ঈদ সংখ্যা ২০২৬

রমণী, না বাঘ? ।। ফ্রাঙ্ক আর স্টকটন

ফ্রাঙ্ক আর স্টকটন (৫ এপ্রিল ১৮৩৪ – ২০ এপ্রিল ১৯০২) ছিলেন আমেরিকান লেখক ও হাস্যরসাত্মক গল্পকার, যিনি ছোটগল্প, রূপকথা ও ব্যঙ্গধর্মী রচনার জন্য পরিচিত। তিনি ফিলাডেলফিয়া, পেনসিলভানিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবং প্রথম জীবনে কাঠখোদাই শিল্পী হিসেবে কাজ করতেন। ছোটগল্প ও কল্পনাধর্মী সাহিত্যে অভিনব কাহিনি-বিন্যাসের জন্য তিনি উনিশ শতকের আমেরিকান সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছেন।


প্রাচীনকালে এক আধা-বর্বর রাজা ছিল। তার খামখেয়ালির কোনো সীমা ছিল না। দূরবর্তী ল্যাটিন প্রতিবেশীদের প্রগতিশীলতা দ্বারা সেগুলো কিছুটা শানিত ও মার্জিত হয়েছিল বটে, কিন্তু নিজ রাজ্যে কোনো রকম বাধা না পেয়ে এবং অতিরঞ্জিত হতে হতে তার উদ্ভট ইচ্ছেগুলো চরিত্রের অংশ হয়ে গিয়েছিল। সে অতিশয় কল্পনাপ্রবণ এবং একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী ছিল বলে বিচিত্র খেয়ালগুলোকে বাস্তবে পরিণত করতে পিছপা হতো না। যা মনে হতো, তা ঘটিয়েই ছাড়ত। যখন তার অভ্যন্তরীণ এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রত্যেক সদস্য তাদের জন্য ঠিক করে দেয়া পথে চলত, রাজা খুশি এবং দরাজদিল হতো। তবে কেউ একটুখানি বাদ-প্রতিবাদ করলে, বা তার কোনো গ্রহ কক্ষপথের বাইরে চলে গেলে, সে আরও বেশি খুশি হতো। কেননা, বাঁকা-তেরচা লোককে সোজা করতে কিংবা উঁচু-নিচু জমিকে সমতল করতে সে যত আনন্দ পেত, তেমন আর কিছুতে পেত না।

ল্যাটিনদের কাছ থেকে নেয়া ধারণাগুলো তার বর্বরতাকে সার্থক করতে সহায়তা করেছিল। সেগুলোর মধ্যে প্রকাশ্য ময়দানে প্রয়োগ হয় এমন ব্যবস্থাদিও ছিল, যাতে পৌরুষ ও পাশবিক সাহসের প্রদর্শনীর মাধ্যমে প্রজাদের মনকে পরিশীলিত এবং সংস্কৃতিমান করে তোলা হতো।

কিন্তু এ বিষয়েও তার বুনো ও উদ্দাম খেয়াল-খুশির ছাপ পড়ত। রাজার ব্যবস্থা এমন হতো যে দর্শকরা মৃত্যুপথযাত্রী যোদ্ধার চিৎকার শুনতে পেত না, কিংবা ক্ষুধার্ত চোয়াল ও মতাদর্শের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখার সুযোগ পেত না। বরং প্রজাদের মানসিক শক্তির উন্নতি এবং বিস্তৃতি সাধনের জন্য তিনি নিজস্ব বিশেষ ব্যবস্থা তৈরি করে নিয়েছিলেন। তার বানানো বিশাল বিচারমঞ্চের চারপাশে দর্শকদের বসার গ্যালারি এবং কতগুলো গোপন কুঠুরি ছিল, আর ছিল কেউ দেখতে পেত না এমন সব গোপন পথ। এখানে কবিতা লেখার মতো সৃজনশীল পদ্ধতিতে বিচার করে অপরাধীদের শাস্তি এবং নিরপরাধকে পুরস্কার প্রদান করা হতো। আর রায়ও দেয়া হতো একেবারেই পক্ষপাতহীন, এমনকি দুর্নীতিরও সুযোগ নেই এমন একটা পদ্ধতিতে, অভিযুক্ত ব্যক্তির বেছে নেবার অধিকার ও বাছাই করার সমান সম্ভাব্যতার ওপর ভিত্তি করে।

রাজা যখন মনে করত যে কেউ যথেষ্ট আমলযোগ্য কোনো অপরাধ করেছে, সবাইকে জানিয়ে দেয়া হতো যে অমুক দিন প্রকাশ্য বিচারমঞ্চে তার বিচার করা হবে। বিচারমঞ্চটা তৈরি করা হয়েছিল এর নামের উপযুক্ত করেই। যদিও এর আকার ও নকশা রাজা বহুদূরের প্রাচীন রোম থেকে আমদানি করেছিল, এটা ব্যবহারের উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি ছিল পুরোপুরিই তার নিজ মস্তিষ্ক-সঞ্জাত। এবং একজন আপাদমস্তক খাঁটি রাজার মতোই, যেকোনো আইন বা প্রথার চেয়ে তার নিজের মনস্কামনা পূরণের প্রতি সে অধিক মনোযোগী থাকত এবং প্রজাদের কর্ম ও চিন্তার ওপর নিজের বর্বর আদর্শ খোদাই করত।

সব লোক গ্যালারিতে জমা হলে, রাজা সভাসদ বেষ্টিত হয়ে গ্যালারির নির্দিষ্ট স্থানে তার জন্য উঁচু করে বসানো সিংহাসনে এসে বসত। তার ইঙ্গিতে ঠিক নিচের একটা দরজা খুলে দেয়া হতো। সে দরজা দিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি বিচার-মাঠে ঢুকত। বৃত্তাকার বেষ্টনীর বিপরীত দিকে, তার একেবারে উল্টো বরাবর পাশাপাশি দুটো দরজা ছিল। সেগুলো দেখতে হুবহু এক। বিচারাধীন ব্যক্তির কাজ ছিল, যাকে বলা যেতে পারে একাধারে দায়িত্ব ও সুযোগ, সোজা দরজা দুটোর দিকে এগিয়ে যাওয়া এবং যে কোনো একটাকে খোলা। সে চাইলে যে কোনোটাই খুলতে পারত। তাকে কোনো ইঙ্গিত দেয়া হতো না বা কোনোটা বেছে নেয়ার জন্য বাধ্যও করা হতো না। যাকে বলে, আমরা আগেই যেমনটি বলেছি, একেবারেই নিরপেক্ষ এবং সমান সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে সংঘটিত ব্যাপার। একটা দরজা খুললে ক্ষুধার্ত বাঘ বেরিয়ে এসে অভিযুক্তের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত এবং তাকে টেনেহিঁচড়ে ভেতরে নিয়ে যেত। তখন লোহার  ডোলফুল ঘণ্টা বেজে উঠত, বিচারমঞ্চের বাইরে আগে থেকে ভাড়া করে রাখা শোককারীগণ গগনভেদী আর্তনাদ করত এবং গ্যালারির দর্শকেরা ভগ্নহৃদয় ও নত মস্তকে বাড়ির পথে রওনা হতো। তারা নীরবে এই শোক করতে করতে ফিরত যে এমন তরুণ ও সুদর্শন, বা এমন বৃদ্ধ ও সম্মানিত কাউকে এই নিদারুণ ভাগ্যের মুখোমুখি হতে হলো।

কিন্তু অভিযুক্ত যদি অন্য দরজাটা খুলত, সেটার ভেতর থেকে ওই ব্যক্তির বয়স ও অবস্থানের সঙ্গে সবচেয়ে মানানসই রমণী বের হয়ে আসত। প্রজাদের মধ্য থেকে বাছাই করে তাকে সেখানে রাখা হতো। এ দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই অভিযুক্তের সাথে ওই নারীর বিয়ে দেয়া হতো। ওই ব্যক্তি আগে থেকে বিবাহিত হলেও বা তার কোনো বাগদত্তা থাকলেও, বা সে অন্য কাউকে ভালোবাসলেও এর অন্যথা হতো না। রাজা তার শাস্তি ও পুরস্কারের মহান পদ্ধতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ওসব তুচ্ছ বিষয়কে পাত্তা দিত না। তখনই, এবং সেখানেই বিয়ের কাজটা সেরে ফেলা হতো। রাজা যেখানটায় বসত তার নিচ থেকে আরেকটা দরজা খুলে যেত, যেটা দিয়ে পাদ্রি, বাদকের দল এবং একদল কুমারী সোনালি শিঙা ফুঁকতে ফুঁকতে ওই যুগলের কাছে যেত এবং বিয়ে পড়িয়ে দিত। তখন পিতলের ঘণ্টাগুলোতে আনন্দের ধ্বনি বাজত, লোকেরা উচ্চৈঃস্বরে হুররে হুররে করত আর বালক-বালিকাদের পুষ্পবৃষ্টির মধ্যে অভিযুক্ত ব্যক্তি নববিবাহিত স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ি ফিরত। ধরে নেয়া হতো সে নির্দোষ, তারই পুরস্কার হিসেবে এই বিয়ে।

এটাই ছিল রাজার আধা-বর্বর বিচার পদ্ধতি। এর ন্যায্যতা একেবারেই পরিষ্কার। অভিযুক্ত ব্যক্তি তো জানত না কোন দরজা দিয়ে রমণী এবং কোন দরজা দিয়ে বাঘ বের হবে। যে কোনো দরজা খোলার স্বাধীনতা তার ছিল, এবং তা খোলার আগে সে ঘুণাক্ষরেও জানত না পরমুহূর্তেই সে বাঘের খোরাক হচ্ছে নাকি রমণীর আলিঙ্গন পেতে যাচ্ছে। কখনও কখনও বাঘটা একটা দরজা দিয়ে বের হতো, কখনো কখনো অন্যটা দিয়ে। বিচার যে কেবল ন্যায্য ছিল তা-ই নয়, ওটা চূড়ান্তও ছিল। রায় বাস্তবায়নও হতো তৎক্ষণাৎ। অভিযুক্ত দোষীর জন্য নির্দিষ্ট দরজা খুললে সঙ্গে সঙ্গেই সাজা পেয়ে যেত, আবার নির্দোষীর জন্য নির্দিষ্ট দরজা খুললে, সে পছন্দ করুক আর নাই করুক, পুরস্কারও সঙ্গে সঙ্গেই মিলত। রাজার বিচারমঞ্চের এই ব্যবস্থা থেকে মুক্তির উপায় ছিল না। আর এই পদ্ধতি খুব জনপ্রিয়ও ছিল। লোকেরা যখন এরকম একটা বিচারের দিনে সেখানে হাজির হতো, তারা জানত না রক্তাক্ত মৃত্যু নাকি আনন্দময় বিয়ের অনুষ্ঠান দেখবে। এই অনিশ্চয়তা যে আকর্ষণ তৈরি করত অন্য কিছুই অতটা পারত না। এইভাবে, দর্শকেরা বিনোদন ও আনন্দ পেত। অভিযুক্ত নিজেই তার পরিণতি বেছে নিয়েছে, এই যুক্তিতে দর্শকদের একটা অংশ কোনোরূপ অন্যায্যতার প্রশ্ন তুলত না।

এই আধা-বর্বর রাজার এক কন্যা ছিল, যে তার পিতার উচ্ছল কল্পনার মতোই প্রস্ফুটিত ছিল। পিতার মতো তার প্রকৃতিও ছিল কর্তৃত্বপরায়ণ এবং একমুখী। এরকম ক্ষেত্রে সচরাচর যা হয়ে থাকে- কন্যাটি ছিল রাজার নয়নমণি। সে তাকে সারা মানবজাতির চেয়েও বেশি ভালোবাসত। শাহজাদী রাজদরবারের এক যুবকের প্রেমে পড়েছিল। প্রেমকাহিনির নায়কদের বংশপরিচয় সাধারণত নিচু হয়ে থাকে, এরও তাই ছিল। আমাদের এই রাজকন্যা তার ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে অত্যন্ত তৃপ্ত ছিল, কেননা সারা রাজ্যে তার মতো সাহসী ও সুদর্শন যুবক আর একটিও ছিল না। মেয়েটির প্রেমে যথেষ্ট বুনো উদ্দামতা ছিল, যা সম্পর্কটাকে সাংঘাতিক রকম উষ্ণ এবং শক্তিশালী করে তুলেছিল। কয়েক মাস ধরে তাদের প্রেমাভিসার চলার পর রাজার কানে সে খবর গেল। পরবর্তী কর্মপন্থা ঠিক করতে রাজা বিন্দুমাত্র দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগল না বা টলল না। যুবকটিকে তদ্দন্ডে বন্দি করা হলো। এটা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘটনা, এবং রাজা ও তার প্রজাকুল সকলে এ বিচার প্রক্রিয়ার প্রতিটি কাজ ও ধাপ সম্পর্কে অত্যন্ত আগ্রহী ছিল। এমন ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। এর আগে আর কোনো প্রজা রাজকন্যাকে প্রেম নিবেদনের সাহস দেখায়নি। পরবর্তীতে অবশ্য এমন ঘটনা সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল, এবং সেগুলো মোটেই এমন নতুন ও পিলে চমকানো ছিল না।

রাজ্যের সব বন তন্ন তন্ন করে খুঁজে শক্তিশালী ও ভয়ংকর বাঘগুলোকে আলাদা করা হলো এবং সবচেয়ে হিংস্রটাকে বেছে নেয়া হলো। ভাগ্য অন্যরকমভাবে যুবকটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না দিলে, সে যেন উপযুক্ত স্ত্রী পেতে পারে সেজন্য অভিজ্ঞ বিচারকদের দিয়ে সকল সুন্দরী তরুণীদের তথ্য সংগ্রহ ও বাছ-বিচার করা হলো। প্রত্যেকেই জানত যে অভিযোগের ঘটনাটি অবশ্যই ঘটেছে অর্থাৎ যুবকটি রাজার দুহিতাকে ভালোবেসেছে। প্রেমিক, রাজকন্যা বা অন্য কোনো লোক, কেউ এ তথ্য অস্বীকারও করেনি। ফলে সন্দেহের অবকাশ ছিল না। কিন্তু রাজা তার বিচার প্রণালিতে এরকম প্রমাণাদি বিবেচনায় আনতে চাইত না। কেননা তথ্যপ্রমাণ ভিত্তিক ব্যবস্থার চেয়ে তার নিজের আবিষ্কৃত পদ্ধতি তাকে অত্যন্ত আনন্দ ও তৃপ্তি দিত। ঘটনা যাই ঘটুক না কেন, যুবকটিকে এ পরীক্ষার মুখোমুখি করা হবে, রাজা সানন্দচিত্তে বিচারের ঘটনাটা দেখবে, যা ঠিক করে দেবে রাজকন্যাকে ভালোবেসে যুবকটি অন্যায় করেছে কিনা।

নির্ধারিত দিন এলো। কাছের এবং দূরের লোকেরা এসে গ্যালারি ভরে ফেলল। অনেকে ভেতরে জায়গা না পেয়ে দেয়ালের বাইরে ভিড় করল। রাজা এবং সভাসদেরা নিজ নিজ আসনে বসল। তাদের উল্টোদিকে সেই ভাগ্যনিয়ন্তা তোরণ, সেই দুই যমজ দরজা, যেগুলো দেখাতে চূড়ান্ত রকমের সদৃশ।

সব কিছু তৈরি। সংকেত  দেয়া হলো। রাজকীয় লোকজন যেখানটায় বসা তার নিচের অংশ থেকে একটা দরজা খুলে গেল এবং রাজকন্যার প্রেমিক বেরিয়ে এল। লম্বা, সুন্দর, উজ্জ্বল বর্ণের যুবকটিকে দেখে দর্শকেরা নিচুস্বরে একই সঙ্গে তারিফ ও উদ্বেগ প্রকাশ করল। তাদের বেশিরভাগ জানতই না যে সেই রাজ্যে এমন সুন্দর যুবক রয়েছে। রাজকন্যা যে এর প্রেমে পড়বে তাতে আর আশ্চর্য কী! কিন্তু কী ভয়ানক কথা যে তাকে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে।

অভিযুক্ত যুবক মাঠের মধ্য দিয়ে উল্টোদিকের দরজা দুটির দিকে রওনা দিল। নিয়ম ছিল যে যাত্রার শুরুতে অভিযুক্তরা রাজাকে কুর্নিশ করবে। সেও তাই করল। তবে তার দৃষ্টি রাজার ওপর ছিল না। তার চোখ পাশে বসা রাজকন্যার ওপর নিবদ্ধ। মেয়েটির চরিত্রের অর্ধেকটায় যদি বর্বরতা না থাকত, তাহলে সে হয়তো এ বিচার দেখতে আসত না। কিন্তু উগ্র ও উদ্দীপ্ত চিত্তের কারণে সে এমন ভয়াবহ রকমের আকর্ষণীয় একটা ঘটনায় উপস্থিত না হয়ে পারেনি। যে মুহূর্তে রাজকীয় ঘোষণা হলো তার প্রেমিককে এ পদ্ধতিতে নিজের ভাগ্য নির্ধারণ করতে হবে, তখন থেকেই রাজকন্যা দিনরাত কেবল এ বিচার এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভেবেছে। এমন ঘটনায় আগ্রহী অন্য যে কারও চেয়ে বেশি ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি থাকায়, অন্যরা যা করেনি রাজকন্যা তাই করেছে। সে দরজা দুটির ভেতরের তথ্য জেনে নিয়েছে। সে জানে কক্ষ দুটির কোনটির ভেতরে বাঘ আর কোনটিতে পুরস্কারের রমণী অপেক্ষা করছে। দরজার পাল্লাগুলো ছিল মোটা, আর সেগুলোর ভেতর দিকটা চামড়া দিয়ে এমনভাবে ঢাকা যে ভেতর থেকে কোনো আওয়াজ বাইরে আসার উপায় নেই। তবে, স্বর্ণমুদ্রা এবং রমণীর ইচ্ছাশক্তি, এ দুইয়ের মিলিত শক্তিতে রাজকন্যা সেই তথ্য উদ্ধার করতে পেরেছিল।

রাজদুহিতা শুধু এটুকুই জানত না যে কোন কামরায় এক রমণী তার দরজা খোলা হলে বের হয়ে আসার জন্য উজ্জ্বল লাজরাঙা মুখে প্রতীক্ষা করছে। সে আরও জানতে পেরেছিল কোন তরুণীকে ওই কামরায় রাখা হয়েছে। তার প্রেমিকের জন্য পুরস্কার হিসেবে এমন এক ডাইনিকে ঠিক করা হয়েছে রাজসভার মধ্যে যে সবচেয়ে সুন্দর এবং আকর্ষণীয়। যুবক যদি সঠিক দরজা খুলতে পারে এবং এর মাধ্যমে তার থেকে উঁচু স্তরের কোনো রমণীকে ভালোবাসার অভিযোগ থেকে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারে, তাহলে এই মেয়েকে তার বিয়ে করতে হবে। এবং রাজকন্যা কিনা এই মেয়েটিকে ঘৃণা করে। সে প্রায়ই লক্ষ্য করেছে, অথবা দেখেছে বলে তার মনে হয়েছে, তার প্রেমিকের দিকে এই বজ্জাত সুন্দরী প্রায়ই আড়নয়নে তাকায়। কখনও কখনও তার এও মনে হয়েছে যে যুবকটি তা বুঝতে পারত এবং পালটা দৃষ্টি বিনিময় করত। মাঝে মাঝে সে তাদের কথা বলতেও দেখেছে। যদিও তা কেবল দুয়েক মুহূর্তের জন্য, কিন্তু কে না জানে যে অল্পের মধ্যেও অনেক কিছু বলে ফেলা যায়। হয়তো তারা একেবারে তুচ্ছ বিষয়ে সামান্য কিছু বলেছে, কিন্তু রাজকন্যার নিশ্চিত হবার উপায় কী? মেয়েটা সুন্দর, কিন্তু সে রাজকন্যার প্রেমিকের দিকে নজর দেয়ার দুঃসাহস করেছে। এবং রাজকন্যার ধমনিতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বইতে থাকা বর্বর পূর্বসূরিদের রক্তের তীব্রতার কারণেই বুঝবে নীরব দরজার পেছনে লাজে রাঙা এবং কম্পমান মেয়েটিকে সে ঘৃণা করে।

প্রেমিক যখন রাজার পাশে বসা কাঙ্ক্ষিত রমণীর চোখের দিকে তাকাল, তার মুখটা তখন চারপাশের উদ্‌বিগ্ন জনসমুদ্রের যে কারও চেয়ে বেশি ফ্যাকাশে এবং সাদা দেখাচ্ছিল। যাদের দুই আত্মা এক হয়ে গিয়েছে কেবল তাদের কাছে থাকা আশ্চর্য ক্ষমতা দিয়ে যুবক সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে ফেলল কোন দরজায় বাঘ আর কোন দরজায় রমণী রাখা হয়েছে রাজকন্যা তা জানতে চাইবেই। সে প্রেমিকার মন বুঝতে পারত এবং নিশ্চিত ছিল যে ওই গোপন তথ্যটি না জানা পর্যন্ত সে ক্ষান্ত হবে না, যা চারপাশের দর্শক তো বটেই, এমনকি রাজাও জানে না। অনিশ্চয়তার এই জুয়ায় যুবকের নিশ্চিত জয়লাভের একমাত্র আশা রাজকন্যার এই গোপন তথ্য আবিষ্কারের ওপর নির্ভর করে, এবং তার দিকে তাকানো মাত্রই সে বুঝতে পারল যে রাজার দুহিতা এ কাজে সফল হয়েছে। ঠিক মনে মনে সে যে-রকম জানত যে রাজকন্যা সফল হবেই।

যুবকের চকিত এবং উদ্‌বিগ্ন দৃষ্টির একটাই জিজ্ঞাসা: ‘কোনটা?’ সে মাঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললে যতটা পরিষ্কার বোঝা যেত, রাজকন্যার কাছে এ দৃষ্টির অর্থ সেরকমই পরিষ্কার ছিল। এক মুহূর্তও নষ্ট করার মতো সময় নেই। প্রশ্নটা ত্বরিতগতিতে এসেছে, জবাবও দিতে হবে সেরকম গতিতেই।

রাজকন্যার হাতটা সামনের কুশনে রাখা ছিল। সে তার হাতটা তুলল, এবং দ্রুত ডানদিকে একটু বাঁকালো। তার প্রেমিক ইঙ্গিতটা ঠিকই ধরতে পারল, যদিও অন্যরা তা দেখেনি। কারণ তাদের চোখগুলো মাঠে দাঁড়ানো যুবকের ওপরই নিবদ্ধ ছিল।

যুবক ঘুরল এবং দ্রুত কিন্তু স্থির পদক্ষেপে মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটা অতিক্রম করতে লাগল। প্রত্যেকের হৃৎপিন্ডের কম্পন তখন থেমে গিয়েছে, প্রত্যেকের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছে, প্রত্যেক চোখ যুবকের ওপর স্থির হয়ে রয়েছে। সামান্যতম দ্বিধা না করে সে ডানদিকে গেল এবং দরজাটা খুলল।

এখন প্রশ্ন হলো: সে দরজা দিয়ে বাঘ বেরিয়ে এলো, নাকি সেই রমণী?

যতই আমরা প্রশ্নটা নিয়ে ভাবি, ততই এর উত্তর দেয়া কঠিনতর হতে থাকে। এটা আমাদের মানব হৃদয়ের প্রেমের এক সর্পিল ধাঁধায় নিয়ে যায়, যেখান থেকে বের হবার পথ খুঁজে পাওয়া দুরূহ ব্যাপার। পাঠকগণ, একটু ভাবুন, এমনভাবে নয় যে আপনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, বরং সিদ্ধান্তের ভারটা থাকুক সেই গরম রক্তের, আধাবর্বর রাজকন্যার ওপর, যার হৃদয় এখন হিংসা ও ঘৃণার যৌথ আগুনে ধাতু গলে সাদা হয়ে যাওয়ার মতো তাপে পুড়ছে। সে যাকে হারিয়েছে, এখন কার তাকে পাওয়া উচিত?

জাগরণে এবং স্বপ্নে কতবার সে আতঙ্কে দুহাতে মুখ ঢেকেছে, যখন এই চিন্তা মনে এসেছে যে তার প্রেমিক সেই দরজাটা খুলেছে, যেটাতে বাঘের তীক্ষè দাঁত অপেক্ষা করে আছে!

 কিন্তু তার চেয়েও বেশিবার কল্পনায় সে তাকে অন্য দরজাটায় দেখতে পেয়েছে। দরজা খুলে ওই নারীকে দেখতে পেয়ে তার প্রেমিকের আনন্দ শুরু হয়েছে, কল্পনায় এমন দৃশ্য দেখতে পেয়ে সে কতবার মনে মনে দাঁত কড়মড় করেছে, কতবার নিজের চুল ছিঁড়েছে! কীভাবে তার হৃদয় দুঃখের আগুনে পুড়েছে যখন সে ভেবেছে তার প্রেমিক ওই রমণীর দিকে যাচ্ছে, যার মুখ জয়ের আনন্দে উদ্ভাসিত আর চোখে আনন্দের ঝিলিক; যখন মেয়েটিকে পথ দেখিয়ে তার প্রেমিক সামনে সামনে আসছে, যখন তার সারাদেহ নতুন জীবন পাওয়ার আনন্দে প্লাবিত; যখন নানাদিক থেকে আনন্দের ধ্বনি আসছে আর ঘণ্টাগুলো পাগলের মতো বুনো আওয়াজে মেতে উঠেছে; যখন সে দেখতে পেয়েছে যে সঙ্গীদের নিয়ে পাদ্রি আনন্দিত চিত্তে সেই যুগলের দিকে যাচ্ছে এবং রাজকন্যার চোখের সামনে তাদের স্বামী-স্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করছে; এবং সে দেখতে পাচ্ছে চারপাশের আনন্দ হুল্লোড়ের মধ্যে তারা ফুল ছিটানো পথে বের হয়ে যাচ্ছে, যে উল্লাসধ্বনির মধ্যে তার নিজের বুকচেরা আর্তনাদ একইসঙ্গে হারিয়ে এবং ডুবে গিয়েছে।

এর চেয়ে কি এই ভালো নয় যে এই যুবক এই দণ্ডেই মারা যাবে এবং পরজগতে গিয়ে রাজকন্যার জন্য অপেক্ষা করবে?

কিন্তু, ওই ভয়ংকর বাঘ, ওই আর্তচিৎকার, ওই রক্ত!

রাজকন্যা মুহূর্তের মধ্যেই তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু সিদ্ধান্তটি মুহূর্তের ছিল না। কয়েক দিন আর রাতের তীব্র মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে সে এই সিদ্ধান্তে এসেছে। সে জানত যে প্রেমিক তার কাছে জানতে চাইবে, সে ঠিক করে রেখেছিল, সে কী জবাব দেবে, এবং বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করেই সে তার হাত দিয়ে ডানদিকের দরজার দিকে ইশারা করেছিল।

তার সিদ্ধান্তের প্রশ্নটি হালকা নয় এবং আমি নিজেকে এমন ব্যক্তির জায়গায় কল্পনা করতে চাই না যে এই প্রশ্নের জবাবদানে সক্ষম। কাজেই আপনাদের সকলের কাছেই এই প্রশ্নটা রেখে যেতে চাই: যুবক দরজা খুললে কে বের হয়ে এসেছিল- রমণী নাকি বাঘ?