শেক্সপিয়রের হ্যামলেট তাঁর দীর্ঘতম নাটক, এবং একই সঙ্গে তাঁর সবচেয়ে বহুলপঠিত ও বহুল আলোচিত ও বিশ্লেষিত সৃষ্টিকর্ম, তখন যেমন ছিল আজও তেমনই আছে, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। কারণ এই নাটকের কাহিনি এমন এক আকর্ষণ তৈরি করে যা পাঠক বা দর্শককে প্রথম দৃশ্য থেকেই আবিষ্ট করে রাখে, চরিত্রগুলো স্মৃতিতে গেঁথে থাকে দীর্ঘদিন, কখনো তা গভীর বিষাদে স্পর্শ করে, কখনো হঠাৎ হাসায়, আবার কখনো নাটকীয়তায় ভরিয়ে তোলে মন, আর এই সবকিছুর নিচে ধীরে ধীরে কাজ করে তার দার্শনিক স্তর, যেখানে জীবন, মৃত্যু, কর্তব্য, দ্বিধা আর নৈতিকতার প্রশ্ন একে একে উঠে আসে। মার্কিন সমালোচক হ্যারল্ড ব্লুম মনে করতেন, মানুষের মৃত্যুচিন্তার মুখোমুখি হয়ে নিজের ভঙ্গুরতা বোঝার ক্ষেত্রে হ্যামলেট এমন এক ধ্যানমূলক উচ্চতায় পৌঁছেছে, যার তুলনা শুধু ধর্মগ্রন্থগুলোই। এই নাটক মঞ্চের পাশাপাশি, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিতরেও গভীর ছাপ রেখে গেছে; ‘কঠোর হয়েও কল্যাণকামী হওয়া’ বা ভয়ের মুহূর্তে ‘লোম খাড়া হয়ে যাওয়া’ ধরনের অভিব্যক্তি আমরা আজ স্বাভাবিকভাবেই ব্যবহার করি, অথচ ভুলে যাই যে এই সবই এসেছে এই ধরণভাঙা নাটকের ভেতর থেকে। আজ এই দীর্ঘ নাটকের গল্পটি বলবো, মূল স্বরগুলো ঠিক রেখে; ডেনমার্কের উচ্চমনস্ক যুবরাজ হতে শুরু করে ধূর্ত খলনায়ক ক্লডিয়াস কিংবা অতি সক্রিয় দরবারি পোলোনিয়াস, সবাই সেখানে উপস্থিত থাকবে, আর তাদের ঘিরে আবর্তিত হবে বিশ্বাসঘাতকতা, বিষাক্ত রাজনীতি ও ন্যায়ের অনুসন্ধানের সেই চিরন্তন গল্প, যেটি শেক্সপিয়র বলতে চেয়েছিলেন, যা আজও আমাদের ভাবতে বাধ্য করে।
হ্যামলেট শুরু হয় এক শীতল, অস্বস্তিকর রাতে, এলসিনোর দুর্গের প্রাচীরে, যেখানে হিম বাতাস আর অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে এক স্নায়ুচাপে ভরা সৈনিক প্রহরা দিচ্ছে, চারপাশে যেন কিছু নড়ে ওঠার আভাস, আর সেই অনিশ্চয়তার মাঝখানেই তার গলাফাটা প্রশ্ন- কে ওখানে? পালটা প্রশ্নে জবাব আসে— না, আগে তুমি বলো, নিজের পরিচয় দাও। পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে সে ধীরে অস্ত্র নামায়; আরেকজন প্রহরী এসেছে তাকে বদলি করতে। বিদায়ের সময় সহযোদ্ধাকে ধন্যবাদ জানিয়ে সে বলে, শীত বড় তীব্র, আর তার মনটা বেশ খারাপ। এই সামান্য কথোপকথনই ইঙ্গিত দেয়, ডেনমার্কে সব কিছু ঠিকঠাক নেই; রাজ্যের কেন্দ্র এলসিনোর যেন অদৃশ্য এক আশঙ্কায় টানটান হয়ে আছে।
প্রহরীদের আলাপচারিতা শুনতে শুনতে আমরা জানতে পারি নরওয়ের এক বিদ্রোহের কথা, যে নরওয়ে একসময় ছিল ডেনমার্কের অধীন, প্রয়াত রাজা হ্যামলেটের শাসনামলে। বহু বছর আগে রাজা হ্যামলেট নরওয়ের রাজা ফোর্টিনব্রাসকে হত্যা করে তার ভূখণ্ড দখল করেছিলেন। এখন সেই নিহত রাজার পুত্র, তরুণ ফোর্টিনব্রাস, প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে, আর ডেনমার্ক ব্যস্ত আসন্ন যুদ্ধের প্রস্তুতিতে। কিন্তু এই প্রস্তুতির ওপর একটা অস্বচ্ছ ছায়া ঝুলে আছে। পরপর দুটি রাতে এলসিনোর প্রাচীরে দেখা দিয়েছে রাজা হ্যামলেটের প্রেতাত্মা। বর্ম পরা সেই ভয়ংকর উপস্থিতি দুর্গের প্রহরীদের আতঙ্কিত করেছে। তার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে না পেরে তারা শরণ নেয় হোরেশিওর কাছে, যে মৃত রাজার পুত্র যুবরাজ হ্যামলেটের বিশ্বস্ত বন্ধু। রাজা কি আবার ‘দম্ভী নরওয়ে’র বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে এসেছেন, অন্তত আত্মার রূপে? হোরেশিওর মন থেকে সন্দেহ যায় না; তার মনে হয় প্রেতাত্মার সেই ভয়াল মুখভঙ্গি কোনো গভীরতর সংকেত বহন করছে।
এলসিনোর অদ্ভুত পরিবেশ সেই সন্দেহকে আরও তীব্র করে তোলে। এক প্রহরীর মুখে শোনা যায় সেই বিখ্যাত বাক্য, ডেনমার্কের রাষ্ট্রের ভেতর কোথাও কিছু পচে গেছে। রাজা হ্যামলেটের মৃত্যুতে শোক স্থায়ী হয়নি দীর্ঘদিন। দুমাস না যেতেই তাঁর ভাই ক্লডিয়াস সিংহাসন দখল করে এবং বিধবা রানি গাট্রুর্ডকে বিয়ে করে বসে। বাইরে যখন সৈনিকেরা যুদ্ধ আর ভূতের গল্প করছে, তখন রাজদরবারে সেই বিয়ে উদ্যাপন হচ্ছে মদ, সংগীত আর আতশবাজির আলোয়।
এই বিয়ের অনুষ্ঠানই হোরেশিওকে আবার ডেনমার্কে ফিরিয়ে এনেছে। এলসিনোর প্রাসাদে সে খুঁজে পায় তার পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়-বন্ধু, গভীর শোকে নিমজ্জিত যুবরাজ হ্যামলেটকে। যুবরাজ হ্যামলেট যখন প্রথম কথা বলে, তখনই আমরা এমন একজন মানুষকে দেখি, যে তীব্র দুঃখ আর ন্যায্য ক্রোধে আচ্ছন্ন। কত দ্রুত তার মা বাবার শোক ভুলে গেল! কত নির্মম হিসাবি বুদ্ধিতে শেষকৃত্য আর বিয়ের খরচ একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হলো! হোরেশিওকে সে বলে, যেন একদিন মৃতের জন্য রান্না করা খাবার পরদিন কৃপণতার সঙ্গে তুলে রাখা হলো আনন্দের ভোজের জন্য।
যুবরাজ হ্যামলেটের চোখে তখন পৃথিবী ক্লান্ত ও বিস্বাদ; তার সমস্ত আনন্দ, আগ্রহ নিঃশেষ হয়ে গেছে। ডেনমার্ক তার কাছে এক অবহেলিত, আগাছায় ভরা বাগান, যেখানে সব কিছুই প্রকৃতিগতভাবে নোংরা আর পচনশীল। মায়ের এই তাড়াহুড়ো করা বিয়ে তার কাছে স্বাভাবিক নয়, বরং রীতিমতো রক্তসম্পর্কের সীমা লঙ্ঘন করা। আর ক্লডিয়াস? সে তার বাবার মতো মহান রাজার তুলনায় কেবলই এক কামুক, মদ্যপ ব্যক্তি।
তবু প্রশ্ন থেকেই যায়, হ্যামলেট কী করবে? ক্লডিয়াস অযোগ্য হলেও সে এখন রাজা, আর সে তার দত্তক পুত্র ও উত্তরাধিকারী। প্রকাশ্যে রাজা ও রানির বিরুদ্ধে কথা বলা মানে ডেনমার্কের ভেতর বিভেদ সৃষ্টি করা, রাষ্ট্রকে দুর্বল করা। তাই তাকে নীরব থাকতে হবে, কর্তব্যপরায়ণ যুবরাজের ভূমিকায় অভিনয় করতে হবে, এমনকি সেই নীরবতা যদি তার হৃদয় ভেঙে দেয় তবু।
শেক্সপিয়রের ট্র্যাজেডিগুলোতে আকস্মিকতা বা দৈবচরিত্র অনেক সময় কাহিনির মূল চালিকাশক্তি, আর হ্যামলেট তার ব্যতিক্রম নয়। বারবার দেখা যায়, চরিত্রদের ব্যক্তিগত দুর্বলতা থেকে জন্ম নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো নিজের অজান্তেই এমন সব পরিণতি ডেকে আনে, যা শেষ পর্যন্ত তাদেরই পিছু নেয়। ক্লডিয়াসের দিকেই তাকানো যাক। নাটক তখনও প্রথম অঙ্কে, অথচ আমরা ইতোমধ্যেই তার প্রধান দোষটি জেনে গেছি; কামনা, লালসা। আর এই দোষই শেষমেষ ঘুরে এসে তাকেই আঘাত করবে।
বিয়েটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন করার তাড়না থেকেই ক্লডিয়াস রাজা হ্যামলেটের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নিজের বিয়ের আয়োজন করে। এই তাড়াহুড়া করা বিয়েই হোরেশিওকে এলসিনোরে নিয়ে আসে যখন প্রেতাত্মার আবির্ভাব ঘটেছে। হোরেশিও তার বিচক্ষণতার জন্য পরিচিত, তাই সৈনিকেরা আগে তার সঙ্গেই কথা বলে, ক্লডিয়াসকে জানাবার আগেই। আর হোরেশিও যেহেতু কেবল বিচক্ষণই নয়, বিশ্বস্ত বন্ধুও, সে তাদের শপথ করায়, হ্যামলেটের সঙ্গে কথা না বলা পর্যন্ত যেন কেউ কিছু প্রকাশ না করে। এই সিদ্ধান্তই সব কিছু পাল্টে দেয়।
হোরেশিও যখন প্রেতাত্মার কথা যুবরাজ হ্যামলেটকে বলে, একটি বিষয় তার মনে গভীরভাবে দাগ কাটে যে প্রেতটি সশস্ত্র ছিল। যদি তার পিতার আত্মা যুদ্ধের সাজে ফিরে এসে থাকে, তবে নিশ্চয়ই সব কিছু স্বাভাবিক নয়, সে বলে ওঠে। এতদিনের ছড়ানো-ছিটানো শোক আর ক্রোধ হঠাৎ ঘনীভূত হয়ে সন্দেহের রূপ নেয়। মানুষ তার অপরাধ ঢাকতে পারে, সে বলে, এমনকি কিছু দিনের জন্য সফলও হতে পারে। কিন্তু নোংরা কাজ শেষ পর্যন্ত প্রকাশ পায়ই। হ্যামলেটের কাছে ন্যায়বিচার ঈশ্বরীয়, আর তা সব অন্যায়কে একদিন না একদিন উন্মোচিত করবেই। সত্য গোপন থাকে না।
সেই রাতেই হ্যামলেট প্রাসাদের প্রাচীরে উঠে প্রেতাত্মার জন্য অপেক্ষা করে। হোরেশিওর সন্দেহ যেমন ছিল, তেমনই; যে অবয়ব এতদিন নীরব ছিল, সে এবার কথা বলতে প্রস্তুত, কিন্তু তার ভয়ংকর কাহিনি শোনার অধিকার কেবল হ্যামলেটের। সে কেবল তখনই মুখ খুলবে, যখন হ্যামলেট নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে নেবে, যেখানে হোরেশিও বা সৈনিকেরা কিছুই শুনতে পাবে না।
প্রেতাত্মা জানায়, সে-ই হ্যামলেটের পিতা। নিজের পাপ স্বীকার বা প্রায়শ্চিত্ত করার সুযোগ না পেয়ে মৃত্যুবরণ করায় তাকে পুরগেটরিতে শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে। ডেনমার্ক বিশ্বাস করে, সে সাপের কামড়ে মারা যায়নি। এক ভোজের পর নিজের বাগানে ঘুমিয়ে থাকার সময় তাকে হত্যা করা হয়েছিল; বিশ্বাসঘাতক ভাই তার কানে বিষ ঢেলে দিয়েছিল, যাতে সে তার মুকুট আর স্ত্রী দুটোই দখল করতে পারে। প্রেতাত্মা বলে, ডেনমার্কের রাজশয্যা এখন পরিণত হয়েছে ভোগবিলাস আর অভিশপ্ত রক্তসম্পর্কের শয্যায়। সে হ্যামলেটকে আদেশ করে, সেই ‘হাসিমুখো, অভিশপ্ত খলনায়ক’ ক্লডিয়াসকে হত্যা করতে হবে, আর ডেনমার্ক নামের এই আগাছায় ভরা বাগান পরিষ্কার করতে হবে। এই মুহূর্ত থেকে নাটকের বাকি অংশে হ্যামলেট যা কিছু করে, সবই এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই।
শেক্সপিয়রের যুগে প্রতিশোধ মানেই ছিল রক্তাক্ত, প্রায় নির্বিবাদী এক কাজ; কুকর্মের সত্য উদ্ঘাটিত হলেই আত্মসমীক্ষার অবকাশ না রেখে নেমে আসত সরাসরি কর্ম। কিন্তু হ্যামলেট সেই ধারার মানুষ নয়। সে চিন্তাশীল, দ্বিধাগ্রস্ত, নিজের ভেতরের টানাপড়েনে আটকে থাকা এক যুবরাজ, যে স্থৈর্যধর্মী সহনশীলতা আর উন্মত্ত হিংসার মাঝখানে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সে নিজেকেই প্রশ্ন করে; অবমাননাকর ভাগ্যের ‘তির আর ঢিল’ সহ্য করাই কি বেশি মহৎ, নাকি অস্ত্র তুলে নিয়ে যে কোনো পরিণতির তোয়াক্কা না করে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করাই সত্যিকার কর্তব্য? প্রশ্নটি ঝুলে থাকে, উত্তরহীন।
অনেক সমালোচকের কাছে এই চিন্তাশীলতাই হ্যামলেটের ট্র্যাজিক ত্রুটি; সিদ্ধান্তহীনতার কারণে সে দৃঢ়ভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হয়। কিন্তু চরিত্রটিকে আর নাটকটিকে দেখার আরেকটি পথও আছে। প্রেতাত্মা কেবল লক্ষ্য নয়, উপায়ের কথাও বলে। সে হ্যামলেটকে সতর্ক করে দেয়; ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যেন তার মন কলুষিত না হয়, যেন সে নিজেই অন্যায়কারী হয়ে না ওঠে। ডেনমার্কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে, কিন্তু নিজে অপরাধী দখলদার হওয়া চলবে না। আর আঘাত আসবে ক্লডিয়াসের ওপর, মায়ের ওপর নয়। গার্ট্রুডের হৃদয়ে বিবেকের কাঁটা এমনিতেই তাকে যথেষ্ট বিঁধবে ও জ্বালাবে, এইটুকুই তার শাস্তি।
এভাবে যুবরাজের সামনে দাঁড়ায় এক অসম্ভব কঠিন সিদ্ধান্ত রাজাকে হত্যা করা, অথচ যে রাষ্ট্রের প্রতীক সেই রাজা, সেই রাষ্ট্রকেই রক্ষা করা। তাকে ‘কঠোর হয়েও কল্যাণকামী’ হতে হবে। একজন শল্যচিকিৎসকের মতো ডেনমার্ককে গ্রাস করা ক্যানসার কেটে ফেলতে হবে, অথচ তার নিচে থাকা সুস্থ দেহ অক্ষত রাখতে হবে। যদি চিন্তা কর্মের শত্রু হয়, তবে হ্যামলেটের মহাসংকট এই যে তাকে চিন্তা করেই কাজ করতে হবে।
কিন্তু এলসিনোর তখন সন্দেহে আচ্ছন্ন। প্রেতাত্মার কাহিনি বিশ্বাস করার মুহূর্ত থেকেই হ্যামলেট বিপদের মধ্যে পড়ে যায়। ক্লডিয়াস কামুক আর মদ্যপ হলেও সে দক্ষ রাজনীতিক; তার ধূর্ত আত্মোন্নতিই তার প্রমাণ। সে যদি হ্যামলেটকে সন্দেহ করে, তবে তাকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেই। ক্লডিয়াসের ডানহাত, চতুর তোষামোদকারী পোলোনিয়াস, গুপ্তচরের জাল বিছিয়ে রেখেছে সবার ওপর নজর রাখার জন্য, এমনকি নিজের সন্তানদের ওপরও। কাজ করতে হলে হ্যামলেটকে তার জ্ঞান আর পরিকল্পনা রাজা ও তার গুপ্তচরদের চোখ থেকে আড়াল করতেই হবে।
এই সমস্যার সমাধান হিসেবে হ্যামলেট বেছে নেয় ভান করা উন্মাদনা। হোরেশিওকে সে বলে, সে ‘অদ্ভুত আচরণ’ করবে; অর্থাৎ ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বাভাবিক, বেখাপ্পা হয়ে উঠবে। উদ্দেশ্য ক্লডিয়াসকে ধোঁকা দেওয়া, কিন্তু এই কৌশল তখনই সফল হবে, যদি তার অভিনয় সবাইকে ধোঁকা দেয়, এমনকি তাঁর প্রেমিকা পোলোনিয়াসের কন্যা ওফেলিয়াকে। তার চোখ দিয়েই আমরা হ্যামলেটের উন্মাদনা দেখি এবং বুঝি, এই অভিনয় কতটা কার্যকর হয়েছে। ওফেলিয়া বলে, একসময় হ্যামলেটের মধ্যে ছিল দরবারির সৌজন্য, পণ্ডিতের প্রজ্ঞা আর সৈনিকের সাহস। এখন সে যেন ভাঙা বাদ্যযন্ত্র; সুরহীন, কর্কশ। এলোমেলো পোশাকে, এমন করুণ মুখে সে ঘোরে যে মনে হয় সদ্য নরক থেকে ছাড়া পেয়েছে।
এখানেও শেক্সপিয়র দেখান, অনিচ্ছাকৃত পরিণতি কীভাবে নিজের স্রষ্টাকেই আঘাত করে। পোলোনিয়াসের দোষ কামনা নয়, অহংকার। সে গর্ব করে বলে, এলসিনোরে এমন কিছু নেই যা সে জানে না; কোথায় সব ‘সত্য লুকিয়ে’ আছে, তার নাকি সবই জানা। এই দম্ভ থেকেই সে ধরে নেয়, হ্যামলেট ইতোমধ্যেই তার জালে আটকা। নাটকের শুরুতেই ওফেলিয়া বাবাকে জানায়, হ্যামলেট তাকে প্রণয় নিবেদন করেছে এবং সম্মানজনক আচরণই করেছে। কিন্তু দুনিয়াদার পোলোনিয়াস জোর দেয়, তরুণরা কেবলই সম্মানের ভান করে কুমারীদের ফাঁদে ফেলার জন্য, আর সে মেয়েকে হ্যামলেটের সঙ্গে দেখা করতে নিষেধ করে। পরে সে ক্লডিয়াসকে বোঝায়, ওফেলিয়ার প্রত্যাখ্যাত ভালোবাসাই হ্যামলেটের উন্মাদনার কারণ; যুবরাজ প্রেমরোগে আক্রান্ত।
নিজের আবিষ্কৃত ‘গোপন সত্য’ প্রমাণ করতে পোলোনিয়াস এক সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে, যেখানে সে ও ক্লডিয়াস পর্দার আড়াল থেকে হ্যামলেট আর ওফেলিয়াকে গুপ্তভাবে পর্যবেক্ষণ করে। ওফেলিয়া যখন পুরোনো প্রেমপত্র ফিরিয়ে দেয়, হ্যামলেট বুঝে যায়, সে কারও নির্দেশে কাজ করছে। প্রথমে সৌজন্য দেখালেও তার স্বর বদলে যায়। সৌন্দর্য, সে বলে, সততাকে বেশ্যায় পরিণত করতে পারে অনেক সহজে, যতটা সততা সৌন্দর্যকে নিজের রূপে ঢালতে পারে; অর্থাৎ ওফেলিয়া তার রূপ ব্যবহার করে তাকে ফাঁদে ফেলছে। হঠাৎ সে জিজ্ঞেস করে, তোমার বাবা কোথায়? ওফেলিয়া বলে, বাড়িতে। কথাটা মিথ্যে; আর হ্যামলেটের কাছে প্রমাণ যে এলসিনোর এমনকি ‘নিষ্পাপ ওফেলিয়া’কেও কলুষিত করেছে। পর্দার আড়ালে থাকা গুপ্তচরদের উদ্দেশে ছোড়া তার বিষাক্ত বাক্যগুলো ওফেলিয়ার কানে ঢুকে পড়ে। এই দৃশ্যের পর সে এমন এক উন্মাদনায় ডুবে যায়, যা আর ভান নয়, আর দরবারের বিষাক্ত রাজনীতির প্রথম শিকার হয়ে ওঠে সে-ই।
ষোড়শ শতকের একটি প্রবাদে বলে, দুষ্টেরা আসলে ভয়েরই বন্দি; অর্থাৎ যার বিবেকে কিছু লুকোনো আছে, তার মতো সন্দেহপ্রবণ আর কেউ নয়। এই অর্থেই ক্লডিয়াস অনিবার্যভাবে এক ‘ভীতসন্দেহী’ মানুষ। হ্যামলেটের উন্মাদনার ভেতরে যে নিয়ম আর পরিকল্পনা আছে, তা পোলোনিয়াসের সরল ব্যাখ্যায় সে বিশ্বাস করতে পারে না। যুবরাজের কাছে নিজে পৌঁছাতে না পেরে সে এমন লোকদের কাজে লাগায়, যারা পারবে; হ্যামলেটের পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়-বন্ধু রোজেনক্রান্ট্জ ও গিল্ডেনস্টার্ন। ক্লডিয়াসের হিসাব পরিষ্কার: বন্ধুদের ওপর আস্থা রাখলে হ্যামলেট মন খুলবে, আর সেই সঙ্গে প্রকাশ পাবে সে কী জানে।
এই ফন্দি কাজে আসে না। হ্যামলেট বুঝতে পারে না, তার বন্ধুরা তাকে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে ক্ষমতার লোভে, নাকি ক্লডিয়াসের আন্তরিকতায় বোকামি করে বিশ্বাস করে; কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। যেভাবেই হোক, তারা গুপ্তচর। সে বলে, তারা স্পঞ্জের মতো; রাজার তোষামোদ আর পুরস্কার শুষে নেবে, আর কাজ শেষ হলে ক্লডিয়াস তাদের নিংড়ে ফেলে দেবে।
ব্যঙ্গাত্মকভাবে, রোজেনক্রান্ট্জ আর গিল্ডেনস্টার্ন ক্লডিয়াসের চেয়ে হ্যামলেটেরই বেশি কাজে লাগে। হ্যামলেটকে আনন্দ দেওয়ার নির্দেশ পেয়ে তারা একদল অভিনেতা ভাড়া করে এলসিনোরে নিয়ে আসে। হঠাৎ করেই হ্যামলেট তার দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান খুঁজে পায়। সে বিশ্বাস করে প্রেতাত্মা সত্য বলেছে, কিন্তু সে তো উইটেনবার্গে পড়াশোনা করা এক পণ্ডিত; যে বিশ্ববিদ্যালয়ে একসময় Martin Luther পড়েছিলেন। দর্শন আর ধর্মতত্ত্বের শিক্ষিত হওয়ায় সে বিশ্বাস আর জ্ঞানের পার্থক্য বোঝে, আর জানে যে শয়তান অনেক সময় ‘মনোহর রূপ’ ধরে মানুষকে পাপে প্রলুব্ধ করে। কাজ করার আগে তাকে নিশ্চিত হতে হবে; প্রেতাত্মা কোনো অশুভ আত্মা নয়। ক্লডিয়াসের অপরাধের প্রমাণ চাই তার।
এখানেই অভিনেতাদের ভূমিকা। হ্যামলেট তাদের অনুরোধ করে এক পরিচিত নাটক মঞ্চস্থ করতে, যেখানে এক রাজাকে হত্যা করা হয়; কিন্তু সে নিজে একটি দৃশ্য যোগ করে, যা তার ভাষায় ‘প্রকৃতির সামনে আয়না ধরা।’ এই নাটকে রাজাকে ছুরিকাঘাত করা হবে না; এক ঈর্ষান্বিত ভাই তার কানে বিষ ঢেলে দেবে। সেই দৃশ্য চলাকালীন হ্যামলেট আর হোরেশিও ক্লডিয়াসের দিকে চোখ রাখবে, তার প্রতিক্রিয়া দেখবে। সে যদি কেঁপে ওঠে, প্রমাণ মিলবে। ‘নাটকই আসল ফাঁদ,’ হ্যামলেট বলে, ‘রাজার বিবেক ধরার জন্য।’ আর ঠিক তাই হয়। ঘুমন্ত রাজার কানে বিষ ঢালার মুহূর্তে ক্লডিয়াস আসন ছেড়ে লাফিয়ে ওঠে এবং অভিনয় থামিয়ে দেয়; অপরাধী দর্শক নিজের অপরাধের প্রতিচ্ছবি সহ্য করতে পারে না। এই প্রতিক্রিয়াতেই সে নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করে ফেলে, আর হ্যামলেটের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়; এবার সে নিশ্চিন্ত বিবেকে তাকে হত্যা করতে পারে।
ক্লডিয়াস নিজের অপরাধ উন্মোচন করে ফেলেছে। সে জানে, যুবরাজ হ্যামলেটও তা জেনে গেছে। প্রাণভয়ে সে নিজের কক্ষে ছুটে যায় এবং ক্ষমা প্রার্থনার আশায় হাঁটু গেড়ে প্রার্থনায় বসে। অন্যদিকে হ্যামলেট এগিয়ে চলে মায়ের কক্ষের দিকে; এবার সত্য প্রকাশের সময়, গার্ট্রুডকে বোঝাতে হবে কীভাবে তিনি ক্লডিয়াসের বিশ্বাসঘাতকতার শরিক হয়েছেন। কিন্তু পথেই সে হঠাৎ রাজাকেই পেয়ে যায়। দরজার দিকে পিঠ করে, প্রার্থনায় নিমগ্ন ক্লডিয়াস হাঁটু গেড়ে আছে। এক আঘাতেই কামুক দখলদারকে শেষ করা কত সহজ হতো। তবু হ্যামলেটের তলোয়ার খাপেই থাকে। তার পিতা তো অনুতাপের সুযোগ না পেয়েই খুন হয়েছিল। এখন প্রার্থনারত ক্লডিয়াসকে হত্যা করলে সে স্বর্গে চলে যাবে, এই ভাবনায় হ্যামলেট থামে। না, সে সিদ্ধান্ত নেয়, অপেক্ষা করাই ভালো; যখন সে মাতাল, উন্মত্ত, কিংবা গার্ট্রুডের সঙ্গে শয্যায় থাকবে।
রাজাকে ফেলে রেখে হ্যামলেট এগোয় রানির কক্ষের দিকে। সেখানে এখনো পোলোনিয়াস, আগের মতোই নাক গলিয়ে গার্ট্রুডকে কী বলতে হবে তা শেখাচ্ছে। যুবরাজের চিৎকার শুনে সে ভয়ে পালাতে চায়, কিন্তু সময় না পেয়ে দেয়ালে ঝোলানো পর্দার আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। জানতেও পারে না যে এই শেষবারের মতো সে অন্যের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করছে।
হ্যামলেট তখন উন্মত্ত। এখন আর বোঝা যায় না, সে এখনও উন্মাদনার ভান করছে, নাকি সত্যিই সংযম হারিয়েছে। সে বলে, সে এসেছে শুধু ‘ছুরির মতো কথা’ বলতে, কিন্তু তার বুনো চেহারা গার্ট্রুডকে নিশ্চিত করে যে ছেলে তাকে হত্যা করতে এসেছে। সে সাহায্যের জন্য চিৎকার করে, পোলোনিয়াসও সাড়া দেয়। মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়িয়ে হ্যামলেট পর্দার ভেতর তলোয়ার ঢুকিয়ে দেয় এবং কৌতূহলী দরবারিকে হত্যা করে।
এই অবিবেচক কর্মেই হ্যামলেট সেই ফাঁদে পড়ে, যেটা এতদিন সচেতনভাবে এড়িয়ে চলেছিল, নিরর্থক, তাড়াহুড়ো করে নির্দোষ রক্তপাত। পোলোনিয়াসের মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে সে ঠান্ডাভাবে তাকে ‘অনধিকারচর্চাকারী মূর্খ’ বলে, তবু মৃত্যুটির জন্য অনুতাপ করে। এটা পাপ, সে জানে, আর একদিন না একদিন তাকে এর জবাবদিহি করতেই হবে।
তারপর সে মায়ের দিকে ফেরে। গার্ট্রুডের দুর্বলতা, ভণ্ডামি আর অপরাধে অংশগ্রহণ, এ সব কিছুর জন্য সে তীব্র ভাষায় নিন্দা করে। একসময় সে প্রায় তাকে আঘাত করতেই যাচ্ছিল, ঠিক তখনই আবার আবির্ভূত হয় রাজা হ্যামলেটের প্রেতাত্মা, গার্ট্রুডকে রক্ষার আদেশ দেয়। মুহূর্তে হ্যামলেটের রক্ততৃষ্ণা মিলিয়ে যায়। যুক্তিতে ফিরে এসে সে শান্ত ও সংযত স্বরে কথা বলে, মাকে নিজের পাপ স্বীকার করতে বলে, ক্লডিয়াসের সঙ্গে শয্যা এড়িয়ে চলার উপদেশ দেয়, আর শেষে তাকে শুভরাত্রি জানায়, এইটুকুই থাকে তার শেষ কথা।
হ্যামলেটের সেই তাড়াহুড়ো করা ভুল ক্লডিয়াসকে সুযোগ করে দেয়। যুবরাজের বিরুদ্ধে সে প্রকাশ্যে কিছু করতে পারে না; ডেনমার্কের মানুষের কাছে হ্যামলেট অত্যন্ত জনপ্রিয়, আর গার্ট্রুডের কাছে অতিমাত্রায় প্রিয়। কিন্তু এখন অন্তত নির্বাসনে পাঠানোর মতো যুক্তি তার হাতে এসেছে। রাজা বলে, এটা নাকি হ্যামলেটের নিরাপত্তার জন্য। হ্যামলেট কৌশলী ভঙ্গিতে ইঙ্গিত দেয়, সে এই সিদ্ধান্তের আসল কারণ বুঝতে পারছে, তবু সে তা মেনে নেয়।
নির্বাসন মানেই তো মৃত্যু। রোজেনক্রান্ট্জ আর গিল্ডেনস্টার্নকে হ্যামলেটের সঙ্গে ইংল্যান্ডে পাঠানোর আগে ক্লডিয়াস তাদের হাতে তুলে দেয় একটি সিলমোহর দেওয়া চিঠি। চিঠিটা আসলে হুমকি; ইংরেজ দরবার যদি হ্যামলেটকে হত্যা না করে, তবে ডেনমার্কের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ অনিবার্য।
কিন্তু ভাগ্য তখনও যুবরাজের পাশে। হ্যামলেটের জাহাজ পথেই জলদস্যুদের হাতে পড়ে; যাদের সে পরে বলে ‘দয়ালু জলদস্যু’। ততক্ষণে সে ক্লডিয়াসের চিঠি খুঁজে পড়ে ফেলেছে এবং নিজের লেখা আরেকটি চিঠি সেখানে বসিয়ে দিয়েছে; যেখানে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ রয়েছে রোজেনক্রান্ট্জ আর গিল্ডেনস্টার্নের জন্য। জলদস্যুদের জাহাজে উঠে সে তাদের প্রতিশ্রুতি দেয়, ডেনমার্কে ফিরিয়ে দিলে মোটা পুরস্কার পাবে। তারা রাজি হয়।
কিন্তু প্রতিশোধের খোঁজে এলসিনোরে ফেরার পথে হ্যামলেট একা নয়। পোলোনিয়াসের মৃত্যুসংবাদ পৌঁছেছে তার পুত্র লেয়ার্টিসের কাছে, যে ফ্রান্স থেকে ডেনমার্কে ফিরে আসে। ভাববার মতো সময় নষ্ট না করে সে ভাড়াটে সৈন্য জোগাড় করে পিতার মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে চায়। এই উত্তপ্ত তাড়ানাই তাকে ক্লডিয়াসের কাছে সহজ শিকারে পরিণত করে; রাজা তার ক্রোধ ঘুরিয়ে দেয় হ্যামলেটের দিকে। প্রতিশোধের কোনো সীমা থাকা উচিত নয়; ক্লডিয়াস এতে একমত, যদিও লেয়ার্টিস ভুল লক্ষ্য বেছে নিয়েছে।
যেভাবে অভিনেতাদের আগমন হ্যামলেটের সমস্যা মিটিয়েছিল, ঠিক সেভাবেই লেয়ার্টিসের আগমন ক্লডিয়াসের সমস্যার সমাধান করে। রাজা নিজে প্রকাশ্যে হ্যামলেটকে আঘাত করতে পারে না। কিন্তু যদি লেয়ার্টিস অন্ধ ক্রোধে যুবরাজকে হত্যা করে, তাতে রাজাকে দোষ দেবে কে? লেয়ার্টিস বুঝতেই পারে না, সে অন্যের পরিকল্পনার হাতিয়ার হয়ে উঠছে, আর আনন্দের সঙ্গেই ক্লডিয়াসের প্রস্তাবে সম্মতি দেয়। হ্যামলেট ফিরলে রাজা তাকে এক তলোয়ার যুদ্ধের আমন্ত্রণ জানাবে। হ্যামলেটকে দেওয়া হবে ভোঁতা তলোয়ার কিন্তু তার প্রতিপক্ষ লেয়ার্টিস ব্যবহার করবে যুদ্ধের তলোয়ার, যার ডগায় মাখানো থাকবে বিষ। উপরন্তু, লড়াই উত্তপ্ত হলে ক্লডিয়াস নিজেই যুবরাজের কাছে এগিয়ে দেবে বিষমিশ্রিত মদের পাত্র, তৃষ্ণা মেটানোর অজুহাতে।
সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। নাটকের চূড়ান্ত সংঘর্ষের মঞ্চ সাজানো হয়ে গেছে। এলসিনোরে ফিরে যুবরাজ হ্যামলেট আর আগের মানুষটি নয়। হোরেশিও যখন তার পলায়নের কথা জানতে চায়, সে শান্ত স্বরে বলে দেয় কীভাবে রোজেনক্রান্ট্জ আর গিল্ডেনস্টার্নকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই শীতলতা পুরোনো বন্ধুকে স্তব্ধ করে দেয়। হ্যামলেট প্রায় অনাসক্ত ভঙ্গিতে বলে, তারা নাক গলাতে ভালোবাসতো বলেই তারা নাক গলাতে গিয়েই মরেছে। তবে তার আর কী-ই বা করার ছিল? পিতাকে খুন করা হয়েছে, মাকে কলুষিত করা হয়েছে, তার নিজের জীবনও বিপন্ন। সে প্রশ্ন তোলে, দৃঢ়তা ছাড়া কাজ না করে যদি ডেনমার্ককে গ্রাস করা ক্যানসারটাকে পচতে দেওয়া হয়, তবে কি তা আরও ভয়ংকর নয়, শুধু তার নিজের জন্য নয়, গোটা রাষ্ট্রের জন্যও?
এই অবস্থানের নিচে কাজ করে জীবন আর মৃত্যুকে নিয়ে এক নতুন উপলব্ধি। কবরস্থানে বসে কবর খোঁড়ার কাজ দেখতে দেখতে সে হোরেশিওকে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের কথা বলে। আলেকজান্ডার মারা গিয়েছিল, মাটিতে শুয়ে ধীরে ধীরে ধুলোয় ফিরে গেছে। সেই ধুলো মিশেছে মাটির সঙ্গে, আর সেই মাটি একদিন কাদায় পরিণত হয়েছে। সেই কাদা দিয়েই ডেনরা বানায় বিয়ারের পিপে বন্ধ করার ঢাকনা। অর্থাৎ, মহাবীর আলেকজান্ডার শেষ পর্যন্ত হয়তো এমনই এক তুচ্ছ কাদামাটির ঢাকনায় রূপ নিয়েছে।
শেষ বিচারে আমরা সবাই ধুলোয় ফিরে যাই, এমনকি সবচেয়ে মহানরাও। তবু হ্যামলেট নৈরাশ্যবাদী হয়ে ওঠেনি; সে বলেনি যে জীবন আর তার কর্ম অর্থহীন। তার বক্তব্য স্থৈর্যবাদী। এক দেবত্ব আছে, সে বলে, যা আমাদের শেষ পরিণতি গড়ে দেয়। আমরা আমাদের ভাগ্য খানিকটা নিজের হাতে খোদাই করতে পারি, ন্যায়ের অনুসন্ধান যেমন জরুরি ও সম্মানজনক। কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত নেয় বিধান। অপ্রত্যাশিত পরিণতি একের পর এক ধাপে আমাদের অনিবার্য মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। কাজ করতে হবে, আবার মানতেও হবে যে কাজের ফল আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। যার মরার কথা, সে মরবেই; যার বাঁচার কথা, সে বাঁচবেই।
এই মনোভাব নিয়েই হ্যামলেট তলোয়ার যুদ্ধের আমন্ত্রণ গ্রহণ করে। সে ফাঁদের গন্ধ পায়, কিন্তু নিজের পরিণতিও মেনে নিয়েছে। তার মনে হয়, এই নাটকের ইতি টানার সময় এসে গেছে।
শেক্সপিয়র কাব্যিক ন্যায়বিচার ভালোবাসতেন। তাঁর ট্র্যাজেডির চরিত্ররা প্রায়ই নিজেদের পাতা ফাঁদেই আটকা পড়ে। যে যত বুদ্ধিদীপ্ত ফাঁদ পাতে, সে ততই তাতে জড়িয়ে যায়। এই ন্যায়বিচারই ক্লডিয়াস আর লেয়ার্টিসের ভাগ্যে জোটে। ক্লডিয়াস বিষমেশানো মদের পাত্র হ্যামলেটের পাশে রাখে এবং তাকে পান করতে উৎসাহ দেয়। কিন্তু হ্যামলেট লড়াইয়ে এতটাই মগ্ন যে নিজের জয়ের ধারা ভাঙতে চায় না। সেই মুহূর্তে গার্ট্রুড ভুল করে বিষমেশানো মদের পাত্রে চুমুক দেয়, ঠিক তখনই লেয়ার্টিস আঘাত হানে। সে হ্যামলেটের দেহে মরণঘাতী ক্ষত তৈরি করে। হ্যামলেট তখনও বোঝে না, সে পালটা আক্রমণ চালায়। লড়াই তীব্র হয়, বিশৃঙ্খলার মধ্যে দুজনেই অস্ত্র ফেলে দিয়ে অন্যের অস্ত্র তুলে নেয়। গার্ট্রুড মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, আর হ্যামলেট লেয়ার্টিসকেই তার নিজের তলোয়ার দিয়ে আঘাত করে।
নিজের বিশ্বাসঘাতকতার কথা স্বীকার করে লেয়ার্টিস হ্যামলেটের কাছে সব খুলে বলে, কারণ ততক্ষণে সে বুঝতে পারে যে তার মৃত্যু নিশ্চিত। হ্যামলেটও তখন নিশ্চিত যে তার হাতে বেশি সময় নেই। সে ক্লডিয়াসকে ছুরিকাঘাত করে এবং সেই মৃত্যুপথযাত্রী রাজাকে নিজের বিষ মেশানো মদ পান করতে বাধ্য করে। মৃত্যুর আগে লেয়ার্টিস পোলোনিয়াসের মৃত্যুর জন্য হ্যামলেটকে ক্ষমা করে। হ্যামলেট তার শেষ নিশ্বাসে হোরেশিওকে তার গল্প পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ করে এবং নরওয়ের যুবরাজ ফরটিনব্রাসের হাতে ডেনমার্কের শাসনভার তুলে দেয়। তার শেষ কথা ছিল ফিসফিস করে বলা: “বাকিটা নীরবতা।”
এইটুকুই গল্প।