছ থেকে পাই অনেক বেশি। এই যে, বুদ্ধের যে একটা কথা আছে 'করুণা' এবং রবীন্দ্রনাথের একটি গান আছে বুদ্ধকে নিয়ে— 'শান্ত হে, মুক্ত হে, হে অনন্তপুণ্য,/করুণাঘন, ধরণীতল কর কলঙ্কশূন্য'—এটা আমার কাছে প্রার্থনা মতো শোনায়। এটা তার কাছেই প্রার্থনা করা যায়, যার ভিতরে অনন্ত করুণা আছে। এই করুণা কিন্তু কে আমার ধর্মের, কে আমার ধর্মের নয়—তাই দিয়ে তৈরি নয়। এটা পশুপাখিদের প্রতি হতে পারে, জীবনের প্রতি হতে পারে। করুণা মানে অনুকম্পা নয়। করুণা মানে কাউকে ছোট করা নয়। এই বোধটা কিন্তু রবীন্দ্রনাথের থেকে ফিরে আসে। এই বোধটা কিন্তু রবীন্দ্রনাথের খুব স্ট্রং। রবীন্দ্রনাথ কিন্তু বুদ্ধকে আদর্শ মানুষ মনে করতেন। আমার মনে হয় যে ওই করুণার কথাটা মাঝে মাঝেই মনে আসে। জীবনানন্দ বলেছেন, পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন। আমার মনে হয় যে পৃথিবীতে করুণার খুব অভাব হচ্ছে।
শামীম রেজা : আলোচনাটা খুব চমৎকার জায়গায় এসে পৌঁছালাম। দীপেশ দা, আমরা এটাই চাইছিলাম, যে আজকে আমরা একেবারে অন্য রকমের করেই ক্লাসরুমে পেলাম আপনাকে।
দীপেশ চক্রবর্তী : সবাই ভালো থাকবেন। সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। আবার দেখা হবে। প্রশ্নগুলো খুব ভালো লাগলো। শামীম তুমি ভালো থেকো, দেখা হবে আবার।
শামীম রেজা : ভালো থাকবেন দীপেশদা। ধন্যবাদ। সবাইকে ধন্যবাদ এত সুন্দর প্রশ্ন করার জন্য, বিশেষ করে ধন্যবাদ শিক্ষার্থীদের প্রতি যারা ধৈর্য ও আগ্রহ ভরে আমাদের কথোপকথন শুনছো।