ঈদ সংখ্যা ২০২৬

পিকনিক উইথ মুনলাইট অ্যান্ড ম্যাঙ্গোজ ।। রুথ প্রাওয়ার ঝাবওয়ালা

রুথ প্রাওয়ার ঝাবওয়ালার জন্ম জার্মানির কোলন শহরে এক পোলিশ-ইহুদি পরিবারে। ১৯৩৯ সালে তিনি চলে আসেন ইংল্যান্ডে। সেখানে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কুইন মেরি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। রুথ ১৯৫১ সালে সি.এস.এইচ ঝাবওয়ালাকে বিয়ে করে বসবাস শুরু করেন দিল্লিতে। তাঁর সাহিত্যকর্মে উঠে আসে সমসাময়িক ভারতীয় সমাজ সংস্কৃতি, নারীর অন্তর্গত সমস্যা, প্রবাসীদের মানসিক টানাপড়েন প্রভৃতি বিষয়। “পিকনিক উইথ মুনলাইট অ্যান্ড ম্যাঙ্গোজ" গল্পটি তাঁর “হাউ আই বিকেম অ্যা হোলি মাদার অ্যান্ড আদার স্টোরিজ (১৯৭৬)" বইটি থেকে নেওয়া।

রুথ প্রাওয়ার তাঁর গভীর মননশীল সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি স্বরূপ ইংল্যান্ডের বুকার পুরস্কার এবং ম্যাকআর্থার ফাউন্ডেশন পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়াও তিনি অ্যাকাডেমি পুরস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র “অ্যা রুম উইথ অ্যা ভিউ"-এর চিত্রনাট্যও লিখেছেন।

শ্রী প্রকাশের কপালটা বেশ খারাপ। কেননা সে এমন এক ছোট শহরে বাস করে যে তার সঙ্গে ঘটা প্রতিটি ঘটনা সবাই জানে, সবার মুখে মুখে ঘোরে। সাধারণত ভেতর জমে থাকা লজ্জার অনুভূতির জন্য বাইরে সে খুব একটা বের হয় না; কিন্তু, সপ্তাহ যত কাটতে থাকে তত তার ঘরে বসে থাকায় বিষণ্নতা বাসা বাঁধে।

 নিজস্ব চিন্তা আর নিঃসঙ্গতার ভিতর সে আবার এমনও ভেবে ওঠে যে সে সম্ভবত অন্যদের ওপর তার নিজের দুর্ভাগ্যের প্রভাব পড়ার বিষয়টি একটু বেশি রঙ ছড়িয়ে চিন্তা করেছিল। দুর্দশা-দুর্যোগ তো যে কোনো সময় যে কারও ওপর পড়তে পারে; এটা নিয়ে বেশি ভাবার কিছু নেই। সুতরাং, এক সকালে যখন বাড়িটিকে তার হতাশাব্যঞ্জক মনে হচ্ছিল, তখন তার মাথায় খেলে গেল কফি শপটিতে ঘুরে আসার কথা। সে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লো। তার বউ তখন স্নান করছিল। আর সেও ওয়াশরুমের বাইরে থেকে জানিয়েছিল বাইরে যাবার কথা। সে বউকে বলেছিল চেঁচিয়েই। তবু যদি পানি পড়ার ছলাৎ ছলাৎ শব্দে বউ শুনতে না পায় তবে এখানে শ্রী প্রকাশের কোনো দোষ নেই।

অর্থাৎ, যখন সে বাসায় ফিরে আসলো এবং বউ জিজ্ঞাসা করলো তার যাওয়া নিয়ে, তখন সে বলতে পারলো স্বচ্ছ বিবেকের সঙ্গে, “তোমাকে তো আগেই জানিয়েছিলাম। "

বউ তাকে নিয়ে চিন্তা করে এটা ভেবে শ্রী প্রকাশ সুখী বোধ করতো। যখন বউ তাকে খাবার বেড়ে দিচ্ছিল, তখন সে তাকে জানালো এই সুখের কথা। জানালো কফি হাউজে সবাই তাকে দেখে কী রকম খুশি হয়েছিল। এমনকি ওয়েটার পর্যন্ত তাকে দেখে, প্রফুল্ল মনে কিছু জানতে না চেয়েই তার পছন্দের খাবার পরিবেশন করেছিল। বউ কিছু না বলে ধৈর্যের সঙ্গে তার খাওয়ার তদারকি করে গেল। তখন সে ফুরফুরে মনে তাকে স্বাগতম জানানোর কথা বউকে বাড়িয়ে বলতে লাগলো। শ্রী প্রকাশের কথাগুলো পুরো সত্যি নয়। তবু একটা আন্তরিক কথনভঙ্গির জন্যে স্ত্রীর খুব একটা বিরক্তিও লাগছিল না, আর সে নীরবে কাজ করে যাচ্ছিল স্বামীর জন্য।

শ্রী প্রকাশ খাওয়া শেষ করে আবার নিশ্চিত করলো সেই সকালে কী কী ঘটেছিল। অসন্তোষের এক ফালি মেঘ যা সে বাসায় বয়ে এনেছিল, তা গেল উধাও হয়ে।

সে এখন বুঝে উঠতে পারল যে কেউ আসলে তার দিকে বিশেষভাবে তাকায়নি, কোনো আভাসও দেয়নি তার অস্তিত্বের। এই রকম ভাবনা তার মাথায় আসলো, কেননা সে অতিরিক্ত সংবেদনশীল একজন মানুষ।

শ্রী প্রকাশের ভিতর সবসময় ছিল এক ধরনের অতি সংবেদনশীলতা; ছিল কবিসুলভ মেজাজ। সে এটা নিয়ে গর্ববোধ করতো; আবার এটাও সত্যি এরকম চরিত্রের কারণে শ্রী প্রকাশকে অজস্র হ্যাপা পোহাতে হয়েছিল। বর্তমানেরটাও সেসবের সঙ্গে যুক্ত হবে। ব্যাপারটা হচ্ছে কী: শ্রী প্রকাশ, একজন গেজেটেড সরকারি কর্মকর্তা, যাকে তার টেলিকমিউনিকেশন মন্ত্রণালয়ের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে কিছু নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে। অভিযোগের অতলে আছে এক মাতালের কথা। যে মাতাল প্রচুর মিথ্যে কথা বলে। আদালতে মিথ্যে সাক্ষী দেয়। এই লোকটির নাম গোয়েল। মিস নিম্মির বাবা।

মিস নিম্মি এসেছিল শ্রী প্রকাশের কাছে জানতে যে তার অফিসে টাইপিস্টের পদটি ফাঁকা আছে কিনা। শ্রী প্রকাশ মন থেকে চেয়েছিল মেয়েটাকে সাহায্য করতে; তাকে ডেকেও ছিল কয়েকবার চাকরির সাক্ষাতের জন্য। তো শ্রী প্রকাশের ভালো ব্যবহারের ফল হিসেবে সে পেল অভিযোগপত্র। একজন নারীর সঙ্গে বাজে আচরণের অভিযোগে অভিযুক্ত সে।

যখন মিস নিম্মির বাবা তার অফিসে এবং বাড়িতে ঘুরে গিয়ে দেখলো শ্রী প্রকাশকে ব্ল্যাকমেইল করা যাচ্ছে না, তখন এই অভিযোগটি তার উপরমহলে পাঠালো যেন সে শাস্তি পায়। প্রকৃত প্রস্তাবে, এটা মাত্রাতিরিক্ত অপ্রীতিকর ঘটনা শ্রী প্রকাশের মতো একজন সংসারী পুরুষের জন্য। একজনের স্বামী, এবং তিনজন সম্মানিত বিবাহিত নারীর পিতা সে। কিন্তু বউকে শ্রী প্রকাশ জোরালোভাবে বলেছিল যে কোনো সন্দেহ নেই শেষে সব সত্য প্রকাশিত হবে। আর ন্যায়বিচার সে পাবেই পাবে।

বউ কোনো মন্তব্য করলো না স্বামীর এই আত্মবিশ্বাস সম্পর্কে। ছোটোবেলা থেকেই বউটি ধীর, শান্তশিষ্ট, কথা না বলা মানুষ। ভীষণ ধর্মভীরু। একজন আদর্শ মা এবং স্ত্রী আসলে দেখতে কেমন সেটা তাকে না দেখলে বোঝা যাবে না। শ্রী প্রকাশ ভগবানকে ধন্যবাদ দিতো এমন একজন নারীকে জীবনে পেয়েছে বলে। বউ তার নিঃসন্দেহে পূজনীয় নারী। বউয়ের সৎ চরিত্রের কথা সে তার কন্যাদের, অফিসের মানুষদের, এমনকি কখনও কখনও অচেনা মানুষদেরও বলে বেড়াতো (একদা এক রিকশায় অপরিচিত সহযাত্রীকেও বলেছিল।)

তবে এখন, এক অজানা উদ্বেগ থেকে মুক্তি পেতে, সে নিজেকে হাজার খণ্ডে টুকরো করে বাজারে ক্লক টাওয়ারের নিচে ছড়িয়ে দিতে প্রস্তুত। প্রস্তুত দেখতে এতে কারা কারা তাকে মাড়িয়ে যাবে পা দিয়ে। তার বর্তমানের দুর্দশার জন্য অনেকখানি দায়ী উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তা। এখানে কেবল নৈতিক টানাপড়েন সমস্যা নয়, সমস্যা হলো তদন্ত চলাকালে তার বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়াটা। ইতোমধ্যে যত যা খরচ হয়েছে, সেটা তার বউ জোগাড় করেছিল গায়ের দু’তিনটে গয়না বিক্রি করে, যা সে যৌতুক হিসেবে এনেছিল বাপের বাড়ি থেকে। কিন্তু এখন, তারা পুরোপুরি নির্ভরশীল তাদের মেয়ে-জামাইদের টাকার ওপর। এটা শ্রী প্রকাশের মতো একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন পুরুষের জন্য অপমানজনক অবশ্য। কিন্তু এছাড়া আর কিছু করারও কি আছে? না, কোনো বিকল্প নেই। সে তার বউকে ভুখা মরতে দিতেও রাজি না। যখন তার মেয়েরা বাপের বাড়িতে এসে শাড়ির গিঁট খুলে টাকা বের করে দিল মায়ের হাতে, তখন শ্রী প্রকাশ কান্না রুখতে পারলো না চোখের। তারা তার কান্না মুছে দিতে এগিয়ে তো আসলোই না, বরং এমন এক নজরে তাকালো যে মানুষটা আরো মরমে মরে গেল।

তখন সে তার ঘরে ঢুকে বিছানায় অবসন্ন শরীর ছেড়ে দিল। তার কন্যারা আরো কিছুটা সময় বাড়িতে কাটালেও সে দেখা করতে গেল না। নিজের ঘর থেকে শুনলো মেয়েরা মায়ের সঙ্গে কথা বলছে, এবং তার বউ মাঝে মাঝে কেঁদে উঠছে।

এইসব বেদনার শব্দ শ্রী প্রকাশের সহ্য করা মুশকিল। সে তার দুই কান বালিশে চেপে চেষ্টা করলো ওদের একটি শব্দও যেন কানে না আসে।

কফি হাউজে প্রথম পা দেবার পর থেকে, শ্রী প্রকাশ প্রায় প্রতিদিনই যাওয়া শুরু করলো ওখানে। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাতের জন্য জায়গাটা ভালো। সে সবসময়ই সঙ্গ ভালোবাসতো। একসময়, যখন সে ছিল নিজ অফিসের রাজা, তখন মানুষজন তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়তো সারা দিনমান। বেলা এগারোটায় তারা সবাই কফি হাউজে ধরনা দিত, আয়েশ করে কফি খেতো কাপের পর কাপ, ফুঁকতো এন্তার সিগারেট আর নানান বিষয় নিয়ে আড্ডা দিয়ে একেকজন রাজা উজির মারতো। মূলত শ্রী প্রকাশই বেশি কথা বলতো, বাকিরা শুনত এবং হাততালিও দিত দস্তুরমতো। কিন্তু আজকাল, সবকিছু বদলে গেছে। কেবল এই কারণে নয় যে সে নিজের কফি সিগারেটের বিল মেটাতে পারছে না, বরং বাকিরা আর আগের মতন নেই। সে নিজেও কি আগের মতন আছে? অথচ সে ছিল মিশুকে একজন মানুষ, যে সবাইকে হাসাতে পছন্দ করতো। একবার তো সে হঠাৎ কফি হাউজের টেবিলের ওপর লাফিয়ে উঠে নাচতে শুরু করে দিয়েছিল। সে পা দিয়ে তাল ঠুকছিল আর জিভ দিয়ে শিস বাজাচ্ছিল। এতে সবাই তাকে ঘিরে ধরে হাসছিল। তার বন্ধুরা, অন্যান্য খদ্দের এমনকি ওয়েটার পর্যন্ত। তারা হাততালি দিচ্ছিল আনন্দ উদ্‌যাপনে।

যদিও আগের মতো কিছুই আর ঘটছিল না, তবু সে প্রতি সকালে কফি হাউজে নিয়ম করে ঘুরে আসতো। শীঘ্রই সে বিকেলেও সেখানে যেতে লাগলো। সাধারণত সেখানে বড় পার্টি বসে বন্ধুদের, কিন্তু এক বিকেলে জায়গাটা ছিল অনেকটা নির্জন- কেবল ওয়েটার ঘুরঘুর করছিল তার নোংরা পোশাকে, আর ছিল এক নির্বাক বিপত্নীক বুড়ো, একজন প্রতিদিনকার খদ্দের। তারা খাচ্ছিল সবজির কাটলেট। ওয়েটার তখন হতাশ ছিল কোনো কারণে। সব সময়ে যেমন থাকে। এমনকি একসময় শ্রী প্রকাশ যখন তাকে টিপস দিতে পারতো, তখনও। এটা সম্ভবত ওয়েটারের মজ্জাগত স্বভাব। চারপাশে পরিচিত কাউকে না দেখে শ্রী প্রকাশ বারবার ওয়েটারকে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে বললো, “আপনি কি আসলেই জানেন না? তারা কি আপনাকে কিছুই বলে নি? আপনার বন্ধুরা তো মোতিবাগে গেছে এক ঝুড়ি আম নিয়ে চাঁদের আলোয় পিকনিক করতে। "

শ্রী প্রকাশ নিজের কপালে চাপড় মেরে ভান করলো যে এই ব্যাপারে সে কিছু জানতো না। তার অভিনয় এতই অপরিপক্ব ছিল যে ওয়েটার উপহাস করতে ছাড়ল না। কিন্তু এদিকে নজর না দিয়ে তাকে কফি হাউজ থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল।

সে হাঁটছিল রাস্তায়। সময়টা বিকেল। রাস্তায় ভীষণ জ্যাম আর আশপাশের দোকানগুলোয় মানুষ গিজগিজ করছিল। ফুটপাতে ভিড়ের ভিতর ইতিউতি সুযোগ বুঝে মালের ট্রে নিয়ে ফেরিওয়ালারা নিজেদের গুঁজে দিচ্ছিল। এদিকে আকাশ যেন কমলার রসে মিশে গলে গলে পড়ছিল, অন্যদিকে বরফে তৈরি নাকছাবির মতো সন্ধ্যাতারাটি একাকী বিচ্ছিন্ন হয়ে ঝিকঝিক করছিল। এভাবে শ্রী প্রকাশের এক ঘণ্টা উড়ে গেল, রোমান্টিক অনুভূতিমাখা গভীর ভাবনার একটি ঘণ্টা! এই এক ঘণ্টা যেন সবসময় অপেক্ষা করেছিল শ্রী প্রকাশকে পাবে বলেই। আর কোথায় সেই যাওয়ার জায়গা আছে শ্রী প্রকাশের, যেখানে তার হৃদয়প্লাবী সৌন্দর্য বুঝে ওঠার মত কেউ একজন থাকবে?

“আরে আরে! একবার দেখো কে আছে এখানে?"

কেউ একজন তার শরীরের সঙ্গে ভিড়ের মধ্যে ধাক্কা লাগালো, তারপর দাঁড়িয়ে গিয়ে তার বাহু ধরলো খুবই আন্তরিক ভঙ্গিতে। এটা ছিল পৃথিবীর সর্বশেষ মানুষ যার সঙ্গে সে দেখা করতে চাইতো: গোয়েল, মিস নিম্মির বাবা, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরকারী, তার শত্রু, তার ধ্বংস এবং বেদনার কারণ। গোয়েলকে আসলেই বেশ উৎফুল্ল লাগছিল এই সাক্ষাতে। সে তখনও শ্রী প্রকাশের বাহু ধরে থাকলো এবং হাত দিয়ে চাপ দিচ্ছিলো নিজের খুশি খুশি ভাব বোঝাতে। শ্রী প্রকাশ গা ঝাঁকুনি দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। এবং সে অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করলে গোয়েল তাকে অনুসরণ করা শুরু করলো। জানতে চাইলো শ্রী প্রকাশের এমনতর বিমাতাসুলভ আচরণের কারণ কী। গোয়েল বুঝালো যে তাদের মধ্যে একটা ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে। সে শ্রী প্রকাশের আরো কাছ ঘেঁষে আসলো।

বলল, “আমাকে মাফ করে দেন।” বলে ক্ষমা চাওয়ার তাদের ঐতিহ্যবাহী আত্ম-নম্র ভঙ্গিটিও করলো। দুজন দাঁড়ালো একে অপরের মুখোমুখি। একই উচ্চতার মানুষ তারা। উভয়ই খাটো, মোটা, মাথায় বলের মত টাক। তবে গোয়েল একটু বেশি মোটা।

গোয়েল এরপর শ্রী প্রকাশকে তার বাড়িতে আমন্ত্রণ দিল। এটা শুনে শ্রী প্রকাশ নিজের দুই কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তখন গোয়েল একটু লোভ দেখালো যে বাড়িতে দেশি মদ আছে। একদম খাঁটি। ভাগ্য খুব ভালো বলে আজ শ্রী প্রকাশের সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল। শ্রী প্রকাশের আপ্যায়ন খুব ভালো করতে পারবে সে আজ।

সে কোনোমতেই গোয়েলের বাড়ি যাবে না। এটা সে রাগী রাগী গলায় জানিয়ে নিজের গন্তব্যের দিকে হাঁটা ধরলে গোয়েল তাকে জড়িয়ে ধরলো, জোর দিয়ে বললো, “কেন যাবেন না? আর যদি নাই যাবেন তবে যাচ্ছিলেন কোথায়?"

তখন শ্রী প্রকাশের মনে পড়ে গেল কোথায় গেছে সবাই। গেছে মোতিবাগে। জ্যোৎস্না রাতে বার্ষিক পিকনিক করতে। তার সব কয়টা বন্ধু একটি বাস ভাড়া করেছিল। সঙ্গে এক ঝুড়ি আম আর দেশি হুইস্কি এক কার্টুন।

আর সারা পথজুড়ে তাদের হুই হুল্লোড় এবং গান। তারপর মোতিবাগ গিয়ে রসালো আমগুলো কেটে হেভি খানাপিনা। তাদের সবার মুখ আমের রসে মিষ্টি আঠা আঠা হয়ে উঠেছিল। আর এই আঠালো ব্যাপারটা মুছে ফেলেছিল হুইস্কিতে। মদের আর আমের রসের মিলিত নৃত্যে তারা উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়েছিল।

তারা উদ্‌গ্রীব ছিল পুরো চরাচর জোৎস্নায় মাখিয়ে কখন চাঁদ উঠবে। যখন উঠলো, তখন তাদের মেজাজ অদ্ভুতভাবে বদলে গেল। এমনিতে মোতিবাগ ছিল সুবিখ্যাত এক মনোহর জায়গা। এখানে আপন আভিজাত্য নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাসাদ। অর্ধেকটা ক্ষয়ে যাওয়া ও পরিত্যক্ত। সপ্তদশ শতাব্দীর এক রাজপুত্র নিজের গৌরব জানান দিতে বানিয়েছিলেন।

চাঁদ তার রূপের আলো বাড়ালে একটি শ্বেতপাথরের ভূত যেন তাদের সমস্ত সাংসারিক চিন্তা শুষে নিতে লাগলো। তারা আবেগে থরথর হয়ে কবিতা আওড়াচ্ছিল। গাচ্ছিল বেদনার গান। কেউ বাজাচ্ছিল বাঁশি। তাদের চোখে চিকচিক করতে লাগলো ফোঁটা ফোঁটা চোখের জল।

আগের বছরগুলোতে শ্রী প্রকাশ ছিল এই ভ্রমণের হরিহর আত্মা। কিন্তু এ বছর তাকে ছাড়াই তারা চলে গেছে।

গোয়েল শহরের এমন এক অংশে থাকতো, যা অন্য অংশের তুলনায় খুব একটা দৃষ্টিনন্দন ছিল না। এ অংশের বাজার একসময় বেশ সমৃদ্ধ থাকলেও এখন মূলত গরিবদের খুন্নিবৃত্তির আয়োজনে লাগে। দোকানের উপরের ঘরগুলো ভাড়া দেওয়া হয় এক রাতের হোটেল হিসেবে। গোয়েলের বাড়িটি ছিল বাজার থেকে বেরিয়ে আসা একটা ভেতরের কানাগলির মাথায়। অপরিচিত কারোর জন্য তার বাড়িটি খুঁজে পাওয়া ছিল একরকম অসম্ভব। বাড়িটিও ছিল বেশ ঘিঞ্জি। উঠোন, সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ের চারপাশ, রোয়াক এসব ভাড়াটেদের মধ্যে ভাগ করা ছিল। গোয়েল আর তার মেয়ে মিস নিম্মির ছিল একটাই ঘর। ঘরটির মাঝে দড়িতে গামছা টাঙিয়ে দুই ভাগ করা হয়েছিল। যার এক ভাগ নিম্মির, অন্য ভাগ গোয়েলের। ঘরে ঢুকেই শ্রী প্রকাশ ভেবেছিল ঘরটি খালি। কিন্তু যখন দড়িতে ঝুলানো বিভাজক গামছা সরিয়ে ফেললো, তখন দেখা গেল মিস নিম্মি মেঝেতে মাদুরের ওপর আলুথালু বেশে ঘুমিয়ে আছে।

গোয়েল কয়েকবার চেঁচিয়ে ডাকার পর মিস নিম্মির ঘুম ছুটলো। তারপর সে ধীরে সুস্থে মাদুর থেকে উঠলো। এমন ভাবে আড়মোড়া ভাঙলো যেন গভীর সমুদ্রে খাবি খাচ্ছে। তার শাড়ি বুক থেকে খসে পড়লো। সে খেয়াল করলো না। একজন অতিথি যে বাসায় এসেছে, সেটাও তার নজর এড়িয়ে গেল। তখন গোয়েল কন্যাকে ধমকালেন, “তুই দেখতে পাচ্ছিস না কে এসেছে!"

নিম্মি কয়েকবার চোখ কুঁচকে তাকিয়ে পরিস্থিতি বুঝে নিল। তারপর তার মুখে ফুটে উঠলো ধীর শান্ত হাসি। শাড়ি দিয়ে সে তার বুকের উন্মুক্ত জায়গা ঢাকলো।

গোয়েল নিম্মিকে দুটো গ্লাস আনতে বললো। সে একটু খুঁজে জানালো- গ্লাস কেবল একটি আছে বাসায়। শ্রী প্রকাশ জানালো- এটা কোনো ব্যাপার না, তাকে উঠতে হবে এখন। মোতিবাগের বাস ধরতে হবে। যেখানে তার বন্ধুরা সব অপেক্ষা করছে। সে উঠে দাঁড়ালে গোয়েল তার হাত টেনে ধরে বসিয়ে দিল। বলতে লাগলো: কেন শ্রী প্রকাশ এখানে একটু সময় থাকতে চাচ্ছে না, এখনই তার যাওয়ার যুক্তি আসলে কী, তারা তো এখানেই বেশ ভালো একটা সময় কাটাতে পারে।

“দেখেন”, গোয়েল বলে, “টাকা আমার কাছে কম নাই।” সে তার পকেটে হাত দিয়ে এক গাদা ব্যাংক নোট বের করে এনে দেখায়। ভগবান জানেন এইগুলো সে কোথা থেকে পেয়েছে। সে শ্রী প্রকাশের মুখের সামনে নোটের বান্ডিল নাড়িয়ে আবার পকেটে পুরে রাখলো। বলল, “চলেন বাদশাবাদ যাই। ওখানে আমরা ভরপুর মদ আর আম খাবো। চাঁদের আলোয় আমরাও নিজেদের মতো পিকনিক করবো।”

গোয়েল এই কথাটা বলে বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠল। কিন্তু শ্রী প্রকাশ হ্যাঁ বা না কিছুই বলল না। গোয়েল মিস নিম্মিকে সাজগোজ করে আসতে বলল। নিম্মিও পিতার বাধ্য কন্যার পরিচয় দিতে গামছার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল সাজতে। মিস নিম্মির দিকে শ্রী প্রকাশ না তাকালেও মেয়েটার পাকা আপেলের মতো গায়ের গন্ধটা এড়াতে পারল না।

তারা চলে এলো বাদশাবাদ, যা মোতিবাগ থেকে খুব একটা দূরে নয়। শহরের উপকণ্ঠে এর অবস্থান। পৌঁছানোয়ও যায় খুব দ্রুত। এটিও এক পরিত্যক্ত প্রাসাদ। যা ছিল রাজাদের জলসাঘর। যদিও এটার বয়স মোতিবাগের প্রাসাদটার চেয়ে দুইশত বছর কম। অন্ধকারে এটি মোতিবাগের প্রাসাদের মতই দেখতে লাগছিল। চারপাশ নিস্তব্ধ। শূন্যতায় মোড়ানো। ধুলোর গন্ধ। আর মাঝে মাঝে শেয়ালের কান্না এই নৈঃশব্দ্যের পর্দা ছিঁড়ে দিচ্ছিল।

এখানে আসার পর প্রথমদিকে শ্রী প্রকাশ বিষণ্নবোধ করলেও গলায় গোয়েলের দেয়া মদ কিছুটা যেতেই তার মেজাজ প্রসন্ন হয়ে উঠতে লাগলো। আর গোয়েল তো দৃঢ়ভাবে ভেবেই এসেছিল- ফুর্তি তাকে করতেই হবে এখানে। মিস নিম্মি যদিও ছিল চুপ করে, তবু বোঝা যাচ্ছিল যে সে সময়টা উপভোগ করছে। সে আম কাটছিল, নিজেও খাচ্ছিল বাকিদের সঙ্গে।

তারপর তারা তিনজন বসে রইলো অন্ধকারে, চাঁদ ওঠার অপেক্ষায়।

গোয়েল ডুবে যেতে থাকলো স্মৃতিকাতরতায়। জীবনের কিছু অসাধারণ অভিজ্ঞতা তার স্মরণে ফুলঝুরির মতো ফুটতে লাগলো। একবার সে ৫০ হাজার টাকায় একটি সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি বিক্রি করে ব্যাপক লাভ করেছিল কী কৌশলে, এবং খুব ঝুঁকি নিয়ে কীভাবে কয়েকজন শিখ কাঠমিস্ত্রির জন্য জাল পাসপোর্ট তৈরি করেছিল, সেসব তার স্মৃতিতে ভেসে আসলো। এই সমস্ত কাজের মাধ্যমে তার পকেটে জমেছিল মোটা কমিশন। যা সম্ভব হয়েছিল তার মানুষের সঙ্গে দ্রুত সম্পর্ক তৈরি করার দক্ষতার জন্য।

এই দক্ষতা তার বড় সম্পদ। কেননা এটাকে কাজে লাগিয়েই সে কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, খনিজ ও জ্বালানি উপমন্ত্রী, আয়কর বিভাগের আধিকারিক—এরকম আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছিল। সে শ্রী প্রকাশকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলল, “যে কোনো বড় নাম বলে দেখেন। যত ইচ্ছা উপরের লেভেলে যান, আমি ঠিকই চিনবো। কোনো না কোনো ডালপালা ধরে দেখবেন তারাও আমাকে চিনবে।”

গোয়েলের কথা শুনে শ্রী প্রকাশ উত্তেজিত হয়ে উঠলো। জোরে বললো, “হায় ভগবান! বড় বড় নাম- বড় মানুষের গালগপ্পো শুনি এখন! অথচ একসময় যখনই কিছুর দরকার পড়তো সবাই আমাকে দেখিয়ে দিত- ‘শ্রী প্রকাশকে গিয়ে ধরো, ওর পকেটে সব কয়টা বাধা।’ একবার আমাদের বিভাগীয় সচিবের পদোন্নতি উপলক্ষ্যে একটি সান্ধ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন হলো। আয়োজকরা আমাকে এসে বলে- ‘শ্রী প্রকাশ, অনুষ্ঠানের শ্রী বৃদ্ধির জন্য আমাদের তো একজন ভিআইপি লাগবে।’ আমি বলেছিলাম, ‘একটু ওয়েট করেন, আমি মুখ্যমন্ত্রীকে হাজির করাচ্ছি।’ এবং বলে আমি বসে থাকলাম না, ঠিকই গেলাম। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে নত হয়ে বললাম, ‘স্যার, দয়া করে আপনার কিঞ্চিৎ পদধূলি এই নগণ্য অনুষ্ঠানটাতে দিয়ে আমাদের ধন্য করুন।’

তিনি বললেন, ‘অবশ্যই শ্রী প্রকাশ, আমি সানন্দে উপস্থিত থাকবো।’ তারপর মুখ্যমন্ত্রী তার সচিবকে ডেকে একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট নোট লিখতে বললেন অনুষ্ঠানটার জন্য।’

শ্রী প্রকাশ থামলো। গোয়েল তখন শুরু করে, ‘আমি যখন সচিবালয়ে যাই—পিয়নরা দাঁড়িয়ে সালাম দেয়। আমার কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট লাগে না। সচিবদের পি এস দরজা খুলে বলে- ‘স্যার গোয়েল, আপনার শুভ আগমন হোক।’ তারা জানে আমি খালি হাতে আসি না। কাগজপত্রের নিচে টাকা লুকিয়ে আনি। টাকার পরিমাণ সবই ফিক্সড করা থাকে, এটা নিয়ে কেউ দরদাম করে না। একজন আন্ডার সেক্রেটারির জন্য ১০০০ টাকা, আর ডেপুটি হলে ২০০০। প্রত্যেকেরই নিজের ঠিক করা রেট আছে।’

গোয়েল একটু থেমে এক চুমুক মদ খেল। শ্রী প্রকাশও গলা ভেজালো। অবৈধভাবে তৈরি করা এই মদের স্বাদ ছিল কড়া। শ্রী প্রকাশ কিছু দিন আগে সংবাদপত্রে পড়েছে- অবৈধ ভেজাল মদ খেয়ে কীভাবে একটা শ্রমিকদের বস্তি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।

গোয়েল বলা শুরু করলো, “সচিবদের কথা ছাড়েন, মন্ত্রীদেরও মালপানি দিয়ে দেখাশুনা করতে হয়। তাদের পালা মানে তিমি পালা। একজন সচিবের চেয়ে মন্ত্রীর খাই অনেক বেশি। কারণ মন্ত্রীদের মেয়াদ নির্দিষ্ট, তারা জানে পরবর্তী নির্বাচনে হয়তো জিতবে না, তাই মুখ খুলে রাখে বিশাল বড় করে। একটু থেমে শ্রী প্রকাশকে বলল, “আপনি দেব কিষাণকে চিনেন নিশ্চয়ই। "

“দেব কিষান!" শ্রী প্রকাশ চেঁচিয়ে উঠল, “ও আর আমি এই এ রকম” —সে দুই আঙুল প্রায় সমান করে দেখায়।

গোয়েল বলতে থাকলো, “দেব কিষানের মন্ত্রণালয়ে একবার কিছু জটিল কাজে আমাকে ডাকা হয়েছিল। আমি মন্ত্রণালয়ে না গিয়ে ডাইরেক্ট তার বাড়িতে যেয়ে উঠি। কোনো ফর্মালিটি না করে শুরু করে দেই কাজের আলাপ।”

শ্রী প্রকাশ হঠাৎ মেজাজ হারিয়ে ফেললো, “দেব কিষান মোটেও এই রকম মানুষ না!”

গোয়েল হেসে উঠলো শ্রী প্রকাশের ভাবসাব দেখে। তখন শ্রী প্রকাশ আরো উত্তেজিত হয়ে বললো, “তোমার মতো নিচু মানুষ দেব কিষানের ব্যক্তিত্ব বুঝবে, সেটা আশা করা পাপ। আর তুমি তার বাড়িতে গেছ, এটা আমার বিশ্বাস হয় না।”

এবার গোয়েলও রেগে গেল, বলল, “আপনি এখনই আমার সাথে চলেন! আমরা একসাথে তার বাড়িতে যাবো। তখন দুধকা দুধ, পানি কা পানি হয়ে যাবে। আপনি দেখবেন কীভাবে মন্ত্রী দেব কিষান আমাকে সমাদর করে।”

“ আর যাই হোক, সে লোক দেব কিষান হবে না।” শ্রী প্রকাশ চড়া গলায় বলল।

“না। দেব কিষানই হবে!”

তাদের দুজনের উচ্চৈঃস্বরে কথা কাটাকাটি দেখেও মিস নিম্মি নির্লিপ্তভাবে আম চুষছিল। সম্ভবত মদ্যপানের পর বাপের এরকম আচরণে মিস নিম্মি অভ্যস্ত ছিল।

গোয়েল বিদ্রূপাত্মক কণ্ঠে বলল, “সে ক্ষেত্রে তো প্রমাণ হিসেবে আপনাকে একটা গোপন কথা বলতে হয় কিষানের। দেব কিষানের খাই সবার চেয়ে বেশি। কারণ সে কখনও তৃপ্ত হয় না। তাকে যারা কাছ থেকে চেনে, তারা আড়ালে তাকে ম্যানহোল বলে ডাকে। রাস্তার ম্যানহোল যেমন যত আবর্জনাই গিলুক, কখনও ভরাট হয় না, দেব কিষানও তেমনই। "

“তোমাকে আমি বিশ্বাস করতে পারছি না”, শ্রী প্রকাশ আবার বলল। যদিও এবার তার কণ্ঠে জোর কম ছিল। আসলে দেব কিষানকে বাঁচাতে তার বিশেষ কোনো আগ্রহ ছিল না। তবে তার নামটা উচ্চারণ করায় একটা দুঃখের স্মৃতি শ্রী প্রকাশের মনে পড়ে গেল।

যখন শ্রী প্রকাশ মিস নিম্মির অভিযোগের কারণে বিপদে পড়েছিল, তখন সে ছুটে বেড়াচ্ছিল ক্ষমতাবান মানুষদের দুয়ার থেকে দুয়ারে। বেশিরভাগই তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হতো অফিসের বাইরে। তবে, এদের মধ্যে দেব কিষাণ ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি শ্রী প্রকাশকে সময় দিয়েছিলেন। নিজ মন্ত্রণালয়ের অফিস কক্ষে। যেখানে দুটো এয়ার কন্ডিশনারের মাঝে শোভা পাচ্ছিল রাষ্ট্রপতির একখানা প্রতিকৃতি।

দেব কিষান বসেছিলেন একটি বিশাল সেক্রেটারিয়েট টেবিলের পেছনে। শ্রী প্রকাশকে তিনি তার সামনের চেয়ারে বসতে না বলাতে সে দাঁড়িয়েছিল। দেব কিষান তার মুখের দিকে তাকালো না। তাকালো শ্রী প্রকাশের মাথার ওপরে কিছু একটার দিকে। শ্রী প্রকাশ চেয়েছিল তার বিপদের কথা সব খুলে বলবে, ব্যাখ্যা করবে, অনুরোধ করবে সাহায্যের জন্য। প্রয়োজনে লোকটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে মিনতি করবে। কিন্তু দেব কিষান তাকে বলেছিলেন- নিয়মানুসারে বিভাগীয় তদন্ত হোক। সে নির্দোষ হলে তো সব সমস্যা মিটেই যাবে।

শ্রী প্রকাশ নিজের পক্ষে কিছু বলার সুযোগ পেল না। সে চুপচাপ বেরিয়ে এসেছিল ওখান থেকে মাথা নিচু করে। তখন তার মাথায় কেবল ঘুরছিল, দেব কিষান আসলে তার মাথার ওপরে কী দেখছিলেন এত মন দিয়ে?

দেব কিষানের চোখ শ্রী প্রকাশকে দেখার কোনো প্রয়োজন বোধ করেনি। তিনি তাকিয়ে ছিলেন আদতে রাষ্ট্রীয় ঝুট-ঝামেলার গভীর গভীরতর খাদের দিকে। শ্রী প্রকাশকে তার একটা মাছি বলে মনে হয়েছিল তখন, যার এই অফিসে ঢুকে পড়াটা ছিল একটা দুর্ঘটনা। এবং যাকে একটা ধোলাই দেওয়া উচিত।

গোয়েল আর ঝগড়া করতে চাচ্ছিল না। সে মদ, আম আর ঘোড়ার গাড়ির পেছনে টাকা খরচ করে এই পিকনিকের আয়োজন করেছিল সময়টা একটু ভালো কাটবে বলে।

গোয়েল তার আর শ্রী প্রকাশের মদের গ্লাসে আরো খানিকটা মদ ঢাললো। স্মৃতিচারণ করতে লাগলো তার আগের ভ্রমণগুলোর অভিজ্ঞতা নিয়ে। একবার সে আর তার বন্ধুরা মিলে এক বসায় এক ডজন মদের বোতল সাবাড় করেছিল, এবং তখন তাদের সঙ্গে যে বাজারি মেয়েরাও থাকতো, সেটা সে শ্রী প্রকাশকে কনুই দিয়ে মৃদু রসিকতার সুরে বলল। এই কথাটা মিস নিম্মি যেন শুনতে না পায়, এই জন্যে শ্রী প্রকাশের কানের কাছে মুখ এনে বলেছিল। এই অশালীন আচরণে শ্রী প্রকাশের মনে হচ্ছিল সে যদি তার গ্লাসের তরলটুকু গোয়েলের মুখে ছুড়ে মারতে পারতো, তাহলে কিছুটা শান্তি পেতো। কিন্তু সে সেটা না করে শিশুসুলভ রাগের ভঙ্গিতে মদের গ্লাসটা মাটিতে আছাড় মারলো।

গোয়েল চেঁচিয়ে উঠলো অবাক হয়ে। মিস নিম্মি থামিয়ে দিল আম চোষা। আর ঠিক তখনই উঁকি দিল চাঁদ। ঘন জ্যোৎস্নায় প্রাসাদটি যেন গলে গলে পড়তে লাগলো।

শ্রী প্রকাশ তার সঙ্গী দুজনকে পেছনে ফেলে রেখে মরীচিকার মতো প্রাসাদের দিকে এগিয়ে গেল। মূল গেটে তালা মারা। সে কাচের দরজা দিয়ে ভেতরে উঁকি মারলে দেখতে পেল একজন ঘুমন্ত প্রহরীকে। প্রহরী মেঝের দিকে ঝুঁকে পড়ে ঘুমাচ্ছে। ভেতরটা দেখা যাচ্ছিল বাইরে থেকে আসা ফ্যাকাশে আলোয়। দিনের বেলার মতোই ভেতরের ক্ষয় হতে থাকা খিলান,খসে পড়া প্লাস্টার, স্ক্রল—সবই চাঁদের আলোয় দেখা যাচ্ছিল। এই অপার্থিব সৌন্দর্যবোধের সঙ্গে আরও কিছু অজানা অনুভূতিতে আক্রান্ত শ্রী প্রকাশ প্রাসাদের সিঁড়িতে বসে কাঁদতে লাগলো। দুই হাতে মুখ ঢেকেও এই কান্না সে থামাতে পারছিল না।

কিছুক্ষণ পর গোয়েল তার পাশে এসে বসলো। গোয়েল হঠাৎ করে কথা শুরু করলো মৃত্যু বিষয়ে। সমস্ত পার্থিব জিনিসের মৃত্যু। রাজার মৃত্যু। রাজার প্রিয় কুকুরের মৃত্যু। গোয়েল পরিত্যক্ত প্রাসাদের দিকে হাত নেড়ে বলে উঠলো, “তারা সবাই এখন কোথায়? কোথায় আছে তারা সব?"

গোয়েলের এই কথার মতোই কোনো কথা শ্রী প্রকাশের বন্ধুরা মোতিবাগের পিকনিকে বলেছিল, তবু গোয়েলের কাছ থেকে শ্রী প্রকাশ এ ধরনের কোনো কথা প্রত্যাশা করে না। নেশা করা, ঘুষের করবার করা ছাড়া দর্শন আর ইতিহাস সম্পর্কে কী এমন জানে গোয়েল যে এখন এমন জ্ঞানের বুলি কপচাচ্ছে?

শ্রী প্রকাশ মাথা তুলে তাকালে দেখা গেল তার মুখে বিরক্তির রেখা। চোখের জল শুকিয়ে গেছে। সে বলল, “তুমি কি জানো নবাব গালিব হাসান সাহেব কী বলেছিলেন যখন দূতরা এসে জানায় প্রাসাদ তোরণের সামনে শত্রু এসে দাঁড়িয়ে আছে?"

গোয়েল এ সম্পর্কে কিছুই জানতো না। এমন কী সে নবাব গালিব হাসান সাহেবকেও চেনে না। সে তার অজ্ঞতা আড়াল করতে হাত নেড়ে বলল, “ওরা সব কই এখন? কই গেছে ওরা সবাই?"

শ্রী প্রকাশ ইতিহাসের ঝাঁপি খুলে বসলো। সে নবাব সম্পর্কে অনেক এলেম রেখেছিল। নবাব গালিব তার কাছে একজন বীরোচিত পুরুষ। তিনি মোতিবাগের প্রাসাদ ছেড়ে বাদশাবাদে এই জমকালো নতুন প্রাসাদটি বানিয়েছিলেন। সমস্ত প্রাসাদ ভরে তুলেছিলেন নিজের প্রিয় জিনিস দিয়ে। সেখানে নবাবের মনোরঞ্জনের জন্য ছিল কবি, গায়ক, নৃত্যশিল্পীরা। তার রসনা তৃপ্ত করতে ছিল রাঁধুনি এবং মদ বিশেষজ্ঞ। তার চুল আর গোঁফ দাড়ির যত্ন নিতে একজন নাপিতও ছিল। ছোট একটা চিড়িয়াখানাও ছিল যেখানে সিংহ আর অক্টোপাসের মতো জীবজন্তু শোভা বাড়াতো। নবাব গালিব নিজেই কবিতা লিখতে ভালোবাসতেন। শুধু লিখেই ক্ষান্ত হতেন না, জোরে জোরে পড়ে শোনাতেন দরবারিদের কাছে। শোনাতেন তার পা মালিশ করতে এবং সুগন্ধী দিতে আসা মেয়েদের। এরকম কবিতা পাঠের এক আসরে হন্তদন্ত হয়ে দরবার কক্ষে দূতরা এসেছিল, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা শত্রুর খবর দিতে। নবাব তখন শ্লোক আবৃত্তির মাধ্যমে দূতদের জবাব দিয়েছিলেন, যা শ্রী প্রকাশ গোয়েলকে শোনালো: “যখন বাঁধা আছি প্রেয়সীর বাহুডোরে, তখন যুদ্ধের দামামা কীভাবে বাজতে পারে? কীভাবে ঝংকার তুলতে পারে যুদ্ধের তরবারি? বেজে উঠতে পারে কি হাড় কাঁপানো প্রাচীন মৃত্যুবাঁশি? "

“আহা!” গোয়েল নিজের বুকে হাত রেখে বুঝালো যে সে শ্রী প্রকাশের কথাগুলো কতটা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছে। এ প্রতিক্রিয়া দেখে শ্রী প্রকাশ শ্লোকটি পুনরায় আবৃত্তি করে শোনালো। নবাবের লেখা আরো কিছু কবিতাও সে শোনালো গোয়েলকে। গোয়েলও প্রশংসায় গদগদ শ্রোতা হয়ে জেঁকে বসলো। সে এমনভাবে মাথা নেড়ে, মাঝে মাঝে জোরে করতালি দিয়ে শ্রী প্রকাশের কবিতা পাঠে উৎসাহ দিতে থাকলো যেন শ্রী প্রকাশ একজন এলেমদার সংগীতশিল্পী বা প্রতিভাবান নৃত্যশিল্পী। শ্রী প্রকাশের তখন নিজের সঙ্গ মধুর লাগছিল। অনেক দিন হলো কেউ তাকে কবিতা পড়তে অনুরোধ করেনি এভাবে। তার বউ এবং কন্যাদের কবিতা ও সংগীতের প্রতি কোনো আগ্রহ ছিল না। এটা নিয়ে শ্রী প্রকাশের চোরা হতাশা ছিল।

প্রশংসা করার আতিশয্যে গোয়েল শ্রী প্রকাশের পাঠ করা একটি লাইন পুনরাবৃত্তি করলো: ‘হে আমার ভালোবাসার গোলাপ, কোথায় পড়েছে ঝরে তোমার পাপড়িগুলো?’

আর এখানেই গোয়েল একটা ভুল করে বসলো। তার মাতাল এবং অশ্লীল কণ্ঠস্বরে কবিতার লাইনটি মানালো না। এই সুন্দর শব্দগুলোকে যেন সে অপমান করলো। হঠাৎ শ্রী প্রকাশ তার ওপরে গেল রেগে। সে তাকে গাল দিতে লাগলো— মিথ্যেবাদী, প্রতারক, ব্ল্যাকমেইলার, মাতাল বলে। গোয়েল সব হজম করলো শান্তভাবে। দু-একবার মাথা নেড়ে সায় দিল। হয়তো সে ছিল অনেকটাই মাতাল। যে কারণে গুছিয়ে প্রতিবাদ করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আর গোয়েলের এই নীরবতাই শ্রী প্রকাশের জন্য হতাশাজনক। সে ঝগড়া চালিয়ে নিতে ব্যর্থ হলো। কিছুক্ষণ শ্রী প্রকাশও কোনো কথা বললো না। তারপর আচমকা জিজ্ঞেস করলো, “তুমি এমনটা কেন করলে আমার সাথে? আমি একা শাস্তি পেলে কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু আমার স্ত্রী, কন্যাদের কী হবে ভেবে দেখেছো? কেন তাদের জীবনটা নষ্ট করলে গোয়েল? আমাকে বলো।”

সহানুভূতির কিছু ‘আহ উহঃ’ ছাড়া গোয়েলের কাছে কোনো সন্তোষজনক উত্তর ছিল না। তবু এইটুকুতে কৃতজ্ঞ শ্রী প্রকাশ নিজের বিবাহিত জীবনের কিছু হৃদয় মথিত করা স্মৃতির বাক্সো খুলে ধরলো। যেমন: আশপাশের মানুষজন সবাই একবাক্যে স্বীকার করতো শ্রী প্রকাশের বউ একজন সতী নারী। একজন দেবী। শ্রী প্রকাশও যত নিজের বউকে কাছ থেকে চিনেছিল, তত অবাক হয়েছিল। মানুষ এত ভালোও হতে পারে! বউকে দেখেই সে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে নারীরা হলো সাক্ষাৎ দেবী, যাদের পায়ের কাছে পুরুষদের মাথা নত করে উপাসনা করতে হবে। সে নিজেও এমনটা বাস্তবে যথাসম্ভব কাজের মাধ্যমে প্রকাশ করতো। পরে তার মানসিকতায় অন্য চিন্তা এলে সে নিজেকে অযোগ্য, ব্যর্থ পুরুষ বলে মনে করতো।

তারপর একসময় বন্ধুদের সঙ্গে গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডাবাজি করে বাড়ি ফিরে সে দেখতে পেতো বউ রান্নাঘরে খাবার বেড়ে তার অপেক্ষায় বসে আছে। ঘুমে বউয়ের চোখ ঢুলু ঢুল। তবু অতি কষ্টে মেলে রেখেছে যেন স্বামীর সেবায় কোনো ত্রুটি না হয়। শ্রী প্রকাশ এই রকম ভালোবাসায় অভিভূত। সে বউয়ের পায়ের কাছে গিয়ে মাথা নত করে বসলে বউ চমকে উঠে স্বামীকে জড়িয়ে ধরতো। আঁচল দিয়ে মুছে দিত মুখ, ঠোঁটের ময়লা। শ্রী প্রকাশ বউয়ের পায়ের কাছে রান্নাঘরেই একদিন শুয়ে পড়েছিল। বউ তাকে ওঠানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু সে উঠলো না। পুরোপুরি বুঝিয়ে দিলো, বউয়ের ভালোবাসার মহত্ত্বের কাছে তার হৃদয় কতটা সিক্ত হয়েছে। মথিত হয়েছে। বউ তখন শ্রী প্রকাশের গায়ের পোশাক খুলে তাকে বিছানায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল।

মাঝে মাঝে বউ স্বামীকে কোলে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করত, যেন শ্রী প্রকাশ ছোট বালক। এই আদর সে পছন্দ করতো। বউয়ের কোলে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকত। ভালোবাসার উষ্ণতায় তার চোখ মুদে আসতো। নিজেকে মনে হতো মায়ের স্নেহে সাঁতার কাটতে থাকা এক আদুরে শিশু। আনন্দের আবেশে সে অস্ফুটে ডাকতো বউকে, “মা।”

শ্রী প্রকাশের গল্প শুনতে শুনতে গোয়েল ঘুমিয়ে পড়েছিল। যদিও ব্যক্তি হিসেবে গোয়েলকে সে সম্মান করতো না, তবু আজ নিজের স্মৃতিচারণার সঙ্গী হিসেবে, তার মনের জমে থাকা কথাগুলো কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়াটা দরকার ছিল বলে গোয়েলকে কিছুটা পাত্তা দিয়েছিল। কেবল বউ সম্পর্কিত স্মৃতিই নয়, এমন আরো অনেক গল্প জমেছিল যা বলতে পারলে শ্রী প্রকাশ হালকা হতো। মাঝে মাঝে তার মন এত ভারাক্রান্ত হয়ে উঠতো, মনে হতো বুকের ভেতরে বিশাল এক গন্ধমাদন পাহাড় গজিয়েছে। তখন অন্য কোথাও—অন্য কোনো খানে—গভীর চাঁদের নিচে স্বর্গের উপত্যকায় বসে—একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলার তৃষ্ণায় তার বুকটা ফেটে যাওয়ার উপক্রম হতো। কিন্তু এখন, এখানে, গোয়েল ছাড়াও ছিল মিস নিম্মি। সে বসে ছিল যেখানে তারা তাকে রেখে গিয়েছিল। আমের ঝুড়ি আর মদের বোতলগুলোর কাছে। আমগুলো সব সে খেয়ে সাবাড় করেছিল। একা একা এতক্ষণ বসে থাকতে তার কোনো সমস্যা হয়নি। বাড়ি যাওয়ার জন্যও ছিল না তার কোনো তাড়া। সামনের ধুলোময় মাটির প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে ছিল চুপচাপ। এইরকম ধৈর্যের পরিচয় মিস নিম্মির ব্যক্তিত্বের অন্তর্গত বৈশিষ্ট্য। শ্রী প্রকাশের অফিসে যখন সে কাজের খোঁজে এসেছিল,তখন সে এভাবেই বসেছিল। নিম্মির এ ব্যক্তিত্ব শ্রী প্রকাশের ভালো লেগেছিল। সে তাই মেয়েটাকে বারবার আসতে বলেছিল। তাকে দেখলে শ্রী প্রকাশের মনে অদ্ভুত এক আনন্দ খেলা করতো। একদিন এভাবেই অফিসে চাকরি প্রার্থী নিম্মি বসেছিল। কথায় কথায় সে একটি মুরগির কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল শ্রী প্রকাশকে, যেটা মোটাসোটা হয়ে বসে আছে টেবিলের ওপর রান্না হবার অপেক্ষায়। এটা কি কোনো ইঙ্গিত? জানতো না শ্রী প্রকাশ। তবে তৃতীয় দিন থেকে সে মিস নিম্মিকে ডাকতো ‘আমার ছোট্ট মুরগা’ বলে। শ্রী প্রকাশ একদিন হঠাৎ চিৎকার করে উঠেছিল “পড়ে যাচ্ছে! পড়ে যাচ্ছে!” বলে এবং এমনভাবে ইশারা করেছিল যে যেন কেউ খাবার খাবে বলে হামলে পড়ছে টেবিলের ওপর। অবশ্যই মিস নিম্মি বুঝতে পারেনি শ্রী প্রকাশ আসলে কী বোঝাতে চাচ্ছিল, তবু মেয়েটা সুন্দর করে হেসেছিল।

শ্রী প্রকাশ বর্তমানে ফিরে এলো সেই পুরোনো “পড়ে যাচ্ছে! পড়ে যাচ্ছে!” বলে চেঁচিয়ে উঠে। খালি মদের বোতলগুলোর পাশে সে বসে পড়ল। মাটিতে। মিস নিম্মি হাসলো। এই হাসিতে তার পেছনের রাজপ্রাসাদ যেন হাওয়ায় ভেসে উঠলো। চাঁদের হলুদ জোৎস্নায় অসম্ভব মায়াবতী লাগছিল মিস নিম্মিকে। এই স্বর্গীয় আলো ঢেকে দিয়েছে তার মুখের রুক্ষতা। ঢেকে দিয়েছে শৈশবে গুটিবসন্তের আক্রমণে তৈরি হওয়া গায়ের ক্ষত।

শ্রী প্রকাশ নিম্মির আরো কাছে সরে এলো। মেয়েটার স্তন বেশ ভারী, দেহলতা থেকে ফুলে বেরিয়ে আসতে চাইছে যেন। শ্রী প্রকাশের হাত আপনাতেই নিম্মির স্তনের ওপরে উঠে গেল। কিন্তু সেই হাতে ছিল শ্রদ্ধার মিশেল। ছিল বিস্ময় এবং মায়া। সেই হাত সতর্ক ছিল যাতে মেয়েটার কোনো ক্ষতি না হয়।

শ্রী প্রকাশ জিজ্ঞেস করলো, “বাবা কোথায়?”

“ঘুমাচ্ছেন। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।”

খুব আলতো করে শ্রী প্রকাশ নিম্মির স্তনে চাপ দিতে দিতে তার ঠোঁটে চুমু খেল। সেখান থেকে পাঁকা আমের স্বাদ তুলে নিল নিজের রুক্ষ ঠোঁটে। নিম্মি নিস্তরঙ্গ পুকুরের মতো শান্ত থাকলো। অফিসে যেমন আদর করতে দিয়েছিল প্রতিবাদহীন, এখনো তেমনি দিল। কেবল একটু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো বাবা সজাগ হলো কিনা।

শ্রী প্রকাশ বলল, “চিন্তা কীসের পাগলি! গোয়েল পেট ভরে মদ খেয়েছে। সে সহজে জাগবে না।"

“বাবা জেগে উঠছেন।”

তারা দুজনেই সামনে তাকালো। প্রাসাদের সামনে একাকী গোয়েল। সিঁড়িতে একটু আরামে নিজেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুতে চেয়েছিল। কিন্তু সিঁড়ি তা হতে দিল না। তাকে পাপোশ ঝাড়ার মতো ফেল দিল। গড়াতে গড়াতে গোয়েল মাটিতে পড়ল। কিন্তু আজ চাঁদনী রাতে মাটির হৃদয়ও নরম হয়ে উঠেছে। মাটি তাকে আলতোভাবে কোলে নিল। সে নড়লো না। বরং সেখানেই শুয়ে থাকলো।

“বাবা ঠিকঠাক আছেন?” নিম্মি প্রশ্ন করলো।

“অবশ্যই সে ঠিক আছে। কিছু কী হয়েছে তার সঙ্গে?” শ্রী প্রকাশ তিক্ত কণ্ঠে জবাব দিল। সে নিম্মির হাত ও বুক থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিল। তার মেজাজ খিঁচড়ে উঠলো। সে বলল, “তুমি কেন তোমার বাবাকে আমার সঙ্গে এমনটা করতে দিলে? আমি তার কী এমন ক্ষতি করেছি বলতে পারো? এমনি তোমারও কি কোনো ক্ষতি করেছি? বলো আমাকে।”

নিম্মির কাছে কোনো উত্তর ছিল না। সে বলতে পারতো না যে শ্রী প্রকাশ তার সঙ্গে খারাপ কিছু করেছে। আচ্ছা কাউকে ভালোবাসা কি অপরাধ? শ্রী প্রকাশ যেভাবে নিম্মিকে পূজা করার মতো করে আদর করেছে সেটাকে কোন অর্থে মিস নিম্মি খারাপ বলবে? অফিসের সেই দিনগুলো ছিল পবিত্র। শ্রী প্রকাশের অনুভূতিও ছিল বিশুদ্ধ, এমনই, যেন মন্দিরে গিয়ে দেবীর পায়ে ফুল দিচ্ছে।

সে আবার জিজ্ঞেস করলো, “বলো, তোমার সঙ্গে কী খারাপ আমি করেছি যার জন্য আমার চাকরি চলে গেছে?”

“আসলে অফিস থেকে ফেরার পর বাবা বারবার আমাকে প্রশ্ন করতো ‘সে তোমার সঙ্গে কী করেছে?’, আমি যখন বলতাম কিছুই করে নাই, তখন বাবা খুব রেগে যেত। সে বারবার একই প্রশ্ন করতে থাকতো। থামতে চাইতো না। মাঝে মাঝে আমাকে রাতে ঘুম থেকে জাগিয়ে জিজ্ঞেস করতো বিভিন্ন প্রশ্ন।”

শ্রী প্রকাশ নিজের মুখ নিম্মির ঘাড়ে ঘষলো। জিজ্ঞেস করলো বিড়বিড় করে, “কী ধরনের প্রশ্ন?”

“বাবার প্রশ্নগুলো ছিল এইরকম: ‘সে তোর কোথায় হাত রেখেছিল?’ আমি যখন মনে করতে পারতাম না, তখন নিজের শরীরের একটা অংশ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করতো, এখানে?’ আমাকে হ্যাঁ বলতে হয়েছিল। কারণ আপনি এমনটাই করেছিলেন।”

“হ্যাঁ, শ্রী প্রকাশ বিড়বিড় করলো, আমি তো ওরকমটাই করেছিলাম তোমার সঙ্গে।” সে আবার একই রকমভাবে নিম্মির শরীরে হাত রাখলো।

নিম্মি বলতে লাগলো, “বাবা আমার সঙ্গে চিৎকার চেঁচামেচি করতেন। তিনি নিজের মাথা দিয়ে দেয়ালে আঘাত করতেন আমার থেকে কথা বের করার জন্য। তবু আমি বলতাম না, যদি ওই সময় মানুষটা আরো অনেক ঝামেলার ভিতর দিয়ে না যেতেন। দুইজন লোক ওই সময় প্রায়ই আসতো আমাদের বাসায়। তারা বাবাকে জেলে যাওয়ার ভয় দেখাতো। বাবা এই বিষয়টায় ভয় পেতেন ভীষণ। একবার জেলে গিয়ে বাবা খুব রোগা হয়ে ফিরেছিলেন। তিনি সেখানে পঞ্চাশ কেজি ওজন খুইয়েছিলেন।”

শ্রী প্রকাশের মনে পড়ে গেল সেই দিনগুলোর কথা। সেই সময় গোয়েলের পাগল পাগল দশা। সে তার কাছে এসে হুমকি ধমকি দিতো টাকার জন্য। কিন্তু শ্রী প্রকাশ নিজের অফিসের ডেস্কে নিরাপদে বসে এইসব হুমকিকে পাত্তা না দিয়ে বলতো, “তুমি জাহান্নামে যাও। যা ইচ্ছা করো।”

শেষবার যখন শ্রী প্রকাশ একই ধরনের আচরণ দিল, তখন গোয়েল অফিসের টেবিলটার ওপর ঘুসি মেরে শ্রী প্রকাশের মুখের কাছে মুখ এনে হিস হিসিয়ে বলেছিল, “তাহলে তুই দেখতে পাবি তোর কর্মফল। তুই দেখবি। তারপর তুই শিখবি।” গোয়েল চিৎকার করে উঠেছিল। তার মুখ থেকে ফেনা বেরুচ্ছিল। শ্রী প্রকাশের অস্বস্তি বোধ হলেও সে সেটা লুকিয়ে গোয়েলের মুখের দিকে ছুড়ে দিয়েছিল তাচ্ছিল্যের হাসি। সঙ্গে সিগারেটের ধোঁয়ার রিং।

মিস নিম্মি বলল, “আমি বেশ অনেকটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম বাবার মেজাজ দেখে। বলেছিলেন তিনি আপনাকে এমন এক শিক্ষা দিবেন যে আপনি সারা জীবনেও ভুলতে পারবেন না। তার কথা হচ্ছে, ‘কেন আমি এই দুনিয়ায় একাই লাথি ঘুসি খাবো?অন্য কাউকেও এগুলোর কিছু ভোগ করাতে হবে না!’ তারপর এক সময় সেই দুইজন লোক বাবার কাছে আসা বন্ধ করে দিলে, বাবা ভালো হয়ে উঠলেন। আমার জন্য হার্ট শেপের একটা আয়না উপহার হিসাবে আনলেন। তারপর আপনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। উনি তখন আবার আপনার অফিসে যাওয়ার চেষ্টা করলেন তার অভিযোগের রিপোর্ট বদলাতে, কিন্তু কর্তৃপক্ষ বলল অনেকটা নাকি দেরি হয়ে গেছে। বাবা যখন ফিরে এসে আমাকে বলেছিলেন এই কথা, আমি কেঁদে ফেলেছিলাম।”

“তুমি কেঁদেছিলে? তুমি আমার জন্য কেঁদেছিলে?” শ্রী প্রকাশ আবেগপ্রবণ হয়ে উঠলো।

“হ্যাঁ। আর বাবাও পরে আপনার প্রতি অন্যায় করার জন্য কষ্ট পেয়েছিলেন।”

গোয়েল তখনও সিঁড়ির পাদদেশে শুয়ে ছিল। শ্রী প্রকাশের মনে গোয়েলের প্রতি আর তেমন ক্ষোভ নেই- বরং তার জন্য বেশ করুণা হচ্ছিল। এই মুহূর্তে তার যেটা সবচেয়ে ভালো লাগছিল- গোয়েল ঘুমিয়ে আছে। শীঘ্রই ভাঙার সম্ভাবনা নেই। তার আর মিস নিম্মির মধ্যকার গোপনীয় অন্তরঙ্গ আলোচনায় কোনো ভাগড়া দিতে আসবে না লোকটা। এবং ভগবানের কাছে এটাই তার আপাতত চাওয়া।

“আমি এত বেশি কেঁদেছিলাম সে সময় যে বাবা আমাকে একটু ভালো রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। তিনি আমাকে দিয়েছিলেন নানান উপহার। কাপড়, মিষ্টি। তারপরও আমি যখন কান্না থামাচ্ছিলাম না,তখন জিজ্ঞেস করেছিলেন,’ আর কীইবা করা যাবে মা? এটা যে মানুষটার নিয়তি।”

“সে ঠিকই বলেছে।” শ্রী প্রকাশ বলল। শ্রী প্রকাশ এ কথা বলল যেন মিস নিম্মি একটু ভালো থাকে। সে চায়নি, মেয়েটা তার কারণে এখন বিরক্ত হোক।

শ্রী প্রকাশ কেবল চেয়েছিল মিস নিম্মি সবসময় একই রকম যেন থাকে—শান্ত, ধীরস্থির, নির্মল—যাতে নিজের হৃদয়কে তৃপ্ত করে সে এই মানবীকে আদর করতে পারে।

শ্রী প্রকাশ ঠোঁট দিয়ে তার শাড়ির আঁচল তুলে ধরলো, ঠিক যেমন করে বউয়ের ক্ষেত্রে করতো। সে বিড়বিড় করে বললো, “আমার দেবী”। এমন করে নিজের বউকেও বলতো। বউ এবং পৃথিবীর সমস্ত নারীর সৌন্দর্য ও উদারতার শ্রীচরণে পূজার অর্ঘ্য সমর্পণ সবসময় জারি থাকবে শ্রী প্রকাশের।