ঈদ সংখ্যা ২০২৬

মদারু কুমির

কার্তিকের ক্ষীণস্রোতা নদী— তবু প্রবাহ, চিন্ময়, শান্ত; অযুতকালের স্মৃতি নিয়ে বইছে।

সূর্যের আদুল আলো, অপ্সরীগণের গহনাসদৃশ প্রভাময়, সারাদিন ঠিকরে পড়ে জলে সোনালি— রুপালি ধারা। আজ যা গল্প, স্মৃতি; —পর্যাপ্ত ইলিশের কালে এই নদী আকাশ থেকে নেমে আসা সোনালি— রুপালি প্রবাহই ছিল। পশ্চিমে ফারাক্কা, বিভিন্ন বাঁধ, অতঃপর মরে যাওয়া শিখতে শিখতে ভুলে যেতে যেতে ইলিশের ঘ্রাণ— নদী, চলছে, অশীতিপর।

হঠাৎ তবু এই কার্তিকে, ঢল—গোপীনাথপুরে পদ্মা আর গড়াইয়ের সংযোগস্থলে যেখানকার নাম হয় মহানগরের ট্যাক, সেদিকে এগিয়ে আসতে দেখে বছরের পর বছর বসবাস করা নদীপাড়ের মানুষেরা ঔৎসুক্য ও একই সাথে বিপন্নতা বোধ করে, নদীর তাড়া খাওয়া চৌদ্দপুরুষের লড়াকু শোণিত যদিও তারা বহন করে; তবু এখন ন্যূনতম বর্ষাও নয়, এই কার্তিকে— এখনো বিগত আশ্বিনের শুভ্র মেঘ পড়ে আছে কাশবনে।

ঢল, কালো— যেন টুকরো টুকরো পাহাড় ভেসে আসছে পশ্চিম থেকে, গতিতে নয়, ধীরে, ধীরে; নিত্যদিনের মতোই রাতে বিছিয়ে রাখা কারেন্ট জাল জল থেকে টেনে নৌকায় তুলতে তুলতে দৃশ্যটা প্রথমে দেখে রজ্জব— ও আব্বা, কীসের ঢল এই শুক্নোর কালে।

শমশের প্রামাণিক তখন হয়তো কার্তিকের সকালের মৃদুল কুয়াশার ব্যূহ ঠেলে দৃষ্টি স্থাপিত রেখেছিল পদ্মার ওপারে শানিকদিয়ায়ের চরের দিকে, হয়তো শানিকদিয়ারের চরে পাবনার প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের দখলে চলে যাওয়া পৈতৃক চৌদ্দ বিঘা জমি হারানোর শোক তাকে সন্তপ্ত করছিল অথবা তার শোণিত বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিল শরীরে, ক্রোধে; —রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হতে থাকলে সরকারি ভুক্তিতে তাদের শানিকদিয়ারের জমিটা যদিও পড়ে না, তবু শোনা যায় পদ্মার জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চরজুড়ে সেনানিবাস, সোলারপ্যানেল স্থাপন ও সরকারি নানা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হবে; চরের জমির মালিক, যাদের বাহুবল পরাক্রমী ছিল, তারা সন্তোষজনক মূল্য অর্জন করে নিয়েছে সরকারের কাছ থেকে আর শমসের প্রামাণিকদের মতো অসংখ্য মানুষদের পৈতৃক জমি দখল নিয়ে রাজনৈতিক দস্যুরা চড়া মূল্যে বিক্রি করেছে সরকারের কাছে। চৌদ্দবিঘা জমির যা দাম পাওয়া যেতো— শমসের প্রামাণিকের, ছেলে রজ্জবের ও নাতি— নাতনির জীবন কেটে যেতো অনায়াসে, গোপীনাথপুর মহানগরের ট্যাকের ভিটে বিক্রি করে শহরে গিয়েও দুচারকাঠা জমি কিনে পাকা দালান গড়া যেতো— ভাবতে ভাবতে বিড়িতে ঘন ঘন টান দিচ্ছিল শমশের প্রামাণিক, ক্রোধকে পুড়িয়ে গিলে ফেলা ছাড়া পরাক্রম তার নেই। রজ্জবের মা অনেকবার বলেছে— একবার কাগজপত্র নিয়ে তোশিল অপিসে যায়ে দেখলি হয় না, অতখানি জমি, পালিও তো পাতি পারি। অক্ষম আস্ফালনে ফেটে পড়ে শমসের— ওই জমির জন্য গেলি, শানিকদিয়ারের চরে আমার হাড়ও খুঁজে পাবা না শালির বেটা।

শমসের বিড়ির আগুন টেনে ঠোঁটের কাছে নিয়ে এলে রজ্জব আবার চিৎকার পারে— ও আব্বা, ঢল। শমসেরের সম্বিত ফেরে— সব্বনাশ, নৌকা কিনারে নে বাপ, শিগগির।

ত্বরিতে নৌকা কূলে ভিড়িয়ে বাবা— ছেলে পাড়ে উঠে আসে। অবিকল ছোট ছোট পাহাড়, ভেসে আসছে, ধীরে। শমসেরের চিৎকার। গোপীনাথপুরের মানুষেরা মহানগরের ট্যাকে ছুটে এসে স্থবির ও আতঙ্কিত। ধীরে ভেসে আসা পাহাড়সদৃশ ঢল, পদ্মা— গড়াইয়ের মোহনায় দাঁড়ালে স্পষ্টত প্রতীয়মান হওয়া রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের সুউচ্চ কাঠামো তাতে আড়াল হয়ে গেছে। মানুষেরা কৌতূহলাতঙ্কিত; বহুবার টেলিভিশনে শোনা খবর কি সত্যি হলো— যে, কোনো পারমাণবিক কেন্দ্রে বিস্ফোরণ হলে ৪০ কিলোমিটার বৃত্তাকার এলাকা নিয়ে ধ্বংস হবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের বর্জ্যও নিষ্কাশনের কোনো বন্দোবস্ত করেনি সরকার; রাশানরা বলেছে— সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে বর্জ্য তারা নিয়ে যাবে তাদের দেশে। গ্রামের দু’চার জন সামান্য শিক্ষিত বয়স্করা বিষোদ্‌গার ছাড়ে— খাবা এখানে, হাগবা রাশিয়ায়, কিরাম করে হয়। ১০-১২ কিলোমিটারের মধ্যেই তো গোপীনাথপুরের মহানগরের ট্যাক, নদীর খামখেয়ালিপনা তারা সয়ে নিয়েছে, বংশপরম্পরায়। পারমাণবিক কেন্দ্রের বীভৎসরূপ কখনো তেড়ে এলে মহানগরের ট্যাকের মানুষদের প্রতিরক্ষার ভাষা অজানা। 

তারা দেখে—ভেসে আসা ছোট ছোট পাহাড়, ধীর ঢল। ক্রমশ নিকটবর্তী হতে থাকলে পাহাড়গুলো সুবৃহৎ দেখায়। কিন্তু তারা কিছুতেই আবিষ্কার করতে পারে না ধীর ঢলে ভেসে আসা বস্তুগুলো আসলে কী এবং ঢলের গতিও শ্লথ বলে তারা সিদ্ধান্তহীনতায় পর্যবসিত—বন্যার ঢল তেড়ে এলে তারা যেভাবে ঘর— গেরস্থালি নিয়ে স্থানান্তর করেছে চিরকাল, সেভাবেই সব কিছু গুটানোর প্রস্তুতি নেবে নাকি তারা? বরং বিমূঢ় ও সমুৎসুক চেয়ে থাকে আর সমবেত বিলাপ করে— পারমাণবিকের বজ্জ ভাসে ওঠেছে রে, বজ্জের ঢল। ঢল নিকটে অগ্রসর ক্রমেই; আন্দাজকৃত পাহাড়ের সদৃশ্যতা কমতে থাকে, আরো নিকটবর্তী হলে ঢল, প্রতীয়মান হয়— রাশি রাশি মৃতবৃক্ষের কাণ্ড, রাশি রাশি, স্তূপের ওপর স্তূপ মৃতবৃক্ষের কাণ্ড ভেসে আসছে; পদ্মা— গড়াইয়ের মিলনস্থলে এসে রাশি রাশি মৃতবৃক্ষের স্তূপ ভিড়লে, মহানগরের ট্যাকের মানুষেরা হৈ হৈ করতে করতে নদীর পাড় থেকে নিচে নামে, কাঠ কুড়োতে। যার যতটা মুরোদ, কুড়োনোর চেষ্টা করে; কিন্তু প্রকাণ্ড সেসব গাছের কাণ্ড মুঠোমুঠো কুড়িয়ে নেবার তো সামগ্রী নয়, ফলে স্ব— স্ব পরিবারের সকল সদস্যরা কসরতে নেমে পড়ে এবং সমবেত শক্তিতে ভেসে আসা মৃতবৃক্ষের কান্ডগুলো তুলে তুলে পাড়ে নিতে থাকে। খবর সাতগ্রামই শুধু হয় না, শহরের স’মিল অলাদের কানেও আছড়ে পড়লে তারা বৃকোদর লরি ও লোকবল এনে হামলে পড়ে নদীতে। মানুষেরা গুঞ্জন করে— ফারাক্কার খুলে দেয়া গেট দিয়ে ভারতের অতি বন্যার জল থেকে ভাসিয়ে এনেছে এই সব মরা গাছ; কেউ কেউ বিভ্রান্তিতে উল্লসিত হয় ও অন্যদের বিভ্রান্ত করে— চন্দনকাঠ ভেসে আইছে রে। চন্দন কাঠ মহামূল্যবান, কমবেশি সেই জ্ঞান অনেকেরই আছে, ফলে হুল্লোড় আরো উত্তুঙ্গে ওঠে— এগুলো কাঠ না, ট্যাকা, খালি ট্যাকা। গোপীনাথপুর মহানগরের ট্যাকের মানুষ, পার্শ্ববর্তী সাতগ্রাম, শহরের স’মিলের মহাজনরাই শুধু নয়, যেন সারা দেশের মানুষের ঢল এবার, তাতে কর্পূরের মতো উড়ে যায় মৃতবৃক্ষের ঢল। প্রকাণ্ড বৃক্ষের কান্ডগুলো স্ব— স্ব অধিকারে নিতে নিতে মানুষেরা পরিশ্রান্ত হলে শহর থেকে আসা স’মিলের অভিজ্ঞ ও ধূর্ত মহাজনরা জহুরির মেধায় নিরীক্ষা করে সাব্যস্ত হয়— ভেসে আসা মৃতবৃক্ষের কাণ্ডগুলো একটারও কাঠ হবার যোগ্যতা নেই, কত কত বছর ধরে জলে ডুবে ছিল এসব মৃতবৃক্ষগুলো কে জানে— এখন সেসব শুধুমাত্র জ্বালানি হবার যোগ্য; আর একটি কাঠও চন্দনকাঠ নয়। মহানগরের ট্যাকে হামলে পড়া মানুষেরা নিরাশায় মুহ্যমান হয়; পরিশ্রান্ত তারা— এই সমস্ত পচা কাঠ নিয়ে কী করবে? স’মিলের ধূর্ত মহাজনেরা যথাযথ মূল্য দিয়ে কিনে নিতে চাইলে সব কাঠ, মুষরে পড়া, বিশ্রান্ত মানুষেরা তবু সামান্য আলো দেখে। লরিতে তুলে দেয় যার যার সংগ্রহ। মহাজনের লরিগুলো ভোঁ ভোঁ করতে করতে সেসব কাঠগুলো নিয়ে শহরের দিকে ছুটে চলে।

মহানগরের ট্যাক শান্ত হয়; সমাহিত রুগ্‌ণ নদী, নিরালঙ্কার জল বাতাসের নিবিড় আলাপে ঝিরি ঝিরি মূর্ছনাবিধুর প্রবহমান, সময়ের শরীরের অতিসূক্ষ্ম রোমকূপ দিয়ে ঢুকে অবিনাশী অনন্ত যজ্ঞের দিকে নির্লিপ্ত চলে যাওয়ার ভূমিকা এখন। কার্তিকের এই নির্মল আকাশে— কখনো দৈত্যকার হাতির বহর, বিজিত অক্ষৌহিনীর দুরন্ত অশ্বদল, সারি সারি উড়ন্ত শুভ্র ভেড়া, বিন্যস্ত কার্পাসবনের ছায়া পড়ে থাকার কথা সারা দিন নদীর জলে; এপাড় থেকে ওপাড়ে উড়ে যাওয়া বকেরা মুখ দেখে নেবে, পানকৌড়ি তার কৃষ্ণকালো শরীরের মায়ায় মুখর হবে— নদীর জলমুকুরে প্রতিফলিত ছায়ায়; কিন্তু প্রকৃতির এই সমস্ত প্রতিমা অবলুপ্ত করে দিয়ে পারমাণবিক কেন্দ্রের বিরাটাকার চোঙাসদৃশ কুলিং টাওয়ার মহানগরের ট্যাকের মানুষের চোখকে গিলে খায়— যেন বৃহৎ আকার হাতির প্রকাণ্ড দাঁত আকাশ ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে আছে আর কার্তিকের স্বচ্ছ আকাশ পড়ে থাকা নদীর জলে প্রকাণ্ড দাঁতগুলোর ছায়া পড়ছে, এই দাঁত দিয়ে যেন নিমিষেই চিবিয়ে পৃথিবীটাকে ছাতু করে ফেলতে পারবে—এমন দাঁতাল, এমন রাক্ষস, বিনাশব্যগ্র— তাকিয়ে আছে মহানগরের ট্যাকের দিকে।

পারমাণবিকের কুলিং টাওয়ারের দিকে নিবদ্ধ দৃষ্টি প্রক্ষেপিত করে শমসের প্রামাণিক মহানগরের ট্যাকে নদীর পাড়ে বসে থাকে ক’দিন, যেহেতু মৃতবৃক্ষের ঢলে তাদের মাছধরার জাল বিলুপ্ত, নৌকাটাও বিধ্বস্ত, কোনোমতে কূলে টেনে এনেছিল রজ্জব; আপাতত উপায়হীন শমসের, বসে থাকে আর তার একজিমা আক্রান্ত অণ্ডকোষ খুচলিয়ে কষ বের করে আরাম পাবার ব্যর্থ ও ভুল পদ্ধতি প্রয়োগ করে, তাতে সাময়িক স্বস্তি হলেও অণ্ডকোষ থেকে কষ বের হওয়ার পরে শুরু হয় জ্বালানি— পুড়ানি, তাতে শমসের প্রামাণিকের মুখের মানচিত্র কুঁচকে পোড়া বেগুনের চামড়ার মতো দেখায়। বেকার বসে থাকা আর খুচলায়ে অণ্ডকোষ থেকে কষ বের করতে আর ভালো লাগে না তার— রজ্জব, নদীত নামা লাগবি তো।

সংসারে, হাঁড়িতেও ভাতের টান পড়ে; রজ্জব বিধ্বস্ত নৌকাটি মেরামত করতে নামে; কিন্তু জাল? শমসের প্রামাণিক পারমাণবিকের কুলিং টাওয়ারের দিকে বেকার দৃষ্টি ফেলে রাখে, কদিন কোনো মাছ ধরা নেই; বাড়ির সবাই মিলে ভেসে আসা ঢলের কুড়ানো কাঠ মহাজনের লরিতে তুলে দিয়ে কিছু টাকা যা পেয়েছিল, ক’দিন তাতেই চালিত হলো সংসার। অবশিষ্ট কিছু টাকা রজ্জবের মা চৌকিতে পেতে রাখা জীর্ণ কাঁথার নিচ থেকে এনে শমসেরের হাতে দেয়— টাউনে যায়ে জাল কিনে আনো।

সমাহিত পদ্মার রুগ্‌ণ জল আবার ভারাক্রান্তচিত্তে তাদের বরণ করে নিলেও মাছেরা যেন জলের এমন অতলে অভিবাসিত, যেখানে কোনো মৎস্যশিকারির জাল কস্মিনকালেও পৌঁছাতে অপারগ অথবা মাছদের ফুলকাগুলো সব রুখপাখির ডানায় পরিণত হয়ে জলে নয়, অন্তরিক্ষে, উড়ে উড়ে কোন কোন অচিন দেশে হারিয়েছে; শূন্য জাল তুলে ভগ্নচিত্তে ফিরতে হয় বাবা— ছেলের প্রায়শই। আর কোনো পেশাও তাদের জানা নেই; শমসেরের বয়স প্রান্তে, রজ্জব যুবক— ভাবে শহরের কলকারখানাতে মজুর দিতে যাবে। যায় যায় করে যায় না অথবা যেতে চায় না রজ্জব, নদীই তাকে ডাকে, মরণাপন্ন নদীতেই তার মরে যেতে ভালো লাগবে। শমসের প্রামাণিকের জীবনও তো নদীতেই বিগত হয়েছে, কিন্তু কথা ছিল— তাঁতে মাকু চালিয়েই, বর্ণিল সুতার ফোঁড়ে গেঁথে ওঠা গামছা— লুঙ্গির মনোহরা জমিনে পূর্বপুরুষের মতো জীবন তার কেটে যাবে। যাইনি, তাঁত চলে গেলেও হাতের অব্যর্থ যে আঙুলগুলো মাছধরা জালে নিবদ্ধ হয়েছে সেই আঙুলে মাকু এখনো নাচে, রঙিন সুতা জড়িয়ে— প্যাঁচিয়ে ধরে।

জলের অতলে অভিবাসিত মাছেদের সন্ধানে তারা নদী ছাড়ে না, তাদের ভেতরে কোনো এক গভীর প্রত্যয় জাগরূক থাকে, তারা নদীতে জাল ফেলেই চলে। মাছের বদলে তাদের জালে বিবিধ প্লাস্টিক, টিনের ক্যান, ছেঁড়া স্যান্ডেল— জুতো, ছেঁড়া পোশাক, কনডম, নকল পিস্তল, নানা হাড়— হাড্ডি জালে ওঠে। নৌকার ওপরে জাল থেকে সেসব ছাড়াতে ছাড়াতে কল্পনাপ্লাবিত বিচিত্র আলাপ নাজিল হয় বাবা— ছেলের মধ্যে; রজ্জব যুবক হলেও বুদ্ধিতে অকেকটাই বেয়ান্দাজি বলে কথার লাগাম তার সবসময় কপর্দকশূন্য— ও আব্বা, এ তো মনে হচ্ছে মেমসাহেবদের পোশাক। পারমাণবিকের ওই রাশান মেমসাহেবদের জুতা— স্যান্ডেল মনে হচ্ছে, পুরোনো হয়ে গেলি নদীত ফেলে দেছে। ও আব্বা, বন্দুকটা তো ফাইন, সত্যিকারের বন্দুক নাকি, গুলি আছে নাকি, দেখিতো; ট্রিগারে টিপ দেয় আর মুখে ফটাশ ফটাশ করে শব্দ করে— ফটাশ, ফটাশ; ও আব্বা, বন্দুকটা আপনার নাতির জন্যি বাড়িত নিয়ে যাতি হবে, খেলবিনে। শমসের প্রামাণিক খাঁকারি দেয়— জাল পরিষ্কার কর, এত বক বক করিসনে।

তারা নদীতে আবার জাল ফেলে, আবার জাল তোলে, অনন্তকালের এই বৃত্তি যেন তাদের।

জাল ফেলে, জাল তোলে অথবা তারা নিজেরাই জালে আটকা পড়ে।

সময়ের দুর্দৈব জালে অন্ধ মাছ তারা। তাদের ফুলকা বিলুপ্ত।

জালের মধ্যে তারা জাল।

তাদের জালে একদিন সুন্দর একটা কাচের বোতল ওঠে। বোতল ভরা কমলা রঙের পানি। রজ্জব সমুৎসুক, চঞ্চলগতিতে বোতলের চিপি ঘুরিয়ে খোলার চেষ্টা করে। পারে না। শমসের প্রামাণিক নিবৃত্ত করে— খুলিসনি বাপ, কি আছে ওর ভেতরে আল্লাহই জানে, বিষ— টিশ হলিও তো হতি পারে।

— না আব্বা, মনে হচ্ছে জুস। আমের জুস, শালা রাশানরা ফেলে দেছে নদীতে, মনে হচ্ছে। প্রবল একটা হ্যাচকা টানে বোতলের চিপিটা খুলে ফেলে দুর্গজয়ের ফুর্তিতে রজ্জব উল্লসিত হয় আর একটা অদ্ভুত সুগন্ধে চারপাশ বিলোলিত; অত্যাশ্চর্য, এ প্রকার সুগন্ধে তাদের ইন্দ্রিয়সমস্ত পর্যবসিত, যারপরনাই তারা বিহ্বলিত এবং রজ্জব লোভাতুর হয় এবং বোতল থেকে এক ঢোক কমলা রঙের পানি গলাধকরণপূর্বক আপনকার পাকস্থলীতে চালান করে দিয়ে দুষ্প্রমেয় সুখানুভূতিতে প্লাবিত হয়ে বলে— আব্বা, তুমিও এক ঢোক খাও, ফাইন স্বাদ; এবং শামসের প্রামাণিক ছেলের হাত থেকে বোতল নিয়ে প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ততায় ভোগে, কিন্তু কমলারঙের পানিঅলা বোতল থেকে ছড়িয়ে পড়া ঐন্দ্রজালিক গন্ধ তার জিহ্বাকে মুখগহ্বর থেকে টেনে এনে বোতলের মুখে ছুঁইয়ে দেয় এবং শমসেরের স্বাদইন্দ্রিয় গ্রহণ করে স্বাদ, আহা, এমনই সেই স্বাদ, অভূতপূর্ব; অতঃপর ঘটনা ঘটে এবং অবধারিত যা হয়— গল গল করে শমসের কয়েক ঢোক কমলারঙের পানি খাখন মরুদ্যানের তৃষ্ণার্ত উটের মতো গলাধঃকরণ করে— আহ্, ফাইন স্বাদরে বাপ। নে আর এক ঢোক মার বাপ। শমসেরের হাত থেকে বোতল নিয়ে রজ্জব এক ঢোক দুই ঢোক তিন ঢোক, খেয়েই চলে; যেন সমস্ত পদ্মানদীকে বোতলে ভরে খেয়ে চলেছে সে।

শমসের আর রজ্জব এখন সাটপাট হয়ে শুয়ে আছে নৌকার ওপরে। তাদের মাথার ওপরে কার্তিকের আকাশের কুসুমসন্নিভ মেঘেরা বন বন করে ঘুরছে, দুর্বার গতি, যেন ভূ— গোলক বিদীর্ণ করে গ্রহান্তরিত হতে চায় সেই সমস্ত মেঘ আর প্রথমে রজ্জবই আবিষ্কার করে সেই মেঘের ভিতরে তাদের নৌকাটি রকেটের মতো সাঁই সাঁই করে একবার ঈশানে একবার নৈর্ঋতে ছুটে বেড়াচ্ছে —আব্বা, আমাদের নৌকো দেখিছো আকাশে, ভাস্যে বেড়াচ্ছে, আব্বা আকাশে মনে হচ্ছে বিরাট নদী...

—তাইতো মনে হচ্ছে বাপ, নদী; নদীর ভিতরে গাঙ আর গাঙের ভেতরে নদী আর তার ভিতরে পানি আর পানির ভিতরে গাঙ আর গাঙের ভিতরে নৌকো আর নৌকোর ভিতরে নদী আর নদীর ভিতরে জাল আর জালের ভিতরে নৌকো আর নৌকোর ভিতরে জাল আর জালের ভিতরে নদী...।

— আব্বাগো, তার ভিতরে মাছ, বিরাট বিরাট মাছ, ইলিশ বাঘাড় বোয়াল, কত্ত মাছ...আব্বাগো মাছের ভিতরে জাল আর জালের ভেতরে নৌকো আর তার ভিতরে কোটি কোটি মাছ আর মাছের ভিতরে টাকা আর টাকার ভিতরে আমরা আর আমাদের ভিতরে ভাত আর ভাতের ভিতরে জাল আর জালের ভিতরে বোতল আর বোতলের ভিতরে কমলা রঙের পানি আর পানির ভিতরে কমলা রঙ আর রঙের ভিতরে বোতল— আব্বা, আকাশের সব মাছ আমরা ধরে আড়তে বেচপো আর খালি বোতল কেনবো আর বোতলের ভিতরে কমলা রঙের পানি আর পানির ভিতরে মাছ আর মাছের ভিতরে বোতল আর বোতলের ভিতরে মাছ আর মাছের ভিতরে রাশানদের ছেঁড়া জুতো— স্যান্ডেল আর ভাঙারি পিস্তল আর কনডোম আর কনডমের ভিতরে মাছ খাবি খাচ্ছে আব্বা...

—ও রজ্জব, বাপ, আমরা মনে হচ্ছে উড়ে যাচ্ছি।

—হ আব্বা, আমরা এখন প্লেনের ভেতরে আর আমাদের ভেতরে প্লেন আর প্লেনের ভেতরে রাশিয়া আর রাশিয়ার ভেতরে আমরা আর আমাদের ভেতরে রাশিয়া... আর রাশিয়ার ভেতরে পারমাণবিক আর পারমাণবিকের ভেতরে বিদ্যুৎ আর বিদ্যুতের ভেতরে আমরা..

—আর আমাদের পাছার ভেতরে বিদ্যুৎ আর বিদ্যুতের ভেতরে আমাদের পাছা আর পাছার ভেতরে মাছ আর মাছের ভেতরে আমরা...

—হ, আমরা এখন মাছ, উড়ে যাচ্ছি

চারদিকে আলো, তিলোত্তমা সম্ভব স্থানে— স্থল ও অন্তরিক্ষ সজ্জিত আলোকঅলংকারে, এখন তারা, বাবা ও ছেলে শুয়ে আছে চিতপটাং সেখানে। আলোক ঝরনার মূর্ছনায় তাদের চোখে ঘুম আসে, বড় পরমাদের ঘুম, স্বপ্নখচিত।

তারা ঘুমায়, তাদের হয় মোহন ঘুম—

দিন মাস বৎসর, আলোকবর্ষ গড়িয়ে আলোকবর্ষে—

তাদের ঘুম—,...

ঘুম ভেঙে গেলে তারা দেখে— বিরান মরুভূমির মতো নদীর চরে পড়ে আছে দুজন। ধীরে উঠে দাঁড়ায় বাবা— ছেলে, তাদের পায়ের নিচে পৃথিবী এখনও মৃদু ঘূর্ণায়মান, চতুর্দিক অচেনা; — শানিকদিয়ারের চর এ তো নয়, লক্ষীকুল্লোর চরও নয়, না ভবানীপুরের, কাথুলিয়ার চরও তো নয়, কোথায় এসেছে তারা— দিকশূন্য এখন, তাদের সহায় নৌকাটিও দৃষ্টিসীমাতে গ্রাহ্য নেই। ইতি— উতি খুঁজতে থাকে নৌকাটিকে আর তাদের পায়ের তলার চরের বালি পিছলে পিছলে যাচ্ছে কসকো সাবানের মতো। অনেক খানাতল্লাশির পর চরের খাড়িতে দেখতে পায় মহিষের শিংয়ের মতো ছোট নৌকাটির গলুই উঁকি দিয়ে আছে। টলতে টলতে গিয়ে নৌকাটিকে খুঁজে পেলেও তারা তাদের মাছ ধরার জাল খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয় এবং তাদের মাথার নিউরনে বিদ্যুৎ ছলকে ওঠে; রজব কিছুটা নাকে কান্নার স্বরে জড়ানো কণ্ঠে বলে— আব্— ব্— ব্— বা, জাল কোনে।

— জাল্— ল্— ল্ কোনে। কিছুটা জড়ানো কণ্ঠে শমসেরও— জাল কোনেরে শালার বেটার শালা—বলে ফুঁপিয়ে ওঠে।

জাল তারা পায় না। না নদীর চরে, না অন্তরিক্ষে।

তারা দেখে— নৌকার ওপরে বোতলটা কাত হয় পড়ে আছে, বোতলের ভিতর থেকে এখনো সেই ইন্দ্রিয়হরা সুগন্ধ পরিব্যপ্ত হচ্ছে বিরান চরজুড়ে। নৌকাটাকে বাবা ও ছেলে টেনে খাড়ি থেকে তুলে মূল পদ্মায় চালিত করে। রজ্জব খানিকটা বৈঠা চালানোর পর তীর থেকে নৌকো কিছুটা নদীর ভেতরে উপস্থিত হলে তাদের চোখে আবছা আবছা দৈত্যের দাঁতসদৃশ পারমাণবিকের কুলিং টাওয়ারের ছবি প্রতীয়মান হয় এবং তারা আবিষ্কার করে, ওই দানবীয় মূর্তি প্রতিষ্ঠিত আছে উজানের দিকে; বিলক্ষণ সম্বিত জাগ্রত হলে তারা নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়— ভাটিতে, স্পষ্টতই তারা ভাসতে ভাসতে অনেক দূর ভাটিতে পতিত হয়েছে; কেননা মহানগরের ট্যাক থেকে পারমাণবিক কেন্দ্রের কুলিং টাওয়ার স্পষ্টতই দেখতে পায় তারা, কিন্তু এই ভাটিতে, জালে পাওয়া কমলা রঙের পানি পান করে সুখসমৃদ্ধ অবচেতনে যেখানে পতিত হয়েছিল তারা, দূরত্ব তথার অ্যাবম্প্রকার, ওই দানবীয় মূর্তি সেখানে আবছায়ায় অপ্রত্যক্ষ। রজ্জব বৈঠাচালনা অব্যাহত রাখলে, নৌকা উজানে ধায় এবং পারমাণবিকের কুলিং টাওয়ায়ের ছবির পরিস্ফুটন তাদের মহানগরের ট্যাকের দূরত্ব বাতলে দেয়; গৃহাভিমুখে তাদের এরূপ প্রত্যাবর্তন, সঙ্গীনশূন্য পরাজিত সৈন্যের বিধুরতাবিধৃত।

জাল আবারও হারালো তারা। কিন্তু অমোঘ ঘোর থেকে শমসের প্রামাণিক আর রজ্জব তাদের চেতন উৎপাটন করতে পারে না কিছুতেই, বরং কেবলই বিবশিত তলিয়ে যেতে থাকে ঘোরাচ্ছান্নতায়। খালি বোতলটা নিয়ে মহানগরের ট্যাকে নদীর পাড়ে বসে থাকে আর পালাবদল করে বোতলের মুখে নাক গুঁজে গন্ধ নেয় বাবা— ছেলে; পাড়ে তাদের ছোট্ট নৌকাটা বাঁধা, নদীর জলের দরিদ্র ঢেউ এসে মৃদু মৃদু দুলিয়ে দিচ্ছে নৌকাটিকে, যেন শুয়ে থাকা অনন্ত এক ঘড়ির কাঁটা একবার ডানে একবার বামে দুলে স্ব— স্থানেই বহাল থাকছে; স্থির, সময়ের অপরিবর্তিত কিমিতি।

তারা বসে থাকে...

সময়ের ভেতরে—, অথবা,

সময় তাদের ভেতরে—

রজ্জবের মা কিংকর্তব্যবিমূঢ়, নিরুপায়; সংসারের চুলাতে বিড়ালের বসতি প্রতিষ্ঠিত ক্রমশ। কখনো বা উৎপন্ন ক্রোধ রজ্জবের মাকে বিষাদগার প্রক্ষেপণে প্ররোচিত করে; তবু বাবা— ছেলে, অটল— বসে থাকে নদীকূলে আর সেই বোতলের মুখে নাক ডুবিয়ে গন্ধ নেয়। সহিষ্ণুতা বিচ্যুত রজ্জবের মা শমসের প্রামাণিকের হাত থেকে বোতলটা কেড়ে নেয়— দেখি, কি বেস্তের গন্ধ শোকে বাপ— বেটা ওই বোতলে নাক সাধা দিয়ে আর হিজিলদাগার মতো বসে থাকে ভৈরদিন; —টেনে, বোতলটা নাকে দেয় রজ্জবের মা।

রজ্জবের মায়ের কোনো ক্রোধ নেই এখন— নিরুত্তাপ, নির্লিপ্ত সে; গন্ধে আবিষ্ট, বিগতচেতন— বোতলে নাক গুঁজে বসে পড়ে শমসের আর রজ্জবের পাশেই। তাদের সমবেত চোখ প্রতিস্থাপিত দূরে নদীরেখা অতিক্রম করে দৃষ্টিসীমায় গ্রাহ্য পারমাণবিক কেন্দ্রের কুলিং টাওয়ারের দিকে। তাদের চোখে আকাশ নেই, উড়ে যাওয়া বকের শুভ্রতা অগোচরে, কাশবনের মেঘ, নেই— সকাল নেই, দুপুর নেই, গোধূলির লোধ্ররেণুরা কেবল নীহারিকার কৌতুক সৃষ্টি করে বিবশিত হয় পুনঃ পুনঃ কৃষ্ণান্ধকারে। তাদের বিমূঢ় বসে থাকা দেখে রজ্জবের বউ সাদেকুন ও পাঁচ বছরের ছেলে ছয়ফুল আসে এবং বোতলের গন্ধ শুঁকে আকুলচিত্তে নদীর পাড়ে বসে পড়ে। মহানগরের ট্যাকের মানুষেরা কৌতূহলপ্রিয় হয় পুরো পরিবারটিকে এভাবে উদাস বসে থাকা দেখে, কেউ কেউ এসে পাশে দাঁড়ায় এবং পালাবদল করে বোতলের গন্ধ শোঁকা দেখে দু— একজন রজ্জবদের হাত থেকে বোতল নিয়ে গন্ধ শোঁকে এবং আবেশিত হয়ে তাদের সাথে পঙ্‌ক্তিবিন্যাস করে বসে পড়ে। একে একে মহানগরের ট্যাকের আবালবৃদ্ধবনিতার সর্বজনীন সমাবেশে নদীপাড় অলঙ্কৃত হয়। সমবেত জনেরা পর্যায়ক্রমে বোতলের গন্ধ শোঁকে, বিহ্বলিত ও বিমনা হয় এবং দৈত্যের দাঁতসদৃশ ভয়ংকর ও বিরাট, পারমাণবিক কেন্দ্রের কুলিং টাওয়ার— দৃশ্যমান বিভীষিকা— মহানগরের ট্যাকের মানুষদের চোখকে নজরবন্দি করে; তখন মানুষেরা তাদের বাপ— দাদার বয়ানে শোনা নানা প্রকার ভৌতিক লোকগল্পে মশগুল হয় এবং গল্পের বিরাটাকার দৈত্য যেভাবে নদীর এই পাড়ে তালবাড়িয়ার ঘাটে এক পা আর ওই পাড়ে শানিকদিয়ারের চরে এক পা দাঁড়িয়ে থাকতো, সেই কল্পদৃশ্য যেন বাস্তবে প্রত্যক্ষ করে— পারমাণবিক কেন্দ্রের কুলিং টাওয়ারের গগনবিদারী দাঁত রূপপুর থেকে বিশাল পদ্মা অতিক্রম করে মহানগরের ট্যাকের সমবেত মানুষের সমাবেশ কামড়ে ধরতে চাইছে। মানুষেরা তবু স্থবির; আতঙ্কগ্রস্ততা তাদের চোখেমুখে পরিব্যপ্ত হলেও স্বপ্নে দেখা হররদৃশ্যের মতো— বাঘ তাড়া করছে, পালানোর জন্যে দৌড়াচ্ছে অথবা দৌড়ানোর জন্যে উদগ্রীব হলেও তাদের পায়ের ক্রিয়া একই স্থানে পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। আদিম পাথুরে পাহাড়ের গায়ে প্রাগৈতিহাসিক শিল্পীদের খোদাইকৃত রিলিফ ভাস্কর্যের মতো মহানগরের ট্যাকের মানুষেরা অনন্ত সময়ের স্যাঁওলা পড়া দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকে নদী পারে, সময় তাদের শরীরে বিবিধ ফার্নের প্রজন্ম রেখে যায়। ফার্নগুলোর শেকড় মানুষদের শরীরের অভ্যন্তরের শিরা— উপশিরা প্রদক্ষিণ শেষে পায়ের তালু দিয়ে বের হয়ে মাটির গভীরে প্রোথিত হয়; কেবল তাদের চোখ দুটো, স্থবির ও আতঙ্কগ্রস্ত, নিবদ্ধ থাকে নিরুৎসব নদীর শরীর ছুঁয়ে দূরে।

একদিন তারা দেখতে পায় অতিকায় বলের মতো রঙিন কিছু একটা আলো ছড়াতে ছড়াতে ভেসে আসছে মহানগরের ট্যাকের দিকে আর ভেসে আসা অজানা রঙিনের আলোর আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে পারমাণবিক কেন্দ্রের কুলিং টাওয়ার। প্রথমে মানুষেরা ভেবেছিল—বিরাট একটা বল হবে, কিন্তু ভেসে নিকটবর্তী হতে থাকলে তাদের অনুমেয় হয় আলোর প্রখরতা—যেন সূর্য, আকাশ থেকে ছিটকে পড়ে ছুটে আসছে তাদের দিকে; পরিদৃশ্যমান আলোর প্রখরতা তাপায়িত করে তোলে চতুর্দিক, মানুষেরা ঘর্মাক্ত হয়; তবু, তারা স্থবির— তাদের কেবল চেয়ে থাকা আছে, আলো অথবা আলেয়ার দিকে।

বল নয়, সূর্য নয়—একটা বিরাট বেলুন—

রঙিন—ভাসতে ভাসতে এসে ভিড়লো মহানগরের ট্যাকে—

প্রথমে রজ্জব, তারপরে শমসের, তারপরে রজ্জবের মা, রজ্জবের বউ— ছেলে ছুটে নদীর পাড় থেকে নিচে নামে; তারপর মহানগরের ট্যাকের মানুষেরা, দলে দলে নেমে পড়ে জলে। সবাই মিলে কঠিন কসরত করে টেনে বেলুনটিকে নদীর পাড়ে কিছুটা তুললেও, শেষ মুহূর্তে সমবেত মানুষের গাদাগাদিতে সৃষ্ট আদমচাপে বেলুনটি ফেটে যায় এবং বেলুনের ভেতর থেকে একটা বিরাট বোতল বের হয়ে আসে। বিরাটাকার বোতল, সাতমানুষের সমান। রজ্জব চিৎকার দিয়ে ওঠে— ওরে আব্বা, কত বড় জুসের বোতল, আব্বা...। কিন্তু এই জুসের বোতল কমলা রঙের পানি ভর্তি নয়, কালো রঙের, যেন আলকাতরা ভরা।

মানুষের কৌতূহলের পারদ ঊর্ধ্বগামী, তাদের জিহ্বাসকল সাপের জিহ্বার মতো চঞ্চল হয় বোতলের ভেতরের কালোপানির অজানা স্বাদগ্রহণের জন্যে। এত বড় বোতলের মুখ খোলার উপায় নিয়ে বিচিত্র পরিকল্পনা ও পদ্ধতির অবতারণের পর সর্বসম্মতিতে সাব্যস্ত হয়, ঝাড়ের বাঁশ কেটে এনে বোতল সমান মই বানানো হবে। মই প্রস্তুত হলে প্রথমেই চোখে মুখে উল্লাস নিয়ে মই বেয়ে ওঠে রজ্জব, কিন্তু দীর্ঘ কসরতের পরেও মুখ খুলতে অপারগ হলে ছেলের অপমান সহ্য করতে না পেরে শমসের প্রামাণিক ওঠে মই বেয়ে— ব্যর্থতা তাকেই শুধু নয়, এককালের ডাকসাইটে ডাকাত জাল্লু খাঁ, জাকো পালোয়ান, শুকো সর্দার, বাঘা ডাক্তাররাই কেবল ব্যর্থ হয় না, আরো অন্তত মহানগরের ট্যাকের শ’খানেক মানুষের ব্যর্থতার পরে আজগর মোল্লার চতুর্থ স্ত্রীর পেটমোছা তেরো বছরের ছেলে হাবিবুল্লাহ্— মুহাম্মদ হাবিবুল্লা ওরফে হাবুল্লা, হাজী শরীয়তউল্লা হাফেজিয়া মাদ্রাসার ৩০ পারা কোরআনের হাফেজ মই বেয়ে ওঠে এবং আলতো করে বোতলের মুখ ঘোরায় এবং তৎক্ষণাৎ, আশ্চর্য, বোতলের মুখ থেকে আকস্মিক ধোঁয়া বের হয় এবং ধোঁয়া আরো বের হতে থাকলে মহানগরের ট্যাকের মানুষেরা মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ ওরফে হাব্বুল্লাকে আল্লাহ নেক বান্দা বলে প্রশংসা করে এবং আল্লাহর দরবারে অশেষ শুকরিয়া আদায় করে বলে— ছেলেটার পেটে আল্লাহর কালাম আছে; পক্ষান্তরে মানুষেরা বোতলের মুখ থেকে উদগীরিত ধোয়ার কুণ্ডলী দেখে সন্ত্রস্ত হতে থাকলেও উদগীরিত ধোঁয়ার সাথে ছড়িয়ে পড়া আশ্চর্য গন্ধে তারা বিস্মিত হয়, তাদের ঘ্রাণইন্দ্রিয় সেই গন্ধের কাছে দাসত্ব করতে থাকে, মোহিত তারা, সজ্ঞালুপ্ত ও নির্লিপ্ত হতে থাকে; তখন কেউ কেউ বিপুল ঘোরে হাব্বুলাকে আল্লাহর অলি অথবা জাদুকরের মর্যাদায় সম্মানিতও করতে থাকে আর তখনই প্রবল হুংকার— মানুষদের শ্রবণইন্দ্রিয় বধিরপ্রায় হয় আর তখনই বোতলের মুখ থেকে লাফিয়ে বেড়িয়ে আসে এক কুমির, অতিকায় ও ভয়ংকর।

মহানগরের ট্যাকের মানুষেরা ঘোরগ্রস্ততা থেকে উন্মূলিত পর, ছত্রভঙ্গ, দিকশূন্য হয়ে আত্মরক্ষার অবস্থান নিশ্চিত করতে মরিয়া হয় এবং অতিকায়, ওই বিরাট কুমির তাদের লক্ষ্য করে ধাবিত হলে অনেক অশীতিপর, নাবালক ও নারীরা, কুমিরের পায়ের আঘাতে ঘায়েল হয়। মানুষ দৌড়াতে থাকে, কুমিরও, মাতালপ্রায়; কুমির মহানগরের ট্যাকের খেত নষ্ট করে, বাগান নষ্ট করে, বিধ্বস্ত করে বাসস্থান মানুষ ও গবাদিদ্বয়ের;

এসব খবর হয়— যেহেতু সময় উড়ন্ত—

—ও, অধুনা কৌশল ও প্রযুক্তি এইক্ষণে প্রভু; ছড়িয়ে পড়ে—

টেলিভিশন, পত্রিকা ও বিবিধ ডিভাইসে ডিভাইসে— সম্বাদ, সম্বাদ—এই যে, এক সে কুমির হয়, অতিকায়, ভয়ংকর; পদ্মায় ভেসে এসে মহানগরের ট্যাকের ফসলের খেত, বাসস্থান ও বাগান বিধ্বস্ত করে দিচ্ছে। মানুষেরা বিপন্ন ও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দৌড়াচ্ছে এবং না জেনেই যে দেশে নিরাপদ আশ্রয়স্থল কোথায়?— সম্বাদ আরো এই যে— কুমিরটি একটা অতিকায় বোতলের মধ্যে করে ভেসে এসেছে পদ্মায়, মহানগরের ট্যাকে।

সুধীজনেরা আলাপ করে, সম্বাদ ওয়াকিবহাল অতঃপর— ফারাক্কার সকল গেট খুলে দিয়ে অতি বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যার জল ভারত পদ্মায় চালান করেছে, সেই বন্যার জলে ভেসে এসেছে এই অতিকায় কুমির। মতান্তর বিচিত্র নয় যে সুধীজনেরা যা আরো বিশ্লেষণ করে— এত বড় বোতল ভারতের ভাণ্ডারে নেই, এ নির্ঘাত রাশানদের কাজ, তারা নিত্য মদ্যপান করে, পারমাণবিক কেন্দ্র লাগোয়া স্থানে বার পর্যন্ত করেছে, বিরাট মদের বোতলে করে কুমিরটাকে রাশানরা এনে ভাসিয়ে দিয়েছে পদ্মায়। এবং দেশের সাংবাদিকরা সাংঘাতিক, উদ্যম ও পরিশ্রমে ব্রতী থেকে সুগভীর খানাতল্লাশি অতঃপর সম্বাদ আরো করে, বিচিত্র যে— রাশানরা কুমিরের মাংস ভক্ষণ করতে আহ্লাদ করে, এখানে কুমিরের মাংস অপ্রতুল, ফলে পদ্মার তীরে পারমাণবিক কেন্দ্রের ভেতরে বিরাট খালখনন করে আহার উদ্দেশ্যে রাশিয়া থেকে কিছু কুমিরশাবক এনে প্রতিপালন করতে অভিলাষিত হয় এবং সেই খালে একটা কুমির এত দ্রুত বড় হতে থাকে যে তাকে আর খালে রাখা অনুকূল হয়ে পড়লে বিরাট বোতলে ভরে, সেই বোতল একটা বিশাল ফোলানে বেলুনের মধ্যে বিশেষ প্রযুক্তিতে স্থাপন করে নদীতে ভাসিয়ে দেয় পারমাণবিক কেন্দ্রে কাজ করতে আসা রাশানরা, যাতে ভাসতে ভাসতে নদী থেকে গভীর সমুদ্র পৌঁছে যেতে পারে বেলুনের ভেতরে বোতল, ভেতরে কুমির এবং সমুদ্রপথে জাহাজে করে কুমিরটিকে রাশিয়াতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। আর সেই কুমির আটকে গেল মহানগরের ট্যাকে।

মহানগরের ট্যাকের খেত— খামার, বাগান, বাসস্থান বিধ্বস্ত ও মানুষেরা আশ্রয়হীনতায় ভাসমান হলে, যেহেতু দেশে সরকার আছে এবং সরকারের প্রাণিসম্পদ মন্ত্রক— তৎপর হয়। দক্ষ প্রাণিসম্পদ নিরাপত্তাকর্মী ও ফায়ার সার্ভিসের অষ্টপ্রহর প্রলম্বিত অভিযান সফল হলে বিরাট জালে আটক হয়ে কুমিরটি সরকারের প্রাণিসম্পদ মন্ত্রকের গবেষণাগারে প্রেরিত হলে বিজ্ঞ গবেষকেদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষা নিশ্চিত করে— কুমিরটির শরীরে অত্যধিক মাত্রায় অ্যালকোহল বিদ্যমান; এবং সম্বাদ হয় যে— নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও কুমিরের শরীর থেকে অ্যালকোহল নিষ্কাশন করে সুন্দরবনের গভীরের আরো গভীর সমুদ্রে তাকে অবমুক্ত করা হবে। তখন মানুষেরা মহানগরের ট্যাকে সেনাবাহিনীর সহায়তায় পুনর্বাসিত হয় এবং দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনাচারে অনেকেই অভ্যস্ত হয় অথবা হয় না, তাদের আতঙ্কও দূরীভূত হয় না; বিশেষত রজ্জব আর শামসের প্রামাণিক, জালে পাওয়া কমলা রঙের পানিভর্তি বোতলের গন্ধে বিস্মিতই থাকে, ফলে তারা যেইরূপ আতঙ্কগ্রস্ততায় লীন ও  নির্লিপ্ততায় আরূঢ় থাকে, তারা পুনারপি বিমূঢ় বসে থাকে নদীর পাড়ে, নদীর জল আরো কমে চলেছে এবং তার স্রোত ও তার ঢেউ ক্রমশ ক্ষীণতর, করুণ।

তাদের নৌকাটিও হয়েছে একা ও অকাঠ, জল নৌকাটিকে ত্যাগ করেছে, দূরে সরে গেছে—

জল ও নৌকাটির মাঝে যেই করুণ সময় প্রবহমান, তা বিগতপ্রাণ ঢেউয়ের ক্ষয়িষ্ণু চিহ্ন মাত্র—

বাবা ও ছেলে, সেই ঢেউচিহ্নের ভেতরে স্পষ্ট প্রতুল মাছের সাঁতার দেখতে পায়; কিন্তু তাদের জাল নেই।

কমলা রঙের পানিভর্তি বোতলের গন্ধ আছে কেবল...।

বোতলের মুখে নাক গুঁজে রজ্জব বলে— আব্বা, কত্ত মাছ, নদীর চরে মাছ উড়ে বেড়াচ্ছে, দেখো আব্বা— বলতে বলতে পাড় থেকে নদীতে দৌড়ে নামে রজ্জব, পেছনে শমসের প্রামাণিকও; বাবা— ছেলে ক্রীড়াবেভুল বালকের মতো উড়ন্ত মাছ ধরতে এগিয়ে এগিয়ে যায়, মাছেরা ততই উড়ুক্কু হয়; তারা আরো এগোয়, আরো, নদীর অনেক গভীরে, কিন্তু জলের দেখা পায় না; এগোতে এগোতে তারা দেখতে পায়— পারমাণবিক কেন্দ্রের উলম্ব কুলিং টাওয়ারের মতো বিরাট বিরাট দাঁতঅলা অতিকায় একটা কুমির হা করে শুয়ে আছে তাদের সামনে; রজ্জব চিৎকার দিয়ে ওঠে— আব্বাগো, এ তো দেখছি সেই মদ খাওয়া কুমির...।

তারা দেখে— মদারু কুমিরটি মুখগহ্বরে টেনে নিচ্ছে বিশাল নদীটিকে।