জাবিতে নিপীড়নবিরোধী মঞ্চের বিক্ষোভ

ধর্ষণ ও নিপীড়নমুক্ত নিরাপদ ক্যাম্পাসের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা৷ বুধবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুর দেড়টায় নিপীড়নবিরোধী মঞ্চের ব্যানারে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়৷ 

বিশ্ববিদ্যালয়ের মুরাদ চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে নতুন প্রশাসনিক ভবনের সামনে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হয়।

এ সময় বক্তারা চার দফা দাবি উত্থাপন করেন। সেগুলো হলো- ধর্ষক ও তার সহায়তাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে; মেয়াদোত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের হল থেকে বের এবং গণরুম বিলুপ্ত করে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের আবাসন নিশ্চিত করতে হবে; নিপীড়ক শিক্ষক মাহমুদুর রহমান জনির বিচার নিষ্পত্তিসহ ক্যাম্পাসে নানাবিধ অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনতে হবে; নিপীড়কদের সহায়তাকারী প্রক্টর ও হল প্রভোস্টের অপরাধ তদন্ত করে তাদের প্রশাসনিক পদ থেকে অব্যাহতি দিতে হবে।’

এ সময় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফ সোহেল বলেন, ‘ক্যাম্পাসে ধর্ষণের ঘটনার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও এ ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত শাহ পরান পলাতক রয়েছে৷ প্রশাসনের নাকের ডগায় একজন অপরাধী পালিয়ে গেলো কীভাবে৷ মোস্তাফিজের মতো ছাত্ররা ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অবস্থান করছে৷অবিলম্বে টর্চার সেল বন্ধ করতে হবে৷ িসব শিক্ষার্থীর জন্য বৈধ সিট নিশ্চিত করতে হবে। গণরুম প্রথা বিলুপ্ত করতে হবে৷ এই ঘটনার দিকে না তাকিয়ে নিপীড়নের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’

নিপীড়নবিরোধী আন্দোলনের সংগঠক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরীন বলেন, ‘১৯৯৮ সালে আমরা যখন জাহাঙ্গীরনগরে ছিলাম, তখন ধর্ষণের বিরুদ্ধে দিনের পর দিন আন্দোলন গড়ে উঠেছে৷ জাবিতে ধর্ষণের ঘটনা শুনে আমার হৃদয় কেঁদে উঠেছে৷এই ঘটনা কেন তদন্ত সেলের কাছে আসেনি, আমাদের প্রশ্ন। আমি প্রশাসনকে বলবো, যদি সহযোগিতা চান আমরা করবো, আমাদের অভিজ্ঞতা আপনাদের কাজে লাগবে।’

নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী সোহাগী সামিয়া বলেন, ‘জাবির স্বাধীন পরিবেশ আমাদের আন্দোলনে শক্তি জোগায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সিস্টেম নিপীড়ক তৈরি করে, আমরা সে সিস্টেমের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি। দেশের যেকোনও প্রান্তে অন্যায় আমরা বরদাশত করবো না।’

নিপীড়নবিরোধী মঞ্চের সদস্যসচিব মাহফুজ ইসলাম মেঘ বলেন, ‘প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হলে সিট পায় না। হলে অছাত্রদের বসে থাকতে দেখা যায়৷ সব নিপীড়নের ঘটনায়ও তারা লিপ্ত থাকে৷ এসব ঘটনায় প্রশাসন নির্লিপ্ত থাকে। আমরা সামনের সিন্ডিকেট মিটিংয়ে এ ঘটনাকে এজেন্ডাভুক্ত করার দাবি জানাই৷’

ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক গোলাম রব্বানি বলেন, ‘আমরা উপাচার্যকে বলতে চাই, আপনি ব্যর্থ হয়েছেন। আমরা জানি না, আপনি কেন সিন্ডিকেট বাতিল করেছেন। আমরা আশা করি, আগামী সিন্ডিকেটে এটি এক নম্বর এজেন্ডাভুক্ত হবে। যতদিন পর্যন্ত এ ক্যাম্পাস নিরাপদ না হবে, ততদিন পর্যন্ত আমাদের এ আন্দোলন চলবে৷ ধর্ষক, চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ীমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।’

ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক পারভিন জলি বলেন, ‘আমরা জানি না কেন সিন্ডিকেট বাতিল হয়েছে৷ আমরা উপাচার্যকে বলেছি স্টাকচার্ড কমিটির সভাপতি তো আপনি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান হিসেবে গত বছর যৌন নিপীড়নের অপর ঘটনায় কেন শিক্ষক মাহমুদুর রহমান জনিকে বহিষ্কার করা হয়নি৷ তিনি শিক্ষক হওয়ার আগে ছাত্র সংগঠনের প্রধান ছিলেন এটাই কি কারণ? আশা রাখি, যেদিন পরবর্তী সিন্ডিকেট হবে সেদিন এটি প্রথম এজেন্ডা হবে। তিন দিনের আন্দোলনে আমাদের অর্জন হলো, অভিযুক্ত মোস্তাফিজের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেওয়া, তাদের বহিষ্কার করা৷ মোস্তাফিজকে পালাতে যে কর্মচারী সহায়তা করেছে, যে প্রক্টর ছাত্রলীগের দুজন কর্মীকে দায়িত্ব দিলেন তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে। আমরা তদন্ত কমিটি পুনর্গঠনের দাবি জানাই৷ নিপীড়নবিরোধী সেল থেকেও সেখানে একজনকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে৷ আমরা শিক্ষকরা দীর্ঘদিন নিপীড়নের ঘটনায় সোচ্চার আছি। আমাদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে৷’

এ সময় অধ্যাপক সোহেল আহমেদ, অধ্যাপক মাফরুহী সাত্তার ও বিভিন্ন অনুষদের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত, শনিবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের ৩১৭ নম্বর কক্ষে স্বামীকে আটকে রেখে এক নারীকে ওই হল সংলগ্ন জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ওইদিন রাতেই আশুলিয়া থানায় মামলা করেন ভুক্তভোগীর স্বামী। পরে অভিযান চালিয়ে চার জনকে গ্রেফতার করা হয়। বাকি দুজন পলাতক রয়েছে।