চবির হলে ৮ লাখ টাকার মালামাল চুরি, দায় নিয়ে ছোড়াছুড়ি

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) নির্মাণাধীন শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর হল থেকে অন্তত ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার মাল চুরি হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ করতে না পারায় আগের কন্ট্রাক্ট বাতিল হয়েছে মাস কয়েক আগে। চলছে নতুন টেন্ডারের কাজ। এরই মধ্যে চুরি হলো বিশাল পরিমাণ সম্পদ। এখন এই চুরির ঘটনায় দায় নিতে রাজি নয় কেউ। হলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বই বা কার ছিল— তা নিয়ে একে অপরকে দোষারোপ করছে বিভিন্ন পক্ষ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ও প্রকৌশল দফতর সূত্রে জানা গেছে, নির্মাণাধীন হলটির বেশ কিছু সিলিং ফ্যান, ইলেক্ট্রিক সামগ্রী, থাই অ্যালুমিনিয়াম ও জানালার কপাট খুলে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। ওই হলের প্রভোস্ট ড. কুন্তল বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ২১ জুলাই দুপুর ২টার দিকে প্রকৌশল দফতর থেকে আমাকে এ ঘটনা জানানো হয়েছে। আনুমানিক ৮-১০ লাখ টাকার মতো চুরি গেছে। তবে কী কী চুরি হয়েছে সেটা এখনও জানা যায়নি। প্রকৌশল দফতর একটা তালিকা করবে।’

তিনি বলেন, ‘সেদিন থেকে ঘটনাস্থল কয়েক দফা পরিদর্শন করেছি। নাট্যোৎসবের জন্য কয়েক দিন কলকাতায় ছিলাম। হয়তো আমার অবর্তমানেই এটা হয়েছে। তবে এটা এক দিনে হয়নি। দীর্ঘ সময় পরিকল্পনা করে করেছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা প্রধান মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘বুধবার সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু হলের পেছনের কর্মচারী ভবন থেকে এক গার্ড বিষয়টি লক্ষ্য করেন। তিনি কিছু শব্দ পেয়ে আঁচ করেছিলেন। আমাকে ফোন দিলে আমি লোক পাঠাই।’

তিনি বলেন, ‘তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। হলের চতুর্দিকে তালা দেওয়া, ঢোকার কোনও সিস্টেম নাই। দেওয়াল টপকিয়ে আমাদের লোকেরা গেছে। গিয়ে দেখে বিভিন্ন জিনিস নিয়ে গেছে। অন্ধকারে লাইট মেরে মেরে দেখলাম পুরোটা।’

এদিকে এই ঘটনা ‘ক্যাম্পাসের ছিঁচকে চোরদের কাজ’ বলে জানিয়েছেন প্রকৌশল দফতরের প্রধান প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর ফজল। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বুধবার রাতে নিরাপত্তা দফতর থেকে আমাকে ফোন করার পরদিন গিয়ে পরিদর্শন করেছি। কী কী চুরি হয়েছে তার তালিকা করে প্রশাসনকে দেওয়া হবে।’

দায় ও দায়িত্ব কার?

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দফতর সূত্রে জানা যায়, ওই হলের কন্ট্রাক্ট ছিল মঞ্জুরুল আলম অ্যান্ড কোম্পানির সাথে। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় দুই-তিন মাস আগে তা বাতিল করা হয়েছে। অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে নতুন করে টেন্ডারের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

চুক্তি বাতিল হওয়ার পর ঠিকাদার হল ছেড়েছেন। কিন্তু এর পরে ওই হলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি কোনও পক্ষই। তবে এখন হল প্রভোস্ট, নিরাপত্তা প্রধান, প্রধান প্রকৌশলী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার একে অপরকে দোষারোপ করছেন।

রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এস‌এম মনিরুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হলে চুরির ব্যাপারে জেনেছি। তবে লিখিত কোনও তথ্য পাইনি। ঠিকাদার যদি দায়িত্ব হস্তান্তর করে থাকে, তাহলে প্রকৌশল দফতরের দায়িত্ব এটি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা দফতরের প্রধান মো. আব্দুর রাজ্জাকও একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রকৌশল দফতরের উচিত ছিল আমাকে চিঠি দিয়ে গার্ড নিয়োগ চাওয়া। এখন চুরি হলো, আমরাই তাদের বিষয়টি জানিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘রেজিস্ট্রার স্যার আমাকে মার্ক করেছেন। আমি তাকে জানিয়েছি যে উনি (প্রকৌশলী) আমাকে চিঠি দেয়নি, আমিই বিষয়টি বারবার স্মরণ করিয়েছি তাকে। ওখানে বিদ্যুৎ নেই, কিছু নেই, অন্ধকারে ওখানে লোক থাকতে পারে?’

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর ফজল বলেন, ‘ঠিকাদার অনেক আগেই হল ছেড়ে গেছে। তার কোনও প্রতিনিধি এখানে থাকে না। হলের দায়িত্ব এখন প্রভোস্টের। ওখানে প্রভোস্ট আছে, প্রভোস্ট থাকলে আমাদের আর কিছু করার নাই। প্রভোস্ট এবং নিরাপত্তা দফতরই জানে বিষয়টা।’

এ বিষয়ে শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর হলের প্রভোস্ট ড. কুন্তল বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হলের কাজ শেষ হলে ঠিকাদার প্রকৌশলকে বুঝিয়ে দিবে, প্রকৌশল প্রশাসনকে এবং প্রশাসন আমাদেরকে বুঝিয়ে দিবে। কিন্তু প্রকৌশল বিভাগ এটা প্রশাসনকে হস্তান্তর করেনি।’

তিনি বলেন, ‘এখন এটা কার নজরদারিতে থাকবে, আমি এটা ক্লিয়ার না। প্রশাসনই বলতে পারবে। তবে হলে যখন ছাত্ররা উঠবে তখন পুরো দায়িত্ব আমার। আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু হলটা আমাকে সেভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি।’

প্রভোস্ট বলেন, ‘দায়িত্বটা নিরাপত্তা দফতরের। জায়গা বিশ্ববিদ্যালয়ের, এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই থাকবে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকার একটি স্থাপনার ব্যাপারে নিরাপত্তা দফতরকে চিঠি দিতে হবে কেন? পুরো এলাকার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব তো তাদেরই নেওয়া উচিত। আমাকে কি সব কিছুতেই চিঠি দিয়ে জানাতে হবে? পুরো ক্যাম্পাস তো রক্ষা করার দায়িত্ব তাদের।’

তিনি বলেন, ‘এটা চুরি হয়ে কোন দিকে নিয়ে গেল? আমরা তো একটা ট্রাংকও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে নিয়ে যেতে পারি না। আমাদের বলতে হয়, কেন নিচ্ছি। কাজেই এত জিনিসপত্র চুরি হয়ে কোন দিকে গেল সেটা নিরাপত্তা দফতর আর প্রকৌশল বিভাগই বলতে পারবে।’