বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপনকে সামনে রেখে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাস। অতীতের গ্লানি ভুলে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে বিভিন্ন বিভাগ ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যস্ততায় ইতোমধ্যেই প্রাণ ফিরে পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘নববর্ষের ঐক্যতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’।
দুই দিনব্যাপী আয়োজনের প্রথম দিনে আজ চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘ব্যাঙের পানচিনি বিয়ে’। গ্রামবাংলার লোকজ বিশ্বাস অনুযায়ী, বৃষ্টির প্রার্থনায় এই প্রতীকী আয়োজন প্রতি বছরই অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ঢাকের বাদন, বিয়ের গান ও লোকজ রীতিতে সম্পন্ন হবে এই অনুষ্ঠান।
আয়োজকরা জানান, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ঐক্যের বার্তা তুলে ধরাই এবারের আয়োজনের মূল লক্ষ্য। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সবাইকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা গেছে, চারুকলা বিভাগে চলছে আনন্দ শোভাযাত্রার প্রস্তুতি। শিক্ষার্থীরা বাঁশ, কাঠ ও কাগজ দিয়ে তৈরি করছেন বিশাল আকৃতির ষাঁড়, ঘোড়া ও পাখির কাঠামো। পাশাপাশি রঙতুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মোটিফ, মুখোশ, মাটির সরা ও নানা শিল্পকর্ম। দিন-রাত পরিশ্রমে ব্যস্ত শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতায় ইতোমধ্যেই রঙিন হয়ে উঠেছে কলাভবন এলাকা।
তবে এবারের শোভাযাত্রায় কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. এ বি এম আজিজুর রহমান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, শোভাযাত্রায় কোনোভাবেই মুখোশ পরিধান করা যাবে না এবং ক্যাম্পাসে রঙ ছিটানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নির্দেশনা অমান্য করলে নেওয়া হবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। এ ছাড়া রাত ১০টার মধ্যে সব অনুষ্ঠান শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১৪ এপ্রিল সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে উপাচার্যের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে দিনের কর্মসূচি শুরু হবে। সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে পুরাতন কলাভবন সংলগ্ন মৃৎমঞ্চে সমবেত সংগীত ‘এসো হে বৈশাখ’-এর মাধ্যমে বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হবে। এরপর সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে চারুকলা বিভাগের তত্ত্বাবধানে বের হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা, যা সেলিম আল-দীন মুক্তমঞ্চে গিয়ে শেষ হবে।
এ ছাড়া দিনব্যাপী বিভিন্ন আয়োজনের মধ্যে রয়েছে বৈশাখী ফলাহার, লোকজ খেলাধুলা, পুতুলনাট্য, জারিগান, পদাবলী কীর্তন ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। বিকাল থেকে টিএসসি চত্বরে বসবে মেলা ও লোকজ আপ্যায়ন। রাত পর্যন্ত চলবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
চারুকলা বিভাগের ৪৮ আবর্তের শিক্ষার্থী মো. ফেরদাউস এবারের পহেলা বৈশাখের আয়োজক কমিটির একজন সদস্য। তিনি জানান, নতুন বর্ষকে বরণ করে নিতে প্রস্তুতি প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। এবারও বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকো মোটিফ ঘোড়া, ষাড়, ব্যাঙ, বিভিন্ন রংবাহারী মুখোস থাকছে আমাদের আয়োজনে। আর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ব্যাঙের বিয়ের জন্যও আমাদের ব্যাঙও তৈরি হয়ে গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফাহমিদা আক্তার বলেন, ‘প্রতি বছরের ন্যায় এবারেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজন করা হবে দুই দিনব্যাপী পহেলা বৈশাখ। বাঙালি জাতির যে ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক যে চর্চা এবং সময়কালের সৃজনশীল উপস্থাপনা সবকিছুর সমন্বয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি জাতির সাংস্কৃতিক ঐক্য ও আত্মপরিচয়ের যে সুর, ছন্দ। এবারের আয়োজনের মধ্য দিয়ে তারই প্রতিফলন হবে।’









