ঈদ সংখ্যা ২০২৬

নিজের সাহিত্য নিয়ে আস্তুরিয়াসের কিছু কথা

১৯৭০ সালের ৬ থেকে ১০ নভেম্বর কয়েকটি সেশনে বিখ্যাত সাহিত্য বিষয়ক সাংবাদিক ও সমালোচক রিতা গুইবার্ট (Rita Guibert) প্যারিসে মিগুয়েল আনহেল আস্তুরিয়াসের তৎকালীন বাসায় আস্তুরিয়াসের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন। সাক্ষাৎকারটি ফ্রান্সিস প্যারত্রিজ (Frances Partridge) ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন এবং ১৯৭৩ সালে নিউইয়র্কের আলফ্রেড এ. নফ পাবলিশিং হাউজ থেকে প্রকাশিত Seven Voices: Seven Latin American Writers Talk to Rita Guibert নামের বইয়ে এটি গ্রন্থভুক্ত হয়েছিল। সেই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের কিয়দংশ এখানে বাংলায় অনুদিত হলো।

রিতা গুইবার্ট: ‘আমার সেই মায়ের প্রতি, যিনি আমাকে গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন‘ এই কথাগুলি আপনার প্রথম গ্রন্থ লেয়েন্দাস দে গুয়াতেমালা (Leyendas de Guatemala)-এর উৎসর্গপত্রে আপনি লিখেছেন যা ১৯৩০ সালে মাদ্রিদে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থ সম্পর্কে ভ্যালেরি মন্তব্য করেছিলেন: ‘এই বইটি পড়ার চেয়ে পান করার জন্যই যেন বেশি উপযুক্ত’। এই উৎসর্গপত্রে আপনি কী বোঝাতে চেয়েছেন?

আস্তুরিয়াস: এই উৎসর্গে নিহিত রয়েছে পুত্রের মাতৃপ্রেম, সন্তানের পক্ষ থেকে তার জন্মদাত্রী নারীর প্রতি গভীর স্বীকৃতি—যিনি কেবল তাকে জন্মই দেননি, বরং পরবর্তীকালে তাকে আত্মিক ও বৌদ্ধিক বিকাশের পথে পরিচালিত করেছেন। লেয়েন্দাস দে গুয়াতেমালা গ্রন্থে আমি আমার দেশের প্রতি, আমার ক্ষুদ্র জন্মভূমির প্রতি, আগ্নেয়গিরি, হ্রদ, পাহাড়, মেঘ, পাখি ও ফুলে ভরা সেই ছোট্ট ভূখণ্ডের প্রতি আমার ভক্তি নিবেদন করেছি। অতএব, এই গ্রন্থটির প্রয়োজন ছিল এমন একটি অলংকার, যা বক্ষদেশে ধারণযোগ্য এক মূল্যবান রত্নের মতো তাৎপর্য বহন করবে। সেই কারণেই আমি ‘আমার সেই মায়ের প্রতি, যিনি আমাকে গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন’ এই একাদশমাত্রিক ছন্দের পংক্তিটি উৎসর্গ হিসেবে নির্বাচন করি।

এই গল্পগুলো আংশিকভাবে গুয়াতেমালার লোককথা, আংশিকভাবে দৈনন্দিন জীবনের বর্ণনা, আবার আংশিকভাবে সেসব কাহিনি, যা আমি শৈশবে ঘুমিয়ে পড়ার সময় আমার মায়ের মুখে শুনতাম। এমনকি তাঁর নীরবতাও এক ধরনের গল্প বলার ভাষা ছিল। তবে এই প্রসঙ্গে আমি এটিও উল্লেখ করতে চাই যে, এই উৎসর্গপত্র রচনার সময় আমার মনে হয়েছিল, এর তাৎপর্য কেবল স্প্যানিশ শব্দ ও বাক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর ব্যাপ্তি আরও বৃহৎ।

অর্থাৎ, লেয়েন্দাস দে গুয়াতেমালা রচনার সময় স্বাভাবিকভাবেই আমি স্প্যানিশ ঐতিহ্যের চেয়ে বেশি আদিবাসী অনুভূতি ও দৃষ্টিভঙ্গির আশ্রয় নিয়েছি—সেই অনুভূতি, সেই দর্শন, সেই খালি পায়ে হাঁটা আদিবাসী মানুষের জীবনবোধ, যারা মানুষের মহাবিশ্ব গঠনকারী সমস্ত উপাদানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। আমার ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে ইন্দো-আমেরিকান মানুষের অভিজ্ঞতা। এই মহাবিশ্ব নির্মাণের সময় আমি নারীর শক্তিকে, বিশেষত সৃজনশীল শক্তিকে, এক মৌলিক উৎস ও অপরিহার্য কারণ হিসেবে স্থাপন করেছি।

নারীই বা মাতাই, মায়া ও মায়া-কিচে (Quiché Maya) বিশ্বাস অনুযায়ী সেই গর্ভ বা উৎস, যেখান থেকে সৃষ্টির সূচনা। মায়া-কিচেরা যারা আজ গুয়াতেমালার ভূখণ্ডে বসবাসরত মায়াদের উত্তরসূরি এবং যাদের সঙ্গে আমার মেস্তিসো (mestizo) রক্তসূত্রে সম্পর্ক রয়েছে—তাদের বিশ্বাসজগতে নারীর, বিশেষ করে মাতৃশক্তির, ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মায়া মহাবিশ্ব অনেকাংশেই নির্ভরশীল মাতৃভূমির টেলিউরিক (telluric) বা ভূগর্ভস্থ শক্তির ওপর। ভূমিই মৌলিক উপাদান; ভূমিই মা; ভূমিই সেই সত্তা, যে আমাদের ধারণ করে, লালন করে এবং শেষ পর্যন্ত আবার নিজের বুকে আশ্রয় দেয়।

মিগুয়েল আনহেল আস্তুরিয়াস রোজালেস

অতএব, গুয়াতেমালার কিংবদন্তিগুলোর প্রেক্ষিতে যখন আমি বলি ‘আমার সেই মায়ের প্রতি, যিনি আমাকে গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন’ তখন আমি আসলে সেই সমস্ত জীবনীশক্তি, মৌলিকতা ও সার্বজনীন উপাদানকে স্মরণ করি, যা আদিবাসী বিশ্বাসে মায়ের মধ্যে নিহিত এক মহান মহাজাগতিক শক্তি হিসেবে প্রতিভাত। মায়াদের বিশ্বাসে, মায়ের পূর্বেও রয়েছে দাদি—অর্থাৎ পৃথিবী—যেখান থেকে জীবনের সমস্ত অন্যান্য উপাদানের উদ্ভব ঘটে।

এটি লক্ষণীয় যে, পোপোল বু যা কিচে মায়াদের বাইবেল তাতে উল্লেখ রয়েছে যে মা, অর্থাৎ মহান জাদুকরী, মহান ওঝা, মহান নক্ষত্রলোকীয় সত্তা, তাঁর সন্তান ও নাতিদের সৎ ও অসৎ শক্তির মধ্যকার সংগ্রামে সহায়তা করেন। যখন তারা প্রথমবার অশুভ শক্তির কাছে পরাজিত হয়, তখন তিনিই তাদের স্মৃতি রক্ষা করেন এবং শুভ-অশুভের সংগ্রামের উপকরণগুলো সংরক্ষণ করেন, যাতে তারা সেগুলো পুনরায় খুঁজে পেয়ে আবারও সৎ ও অসৎ শক্তির মধ্যকার সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে পারে।

এই সমস্ত অর্থ, প্রতীক ও বিশ্বাস একত্রে নিহিত রয়েছে সেই একাদশমাত্রিক পঙ্‌ক্তিতে—‘আমার সেই মায়ের প্রতি, যিনি আমাকে গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন’—যা বিস্তৃত হয়ে পৌঁছে যায় সম্পূর্ণ এক পুরাণতত্ত্বে, এক পূর্ণাঙ্গ সৃষ্টিতত্ত্বে এবং মায়া আদিবাসীদের গভীরতম শিকড়ে প্রোথিত বিশ্বাসসমূহের সমগ্র পরিসরে।

রিতা গুইবার্ট: আপনার কাছে সর্বদাই মেস্তিসো (মিশ্র বংশজাত) পরিচয়টি গর্বের বিষয় বলে বিবেচিত হয়েছে, কারণ, আপনার ভাষ্য অনুযায়ী, আমেরিকার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে মেস্তিসাজের (mestizaje=জাতিগত মিশ্রণ) ওপর। দয়া করে ধারণাটি কি একটু ব্যাখ্যা করবেন?

আস্তুরিয়াস: আমার দৃষ্টিতে, আমাদের এই মহান আমেরিকা—যে আমেরিকাকে আমরা হৃদয়ে ধারণ করি এবং কাঁধে বহন করি—তার যত সমস্যাই থাকুক না কেন, এটি হলো সেই আমেরিকা, যাকে কিউবান লেখক হোসে মার্তি (José Martí) ‘আমাদের’ বলে অভিহিত করেছিলেন, কারণ তা ছিল দরিদ্র কিন্তু আমাদের নিজস্ব আমেরিকা। এই আমেরিকার জন্ম সেই রাতে, যখন প্রথম কোনো স্প্যানিয়ার্ড একজন আদিবাসী নারীর মুখোমুখি হয়, তাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে, তাকে ধর্ষণ করে, তাকে অধিকার করে এবং তাকে মাতৃত্বে প্রবেশ করায়। সেই মুহূর্তেই, সেই ক্ষণেই, সেই আদিপ্রভাতে জন্ম নেয় এক নতুন মানবসত্তা—একটি নতুন উপাদান—স্প্যানিয়ার্ড ও আদিবাসীর সংমিশ্রণে জাত এক মৌল।

আমি ইনকা গার্সিলাসোর (Inca Garcilaso) কথা ভাবি। ইনকা গার্সিলাসো ছিলেন এক ইউস্তা (yusta=ইনকা রাজকুমারী) ও এক স্প্যানিয়ার্ডের সন্তান। সেই মহিমান্বিতা ইউস্তার এক স্প্যানিয়ার্ডের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে জন্ম নেয় আমেরিকার প্রথম মেস্তিসো লেখক ইনকা গার্সিলাসো। অর্থাৎ, যখন আমাদের মেস্তিসো বলা হয়, বা আমরা নিজেকে মেস্তিসো বলে স্বীকার করি, তখন প্রথমেই আমরা নিজেদের সেই মহান আত্মা ইনকা গার্সিলাসোর সঙ্গে যুক্ত মনে করি এবং তাঁর সমস্ত রচনার উত্তরাধিকার বহন করি।

একই সঙ্গে আমরা সেই যুগের আরেক মহান কবির কথাও স্মরণ করি—গুয়াতেমালার কবি রাফায়েল লান্দিবার (Rafael Landívar)। স্পেনের রাজা কার্লোস তৃতীয় যখন জেসুইটদের স্পেন ও তার উপনিবেশসমূহ থেকে বহিষ্কারের আদেশ দেন, তখন লান্দিবার গুয়াতেমালা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি প্রথমে মেক্সিকো যান, সেখান থেকে ইতালিতে গমন করেন এবং শেষ পর্যন্ত বোলোনিয়ায় পৌঁছান। কিছু সময় পর, যখন নস্টালজিয়া তাঁকে চেপে ধরে ও ব্যথিত করে, তখন তিনি Rusticatio Mexicana রচনা করেন—তিন হাজারেরও বেশি লাতিন হেক্সামিটারে লিখিত এক মহাকাব্য—যেখানে তিনি প্রথমে তাঁর গুয়াতেমালাকে, পরে মধ্য আমেরিকার উর্বর পর্বতমালাকে, এবং শেষে সমগ্র আমেরিকাকে বন্দনা করেন। তিনি ইউরোপের সামনে এমন এক মহাদেশ উপস্থাপন করেন যেখানে ইউরোপের সৌন্দর্যের কোনো কিছুরই অভাব নেই। তিনি বর্ণনা করেন যে, সেই দূরবর্তী আমেরিকায় রয়েছে চমৎকার অশ্বসম্ভার, বিশাল পশুপাল, এটনা ও ভিসুভিয়াসের মতো আগ্নেয়গিরি, আরোগ্যদায়ক জলধারা; সর্বোপরি সেখানে রয়েছে এক ত্যাগী জনগোষ্ঠী—আদিবাসী জাতি—যারা গভীর প্রজ্ঞার অধিকারী, পরিশ্রমী, অথচ ইউরোপীয়দের কাছে যাদের সম্পর্কে অপবাদ রটানো হয়েছে।

লান্দিবার প্রত্যাশিত মাত্রায় পরিচিত নন, যদিও দোন মার্সেলিনো মেনেন্দেস ই পেলায়োর (Don Marcelino Menéndez Pelayo) মতে তিনি ছিলেন আধুনিক লাতিন আমেরিকার ভার্জিল। আজ আমরা এই মেস্তিসোদের কথা ভাবি—ইনকা গার্সিলাসো, লান্দিবার, তারপর ভেনেজুয়েলার লেখক আন্দ্রেস বেলো (Andrés Bello)—আরেক নির্বাসিত মণীষী যিনি আমাদের ট্রপিক অঞ্চলের গান গেয়েছেন, চিনির প্রাচুর্য, পশুপাল, কফি ও সমগ্র ট্রপিক্যাল সম্পদের বর্ণনা দিয়েছেন। এঁরাই সেই মেস্তিসো যারা ধীরে ধীরে আমেরিকাকে গঠন করেছেন।

সব তুলনাগত সীমা বজায় রেখেই বলি, নিজেকে মেস্তিসো বলে অনুভব করতে আমি গর্ব বোধ করি। আমি গর্বিত, কারণ আমি সেই মানবগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, যেখানে দুটি ধারা, দুটি মহাসাগর, দুটি অনুভব—আদিবাসী ও ইউরোপীয়—একত্রিত হয়েছে। সেই ইউরোপীয়, যে ক্লান্ত ও ভারাক্রান্ত হয়ে আমাদের ভূখণ্ডে এসেছিল; আর সেই আদিবাসী, যে পুনর্জন্ম লাভ করেছিল পবিত্রভাবে, মৌলিকভাবে, চোখভরা স্বপ্ন নিয়ে।

এই কারণেই আমি বিশ্বাস করি, আমাদের মেস্তিসো আমেরিকাই আগামী দিনের আমেরিকা। সৌভাগ্যক্রমে আমরা বিশুদ্ধ জাতি নই; আমাদের এই ভয়ে ভোগার কিছু নেই যে আমাদের বংশধারা বিলুপ্ত হয়ে যাবে, কারণ এ বংশধারা প্রতিদিন নবায়িত হয়েছে এবং হচ্ছে। পরবর্তীকালে এতে যুক্ত হয় আফ্রিকীয় উপাদান—একটি ট্র্যাজিক মুহূর্তে—যখন কালো দাসদের আমাদের ভূখণ্ডে আনা হয়। ইউরোপীয় ও আদিবাসী রক্তের সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনের আরেক মৌলিক উপাদান, অস্তিত্বের এক ভিন্ন, আরও সঙ্গীতময় অনুভূতি।

এই সময়েই জন্ম নেয় আমাদের আমেরিকান জীবনের আরেকটি অপরিহার্য উপাদান—কালো ও লাতিনের, কালো ও ইউরোপীয়ের, কালো ও মেস্তিসোর সংমিশ্রণ। এইসব গোষ্ঠী ও উপাদান থেকেই উদ্ভূত হয় আজকের মানুষ, যে মানুষ আমাদের দেশগুলোকে আকীর্ণ করে ধরে রেখেছে, যে মানুষ আমাদের দেশগুলোতে শ্রম দিচ্ছে।

এই কারণেই, যখন আমার মতো কেউ বলে যে, সে মেস্তিসো—মেস্তিসো পিতামাতার সন্তান—তখন তা আমাকে বিষণ্ন করে না; বরং গর্বে ভরিয়ে দেয়। কারণ এই মেস্তিসাজের কারণেই আমেরিকা একটি নতুন ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছে এবং এক নতুন মানুষ সৃষ্টি করছে।

মিগুয়েল আনহেল আস্তুরিয়াস রোজালেস

রিতা গুইবার্ট: কেন Leyendas de Guatemala (১৯৩০) ও El señor presidente—এর প্রকাশের মধ্যে ১৬ বছরের ব্যবধান হলো?

আস্তুরিয়াস: এর কারণ হলো—আমাদের দেশে টানা চৌদ্দ বছর ধরে হোর্হে উবিকোর (Jorge Ubico) স্বৈরশাসন চলেছিল। আমি যখন গুয়াতেমালায় ফিরে আসি, তখন আমার ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়া উপন্যাসটির একটি কপি ফরাসি অধ্যাপক জর্জ পিলেমাঁর (Georges Pillement) কাছে রেখে আসি। পরে তিনি এটি ফরাসিতে অনুবাদ করেন, কিন্তু আমাকে পাঠাননি, কারণ সেটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল। গুয়াতেমালায় আমি সাংবাদিকতায় কাজ করি এবং কয়েকটি সনেট রচনা করি Fantominas, Rayitos de estrella, Emulo Lipolidón, Alcasán এবং El rey de la altanería যেগুলি একটি ছোট পুস্তিকায় প্রকাশিত হয়। El señor presidente অবশেষে ১৯৪৬ সালে মেক্সিকোতে প্রকাশিত হয়।

রিতা গুইবার্ট: এই গ্রন্থটির জন্মবৃত্তান্ত যদি একটু বলতেন?

আস্তুরিয়াস: ১৯২৩ সালে গুয়াতেমালার পত্রিকা El Imparcial-এ ছোটগল্পের জন্য একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। আমি একটি গল্প প্রস্তুত করেছিলাম, যার শিরোনাম ছিল Los mendigos políticos (রাজনৈতিক ভিখারি), যা কার্যত El señor presidente-এর প্রায় প্রথম অধ্যায়। তবে সেটি সময়মতো পত্রিকায় পাঠাতে পারিনি এবং ইউরোপে যাওয়ার সময় সেটি আমার লাগেজের মধ্যে রেখে দিই।

প্যারিসে যখন আমি আমার হিস্পানো-আমেরিকান বন্ধুদের সঙ্গে মিলিত হতাম, তখন প্রত্যেকে নিজের দেশের স্বৈরশাসকদের সম্পর্কে নানা উপাখ্যান বলত। তখন আমি আমার বাড়িতে শোনা স্মৃতিগুলির কথা মনে করতাম—এস্ত্রাদা কাব্রেরার (Estrada Cabrera) সময়ে কীভাবে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হতো, সবকিছু তল্লাশি করা হতো, এবং কেবল তখনই কথা বলা শুরু হতো যখন নিশ্চিত হওয়া যেত যে কেউ শুনছে না। তাঁরা কখনোই কাব্রেরার নাম উচ্চারণ করতেন না; তাঁকে বলা হতো ‘লোকটি’। বলা হতো, অমুককে হত্যা করা হয়েছে, বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে, কিংবা থানায় নির্যাতন করা হয়েছে।

একদিন আমি এই সমস্ত স্মৃতিকে ‘Los mendigos políticos’’-এর সঙ্গে সংযুক্ত করতে শুরু করি, এবং সেখান থেকেই উপন্যাসটির জন্ম হয়—জেনারেল কানালেসের কাহিনি ও সেই আইনজীবীর গল্প, যাকে ‘পাগলটি’র মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয়। উপন্যাসের প্রায় সব চরিত্রই বাস্তব মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত, যাদের আমি পুরাণ ও গ্রন্থের নিজস্ব কল্পনার সঙ্গে সংমিশ্রিত করেছি।

আনহেল ফেইস (Angel Face) চরিত্রটির ক্ষেত্রে আমি সেই সময়ের দুই বা তিনজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে একত্র করার চেষ্টা করেছি। এই চরিত্রটিকে আমি সুদর্শন করে গড়ে তুলেছি, কারণ এটি কিছুটা মেলে এক মেধাবী ও আকর্ষণীয় আইনজীবীর সঙ্গে—ফ্রান্সিসকো গালভেস পোর্তোকারেরো—যাকে কাব্রেরা কঠিন দুশ্চরিত্রে রূপান্তর করেছিলেন। তিনি শেষ পর্যন্ত জনতার হাতে নির্মমভাবে নিহত হন—যা ছিল সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, কারণ তিনি কোনো অপরাধী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এমন এক ব্যক্তি, যাকে কাব্রেরা নিজের স্বার্থে ব্যবহার করেছিলেন।

এক পর্যায়ে আনহেল ফেইস আর স্বৈরশাসকের ইচ্ছামতো আচরণ করছিল না; সে স্বৈরশাসকেতর ইচ্ছাপূরণের দাসত্ব থেকে পালাতে চাচ্ছিলো। এখানেই কাব্রেরার অন্তর্দৃষ্টি প্রকাশ পায়—স্বৈরশাসকদের যেন এক ধরনের ঘ্রাণশক্তি বা ভবিষ্যদ্বাণীমূলক অনুভূতি থাকে। এই কারণেই আমি মনে করি, যে কেউ স্বৈরশাসক হতে পারে না। কাব্রেরা আনহেল ফেইসের প্রতি সন্দেহ করতে শুরু করে, কারণ সে অনুভব করে যে, যদিও সে বাহ্যিকভাবে তার সঙ্গে আছে, প্রকৃতপক্ষে সে আর তার পক্ষের নয়। ফলত, তাকে কারাগারে ভয়াবহভাবে নির্মূল করা হয়। তাকে বিশ্বাস করানো হয় যে তার স্ত্রী স্বৈরশাসকের উপপত্নী হয়ে গেছে; আর সেই নারীকে সন্দেহের মধ্যে রাখা হয়—তার স্বামী পালিয়ে গেছে কি না এবং তাকে পরিত্যাগ করেছে কিনা তা তাকে বুঝতে দেয়া হয় না। এসবই বাস্তব ঘটনা।

এই ধরনের স্বৈরতন্ত্র যেখানে শাসকেরা আড়ালে থাকে এবং গোপন কোণ থেকে মাকড়সার মতো অশুভ কার্য পরিচালনা করে তা ফ্যাসিবাদেরও পূর্ববর্তী। কাব্রেরা ছিলেন ইতালির কুখ্যাত বোরজিয়া বংশের একজনের মতো, যিনি মানুষকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করতে কোনো দ্বিধায় ভুগতেন না। বিপরীতে, পরবর্তী সময়ে উবিকোর মতো স্বৈরশাসকরা গুয়াতেমালার জনসমক্ষে আবির্ভূত হন—বিশাল সামরিক পোশাক, মোটরসাইকেল ও মাইক্রোফোনসহ। এটি ছিল ফ্যাসিবাদ ও নাৎসিবাদের রূপ; কিন্তু কাব্রেরার শাসন ছিল এক নীরব, ভয়াবহ স্বৈরতন্ত্র, যেখানে আজকের মতো যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না।

কাব্রেরা দেশের দুইটি প্রধান বন্দর—আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের বন্দর—সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। কোনো বিদেশি সংবাদপত্র প্রবেশ করতে পারত না; কেবল তাঁর প্রকাশিত পত্রিকাগুলিই চলত, এবং তখন রেডিওও ছিল না। আজকের দিনে কোনো স্বৈরশাসন আর এভাবে একটি দেশকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পারে না, কারণ গোপনে রেডিও চালিয়ে মানুষ জানতে পারে বাইরে কী ঘটছে। কাব্রেরার শাসনামলে এই বিচ্ছিন্নতা এতটাই চরম ছিল যে বিশ্ববরেণ্য অনেক ব্যক্তিত্ব, যাঁরা কখনো ঘটনাস্থলে যাননি, মিনার্ভার উৎসবের প্রশংসা করে প্রবন্ধ লিখেছিলেন। প্রচারের প্রভাবে যেসব আলোকচিত্রে মিনার্ভাকে উদ্দেশ্য করে গান গাইছে এমন শিশুদের দেখানো হতো তাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন যে এটি এক স্বর্গরাজ্য এবং কাব্রেরা যেন এক ধরনের পেরিক্লেস।

আমরা, আমার প্রজন্মের মানুষরা, যেহেতু কোনো সংবাদপত্র বা নতুন বই পেতাম না, তাই কেবল স্প্যানিশ ও ফরাসি লেখকদেরই পড়তাম—ভিক্তর হুগো, দুমা, জোলা—আমাদের বাড়িতে আগে থেকে ছিল। ধীরে ধীরে বইগুলো পোকায় ধরতে শুরু করে। কাব্রেরার মতো একটি স্বৈরতন্ত্রের আর পুনরাবৃত্তি হতে পারে না। এটি দুইটি প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিয়েছিল—বিশেষত ১৯০৭ সালের প্রজন্মকে, যাঁদের অধিকাংশই ছিলেন চিকিৎসক ও আইনজীবী, প্রায় সবাই ফ্রান্সে শিক্ষিত, এবং গুয়াতেমালায় ফিরে এসেই তাঁরা স্বৈরতন্ত্রের প্রকৃত রূপ উপলব্ধি করেছিলেন।

তাঁরা রাষ্ট্রপতিকে একটি বোমা দিয়ে হত্যার ষড়যন্ত্র করেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেই বিস্ফোরণে নিহত হয় কোচওয়ালা ও তার ঘোড়াগুলি, আর কাব্রেরা বেঁচে যান। প্রথমে ধারণা করা হয় যে, কোচওয়ালা রাষ্ট্রপতির জীবন বাঁচাতে গিয়ে মারা গেছে; ফলে তাকে এক জাঁকজমকপূর্ণ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া দেওয়া হয়, যেখানে জেনারেলরা, সংসদ ও রাষ্ট্রের অন্যান্য ক্ষমতাধরেরা উপস্থিত ছিলেন। সংবাদপত্রে তার প্রতিকৃতি ছাপা হয়, তাকে শহিদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পরে, তার স্ত্রী সরলতার বশে ঘরে পাওয়া কিছু কাগজ পুলিশপ্রধানকে দেখালে প্রমাণিত হয় যে কোচওয়ালা নিজেই ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল। তখন তার মৃতদেহ কবর থেকে তুলে ফেলে দেওয়া হয়।

পাঁচজন ষড়যন্ত্রকারীর মধ্যে সবাই ছিলেন চিকিৎসক। তাদের একজনকে কারাগারে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ষড়যন্ত্রে জড়িত ভালদেস ব্লাঙ্কো ভ্রাতৃবৃন্দ, যারা মেক্সিকো পালানোর পরিকল্পনা করছিলেন তারাও যে বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন সেখানে ধরা পড়েন। শেষ পর্যন্ত জানা যায়নি—তাঁদের একজন অন্যদের হত্যা করে আত্মহত্যা করেছিলেন, না কি সবাইকে হত্যা করা হয়েছিল। পরে সামরিক ক্যাডেটদের আরেকটি আক্রমণ ব্যর্থ হয়। যে ছেলেটি সামরিক বিদ্যালয়ের সেরা নিশানাবিদ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল সে কাব্রেরা প্রাসাদে পৌঁছালে তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করে। কিন্তু গুলি রাষ্ট্রপতিকে অভিবাদন জানানো পতাকার সঙ্গে লেগে যায় এবং কেবল তার হাতে আঘাত করে। কাব্রেরা পড়ে গেলে ক্যাডেটরা মনে করে তিনি মারা গেছেন এবং তার মৃত্যু নিশ্চিত না করেই তারা চলে যায়। প্রচণ্ড ক্রোধে কাব্রেরা সেই কোম্পানি ভেঙে দেন এবং সামরিক বিদ্যালয় পুড়িয়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস করেন।

আমার মনে আছে, ১৯১৯ সালে যখন ছাত্র ও শ্রমিকরা মিলিত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম শুরু করি, তখন শুধু এই ভেবে যে আমরাও ধরা পড়ে যেতে পারি—আমার মায়ের চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল। আমরা ইশতাহার প্রকাশ করেছিলাম, যেখানে লেখা ছিল: ‘প্রয়োজন হলে আমাদের জীবন এখানে নিয়ে নাও, কিন্তু আমরা লড়ছি এবং আমাদের দেশের স্বাধীনতা চাই’। সবার স্বাক্ষরসহ এই ইশতাহার আমরা প্রকাশ করেছিলাম। আজ যখন সেই ইশতাহার গুলো পড়ি, তখন ভয় লাগে এবং নিজেকে প্রশ্ন করি—এই ভয়ংকর জন্তুর সামনে আমরা কীভাবে সেগুলো লিখতে পেরেছিলাম।

মিগুয়েল আনহেল আস্তুরিয়াস রোজালেস

রিতা গুইবার্ট: সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী থাকার সময়ই কি আপনার পরাবাস্তববাদের (Surrealism) সঙ্গে সংযোগ শুরু হয়?

আস্তুরিয়াস: তা কিছুটা পরে ঘটে। আমি তখন ছাত্র, যখন পরাবাস্তববাদ আত্মপ্রকাশ করে; অর্থাৎ এর সাথে আমার প্রথম সংযোগ ঘটে আনুমানিক ১৯২৯—১৯৩০ সালের দিকে, যখন আমি ইতোমধ্যে সরবোন ত্যাগ করেছি। আমি কয়েকজন পরাবাস্তববাদীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলাম, বিশেষ করে দেসনো—যিনি একটি বন্দিশিবিরে মৃত্যুবরণ করেছিলেন—এবং যিনি ব্রেতোঁ, এলুয়ার ও আরাগোঁর গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। আমি দাদাবাদের জনক ত্রিস্তাঁ জারার (Tristan Zara) সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ছিলাম। বহু লাতিন আমেরিকান লেখকের সঙ্গে (সেই সময় প্যারিসে বসবাস করতেন পেরুর মহান কবি ভায়েহো) আমি তাঁদের মনপার্নাসে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন জলসায় অংশগ্রহণ করতাম। নিঃসন্দেহে পরাবাস্তববাদ আমাদের জন্য এক উন্মুক্ত দ্বার হয়ে উঠেছিল এবং আমাদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।

রিতা গুইবার্ট: পরাবাস্তববাদ কীভাবে আপনাকে প্রভাবিত করেছিল?

আস্তুরিয়াস: আমরা অনুভব করেছিলাম যে, এটি আমাদের সৃষ্টিশীলতার স্বাধীনতা দিচ্ছে। ভিন্ন জাতিগত পটভূমির মানুষ হিসেবে আমরা এমন এক সৃজনশীল ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, যেখানে বুদ্ধি ও যুক্তি সর্বদা প্রহরীর ভূমিকা পালন করত। পরাবাস্তববাদ আমাদের জন্য এক নতুন দরজা খুলে দেয়, যার মাধ্যমে আমরা আমাদের অবচেতন মন, আমাদের গভীর সত্তা থেকে উৎসারিত অন্তর্লৌকিক বার্তা প্রকাশ করতে পারি। স্বয়ংক্রিয় লেখা ও লেখার এইসব নতুন রূপ আমাদের জন্য ছিল যেন এক প্রবল আঘাত—কারণ আমরা ইতোমধ্যেই এক ধরনের প্রাথমিক, আরও আদিম ও শিশুসুলভ পরাবাস্তবতা বহন করছিলাম।

পরাবাস্তববাদে নিঃসন্দেহে মৌলিক ও মনস্তাত্ত্বিক উপাদান রয়েছে; আর যেহেতু আমাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ উপাদানের এক সঞ্চিত ভার ছিল, এই নতুন ধারাটি আমাদের সেগুলিকে জীবন্ত করে তোলার সুযোগ দেয়। Popol Vuh কিংবা Anales de Xahil—এর মতো আদিবাসী গ্রন্থে এমন পাঠ রয়েছে, যা প্রকৃত অর্থেই পরাবাস্তব। সেখানে বাস্তবতা ও স্বপ্নের দ্বৈততা বিদ্যমান; সেখানে এমন এক স্বপ্নময়, অবাস্তব পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যেখানে এত সূক্ষ্ম বিবরণ থাকে যে তা বর্ণিত হলে বাস্তবতাই বাস্তবতার চেয়েও অধিক বাস্তব বলে মনে হয়। এখান থেকেই জন্ম নেয় সেই ধারাটি, যাকে আমরা ম্যাজিক রিয়ালিজম বলি।

কিছু ঘটনা ঘটে এবং পরে কিংবদন্তিতে রূপান্তরিত হয়; আবার কিছু কিংবদন্তি পরবর্তীতে বাস্তব ঘটনার আকার ধারণ করে। বাস্তবতা ও স্বপ্নের মধ্যে, বাস্তবতা ও কল্পনার মধ্যে, যা দেখা যায় এবং যা কেবল কল্পিত বলে মনে হয়—এসবের মধ্যে কোনো স্পষ্ট সীমারেখা নেই। আমাদের জলবায়ু, আলো ও পরিবেশের এই সামগ্রিক জাদুকরী আবহ আমাদের কাহিনিগুলিকে দ্বৈত দৃষ্টিতে উপস্থাপন করে। একদিকে সেগুলি স্বপ্নের মতো, অন্যদিকে নিখাদ বাস্তবতা।

সে সময় পরাবাস্তববাদের পাশাপাশি একদল লেখক—যাদের মধ্যে ছিলেন গার্ট্রুড স্টাইন, জেমস জয়েস ও লেওঁ পল ফার্গ (Léon—Paul Fargue)—তারা শব্দ নিয়ে, শব্দের মূল্য নিয়ে এবং শব্দের খেলাকে কেন্দ্র করে গভীরভাবে চিন্তিত ছিলেন। আমাদের কাছে পরাবাস্তববাদের চেয়েও শব্দ ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ, কারণ লাতিন আমেরিকানদের জন্য—বিশেষত আমেরিকার আদিবাসী মানুষদের কাছে—শব্দের একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। শব্দ কেবল চিন্তা ও অনুভূতির বাহক নয়; এর মধ্যে একটি জাদুময় দিকও নিহিত।

এই নতুন শব্দ—গবেষকেরা লক্ষ্য করেছিলেন যে, শব্দগুলির সংযোজন—পদ্ধতির পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অর্থের আড়ালে নতুন নতুন ধারণা আবির্ভূত হয়। আমরা স্প্যানিশ ভাষায় এই ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু করি। এটি এমন সূত্র, যা প্রকৃতপক্ষে এক ধরনের উন্মত্ততার দিকে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু ভাষাকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করে তোলে, বিশেষত ধ্বনিসৌন্দর্য ও অনুকরণধ্বনির ক্ষেত্রে। নির্দিষ্ট শব্দ ও ধ্বনির পুনরাবৃত্তি আদিম সাহিত্য ও আদিবাসী সাহিত্যের একটি অত্যন্ত মৌলিক উপাদান। পরাবাস্তববাদের সমান্তরালে বিকশিত এই সমস্ত দিক আমাদের গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল।

রিতা গুইবার্ট: আপনি কি আপনার সমগ্র রচনায় ভাষা নিয়ে এই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন?

আস্তুরিয়াস: হ্যাঁ, তবে এই উদ্বেগ কিছুটা ভৌগোলিক—ভিত্তিক ও আদিবাসী প্রকৃতির, কারণ আদিবাসীদের কাছে শব্দের একটি পবিত্র ধারণা রয়েছে। তাঁদের মতে, শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে মানুষ যে—বস্তুটির নাম বলে, সেটিকে নিজের করে নিতে পারে। আমি যদি বলি ‘ঘর’, তবে আমি একটি ঘরের অধিকার লাভ করি। এটি এক ধরনের আত্মসাৎ করার প্রক্রিয়া। তাঁদের প্রজ্ঞায় বলা হয়: ‘শব্দের মধ্যে সবকিছু, শব্দের বাইরে কিছুই নয়’। এই ধারণাই আমাদের সাহিত্যকে শব্দ বা পদবাচ্য নিয়ে এক গভীর ও মৌলিক উদ্বেগে আবদ্ধ করে—যখন তা আদিবাসী শিকড়ে প্রোথিত থাকে।

রিতা গুইবার্ট: নিজ দেশের বাইরে বসবাস করা কি আপনার ভাষাগত সৃষ্টিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, যার উৎস গুয়াতেমালার দৈনন্দিন ভাষা?

আস্তুরিয়াস: দেশের বাইরে থাকা একজন লেখকের জন্য একই সঙ্গে লাভজনক ও ক্ষতিকর। দূরে থাকা মানে শ্রাব্য, ঘ্রাণগত এবং এমনকি স্বাদগত সমস্ত মৌলিক উপাদানের প্রাথমিক উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। তবে একই সঙ্গে দূরে থাকা উপকারীও, কারণ তখনই মানুষ ভূ-দৃশ্যকে আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারে, চরিত্রগুলিকে ভালোভাবে দেখতে পারে এবং শব্দগুলিকে গভীরভাবে শুনতে পারে। লেখক বা শিল্পী ও প্রত্যক্ষ বাস্তবতার মধ্যে একটি দূরত্ব সৃষ্টি হয়।

কিছু সময় পর দেশে ফিরে এলে এক নতুনত্বের জগৎ আবিষ্কৃত হয়, যা অল্পদিন পর আর নতুন বলে মনে হয় না। উদাহরণস্বরূপ, গুয়াতেমালায় সূর্যাস্তের দৃশ্য অপূর্ব। প্রথমবার তা দেখলে মানুষ বিমুগ্ধ হয়ে যায়, কিন্তু পরে আর তা অনুভব করা যায় না, কারণ সেটি স্বাভাবিক ভূদৃশ্যের অংশ হয়ে ওঠে। একজন শিল্পীর জন্য আদর্শ অবস্থা হলো বছরের একাংশ নিজের দেশে এবং আরেক অংশ দেশের বাইরে বসবাস করা।

রিতা গুইবার্ট: যদিও আপনি আপনার জীবনের অধিকাংশ সময় বিদেশে কাটিয়েছেন, তবুও আপনার সাহিত্যকর্মের বিষয়বস্তু বরাবরই গুয়াতেমালা। এটা কেন?

আস্তুরিয়াস: আমি তাঁদের মধ্যে একজন, যারা বিশ্বাস করে যে সাহিত্যকে অবশ্যই বিশেষ থেকে সার্বিকের দিকে অগ্রসর হতে হবে। এক সময় বিশ্বজনীনতা বা কসমোপলিটানিজমকে কেন্দ্র করে একটি বৃহৎ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। প্যারিসে আমি যেসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লেখকের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম তাদের মধ্যে রয়েছেন এনরিকে গোমেস কারিয়ো (খ্যাতনামা গুয়াতেমালান ক্রনিকলার), দোন ভেন্তুরা ও দোন ফ্রান্সিসকো গার্সিয়া কালদেরোন (পেরুভীয় লেখক), এবং গনসালো সালদুম্বিদে (বিখ্যাত ইকুয়েডরীয় লেখক)। তাঁরা সকলে তাঁদের রচনায় নিজ নিজ দেশের বাস্তবতা থেকে শুরু না করে সার্বজনীন বিষয়কে আঁকড়ে ধরেছিলেন। তাঁদের সাহিত্যকর্ম যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং এখনও আছে, তা অস্বীকার করা যায় না; কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেই সাহিত্য আজ প্রায় বিস্মৃত ও হারিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, যেসব লেখক নিজেদের দেশ থেকে শুরু করেছেন এবং নিজেদের দেশ সম্পর্কে লিখেছেন, তাঁদের সাহিত্য কখনো হারিয়ে যায়নি। কারণ এই রচনাগুলি সাহিত্যিক মাইলফলক হয়ে ওঠে এবং বিশ্বসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লাতিন আমেরিকার লেখকেরা তাঁদের নিজ নিজ জাতির দিকে মনোনিবেশ করতে শুরু করেন, নিজেদের জগতের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এভাবেই আমাদের সাহিত্য পুনর্গঠিত, সমৃদ্ধ ও বিস্তৃত হয়েছে। সাহিত্য কসমোপলিটানিজম থেকে সরে এসে সরাসরি বিশেষত্বের দিকে, স্বাতন্ত্র্যের দিকে, আদিবাসীবাদ ও ক্রেয়োলিসমের (Creoleism) দিকে অগ্রসর হয়েছে, যদিও এর অর্থ এই না যে লেখককে কেবল আদিবাসীবাদী বা ক্রেয়োলিস্ট হয়েই থাকতে হবে। আমার বিশ্বাস, লেখকের জগৎকে ক্রমাগত সম্প্রসারিত করতে হবে, তবে তা অবশ্যই নিজ দেশ ও নিজ বাস্তবতা থেকে শুরু করে।

আমার মনে আছে, যখন আমি ভ্যালেরির কাছে গিয়েছিলাম Leyendas de Guatemala-এর ফরাসি অনুবাদের জন্য ফ্রান্সিস দে মিওমান্দ্রেকে লেখা তাঁর চিঠির জন্য কৃতজ্ঞতা জানাতে—যে-চিঠিতে ভ্যালেরি বলেছিলেন, এই কিংবদন্তিগুলি যেন অন্য এক গ্রহের ভাষায় রচিত জাদু, যা তাঁর ইউরোপীয় চেতনার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত, এবং যা পড়ার চেয়ে যেন পান করে নেওয়া যায়। তখন ভ্যালোরি আমাকে অঙ্গীকার করিয়েছিলেন আমি যেন প্যারিস ছেড়ে চলে যাই। তাঁর মতে, আমি যদি প্যারিস থেকে যাই, তবে সিন নদী, নোত্র দাম কিংবা ভার্সাই সম্পর্কে লিখে আরেকজন লেখকে পরিণত হব। তিনি বলেছিলেন— ‘আমরা ফরাসিরাই তো সেই লেখক অনেক ভালোভাবে হতে পারি’। বহু হিস্পানিক—আমেরিকান লেখক একারণেই এখানে এসে লেখক হিসেবে ব্যর্থ হন, কারণ তাঁরা নিজেদের মৌলিক সত্তাকে ভুলে যান। ভ্যালেরির এই উপদেশটি আমার জন্য অত্যন্ত মূল্যবান ছিল। ইউরোপে দশ-এগারো বছর বসবাসের পর দেশে ফিরে আমি যেন এক নতুন ও সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করি—যেন স্পঞ্জের মতো ভূদৃশ্য ও জীবনের সমস্ত উপাদান শুষে নিতে শুরু করি। এই অভিজ্ঞতাই আমার সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়েছে, বিশেষত Hombres de maíz এবং Mulata de tal-এ। এই গ্রন্থগুলিতে আমি আমার দেশের আরও বৈচিত্র্যময় রূপ তুলে ধরতে পেরেছি, যা Leyendas-এ সম্ভব হয়নি, যখন আমি তুলনামূলকভাবে আরও সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ ছিলাম।

মিগুয়েল আনহেল আস্তুরিয়াস রোজালেস

রিতা গুইবার্ট: আপনার সাহিত্যে ভূতাত্ত্বিক (telluric) ও পৌরাণিক প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয় কেন?

আস্তুরিয়াস: প্রকৃতিই আমার সাহিত্যকর্ম। সাধারণভাবে বলতে গেলে, লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রকৃতির ওপর মানুষের আধিপত্যের অভাব। ইউরোপীয় সাহিত্যে, বিশেষ করে উপন্যাসে, প্রকৃতি মানুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং খুব সামান্য ভূমিকা পালন করে, কারণ সেসব উপন্যাস কংক্রিট ও কাচের পরিবেশে আবর্তিত। কিন্তু আমাদের আমেরিকায় প্রকৃতি কেবল পটভূমি নয়; বহু উপন্যাসে প্রকৃতিই প্রধান চরিত্র।

উদাহরণস্বরূপ, কলম্বীয় ঔপন্যাসিক ইউস্তাসিও রিভেরার La vorágine-এ আমরা দেখি কীভাবে সমুদ্রের মতো এক বিশাল জঙ্গল—ক্রমে উপন্যাসের প্রধান চরিত্রে রূপান্তরিত হয়। উপন্যাস পড়তে পড়তে আমরা লক্ষ্য করি, দুই তরুণ প্রেমিক-প্রেমিকা, যাদের প্রেম প্রথমে আমাদের কাছে ট্র্যাজিক ও বীরত্বপূর্ণ বলে মনে হয়, ধীরে ধীরে তা গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে এবং জঙ্গলই হয়ে ওঠে উপন্যাস ও আখ্যানের কেন্দ্রবিন্দু। গাছ, সাপ, পশু, এবং সেই সব কঙ্কাল, যারা ক্ষুধায় ধ্বংস হয় এবং সেখানে মৃত্যুবরণ করে। একই বিষয় দেখা যায় অন্যান্য উপন্যাসেও।

আমার নিজের রচনায় গুয়াতেমালার প্রকৃতি একটি কেন্দ্রীয় ও প্রাধান্যপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। মধ্য আমেরিকার ভূগোল, আলো, জল, পাহাড় ও আগ্নেয়গিরির আকৃতি—সবকিছুই আমার সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছে। গুয়াতেমালার আলো যেন সবসময় ভেজা কাচের মতো; বস্তু কখনো কাছ থেকে দেখা যায় না, সবকিছুতেই এক দূরত্ব ও প্রতিফলন থাকে। এই আলো, এই সবুজ রং, এই পাখি ও ফুলের প্রাচুর্য আমার সাহিত্যকে আকার দিয়েছে।

আমার রচনায় পাহাড় ও নদী প্রায়ই মানবীয় রূপ ধারণ করে, আবার মানুষও প্রকৃতির রূপে রূপান্তরিত হয়। Hombres de maíz-এ মারিয়া তেকুন নামের চরিত্রটি একই সঙ্গে এক মানবী ও এক পাহাড়ের প্রতীক। এভাবেই প্রকৃতি ও মানবসত্তার মধ্যে এক গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গুয়াতেমালা মূলত সবুজের দেশ। এ কারণেই আদিবাসীদের কিচে বলা হয়, যার অর্থ সবুজ বৃক্ষের দেশ। এই সবুজ ভূদৃশ্যের মধ্য দিয়ে রঙিন পোশাকে সজ্জিত আদিবাসীরা চলাফেরা করে, যারা নিজেরাও ভূদৃশ্যের অংশ হয়ে ওঠে।

এই প্রকৃতি আমার সাহিত্যকে কখনো অতিরিক্ত নিষ্ঠুর বা রক্তাক্ত হতে দেয় না। মানুষের চরিত্রও পরিবেশ দ্বারা গঠিত হয়। আলো, প্রতিফলন, জাদু, কিংবদন্তি, চিকিৎসক ও জাদুকরের জগৎ—সবকিছু মিলিয়ে এক দৃশ্যমান ও অদৃশ্য জগৎ তৈরি হয়, যা দরিদ্র মানুষের জীবনধারণে সহায়ক হয়ে ওঠে।

রিতা গুইবার্ট: আপনার সাহিত্যে যে হাস্যরস পাওয়া যায়, তার উৎস কী?

আস্তুরিয়াস: একজন ফরাসি সমালোচক বলেছেন যে El señor presidente-এ সবকিছু যখন নিমজ্জিত হয়ে যায়, তখনও কোনো না কোনো চরিত্র আকাশ, তারা বা আলো দেখে এবং পাঠক যেন সেই অন্ধকার থেকে উঠে আসতে পারে। আমার মনে হয়, আমার রচনার হাস্যরসের উৎস গুয়াতেমালার তথাকথিত ‘চাপিন হাস্যরস’ (chapín humor)। রাজধানীর বাসিন্দাদের ‘চাপিন‘ বলা হয়, এবং তাঁদের ভাষাভঙ্গির একটি বৈশিষ্ট্য হলো—যে-কোনো ঘটনাকে একটু রসিকতা বা কৌতুকে রাঙিয়ে তোলা। এই প্রবণতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলেন ঊনবিংশ শতকের রোমান্টিক কবি পেঁপে বাতরেস মন্তুফার (Pepe Batres Montúfar), যাঁর গভীর দুঃখের মধ্যেও হালকা হাসির উপাদান ফুটে ওঠে।

রিতা গুইবার্ট: হিস্পানিক-আমেরিকান সাহিত্যের স্প্যানিশ ভাষা কি কাস্তিলীয় বিশুদ্ধতা হারিয়ে স্থানীয় বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে? আপনি কি এই পরিবর্তনের পক্ষে?

আস্তুরিয়াস: হিস্পানিক-আমেরিকান উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো আমাদের স্প্যানিশ ভাষা। মেক্সিকো, গুয়াতেমালা, পেরু, বলিভিয়া ও ইকুয়েডরের মতো দেশে—যেখানে আদিবাসী ভাষা এখনও জীবিত—স্প্যানিশ একটি স্বতন্ত্র চরিত্র ধারণ করেছে। কাস্তিলীয় ব্যাকরণ অনেকটাই পরিত্যক্ত হয়েছে এবং আদিবাসী ভাষার গঠন তার সঙ্গে মিশে গেছে। আমাদের সাহিত্যে শব্দের গুরুত্ব বাক্যের চেয়ে বেশি। আদিবাসী সংস্কৃতিতে শব্দ পবিত্র; শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে বস্তু বা সত্তার ওপর এক ধরনের জাদুকরী অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

এই কারণেই আমার সাহিত্যে শব্দের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি অনুচ্ছেদের জন্য সঠিক শব্দ খুঁজতে আমি দিনরাত ব্যয় করি। শব্দ যত নিখুঁত হয়, তত গভীরভাবে তা অনুভূতি ও বাস্তবতাকে ধারণ করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় আমাদের স্প্যানিশ ভাষা কাস্তিলীয় স্প্যানিশ থেকে অনেক দূরে সরে গেছে; এটি আদিবাসী ভাষায় ‘গর্ভবতী’ এক নতুন ভাষা। এমনকি বার্নাল দিয়াস দেল কাস্তিয়োর মতো প্রাথমিক স্প্যানিশ লেখকদের লেখাতেও এই রূপান্তর দেখা যায়। আমেরিকার আলো, বাতাস ও প্রকৃতি নিজেই ভাষাকে রূপান্তরিত করে।

আমি এই ভাষাগত সমৃদ্ধির বিরোধী নই। বরং মনে করি, হিস্পানিক-আমেরিকান স্প্যানিশ ক্রমাগত সমৃদ্ধ হচ্ছে—যেমন ইংরেজি ভাষা হয়েছে। আমার উপন্যাস Maladrón-এ আমি ইচ্ছাকৃতভাবে এক ধরনের সুরেলা, সমৃদ্ধ স্প্যানিশ ব্যবহার করেছি, যা ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের স্মৃতি জাগায়, কিন্তু আজকের পাঠকের কাছেও বোধগম্য।

রিতা গুইবার্ট: আপনার শৈলীতে শব্দ ও ধ্বনির পুনরাবৃত্তির তাৎপর্য কী?

আস্তুরিয়াস: আদিবাসী ভাষায় অতিশয় বোঝাতে শব্দ বা ধ্বনির পুনরাবৃত্তি করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, সাদা সাদা সাদা—মানে অত্যন্ত সাদা। এই পুনরাবৃত্তি শৈলীর মধ্য দিয়েই তীব্রতা প্রকাশ পায়।

রিতা গুইবার্ট: আপনার শৈলী সাধারণ পাঠকের জন্য সবসময় সহজবোধ্য নয়। আপনি কি একমত?

আস্তুরিয়াস: আমার বই সহজ নয়, কারণ এতে আমাদের ভাষার বারোক প্রবণতা রয়েছে। এই বারোক প্রবণতা আমাদের সাংস্কৃতিক বাস্তবতারই অংশ। যেমন, ঔপনিবেশিক আমলে আদিবাসীরা ইউরোপীয় স্থাপত্যে নিজেদের অলংকার যোগ করেছিল, তেমনই আমাদের সাহিত্যে ভাষা ক্রমে অলংকৃত ও ঘন হয়ে উঠেছে। আমার সাহিত্য আদিবাসী মায়া ও নাহুয়া ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তবু আমি চেষ্টা করি, আদিবাসী শব্দ কম ব্যবহার করে স্প্যানিশেই তাদের ভাব প্রকাশ করতে, যাতে সাহিত্যটি সর্বজনগ্রাহ্য হয়।

রিতা গুইবার্ট: আপনার নিজ সাহিত্যকর্মগুলোর মধ্যে প্রিয় গ্রন্থ কোনটি?

আস্তুরিয়াস: লেখক তাঁর গ্রন্থগুলিকে সন্তানের মতো ভালোবাসেন। তবু বলবো আমার সবচেয়ে প্রিয় Hombres de maíz—যদিও El señor presidente সাহিত্যিক দিক থেকে মৌলিক ও অপরিহার্য। Hombres de maíz একটি গভীর ও প্রতীকবদ্ধ গ্রন্থ; এটি পাঠকের কাছে সহজ-সমঝোতায় আসে না। এতে আদিবাসী, পৌরাণিক ও উদ্ভিদজগতের উপাদান এত গভীরভাবে মিশে আছে যে, প্রতিবার পড়লে নতুন নতুন অর্থ উন্মোচিত হয়। কখনো চরিত্র বাস্তব থেকে প্রেতাত্মায় রূপান্তরিত হয়, কখনো আবার উল্টোটা ঘটে। এই উপন্যাসে স্প্যানিশ ভাষা কখনো কখনো আর স্প্যানিশ বলে মনে হয় না—বরং অন্য এক ভাষার গানের মতো শোনায়।